প্রিয়তমেষু পর্ব:০৭ হুমায়ূন আহমেদ

প্রিয়তমেষু পর্ব:০৭

রকিব তিন দিন পর আজ প্রথম তার অফিসে এসেছে। চুপচাপ তার চেয়ারে বসে আছে। টেবিলের ফাইলপত্র খানিকক্ষণ নাড়াচাড়া করে রেখে দিল। তার মনে হচ্ছে সবাই তাকে অন্য রকম দৃষ্টিতে দেখছে। এখন পর্যন্ত কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে নি গত তিন দিন সে আসে নি কেন। অথচ এটা জিজ্ঞেস করা খুবই স্বাভাবিক।পাশের টেবিলে বসে আজিজ খাঁ। তার বিশেষ বন্ধু। সেও এখন পর্যন্ত কিছু জিজ্ঞেস। করছে না। রকিব নিজ থেকেই বলল, জ্বরে পড়ে গিয়েছিলাম। গোসল করে ফ্যানের নিচে শুয়েছি, ফট করে ঠাণ্ডা লেগে গেল। সকালেও জ্বর ছিল।আজিজ খাঁ তবু কিছু বলল না। অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। অথচ তার অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার কোন কারণ নেই। তার সমস্যার কথা এরা নিশ্চয়ই কিছু জানে না। কোনো পত্রিকায় কিছু ছাপা হয় নি। সব কটা পত্রিকা সে খুটিয়ে-খুটিয়ে পড়েছে। তা হলে সবাই এরকম করছে কেন? নাকি সবটাই তার মনের ভুল?

টিফিনের সময় এ. জি. এম. মনসুরউদ্দিন সাহেব তাকে ডেকে পাঠালেন। মনসুরউদ্দিন সাহেব ধমক না-দিয়ে অধস্তন কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেন না, এবং কাউকে বসতে বলেন না। কেউ যদি বসে পড়ে তিনি সরু চোখে তাকান। অথচ আজ তিনি রকিবকে ঘরে ঢোকামাত্র বসতে বললেন।রকিব সাহেব চা খাবেন? জ্বি-না স্যার।কাল তিনটার দিকে আপনাকে এক বার খোঁজ করেছিলাম।কাল আসি নি স্যার জ্বর ছিল। গোসল করে ফ্যানের নিচে শুয়েছিলাম, বুকে ঠাণ্ডা বসে গেছে।ও আচ্ছা! কী ব্যাপার স্যার? না, মানে অফিসিয়াল কিছু না।

এক ভদ্রলোক এসেছিলেন আপনার খোঁজে। আমার পরিচিত আর কি। ওনার কাছে শুনলাম।রকিবের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।রকিব সাহেব, আপনি কি কোনো পুলিশ কেইস করেছেন নাকি? রকিব হ্যাঁ, না কিছু বলল না।ভদ্রলোক ঐ ব্যাপারেই কথা বলতে এসছিলেন। মানে কোনো সেটেলমেন্টে আসা যায় কি না। অবশ্যি আপনিই ভালো বুঝবেন। আগে বলুন তো হয়েছেটা কি? কিছু হয় নি স্যার।ঐ ভদ্রলোকও তাই বলছিলেন। আমি ওনাকে আপনার বাসার ঠিকানা দিয়েছি। উনি ঠিক বাসায় যাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহী নন।উনি কে স্যার?

মিজান সাহেবের মামা হন সম্পর্কে। চৌধুরী খালেকুজ্জামান। ইণ্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট। আপনি বরং টেলিফোনে ওনার সাথে কথা বলুন। আমার কাছে একটা কার্ড আছে। এই নিন।রকিব হাত বাড়িয়ে কার্ডটা নিল। মনসুরউদ্দিন সাহেব হাসিমুখে বললেন, এই জন্যেই ডেকেছিলাম, অন্য কিছু না। আপনি খালেকুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলুন। বিশিষ্ট ভদ্রলোক। কোনো রকম সঙ্কোচ ছাড়া কথা বলবেন। খোলাখুলি কথা হওয়া ভালো। কি বলেন? জি স্যার।আমি বরং ওনার সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে দিই। আজ সন্ধ্যাবেলা বাসায় চলে যান। ব্যস্ত মানুষ তো. অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া দেখা হওয়া মুশকিল। তা হলে কি করব অ্যাপয়েন্টমেন্ট?

রকিব এমন ভাবে মাথা নাড়াল যার মানে হ্যা বা না দুই-ই হতে পারে। সে অফিসে চারটা পর্যন্ত বসে রইল। বিভিন্ন ফাইল খুলল এবং বন্ধ করল। চারটার পর সে বাসায় গেল না। পার্কের বেঞ্চিতে অন্ধকার হওয়া পর্যন্ত বসে রইল। পার্কের কাছেই খালেকুজ্জামান সাহেবের বাসা। হেঁটে হেঁটেই যাওয়া যায়। রকিবের একবার মনে হচ্ছে তার যাওয়া উচিত, ভদ্রলোক কি বলেন শোনা উচিত। আবার পর মুহূর্তেই মনে হচ্ছে, কেন সে যাবে? তার কিসের গরজ? রাত আটটা পর্যন্ত সে পার্কে বসে রইল। আটটার পর খালেকুজ্জামান সাহেবের বাসার সামনে উপস্থিত হল। বিশাল বাড়ি। গেট বন্ধ। খাকি পোশাক পরা দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছে। রকিব নিচু গলায় বলল, চৌধুরী সাহেব কি বাড়ি আছেন? জ্বি আছেন। দেখা করবেন?

না, দেখা করব না। এমনি জিজ্ঞেস করলাম।দারোয়ানের বিস্মিত দৃষ্টির সামনে রকিব লম্বা-লম্বা পা ফেলে বাসার দিকে রওনা হল। রাস্তায় বাতি নেই। হাঁটতে কেমন গা ছমছম করে। লোকজনের চলাচলও খুব কম। ঢাকা শহর বদলে যাচ্ছে। রাত নটার পর রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়।আকাশে মেঘ জমেছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বৃষ্টি নামলে খুব ঝামেলায় পড়তে হবে। ভিজতে-ভিজতে বাড়ি ফেরা। ঠাণ্ডা লেগে গেলে সর্বনাশ।বড় রাস্তায় ওঠার আগেই বৃষ্টির ফোঁটা দু-একটা পড়তে শুরু করল। কিছু-কিছু রিকশা আছে, তারা কোথাও যাবে না। যাবে না তো রিকশা নিয়ে বসে আছে কেন কে জানে। রকিব চায়ের দোকানে কিছুক্ষণ বসল। বৃষ্টি চেপে নেমেছে। ধরার কোনো লক্ষণ নেই।

তাকে বাড়ি ফিরতে হবে কাকভেজা হয়ে। তার কপালটাই খারাপ। অফিস থেকে সরাসরি বাসায় চলে এলে এই ঝামেলা হত না।বাসায় ফিরতে-ফিরতে রকিবের এগারটা বেজে গেল। বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়েছে। গলা বসে গেছে। ঢোক গিলতে কষ্ট হচ্ছে। সে বুঝতে পারছে প্ৰবল জ্বর আসছে। ঠাণ্ডা তার সহ্য হয় না। তার জীবনটা এমন কেন? যে-সব সহ্য হয় না বারবার সেসবের মধ্যে দিয়েই তাকে যেতে হয়।সে না হয়ে অন্য কেউ হলে একটা রিকশা পেয়ে যেত। সে বলেই পেল না। হেঁটে হেঁটে কাদায়-পানিতে মাখামাখি হয়ে এতটা পথ আসতে হল।

বাসা ঘন অন্ধকারে ড়ুবে আছে। পুরো অঞ্চলে ইলেকট্রিসিটি নেই। একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে পুষ্প বসে আছে। ভয়ে তার মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে আছে। কেন জানি মনে হচ্ছিল মিজান ছাড়া পেয়েছে। ছাড়া পেয়েই চলে এসেছে এখানে। দরজায় ধাক্কা দিয়ে হাসি-হাসি গলায় বলবে, ভাবি চিনতে পারছেন তো, অধমের নাম মিজান। রকিব যখন দরজায় ধাক্কা দিল, উঁচু গলায় বলল, দরজা খোল—তখনন তার পুরোপুরি বিশ্বাস হয় নি এটা রকিব। পুষ্প ভয়ে কাতর গলায় বলেছে, কে, কে? পল্টু ঘুমিয়ে পড়েছিল। পল্টুকে ধাক্কা দিয়ে জাগাল। যেন এই শিশুটিও মায়ের বিপদে পাশে এসে দাঁড়াবে।

দরজা খোল না। এই পুষ্প।পুষ্প দরজা খুলল। কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল, কোথায় ছিলে তুমি? ইস, কি অবস্থা হয়েছে। এরকম করে ভিজলে কেন? রকিব জবাব দিল না। বাথরুমে ঢুকে গেল। পুষ্প বলল, ভয়ে আমি মরে যাচ্ছিলাম। নিশাত আপারাও নেই সন্ধ্যা থেকে। বাসায় ইলেকট্রিসিটি নেই। তুমি কথা বলছ না কেন? ভাত গরম করব? রকিব সেই প্রশ্নের উত্তর দিল না।এ্যাই, কথা বলছ না কেন? ভালো লাগছে না তাই বলছি না। এসেই প্ৰেমালাপ শুরু করব নাকি? অবস্থাটা দেখছ না! ভাত বাড়ব?

না, পানি গরম কর। গোসল করব।পুষ্প গরম পানি এনে দিল একটামাত্র মোমবাতি, তাও শেষের দিকে চলে এসেছে। শেষ হলেই অন্ধকারে ঘর ঢেকে যাবে। প্রবল বর্ষণ হচ্ছে। শক্ত বাতাসও দিচ্ছে। আজ সারা রাত নিশ্চয়ই কারেন্ট আসবে না।আজ সকালবেলা নিশাত আপা এসেছিলেন। ওনার বোন আর দুলাভাই এসেছেন এই জন্যে তাঁরা কদিন ঐ বাড়িতে থাকবেন। কীরকম ভয়ের ব্যাপার না? ভয়ের কী আছে এর মধ্যে? এত বড় বাড়িতে আমরা একা। বাড়িওয়ালা তো নেই, শুধু তার ভাগ্নেটা আছে। ওকে দিয়েই মোমবাতি আনালাম।ভালো করেছ।গোসল শেষ হতে হতে মোমবাতি ফুরিয়ে গেল। রকিব বিরক্ত মুখে বলল, আর নেই মোমবাতি? না।একেকটা কাজ যা কর না! দুটো মোম আনতে কি অসুবিধা ছিল?

পুষ্প ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলল। এখন চুপ করে থাকাই ভালো। রকিব কোনো কারণে রেগে আছে। অফিসে কিছু হয়েছে বোধহয়। অফিসে কিছু হলেই সে কয়েক দিন রেগে থাকে। কথা বললেই রেগে যায়।পুষ্প ভাত খেল না। অন্ধকারে খাবে কীভাবে? সে অনেক দিন পর রকিবের পাশে নিজের বালিশ রাখল। এই কদিন তাদের দুজনের মাঝখানে বাবু ঘুমিয়েছে।নিশাত আপা বাবুর জন্যে খুব দামি একটা প্যান্ট আর শার্ট এনেছেন। দেখবে? অন্ধকারে দেখব কীভাবে? আমি বিড়াল নাকি? পুষ্প লক্ষ করল রকিবের গলা তরল হয়ে আসছে। সেই রাগীরাগী ভাবটা এখন নেই।তোমার গলার ব্যথাটা কমেছে?

না, এই ঘোড়ার ডিম আর কমবে না।মাথা টিপে দেব? ব্যথা করছে গলা, মাথা টিপে দিলে কী হবে? পুষ্প হেসে ফেলল। এই তো মানুষটা সহজ হয়ে গেছে।চা করে দেব? চা খাবে টোস্ট বিসকিট দিয়ে। রাতে কিছু খেলে না তো! খিদে লাগছে না? লাগছে।দেব করে? দাও, বরং চারটা ভাতই দাও। অন্ধকারে খাব কী করে? পুষ্প উঠে বসল। একটা হাত রাখল রকিবের গায়ে। তার মনে কিছু কথা জমে আছে, বলবে-বলবে করেও বলা হয় নি। এই অন্ধকারে বলে ফেললে কেমন হয়। আঁধার সেই কথাগুলি বলবার জন্যে বিশেষ একটা পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে।এই শোন, একটা কথা বলি?

বল।ঐ ঘটনার পর থেকে তুমি এক দিনও আমাকে আদর কর নি। আচ্ছা, আমাকে তোমার এখন ঘেন্না লাগে? না বল, আমি মন-খারাপ করব না। এখন কি আর আমার সঙ্গে ঘুমুতে ইচ্ছা করে না? রোজই তো ঘুমাচ্ছি।এই ঘুমের কথা বলছি না। আমাকে তোমার এখন ঘেন্না লাগে? আরে কী যে বল। মনমেজাজ ঠিক নেই। মাথার ঘায়ে কুত্তা পাগল অবস্থা। এখন কি এসব ভাল লাগে? ইচ্ছা করে ঘরবাড়ি ছেড়ে জঙ্গলে চলে যেতে।পুষ্প অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। বৃষ্টির বেগ আগের মতোই আছে। ঢাকা শহর মনে হচ্ছে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। পুষ্প অস্পষ্টভাবে প্রায় ফিসফিস করে বলল, আজ আমাকে একটু আদর করবে?

অসুখবিসুখের মধ্যে এইসব যন্ত্ৰণা ভালো লাগে? বলেই রকিব স্ত্রীকে টেনে নিল। গভীর আনন্দে পুষ্পের চোখে পানি এসে গেছে। তার মনে হচ্ছে পাশের মানুষটি ছাড়া পুষ্প আর কাউকে চেনে না। আর কেউ তার নেই। এই মানুষটি একটি কড়া কথা বললে সে ছাদ থেকে লাফিয়ে রাস্তায় পড়ে যাবে। এই মানুষটি…… পুষ্প আর ভাবতে পারছে না। জগৎ-সংসার দুলে উঠতে শুরু করেছে। কী অপূর্ব, কী রহস্যময় স্বামী-স্ত্রীর ভালবাসাবাসির এই গোপন সম্পর্ক।পুষ্প। উঁ।আমরা সুখেই আছি, তাই না? আমার একটা কথা শুনবে পুষ্প? কী কথা? বলছি। কিন্তু বল, তুমি শুনবে? হ্যাঁ।রকিব পুষ্পকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে এল। মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, তোমার ব্যাপারটা জানাজানি হোক এটা আমি চাই না পুষ্প। জানাজানি হলে কী হবে একটু ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখ। কী হবে?

খবরের কাগজে উঠবে। সবাই কেমন করে আমাদের দিকে তাকাবে। পল্টু বড় হয়ে জানবে। আত্মীয়স্বজনরা কানাকানি করবে।লোকটার শাস্তি হোক তুমি চাও না? চাইব না কেন? অবশ্যই চাই। হারামজাদাকে আমি গুণ্ডা লাগিয়ে খুন করার।পুষ্প হাসল। অন্ধকারে সেই হাসি রকিব দেখতে পেল না।তোমাকে কথা দিচ্ছি পুষ্প। প্রফেশন্যাল লোক লাগিয়ে কুত্তার বাচ্চাটার ভুঁড়ি নামিয়ে ফেলব।পুষ্প শান্ত গলায় বলল, আমি কী চাই জান? আমি চাই সবাই শয়তানটাকে দেখুক। সবার সামনে শয়তানটার কঠিন শাস্তি হোক, তারপর আমরা কোনট-এ। অচেনা জায়গায় চলে যাব। সেখানে কেউ আমাদের চিনবে না। কেউ কিছু জানবে না। আমরা নিজেরা-নিজেরা থাকব।অচেনা জায়গায় চাকরিটা আমাকে দেবে কে?

নিশাত আপা জোগাড় করে দেবেন। আমাকে বলেছেন। উনি সব ভেবে রেখেছেন। তিনি কী বলেছেন বলব? রকিব জবাব দিল না। পুষ্প আগ্রহ নিয়ে বলতে লাগল, নিশাত আপা বলেছেন তোমার জন্যে সিলেট চা-বাগানে একটা চাকরির ব্যবস্থা করবেন। নিশাত আপার শ্বশুর একটা চা-বাগানের মালিক। এখানে তুমি যা বেতন পাও, সেখানেও তাই পাবে। কি, কথা বলছ না কেন?তোমার নিশাত আপার এত দরদ কেন? মানুষের জন্যে মানুষের দরদ থাকবে না? পৃথিবীর সব মানুষই কি তোমার বন্ধুর মতো? ঐসব হচ্ছে মুখের কথা। চা-বাগানে চাকরি জোগাড় করবে? চাকরি এত। সোজা? নিশাত আপা করবে।আর করলেইবা সেই চাকরি আমি নেব কেন? দয়া-দেখানো চাকরি। ঐসবের কোনো ভবিষ্যৎ আছে?

ভবিষ্যৎ নাই-বা থাকল। নিরিবিলি একটা জায়গায় না হয় নতুন করে জীবন শুরু করলাম।পুষ্প গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে, রকিব কিছু বলছে না।বৃষ্টির জোর কমে আসছে। জানালা গলে হিম-শীতল বাতাস ঢুকছে। মশারি নৌকার পালের মত ফুলে-ফুলে উঠছে।পল্টু জেগে উঠেছে। অন্ধকার দেখে কাঁদছে। পুষ্প কিছু বলছে না। যেন তার ছেলের কান্না শুনতে পাচ্ছে না।নিশাতের মনে হল আজ কোনো কারণে জহির রেগে আছে। জহির খুব সহজে রাগ আড়াল করে রাখতে পারে। প্রচণ্ড রাগ নিয়েও সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলতে পারে, হাসতে পারে। বিয়ের প্রথম-প্রথম ব্যাপারটা সে বুঝতে পারে নি। এখন পারে। চেহারা দেখে বলে দিতে পারে জহির রেগে আছে কি রেগে নেই।

এখন যেমন পারছে। তবে রাগের কোনো কারণ নিশাত ধরতে পারছে না। গত কাল অনেক রাত পর্যন্ত তারা ও-বাড়িতে ছিল। জহির খুব আগ্রহ নিয়ে দুলাভাইয়ের সঙ্গে গল্প করেছে। দুলাভাইয়ের অতি তুচ্ছ রসিকতাতেও খুব শব্দ করে হেসেছে। জহিরের জন্যে ব্যাপারটা খুবই অস্বাভাবিক। তবে বোঝা গেছে সে খুব আনন্দে আছে। আজ এই অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই কী হল? অফিসে কোন গণ্ডগোল হয়েছে? অফিসের গণ্ডগোলে বিচলিত হবার লোক তো জহির নয়।নিশাত নিজ থেকে কিছু জিজ্ঞেস করল না। স্বামীকে লক্ষ করতে লাগল দূর থেকে।

জহির অফিসের কাপড় ছেড়ে হাত-মুখ ধুয়ে বারান্দায় চা খেতে এল। এটা তার রুটিন। পরপর দু কাপ চা নিঃশব্দে খাবে। কোনো রকম কথা বলবে না। চোখের সামনে থাকবে খবরের কাগজ কিংবা কোনো গল্পের বই। আজ রুটিনের ব্যতিক্রম হল। জহির চায়ের কাপে চুমুক দিতে-দিতে বলল, বাবার চিঠি পেলাম। আগামাথা কিছু বুঝতে পারছি না। নিশাত, তুমি একটু পড়ে দেখবে? নিশাত বলল, যে-চিঠির আগামাথা তুমি বোঝ নি, আমি কী করে বুঝব? আমার কি এত বুদ্ধি?

বাবা লিখেছেন, তুমি নাকি তাঁর কাছে একটা চাকরি চেয়েছ। চা-বাগানের চাকরি।আমার নিজের জন্যে না, অন্যের জন্যে।কার জন্যে জানতে পারি? পার। পুষ্পের স্বামীর জন্যে। ঘটনা প্রকাশ হয়ে গেলে ও বেচারা থাকতে পারবে। না। নিরিবিলি কোন জায়গায় তাদের চলে যেতে হবে।জহির কথা বলছে না। চায়ের কাপেও চমক দিচ্ছে না। সে রাগ সামলাবার চেষ্টা করছে। শেষ পর্যন্ত সামলাতে পারবে কি না কে জানে। নিশাত বলল, তোমার চা কিন্তু ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।জহির চায়ের কাপে ছোট্ট একটা চুমুক দিয়ে কাপ সরিয়ে রাখল। নিচু গলায় বলল, তোমার কি মনে হয় না, তুমি সমস্ত ব্যাপারটা নিয়ে একটু বাড়াবাড়ি করছ?

না, তা মনে হয় না।আমার কিন্তু মনে হচ্ছে।মনে হলে কিছু করার নেই।ব্যাপারটা তুমি কি ভুলে যেতে পার না? অনেক কিছু তো করলে, আর কেন? আমি কিছুই করি নি। চিঠিটা পড়ে দেখি।আমার কোটের পকেটে আছে।নিশাত উঠে চিঠির খোঁজে ভেতরে গেল। চিঠি নিয়ে এসে আবার বসল জহিরের – সামনে। মানুষটা কী কঠিন দৃষ্টিতে তাকে দেখছে। সেই দৃষ্টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সে খাম খুলল।নিশাত ভেবে পাচ্ছে না তার চিঠির উত্তরে উনি জহিরকে কেন লিখবেন। চাকরি কি দিতে পারবেন না? এই কথা সরাসরি জানাতে সঙ্কোচ করছেন?

শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে নিশাতের সম্পর্ক খুব ভালো নয়। ওদের সবই যেন কেমন আলগা-আলগা। নিশাতের শ্বশুর ইসমাইল সাহেব দশ মিনিট কখনন কারো সঙ্গে কথা বলেন না। নিশাতের সঙ্গে কথাবার্তা হ্যা-র মধ্যে রেখেছেন। তবে জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, নববর্ষ—এইসব উপলক্ষে লোক মারফত একটা বড় প্যাকেট এসে। উপস্থিত হয়। সঙ্গে ইংরেজিতে একটা নোটার সারমর্ম, এই আনন্দ তোমার জীবনে অক্ষয় হোক।জহিরের কাছের চিঠিটিও ইংরেজিতে লেখা। টাইপ করে পাঠিয়েছেন। এই চিঠিরও নিশ্চয়ই কয়েকটি কপি আছে, ফাইল কপি, অফিস কপি। নিশাত চিঠি পড়ল–

প্রিয় জহির,

নিশাত সম্প্রতি আমার কাছে চা-বাগানের একটি চাকরি চেয়ে চিঠি দিয়েছে। চাকরি কার জন্যে এবং সেই চাকরিপ্রার্থীর অভিজ্ঞতা কী তা লেখে নি। আমি নিজে যাচাই না করে কাউকে চাকরি দিই না। তবে নিশাতের জন্যে একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তোমার স্ত্রীকে আমি খুব পছন্দ করি। তার অনুরোধ নিশ্চয়ই রাখব। তোমাকে এই চিঠি লেখার কারণ হচ্ছে তুমি আমাকে চাকরিপ্রাথী সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য দেবে। সে যেন চা-বাগানে চাকরি চেয়ে একটি দরখাস্ত করে। দরখাস্ত অবশ্যই যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হতে হবে। তোমার কাছ থেকে চিঠি। পাবার পর আমি নিশাতকে চিঠি দেব।

ইতি

মোহাম্মদ ইসমাইল।

কাজের চিঠি। তুমি কেমন আছ জাতীয় একটা বাক্য পর্যন্ত নেই। যেন চিঠিটা কোনো মানুষের লেখা নয়, যন্ত্রের লেখা। নিশাত তাকাল জহিরের দিকে। রাগের কঠিন ভঙ্গিগুলি এখন আর জহিরের চেহারায় নেই। সে নিজেকে সামলে ফেলেছে। এখন সে বেশ সহজ ভঙ্গিতে কথা বলবে, যেন দু জনের মধ্যে কখনো কিছু হয় নি।

জহির খবরের কাগজ ভাঁজ করে রেখে হাসিমুখে বলল, চিঠি পড়লে? হ্যাঁ।পরে এই চিঠির ব্যাপার নিয়ে আলাপ করব। এখন বল তোমার প্রোগ্রাম কি? আমার প্রোগ্রাম দিয়ে কী করবে? তোমার দুলাভাই সবাইকে নিয়ে বড় কোন জায়গায় খেতে চান। নির্ভর করছে। তোমার প্রোগ্রামের উপর। যা ব্যস্ত তুমি। আজ সন্ধ্যায় সময় হবে?

হবে।ভালো। তোমার দুলাভাই মানুষটি খুব চমৎকার। আমার খুব পছন্দ হয়েছে।আর আমার বোন? তিনি তোমার মতোই।আমার মতো বলতে কী মিন করছ? আমি মন্দ না ভালো। কখনো-কখনো ভালো। কখনো মন্দ।উদাহরণ দাও। আমি কখন ভালো কখন মন্দ।কারো সাতে-পাঁচে থাক না। নিজের মতো জীবন যাপন কর। এটা খুব ভালো। আবার কোনো-কোনো ক্ষেত্রে বাইরের জিনিস নিয়ে মাতামাতি কর, এটা মন্দ।পুষ্পের ব্যাপারটার কথা বলছ? হ্যাঁ।এই ঝামেলা এক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে, স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের কেইস। খুব দ্রুত হয়। পুলিশ আজকালের মধ্যে চার্জশিট দিয়ে দেবে। বাকি রইল শুধু এক জন। ভালো উকিল।পাও নি এখনো?

পেয়েছি, আজ কথা হবে।জহির মুখ নিচু করে হাসছে। নিশাত বলল, হাসছ কেন? হাসির কী বললাম? তোমার দুলাভাই বলছিলেন, তোমার কিছু করবার নেই, তাই বাইরের যন্ত্রণা নিয়ে মাতামাতি করছ। তোমার দু-একটা ছেলেপুলে থাকলে এটা করতে না। আমাকে এই লাইনে কিছু সৎ পরামর্শ দিলেন।পরামর্শ তোমার মনে ধরেছে? হ্যাঁ। চল একটা বাচ্চাকে পৃথিবীতে নিয়ে আসি।নিশাত বাইরের দিকে তাকাল। কী চমৎকার একটা কথা বলেছে—একটা বাচ্চাকে পৃথিবীতে নিয়ে আসি। একমাত্র বাবা এবং মা এই দুজনে মিলেই অদৃশ্য, অচেনা, রহস্যময় জগৎ থেকে একটা শিশুকে পৃথিবীতে নিয়ে আসেন।কী ব্যাপার নিশাত, এরকম অবাক হয়ে তাকিয়ে আছ কেন? তোমার মত নেই?

নিশাত কোমল স্বরে বলল, আমার মত আছে।বলেই তার কেমন যেন লজ্জা লাগল। চোখমুখ লাল হয়ে উঠল। লজ্জা ঢাকার জন্যে উঠে বারান্দায় চলে গেল। খুব ইচ্ছা করছে পুষ্পের বাচ্চাকে ধরে এনে কিছুক্ষণ আদর করতে। সময় নেই। উকিলের খোঁজে যেতে হবে। সরদার এ. করিম। ক্রিমিন্যাল আইনের ওস্তাদ লোক। তার হাতে এক বার ব্যাপারটা তুলে দিতে পারলে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়।নিশাত! কি?তোমার গোলাপের উবগুলির অবস্থা দেখছ? সবগুলি গাছে পোকা ধরেছে। গত সপ্তাহে তুমি ইনসেকটিসাইড দাও নি, তাই না?

 

Read more

প্রিয়তমেষু পর্ব:০৮ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.