পুফি পর্ব – ২ হুমায়ূন আহমেদ

পুফি পর্ব – ২

মেয়ে দুটির বয়স ষোল, সতেরো। দুজন যমজ বোন। আগে নাম ছিল হাবীব, হামিদা। সুলতানা নাম বদলে রেখেছেন, তুহিন—তুষার। এরা সারাক্ষণ সাজগোজ নিয়ে থাকে। মেয়ে দুটি জন্ম থেকেই রূপ নিয়ে এসেছে। সুলতানা ঘষে মেজে এদের প্রায় নায়িকা বানিয়ে ফেলেছেন। লাক্স চ্যানেল আই সুপার ষ্টারে পাঠালে থার্ড বা ফোরথ হয়ে যেতে পারে।অপরিচিত কেউ এলে সুলতানাকে জিজ্ঞেস করেন, এরা আপনার বোন নাকি?

সুলতানা চাপা আনন্দ নিয়ে বলেন, এই দুটাই আমার কাজের মেয়ে। এই তোরা হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? গেস্টকে চা দিবি না? গেস্ট খুবই লজ্জা পান। গেস্টদের লজ্জা সুলতানা উপভোগ করেন।সুলতানা রাতে যখন থাকেন না, তুহিন-তুষারকে রেখে যেতে শঙ্কা বোধ করেন। পুরুষ মানুষকে বিশ্বাস করা আর শকুন বিশ্বাস করা একই। শকুন মারা গরু দেখলে ঝাঁপিয়ে পড়বে। পুরুষও মেয়েমানুষ দেখলে ঝাঁপিয়ে পড়বে। মৃত মেয়ে মানুষ দেখলেও ঝাঁপ দিবে।

রাতের খাবার শেষ করে ছবি দেখতে বসে জোয়ারদার লক্ষ্য করলেন বিড়ালটা তার চেয়ার ঘেঁষে বসে আছে। ওই দিনের সেই বিড়াল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। একটা ছোট্ট প্ৰভেদ অবশ্য আছে। অনিকার বিড়ালটার ডান চোখের ওপর শাদা দাগ। এটার বা চোখের ওপর কালো শাদা। এমনকি হতে পারে এই বিড়ালটা অনিকার বিড়ালের যমজ? তুহিন তুষারের মত এরাও যমজ বোন। অনিকার বিড়ালের নাম পুফি। এটার নাম দেওয়া যেতে পারে কুফি।জোয়ারদার বললেন, এই কুফি। কুফি।বিড়াল ঘড়ি ঘড়ি শব্দ করল। নাম পছন্দ হয়েছে কী হয়নি বোঝা গেল না।

বিড়াল রহস্য নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে হবে। হুটহাট চিন্তায় কাজ হবে না। জোয়ার্দার ছবিতে মন দিলেন। মন বসছে না, তবুও জোর করে তাকিয়ে থাকা। ওয়েস্টার্ন ছবি। বন্দুক পিস্তলের ছড়াছড়ি। অনিকের ঘর থেকে হাসির শব্দ শোনা গেল! এই শব্দে জোয়ার্দারের শরীর প্রায় জমে গেল। হাসির শব্দ তাঁর পরিচিত। জামালের হাসি। অনেক দিন পর খালি বাড়ি পেয়ে জামাল এসেছে। মাঝখানে অনেক দিন তিনি জামালকে দেখেন। নি। হয়ত আজ আবার দেখলেন।তিনি এখন কী করবেন? ছবি দেখতে থাকবেন? নাকি উঠে পাশের ঘরে যাবেন? জোয়ারদার উঠে দাঁড়ালেন।জামাল বিড়ালটাকে নিয়ে খেলছে। টেনিস বল দূরে ছুড়ে মারছে। বিড়াল মাথা দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে বলটা জামালের কাছে নিয়ে আসছে। একেকবার বল আনছে আর জামাল বলছে, কুফি ভালো। কুফি ভালো।এমন কি হতে পারে জামাল যে জগৎ থেকে এসেছে, কুফিও সেই জগৎ থেকে এসেছ? কুফি এ পৃথিবীর কোনো বিড়াল না।

জোয়ারদার কাপা কাপা গলায় বললেন, জামাল।জামাল ফিরে তাকাল। জোয়ারৰ্দারের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে আবার খেলায় মগ্ন হয়ে গেল। জোয়ারদার দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে ছবি দেখতে গেলেন।ছবির মূল নায়ককে এখন ফাঁসিতে ঝোলানো হচ্ছে। ছবির মাঝখানে নায়ক ফাঁসিতে ঝুললে বাকি ছবি কিভাবে চলবে কে জানে?জোয়ারদার ছবিতে পুরোপুরি মন দিতে পারছেন না। জামালের হাসি তাকে বারবার চমকে দিচ্ছে।এর মধ্যে মোবাইল ফোন বাজছে। সুলতানা ফোন করেছেন। তার গলার স্বরে অপরাধী অপরাধী ভাব।সুলতানা বলল, এই কী করছ? ছবি দেখছি।কী ছবি? নাম বলতে পারব না। ওয়েস্টার্ন ছবি।ছবিতে এখন কী দেখাচ্ছে?

বারের দৃশ্য। দুজন মগভর্তি করে বিয়ার খাচ্ছে।বাচা একটা ছেলের হাসির শব্দ পাচ্ছি। সেও কি বারে? জোয়ার্দার ইতস্তত করে বললেন, হঁ।তোমাকে একটা জরুরি বিষয়ে টেলিফোন করেছি। রঞ্জু প্ল্যান চেঞ্জ করেছে।ও, আচ্ছা।রঞ্জু ঠিক করেছে কুমিল্লা যাবে না। সরাসরি কক্সবাজার যাবে। সাইমন হোটেলে বুকিং দিয়ে ফেলেছে। ওযে কেমন পাগল টাইপ তুমিতো জান।ভালো তো।সুলতানা বললেন, কয়েক দিন একা থাকতে হবে, তোমার কষ্ট হবে, সরি। আমি রাজি হতাম না। তোমার মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রাজি হয়েছি। সে যে কী খুশি৷ আমি মনে হয় তোমার ছবি দেখায় ডিসটার্ব করছি।হুঁ।তাহলে রাখি? আচ্ছা।

নিয়মের ব্যতিক্রম করে জোয়ার্দার পুরো ছবি দেখলেন। জামালের হাসির শব্দ এখনো পাওয়া যাচ্ছে। জোয়ার্দার ঘুমুতে গেলেন রাত ১২টায়।জামাল এখন বিড়াল নিয়ে বিছানায় উঠেছে। খেলার ভঙ্গি পাল্টেছে। জামাল বিড়ালের সামনে কোলবালিশ ধরছে। বিড়াল বালিশে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। নখ দিয়ে আঁচড়াচ্ছে। কোলবালিশ থেকে বের হওয়া তুলা ঘরময় ছড়ানো।জোয়ার্দার বিরক্ত মুখে বললেন, অন্য ঘরে যাও। আমি এখন ঘুমাব।জামাল সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকে নেমে পাশের ঘরে চলে গেল। বিড়ালটা গেল জামালের পেছনে পেছনে।

বিড়াল এবং জামালের বিষয়টা নিয়ে কারো সঙ্গে কথা বলা জরুরী। এটা তার মানসিক রোগ। এইটুকু বুঝার বুদ্ধি তার আছে। মানসিক রোগের কোনো ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলাই ভাল। তার পরিচিত একজন আছে ডাক্তার শায়লা। সে বেশ বড় ডাক্তার। বিলেত বা আমেরিকা থেকে ডিগ্ৰী নিয়ে এসেছেন। এখন এ্যাপোলো হাসপাতালের সাইকিয়াট্রি বিভাগের প্রধান।শায়লা তার দূর সম্পর্কের বোন।ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে যখন আই এস সি পড়তো তখন শায়লার জোয়ার্দারের সঙ্গে বিয়ে পাকাপাকি হয়। পানচিনি হয়ে যায়। পানচিনি হবার পরদিন দুজন মিলে ব্ৰহ্মপুত্ৰ নদীর পাশ দিয়ে পঁচিশ মিনিট হেঁটেছিলেন। শায়লা লজ্জায় মরে যাচ্ছিল। তাদের মধ্যে কোনো কথা হয়নি। কোন কথা না পেয়ে তিনি একবার বললেন, তোমার কি মিষ্টি পছন্দ?

নদীর পাড় দিয়ে হাঁটাহাটির পরদিন বিয়েটা ভেঙ্গে যায়।জোয়ার্দারের বড় মামা হৈচৈ শুরু করলেন। মেয়ে যার কাছে প্ৰাইভেট পড়ে তার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক। একবার সন্তান খালাস করিয়েছে। তার কাছে প্রমাণ আছে। ইত্যাদি।জোয়ার্দার নির্বিরোধী ভীরু মানুষ। বিয়ে ভেঙ্গে যাবের পর সে কিন্তু ভাল সাহস দেখালো। সে শায়লার সঙ্গে দেখা করলো এবং বলল, বড় মামা খামাখা হৈচৈ করছেন। এটা তার স্বভাব। তুমি কিছু মনে করো না। আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই। তুমি রাজি থাকলে চল কাজি অফিসে যাই বিয়ে করি।

শায়লা কঠিন গলায় বলল, না।পুরানো দিনের কথা মাথায় রেখে লাভ নেই। শায়লার কাছে যাওয়া যায়। তিনিতো তার প্রেমিকার কাছে যাচ্ছেন না। ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন।ডাক্তারের ওয়েটিং লাউঞ্জে খানিকটা লজ্জিত এবং বিব্রত মুখে জোয়ার্দার বসে আছেন। তার কোলে এক প্যাকেট মাতৃভান্ডারের রসমালাই। হাতে সবুজ রঙের কার্ড সেখানে ইংরেজীতে লেখা Please wait.

এর নিচে লেখা 17.

তিনি অপেক্ষা করছেন। হাসপাতাল হচ্ছে মশা মাছি মুক্ত এলাকা। কিন্তু তার রসমালাইয়ের প্যাকেটের উপর স্বাস্থ্যবান দুটা নীল মাছি উড়াউড়ি করছে। রুগীদের কেউ কেউ বিরক্ত হয়ে তার দিকে তাকাচ্ছে।রসমালাই সঙ্গে করে আনা মস্ত বোকামী হয়েছে। তিনি সৌজন্য সাক্ষাতে আসেন নি। ডাক্তারের সঙ্গে তাঁর রোগ নিয়ে পরামর্শ করতে এসেছেন।ডাক্তারের অ্যাসিস্ট্যান্ট জোয়ার্দারের দিকে তাকিয়ে বলল, রেডি হয়ে যান। নেক্সট আপনি।

জোয়ার্দার ভেবে পেলেন না রেডি হবার মানে কি। উঠে দাড়াতে হবে। দরজার সামনে যেতে হবে? ভিজিটের টাকা দিন। পনেরোশ টাকা। হাইট আর ওজন মাপুন। ব্লাড পেশার মাপুন।হাতে কি? মিষ্টির প্যাকেট।মিষ্টির প্যাকেট টেবিলে রেখে ওজন মাপুন। মিষ্টির প্যাকেট কার জন্যে? ডাক্তারের জন্যে। আপনারাও খাবেন।এসিসটেন্ট মুখ বিকৃত করে বলল, ডাক্তারের জন্যে আনবেন ভিজিট। মিষ্টি লাউ কুমড়া এইসব না।জ্বি আচ্ছা।এখন ঢুকে পড়ুন।

ডাক্তারের ঘরগুলি আলো ঝলমলে হয়। রুগীর চোখ মুখ দেখতে হয়।জিভ দেখতে হয়। অল্প আলোয় সম্ভব না। সাইকিয়াট্রিষ্টের ঘর বলেই হয়তো আলো কম। ডাক্তারী টেবিলের ওপাশে শায়লা বসে আছে। মানুষের চেহারায় বয়সের ছাপা পড়ে। জোয়ার্দার অবাক হয়ে দেখলেন শায়লার চেহারায় বয়সের কোনো ছাপ পড়ে নি। আগে রোগা পটকা ছিল এখন স্বাস্থ্যু ভাল হয়েছে। গায়ের চামড়া উজ্জ্বল হয়েছে। রঙিন স্কার্কে শায়লার মাথার চুল পেছন দিক থেকে বাধা। তাকে খানিকটা ইরানি মেয়ের মতো লাগছে। ডাক্তার শায়লা বললেন, আপনার নাম জোয়ার্দার?

জ্বি।কি প্রবলেম নিয়ে এসেছেন বলুন। গুছিয়ে বলার চেষ্টা করুন কিছু যেন বাদ না পড়ে। আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমাদের যখন গুছিয়ে কথা বলা দরকার তখন টেলিগ্রাফের ভাষায় কথা বলি। আর যখন সারা সংক্ষেপ বলা দরকার তখন পাঁচ শ, পৃষ্ঠার উপন্যাস শুরু করি। আপনি কিছু মনে করবেন। না। আমার ধুমপান করার অভ্যাস আছে। আমি সিগারেট টানতে টানতে আপনার কথা শুনিব। আপনার কোনো সমস্যা আছে?

জ্বি না।জোয়ার্দারের বুক থেকে পাথর নেমে গেছে শায়লা তাকে চিনতে পারে নি। চিনতে না পারারই কথা। অল্প বয়সেই তার চুল পেকেছে। মাথায় টাক পড়েছে।শায়লা সিগারেটে টান দিতে দিতে বললেন, চুপ করে আছেন কেন? সমস্যা বলুন।আমার ঘরে একটা বিড়াল ঢুকে।সমস্যা এই না। আরো আছে? এইটাই সমস্যা।ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকেন? জ্বি।একটা ফ্ল্যাট বাড়িতে বিড়াল ঢুকা সমস্যা হবে কেন? এরা খাদ্যের সন্ধানে ঢুকবে। আরামের সন্ধানেও ঢুকবে। বিড়াল আরাম পছন্দ করে। সে কি মাঝে মধ্যে আপনার পাশে আরাম করে শুয়ে হাই তুলে? জ্বি।যখন টিভি চলে। তখন টিভির দিকে তাকিয়ে থাকে? জ্বি।ব্যাপারটা যে খুবই স্বাভাবিক। আপনি বুঝতে পারছেন?

জ্বি।এমন যদি হতো বিড়ালটা টিভি দেখতে দেখতে টিভির নাটক নিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা শুরু করত তাহলে ছিল সমস্যা। তখন আমার কাছে আসার একটা অর্থ হতো। এখন আপনি এসেছেন। শুধু শুধু কিছু টাকা খরচ করবার জন্যে। চা বা কফি কিছু খাবেন। আমার এখানে চা-কফির ব্যবস্থা আছে।না।বিয়ে করেছেন নিশ্চয়ই? জ্বি।ছেলেমেয়ে কি? একটাই মেয়ে। নাম অনিকা। আমি এখন যাই?

না। আমি একটা সিগারেট শেষ করেছি। দ্বিতীয় সিগারেট ধরাব। সেটা শেষ করব তারপর যাবেন।জ্বি আচ্ছা।শায়লা দ্বিতীয় সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, হাস্যকর বিড়ালের গল্প নিয়ে আপনি আমার কাছে কেন এসেছেন। এখন আমি সেই ব্যাখ্যা করব। দয়া করে লজ্জা পাবেন না।আপনার খুবই ইচ্ছা করছিল আমার সঙ্গে দেখা করার। আপনি লাজুক মানুষ কোনো অজুহাত খুঁজে পাচ্ছিলেন না। বিড়ালের একটা গল্প অনেক চিন্তা ভাবনা করে বের করলেন। হয়েছে?

জোয়ার্দার মাথা নিচু করে থাকলেন। কিছু বললেন না। একবার ভাবলেন বলেন, বিড়ালের গল্পটা সত্যি। তারপর মনে হলো থাক।শায়লা বললেন, আপনি যে মনে করে আমার জন্যে রসমালাই নিয়ে এসেছেন। এতে আমি বেশ অবাক হয়েছি। রসমালাইয়ের অংশটা আমি ভুলে গিয়েছিলাম। আপনাকে নিয়ে ব্ৰহ্মপুত্রের পাড় ধরে হাঁটছি। লজ্জায় আমি অস্থির। হঠাৎ কথা নাই বার্তা নাই আপনি বললেন, তোমার কি মিষ্টি পছন্দ? আমি কোনো কিছু না ভেবেই বললাম, রসমালাই। রসমালাই কেন, কোনো মিষ্টিই আমার পছন্দ না।

জোয়ার্দার অস্বস্তির সঙ্গে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, শায়লা যাই? শায়লা হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে বললেন, আচ্ছা। আবার যদি কোনো কারণে আমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে বা আমাকে দেখতে ইচ্ছা করে, সরাসরি চলে আসবেন। বিড়ালের কাহিনী ফাদার কিছু নাই।আচ্ছা।সঙ্গে ট্রান্সপোর্ট আছে? ট্রান্সপোর্ট না থাকলে বলুন আমার গাড়ি পৌঁছে দেবে।জোয়ার্দার বললেন, লাগবে না।

প্রচন্ড অস্বস্থি নিয়ে জোয়ার্দার বাড়ি পৌঁছলেন। দরজা খুলে বাড়িতে ঢোকার পর অস্বস্থি কাটল। খালি বাড়ি। বসার ঘরে বাতি জুলছে। সোফায় বিড়ালটা শুয়ে আছে। তাকে দেখে একবার মাথা তুলে আবার আগের অবস্থায় চলে গেল। মনে হয়। ঘুমাচ্ছে। টিভিতে হিন্দি সিরিয়েল হচ্ছে। সিরিয়ালে লম্বা গলার একটা মেয়ে সুন্দর করে কাঁদছে। তার সামনে কঠিন চেহারার একজন যুবা পুরুষ। সে মেয়েলি গলায় কথা বলছে।টিভি কে ছেড়েছে? বিড়ালটা নিশ্চয়ই না। জামালের কান্ড। জামালের কথাটা শায়লার বলা উচিত ছিল। লাভ হতো না। বিড়ালের ব্যাপারটা শায়লা যে ভাবে উড়িয়ে দিয়েছে জামালেরটাও উড়িয়ে দিবে।জোয়ার্দার ডাকলেন, জামাল? জামাল জবাব না দিয়ে শোবার ঘরের মুখে এসে দাঁড়াল।কখন এসেছিস?

জামাল জবাব দিল না হাসল। জোয়ার্দার দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তোদের দুজনকে নিয়ে বিরাট দুঃশ্চিন্তায় আছি। দেখা যাবে শেষটায় আমি পাগল হয়ে যাব। আমাকে পাবনা পাগলা গারদে নিয়ে আটকে রাখবে। পাগলা পারদ চিনিস? জামাল না সূচক মাথা নাড়ল।জোয়ার্দার উঠে পড়লেন। তাঁকে রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। সহজ কোনো আইটেমে যেতে হবে। দুই মুঠ ভাত, এক মুঠ ডাল, এক চিমটি লবন আর একটা ডিম দিয়ে জাল। শেষটায় তেল দিয়ে বাগার।জোয়ার্দার রান্না বসিয়েছেন। তার পাশে জামাল দাঁড়িয়ে আছে। সে উৎসুখ চোখে দেখছে। বিড়ালটা খাবার টেবিলে শুয়ে ঘুমুচ্ছে।জোয়ার্দার জামালের দিকে তাকিয়ে বললেন, কিছু খাবি?

জামাল না সূচক মাথা নাড়ল। জোয়ার্দার পুফির দিকে তাকিয়ে বললেন, তুই কিছু খাবি? পুফি মাথা তুলে বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে আবার মাথা নামিয়ে নিলো।টিভির সামনে বসে জোয়ার্দার রাতের খাবার খাচ্ছেন। জামাল তার পাশে বসেছে। পুফি তার পায়ের কাছে। টিভিতে বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে। আগুন জ্বলিছে। পুরোহিত মন্ত্র পড়ে পড়ে আগুনে কি যেন দিচ্ছে। আগুন ধাপ করে বাড়ছে। আগুনের পাশে বসা স্বামী স্ত্রী দুজনই ভয় পেয়ে খানিকটা পিছাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখতে ভাল লাগছে।

মোবাইল টেলিফোন বাজছে। সিনেমাতেই মনে হয় বাজছে। একসময় বুঝা গেল সিনেমার না জোয়ার্দারের টেলিফোন বাজছে। তাকে উঠে টেলিফোন আনতে হলো না। পুফি লাভ দিয়ে উঠে দাতে কামড়ে ধরে টেলিফোন নিয়ে এলো। এইজাতীয় দৃশ্য বিদেশী সিনেমায় দেখা যায়। ঘরের বেড়াল খাওয়ানো এবং ঘুমানো ছাড়া কিছু করে না।টেলিফোন করেছে অনিকা।হ্যালো বাবা! বলতো আমরা কোথায়? কক্সবাজারে।হয় নি। দশে গোল্লা পেয়েছ। এখন আমরা সেন্টমার্টিন আইল্যান্ডে। মামা একটা জাহাজ ভাড়া করে আমাদের সেন্টমার্টিন নিয়ে এসেছে।মজা হচ্ছে মা?

খুব মজা হচ্ছে। এখন আমরা বার বি কিউ করছি। নাও মার সঙ্গে কথা বলো।সুলতানা বললেন, এই একটা ইন্টারেস্টিং খবর শোন, রঞ্জুর সেন্টমাটিনে একটা হোটেল আছে। নাম দিয়েছে Solid Rock সমুদ্রের পাশের বাড়ি নাম দিয়েছে Solid Rock, অদ্ভুত না? হুঁ।ওর কি চমৎকার চমৎকার আইডিয়া। সে যে সেন্টমাটিনে হোটেল বানিয়ে বসে আছে তাই জানতাম না। আমি এত অবাক হয়েছি। তুমি অবাক হও নি? হুঁ।এখন টেলিফোন রাখছি, পরে তোমার সঙ্গে কথা হবে মাংস পুড়ে যাচ্ছে। যাই।আচ্ছা আরেকটু ধর অনিকা কথা বলবে।অনিকা। কি খবর মা?

তোমাকে ছাড়া এসেছি তো বাবা এই জন্যে আমার বেশি ভাল লাগছে না।কয়েকদিন পরতো চলেই আসবে।বাবা শোনা। আমি ডাবের পানি দিয়ে গোসল করেছি।কেন? মা বলেছে ডাবের পানি দিয়ে গোসল করলে স্ক্রীন ব্ৰাইট হয়। এই জন্যে।তোমার স্ক্রীনতো এমিতেই ব্ৰাইট।আরো ব্ৰাইট হবে। আমি তখন চাঁদের মতো হয়ে যাবো। চাঁদের গা থেকে যেমন আলো বের হয় আমার গা থেকেও বের হবে।ভালোতো।

বাবা। আমি টেলিফোন রাখছি। মা ডাকছে। মাকে সাহায্য করতে হবে।জোয়ার্দার ঘুমুতে গেছেন। ঘুম যখন আসি আসি করছে তখন তাঁর মোবাইল বাজতে শুরু করেছে। তার মোবাইল ধরার কোনো ইচ্ছা ছিল না, পুফি কামড়ে মোবাইল নিয়ে এসেছে বলে অনিচ্ছায় ধরতে হলো।হ্যালো! কে বলছেন!আমার নাম করিম। আমি শায়লা ম্যাড়ামের এসিসটেন্ট। ম্যাডাম জরুরী ভিত্তিতে আপনাকে একটু দেখা করতে বলেছেন।আমার টেলিফোন নাম্বার কোথায় পেয়েছেন।আপনিইতো আমাকে দিয়েছেন। টাকা দিয়ে যখন রশিদ নিলেন তখন টেলিফোন নাম্বারা এড্রেস সব দিলেন।ও আচ্ছা।আপনার পক্ষে কি এখন আসা সম্ভব? আমি গাড়ি নিয়ে আসছি।

এখন সম্ভব না। আমি শুয়ে পড়েছি।আগামীকাল কি আসতে পারবেন? সকাল দশটা থেকে এগারটা এই সময় ম্যাডাম বাসায় থাকেন।কাল আমার অফিস আছে।তাহলে রাতে চেম্বারে আসুন।আচ্ছা।রাত নটার দিকে এলেই হবে। রাত নটার পর ম্যাডাম আপনার জন্যে ফ্রি রাখবেন।আচ্ছা।জোয়ার্দার ঘুমিয়ে পড়লেন। করিম তারপরেও অনেকক্ষণ হ্যালো হ্যালো করল।অফিস পাঁচটায় ছুটি হয়। চারটা বাজতেই চেয়ার খালি হতে শুরু করে। যারা চক্ষুলজার কারণে বসে থাকে তারা ঘন ঘন হাই তুলতে থাকে। ফাইলপত্ৰ সব তালাবদ্ধ। টেবিল খালি। খালি টেবিলে সত্যি সত্যি মাছি ওড়ে। মাছি মারার ব্যাপারে কাউকে তেমন উৎসাহী মনে হয় না।

আজ অফিস খালি হওয়া শুরু হয়েছে তিনটা থেকে, কারণ আগামীকাল বুদ্ধপূর্ণিমার ছুটি। তা ছাড়া আকাশে ঘনকালো মেঘ। ঝড় বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই বাসায় চলে যাওয়া ভালো।জোয়ার্দার সাহেব গভীর মনোযোগে ফাইলে চোখ বোলাচ্ছেন। আকাশ মেঘে অন্ধকার বলে ধাতি জ্বলিয়েছেন। খালেক ঘরে ঢুকে বলল, স্যার, যাবেন না? জোয়ার্দার অবাক হয়ে বললেন, কোথায় যাব? বাসায় যাবেন। আর কোথায় যাবেন?

পাঁচটা তো এখনো বাজে নাই।খালেক টেবিলের সামনে বসতে বসতে বলল, আকাশের অবস্থা দেখেছেন? বিরাট তুফান হবে। আগে আগে চলে যাওয়া ভালো।জোয়ার্দার কিছু বললেন না। খালেক বলল, স্যার, একটা রিকোয়েস্ট করব। যদি অনুমতি দেন।জোয়ার্দার হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লেন।খালেক বলল, আজ আমার সঙ্গে আমার বাসায় চলুন। রাতে খাওয়াদাওয়া করবেন, তারপর আমি নিজে পৌঁছে দিব।খালেককে অবাক করে দিয়ে জোয়ার্দার বললেন, আচ্ছা।স্যার, তাহলে দেরি করে লাভ নেই। উঠে পড়ুন।জোয়ার্দার বললেন, পাঁচটা বাজুক। অফিস ছুটি হোক।ঠিক আছে, বাজুক পাঁচটা। আমি ক্যান্টিনে আছি। আপনার জন্য চা নাশতা কিছু পাঠাব? না।প্রবল বৃষ্টির মধ্যে জোয়ার্দার লাল রঙের প্রাইভেট কারে উঠলেন। খালেক বলল, পেছনের সিটে আরাম করে বসুন। আমি ড্রাইভারের সঙ্গে বসছি।জোয়ার্দার বললেন, কার গাড়ি?

খালেক লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, আমার। মেয়ের স্কুল ডিউটি করতে হয়, এজন্য ধারাদেনা করে কিনে ফেলেছি। আমার স্ত্রী অবশ্যি এ গাড়িতে ওঠে না। তার ধারণা, এটা ঘুষের টাকায় কেনা। ইচ্ছা করলে আমার স্ত্রীর সঙ্গে আর্গুমেন্টে যেতে পারতাম। বলতে পারতাম, স্বামীর দায়িত্ব স্ত্রীর ভরণপোষণ। আমি সেই দায়িত্ব পালন করছি। কিভাবে করছি সেটা আমার ব্যাপার। তুমি আমার বিচারক না। আর্গুমেন্ট ঠিক আছে না। স্যার?

জোয়ার্দার জবাব দিলেন না। জানালা দিয়ে বাইরের বৃষ্টি দেখতে লাগলেন। ভাল বৃষ্টি নেমেছে। জানালার কঁাচে ধুমধাম শব্দ থেকে মনে হয়, শীলও পড়ছে।খালেকের ফ্ল্যাটবাড়ি ছবির মতো সুন্দর। বসার ঘরের টেবিলে। লাল টকটকে ফুলদানিতে ধবধবে সাদা গোলাপী। গোলাপের গন্ধে ঘর গন্ধময় হয়ে আছে। জোয়ার্দার বললেন, বাহ।

Leave a comment

Your email address will not be published.