দিনের শেষে পর্ব:৬ হুমায়ূন আহমেদ

দিনের শেষে পর্ব:৬

আমি পড়াচ্ছিলাম সম্রাট অশোক এবং সম্রাট প্রিয়দর্শিনী। দুজন কি আসলে এক, না ভিন্ন? কে সম্রাট অশোেক, কে প্রিয়দর্শিনী? আমি ক্লাসে নানান ধরনের ড্রামা করতে পছন্দ করি। কিছু প্রাচীন ভারতীয় ভাষা জানি-গম্ভীর গলায় সেসব বলে একটা পুরানো আবহাওয়া তৈরি করি এইসব দেখে এই মেয়ে অন্য রকম হয়ে গেল। অল্পবয়েসী মেয়েদের মনে যখন প্ৰেম আসে তখন তা আসে টাইডাল ওয়েরে মতো। অরু নিজে তো ভেসে গেলই, আমাকেও ভাসিয়ে নিয়ে গেল। এই আমি একজন বুড়োমানুষ।

ওল্ড ম্যান। 13thNov 1940-তে আমার জন্ম। আমার বয়স হিসেব করে দেখুন। এই মেয়ে তার নিজের যতটুকু না সর্বনাশ করল, আমার করল তার চেয়ে বেশি। এখন সে বলে বেড়াচ্ছে অবিশ্বাস্য সব কথা।আমার এক বন্ধু না-কি রান্নাঘরে গিয়ে তার নাভিতে হাত দিয়েছে। আমার ঐ বন্ধুটি চারিত্রিক দিক থেকে মহাপুরুষ ধরনের। সে মাঝে-সাঝে আমার এখানে এসে তাস খেলত। তার পক্ষে….. আজহার সাহেব আপনি বলেছিলেন এখানে তাস খেলা হয় না।বলেছিলাম?

হা শুরুতে বলেছিলেন।মাঝে-মাঝে তাস খেলা হয়। Once inafull-moon. এই বাড়ি তো আর মসজিদ বা মন্দির না যে এখানে তাস খেলা যাবে না। আপনি তাহলে পুরোপুরি সত্যি কথা বলছেন না।আরে ভাই কী মুশকিল পুরোপুরি সত্য কথা কেউ বলে না। কেন বলবে? মানুষতো আর কম্পিউটার না যে পুরোপুরি সত্যি কথা বলবে। একমাত্র কম্পিউটার পুরোপুরি সত্যি কথা বলে। এই জন্যেই কম্পিউটারের প্রেমে পড়া যায় না। মানুষের প্রেমে পড়া যায়।

ভাই আমি উঠি।উঠতে চান? হ্যাঁ।যেসব কথা আপনাকে বলতে চেয়েছিলাম তার একটি কথাও আপনাকে এখনো বলা হয় নি।বলুন।নাম্বার ওয়ান, আমার ধারণা অরু জীবিত নেই। চমকে উঠবেন না। চমকে ওঠার মতো কিছু না। আমার আরো একজন স্ত্রী আছে যে অরুকে হত্যা করার জন্যে তোক লাগিয়েছে—এই গুজব বাজারে আছে। নাম্বার টু মেয়েটা অসুস্থ। সে নিজেও আত্মহত্যা করতে পারে।

নাম্বার থ্রি, সে অসম্ভব সুন্দরী মেয়ে, গুণ্ডা-পাণ্ডাদের হাতে পড়লেও একই জিনিস হবে। গ্যাং রেপ বলে একটি কথা আছে। আপনি শুনেছেন কিনা জানি না। আপনাকে যে রকম সুফি মানুষ বলে মনে হয়, আপনার না শোনারই কথা। গ্যাং রেপ বিষয়টি আপনাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি। ধরুন পাঁচজন যুবক এবং একজন তরুণী আছে। যুবকরা সবাই লাইন ধরে অপেক্ষা করছে…… জহির বলল, দয়া করে চুপ করুন, আপনি ক্রমাগত আজেবাজে কথা বলছেন। কেন বলছেন?

বলছি কারণ আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। মেয়েটা মারা গেলে আমি বিরাট বিপদে পড়ে যাব। পুলিশ কোনো না কোনো সূত্র বের করে আমাকে জেলে ঢুকিয়ে দেবে। বিজ্ঞ জজ সাহেব দড়িতে ঝুলিয়ে দেবেন। জজ সাহেবরা নিজেরা যেহেতু কখনো দড়িতে ঝোলেন না, তারা জানেন না ব্যাপারটা কি। কাজেই I am going to die. আজহার সাহেব।জ্বি।

আপনি কি মদ্যপান করেছেন? বেশি করতে পারি নি, অল্প করেছি। এত পয়সা আমার কোথায় ভাই? আপনাকে আমি এখন একটা রিকোয়েস্ট করব। যদি চান আপনার পায়ে ধরেই রিকোয়েস্ট করব। সেটা হচ্ছে আমি জানি অরু যদি বেঁচে থাকে তাহলে সে আপনার সঙ্গে দেখা করবেই। আপনি তখন দয়া করে আমাকে সেটা জানাবেন।আমার সঙ্গে দেখা করবে কেন?

কারণ আপনাকে সে ভালবাসে। আপনি একটা মহা গাধা বলে এই সহজ জিনিসটা ধরতে পারেন নি। শুধু যে সেই আপনাকে ভালবাসে তাই না, অরুর ছোট বোন তরু…..ঐ মেয়েটিও আপনার জন্যে পাগল। এই তথ্যটাও আপনার জানা নেই। আপনি তো ভাই বিশ্বপ্রেমিক।জহির চোখ বড়-বড় করে তাকিয়ে রইল। আজহার সাহেব বললেন, বোকামি ছাড়া আপনার মধ্যে এমন কিছু নেই যা চোখে পড়ে। এই বোকামির জন্যেও যে মেয়েরা প্রেমে পড়তে পারে তা আমার জানা ছিল না। আপনি এখন যদি চলে চান, চলে যেতে পারেন। বোকা মানুষদের আমি বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারি না।

A rich man you can tolerate many times

A wise man can only twice be tolerated

But a fool..

বাকিটা শেষ করলাম না। শেষ করলে মনে কষ্ট পাবেন। আসুন আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।এগিয়ে দিতে হবে না।হবে রে ভাই হবে। এগিয়ে দিতে হবে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। ছাতা নিয়ে এইজন্যেই যাচ্ছি। সেতুলে দিয়ে আসব। এতটুকু গুণ আমার আছে। তা ছাড়া জানেন না বোধ হয় যে মাতালদের ভদ্রতাবোধ হয় অসাধারণ।আপনি মাতাল হন নি।হয়েছি। মাতাল হয়েছি।

ভালোমতোই হয়েছি। মদ না খেয়েও মানুষ মাতাল হতে পারে। একটা ভালো কবিতা পড়ে মাতাল হতে পারে, একটা সুন্দর সুর শুনে মাতাল হতে পারে, প্রেমে পড়েও মাতাল হতে পারে।সিঁড়ি দিয়ে নামতে-নামতে আজহার সাহেব বললেন, মাতালদের ফেভারে কিছু চমৎকার কথা আছে আপনাকে বলছি শুনুন। অরুকে বলায় অরু খুব মজা পেয়েছিল আপনিও পাবেন। আপনি তো অরুর বন্ধু-বলব?

বলুন।

একজন মাতাল অতি সহজেই ঘুমিয়ে পড়ে।

একজন ঘুমন্ত মানুষ কোনো পাপ করতে পারে না।

যে পাপ করতে পারে না সে স্বর্গে যায়।

কাজেই মাতালরা সব সময় স্বর্গে যায়।

মজার কবিতা না?

জহির জবাব দিল না। রাস্তায় প্রচণ্ড বৃষ্টি। আজহার সাহেব নিজে ভিজতে-ভিজতে অনেক ঝামেলা করে জহিরকে একটা রিকশা করে দিলেন। রিকশায় উঠবার ঠিক আগমুহূর্তে বললেন, আপনাকে অনেক মন্দ কথা বলেছি, দয়া করে মনে কিছু করবেন না। আপনার জন্যে একটা উপহার নিয়ে এসেছি—অরুর ব্যক্তিগত একটা খাতা–ডায়েরিও বলতে পারেন। আমার সম্পর্কে এই খাতায় সে অনেক কিছু লিখেছে। পাশাপাশি আপনার কথাও লিখেছে। পড়লে আপনার ভালো লাগবে।তাই নাকি?

জ্বি। অরু ফিরে না এলে আমি পাগল হয়ে যাব জহির সাহেব।আজহার সাহেব রিকশাওয়ালা এবং আশেপাশের দুএকজন মানুষকে সচকিত করে হঠাৎ হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠলেন। মাতালের কান্না নয়, জগৎ সংসার ছারখার হয়ে যাওয়া একজন মানুষের কান্না। রিকশাওয়ালা পর্যন্ত অভিভূত হয়ে বলল, ভাইজান কাইন্দেন না-আল্লারে ডাকেন। আল্লা ছাড়া আমরার আর কে আছে।

সুন্দর ডায়েরিতে মেয়েরা খুব যত্ন করে অনেক কিছু লেখে। এই লেখা মোটেই এরকম নয়। মোটা লাইন টানা একটা খাতা। শুরুতে বায়োলজির নোট নেবার জন্যে হয়ত কেনা হয়েছিল। বায়োলজির নানান প্রসঙ্গে খাতা ভর্তি। তার ফাঁকে-ফাঁকে অন্য সব কথা। হয়ত ফুসফুসের রক্ত সঞ্চালন সম্পর্কে দীর্ঘ একটা লেখার ফাঁকে চার লাইনের সম্পূর্ণ অন্য একটা লেখা।

জহির সারারাত জেগে লেখাগুলি পড়ল— জহির ভাইকে নিয়ে আজ মার সঙ্গে ঝগড়া হল। ঝগড়া হবার মতো কোনো ঘটনা ছিল না তবু হল। আসলে অন্য একটা ব্যাপারে আমি মার ওপর রেগে ছিলাম। সুযোগ পেয়ে রাগ ঝাড়লাম। মা খুব অবাক হলেন আমি জহির ভাইয়ের পক্ষ নিয়ে এত কথা বলছি কেন? মাঝখান থেকে বেচারা জহির ভাই খুব সজ্জা পেলেন। আমার মনে হচ্ছে বেচারা আর অনেকদিন আমাদের বাসায় আসবেন না।

এরকম ছোটখাট একটা ঘটনা ঘটে আর জহির ভাই সপ্তাহখানেক এ বাসায় আসা ছেড়ে দেন। আজকের সমস্যার সূত্রপাত হল এইভাবে-জহির ভাইকে বাজারে পাঠানো হয়েছিল, তিনি বাইম মাছ নিয়ে এসেছেন। সেই বাইম মাছ দেখে মা তাঁর স্বভাব মতো অগ্ন্যুৎপাত শুরু করলেন সাপের মতো দেখতে একটা মাছ তুমি কি মনে করে আনলে? কে খাবে এই মাছ?

আমি তখন বললাম, ওমাবাইম মাছ! আমার খুব ফেভারিট মাছ।জহির ভাই আনন্দিত চোখে আমার দিকে তাকালেন। সেই দৃষ্টি দেখে আমার বড় ভালো লাগল। আহা বেচারা! মা হতভম্ব। তিনি বললেন, বাইম মাছ তোর পছন্দ? তুই কবে খেয়েছিস? আমি কখনো খাই নি তবু বুঝতে পারছি এ মাছ খেতে অসাধারণ হবে।জহির ভাই বিব্রত গলায় বললেন, আমি বদলে নিয়ে আসছি।আমি বললাম—অসম্ভব। আমি আজ বাইম মাছ ছাড়া অন্য কোনো মাছ খাবই না।

তরু জহির ভাইয়ের সঙ্গে কি যেন কথা বলছিল। ওরা বারান্দায় বসে কথা বলছিল। অবাক হয়ে দেখি তরুর গাল পাল, মাথা নিচু হয়ে আছে। আমার পায়ের শব্দ পেয়েই তরু থেমে গেল এবং চোখমুখ কেমন করে যেন তাকাল। তাকানোর এই দৃষ্টি আমি চিনি। আমি কেন, সবাই চেনে। শুধু গাধার গাধা জহির ভাই চেনেন না। কোনোদিন চিনবেনও না। আমি তরুকে ডেকে আমার ঘরে নিয়ে গেলাম। বললাম, জহির ভাইয়ের সঙ্গে কী কথা বলছিলি?

কোনো কথা বলছিলাম না তো।কোনো কথা বলছিলি না? ক্লাসের একটা মেয়ের কথা বলছিলাম।কি কথা? মেয়েটার নাম তৃষ্ণাও একটা ছেলের প্রেমে পড়েছে—ছেলেটা ওদের আত্মীয়—ঐ গল্পটা বলছিলাম।কেন? কথায় কথায় চলে আসল–ওর কথা তোমাকেও তো বলেছি।আমি হঠাৎ রুর গালে প্রচণ্ড চড় বসিয়ে দিলাম। এই কাজটা আমি কেন করলাম তরু কি তা বুঝতে পারল? অবশ্যই পারল। আমি যেমন মেয়ে তরুও তো তেমনি মেয়ে। ও কেন পারবে না?

ওকে চড়টা দিয়েই আমি দুহাতে নিজের মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলাম। তরু আমাকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করতে লাগল। আহা রে, এত ভালো কেন আমার বোনটা।জহির ভাইকে আমার এত ভালো লাগে কেন তা বুঝতে চেষ্টা করছি। কারণ নেই। কোনো কারণ নেই। এই মানুষটা একটা অকাট গাধা, একটা ছাগল। একবারের কথা, বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ থেকে ঢাকায় ফিরছি। আমি বললাম, জহির ভাই আসুন আমরা ডেকের বেঞ্চিতে বসে চাঁদের আলো দেখতে-দেখতে যাই।

গাধাটা বলল, ঠাণ্ডা লাগবে না। আমি বললাম, লাওক। আমি একা-একা বসে আছি, গাধাটা কোত্থেকে একটা কম্বল না কী-যেন এনে আমার গায়ে জড়িয়ে দিল। যখন কম্বলটা জড়িয়ে দিচ্ছে তখন হঠাৎ কেন জানি আমার চোখে পানি এসে গেল। এর নামই কি ভালবাসা? এই ভালবাসা কোথায় লুকিয়ে থাকে? কোন অচেনা জগতে? কোন অচেনা ভূবনে? কি করে সে আসে? কেন সে আসে? কেন সে আমাদের অভিভূত করে?

জহির ভাই আমার পাশে বসলেন। জড়সড় হয়ে বসলেন। একটু সরে বসলেন, যেন গায়ের সঙ্গে গা লেগে না যায়। আমি বললাম, এমন দূরে সরে বসেছেন কেন? আপনার কি ধারণা আমার গার সঙ্গে গা লাগলে আপনার পাপ হবে? জহির ভাই বিড়বিড় করে কী যেন বললেন।আমি বললাম, আসুন তত আপনি আমার আরো কাছে সরে আসুন।তিনি কাছে এলেন, আমি মনে-মনে বললাম, জনম জনম তব তরে কাঁদিব।কি আশ্চর্য! কেন কাঁদব? কী আছে এই মানুষটির? হে ঈশর, ভালবাসা কী আমাকে বুঝিয়ে দাও।

 রাত কত হবে? দুটা? তিনটা? না তার চেয়েও বেশি। আমি দরজা খুলে বের হলাম। আকাশ ভেঙে জোছনা নেমেছে। কী জোছনা। জোছনায় মন এমন করে কেন? অনেকক্ষণ বসে রইলাম বারান্দায় আমার মাথাটা হঠাৎ গণ্ডগোল হয়ে গেল। আমি বসার ঘরে ঢুকলাম। ওখানে একটা খাটে জহির ভাই কদিন ধরে আছেন। আমি ঘরে ঢুকলাম খুব সাবধানে।

আমি একটা ঘরের মধ্যে আছি। কি করছি বুঝতে পারছি না। জহির ভাইয়ের টের পাশে বসলাম। আমার ধারণা ছিল তিনি ঘুমাচ্ছেন। আসলে তিনি ঘুমুচ্ছিলেন না। আমি পাশে বসা মাত্র জহির ভাই বললেন, অরু—তুমি ঘুমাতে যাও। আমি একটা কথা না বলে উঠে চলে এলাম। এর পরে কতবার দেখা হল, আমরা দুজনে এমন ভাব করলাম যেন এমন একটি ঘটনা কোনো দিন ঘটে নি। কিংবা কে জানে, হয়ত সত্যি এমন কোনো ঘটনা ঘটে নি। হয়ত এটা একটা স্বপ্নদৃশ্য।

করিম সাহেব জহিরকে ডেকে পাঠিয়েছেন। বেয়ারা দিয়ে স্লিপ পাঠিয়েছেন, তুমি দেখা কর। জরুরি।জহির স্লিপ পেয়েই সঙ্গে-সঙ্গে আসতে পারল না। তাঁকে যেতে হল সেজো সাহেবের কাছে। এই অফিসের তিন সাহেব বড়, মেঝো এবং সেজো। সবচে মেজাজী সাহেব হচ্ছেন সেজো জন। অদ্ভুত কোনো কারণে তাঁর ক্ষমতাও মনে হয় খুব বেশি। যদিও মানুষটা মিষ্টভাষী। কখনো রাগেন না। অফিসের যে কোনো কর্মচারী তাঁর ঘরে ঢকামাত্র হাসিমুখে বলেন, আগে বলুন তো দেখি কেমন আছেন?

কর্মচারী হাত কচলে বলে, জ্বি স্যার আপনার দেয়া।আপনাকে আজ এমন রোগা-রোগা লাগছে কেন? বাড়িতে অসুখ-বিসুখ? কর্মচারী আরো বিগলিত হয়ে বলে, জ্বি না স্যার। জ্বি না। সব ঠিক আছে স্যার।সব যদি ঠিক থাকে তাহলে আমার সামনে হাসিমুখে বসুন। দুএকটা হাসিতামশার কথা বলুন। চা চলবে? সকলেই জানে এইসব আলগা খাতিরের কথার আসলে কোনো মানে নেই। পুরাটাই এক ধরনের ভড়ং, এক ধরনের ভান। তবুও কেন জানি ভড়ংটাই ভালো লাগে। ভানটাকেই সত্যি ভাবতে ইচ্ছা করে।জহির ভয়ে-ভয়ে বলল, স্যার আসব?

আসুন, জহির সাহেব, বসুন, খবরাখবর কি বলুন। আপনাকে রোগা-বোগা লাগছে কেন? কানের কাছে কয়েক গাছি পাকা চুল দেখতে পাচ্ছি। ব্যাপারটা কি বলুন তো? আপনাদের মতো ইয়াংম্যানরা যদি চুল পাকিয়ে ফেলেন তাহলে সংসার চলবে কীভাবে? চা চলবে? জহির এই দীর্ঘ প্রস্তাবনার কিছুই বুঝতে পারল না।সেজো সাহেব বিনা কারণে গল্প করে সময় নষ্ট করার মানুষ নন।

কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্যটাও জহির ধরতে পারছে না। কাজকর্ম কেমন চলছে সেটা জিজ্ঞেস করলেন, এই চাকরি কীভাবে পাওয়া গেল তা জানতে চাইলেন। আমাদের দেশের অবস্থা দশ। বছর পর কী হবে তাও বললেন। জহির হা-হু ছাড়া কিছুই বলল না। সে কি বলবে? চা শেষ হবার পর সেজো সাহেব বললেন, আচ্ছা যান।জহির ক্ষীণ স্বরে বলল, কী জন্যে ডেকেছিলেন স্যার?

এম্নি ডাকলাম। গল্প করার জন্যে ডাকা। আমরা এক অফিসে কাজ করিকেউ। বড় কাজ করি, কেউ ছোট। তাতে তো কিছু যায় আসে না। সম্পর্ক তো রাখতেই হবে। আমেরিকায় আমি দেখেছি অফিসের বস এক টেবিলে বসে জেনিটারের সঙ্গে চা খাচ্ছে। Can you imagine? একজন জেনিটার। যার কাজ হচ্ছে বাথরুম পরিষ্কার করা। আচ্ছা জহির সাহেব যান।

পরে দেখা হবে।জহির পুরোপুরি হতচকিত অবস্থায় বের হয়ে এল। তৎক্ষণাৎ করিম সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গেল। করিম সাহেব কি একটা ফাইলের পাতা উল্টাচ্ছিলেন। তিনি ফাইল বন্ধ করে বললেন, চল আমার সঙ্গে। প্রথম গেলেন ক্যান্টিনে। ঢুকতে গিয়েও ঢুকলেন না। বললেন, এখানে ভিড় বড় বেশি, চল বাইরে কোথাও যাই।ব্যাপার কি স্যার?

করিম সাহেব বিরক্ত মুখে বললেন, ব্যাপার কি তুমি কিছুই জান না? জ্বি না।গতকাল অফিসে আস নাই? জ্বি না। আমার এক মামাতো বোন, স্যার তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। অরু তার নাম। আপনি বোধ হয় দেখেছেন, কয়েকবার অফিসে এসেছে।এখন কি তুমি সেজো সাহেবের কাছে গিয়েছিলে? জ্বি।সেজো সাহেব তোমাকে কিছু বলেছেন? জ্বি না।করিম সাহেব জহিরকে নিয়ে কোনো চায়ের দোকানে ঢুকলেন না। অফিস থেকে রাস্তায় বের হয়ে শুকনো গলায় বললেন, তোমার যে চাকরি নিয়ে সমস্যা হচ্ছে তুমি কিছু শুনেছ?

জহির তাকিয়ে আছে। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। চাকরি নিয়ে সমস্যা হবে কেন? সমস্যা হবার কি আছে? করিম সাহেব বললেন, আমি ব্যাপারটা জানলাম কাল বিকাল তিনটায়। বড় সাহেব ছিলেন না। সেজোর সঙ্গে দেখা করলাম, তিনি বললেন–চাকরির কন্ডিশনই ছিল—টেম্পোরারি এ্যাপয়েন্টমেন্ট। ছাঁটাই হলে অসুবিধা নেই।জহির হতভম্ব হয়ে বলল, গত বছর তো স্যার পার্মানেন্ট হয়েছে।আমিও সেই কথাই বললাম। তিনি ফাইল বের করে দেখালেন যে চাকরি এখনো টেম্পোরারি।

ছাঁটাই কি হয়ে গেছে স্যার? না এখনো হয় নি।জহির তাকিয়ে আছে।করিম সাহেব ছোট-ছোট নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। তাঁর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে তিনি খুব কষ্ট পাচ্ছেন।জহির? জ্বি স্যার।আমি কাল রাতে তোমার বাসায় গিয়েছিলাম, অনেক রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছি। তুমি ছিলে না।বাসায় ফিরতে একটু দেরি হয়েছিল।জহির? জ্বি স্যার।তোমাকে আমি কী রকম পছন্দ করি তা কি তুমি জান?

জানি স্যার।না জান না কারণ আমি নিজেও জানতাম না। কাল সারারাত আমি ঘুমাই নি, বারান্দায় বসে ছিলাম।বলতে-বলতে করিম সাহেবের গলা ধরে এল। আসলেই এই ছেলেটির প্রতি তার মমতার পরিমাণ তিনি এর আগে কখনো বুঝতে পারেন নি। যে ছেলের দুদিন পর বিয়ে আজ তার চাকরির সমস্যা। এই ব্যাপারটা তাঁকে খুবই কষ্ট দিচ্ছে। কেন এমন হবে?জহির? জ্বি স্যার।তোমার বিয়ের ব্যাপারটা ঠিক আছে তো?

জ্বি স্যার, এখনো আছে।ঠিক রাখবে। মেয়ে পক্ষীয়দের কিছুই জানানোর দরকার নেই। তুমি ভয় পেও না। মানুষের ভাগ্য মানুষের কাছে না, আল্লাহর কাছে। একটা কিছু হবেই।জহির চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।করিম সাহেব বললেন, হঠাৎ করে তোমার চাকরি নিয়ে সমস্যাটা কেন হল তা। বুঝতে পারছিনা। ইউনিয়নের লিডার মকবুলকে বললাম, মকবুল বলল দেখবে। কিন্তু তার কথার মধ্যে কোনো জোর নেই। দেখলে তো এখনই দেখতে হবে। চাকরি চলে গেলে দেখার কি থাকবে? মকবুলটা একটা হারামজাদা।অর্ডার কি স্যার হয়ে গেছে?

না, তবে হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে সেজো সাহেবের কোনো রিলেটিভ ঢুকবে। একটা ছেলের নামে এ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারও ইস্যু হয়েছে।আমি এখন কী করি স্যার? করিম সাহেব কিছু বললেন না। মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর বড় কষ্ট হচ্ছে।স্যার, আমি কি বাসায় চলে যাব, না অফিসে কাজ করব?

বাসায় যাবে কেন? বাসায় যাবার কি আছে? অফিসেই থাক। আল্লাহর উপর ভরসা রাখ।আশ্চর্যের ব্যাপার। এতো ভয়াবহ একটা খবর, অথচ জহির কাউকেই তা দিতে পারল না।বরকত সাহেবের বাসায় গেল। শাহানা তার সঙ্গে একটি কথা বললেন না। তরু এবং মীরু দুজনের কেউই বাসায় নেই। ওরা কোথায় জিজ্ঞেস করায় শাহানা তীক্ষ্ণ গলায় বলল, আমি কি রেলের টাইম-টেবিল? কে কোথায় গেছে হিসাব রাখব? বরকত সাহেবও কোনো কথা বললেন না। শুধু দুবার বললেন তাঁর শরীরটা ভালো না, মাথাব্যথা। এটা আসলে প্রকারান্তরে বলে দেয়া তুমি এখন যাও।জহির বলল, অরুর কি কোনো খবর পাওয়া গেছে মামা?

না। খবর নিয়ে ভাবছিও না। No News is good News. আচ্ছা জহির, আমার অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল তোমার বিয়ে উপলক্ষে ভালো কিছু দেয়া—এক জোড়া কানের দুল কেনা হয়েছে। তুমি মেয়েকে যে গয়না পাঠাবে তার সাথে দিয়ে দিও। দুল জোড়া তরুকাছে আছে। ঐ নিয়ে আরেকদিন আলাপ করব। আজ যাও। শরীরটা ভালো না, মাথা ধরেছে।

জহির উঠে পড়ল। তার ভাগ্যটা অদ্ভুত। খুব কষ্টের সময় সে আশেপাশে কাউকে পায় না, যাকে কষ্টের কথা বলা যায়। সে এখন যদি আসমানীর কাছে চলে যায় তাহলে কেমন হয়? সে কি আসমানীকে বলতে পারে না আসমানী, আজ আমার খুব কষ্টের দিন। আজ আমার চাকরি চলে গেছে।না কি সে সেজো সাহেবের বাড়িতে যাবে? সেজো সাহেবের স্ত্রীকে বলবে,ম্যাডাম সাত দিন পর আমার বিয়ে অথচ…..।কোনো পীর সাহেবের কাছে গিয়ে দোয়া চাওয়া যায় না? তাঁদের কত রকম ক্ষমতার কথা শোনা যায় সত্যি-সত্যি হয়ত তাঁদের ক্ষমতা আছে। সবাই সেইসব ক্ষমতার খবর রাখে না।

জহির কোথাও গেল না। কলাবাগানের বাচ্চাদের পার্কের একটা বেঞ্চিতে অনেক রাত পর্যন্ত বসে রইল। ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করছে না। আজ অসম্ভব গরম পড়েছে। তার বুক কাঁপছে। সে খুব একটা ভরসা পাচ্ছে না। এ রকম হচ্ছে কেন? কেন এ রকম হচ্ছে? বার বার সুশীতল একটা নদীর ছবি শুধু মনে আসছে। যেনদীতে গা ডুবিয়ে শুয়ে থাকা যায়। সেই নদীর জলের টান খুব প্রবল, প্রবল টানে শুধু দক্ষিণের দিকে ভেসে ভেসে যাওয়া। দক্ষিণের সমুদ্র। তারও দক্ষিণে কি?

আকাশ মেঘলা।

ফোঁটায়-ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ছে।

জহির এক সময় উঠল।

জহিরের ঘরের দরজা খোলা।

বাতি জ্বলছে। জহির বারান্দায় থমকে দাঁড়াল। ভেতর থেকে গুনগুন করে গান। শোনা যাচ্ছে–

জনম জনম তব তরে কাঁদিব।

যতই ভাঙিবে খেলা

ততই সাধিব।

তোমারই নাম গাহি

তোমারই প্রেম চাহি

ফিরে ফিরে নিতি তব চরণে আসিব।

খুব কষ্টের একটা গান। কিন্তু গাওয়া হচ্ছে হাসি-তামাসা করে, যেন এটা মূল গানের একটা প্যারোডি, যেন কোনো একটা হাসির গান।জহির ঘরে ঢুকতে-ঢুকতে বলল, কখন এসেছ অরু? অরুবলল, অনেকক্ষণ। আপনার চাবি খুজে পাই নি বলে তালা ভেঙেছি। সরি ফর দ্যাট। তবে আপনার অনেক কাজ করে রেখেছি। রান্না করেছি। আসুন দুজনে খেতে বসে যাই। নাকি গোসল করবেন? যদি গোসল করতে চান গরম পানি করে দিতে পারি। বলতে-বলতে অরু মিষ্টি করে হাসল।

জহির কিছুই বলতে পারছে না। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। অরু বলল, আপনি এতে অবাক হচ্ছেন কেন? আপনি নিশ্চয়ই জানতেন, আমি একদিন আসব। জানতেন না? জানতাম।অরুকে কেমন রোগা-রোগা লাগছে। তার চোখের নিচে কালি। গাল ঈষৎ লালচে। সম্ভবত গায়ে হাত দিলে উত্তাপ টের পাওয়া যাবে।জহির ভাই? বল।আপনার মনে যদি কোনো কঠিন প্রশ্ন থাকে তার উত্তর খেতে খেতে দেয়া যাবে। আরেকটা কথা, আপনাকে এমন লাগছে কেন? ভয়ঙ্কর কিছু কি ঘটেছে? না।

 

Read more

দিনের শেষে শেষ : পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *