দুই দুয়ারী-পর্ব-(৩)-হুমায়ুন আহমেদ

আমি কিছুই বলব না। এইসব পাগলামি তুমি তােমার মাকাছ থেকে পেয়েছতােমার মাকে আমি যেমন কিছু বলি না তােমাকেও বলব নাতবে আশা করব যে, দ্রুত পাগলামি কাটিয়ে উঠবে। 

দুই দুয়ারীসাবের মাথা নিচু করে রাখলকিছু বলল নামতিন সাহেব বললেন, বুঝতে পারছ কি বলছি? পারছিপাগলামি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করবেজি আচ্ছা। 

পাগলামি কাটিয়ে ওঠার কোন রকম লক্ষণ সাবেরের মধ্যে দেখা যাচ্ছে নাতার স্টাডি রুমে চিকিৎসা শাস্ত্রের রাজ্যের বইসারাদিন সে বই পড়েযে সময়টা বই পড়ে না বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করেএমাথা ওমাথায় যায় ওমাথা থেকে এমাথায় আসেযা পড়েছে তা মনে করার চেষ্টা করে। 

দোতলায় মাঘরের পাশের ঘরে থাকে মিতু এবং এষামেজো মেয়ে এষা ইংরেজী সাহিত্যে সেকেন্ড ইয়ার অনার্স পড়ছেরূপবতী না হলেও স্নিগ্ধ চেহারা, অত্যন্ত বুদ্ধিমতীতার বিয়ের কথা পাকা হয়ে আছেছেলেটির নাম জুবায়েরলেদার টেকনােলজিতে জার্মানী থেকে ডিগ্রী নিয়ে এসেছেনিজেই ছােটখাটো ইণ্ডাস্ট্রির মত শুরু করেছেশুরুটা করেছে চমৎকারজুবায়ের প্রায়ই বাড়িতেআসেবাড়ির প্রতিটি সদস্য এই ছেলেটিকে খুব পছন্দ করে। 

দুই দুয়ারী-পর্ব-(৩)-হুমায়ুন আহমেদ

মতিন সাহেবের বড় মেয়ের নাম নিশামাত্র কিছুদিন হল তার বিয়ে হয়েছেএই মেয়েটি অসম্ভব রূপবতীরূপবতীদের সাধারণ ত্রুটি অহংকার তার মধ্যে পুরােপুরি আছেনিশার স্বামী ফজলুর রহমান গােবেচারা ধরনের মানুষঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাথমেটিক্সের এসােসিয়েট প্রফেসরনিশা এই বিয়েতে সুখী হয়নি বলে মনে হয়বাবার বাড়িতে সে যখন আসে স্বামী এবং শশুর বাড়ির বদনাম করতে আসেমাঝে মাঝে কান্নাকাটিও করে। 

মতিন সাহেব থাকেন এক তলায়বলা চলে একা একাই থাকেনএমনও দিন যায় স্ত্রীর সঙ্গে তার কথাই হয় নাএই নিয়ে তাঁর মনে কোন ক্ষোভ আছে বলে মনে হয় নামতিন সাহেবের পাশের ঘরে থাকে মিতুর ছােট মামা মন্টুজগন্নাথ কলেজ থেকে দুবার বি..পরীক্ষা দিয়ে ফেল করে সেতৃতীয়বারের প্রস্তুতি নিচ্ছেমন্টুর ঘরের দরজায় বড় বড় করে লেখা – 

মনােয়ার আহমেদ মন্টু তার নিচে ছােট ছােট অক্ষরে লেখা বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধমন্টুর ঘর দিনরাতই খােলাযার ইচ্ছা সে ঘরে ঢুকছে এবং বেরুচ্ছেমতিন সাহেবের

দুই দুয়ারী-পর্ব-(৩)-হুমায়ুন আহমেদ

পরিবারের এই হচ্ছে মােটামুটি পরিচয়এরা ছাড়াও দুজন কাজের লােক, একজন বাবুর্চি, একজন মালী, একজন দারােয়ান, একজন ড্রাইভার বাড়িতেই থাকেএদের থাকার জায়গা বাড়ির পেছনের টিন শেডেএইসব মানুষের সঙ্গে তিনদিন আগে আরেকজন মানুষ যুক্ত হয়েছে যার কোন নাম নেই এবং যে পুরানাে কোন কথা মনে করতে পারছে না। 

এক তলায় একটা ঘর তাকে দেয়া হয়েছেনির্বিকার ভঙ্গিতেই সে সেই ঘরে আছে। খাওয়াদাওয়া করছে, ঘুমুচ্ছেযেন এটা তার নিজেরই ঘরবাড়িমাঝে মাঝে গুন গুন করে গান গাইতেও শােনা যাচ্ছেএকটিই গান – 

সকাতরে কাঁদিছে সকলে, শােনাে শােনাে পিতা 

কহে কানে কানে শুনাও প্রাণে প্রাণে মঙ্গল বারতামতিন সাহেব লােকটির খোঁজ বের করার ভালই চেষ্টা করেছেনথানায় ডায়েরী করিয়েছেনদুটি দৈনিক পত্রিকায় সন্ধান চাইবিজ্ঞাপন ছবিসহ ছাপা হয়েছেএ্যাকসিডেন্ট যেখানে হয়েছিল সেখানেও লােক পাঠিয়েছিলেনকেউ কোনরকম সন্ধান দিতে পারেনিমতিন সাহেব বুঝতে পারছেন না, তার কি করণীয় আছেতিনি মনে মনে ঠিক করে রেখেছেন আরাে তিনচারদিন দেখে লােকটাকে যেখান থেকে তুলেছেন সেখানে রেখে আসবেনকাজটা অমানবিক হলেও কিছু করার নেইসঙ্গে কিছু টাকাপয়সা দিয়ে দিলেই হবেলােকটি স্মৃতিশক্তি তার কারণেই হারিয়েছে তাতাে নাও হতে পারেহয়ত আগে থেকেই স্মৃতিশক্তি ছিল না

দুই দুয়ারী-পর্ব-(৩)-হুমায়ুন আহমেদ

বুধবার সন্ধ্যা। 

মতিন সাহেব বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে আছেনএষা ট্রেতে করে চা, এক পিস কেক এবং কলা এনে সামনে রাখলমতিন সাহেব বললেন, কেমন আছ মা

এষা হাসি মুখে বলল, ভাল আছিতুমি কেমন আছাে বাবা? আমি মন্দ আছি। 

পিতা এবং কন্যা দুজনই একসঙ্গে হেসে উঠলএষা কথা বলা শেখার পর থেকে এই জাতীয় বাক্যালাপ দুজনের মধ্যে চলছেবয়সের সঙ্গে সঙ্গে ধরনটা একটু পাল্টাচ্ছেএষার পাঁচ বছর বয়সে কথাবার্তা হত এ রকম ঃ 

মতিন সাহেব উঁচু গলায় বলতেন, কেমন আছ মামণি।  

এষা প্রায় চিৎকার করে বলতাে, তুমি কেমন আছাে বাবামণিআমি মন্দ আছিআমিও মন্দ আছিহি হি হি। 

আজ দুজনেরই বয়স বেড়েছে কিন্তু এই একটা জায়গায় যেন বয়স আটকে আছেএষা বাবার সামনে চা রাখলকোমল গলায় বলল, কলার খােসা ছাড়িয়ে দেব বাবা? মতিন সাহেব বললেন, তাের কথা শুনে মনে হচ্ছে কলার খােসা ছড়ানাে দারুণ কঠিন কাজএই কঠিন কাজটা করে তুই আমাকে সাহায্য করতে চাসকিছু করতে হবে না তুই আমার সামনে বােসবসতে বলার দরকার ছিল না এষা নিজ থেকেই বসতসন্ধ্যাবেলা বেশ কিছুটা সময় সে বাবার সঙ্গে বসেমতিন সাহেব মেয়ের কাছ থেকে বাড়ির সারাদিনের খবরাখবর নেনএষাকে বাড়ির গেজেট বলা চলেকিছুই তার চোখ এড়ায় নাবলেও খুব গুছিয়ে

দুই দুয়ারী-পর্ব-(৩)-হুমায়ুন আহমেদ

মতিন সাহেব চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, আজ তাের মা আছে কেমন

জানি নাইউনিভার্সিটিতে যাবার আগে উকি দিয়েছিলামমা খ্যাক করে উঠেছেন কেন ডিসটার্ব করছ?” 

বেচারী খেটেখুটে বাসায় আসেডিসটার্ব না করলেই হয়ডিসটার্ব আবার কি? আমি মার সঙ্গে কথাও বলব না ? যখন মন টন ভাল থাকবে তখন কথা বলবি?তার মন কখনােই ভাল থাকে নাতাও ঠিকআরেকটা খবর আছে বাবাবলে ফেলহরিপ্রসন্ন স্যার এসেছেন। 

মতিন সাহব বিরক্ত মুখে বললেন, কেন

কিছু বলেন নিদেখে মনে হল খুব অসুস্থতুমি কি তার সঙ্গে কথা বলবে? ডাকব?” 

না এখন কথা বলব নামনটা ভাল না। মন ভাল না কেন?তিনি উত্তর দিলেন নাসিগারেট ধরালেনতিনি এখন পুরােদমে সিগারেট খাচ্ছেনদিনে এক প্যাকেটের বেশী লাগে। 

এষা একটু চিন্তিত বােধ করলবাবার সিগারেট শুরু করা মানে তার ওষুধের কারখানায় বড় ধরনের কোন সমস্যাযে সমস্যা নিয়ে তিনি কখনাে কারাে সঙ্গে কথা বলেন না। 

সাবেরের খবর কি রে

দাদা ভালই আছেএকটা নর কংকাল কিনে এনেছেঅস্থিবিদ্যা যা শিখেছিল সব ভুলে গেছেআবার নতুন করে নাকি শিখতে হবে। 

মতিন সাহেব গম্ভীর হয়ে গেলেনএষা বলল, মার সঙ্গে দাদাকেও নিয়েযাওতাকেও কোন একজন বড় সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানাে দরকারআরেক কাপ চা দেব বাবা

Leave a comment

Your email address will not be published.