নিষাদ পর্ব – ৭ হুমায়ূন আহমেদ

নিষাদ পর্ব – ৭

এইজাতীয় রহস্যকে পাশ কাটিয়ে যাবার প্রবণতা আমাদের মধ্যে আছে। আমরা ভান করি যে, এ-সব কখনো ঘটে নি। তা না-করে এই ধরনের ঘটনাগুলো নিয়ে ব্যাপক বিচার-বিশ্লেষণ হওয়া প্রয়োজন। যাতে প্রকৃতির বিপুল রহস্যের কিছু জট আমরা খোলার চেষ্টা করতে পারি।

মিসির আলি তাঁর এই লেখাটি পড়তে দিলেন তাঁর বন্ধু দেওয়ান সাহেবকে। দেওয়ান সাহেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। পুরোপর অ্যাকাডেমিক মানুষ। পদার্থবিদ্যার সূত্রের মধ্যে যা পড়ে না, তা তিনি চোখ বন্ধ করে ঝুড়িতে ফেলে দেন।দেওয়ান সাহেব মিসির আলির লেখা পড়ে গম্ভীর মুখে বললেন, তুমি বদ্ধ উন্মাদ।

তোমার তাই ধারণা?……ধারণা অন্য রকম ছিল। লেখা পড়ে ধারণা পাল্টেছে। তুমি এক কাজ কর। ভালো এক জন ডাক্তারকে বল তোমার চিকিৎসা করতে।আমার এই লেখাটাকে তোমার পাগলের প্রলাপ বলে মনে হচ্ছে? হুঁ। পদার্থবিদ্যার একটি সূত্র হচ্ছে, একই সময়ে একই স্থানে দুটি বস্তু থাকবে না। কারণ বস্তু স্থান দখল করে। আর তুমি অসীম বস্তু নিয়ে এসেছ, সবাইকে ঠেসে ধরছে এক জায়গায়।

মাত্রা কিন্তু ভিন্ন। এক-এক জীবন এক-এক ডাইমেনশনে প্রবাহিত।মূর্খরা যখন পদার্থবিদ্যা কিছু না-জেনে কথা বলে, তখন এ-রকম কথা বলে। ডাইমেনশনের তুমি জান কী? খুবই কম জানি। এইটুকু জানি যে, বস্তুর তিনটি মাত্রা : দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা। সময়কে একটি মাত্রা ধরা হলে, হয় চারটি। এ ছাড়াও মাত্রা তিনের বেশি হয়। যেমন একটি বস্তুর কথা ধরা যাক, যার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা সমান—একটি পারফেক্ট কিউব।

এর মাত্রা হচ্ছে তিন। তবে চতুর্মাত্রিক কিউবও আছে, যার নাম খুব সম্ভব টেস্যারেক্ট। চতুর্মাত্রিক কিউব আমরা আঁকতে পারি না, তবে তার প্রজেকশন বা ছায়ার মডেল তৈরি করা হয়েছে।মন্দ না। কিছু-কিছু তো জান বলেই মনে হচ্ছে।মিসির আলি বিরক্ত হয়ে বললেন, তোমরা বিজ্ঞানীরা একটা সুপিরয়রিটি কমপ্লেক্সে সব সময় ভোগ। সব সময় মনে কর।–তোমরা ছাড়া অন্য কেউ বিজ্ঞান নিয়ে কথা বলতে পারবে না।

রেগে যাচ্ছ কেন?……..রাগছি না, বিরক্ত হচ্ছি! তোমাদের বিজ্ঞানে অসংখ্য গোঁজামিল। তোমরা তা ভালো করেই জান, অথচ ভান করা যে, এটা একটা নিখুঁত জিনিস। গোঁজামিল তুমি কোথায় দেখলে? থার্ড ডিনামিক্সের প্রথম সূত্রে তোমরা বল-শক্তি শূন্য থেকে সৃষ্টি করা যায় না, ধ্বংস করা যায় না। আবার এই তোমরাই বল সৃষ্ট আদিতে শূৰ্ণ থেকে শক্তির সৃষ্টি।সৃষ্টির আদি অবস্থা ছিল ভিন্ন।

প্রাকৃতিক সূত্রগুলো তাহলে কি একেক অবস্থায় একেক রকম হবে? তোমরাই তো তা অস্বীকার কর! তোমরাই তো বল, প্রাকৃতিক সূত্রের কোনো পরিবর্তন হয় নি, হবে না।দেওয়ান সাহেব গলার স্বর নরম করে বললেন, চা খাও।তা খাব। তুমি আমার কথার জবাব দাও।আছে। কিছু সমস্যা তো আছেই। প্রকৃতির ব্যাপারটায় রহস্য এত বেশি যে, কোনো থই পাওয়া যায় না।

এবং সবচে বড় মুশকিল কি জোন? ……….আমরা নিজেরাও এই প্রকৃতির অংশ। প্রকৃতির অংশ হয়ে সেই প্রকৃতিকে পুরোপুরি জানা সম্ভব নয়। তার জন্য প্রকৃতির বাইরে যেতে হবে। তা যেহেতু পারছি না, প্রকৃতির অনেক রহস্যই বুঝতে পারছি না।মিসির আলি বললেন, প্লটোর সেই বিখ্যাত গুহার উপমাটা কি তুমি জান? প্লেটো পড়ার সময় কোথায়? ফিজিক্স নিয়েই কুল পাচ্ছি না।

মনে কল্প–একটা গুহায় কিছু লোককে সারা জীবন বন্দি করে রাখা হয়েছে। লোকগুলো গুহামুখের দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসা বলে, গুহার বাইরে কী হচ্ছে জানে না। তাদের যে-ছায়া পড়ছে গুহার দেয়ালে, তা-ই শুধু তারা দেখছে। তার বাইরে এদের কোনো জগৎ নেই। ছায়াজগৎই তাদের কাছে একমাত্র সত্য। সত্যিকার জগৎ কী, এরা জানে না। আমাদের বেলাতেও তা-ই হতে পারে।

আমরা যে-জগৎ দেখছি, এটা সম্ভবত ছায়াজগৎ। সত্যিকার জগৎ আছে আমাদের চোখের আড়ালে! এ তো ফিলসফি-মায়াবাদ।ফিলসফিতে অসুবিধা কোথায়? দেওয়ান সাহেব বললেন, তুমি আমাকে কনফিউজ করে দিচ্ছ। দেখি, একটা সিগারেট দাও।দেওয়ান সাহেব সিগারেট ধরিয়ে টানতে লাগলেন। তাঁকে চিন্তিত মনে হল। মিসির আলি হাসিমুখে বললেন, তোমাকে আরো কনফিউজ করে দিচ্ছি। তোমাদের দলের এক জন লোক বিখ্যাত পদার্থবিদ শ্রেডিনজার নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করেছিলেন।

কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রবক্তাদের এক জন।ইরউইন শ্লোডিনজার?…হ্যাঁ। তিনি বলেছিলেন– My body functions as a pure mechanism according to laws of nature and I know by direct experience that I am dirccting the motions. It follows that I am the one who directs the atoms of he word in motions. Hence I am God Almighty.

এটা কি তোমার মুখস্থ ছিল? না, ছিল না। তোমার কাছে আসার আগে মুখস্থ করেছি।মনে হচ্ছে তৈরি হয়ে এসেছ।হ্যাঁ। খুব ভালো। এখন বল আর কি বলবে?তোমাকে একটা ছবি দেখাব। একটা বিয়ের ছবি। খুব মন দিয়ে ছবিটা দেখবে। এবং ছবিটার মধ্যে কোনো বিশেষত্ব আছে কি না আমাকে বলবে।দও তোমার ছবি।মিসির আলি মুনির এবং বিনুর বিয়ের ছবিটি দিলেন। দেওয়ান সাহেব দীর্ঘ সময় ছবিটির দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, তেমন কিছু তো দেখছি না।

মেয়েটা শাড়ি কিভাবে পরেছে সেটা দেখেছ?……অন্য সবাই যেভাবে পরে, সেভাবেই পরেছে।না, তা না। মেয়েরা শাড়ির আঁচল রাখে বাঁ কাঁধে। এই ছবিতে প্রতিটি মেয়ে শাড়ির আঁচল রেখেছে ডান কাঁধে। বয়স্ক মহিলারাও তাই করেছেন।তাতে হয়েছেটা কী? ছবিটা কোনো এক বিশেষ কারণে উলটো হয়ে গেছে।

তোমার কি তা মনে হয় না? …..হ্যাঁ, তা তো হয়েছেই। এটা অবশ্যই স্বাভাবিক ছবি নয়।মিসির আলি বললেন, নেচার পত্রিকায় একবার পড়েছিলাম, একটা ডান হাতের গ্লাভস যদি বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডের বাইরে দিয়ে ঘুরিয়ে আনা হয়, তবে সেই গ্লাভসটি হয়ে যাবে বাঁ হাতের গ্লাভস।

আমি কি ঠিক বললাম?…….পুরোপুরি ঠিক না-হলেও ঠিক। ডান হাতের গ্লাভস বাঁ হাতের গ্লাভস হবে। রাইট হ্যাণ্ডেড অবজেক্ট হবে লেফট হ্যাণ্ডেড অবজেক্ট।এই ছবির মধ্যেও কি তাই হয় নি? দেওয়ান সাহেব। আবার ছবিটি হাতে নিলেন। মিসির আলি বললেন, ছবিটি এসেছে অন্য মাত্রার এক জীবন থেকে। এই জন্যে ছবির এই পরিবর্তন।তুমি খুব ছোট জিনিস থেকে বড় সিদ্ধান্ত নিতে চাইছ।

এটা ঠিক নয়।ঠিক নয়?…….না। ছবিটির আরো সহজ ব্যাখ্যা আছে। কোনো বিশেষ কারণে মহিলারা সেদিন ডান কাঁধে শাড়ির আঁচল দিয়েছিলেন। বাঁ কাঁধেই শাড়ির আঁচল রাখতে হবে, এ-রকম কোনো আইন তো জাতীয় পরিষদে পাস হয় নি।তা হয় নি।অন্য একটা ব্যাখ্যাও দেয়া যায়।

এটা এটা সম্ভবত খুব সহজ কোনো ক্যামেরা-ট্রিক।ট্রিকটা তারা করবে কেন?….তোমার মতো পাগলদের উসকে দেবার জন্যে। দেখি, আরেকটা সিগারেট দাও, তোমার সঙ্গে বেশিক্ষণ থাকলে আমিও পাগল হয়ে যাব। বিদেয় হও।হচ্ছি।শোন মিসির।বল।কাল-পরশু একবার এসো, তোমার থিওরিটা নিয়ে আলাপ করব।

আলাপ করবার মতো কিছু কি আছে?……..না।তা হলে আসতে বলছ কেন? তোমার পাগলামি কথাবার্তা শুনতে ভালোই লাগে।মিসির আলি বললেন, তুমি আমার এই প্রশ্নটির জবাব দাও। যদি তিনটি লোক একটি ছাগলকে দেখতে পায়, তাহলে কি তুমি স্বীকার করবে ছাগলটির একটি অস্তিত্ব আছে? সে রিয়েল? …………হ্যাঁ, স্বীকার করব।

তিনটি মানুষ যদি একটি স্বপ্ন দেখে বা তিনটি মানুষ যদি একই চিন্তা করে, তাহলে সেই স্বপ্ন বা সেই চিন্তাকেও কি তুমি সত্য বলে স্বীকার করবো? না। চিন্তা কোনো বাস্তব বিষয় নয়। এটা হচ্ছে মাথার মধ্যে কিছু বায়োকেমিক্যাল রিঅ্যাকশন। তুমি কাল এসো। কাল তোমার সঙ্গে আলাপ করব।

সপ্তাহখানিক পরে আসব। এই এক সপ্তাহ আমি পড়াশোনা করব। কোথাও বেরুব না। প্রচুর বইপত্র জোগাড় করেছি। কূর্ট গডেল-এর সেই থিওরি বোঝবার চেষ্টা করব।ভালো কথা, পড়। তবে খেয়াল রাখবে, অল্পবিদ্যার অনেক সমস্যা নাপিত ফোঁড়া কাটতে পারে, সার্জেন চাকু হাতে নিতেও ভয় পায়।চাকু হাতে নিতে হলে–তোমার কাছে আসব।

আরেকটা কথা-তোমার বিষয় সাইকোলজি, নিজেকে সেখানে আটকে রাখলে ভালো হয়। পদার্থবিদ্যা নিয়ে চিন্তাভাবনাটা পদার্থবিদদের ওপর ছেড়ে দাও।মিসির আলি কঠিন একটা উত্তর দিতে গিয়েও দিলেন না। অ্যাকাডেমিক মানুষরা একচক্ষু হরিণের মতো হন। নিজের বিষয় ছাড়া অন্য কিছু বুঝতে পারেন না।

মুনির গত তিন দিন ধরে অফিসে আসছে না। আজ এক তারিখ। বেতনের ডেট। যারা অসুস্থ, তারাও এই দিনে উপস্থিত থাকে—বেতন নিয়ে চলে যায়। মুনির আজও এল না।নিজাম সাহেব সত্যি-সত্যি চিন্তিত বোধ করলেন। আজ অফিসে আসবার পথে বিনু বলেছে, বাবা, ওঁকে নিয়ে আসবে? মুনির সাহেবকে।

তিনি হাঁ-সূচক মাথা নেড়েছেন। বাসায় মুনিরকে আনার তাঁর কোনো ইচ্ছে নেই, কিন্তু খোঁজ নিশ্চয়ই নেয়া যেতে পারে এবং নেয়া উচিতও। ছেলেটিকে তিনি সত্যি-সত্যি পছন্দ করেন।অফিস থেকে ঠিকানা নিয়ে, তিনি সন্ধ্যার আগে আগে মুনিরের ঘরের দরজায় উঁকি দিলেন।তাঁর বিস্ময়ের সীমা রইল না। একটা মরা মানুষ যেন বিছানায় পড়ে আছে। বড়বড় করে শ্বাস নিচ্ছে।

তোমার কী হয়েছে?……….শরীরটা খুব খারাপ। রাতে-দিনে কখনো ঘুমাতে পারি না। ক্রমাগত নানান জায়গায় যাই! তোমার কথা বুঝলাম না। নানান জায়গায় যাও মানে? কোথায় যাও? না, যাই না কোথাও। শুয়ে থাকি।নিজাম সাহেব গায়ে হাত দিয়ে চমকে উঠলেন। অনেক জ্বর।ডাক্তার দেখিয়েছ? জ্বি না। ডাক্তার কিছু করতে পারবে না।

কী করে বুঝলে ডাক্তার কিছু করতে পারবে না?……..আমি জানি।পাগলের মতো কথা বলবে না। তুমি সবজান্তা নাকি? জ্বি, আমি সব কিছুই জানি।নিজাম সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। কী অদ্ভুত কথাবার্তা! সত্যি সত্যি কি পাগল হয়ে যাচ্ছে নাকি? বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে আছে! গায়ে আধময়লা একটা কাঁথা। ঘরে আলো নেই। অল্প যা আলো আসছে, তাতে মুনিরের মুখ অস্বাভাবিক ফ্যাকাসে লাগছে। কিন্তু চোখ দুটি উজ্জ্বল চকচক করছে।

বিনু কেমন আছে? ভালো আছে।ওকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে। নিজাম সাহেব হতভম্ব হয়ে গেলেন। এই ছেলে এসব কী বলছে। বিনুকে তার দেখতে ইচ্ছে করবে কেন? ও আমার সঙ্গে শুধু কষ্টই করেছে। বেশির ভাগ সময়ই ওকে আমি কষ্ট দিয়েছি। এতে আমার মন-খারাপ লাগে। আমি শুধু কাঁদি। ওকে আপনি বলবেন।

তুমি এসব কী বলছ?………..জ্বি? এসব কী কথাবার্তা তুমি বলছ? আমার ভুল হয়েছে। আর বলব না।তুমি এক দিন মাত্র গিয়েছ আমার বাসায়। বিনুর সঙ্গে তোমার কোনো পরিচয় থাকার কথা নয়।জ্বি-না। আমার সব কেমন গণ্ডগোল হয়ে গেছে। জট পাকিয়ে গেছে। আপনি কিছু মনে করবেন না।না না, ঠিক আছে! ডাক্তার দেখানো দরকার। অবহেলা করা ঠিক হবে না। চল আমার সঙ্গে।

কোথায়?………তোমাকে আমি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।জ্বি আচ্ছা। বিনুকে আপনি কি দয়া করে একটা কথা বলতে পারবেন? কী কথা? বলবেন যে, তার ধারণা ঠিক নয়। আমি তার ওপর কোনো অবিচার করি নি।আমি বলব। তুমি ঘুমাবার চেষ্টা কর।জ্বি আচ্ছা।মুনির সঙ্গে-সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল। গভীর গাঢ় ঘুম। নিজাম সাহেব দীর্ঘ সময় তার পাশে রইলেন। বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা বলে এলেন।

তারা এক জন ডাক্তার দেখিয়েছে। ডাক্তার বলেছে।–প্রেসার বেশি হই। কমপ্লিট রেস্ট নিতে হবে। নিজাম সাহেব এক জন ডাক্তার নিয়ে এলেন। সেই ডাক্তার অনেক ডাকাডাকি করেও মুনিরের ঘুম ভাঙাতে পারলেন না। অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করলে জ্বি বলে সাড়া দেয়, তারপর আর কোনো উত্তর করে না।

ডাক্তার সাহেব বললেন, ইনি কি আপনার আত্মীয়?…….জ্বি না। তবে আত্মীয়ের মতোই। ছেলেটিকে খুব স্নেহ করি। আমার অফিসেই কাজ করে।ড্রাগস খায় কি না জানেন? আপনার কথা বুঝতে পারলাম না।চোখের মণি খুব ছোট। আলো ফেললেও তেমন রেসপন্স করছে না। ড্রাগ এডিক্টদের এরকম হয়।

ড্রাগস নেয় কি না আপনি জানেন না?………..জ্বি-না।মনে হচ্ছে নেয়। ড্রাগসটা অসম্ভব বেড়ে গেছে। এটা খুব অল্প দিনেই বিরাট সামাজিক সমস্যা হিসেবে আসবে। আপনি বরং একে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিন। দেরি করবেন না। হাসপাতালে চেনা-জানা কেউ আছে? জ্বি-না।হাসপাতালে ভর্তি করাটাও তো তাহলে এক সমস্যা হবে।

নিজাম সাহেব অসাধ্য সাধন করলেন। রাত নটার মধ্যে মুনিরকে হাসপাতালে তুর্তি করিয়ে ফেললেন। এক জন অল্পবয়স্ক ডাক্তারের হাত ধরে সত্যি-সত্যি কেঁদে ফেললেন।….একটু দেখবেন ভাই। ছেলেটার কেউ নেই।দেখব, নিশ্চয়ই দেখব।খুবই দরিদ্র ছেলে।ধনীর যে-চিকিৎসা হবে, দরিদ্রেরও সেই একই চিকিৎসা হবে।ভাই, তা তো হয় না।হয়। আপনারা জানেন না।

আমরা ইন্টানি ডাক্তার হাসপাতাল আমরাই চালাই। ধনী-দরিদ্র নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। যখন বয়স্ক হব, প্রফেসর-ট্রফেসর হব, তখন হয়তো ঘামাব! এখনো আদর্শ বলে একটা ব্যাপার সামনে আছে।নিজাম সাহেব ডাক্তার ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরলেন।বাড়ি ফিরতে-ফিরতে তাঁর এগারটা বেজে গেল। উদ্বিগ্ন মুখে বিনু বারান্দায় দাঁড়িয়ে।

তার বাবা কখনো এত দেরি করেন না! আজ কোন করছেন? অ্যাকসিডেন্ট হয়। নি তো? বারবার বিনুর চোখে পানি এসে যাচ্ছে। বাবাকে দেখে সে সত্যি-সত্যি কেঁদে ফেলল, কোথায় ছিলে তুমি?……মুনিরের খোঁজে গিয়েছিলাম।আমি এদিকে ভয়ে অস্থির। ওঁকে পেয়েছিলে? নিজাম সাহেব ইতস্তত করে বললেন, না।বিনু দীর্ঘ সময় বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত গলায় বলল, মিথ্যা কথা বলছ কেন বাবা? নিজাম সাহেব মেয়ের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেন না।

মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।বাবা, উনি কি অসুস্থ? হ্যাঁ।কোথায় আছেন? হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়ে এসেছি।কী অসুখ?…..বুঝতে পারছি না। কী সব আবোল-তাবোল কথা বলছে।আমার এখানে যখন এসেছিলেন, তখনো আবোল-তাবোল কথা বলেছিলেন। আমি খুব রাগ করেছিলাম। নিজাম সাহেব অবাক হয়ে বললেন, এখানে এসেছিল নাকি? হ্যাঁ।কই, তুই তো আমাকে বলিস নি? উনি যে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে পড়ে আছেন, এটাও তো তুমি আমাকে বল নি।

নিজাম সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। কী বলবেন, বুঝতে পারলেন না। বাবা।কি? তুমি আমাকে একবার ওঁর কাছে নিয়ে যাবে?………নিজাম সাহেব চুপ করে রইলেন। বিনু বলল, আমি তাঁকে খুব কড়া-কড়া কথা বলেছি। আমার খারাপ লাগছে। হাত মুখ ধুয়ে এস, ভাত দিচ্ছি।নিজাম সাহেব ক্ষুধার্ত ছিলেন। কিন্তু কোনো খাবারই মুখে রুচল না। বারবার মনে হতে লাগল, বিনুর বিয়ে নিয়ে কোনো ঝামেলা হবে না তো? সে শেষ মুহূর্তে বেঁকে বসবে না তো? গায়ে-হলুদের আর মাত্র পাঁচ দিন আছে। আত্মীয়স্বজনরা আসতে শুরু করবে।

একটা কেলেঙ্কারি হবে না তো?………সারা রাত বিনু এক ফোঁটা ঘুমুতে পারল না। বারান্দায় মোড়া পেতে বসে রইল। তার কাছে সব কিছুই কেমন অর্থহীন মনে হচ্ছে একটা জটিল রহস্যের আবর্তে সে পড়ে গেছে, এ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ নেই। বারান্দা অন্ধকার। অনেক দূরে একটা স্ট্রীটল্যাম্প জ্বলছে। তার আলো যেন চারপাশের অন্ধকারকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

মিসির আলির কাছে একটি চিঠি এসেছে।এই কারণে তিনি অসম্ভব বিরক্ত। চিঠি না-খুলেই তিনি একপাশে ফেলে রেখেছেন। এখন বিরক্তি কমানের চেষ্টায় সুন্দর কিছু কল্পনা করার চেষ্টা করছেন। সুন্দর কোনো কল্পনাও মাথায় আসছে না।

তাঁর বিরক্তির মূল কারণ হচ্ছে, জটিল একটি বিষয় নিয়ে তিনি ভাবছিলেন। পিয়ন ঠিক এই সময় চিঠি নিয়ে এল। এবং এমনভাবে কড়া নাড়তে লাগল, যেন ভূমিকম্প হচ্ছে-এক্ষুণি সবাইকে ঘর থেকে বের করতে হবে। তিনি দরজা খুলে বললেন, কি ব্যাপার? স্যার, একটি চিঠি।রেজিস্ট্রি চিঠি? জ্বি-না।তাহলে এত হৈচৈ করছেন কেন? দরজার ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে দিলেই ঝামেলা চুকে যায়।

 

নিষাদ শেষ – পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.