নিষাদ পর্ব – ৫ হুমায়ূন আহমেদ

নিষাদ পর্ব – ৫

তিনি নিজেও তাঁর জীবন দ্বিধার মধ্যে পার করে দিচ্ছেন। সমাজ-সংসার থেকে আলাদা হয়ে বাস করতে তাঁর ভালো লাগে, আবার লাগে না। মানুষের মঙ্গলের জন্যে তীব্র বাসনা অনুভব করেন। এক জন মমতাময়ী স্ত্রী, কয়েকটি হাসিখুশি শিশুর মাঝখানে নিজেকে কল্পনা করতে ভালো লাগে! আবার পর মুহূর্তেই মনে হয়–এই তো বেশ আছি। বন্ধনহীন মুক্ত জীবনের মতো আনন্দের আর কী হতে পারে? পুরোপুরি নিঃসঙ্গও তো নন। তিনি।

তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরির দিকে তাকালে মন অন্য রকম হয়ে যায়। সারি—সারি বই। কত বিচিত্ৰ চিন্তা, কত বিচিত্র কল্পনার কী অপূর্ব সমাবেশ। এদের মাঝখানে থেকে নিঃসঙ্গ হবার কোনো উপায় নেই।মিসির আলি বইয়ের তাকের দিকে চোখ বন্ধ করে হাত বাড়ালেন। যে-বই হাতে উঠে আসে, সে বইটিই খানিকক্ষণ পড়বেন। এটা তাঁর এক ধরনের খেলা। সব সময়ই এমন একটা বই উঠে আসে, যা পড়তে ইচ্ছে করে না। আবার পড়তে শুরু করলে ভালো লাগে।

আজও তাই হল। কবিতার বই হাতে। এই একটি বিষয়ে পড়াশোনা তাঁর ভালো লাগে না। কবিতার বই সজ্ঞানে কখনো কেনেন নি, এখানে যা আছে সবই নীলুনামের তাঁর এক ছাত্রীর দেয়া উপহার। মেয়েদের এই এক অদ্ভুত সাইকোলজি, উপহার দেবার বেলায় কবিতার বই খোঁজে।মিসির আলি বইটির পাতা ওন্টাতে লাগলেন। ইংরেজি কবিতা। কার লেখা কে জানে? অবশ্য নামে কিছু যায়-আসে না। তিনি ভ্রূ কুঁচকে কয়েক লাইন পড়তে চেষ্টা করলেন–

I can not see what flowers are at my seet,

Nor what soft incense hangs upon the boughs,

এর কোনো মানে হয়! কোনো মানে হয় না, তবু পড়তে এত ভালো লাগে! মিসির আলি পড়তে শুরু করলেন।অনেকক্ষণ ধরে কে যেন কড়া নাড়ছে।কড়া নাড়ার ধরনটা অদ্ভুত। দুটি টোকা দিয়ে থেমে যাচ্ছে, আবার দুটি টোকা দিচ্ছে। জানালার পর্দা সরিয়ে বিনু উঁকি দিল। অপরিচিত এক জন মানুষ। রোগা, মুখভর্তি দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল। এর মাঝে দুটি চোখ জ্বলজ্বল করছে।

বিনু ভয় পাওয়া গলায় বলল, কে?…..লোকটি খুবই কোমল স্বরে কল, আমাকে তুমি চিলবে না। আমার নাম মিসির আলি।কোমল স্বর খুবই সন্দেহজনক। এ-রকম মিষ্টি গলায় একটা অপরিচিত লোক কথা বলবে কেন? বিনু বলল, বাবা তো একটু বাজার করতে গিয়েছে। আপনি আধা ঘন্টা পরে আসুন না।বাসায় বুঝি তুমি ছাড়া আর কেউ নেই।

জ্বি-না।আচ্ছা ঠিক আছে, দরজা খুলতে হবে না। আমি এখানেই আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করি।বিনু অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। মিসির আলি বললেন, একটা কাজ কর, জানালা দিয়ে আমাকে একটা দেশলাই দাও।আসুন, আপনি ভেতরে এসে বসুন।মিসির আলি হেসে বললেন, এখন বুঝি আমাকে আর দুষ্ট লোক মনে হচ্ছে না? না।

নৌকায় যখন ডাকাতি হয়, তখন ডাকাতরা কী করে, জান? আগুন চায়।এটা তো আর নৌকা না।মিসির আলি হেসে ফেললেন। মুনির যা বলেছে, তাই–এ মেয়েটির আচারআচরণে খুব স্বাভাবিক একটি ভঙ্গি আছে। ঠিক সুন্দরী তাকে বলা যাবে না, তবে চেহারা খুব মায়াকাড়া। তার চেয়েও বড় কথা, ছবিতে এই মেয়েটিই কনে হয়ে বসে আছে। এই মেয়েটির বা গালের কাটা দাগটাও ছবিতে নিখুঁত এসেছে।

বিনু, তুমি বস, তোমার সঙ্গে গল্প করি।আপনি আমার নাম জানলেন কীভাবে? মুনির বলেছে। মুনিরকে চেন তো? তোমার আব্বার সঙ্গে কাজ করে।খুব ভালো করে চিনি। আপনি কি ওঁর আত্মীয়? ঠিক আত্মীয় না হলেও খুব চেনা! মাঝে মাঝে অনান্তীয় লোকজনকেও খুব চেনা মনে হয় না? মুনিরও সে-রকম।

আপনি তো খুব সুন্দর করে কথা বলেন।তুমিও খুব সুন্দর করে কথা বল।বাবার কাছে কী জন্যে এসেছেন? ঠিক তোমার বাবার কাছে আমি আসি নি। আমি এসেছি তোমার কাছে।বিনু বিস্মিত হয়ে তাকাল। মিসির আলি একটা ছবির উল্টো পিঠ দেখিয়ে বললেন, এখানে লেখা আছে, আমাদের টগরমনি। বয়স এক বছর। এই হাতের লেখাটা কি তোমার?বিনু খুবই অবাক হয়ে লেখাটার দিকে তাকিয়ে রইল।

বল, তোমার হাতের লেখা? জ্বি। কিন্তু আমি এ-রকম কিছু কখনো লিখি নি। ছবিটা দেখি।উঁহু, ছবিটা এখন দেখাব না। পরে দেখাব। এখন অন্য একটা ছবি দেখ, বিয়ের ছবি। বর-কনে বসে আছে। তাদের ঘিরে আত্মীয়স্বজনরা দাঁড়িয়ে আছে। বর এবং কনের ছবি আমি কাগজ দিয়ে ঢেকে রাখব। তুমি শুধু অন্যদের ছবিগুলো দেখবে এবং বলবে এদের চেন কি না।

তার আগে বলুন, আপনি কে? আমি আমার নাম তো আগেই বলেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইকোলজি পড়াই। একটা ছোট্ট গবেষণা করছি। গবেষণাটা মুনিরকে নিয়ে।ওকে নিয়ে গবেষণা করছেন, কিন্তু আমাকে এ—সব দেখাচ্ছেন কেন? পরে তোমাকে বলব। তুমি এখন ছবিটা একটু দেখ তো।

চিনতে পোর এদের?……….হ্যাঁ, দু জনকে বাদ দিয়ে সবাইকে চিনি। এরা সবাই আমার আত্মীয়। আমার খালা, আমার ফুপু। এটা হচ্ছে আমার বান্ধবী লিজা। এটা আমার বড় খালার মেয়ে কনক। ইনি আমার ছোট মামা।মিসির আলি ছবিটি পকেটে রেখে দিলেন।বিনু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কিছু বলতে গিয়ে সে বলল না। নিজেকে সামলে নিল।

মিসির আলি বললেন, তুমি কি কিছু বলবে? না।মনে হচ্ছিল কি জানি বলতে চাইছিলে? আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, এটা আমার বিয়ের ছবি। কিন্তু আমার বিয়ে হয় নি। আপনি এই ছবি কোথায় পেলেন?……..মিসির আলি চুপ করে রইলেন। বিনু কড়া গলায় বলল, আপনি এখন যান।

আমি দরজা বন্ধ করে দেব।মিসির আলি নিঃশব্দে উঠে এলেন। বিনু জানালার পর্দা ফাঁক করে তাকিয়ে আছে–তার মুখ বিষণ্ণ। চোখে গাঢ় বিষাদের ছায়া! এই বিষাদের উৎস কী, কে জানে! এখন রাত প্রায় এগারটা।

আন্দাজে বলছি, কারণ আমার ঘড়ি নেই। রাতের বেলা আন্দাজে সময় ঠিক করি। দিনের বেলা এই অসুবিধা হয় না। বেশির ভাগ মানুষের হাতেই ঘড়ি থাকে। জিজ্ঞেস করলেই সময় জানা যায়।যে আমার এই লেখা পড়বে, সে বুদ্ধিমান হলে ধরে ফেলবে যে আমি আজেবাজে কথা লিখে সময় নষ্ট করছি। আসলে তা না। কিভাবে শুরু করব বুঝতে পারছি না।

মিসির আলি সাহেব আমাকে চমৎকার বাঁধান খাতা দিয়েছেন। শুধু তাই না, সঙ্গে খুব দামী একটা কলম। বল পয়েন্ট না, ফাউনটেন পেন। কালির দোয়োতও কিনেছেন। দোয়াতটার দামই সত্তর টাকা। কলমটার দাম কত কে জানে। দুই তিন শ টাকা তো হবেই। এত দামী কলম, কিন্তু লেখা ভালো না। অর্থাৎ আমি লিখে আরাম পাচ্ছি না।

মিসির আলি সাহেব বলেছেন, আমি যেন রোজ লিখি। প্রতিটি খুঁটিনাটি যেন লিখি। কিছুই যেন বাদ না দিই। ভ্রমণের ব্যাপারটাই যেন লিখি। ভ্রমণ বলতে তিনি অন্য জগতে যাবার ব্যাপারটা বোঝাচ্ছেন। তিনি নিজে এই ব্যাপারটা বিশ্বাস করেন। কি করেন না, তা আমি এখনো বুঝতে পারছি না। মাঝে মাঝে মনে হয় বিশ্বাস করেন, আবার মাঝে-মাঝে মনে হয় করেন না। পুরো ব্যাপারটাই এক জন নিঃসঙ্গ যুবকের কল্পনা ধরে নিয়েছেন।

আমি তাঁকে একটি চিঠি এবং দুটি ছবি এনে দিয়েছি। এই প্রসঙ্গে তিনি একটি কথাও বলছেন না। আমি একবার ছবিটা চাইলাম। তিনি বললেন, পরে পাবে।তিনি যে চুপচাপ বসে আছেন তাও মনে হয় না। আমার ব্যাপারে তিনি খুলনা গিয়েছিলেন, এটা হঠাৎ জানতে পারি। সেখান থেকে তিনি কী জানলেন, আমি জানি না।

ফুলেশ্বরীর শ্বশুরবাড়িতেও তিনি গিয়েছিলেন। আমার সম্পর্কে তথ্য সংগ্ৰহ করছেন বলে মনে হয়। আমি নিজে যা জানি, সবই তাঁকে বলেছি। এর বেশি তিনি কী জানতে চান কে জানে। লোকটির ধৈর্য অসীম। মমতাও অসীম। তাঁর মমতার নানান পরিচয় পেয়েছি। কঠিন ঋণে তিনি আমাকে আবদ্ধ করেছেন।

আমার পক্ষে ঋণমুক্ত হবার কোনো পথ আছে কি না। আমি জানি না। ঋণমুক্ত হতে চাইও না। কিছু কিছু মানুষের কাছে ঋণী থাকতে ভালো লাগে! মিসির আলি তেমন এক জন মানুষ।আবারো আজেবাজে কথা বলছি। কি করব, আমি তো আর লেখক নই, যে, গুছিয়ে ঘটনার পর ঘটনা সাজাব। আমি তা পারি না। লেখক ছাড়া অন্য কেউই বোধহয়। পারেন না।

যাই হোক, মূল ব্যাপারে ফিরে আসি। আমি এখন প্রায় এক শ ভাগ নিশ্চিত যে, আমার পাশাপাশি দুটি জীবন চলছে। এক জীবনে আমার বাবা শৈশবে মারা গেছেন। প্রবল দুঃখ কষ্ট ভোগ করে বর্তমানে এই অবস্থায় আছি। অসহায় নিঃসঙ্গ এক জন মানুষ।অন্য জীবনটি চমৎকার! এই জীবনে বাবা বেঁচে আছেন। আমি বড় কোনো চাকরি কিংবা ব্যবসা করছি, এখনো ঠিক জানি না। বিয়ে করেছি।

জীবনটা বেশ সুখের বলেই মনে হচ্ছে। এই জীবনটাকে আমি স্বপ্নজীবন নাম দিচ্ছি বোঝার সুবিধের জন্যে। স্বপ্ন—জীবনটাও পৃথিবীর মধ্যেই। কারণ, সেখানেও আমি আকাশে চাঁদ দেখছি। দুটি পাশাপাশি জীবন কিভাবে চলছে? দুটি কি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগৎ? দুটি পৃথিবী দুটি চাঁদ? সব মানুষই দু জন করে? …….এইসব প্রশ্নের আমি কোনো কূল-কিনারা পাই না। কাজেই খুব বেশি ভাবিও না।

চিন্তা-ভাবনার দায়িত্ব আমি মিসির আলি সাহেবের ওপর ছেড়ে দিয়েছি।আমি লক্ষ করেছি যে, এখন আমি এ জগৎ থেকে স্বপ্ন-জগতে খুব সহজেই যেতে পারি। নিয়মটা খুব সহজ। নিজেকে প্রথমে খুব ক্লান্ত করে নিতে হয়। উপবাস এবং পরিশ্রম এই দুটি জিনিস একত্রে চালিয়ে যাবার পর চোখ বন্ধ করে স্বপ্ন— জগৎটির কথা ভাবলেই হয়।

একবার স্বপ্ন-জগতে চলে যাবার পর সেই জগৎটাকে সত্যি মনে হয়। বর্তমানে যে জীবন যাপন করছি, তাকে মনে হয় মিথ্যা জীবন। কোনটি সত্যি কে জানে? প্রাচীনকালের মুনি-ঋষিরা বলতেন–জীবনটাই একটা মায়া। আসলেই বোধহয় তাই। সবটাই বোধহয় মায়া। আমার এখন এ-সব জানতে ইচ্ছে করে না। যে-কোশে একটি জীবনে আমি স্থায়ী হতে চাই।

যদি এটা এক ধরনের অসুখ হয়, তাহলে আমি চাই যেন অসুখটা সেরে যায়। সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবনযাপন করতে চাই। মুক্তি চাই। পরিপূর্ণ মুক্তি।আজ এর বেশি কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে না। এখন তৈরি হব ভ্রমণের জন্যে। অদ্ভুত এক ভ্রমণ। এই জীবন ছেড়ে অন্য এক জীবনে।মুনির খাতা বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। বাতি নিভিয়ে সিগারেট ধরাল। মনে-মনে বলল-ভ্রমণের প্রস্তুতি। যাত্রা হবে শুরু।

এ-রকম যদি হত-ওয়ান ওয়ে জানি, আর ফিরে আসতে হবে না।–তাহলে কেমন হত? স্বপ্ন—জীবনটি কি খুবই সুখের? মৃত্যু ঐ জীবনেও হানা দিয়েছে। টগরের মৃত্যু হল। বাবা-মোর কাছে কত তীব্রই না ছিল সেই শোক! সে এখন বুঝতে পারছে না, কিন্তু ঐ জীবনের মুনির কী গভীর শোক পেয়েছে, তা সে রক্তের মধ্যে অনুভব করে। শোক এবং শোক, চারদিকেই শোক। জাপানি একটি কবিতায় আছে না?

বল দেখি কোথা যাই………….কোথা গেলে শান্তি পাই?………ভাবছিলাম বনে যাব………..তাপিত হিয়া জুড়াব…………….সেখানেও অর্ধ-রাত্রে……………….কাঁদে মৃগী কম্প গাত্রে।

মুনির সিগারেট ফেলে নিজেকে তৈরি করল। মুহূর্তে ঘরের চেহারা পাল্টে গেল। সে দাঁড়িয়ে আছে সিঁড়ির মাথায়, তারা কোথায় যেন বেরুচ্ছে। ঐ তো বিনু)। আশ্চৰ্য, কী সুন্দর লাগছে বিনুকে। অসম্ভব সুন্দরা বিনুর চুলগুলো পিঠময় ছড়ান। এ-রকম খোলা চুলে সে কোথায় যাচ্ছে নাকি বিনুযাচ্ছে না, সে একাই যাচ্ছে? একটি কাজের লোক বড়-বড় দুটি সুটকেস নিয়ে নামছে।

তারা নিশ্চয়ই দূরে কোথাও যাচ্ছে। ঘরে দিনের আলো। কটা বাজছে কে জানে। মুনির হাতের ঘড়ির দিকে তাকাল।–দশটা পনের। ঘড়ির ডায়াল সবুজ রঙের। বাহ্, ইন্টারেষ্টিং তো! এটা তো স্বপ্ন! স্বপ্নে তো রঙ দেখার কথা নয়। সে রঙ দেখছে কেন? কে বলেছিল, স্বপ্নে রঙ দেখার কথা নয়? মনে পড়ছে না।

নামটা মনে পড়ছে না। মা দিয়ে শুরু। মিহির? মুনির? না না, মিসির। মিসির আলি। মিসির আলি বলেছেন।–দ্রমণের সময় খবরের কাগজ হাতে নেবে। খবরের কাগজ হাতে নিতে হবে কেন? মিসির আলি বলেছেন, একটা খবরের কাগজ হাতে নেবে। কিছুতেই হাতছাড়া করবে না। কেন বললেন এ-রকম কথা। বিনু কেমন যেন বিরক্ত মুখে তাকাচ্ছে।টগর। টগর।

মুনির চমকে উঠল। টগরকে কেন ডাকছে? টগর চার বছর বয়সে মারা গেল না? বিন্দু কি ভুলে গেছে? এত বড় একটা ঘটনা কি ভোলার কথা অবশ্যি ভোলাটা অস্বাভাবিকও নয়। এই তো সে নিজেই অনেক কিছু ভুলে যাচ্ছে। কি কি যেন তাকে বলেছিলেন মিসির আলি। এখন আর কিছুই মনে পড়ছে না।টগর। আমি কিন্তু খুব রাগ করছি। আর এক বার মাত্র ডাকব। এর মধ্যে ভূমি যদি আসি ভালো কথা, না এলে তোমাকে ছাড়াই রওনা হব।

মুনির অবাক হয়ে দেখল, টগর এসেছে। আট-ন বছর বয়সের চশমাপরা একটা ছেলে। টগর বলল, আমি যাব না, মা।বিনু বলল, খুব ভালো কথা, থাক তুমি।বিনু তরতর করে নেমে যাচ্ছে। টগর হাসিমুখে মুনিরের দিকে তাকিয়ে আছে।তার মানে কি টগর বেঁচে আছে? চার বছর বয়সে ও তাহলে মারা যায় নি? এটা কোন জীবন? অন্য আরেকটা? এর মানে কী?…মুনিরের নিঃশ্বাস ভারি হয়ে এল।

সঙ্গে-সঙ্গে ঘোর কেটে গেল। সে আছে তার পরিচিত জায়গায়। ভ্ৰমণ শেষ হয়েছে।মুনির বাতি জ্বালোল। খাতা খুলে লিখল, মানুষের জীবন দুটি নয়। অনেক। হয়তো-বা অসংখ্য।ক্লান্তিতে খাতার ওপরই মাথা রেখে সে ঘুমিয়ে পড়ল। সারারাত সেই ঘুম ভাঙল না। কত বিচিত্র স্বপ্ন দেখল ঘুমিয়ে-ঘূমিয়ে।

কখনো মনে হচ্ছে সে মেঘে-মেঘে ভেসে বেড়াচ্ছে, আবার কখনো-বা তলিয়ে যাচ্ছে গভীর অতলে। কী গাঢ় নীল সেই পানি। চারদিকে শব্দহীন সময়। কী অসহ্য নীরব। এই নীরবতার মধ্যেও কে যেন নিচু গলায় তাকে ডাকছে। বিনু ডাকছে নাকি? এটা কি বিনুর গলা? আহু! কী সুন্দর করেই না সে ডাকছে! আবার সব চুপচাপ। অসহ্য নীরবতা। মুনির স্বপ্নের মধ্যেই কাঁদছে। চেঁচিয়েচেঁচিয়ে বলছে-আমাকে মুক্তি দাও। কিন্তু তার চিৎকারেও কোনো শব্দ হচ্ছে না। কী অদ্ভুত অবস্থা!

তার ঘুম ভাঙল ভোরবেলা। প্রথম খানিকক্ষণ বুঝতেই পারল না, সে কোথায় আছে। কোন জগতে! সে ঠিক করল, আজ অফিসে যাবে না। সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় হাঁটবে। দুপুরবেলার দিকে যাবে মিসির আলির কাছে। এমনি খানিকক্ষণ গল্প করবে। দুপুরবেলা বা দিনের আলোয় তাঁর কাছে কখনো যাওয়া হয় নি। দিনের আলোয় লোকটিকে দেখতে কেমন দেখায় কে জানে। তবে দুপুরবেলা ওকে হয়তো পাওয়া যাবে না। ক্লাসে থাকবেন কিংবা লাইব্রেরিতে থাকবেন।

মিসির আলি ঘরেই ছিলেন, অবাক হয়ে বললেন, অসময়ে তুমি, ব্যাপার কি বল তো? অফিসে যাও নি? জ্বি-না। আপনি ইউনিভার্সিটিতে যান নি? না। আজ বৃহস্পতিবার না? বৃহস্পতিবারে ইউনিভার্সিটি বন্ধ থাকে।কী করছেন স্যার? রান্না করছি। রোজ-রোজ হোটেলে খাওয়া ভালো লাগে না।কী রান্না করছেন? নতুন ধরনের রান্না, আমিই তার আবিষ্কারক। নাম হচ্ছে মিসির মিকচার।

চাল, ডাল এবং আলু একসঙ্গে মিশিয়ে দু চামচ ভিনিগার, এক চামচ সয়া সস, একটুখানি লবণ, দুটো কাঁচা লঙ্কা এবং আধা চামচ সরিষা বাটা দিয়ে সেদ্ধ করতে হয়। সেদ্ধ হয়ে যাবার পুর এক চামচ বাটারওয়েল দিয়ে দমে দিতে হয়-অপূর্ব একটা জিনিস নামে। খেয়ে দেখ।জিনিস যেটা নামল, তার চেহারা দেখলে খেতে ইচ্ছে করে না, কিন্তু স্বাদ সত্যি চমৎকার। মুনির অবাক হয়ে গেল।কি, কেমন লাগছে? জ্বি স্যার, ভালো।আরো কিছু বিশেষণ দিয়ে বল।

শুধু ভালো, এর বেশি কিছু না?………চমৎকার স্যারা এখন বল, তুমি যে ভ্রমণে যাচ্ছ, সেখানে কখনো খাওয়াদাওয়া করেছ? চট করে বলতে হবে, না-ভেবে বল! পানি খেয়েছি।পানিতে হবে না, স্বাদ আছে এমন কিছু।মনে পড়ছে না। স্যার।এই জিনিসটা খুব ভালো করে খেয়াল করবে।কেন? স্বপ্নে আমরা প্রায়ই প্রচুর খাওয়াদাওয়া করি। তাতে কিন্তু কোনো স্বাদ থাকে না।

আপনি এখনো স্বপ্ন ভাবছেন?……….হ্যাঁ, ভাবছি। তবে তুচ্ছ স্বপ্ন ভাবছি না।সব স্বপ্নই তো তুচ্ছ।না, তা না। তা ছাড়া স্বপ্নকে তুচ্ছ করাও খুব মুশকিল। ফ্রয়েড সাহেব ইন্টারপ্রিটেশন অব ড্রীম লিখে স্বপ্নের মহিমাকে খর্ব করেছেন, কিন্তু তাঁর শিষ্য জাং পরবর্তী সময়ে ভিন্ন কথা বলেছেন।

কি বলেছেন?………ঐ সব থিওরি তোমার ভালো লাগবে না। তারচে বরং তোমার কথা শুনি। যা যা করতে মুদুল্লাম, করেছ তো? সব কিছু শিখছ তো? লিখছি।খুব খুঁটিয়ে লিখবে। কোনো কিছু বাদ দেবে না।কি হবে স্যার এসব দিয়ে? হয়তো কিছু হবে না। তাতে কি? কই, আমার সিগারেট এনেছ? মুনির পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল। মিসির আলি হেসে ফেললেন।

 

 

নিষাদ পর্ব – ৬ হুমায়ূন আহমেদ

 

Leave a comment

Your email address will not be published.