দুই দুয়ারী-পর্ব-(২)-হুমায়ুন আহমেদ

 মতিন সাহেবের মনে হল মিতুর কথাই হয়ত সত্যি – লােকটি মরে গেছে। ক্যাসেটে গান হচ্ছে। মতিন সাহেব মন দিয়ে গানের কথা শুনতে লাগলেন। কোন কিছুতে নিজেকে ব্যস্ত রাখা। 

দুই দুয়ারী“সকাতরে ঐ কাঁদিছে সকলে, শােনাে শােনাে পিতা কহাে কানে কানে শুনাও প্রাণে প্রাণে মঙ্গল বারতা। ক্ষুদ্র আশা নিয়ে রয়েছে বাঁচিয়ে সদাই ভাবনা 

যা কিছু পায় হারায়ে যায়, না মানে সান্ত্বনা ।।” মিতু ফিস ফিস করে বলল, বাবা । ‘কি মা? ‘লােকটা মরে গেলে আমরা কি করব? ‘আমরা তার আত্মীয়–স্বজনকে খবর দেব। ‘তােমাকে পুলিশে ধরবে না? 

‘না। এটা একটা এ্যাকসিডেন্ট। ‘আমার মনে হচ্ছে পুলিশ তােমাকে ধরে নিয়ে যাবে। ভয় লাগছে বাবা। ‘ভয়ের কিছু নেই। লােকটা মরে নি। 

মতিন সাহেব আড় চোখে তাকালেন। লােকটি নড়ছে না। নিঃশ্বাস ফেলছে বলেও মনে হচ্ছে না। সম্ভবত মারা গেছে। প্রথমেই তাকে একজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত। তিনি গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিলেন। স্পীডােমিটারের কাঁটা আবার নব্বই এর কাছাকাছি চলে এল। 

লােকটি মরেনি। ডাকামাত্র উঠে বসল। হেঁটে হেঁটে ঢুকল ডাক্তারের চেম্বারে। ডাক্তার জাকির হােসেন মতিন সাহেবের বন্ধু। তিনি দেখেটেখে বললেন, তেমন কিছু না। দু–এক জায়গা ছিড়ে গেছে। ওয়াশ করে ব্যাণ্ডেজ লাগিয়ে দিচ্ছি। হাঁটুতে স্টীচ লাগবে। দ্যাটস ইট। 

মতিন সাহেব চিন্তিত গলায় বললেন, মাথায় চোট পেয়েছে কিনা দেখবেন? সারা রাস্তা ঝিমুতে ঝিমুতে এসেছে। 

ডাক্তার সাহেব সহজ গলায় বললেন, মাথায় চোট পেয়েছে বলে মনে হয় না। চোখের মণি ডাইলেটেড হয়নি। রিফ্লেক্স এ্যাকশন ভাল। লম্বা ঘুম দিলে ঠিক হয়ে যাবে। একটা পেইন রিলিভার দিয়ে দিচ্ছি – ব্যথা বেশী হলে খেতে হবে। প্রেসক্রিপশন লিখতে গিয়ে ডাক্তার নাম জিজ্ঞেস করলেন। লােকটি বিব্রত চোখে তাকাল। যেন খুব অস্বস্তি বােধ করছে। 

‘বলুন, নাম বলুন। ‘আমার কোন নাম নেই। ‘নাম নেই মানে?” 

লােকটি মাথা নিচু করে ফেলল। আড় চোখে তাকাল মতিন সাহেবের দিকে। তার চোখে চাপা সংশয়। মতিন সাহেব খানিকটা হকচকিয়ে গেছেন। তাকাচ্ছেন মিতুর দিকে। ডাক্তার সাহেব বললেন, আপনি কি নাম মনে করতে পারছেন না? 

‘আপনার পরিচিত কারাের নাম মনে আছে?” লােকটি মিতুর দিকে তাকিয়ে বলল, এই মেয়েটার নাম মিতু। 

এই মেয়ে ছাড়া অন্য কারাের নাম মনে পড়ছে না?” ‘না। ‘আপনি কি করেন বলুন তাে?” “কিছু করি না। ‘কিছু নিশ্চয়ই করেন – এখন মনে করতে পারছেন না, তাই না? 

“আচ্ছা, এ্যাকসিডেন্টের পরের ঘটনা মনে আছে?” ‘আছে। ‘দু–একটা বলুন তাে শুনি। ‘মিতু তার বাবার সঙ্গে কথা বলছিল। গান হচ্ছিল। “কি গান?” 

লােকটি মতিন সাহেবকে পুরােপুরি চমকে দিয়ে গানের প্রতিটি লাইন বলে গেল। মতিন সাহেব যেমন চমকালেন ডাক্তার তেমন চমকালেন না। সহজ গলায় বললেন, সাময়িক এ্যামনেশিয়া। শকটা কেটে গেলে ঠিক সয়ে যাবে। ভাল মত রেস্ট হলেই স্মৃতি ফিরে আসবে। ঘুমের ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি। দশ মিলিগ্রাম করে ফ্রিজিয়াম ঘুমুতে যাবার এক ঘন্টা আগে খেতে হবে। 

ডাক্তার লােকটির দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনার কি বমি ভাব হচ্ছে? ‘জি না। ‘মাথা ঘুরছে ? ‘ঘুরছে না তবে — কেমন যেন লাগছে। ‘ ‘আচ্ছা বসুন, এখানে আমি আপনার ব্লাড প্রেসার মাপি। 

মতিন সাহেব ডাক্তারের চেম্বারের বাইরে চলে এলেন। তাঁকে একটা সিগারেট খেতেই হবে। মিতু তার পেছনে পেছনে এল। রাস্তার পাশের সিগারেটের দোকান থেকে সিগারেট কিনলেন। মুখে এখনাে থুথু জমা হচ্ছে। একটা মিষ্টি পান কিনলেন। মিতুর দিকে তাকিয়ে বললেন, পান খাবিরে মিতু? 

‘খাব। মিষ্টি পান। 

মিতু পান মুখে দিয়ে বড়দের মত পিক ফেলে বলল, লােকটাকে এখন আমরা কি করব? 

‘বুঝতে পারছি না। ভাবছি একটা শার্ট এবং প্যান্ট কিনে দেব। শ’ দু‘এক টাকা দিয়ে দেব। ও বাড়ি চলে যাবে। 

‘বাড়িতে চেনে না। যাবে কি ভাবে ? ‘তুই কি করতে বলছিস?” 

‘কয়েকদিন আমাদের বাসায় থাকুক। তুমি খোঁজ করে তার আত্মীয়–স্বজন বের কর। 

‘এটাও করা যেতে পারে। 

মতিন সাহেব চেম্বারে ঢুকলেন। লােকটি খুশী খুশী গলায় বলল, আমার ব্লাড প্রেসার স্বাভাবিক। হার্ট বিটও স্বাভাবিক। 

মতিন সাহেব বললেন, সব কিছু স্বাভাবিক হলেই ভাল। তিনি লােকটিকে বাসায় নিয়ে এলেন। 

মতিন সাহেবের বাসা বনানীতে। 

নিজের বাড়ি নয় – ভাড়া করা। পুরানাে ধরনের বাড়ি। অনেকগুলি ঘর। সামনে ফাঁকা জায়গায় দেশী ফুলের গাছ। চাপা গাছ, কেয়া গাছ, হাসনাহেনা। জংলা জংলা ভাব আছে। বাড়ির দক্ষিণে দুটা ঝাকড়া কাঁঠাল গাছ। একটা কাঁঠাল গাছের তলা বাঁধানাে। ছুটির দিনের দুপুরে মিতু এইখানে বসে একা একা সাপলুডু খেলে। কাঁঠাল তলার আরেকটা নাম আছে – কান্নাতলা। মন খারাপ হলে মিতু এখানে বসে কাঁদে। 

এত বড় বাড়িতে মানুষের সংখ্যা অল্প। 

মতিন সাহেবের স্ত্রী — সুরমা। তিনি মতিঝিল জনতা ব্যাংকের মহিলা শাখার ম্যানেজার। সারাদিন অফিসেই থাকেন। সন্ধ্যা নাগাদ ফিরে প্রথমেই সবাইকে খানিকক্ষণ বকা ঝকা করেন, তারপর উঠে যান দোতলায়। রােজ সন্ধ্যায় তাঁর মাথা ধরে। দোতলায় তাঁর ঘরে দরজা বন্ধ করে ঘণ্টা দুএক চোখ বন্ধ করে 

শুয়ে থাকেন। তারপর একতলায় নেমে এসে আবার সবাইকে খানিকক্ষণ বকা ঝকা করেন। ঝড় ঝাপ্টা বেশীর ভাগ যায় তাঁর বড় ছেলে সাবেরের উপর দিয়ে। সাবের এই পরিবারে বড় ধরনের সমস্যা তৈরী করেছে। সবাইকে অশান্তিতে ফেলেছে। 

 সাবের দোতলায় থাকে। একেবারে কোনার দু‘টি ঘর তার। একটি স্টাডি রুম, অন্যটি শােবার ঘর। সাবের তিন বছর আগে ডাক্তারী পাস করেছে। পাস করবার পরপরই ঘােষণা করেছে ডাক্তারী কিছুই সে শিখতে পারেনি। সে চিকিৎসার ক, খও জানে না। কাজেই ডাক্তারী করবে না। মতিন সাহেব সাবেরকে ডেকে বলেছিলেন, শুনলাম তুমি চাকরি–বাকরি নিতে চাও না – সত্যি? 

সাবের শান্ত গলায় বলেছে, সত্যি। প্রাইভেট প্র্যাকটিসও করতে চাই না। ‘কেন চাও না? ‘আমি ডাক্তারী কিছুই শিখতে পারিনি। ‘পরীক্ষায় তাে খুব ভাল রেজাল্ট করেছ। ‘তা করেছি, কিন্তু আমার কিছুই মনে নেই। ‘কিছুই মনে নেই বলতে কি মিন করছ?” 

“যেমন ধর ডিপথেরিয়া। কিছুক্ষণ আগে ডিপথেরিয়া নিয়ে চিন্তা করছিলাম। ডিপথেরিয়াতে এন্টিটক্সিন দিতে হয় এবং এন্টিবায়ােটিক দিতে হয়। এন্টিটক্সিনের ডােজ কিছুই মনে নেই। ডিপথেরিয়াতে কার্ডিয়াক ফেইলিউর হয় – কেন হয় তাও মনে নেই। 

‘সব কিছু মনে থাকতে হবে? ‘অফ কোর্স মনে থাকতে হবে। মানুষের জীবন নিয়ে কথা। ‘তুমি তাহলে কি করবে?” 

‘আমি নিজে নিজে পড়ব। যেদিন বুঝব যা জানার সব জেনেছি সেদিন চিকিৎসা শুরু করব। 

মতিন সাহেব বললেন, তুমি যা করছ তা যে এক ধরনের পাগলামি ত কি বুঝতে পারছ? 

না বুঝতে পারছি না। 

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *