• Wednesday , 25 November 2020

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৬

শের শাহ্ বললেন, হ্যাঁ আমার অনেক দয়া । তবে পরাজিত  মোঘল সম্রাট হুমায়ূনের মতো দয়া আমার নেই । তোমাকে যে বিশেষ সুবিধা আমি দেব তা হলো কোন পদ্ধতিতে তুমি মৃত্যু চাও তা তুমি ঠিক করবে । আমার হাতে অনেক পদ্ধতি আছে । যেমন-

১. হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে মৃত্যু ।

২ শলদণ্ড ।

৩. তলোয়ার দিয়ে মাথা কেটে আলাদার করা ।

৪. আগুনে পুড়ে মৃত্যু ।

হরিশংকর শুন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন । তাঁর ঠোঁট কাঁপছে । নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে । শের শাহ্ বললেন, তুমি নিজে যদি তোমার পছন্দের কোনো বিশেষ পদ্ধতিতে মরতে চাও তাও করা হবে । বলো কী পদ্ধতিতে মরবে ?

হরিশংকর কিছু বলতে পারলেন না । শের শাহ্ তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দিয়ে দলবল নিয়ে বের হলেন-সম্রাট হুমায়ূনের খবর পাওয়া গেছে । গ্রাম নোকরা, জেলা বীরভূম ।

লছমি বাইয়ের বাড়ি শের শাহ্’র সৈন্যরা ঘিরে রেখেছে । লছমি বাইকে আনা হয়েছে শের শাহ্’র সামনে । শের শাহ্ ঘোড়ার উপর বসে আছেন । তাঁর দুইপাশে দুই পুত্র । তারাও ঘোড়ার পিঠে । শের শাহ্ বললেন, তোমার নাম ?

লছমি বাই ।

হুমায়ূন কোথায় ?

জানি না ।

তুমি তাঁকে সেবা-শুশ্রুষা করেছে ?

উনি নিজেকে হিন্দুস্থানের সম্রাট বলেছিলেন । আমি বিশ্বাস করি নাই ।

হুমায়ূন কোন পথে পালিয়েছেন ?

লছমি জবাব ‍দিল না । চুপ করে রইল ।

তিনি কোন দিকে গেছেন তা জেনেও যদি না বলো তাহলে তোমার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড । এখন বলো ।

আমি বলব না ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৬

শের শাহ্ তার বড় পুত্র জালাল খাঁ’র দিকে তাকিয়ে বললেন, হুমায়ূন নামের ওই মানুষটার কী অদ্ভুত ক্ষমতা লক্ষ করেছ ? মেয়েটি কিছুক্ষণ তাঁর সঙ্গে ছিল । এই কিছুক্ষণেই তার মাথা নষ্ট হয়ে গেছে । সে হুমায়ূনকে রক্ষা করবে, বিনিময়ে প্রাণ দিতেও প্রস্তুত । এই ঘটনা আমাদের জন্যে ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ ।

দুঃসংবাদ কেন ?

জাদুকরী ক্ষমতার হুমায়ূনের মতো মানুষরা যা কিছু হারায় সবই ফিরে পায় । মানুষের ভালোবাসার কারণে ফিরে পায় । মানুষের ভালোবাসা আমরাও যেন ফিরে পাই সেই চেষ্টা এখন থেকেই করতে হবে ।

জালাল খাঁ হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন । শের শাহ্ লছমি বাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি একজন অসুস্থ, হতাশ এবং ভগ্নহৃদয় মানুষকে সেবা-যত্ন করে সুস্থ করেছ । তাঁকে রক্ষার চেষ্টা করেছ । মানুষটি আমার শক্র হলেও তোমার আচরণে আমি খুশি । এই স্বর্ণমুদ্রাটি রাখো । আমার বকশিশ ।

লছমি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, নড়ল না । লছমি বাইয়ের স্বামী মুখভর্তি হাসি নিয়ে এগিয়ে এল ।

সম্রাট হুমায়ূন নদীপথে আগ্রার দিকে রওনা হয়েছেন । অতি সাধারণ মাছ ধরার নৌকা । নৌকার মাঝি তিনজনই বলশালী । তারা আরোহীর পরিচয় জানে না ।

হুমায়ূন দুপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে যাচ্ছেন । কয়েকবারই তাঁর মনে হলো, পৃথিবী এত সুন্দর কেন ? তাঁর হাতে কাগজ-কলম নেই, তিনি মনে মনে একটি শের রচনা করলেন । শেরটির ভাবার্থ-

আমরা বাস করি সুন্দরের মধ্যে

সুন্দরকে ঘিরে থাকে অসুন্দর ।

যেমন পুণ্যের চারদিকে থাকে

পাপের শক্ত খোলস ।

ভাগ্যবান সেইজন যে অসুন্দরের পর্দা ছিঁড়ে

সুন্দর দেখে পুণ্যের কাছে যায় পাপের

শক্ত খোলস ভেঙে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৬

সম্রাট নৌকার পাটাতনে শুয়ে আছেন । আকাশ মেঘে ঢাকা । হিন্দুস্থানের কঠিন রোদ এখন আর তাঁর চোখে লাগছে না । আরামদায়ক বাতাসে চোখ বুজে আসছে । তাঁকে ঘুমুলে চলবে না । জেগে থাকতে হবে।

তিনি চোখ বন্ধ করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে লাগলেন । শের শাহ্ কে অতি দ্রুত পরাজিত করতে হবে । তিনি কি ভাইদের সাহায্য পাবেন? অবশ্যই পাবেন । ভাইদের প্রতি স্নেহ এবং মমতার কোনো অভাব তিনি দেখান নি । সাধারণ নিয়মে সিংহাসনে বসার পরপর ভাইদের হত্যা করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে কেউ বিদ্রোহ করতে না পারে । তিনি তা করেন নি । তিনি পিতার আদেশ মনে রেখেছেন ।

মৃত্যুর আগে সম্রাট বাবর পুত্র হুমায়ূন মীর্জার হাত ধরে বলেছিলেন, আমার মন বলছে তোমার ভাইরা তোমাকে অনেক যন্ত্রণা দেবে, তারপরেও তুমি তাদের প্রতি কোমল থাকবে । যে ভাইদের প্রতি কোমল থাকে, আল্লাহ্ পাক তার প্রতি কোমল থাকেন । নৌকার মাঝির কথায় তাঁর চিন্তা বাধাগ্রস্ত হলো ।

নৌকার মাঝি বলল, হুজুর, বিশাল একটা নৌকা আমাদের পিছনে পিছনে আসছে । আমাদের থামতে ইশারা করছে । আমরা কি থামব ?

হুমায়ূন শুয়ে রইলেন । জবাব ‍দিলেন না । তাঁর কাছে কোনো জবাব নেই ।

নৌকার মাঝি বলল, ওই নৌকায় সৈন্য আছে । আমরা না থামলে বিরাট সমস্যা হবে ।

শের শাহ্’র সৈন্য ?

মাঝি বলল, সে রকমই অনুমান করি । চারদিকেই এখন শের শাহ্’র সৈন্য ।

হুমায়ূন বললেন, ছোট কোনো খালে নৌকা ঢুকিয়ে দিতে পার ?পারি । তাতে লাভ হবে না । আমরা ওদের নজরের মধ্যে আছি । খালে নৌকা ঢোকালে ওরাও খালে ঢুকবে ।

হুমায়ূন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন ।

হুজুর! ওরা খুব কাছে চলে এসেছে ।

হুমায়ুন হতাশ গলায় বললেন, আসুক । আর তখনই শুনলেন ওই নৌকা থেকে কে একজন বলছে-হিন্দুস্থানের মহান সম্রাট হুমায়ূন কি নৌকায় আছেন ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৬

কণ্ঠস্বর হুমায়ূনের পরিচিত । অবিকল বৈরাম খাঁ’র গলা । প্রচণ্ড মানসিক চাপে মানুষের মাথা এলোমেলো হয়ে যায়, তখন সে নানান ধরনের ভ্রান্তির মধ্যে পড়ে । তাঁর বেলাতেও কি এরকম হয়েছে ?

সম্রাট উঠে বসলেন । অবাক হয়ে দেখলেন, পনেরোজনের মতো মোঘল সৈন্য নিয়ে বৈরাম খাঁ নৌকায় দাঁড়ানো ।

সম্রাটের চোখে পানি এসে গেল । তিনি মনে মনে বললেন, বৈরাম খাঁকে পেয়েছি । আমার আর কোনো ভয় নেই ।

বৈরাম খাঁ । ভালো আছেন ?

সম্রাট ভালো থাকলেই আমি ভালো ।

আপনাকে দেখে আমি বুকে এক শ’ হাতির বল পাচ্ছি ।

আল্লাহ্ পাকের দরবারে হাজার শুকরিয়া । নৌকার তিন মাঝি হতভম্ব হয়ে তাকাচ্ছে । তারা ঘটনা কিছুই বুঝতে পারছে না ।

হরিশংকরকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপের সব ব্যবস্থা সম্পন্ন । বৃষ্টির পানিতে কাঠ ভেজা থাকায় আগুন ধরাতে সমস্যা হচ্ছিল । কাঠে তার্পিন এবং গালা ঢেলে এই সমস্যার সমাধান করা হয়েছে । এখন সুন্দর আগুন জ্বলছে । হরিশংকর মন্ত্রমুগ্ধের মতো জ্বলন্ত আগুনের দিকে তাকিয়ে আছেন । অগ্নিমন্ত্র পাঠ করে সাধু-সন্ত্ররা আগুন নেভাতে ও জ্বালাতে পারেন । হরিশংকর জানেন তিনি সাধু-সন্তদের একজন না । অগ্নিমন্ত্র তাঁর ক্ষেত্রে কাজ করবে না, তারপরেও তিনি অগ্নিমন্ত্র জপ করার চেষ্টা করলেন । কিছুতেই মন্ত্রের প্রথম চরণ মনে এল না, মাঝখানের একটা লাইন শুধু মাথায় আসছে-

‘যা অগ্নিদায়েনো নমঃভূপে…’

এই সময় হঠাৎ করে বিরাট হইচই শুরু হলো । সম্রাট হুমায়ূন নাকি ধরা পড়েছেন । তাঁকে এখানে আনা হচ্ছে । সম্ভবত হুমায়ূনকেও অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হবে । চরম বিশৃঙখলার সুযোগে হরিশংকর পালিযে গেলেন । সম্রাট হুমায়ূনের ধরা পড়ার সংবাদ মিথ্যা । ধরা পড়েছে কামানচির এক সেনাপতি তোরাব জান। জ্বলন্ত অগ্নিতে তোরাব জানকে নিক্ষেপ করা হলো ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৬

ভগ্নহৃদয় হুমায়ূন আগ্রায় পৌঁছেছেন । ফরমান জারি করেছেন, তিনি মাগরেবের নামাজের আগে কারও সঙ্গে দেখা করবেন না । সম্রাট রোজা রেখেছেন । সূর্যাস্তের পর রোজা ভেঙে নামাজ আদায় করবেন । তারপরই যদি তাঁর মন চায় তিনি পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেন । ঘনিষ্ঠজনদের একটি তালিকাও তিনি জওহর আবতাবচির কাছে ‍দিয়েছেন । তালিকায় আছেন তাঁর মা, কামরান মীর্জার মা এবং বোন গুলবদন ।

সম্রাট বিছানায় শুয়ে আছেন । চোখ বন্ধ । তাঁর সামান্য শ্বাসকষ্টও হচ্ছে । গঙ্গা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় ডানপায়ে ব্যথা পেয়েছিলেন । সেই ব্যথা এখন প্রবল । পা ফুলে উঠেছে । তাঁর শোবার ঘরের দরজা আধখোলা । দরজার বাইরে রুপার ছোট ঘন্টা। সেই ঘণ্টা বেজে উঠল । সম্রাট বিরক্ত গলায় বললেন, আমি ফরমান জারি করেছি কারও সঙ্গেই সাক্ষাৎ করব না ।

কোমল নারীকণ্ঠ দরজার বাইরে থেকে বলল, আমি সম্রাটের কাছে আসি নি । আমি আমার ভাইয়ের কাছে এসেছি ।

গুলবদন! কী চাও ?

আমি আমার ভাইকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কাঁদতে চাই ।

এসো । ভেতরে এসো ।

গুলবদন ছুটে এসে বিছানায় শোয়া হুমায়ূনকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন ।

হুমায়ূন বোনের মাথায় হাত বুলাত বুলাতে নিজেও কাঁদলেন । একটি শের আবৃত্তি করলেন । যার অর্থ, ‘পৃথিবীর পবিত্রতম বস্তু হলো গভীর দুঃখ থেকে নিঃসৃত অশ্রুধারা ।’

গুলবদন বললেন, আমি সম্রাটের জন্যে দু’টি আনন্দসংবাদ নিয়ে এসেছি । সম্রাট অনুমতি দিলে সংবাদ দুটি তাঁকে দেব ।

হুমায়ূন বললেন, আমার বোন গুলবদন সম্রাটের অনুমতি ছাড়াই যা ইচ্ছা বলতে পারে । সে সম্রাটের অনুমতির উর্ধ্বে । প্রথম সুসংবাদ । আপনার বিদ্রোহী ভাইদের শুভবুদ্ধি জাগ্রত হয়েছে । তারা আপনার ক্ষমার অপেক্ষায় আছে । মোঘল সাম্রাজ্যের প্রবল দুঃসময়ে তারা একত্রিত হয়ে আপনার সঙ্গে শের শাহ্’র বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করবে । কামরান মীর্জা পঁচিশ হাজার সৈন্য নিয়ে প্রস্তুত। আপনার অনুমতি পেলে সে শের শাহ্’র বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করবে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৬

সম্রাট বললেন, এই সংবাদে আমি পরম করুণাময় আল্লাহ্ পাকের দরবারে শুকুরগোজার করছি । দ্বিতীয় সুসংবাদটি বলো ।

আপনি কামরান মীর্জার কাছ থেকে জাদুবিদ্যার একটি বই অনেকদিন থেকে চাচ্ছিলেন । কামরান মীর্জা বইটি নিয়ে এসেছেন । তিনি নিজে আপনার হাতে তুলে দেবেন ।

সম্রাট দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, জাদুবিদ্যার অতি মূল্যবান একটি বই আমাকে শের শাহ্ দিয়েছিলেন । আফসোস সেই বইটা নাই । হারিয়ে ফেলেছি ।

গুলবদন বললেন, সম্রাট শুধু বই কেন, অনেক কিছুই তো আপনি হারিয়ে ফেলেছেন ।

ঠিক বলেছ । আমার প্রাণপ্রিয় কন্যা আকিকা বেগম নাই । তাকে নিয়ে অদ্ভুত সব দুঃস্বপ্ন দেখি । পালিয়ে যাওয়ার আগে কেন যে মেয়েটাকে নিজের হাতে হত্যা করলাম না !

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৭

Related Posts

Leave A Comment