জয়ী বিছানায় পা তুলে বসে আছে। মনিরুদ্দিন, তার বাবা এবং বেশ কিছু আত্মীয় স্বজন চলে এসেছে। বসার ঘরে সবার জায়গা হচ্ছে না। বারান্দায় কিছু বেতের চেয়ার দেয়া হয়েছে। সবাই নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করছেন। মনিরুদ্দিন সৌদী আরবে সাদামের বাহিনী ঢুকে পড়েছে এই খবরে খুবই উল্লাসিত। তিনি নীচু গলায় ভেতরের কিছু খবরও দিচ্ছেন। তেমন বাংলাদেশ টেলিভিশন যে বার বার বলছে সৌদী আরবে: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সকল সদস্য ভালো আছে। এটা খুবই ভুল খবর। এরা আসল খবর দিচ্ছে না। আসল খবর হলো স্কার্ড মিজাইলে একাত্তুর জন সোলজার শেষ। ঢাকা এয়ারপোর্টে কার্ফিউ দিয়ে এদের ডেড বডি আনা হয়েছে। এটা খুবই পাকা খবর।
সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে শুনছে। এক দফা চা হয়েছে। দ্বিতীয় দফা চ্যায়ের অর্ডার দেয়া হয়েছে। বিয়ে পড়াতে সামান্য দেরী হবে। মগবাজারের কাজী সাহেব এখনো এসে পৌছান নি। তাকে আনতে গাড়ি গেছে।বরপক্ষ ছেলের এক খালা বড় একটা সুটকেস নিয়ে এসেছেন। তিনি হাসি হাসি মুখে এ বাড়ির মেয়েদের সুটকেসের জিনিস দেখাচ্ছেন।হুট করে বিয়ে হচ্ছে এই জন্যেই ঘরে যা ছিল তাই আনা হয়েছে। গয়নার এই সেটটা আপনারা একটু দেখেন। কিছুক্ষণ আগে রেডিমেড কেনা হয়েছে। দাম পড়েছে আশি হাজার সাত শা। মোট পাঁচটা রিয়েল ডায়ামন্ড আছে। রিসিটও সঙ্গে এনেছি পছন্দ না হলে বদলে আনতে পারবেন।
মেয়েরা চোখ বড় বড় করে জড়োয়া সেটের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকার মতোই জিনিস। ছেলের খালা বললেন, বিয়ে পড়ানো হোক। বিয়ে পড়ানো হবার পর মেয়ের গলায় এটা পরাবেন।জরীর বড় চাচী বললেন, আগে পরালে অসুবিধা কি? ভদ্রমহিলা শুকনো গলায় বললেন, আগে না। বিয়ে পড়ানো হোক।জরীর বড়চাচী উঠে এলেন। ঢুকলেন জরীর ঘরে। জরী চাচীর দিকে তাকাল। কিছু বলল না। চাচীকে সে পছন্দ করে না। ভদ্র মহিলা খুব ঝগড়াটে। জরীরা যে এ বাড়ির আশ্রিত তা তিনি দিনের মধ্যে একবার জরীদের মনে করিয়ে দেন।বড়চাচী তীক্ষ্ম গলায় বললেন, তুই আমাকে ঠিক করে বলতো জরী, তুই গাড়ি থেকে নেমে পড়েছিলি কেন?
বলতে ইচ্ছা করছে না চাচী।ছেলেটাকে তোর খুব অপছন্দ হয়েছে? জ্বি।আমারও অপছন্দ হয়েছে। এরা ছোটলোকের ঝাড়। তুই বউ সেজে আছিস কেন? পালিয়ে যা না।জরী অবাক হয়ে তাকাল।বড়চাচী বললেন, পেছনের দরজা দিয়ে বের হ। কোনো বান্ধবীর বাসায় চলে যা। তারপর দেখা যাবে।আমার সাহসে কুলাচ্ছে না চাচী।তুই আয়তো আমার সাথে। পরের বাড়িতে থেকে থেকে তোদের সব গেছে। সাহস গেছে, মর্যাদাবোধ গেছে, তোদের সাথে আমার কথা বলতে ঘেন্না লাগে। আয় আমার সাথে আয়। টুকুনকে সঙ্গে দিয়ে দিচ্ছি। ওকে নিয়ে কোনো এক বান্ধবীর বাড়িতে লুকিয়ে থাক।সত্যি বলছেন? সত্যি বলছিনাতো কি- তোর সঙ্গে রস করছি? আমার রস করার বয়স?
বড়চাচী নিজেই পেছনের দরজা দিয়ে জরীকে বের করলেন। তাঁর সেজো ছেলে টুকুনকে সঙ্গে দিয়ে দিলেন।তারা একটা বেবীটেক্সি নিল।টুকুল বলল, তুমি যাবে কোথায় জরী আপা? দারুচিনি দ্বীপে যাব।সেটা কোথায়? অনেক দূর। তুই আমাকে কমলাপুর রেলস্টেশান নামিয়ে এই বেবীটেক্সী নিয়েই বাসায় ফিরে যাবি। পারবি না? খুব পারব। ঢাকা শহরে আমার মতো কেউ চিনে না। টুকুনের বয়স দশ এত বড় দায়িত্ব পেয়ে সে খুবই আনন্দিত।অয়ন একটা সুটকেশ এবং হ্যান্ডব্যাগ হাতে সন্ধ্যা থেকেই তার ছাত্রের বাসায় বসে আছে। ছাত্রের খোঁজ নেই। শুধু ছাত্র না, বাড়িতেই কেউ নেই, সবাই দলবেঁধে বিয়ে খেতে গেছে।কাজের ছেলেটি বলল, বসেন মাস্টার সাব। চা খান। বাড়িতে লোকজন না থাকলে কাজের লোকরা খুব সামাজিক হয়ে উঠে। আগ্রহ করে চা-টা দেয়। অয়ন জিজ্ঞেস করল, কখন ফিরবে?
তার কি কোনো ঠিক আছে। বিয়া বাড়ি বইল্যা কথা। রাইত নয়টার আগে না।রাত নটা হলে অপেক্ষা করা যায়। নটা, দশটা পর্যন্ত অপেক্ষা করা যেতে পারে। একটা বেবীটেক্সি নিলে দশ মিনিটে স্টেশনে চলে আসবে। জিনিসপত্ৰতো সব সঙ্গেই আছে। অসুবিধা কিছু নেই।অয়নের মনে হলো নটার আগেই তার ছাত্র চলে আসবে। স্যারের কথা নিশ্চয়ই তার মনে আছে। গতকালইতো সে বলেছে, চিন্তা করবেন না। স্যার আমি ব্যবস্থা করে রাখব। নিশ্চয়ই ব্যবস্থা করে রেখেছে।অয়ন বলল, বিয়ে কোথায় জান না-কি করিম? জ্বে না। কিছুই জানি না। চা দিমু?
আচ্ছা দাও। চা দাও।রাত দশটার ভেতর সে সর্বমোট ছকাপ চা খেল। বেশ কিছুক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইল। তার ছাত্রের কালো গাড়ি যদি দেখা যায়।রাত দশটা পাঁচে কাজের ছেলে এসে বলল, তারা আইজ আর আসব না। চইলা গেছে মীর্জাপুর।তুমি বুঝলে কি করে? আম্মা টেলিফোন করছিল।আমি যে বসে আছি এটা বলেছ? জ্বে না। ইয়াদ ছেল না।অয়নের মনে আরেকটা সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। এমনতো হতে পারে তার ছাত্র ড্রাইভারকে দিয়ে স্টেশনে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে। কারণ সে জানে তার স্যার রাত সাড়ে দশটার ট্রেনে যাচ্ছে। বিয়ের তাড়াহুড়ায় মনে ছিল না। বিয়ে বাড়িতে গিয়ে মনে হয়েছে। সে কি চলে যাবে স্টেশনে? করিম! জ্বে মাস্টার সাব।তারা কোত্থেকে টেলিফোন করেছে? তাতো জানি না।এই বাসায় কি কেউ নেই? সব চলে গেছে? জ্বে। বড় সাবের এক ভাই আছেন। তুমি উনাকে একটু জিজ্ঞেস করে আসবে আমার কথা বাবু কিছু বলে গেছে। কের আমাকে কিছু টাকা দেয়ার কথা ছিল।
বাৰু কি উনার কাছে দিয়ে গেল কি-না।করিম খোজ নিয়ে এল। বাবু কিছুই বলে নি।অয়ন পুরোপুরি নিঃসন্দেহ হলো বাবু ড্রাইভারকে দিয়ে স্টেশনেই টাকা পাঠিয়েছে। এতক্ষণ। এইখানে নষ্ট না করে তার উচিত ছিল স্টেশনে চলে যাওয়া। বিরাট ভুল হয়েছে।অয়ন ঘর থেকে বের হয়েই বেবীটেক্সি নিল। হাতে সময় একেবারেই নেই।কমলাপুর রেলস্টেশনে শুভ্ৰ দাঁড়িয়ে আছে।এত লোকজন চারপাশে সে কাউকেই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। মানুষগুলোই মনে হচ্ছে ছায়া মূর্তি, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকেও সে তিন জনের সঙ্গে ধাক্কা খেল। ভেবেছিল এ রকম সমস্যা হবে। দলের অন্যদেরই বা সে কি করে খুঁজে বের করবে। একমাত্র উপায় যদি ওদের কেউ তাকে দেখতে পায়। এখনো কেউ দেখতে পায় নি। ওরা কি আসে নি? সাড়ে নটা বাজে। এর মধ্যেতো এসে পড়া উচিত। এত দেরী করছে কেন?আপনি, আপনি এখানে?
শুভ্ৰ তাকাল। তার সামনে একটি তরুণী মূর্তি তা সে বুঝতে পারছে, কিন্তু চিনতে পারছে না। গলার স্বরও অচেনা। নিশ্চয় ক্লাসের কোনো মেয়ে। ক্লাসের মেয়েরা ছেলেদের তুমি তুমি করে বলে, শুধু শুভ্রের বেলায় আপনি। দোষটা অবশ্যি শুভ্রর। সে ক্লাসের কোনো মেয়েকে তুমি বলতে পারে না।আপনি বোধ হয় আমাকে চিনতে পারছেন না। আমার নাম জরী। সাবসিডিয়ারীতে আমরা এক সঙ্গে ক্লাস করি।ও আচ্ছা।এখনো আপনি আমাকে চিনতে পারেন নি? আপনার সঙ্গে বেশ কয়েকবার আমার কথা হয়েছে।
শুভ্ৰ অস্বস্তির সঙ্গে বলল, আমি চিনতে পেরেছি।তাহলে বলুন আমার নাম কি? শুভ্র বিব্রত গলায় বলল, আমি চোখে কিছুই দেখতে পারছি না। এই জন্যে কিছু চিনতেও পারছি না। আমার চশমা ভেঙ্গে গেছে। চশমা ছাড়া আমি কিছুই দেখি না।জরী বলল, আমরা সবাই এই খবর খুব ভালো জানি। আপনার নাম হচ্ছে কানা বাবা। আমরা মেয়ের অবশ্যি কানা বাবা বলি না।আপনারা কি বলেন? আমরা বলি–The learned blind father.
Learned?
লারনেড না ডেকে উপায় আছে। যে ছেলে জীবনে কোনো দিন কোনো পরীক্ষায় ফাস্ট ছাড়া সেকেন্ড হয় নি তাকে ইচ্ছে না থাকলেও লারনেড ডাকতে হয়।শুভ্ৰ অত্যন্ত বিব্রত বোধ করছে।বিব্রত বোধ করার প্রধান কারণ সে এখনো মেয়েটিকে চিনতে পারে নি।জরী বলল, আপনি কি দারুচিনি দ্বীপে যাচ্ছেন? জ্বি।আমাকে এত সম্মান করে জ্বি বলতে হবে না। আমিও আপনাদের সঙ্গে যাচ্ছি। আপনি এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? এই প্লাটফরম থেকে ময়মনসিংহ লাইনের গাড়ি যায়। আপনার গাড়ি ছাড়বে চার নম্বর প্ল্যাটফরম থেকে।শুভ্ৰ হাসি মুখে বলল, আমিতো এ সবের কিছুই জানি না। এক জন লোক হাত ধরে ধরে এখানে দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছে। তারপর থেকে দাঁড়িয়েই আছি।
জরী বলল, চলুন হাত ধরে ধরে আপনাকে চার নম্বর প্ল্যাটফরমে নিয়ে যাই। ধরুন হাত ধরুন। সংকোচ করার কিছু নেই। আপনি হচ্ছেন কানা বাবা।জরী ভেবে পেল না সে হঠাৎ এত কথা বলছে কেন? সে তো চুপচাপ ধরনের মেয়ে। এত কথাতো সে কখনো বলে না। আজ তার হয়েছেটা কি? শুভ্ৰ হাত ধরল। খানিকটা ইতস্ততঃ করে বলল, আপনিই বা কেন এদিকে এলেন? আপনারাওতো চার নম্বর প্ল্যাটফরমে থাকার কথা।কেউ এখনো আসে নি। তাই ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। আচ্ছা আপনার চোখ এত খারাপ আপনারতো উচিত বাড়তি চশমা রাখা।শুভ্র বলল, এক্সট্রা চশমা বাড়িতে আছে।জরী বলল, আপনার ব্যাগ কে গুছিয়ে দিয়েছে বলুনতো? আমার মা।তাহলে ব্যাগ খুললেই বাড়তি চশমা পাওয়া যাবে। দেখি আপনার ব্যাগটা খুলি। চাবি দিনতো।
শুভ্র বলল, আমার মনে হয় না। মা বাড়তি চশমা দিয়েছেন।অবশ্যই দিয়েছেন। কোনো মা এত বড় ভুল করবে না। দিন চাবি দিন।ব্যাগ খুলতেই খাপে মোড়া দুটা চশমা পাওয়া গেল।চোখে চশমা দিয়ে শুভ্ৰ বিস্মিত হয়ে বলল, আপনি এত সেজেছেন কেন? আজ রাতে আমার বিয়ে হবার কথা ছিল। এটা হচ্ছে বিয়ের সাজ। বিয়ে হয়নি বলেই যেতে পারছি।শুভ্র বলল, ভাগ্যিস হয় নি। বিয়ে হলে আপনার সঙ্গে দেখা হত না। আমারো দারুচিনি দ্বীপে যাওয়া হত না। বোকার মতো একা একা ভুল প্ল্যাটফরমে দীড়িয়ে থাকতাম। কেউ আমাকে খুঁজে পেত না। আর পেলেও কেউ বুদ্ধি করে বলতে পারত না যে আমার ব্যাগে এক্সট্রা চশমা আছে। আমাকে যেতে হত। অন্ধের মতো।জরী হাসল।
এখন তার সব কিছুই ভালো লাগছে। পৃথিবীটা অনেক বেশি সুন্দর মনে হচ্ছে। ন্টেশনের হৈচৈ আলো সব মিলিয়ে কেমন যেন নেশা ধরে যাচ্ছে। বার বার মনে হচ্ছে পৃথিবী এত সুন্দর কেন? আরেকটু কম সুন্দর হলে তো ক্ষতি ছিল না। দুই জন হাঁটছে ছোট ছোট পা ফেলে। শুভ্ৰ হঠাৎ কি মনে করে বলে ফেলল, চশমাটা পাওয়া না গেলেই ভালো হত।কেন? আপনি আমাকে হাত ধরে ধরে নিয়ে যেতেন। আপনি যখন আমার হাত ধরে হাঁটছিলেন আমার অসম্ভব ভালো লাগছিল। কিছু মনে করবেন না- কথাটা বলে ফেললাম। বেশির ভাগ সময় আমরা মনের কথা বলতে পারি না বলে কষ্ট পাই। আমি ঠিক করেছি। আমি এই ভুল কখনো করব না। যা বলতে ইচ্ছা করে— তা বলব। আপনি কি রাগ করলেন?
জরী সহজ গলায় বলল, না রাগ করি নি। আপনি বরং এক কাজ করুন চশমাটা খুলে পকেটে রেখে দিন। আমি আপনাকে হাত ধরে ধরে নিয়ে যাই। নয়ত ওরা দেখলে হাসাহসি করবে।শুভ্র চশমা খুলে পকেটে রাখল।জরী তাকে হাত ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। দলটির সঙ্গে দেখা হলো। সবাই একসঙ্গে চেচিয়ে উঠল— কানা বাবা। কানা বাবা।আনুশকা ছুটে এসে বলল, জরী তোরতো যাওয়ার কথা ছিল না।জরী বলল, চলে এলাম।খুব ভালো করেছিস। খুব ভালো। তুই কানা বাবাকে কোথায় পেলি? পেয়ে গেলাম। বেচারা চশমা ভেঙ্গে ফেলেছে। হাত ধরে আনা ছাড়া উপায় কি? দলের সবাই আবার চেঁচিয়ে উঠল— কানা বাবা। কানা বাবা।সঞ্জুর বাবাও এসেছেন।সঙ্গে মুনাকে নিয়ে এসেছেন। সঞ্জু খুব অস্বস্তি বোধ করছে।
সে বুঝতে পারছে তাকে নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে গা টেপাটেপি হচ্ছে। মোতালেব ফিস ফিস করে বলল, দেখ সবাই দেখা খোকাবাবুর বাবা ফিডিং বোতল হাতে চলে এসেছে। লোকটার কি বুদ্ধি শুদ্ধি নেই? সবাই ট্রেনে উঠেছে। প্রথম শ্রেণীর রিজার্ভ করা কামরায় নয়। থার্ড ক্লাসে। তাতে কারোর আনন্দে ভাটা পড়ছে না। হাসাহাসি, আনন্দ উল্লাসের সীমা নেই। আনুশকা পাশের অচেনা এক ভদ্রলোককে বলল, ব্রাদার আপনি কি সেন্ট মেখেছেন গন্ধে বমি এসে যাচ্ছে। সেই লোক হতভম্ব।জরী শুভ্ৰকে বলল, আপনি চশমা পরছেন না কেন? শুভ্ৰ হাসিমুখে বলল, আমি চশমা পরব না বলে ঠিক করেছি।বেশ তাহলে হাত ধরুন। আপনাকে ট্রেনে নিয়ে তুলি।মোতালেব চেঁচিয়ে বলল, ভাইসব রাস্তা করে দিন, কানা বাবা আসছে কানা বাবা। দি লারনেড ব্লাইন্ড ফাদার।
নীরা চেঁচিয়ে বলল, অবিকল এই রকম একটা দৃশ্য আমার কল্পনায় ছিল। সুনীল অন্ধ হয়ে গেছে। আমি তার হাত ধরে ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছি। সুনীল এই পৃথিবীকে দেখছে আমার চোখ দিয়ে। বানিয়ে বলছি না। বিশ্বাস করা। এই দ্যাখ আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।আনুশকা বলল, লারনেড ব্লাইন্ড ফাদারকে সারাক্ষণ হাত ধরে ধরে কে টানবে? চিটাগাং নেমেই ওর জন্যে চশমার ব্যবস্থা করতে হবে। শুনুন লারনেড ব্লাইন্ড ফাদার, সব সময় আমরা আপনাকে আপনি বলেছি, এখন আর বলব না। দয়া করে কিছু মনে করবেন না।শুভ্ৰ হাসল। মাথা ঝাকিয়ে বলল, আমি খুব খুশি হব। যদি তা করেন।আরেকটা কথা এমন ফরম্যাল ভঙ্গিতে কথা বলবেন না, বললে চিমটি খাবেন।জ্বি আচ্ছা। আর বলব না।রানা বলল, একটা গান ধরলে কেমন হয়?
নীরা বলল, খুব খারাপ হয়। আচ্ছা আমি বসব কোথায়? আমার তো বসার জায়গা নেই।রানা বলল, তুমি এবং সুনীল তোমরা দুই জন দাঁড়িয়ে যাও। হাত ধরা ধরি করে দাঁড়িয়ে থাক।আমার দাঁড়িয়ে যেতে কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু সুনীলকে বসতে দাও। জানালার পাশে বসতে দাও। বেচারা কবি মানুষ।সত্যি সত্যি জানালার পাশে খানিকটা জায়গা খালি করা হলো। সেখানে কেউ বসল না।মুনা লক্ষ্য করল। সবাই আছে শুধু অয়ন নেই।সে কি যাচ্ছে না? কাউকে জিজ্ঞেস করতে তার খুব লজ্জা লাগছে। তবু লজ্জা ভেঙ্গে মোতালেবকে জিজ্ঞেস করল।মোতালেব বিরক্ত মুখে বলল, যাওয়ারতো কথা, গাধাটা এখনো কেন আসছে না কে জানে। ট্রেন মিস করবে। গাধারা সব সময় এ রকম করে। আগে একবার পিকনিকে গেলাম। সে গেল না। পরে শুনি চাঁদার টাকা জোগাড় হয় নি। আরে এক জন চাঁদা না দিলে কি হয়। সবাইতো দিচ্ছি।মুনা ক্ষীণ স্বরে বলল, উনার কি টাকার জোগাড় হয় নি?
মোতালেব বলল, কি করে বলব। আমাকেতো কিছু বলে নি।মুনা অসম্ভব রকম মন খারাপ করে বাবার কাছে চলে এল। আর তখনি সে অয়নকে দেখল। অয়ন শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি থেকেই বোঝা যায় সে চাচ্ছে না কেউ তাকে দেখে ফেলুক। মুনা চেঁচিয়ে ডাকল, অয়ন ভাই। অয়ন ভাই।অয়ন প্ল্যাটফর্মে গাদা করে রাখা প্যাকিং বাক্সগুলোর আড়ালে সরে গেল। মুনা এগিয়ে গেল। পিছনে পিছনে এলেন সোবাহান সাহেব।মুনা বলল, অয়ন ভাই আপনি যাচ্ছেন না। ট্রেনতো ছেড়ে দিচ্ছে।অয়ন কি বলবে ভেবে পেল না। সোবাহান সাহেব উত্তেজিত গলায় বললেন, দৌড়ে গিয়ে উঠ। সিগন্যাল দিয়ে দিয়েছে।অয়ন নীচু গলায় বলল, চাচা আমি যাচ্ছি না।যাচ্ছ না কেন? টাকা জোগাড় করতে পারি নি। এক জনের দেয়ার কথা ছিল সে শেষ পর্যন্ত…
গার্ড বাঁশি বাজিয়ে দিয়েছে। ট্রেন নড়তে শুরু করেছে। অয়ন ছোট্ট করে নিঃশাস ফেলল।মুনার চোখে পানি এসে গেছে। সে জল ভেজা চোখে তার বাবার দিকে তাকিয়ে আছে।সোবাহান সাহেব পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে শান্তগলায় বললেন, বাবা এই নাও এখানে ছয়শ টাকা আছে। তুমি যাও দৌড়াও।অয়ন ধরা গলায় বলল, বাদ দিন চাচা। আমি যাব না। তার খুব কষ্ট হচ্ছে সে কখনোই কোথাও যেতে পারে না। তার জন্যে খুব কষ্টতো তার হয় না। আজ কেন হচ্ছে?
সোবাহান সাহেব বললেন, এক থাপ্পর দেব। বেয়াদপ ছেলে। দৌড় দাও। দৌড় দাও।মুনা বলল, যান। অয়ন ভাই যান। প্লীজ।অয়ন টাকা নিল।সে দৌড়াতে শুরু করেছে। তার পেছনে পেছনে দৌড়াচ্ছে মুনা। সে কেন ছুটছে তা সে নিজেও জানে না।দলের সবাই জানালা দিয়ে মুখ বের করে তাকাচ্ছে। মোতালেব এবং সঞ্জু হাত বের করে রেখেছে—কাছাকাছি এলেই টেনে তুলে ফেলবে। এইত আর একটু। আর একটু… । সোবাহান সাহেব চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করছেন—হে মঙ্গলময় ঈশ্বর। এই ছেলেটিকে দারুচিনি দ্বীপে যাবার ব্যবস্থা তুমি করে দাও।ট্রেনের গতি বাড়ছে।গতি বাড়ছে অয়নের। আর ঠিক তার পাশাপাশি ছুটছে মুনা। সে কিছুতেই অয়নকে ট্রেন মিস করতে দেবে না। কিছুতেই না।
