Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

শের খাঁ যদি সাপও হয় সেই সাপ এখন গর্তে ঢুকছে । সাপ গর্তে ঢোকে সোজা হয়ে ঢোকে ।

বৈরাম খাঁ বললেন, সাপ যখন গর্ত থেকে বের হয় তখন কিন্তু আবার একেবেঁকেই চলে ।

এই সাপ সহজে গর্ত থেকে বের হবে না ।

বৈরাম খাঁ ক্লান্ত গলায় বললেন, শের খাঁ ছাড়াও চিন্তিত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে । আপনার ভাই কামরান মীর্জা নিজের নামে খুৎবা পাঠ শুরু করেছেন । নিজের নামে স্বর্ণমুদ্রা বের করেছেন ।

সম্রাট বললেন, এটি কামরানের শিশুসুলভ কার্য । শিশুদের সব কাজ গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে নেই । যথাসময়ে সে ক্ষমা প্রার্থনা করবে । এবং আপনি তাঁকে ক্ষমা করে দেবেন ?

হ্যাঁ ।

আপনার আরেক ভ্রাতা হিন্দাল মীর্জাকে রসদের জন্যে পাঠানো হয়েছিল । তিনি কুড়ি হাজার অশ্বরোহী সৈন্য নিয়ে রসদ সংগ্রহ বের হয়ে আর ফিরে আসেন নি । খবর পাওয়া গেছে তিনি দিল্লীর দিকে অগ্রসর হচ্ছেন । মনে হচ্ছে তাঁর ও দিল্লীর সিংহাসনে বসার বাসনা ।

বৃদ্ধকে সম্মান করো, এই সম্মান তাঁর অভিঙ্গতার কারণে,

যুবককে সমীহ করো, এই সমীহ তার তারুণ্যের কারণে,

শিশুকে ভালোবাসো, এই ভালোবাসা তার শিশুসুলভ কর্মকাণ্ডের

জন্যে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

বৈরাম খাঁ বিরস গলায় বললেন, প্রতিটি শের কবির ব্যক্তিগত ধ্যানধারণার ফসল । ব্যক্তিগত কোনো কিছুই সর্বজনীন হতে পারে না । যাই হোক, আমি হস্তীশাবকের স্নান দেখার জন্যে আসি নি । আমি শের খাঁর কাছ থেকে একটি পত্র পেয়েছি । পত্রটি আপনাকে পড়ে শোনানোর জন্যে এসেছি । সম্রাটের অনুমতি পেলে পত্রটি পড়তে চাই ।

পড়ুন ।

বৈরাম খাঁ পত্রটি পড়লেন

সিংহের চেয়ে সাহসী, দিল্লীর সূর্য সম্রাট হুমায়ূনের

প্রিয়ভাজন, বৈরাম খাঁ ।

আমার অভিনন্দন এবং সালাম ।

আপনি ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই অবগত হয়েছেন

যে, সন্ধির সকল শর্ত মেনে আমি আমার বাহিনী

নিয়ে দূরে সরে গেছি । আমার পুত্র সাইফ খাঁকে

নির্দেশ দিয়েছি সে যেন সম্রাটের সঙ্গে দিল্লী যাত্রা

করে ।

আমি যে-কোনো এক শুভদিনে সম্রাটের সামনে উপস্থিত হব । তাঁর পদচুম্বনের দুর্লভ

সুযোগের আশায় কালযাপন করছি ।

এক্ষণ, আপনাকে পত্রদানের কারণ ব্যাখ্যা

করি । আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে,

ঝাড়খণ্ডের দলপতিদের চোরাগোপ্তা হামলায় আমি

বিপর্যস্ত ।

সম্রাট হুমায়ূনের দীন সেবক হিসেবে এবং দিল্লীর সিংহাসনে প্রতি অতি অনুগত ভৃত্য হিসেবে

আমি কি আপনার কাছ থেকে কিছু পরামর্শ পেতে

পারি ?

ঝাড়খণ্ডের দলপতিদের কীভাবে সমুচিত জবার

দেওয়া যায়-এই বিষয়ে পরামর্শ ।

সম্রাটের অনুমতি সাপেক্ষে আপনি যদি রাজি

থাকেন তাহলে আপনাকে সসম্মানে আমার তাঁবুতে

আনার ব্যবস্থা আমি করব ।

পত্রের উত্তরের অপেক্ষায় থাকলাম ।

ইতি

আপনার গুণমুগ্ধ,

মোঘল সম্রাট হুমায়ূনের দীন সেবক,

শের খাঁ

সম্রাট বললেন, পত্রের কী জবাব দেবেন বলে ঠিক করেছেন ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

বৈরাম খাঁ বললেন, আপনি যে জবাব দিতে বলবেন আমি সেই জবাবই দেব ।

আমি মনে করি শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে আপনি শের খাঁ’র সঙ্গে দেখা করতে পারেন ।

আপনার যদি এরকম নির্দেশ হয় আমি যাব । এখন আপনার অনুমতি নিয়ে আমি তাঁবুতে ফিরে যেতে চাই । বাংলা মুলুকের প্রচণ্ড তাপে আমি বিপর্যস্ত বোধ করছি ।

সম্রাট বললেন, আপনি নিজের তাঁবুতে ফিরে যান । বিশ্রাম করুন । বৈরাম খাঁ তাঁবুতে ফিরেই শের খাঁ’র পত্রের জবাব দিলেন ।

সেখানে লিখলেন,

পাঠানদের প্রতিনিধি

শের খাঁ,

আপনার পত্র পাঠ করেছি । আমার পক্ষে

কোনোক্রমেই সম্রাট হুমায়ূনকে একা ফেলে আপনার কাছে যাওয়া সম্ভব না ।

ক্ষমাপ্রার্থনাপূর্বক

বৈরাম খাঁ

দিন বৃহস্পতিবার । সময় সুবেহ্ সাদেক ।

শের খাঁ তার দুই পুত্র এবং প্রধান সেনাপতি খাওয়াস খাঁকে নিয়ে গোপন বৈঠকে বসেছেন । শের খাঁ বললেন, আজ মধ্যরাতে আমরা মোঘল বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ব । কারও কিছু বলার আছে ?

কেউ জবাব দিল না । খাওয়াস খাঁ বললেন, আজকের রাতটা কি বিশেষ কারণে ঠিক করা হয়েছে ?

শের খাঁ বললেন, হ্যাঁ । আমরা মুসলমানরা ‍দিনগণনা করি চন্দ্র দেখে । সেই হিসাবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবারের শুরু শুক্রবারে মুসলমানরা যুদ্ধযাত্রা করে না । মোঘল বাহিনী নিশ্চিত মনে ঘুমাবে । আমরা মুসলমান হয়েও ঝাঁপিয়ে পড়ব ।

খাওয়াস খাঁ বললেন, দিন নির্ধারণ ঠিক আছে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

শের খাঁ বললেন, মোঘল বাহিনী সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত হবে এই বিষয়ে আমি একশত ভাগ নিঃসন্দেহ । ইম ঝাড়খণ্ডের দলপতির নামে একটা মিথ্যা গল্প তৈরী করেছি ।বারবার তার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেছি । মোঘলরা তা বিশ্বাস করেছে । আমাদের দুটা লাভ হয়েছে । এক. মোঘলদের বিশ্বাস অর্জন । দুই. দ্রুত যুদ্ধযাত্রা করার অনুশীলন ।

শের খাঁ’র পুত্র সাইফ খাঁ বলেলেন, বারবার ঝাড়খণ্ডের দলপতির বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা যে একটি অনুশীলনের অংশ তা আমি আগে বুঝতে পারি নি ।

শের খাঁ বললেন, এখন আমি কিছু কঠিন নির্দেশ দেব । এইসব নির্দেশ অক্ষরে পালন করতে হবে ।

প্রথম নির্দেশ

সম্রাট হুমায়ূনকে কোনো অবস্থাতেই হত্যা বা গ্রেফতার করা যাবে না । তাঁকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে ।

শের খাঁ’র পুত্র জালাল খাঁ বললেন, আপনার এই নির্দেশের পেছনে কারণ কী ?

শের খাঁ বললেন, একটিই কারণ । মানুষ হিসেবে আমি সম্রাট অত্যন্ত পছন্দ করি । আমি আমার ‍দিক থেকে তাঁর কোনো অমঙ্গল হতে দেব না ।

দ্বিতীয় নির্দেশ

সম্রাটের পরিবারের সমস্ত নারী ও শিশু এবং তাঁর

হেরেমের নারীদের কোনোরকম অসম্মান বা ক্ষতি

করা যাবে না ।

তৃতীয় নির্দেশ

যে-কোনো মূল্যে বৈরাম খাঁকে হত্যা করতে হবে ।

বৈরাম খাঁ সিংহের মতো সাহসী আবার শৃগালের

চেয়েওর ধূর্ত । বৈরাম খাঁ বিহীন হুমায়ূন কোনো

শক্তিই না ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

শের খাঁ বললেন, এখন খাওয়াস খাঁ’র দায়িত্ব হলো বিশাল সেনাবহিনী নিয়ে ঝাড়খণ্ডের চেরুহ দলপতির বিরুদ্ধে মিথ্যা যুদ্ধযাত্রা করা । সম্রাট হুমায়ূন যেন খবর পান আপনি দলপতিকে শায়েস্তা করতে যাচ্ছেন-আমি সেই ব্যবস্থা করব । আপনি সন্ধ্যা নামার পর ফিরে আসবেন ।

খাওয়াস খাঁ বললেন, আমি কি এখনই যাত্রা করব ?

শের খাঁ বলেলেন, এই মুহূর্তে ।

ভোরবেলা নাশতা খেতে হুমায়ূন শুনলেন, শের খাঁ’র বিশাল বাহিনী খাওয়াস খাঁ’র নেতৃত্বে চেরুহ দলপতির বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেছে ।

হুমায়ূন দুঃখিত গলায় বললেন, শের খাঁ বেচারা ভালো ঝামেলায় আছে ।

সারাটা ‍দিন সম্রাটে আনন্দে কাটল । তিনি তাঁর কন্যা আকিকা বেগমের সঙ্গে পাশা খেললেন । আকিকা বেগম পাশা খেলায় পিতাকে হারিয়ে দিলেন । সম্রাট কন্যার কাছে হেরে প্রভৃত আনন্দ পেলেন। তিনি একটি শের আবৃত্তি করলেন । এই শেরটির ভাবার্থ-

সেই ব্যক্তিই সৌভাগ্যবান যে বুদ্ধিতে নিজ পুত্র-কন্যার

হাতে পরাস্ত হয় ।

আকিকা বেগম বলল, বাবা, আমি তোমাকে বুদ্ধিতে হারাই নি ।

পাশার দানে হারিয়েছি ।

হুমায়ূন হাসতে হাসতে বললেন, একই ব্যাপার ।

অম্বা মেয়েটির সঙ্গেও কিছু কথা বললেন । হুমায়ূন বললেন, আমার এখানে তুমি কি সুখে আছ ?

অম্বা বলল, মহা সুখে আছি । আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে চাই । এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত । আরও চিন্তা করো । সম্রাট দুপুরে আচার্য হরিশংকরের সঙ্গে বসলেন । তাঁর অনুবাদ শুনলেন । সর্বমোট দশ পৃষ্ঠা অনুবাদ হয়েছে । সম্রাট আচার্যকে দশটি রৌপ্যমুদ্রা দিলেন ।

মাগরেবের নামাজের পর কোনোরকম খবর না দিয়ে সম্রাট উপস্থিত হলেন জেনানা তাঁবুতে । মহিলারা অভিভূত । অনেকদিন তাঁরা সম্রাটের দর্শন পায় না ।

হুমায়ূন বললেন, ‍দিল্লী ফিরে গেলে কেমন হয় ?

সবাই একসঙ্গে বলল, খুব ভালো হয় । আমরা এক সপ্তাহের মধ্যে দিল্লীর দিকে রওনা হব ।

মহিলাদের আনন্দের সীমা রইল না । তাঁদের আগ্রহে সম্রাট রাতের খাবার জেনানা তাঁবুতে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন । রাতের খাওয়ার শেষে গানবাজনার আয়োজন করা হলো ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

আনন্দেরও এক ধরনের ক্লান্তি আছে । সম্রাট সেই ক্লান্তি নিয়ে রাতে ঘুমুতে গেলেন ।

শের খাঁ’র বাহিনী কীর্তিনাশা নদীর উপরের কাঠের পুল দিয়ে পার হলো । শের খাঁ বিস্মিত হলেন । এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি পুল, সেখানে কোনো পাহারা নেই । শের খাঁ’র হস্তীবাহিনী কীর্তিনাশা সাঁতরে পার হলো ।

শের খাঁ’র বাহিনী ঘুমন্ত মোঘল সেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ।

মোঘল অশ্বারোহীরা তাদের অশ্বের পিঠে জিন পরানোর সময়ও পেল না ।

সম্রাটের ঘুম ভাঙল ‘পালাও’ ‘পালাও’ চিৎকারে। সম্রাট বিস্মিত হয়ে বললেন, কী হয়েছে ?

জওহর আবতাবচি ভীত গলায় বলল, আমরা শের খাঁ কর্তৃক আক্রান্ত হয়েছি এবং পরাজিত হয়েছি । মোঘল সৈন্যদের প্রায় সকলেই নিহত ।

সম্রাট বললেন, আমি কি দুঃস্বপ্ন দেখছি ?

জওহর আবতাবচি বলল, না । সম্রাট, আপনাকে এক্ষুনি পালাতে হবে ।

আহত মোঘল সেনাদের আর্তচিৎকার শোনা যাচ্ছে । মহিলা এবং শিশুদের কান্না শোনা যাচ্ছে ।

হুমায়ূন ভেবে পেলেন না, তাঁর তাঁবু কেন আক্রান্ত হয় নি । শের খাঁ’র উচিত ছিল সবার আগে সম্রাটকে হত্যা করা । এখানে কি শের খাঁ’র কোনো হিসাব আছে ?

সম্রাট ঘোড়ায় চড়ে কীর্তিনাশা নদীর পাড়ে গেলেন । পুল ভাঙা । শত শত মোঘল সৈন্য পুলে উঠে সেখান থেকে ঝাঁপ দিয়ে পানিতে পড়ছে । নদীর স্রোতে ভেসে চলে যাচ্ছে । হাতিগুলিরও মনে হয় মস্তিঙ্ক বিকৃতি হয়েছে । তারা কিছুতেই পানিতে নামবে না । অথচ এরা শিক্ষিত হাতি । যুদ্ধক্ষেত্রের সব পরিস্থিতির জন্যে তৈরি ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

হুমায়ূন পেছনে দিকে তাকালেন, তাঁর তাঁবুতে আগুন জ্বলছে । আগুন ছুটে যাচ্ছে জেনানা তাঁবুর দিকে । আগুনের লেলিহান শিখায় আকাশ লাল । সম্রাট হুমায়ূনের ইমাম সাহেব উচ্চস্বরে আযান ‍দিচ্ছেন, আল্লাহু আকবার । আল্লাহু আকবার । মহাবিপদের সময় আযান দিতে হয় । আজ মোগলদের মহাবিপদ ।

সম্রাট ঘোড়া নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিলেন । মুহূর্তের মধ্যে ঘোড়া পানিতে তলিয়ে গেল । সম্রাট নিজেও তলিয়ে যাচ্ছিলেন । হঠাৎ শুনলেন, কে যেন বলছে আমি আপনার দিকে একটা বাতাসভর্তি মশক ছুঁড়ে দিচ্ছি । আপনি মশক ধরে নদী পার হওয়ার চেষ্টা করুন ।

তুমি কি আমাকে চেনো ?

আপনি মোঘল সম্রাট হুমায়ূন ।

তোমার নাম কী ?

আমি নাজিম । ভিসতিওয়ালা নাজিম । আপনি মশক শক্ত করে ধরে ভাসতে থাকুন ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৫

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *