• Wednesday , 25 November 2020

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৮

প্রধান নকিব ঘোষণা করল, আল সুলতান আল আজম ওয়াল খাকাল মুকররাম, জামিই সুলতানই হাকিকি ‍ওয়া মাজাজি ভিসতি নিজাম পাদশাহ্ ।

আমীররা কুর্নিশ করলেন ।

নতুন সম্রাট পাশে দাঁড়ানো আমীরকে হাতের ইশারায় কাছে ডেকে নিচুগলায় জানতে চাইলেন, দুপুরের খাবার কখন দেওয়া হবে? তাঁকে সময় বলা হলো । তিনি বললেন, ‍দিল্লীতে তাঁর দূরসম্পর্কের এক দেশিয়াল ভাই আছেন । দুপুরের খানায় তাকে কি আমন্ত্রণ জানানো যাবে ?

অবশ্যই যাবে । তাকে আনতে এক্ষুনি হাতি পাঠানো হবে ।

খাওয়ার পর আমার দেশিয়াল ভাইকে নিয়ে আমি কি মোগল হেরেম পরিদর্শনে যেতে পারি ?

আপনি যখন ইচ্ছা তখন যেতে পারবেন, তবে আপনার ভাই যেতে পারবেন না । সম্রাট ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের সেখানে প্রবেশাধিকার নেই ।

আমি যদি ফরমান জারি করি ?

আপনি ফরমান জারি করলেও হবে না । সম্রাটকেও নিয়মকানুনের ভেতর দিয়ে যেতে হয় ।

আমার ভাইয়ের খুব শখ ছিল হেরেম পরিদর্শন করা । কোনো উপায় কি আছে ?

একটা উপায় আছে । আপনার ভাইকে খোজা করানো হলে উনি যেতে পারবেন । সেই ব্যবস্থা কি করব ?

নতুন সম্রাট গম্ভীর হয়ে গেলেন ।

সন্ধ্যাবেলায় নতুন সম্রাটের সময় শেষ হলো । তিনি প্রচুর ধনরত্ন নিয়ে নিজ গ্রামের দিকে রওনা হলেন । তিনি নিজে ঘোড়ায় করে যাচ্ছেন, তাঁর পেছনে দুটা গাধা । গাধার পিঠে স্বর্ণমুদ্রা, রৌপ্যমুদ্রা । তাঁকে নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার জন্যে দশজন অশ্বারোহীর একটি দল আগে আগে যাচ্ছে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৮

দিল্লীর উপকণ্ঠে ভিসতি নিজামের উপর ডাকাত দল ঝাঁপিয়ে পড়ল । তারা অনেকক্ষণ ধরেই নিজামকে অনুসরণ করছিল । ডাকাতের ছদ্মবেশে এরা সবাই কামরান মীর্জার দেহরক্ষী বাহিনী । নিজামকে রক্ষাকারী দলের সবাই ঘটনা বুঝতে পেরে দ্রুত পালিয়ে গেল । ডাকাত দল ধনরত্ন এবং ঘোড়া নিয়ে চলে গেল । আধাবেলার দিল্লীশ্বরের মৃতদেহ নর্দমায় পড়ে রইল । তার উপর নীল রঙের স্বাস্থ্যবান মাছি ভনভন করতে লাগল । দুটি গাধার একটি প্রভুর মৃতদেহের দিকে বিষণ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল ।*

 

*গুলবদনের লেখা হুমায়ূননামায় বলা হয়েছে, নিজাম ভিসতি দুই দিনের জন্যে দিল্লীর সিংহাসনে ছিলেন । অন্য কোনো সূত্র তা সমর্থন করে না । নিজাম ভিসতি অর্ধদিবসের সম্রাট-এই তথ্যই প্রতিষ্ঠিত ।

 

দিল্লীর পথে ঘাটে জনৈক নগ্নপদ বৃদ্ধকে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে । তার চক্ষু কোটরাগত । অনাহারে-অর্ধাহারে শরীর ভেঙে গেছে । সে কপর্দকহীন । তার বেশির ভাগ সময় কাটে হালুকাবির দোকানের আশেপাশে । দোকানিদের কেউ কেউ একটা লাড্ডু, একটা লুচি ছুঁড়ে দেয় । বৃদ্ধ তা লুফে নেয় । খাবারের সন্ধানে সে শ্মশানঘাটেও বসে থাকে । সেখানে গুড় মাখানো চিঁড়া বিতরণ করা হয় । বৃদ্ধ উড়ুনি পেতে চিঁড়া গ্রহণ করে । বৃদ্ধ উচ্চবর্ণের ব্রাক্ষণ । কিন্তু সে পৈতা লুকিয়ে ফেলেছে । ব্রাক্ষণরা উচ্ছিষ্ট খাদ্য গ্রহণ করতে পারে না । বৃদ্ধ নিরুপায় । উচ্ছিষ্ট খাদ্যগ্রহণে তার কোনো আপত্তি নাই । দিল্লী শহরের অন্য ভিক্ষকদের সঙ্গে তার কোনো তফাত নেই । খাদ্য নিয়ে ভিক্ষুকদের সঙ্গে সে কাড়াকাড়িও করে ।

ভিক্ষুকো ভিক্ষুকং দৃষ্টা

শ্বতুলং গুরগুরায়তে

(কুকুর যেমন অন্য কুকুরকে দেখলে গর্জন করে,

ভিক্ষুকও সেরকম অন্য ভিক্ষুককে দেখলে গর্জন করতে থাকে । )

এই বৃদ্ধ আমাদের পরিচিত । তাঁর নাম হরিশংকর । আচার্য হরিশংকর । তিনি শত মাইল হেঁটে দিল্লী এসেছেন সম্রাট হুমায়ূনের সাক্ষাৎপ্রত্যাশী হয়ে ।

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার

সম্রাট তাঁর অতীত জানেন না । কাজেই সম্রাটের কৃপা প্রার্থনা তিনি করতে পারেন । সম্রাট সন্দেহ করবেন না । সম্রাটের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টার তিনি ক্রটি করেন নি । সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে । ভিক্ষুককে রাজদরবারে ঢোকানো যায় না । সম্রাটের দর্শনপ্রাথীদের উপহার নিয়ে যেতে হয় । আচার্য হরিশংকরের কাছে তার নোংরা উড়ুনি ছাড়া কিছু নেই ।

প্রতি শুক্রবার হাতির পিঠে চড়ে সম্রাট জুমার নামাজ পড়তে যান । এই সময় রাস্তায় পাশে দাঁড়িয়ে হরিশংকর সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে নানান অঙ্গভঙ্গি করেন, উচ্চস্বরে কাঁদেন । তাতে লাভ হয় না সম্রাট তাকান না ।

একন হরিশংকর লাফ দিয়ে হাতির সামনে পড়ার চিন্তাভাবনা করছেন । সাহস সঞ্চয় করতে পারছেন না ।

এক জুমাবারে হরিশংকর লাফ দিয়ে হাতির সামনে পড়ার চিন্তাভাবনা করছেন । সাহস সঞ্চয় করতে পারছেন না ।

এক জুমাবারে হরিশংকর রাস্তায় পাশ থেকে দৌড়ে এসে সম্রাটের হাতির সামনে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললেন । হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট হওয়ার দৃশ্য না দেখাই ভালো ।

চারদিক থেকেই হৈচৈ হচ্ছে । ঘন্টা বাজছে । ভীত হরিশংকর চোখ খুললেন ।

আশ্চার্য! হাতির পিঠের হাওদায় বসা সম্রাট তার দিকে তাকিয়ে আছেন । তিনি কি তাকে চিনতে পারছেন? উত্তেজনায় হরিশংকর কুর্নিশ করতে ভুলে গেল ।

সম্রাট বললেন, আপনি কি আচার্য হরিশংকর ?

হরিশংকর সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন । সেখান থেকে উঠে হাতজোড় করে বললেন, সম্রাট আমাকে চিনতে পেরেছেন । আমার জীবন ধন্য । আমি শের শাহ্’র হাতে বন্দি ছিলাম । কোনোক্রমে পালিয়ে এসেছি। আমি সম্রাটের দেখা পেয়েছি, আমার জীবন ধন্য ।

আমার দেখা পাওয়ার জন্যেই কি আপনি এসেছেন ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৮

হ্যাঁ-সূচক মাথা নেড়ে হরিশংকর আবার মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন । সম্রাট বললেন, আপনার অতি মলিন বেশ ভগ্ন শরীর দেখে আমি ব্যথিত । কাল রাজদরবারে আমার সঙ্গে দেখা করবেন ।

সম্রাট হুমায়ূন হরিশংকরকে সভাসদের পদ দিলেন । তিনি সম্রাটের উপদেষ্টাদের একজন হলেন । সম্রাট হুমায়ূনের অনেক বড় বড় ভুলের মধ্যে এটিও একটি ।

সাত দিনের মধ্যে আচার্যের চেহারায় জেল্লা ফিরে এল । নতুন পোশাকে তাঁকে দরবারে মোটেই বেমানান মনে হলো না । তিনি অবশ্যি নিজেকে সবকিছু থেকে আলাদা করে মৌনী ভাব ধরলেন । যদিও তিনি জানেন-

বিদ্যা স্তব্ধস্য নিষ্ফলা

(যে কথা কইতে ভয় পায়, তার বিদ্যা নিষ্ফল হয় । )

আচার্য হরিশংকর অপেক্ষায় আছেন । কথা বলার সময় অনেক পাওয়া যাবে । কিছু কথা সম্রাটকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বলতে চান । কী বলবেন তা ভেবে রেখেছেন । সম্রাটের সঙ্গে একান্তে কথা বলার সুযোগ হচ্ছে না ।

যুদ্ধপ্রস্তুতি নিয়ে সম্রাট ব্যস্ত । মিত্র রাজাদের কাছে সাহায্য চেয়ে সম্রাটের চিঠি নিয়ে রাজদতরা যাচ্ছেন । তিনি নিজের ভাইদের সঙ্গে ঘনঘন বৈঠক করছেন । মীর্জা কামরান পবিত্র কোরান শরীফে হাত রেখে প্রতিঙ্গা করেছেন, তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে সম্রাটের ডানহাত হয়ে কাজ করবেন ।

মীর্জা কামরানকে নিয়ে সম্রাটের সামান্য আশঙ্কা ছিল । সেই আশঙ্কা অমূলক প্রামাণিত হয়েছে ।

রাজজ্যোতিষীদের শুভক্ষণ বের করতে বলা হয়েছে । সম্রাট নিজে ইস্তেখারা নামাজ পড়েছেন । ইস্তেখারার নামাজের পর অজু করে ঘুমিয়ে পড়লে স্বপ্নে নির্দেশ আসে । স্বপ্নে যা দেখা যায় তার সবটাই প্রতীকী । এই প্রতীকের অর্থ-উদ্ধার বেশিরভাগ সময় কঠিন হয় ।

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার

সম্রাট স্বপ্নে দেখেছেন ধবধবে সাদা একটা বক গাছে বসেছে । গাছের পাতা খাচ্ছে ।

স্বপ্নের তফসিরকারীরা স্বপ্নের অর্থ করেছেন এইভাবে-

বক মাংসাশী । সে জীবন্ত মাছ, পোকামাকড় ধরে

ধরে খায় । স্বপ্নে সে তার স্বভাব পরিবর্তন করে

তৃণভোজী হয়ে গাছের পাতা খাচ্ছে । প্রতীকীভাবে

বক হলো শের শাহ্ । কারণ সে পাখির মতোই এক

জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়ায় । বক

যেমন ধবল সাদা, শের শাহ্’র মাথার পাপড়িও

ধবল সাদা । স্বপ্নের পূণাঙ্গ অর্থ-বক তার স্বভাব

পরিবর্তন করেছে অর্থাৎ শের শাহ্ স্বভাব পরিবর্তন

করেছে । এই পরিবর্তন হবে যুদ্ধে পরাজয়ের কারণে ।

রাজদরবারের সবাই স্বপ্নের তফসিরে সন্তোষ প্রকাশ করলেন । শুধু আচার্য হরিশংকর মৌন রইলেন । সম্রাট বললেন, আচার্য হরিশংকর, আপনি চুপ করে আছেন কেন ? স্বপ্নের এই ব্যাখ্যার বিষয়ে আপনার কি কিছু বলার আছে ?

আচার্য হরিশংকর বললেন, আমার বলার আছে । তবে আমি মৌন থাকতে চাচ্ছি । জ্ঞানীদের সামনে কথা বলার অর্থ নিজের মূর্খতা ঢোল পিটেয়ে প্রচার করা ।

হুমায়ূন বললেন, আপনার বক্তব্য আমি শুনতে চাচ্ছি । হরিশংকর বললেন, আমি মনে করি এই বক সম্রাট নিজে । সম্রাটের অন্তর অতি পবিত্র । পবিত্রতার রঙ সাদা । বকও সাদা । বক মাছ না খেয়ে পাতা খাচ্ছে, কারণ সে কৌশল পরিবর্তন করেছে । স্বপ্নের মাধ্যমে সম্রাটকে যুদ্ধকৌশল পরিবর্তন করতে বলা হচ্ছে ।

হুমায়ূন বললেন, আপনার ব্যাখ্যা আমি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করলাম । যুদ্ধযাত্রায় আপনি আমার সঙ্গী হবেন ।

হরিশংকর বললেন, সম্রাট যে আদেশ করবেন তা-ই হবে । তবে আমার উপস্থিতি আপনার জন্যে অমঙ্গলস্বরুপ । আমাকে রাজধানীতে রেখে যাওয়াই আপনার জন্যে শুভ হবে ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১

Related Posts

Leave A Comment