• Wednesday , 25 November 2020

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ

পুষ্প নীচু গলায় বলল, বইটার মূল বিষয়টাই ভূলমূল বিষয়ই ভূল ? কি বলছ তুমি? 

ঐটি একটি প্রেমের উপন্যাসউপন্যাসের মূল বিষয় হল ভালবাসলে ভালবাসা ফেরত দিতে হয়আপনার বই এর চরিত্ররা তাই করেছেকিন্তু এমনতাে কখনাে হয় নামনে করুন একটা কালো, কুর্দশন মেয়ে প্রচণ্ড আবেগ নিয়ে একটি রূপবান ছেলেকে ভালবাসলসেই ছেলে কি তার ভালবাসা ফেরত দেবে? কখনাে না

আপনি লিখেছেন মানুষ হচ্ছে আয়নার মতভালবাসার আলাে সেই আয়নায় পড়লে তা ফিরে আসবেমানুষ আয়নার মত নাআমার চেয়ে আপনি তা অনেক ভাল করে জানেনএকটা ভুল কথা লিখেছেন কিন্তু এমন সুন্দর করে লিখেছেন যে পড়লে সত্যি মনে হয়মন অসম্ভব ভাল হয়ে যায়। 

মন ভাল হওয়াটাকে তুমি তুচ্ছ করছ কেন?ভুল কথা বলে মন ভাল করলে সেটাকে তুচ্ছ করা কি উচিত না? পুষ্প আমি আরেক কাপ চা খাব। 

পুষ্প উঠে গেলশওকত সাহেব চুপচাপ বসে রইলেন। 

পুষ্প চা নিয়ে ফিরে এল। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-১৬

তিনি বললেন, থ্যাংক ইউবলেই হাসলেনহাসিব অর্থ তুমি যা বলেছ শুনলামআমি রাগ করিনিকিন্তু তিনি যে রাগ করেছেন তা ঢাকতে পারছেন । 

স্যার আমি কি আপনার নাস্তা নিয়ে আসব?নিয়ে আস। 

মেয়েটিকে প্রচণ্ড ধমক দিতে ইচ্ছে হচ্ছেবলতে ইচ্ছা করছে শােন বােকা মেয়ে, আমি এই পৃথিবীটাকে যেমন দেখি, যেমন ভাবি তেমন করেই লিখিসত্যিকার পৃথিবীটা কেমন তা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেইসত্যিকার ছবি হচ্ছে ফটোগ্রাফীসাহিত্য ফটোগ্রাফী নয়, তৈলচিত্রসেই তৈলচিত্রে আমি কিছু রঙ বেশী ব্যবহার করেছিমানুষকে যেভাবে দেখতে ভালবাসি আমি সেইভাবে আঁকিযদিও জানি মানুষ সে রকম নয়আমি নিজেও তেমন নইকিন্তু আমার সে রকম হতে ইচ্ছে করেকাজেই আমি ধরে নিয়েছি অন্যদেরও তাই হতে ইচ্ছে করেআমি মানুষের ইচ্ছের ছবি এঁকেছি। 

এইসব কথার কিছুই বলা হল নাতিনি নিঃশব্দে নাশতা খেলেননাশতা শেষ করে লেখার টেবিলে গিয়ে বসলেনপুষ্প পেছনে পেছনে এল। 

কিছু বলবে পুষ্প

পুষ্প নরম গলায় বলল, আপনি আমার কথায় এতটা মন খারাপ করবেন আমি ভাবি নিআমি অতি সামান্য মেয়ে, আমার কথার কি গুরুত্ব আছে

নীল অপরাজিতা-পর্ব-১৬

আমার সহজে মন খারাপ হয় নাকঠিন আঘাতও আমি সহজভাবে গ্রহণ করতে পারি। কিন্তু এই বইটির ব্যাপারে আমার এক ধরনের স্পর্শকাতরতা আছেলেখক হিসেবে আমার আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়ে গিয়েছিলপ্রথম বইটি প্রকাশিত হবার পর তিন বছর একটি লাইন লিখতে পারিনিতারপর এই বইটি লিখলামলেখার পর মনে হল নিজের স্বপ্ন অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতা আমার আছেহােক না স্বপ্নটা মিথ্যা। 

আপনি নিজে যদি এটা বিশ্বাস করেন তাহলে আমার উপর এত রাগ 

করলেন কেন?” 

তােমার উপর রাগ করেছি কারণ তুমি আমাকে যা বলেছে তাও কিন্তু আমি বিশ্বাস করি। 

তা কেমন করে হয়

হয়একই সঙ্গে আমরা ভালবাসি, আবার যাকে ভালবাসি তাকে ঘৃণাও করিতুমি সম্ভবত এখনাে কারাে প্রেমে পড়নিপ্রেমে পড়লে বুঝতে পারতে। 

আপনি কি এখন লিখবেন?হ্যালেখার সময় আমি যদি পাশে বসে থাকি আপনি কি রাগ করবেন

আমি চাই না লেখার সময় কেউ আমার আশেপাশে থাকেলিখতে লিখতে প্রায়ই আমার চোখে পানি আসেএই দৃশ্য অন্যের কাছে হাস্যকর মনে হবারই কথা। 

তাহলে আমি যাই। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-১৬

আচ্ছা যাও ভাল কথা, তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছেYoung lady, you are sat. এখন যাও আমি লেখা শুরু করি। 

আজও কি দুপুরে খাবেন না

খাবএখানে খাবার আনতে হবে নাঠিক দুটার সময় আমি তােমাদের ঘরে আসব। 

বিকেলে কি আমার সঙ্গে মঠটা দেখতে যাবেন ? যাবসত্যি যাবেন? হ্যা, সত্যি যাব। 

মঠ ব্যাপারটা আসলে ইটের বিশাল স্থূপ| বােঝা যাচ্ছে এক সময় অনেক উচু ছিল, এখন ভেঙ্গে একাকার হয়ে আছেচল্লিশ পঞ্চাশ ফিটের মত উঁচুউপরে উঠার সিড়ি আছেমােফাজ্জল করিম সাহেবও সঙ্গে আছেনতিনিই সবচে অবাক হলেন, এইটা কি ব্যাপার? জিনিসটা কি

শওকত সাহেব বললেন, আপনি কখনাে আসেন নি

আসবাে না কেন? এই রাস্তায় কত আনাগােনা করেছিজঙ্গলের ভিতর কখনাে ঢুকি নাইঅবশ্য শুনেছি মঠের কথা। 

পুষ্প বলল, বাবা সিঁড়ি দিয়ে উঠলে কেমন হয়

করিম সাহেব আঁৎকে উঠলেন, পাগল হয়েছিস? এটা সাপের আড্ডাখানাতার উপর বর্ষাকালকাছে পিছেই বেশীক্ষণ থাকা উচিত না। 

শওকত সাহেব বললেন, জিনিসটা কি কেউ কি বলতে পারে ? দেখতে অনেকটা বাতিঘরের মতএই জায়গায় বাতিঘর থাকবে কেন? বৌদ্ধদের কিছু নাতাে

নীল অপরাজিতা-পর্ব-১৬

করিম সাহেব বললেন, নাএই অঞ্চলে কোন বৌদ্ধ নাইএরকম ভূপ কি একটাই না আরাে আছে

জানি না তােখোজ নেয়া যায়

অবশ্যই খোজ নেয়া যায়স্কুলে একটা নােটিশ দিয়ে দিলেই হবেদূর দূর থেকে ছেলেরা পড়তে আসে। 

তাহলে একটা নােটিশ দিয়ে দেবেন তাে? আমি খুবই অবাক হচ্ছিজঙ্গলের ভেতর এমন বিশাল ব্যাপার দেখব আশা করিনি বলেই বােধ হয় অবাক হচ্ছি। 

শীতকালে একবার আসবেন স্যারআমি সব পরিষ্কারটরিষ্কার করে রাখবশীতকালে জায়গাটা এম্নিতেও খুব সুন্দর হয়সােহাগী নদীর দুই ধারে কাশফুল ফোটেআহ দেখার মতচলেন স্যার, আজ ফেরা যাককাদায় মাখামাখি হয়ে গেছেন। 

চলুনআপনার জন্যে স্যার একটা ভাল খবর আছেবলুন শুনি। 

ওসি সাহেবকে বলেছিলাম একটা বজরার ব্যবস্থা করতেউনি খুবই করিঙ্কর্মা লােকব্যবস্থা করে ফেলেছেনসন্ধ্যার মধ্যে বজরা ঘাটে চলে আসবে। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-১৬

শওকত সাহেব অবাক হয়ে বললেন, বজরা দিয়ে আমি কি করব? বজরায় বসে লেখালেখি করবেনঘুরবেনআমি তাে ভাই রবীন্দ্রনাথ নাআমি যেখানে আছি ভাল আছিসেটা তাে স্যার রইলইবজরাও রইল। 

আগে আগে যাচ্ছেন করিম সাহেব, তার পেছনে শওকত সাহেবপূষ্প এবং নৌকার মাঝি সবার পেছনেপুষ্প নৌকার মাঝির সঙ্গে গল্প করতে করতে 

আসছেচুল দুবেণী করায় তাকে খুকীখুকী লাগছেআজ সে সুন্দর একটা শাড়ি পরেছিল। কাদায় শাড়ির অনেকখানিই নষ্টকাদার দাগ উঠবে বলে মনে হয় নাশওকত সাহেব লক্ষ্য করলেন, পুষ্প মাঝির সঙ্গে ময়মনসিংহের স্থানীয় ভাষায় টেনে টেনে কথা বলছেমাঝিমত করেই বলছেকরিম সাহেব যদিও তা করছেন নাভাষার ব্যাপারে তিনি যে খুব সাবধান তা বােঝা যাচ্ছে। 

করিম সাহেব বললেন, স্যার কি গােমাংস খান ? খাব না কেন?অনেকে খায় নাএই জন্যে জিজ্ঞেস করছিআমি লােক পাঠিয়েছিকোথায় লােক পাঠিয়েছেন

 

Read more

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ

Related Posts

Leave A Comment