বৃহন্নলা-পর্ব-(১)-হুমায়ূন আহমেদ

বৃহন্নলা-পর্ব-৫

অতিপ্রাকৃত গল্পে গল্পের চেয়ে ভূমিকা বড় হয়ে থাকেগাছ যতনা বড়, তার ডালপালা তার চেয়েও বড়এই গল্পেও তাই হবেএকটা দীর্ঘ ভূমিকা দিয়ে শুরু করবপাঠকদের অনুরােধ করছি তাঁরা যেন ভূমিকাটা পড়েনএর প্রয়ােজন আছে। 

আমার মামাতাে ভাইয়ের বিয়ে

বাবামার একমাত্র ছেলে, দেখতে রাজপুত্র না হলেও বেশ সুপুরুষএম পাস করেছেবাবার ব্যবসা দেখাশােনা করা এবং গ্রুপ থিয়েটার করাএই দুইয়ে তার কর্মকাণ্ড সীমিতবাবামাএকমাত্র ছেলে হলে যা হয় বিয়ের জন্যে অসংখ্য মেয়ে দেখা হতে লাগলকাউকেই পছন্দ হয় নাকেউ বেশি লম্বা, কেট বেশি বেঁটে, কেউ বেশি ফর্সা, কেউ বেশি কথা বলে, আবার কেউকেউ দেখা গেল কম কথা বলেনানান ফ্যাকড়াশেষ পর্যন্ত যাকে পছন্দ হল, সেমেয়ে ঢাকা ইডেন কলেজে বিএ পড়ে ইতিহাসে অনার্স! মেয়ের বাবা নেইমাঅন্য কোথায় বিয়ে হয়েছেমেয়ে তার বড়চাচার বাড়িতে মানুষতিনিই তাকে খরচপত্র দিয়ে বিয়ে দিচ্ছেন। 

আমার মামা এবং মামী দু জনের কেউই এই বিয়ে সহজভাবে নিতে পারলেন নাযেমেয়ের বাবা নেই, মা আবার বিয়ে করেছেপাত্রী হিসেবে সে তেমন কিছুনাতা ছাড়া সে খুব সুন্দরীও নামােটামুটি ধরনের চেহারাআমার মামাতাে ভাই তবু কেন জানি একবারমাত্র এই মেয়েকে দেখেই বলে দিয়েছেএই মেয়ে ছাড়া আর কাউকে সে বিয়ে করবে নামেয়ের বাবা নেই তো কী হয়েছে? সবার বাবা চিরকাল থাকে নাকি? মেয়ের মাবিয়ে হয়েছে, তাতে অসুবিধাটা কী? অল্প বয়সে বিধবা হয়েছেন, তাঁর তাে বিয়ে করাই উচিতএমন তাে না যে, দেশে বিধবাবিবাহ নিষিদ্ধ। 

বৃহন্নলা-পর্ব-(১)

মামামামীকে শেষ পর্যন্ত মত দিতে হল, তবে খুব খুশিমনে মত দিলেন না, কারণ মেয়ের বড়চাচাকেও তাঁদের খুবই অপছন্দ হয়েছেলােকটা নাকি অভদ্রের চুড়ান্তধরাকে সরা জ্ঞান করেচামার টাইপ। 

বিয়ের দিন তারিখ হল। 

এক মঙ্গলবার কাকডাকা ভােরে আমরা একটা মাইক্রোবাস এবং সাদা রঙের টয়ােটায় করে রওনা হলামগন্তব্য ঢাকা থেকে নব্বই মাইল দূরের এক মফস্বল শহরমফস্বল শহরের নামটা আমি বলতে চাচ্ছি নাগল্পের জন্যে সেই নাম জানার প্রয়ােজনও নেই। 

তেত্রিশ জন বরযাত্রীঅধিকাংশই ছেলেছােকরা। হৈচৈয়ের চূড়ান্ত হচ্ছেএই মাইক বাজছে, এই মাইক্রোবাসের ভেতর ব্রেক ডান্স হচ্ছে, এই পটকা ফুটছেফাঁকা রাস্তায় এসে মাইক্রোবাসের গিয়ারবক্সে কী যেন হলএকটু পরপর বাস থেমে যায়সবাইকে নেমে ঠেলতে হয়বরযাত্রীদের উৎসাহ তাতে যেন আরাে বাড়লশুধু আমার মামা অসম্ভব গম্ভীর হয়ে পড়লেনআমাকে ফিসফিস করে বললেন, এটা হচ্ছে অলক্ষণখুবই অলক্ষণরওনা হবার সময় একটা খালি জগ দেখেছি, তখনি মনে হয়েছে একটা কিছু হবেগিয়ারবক্স গেছে, এখন দেখবি চাকা পাংচার হবেনা হয়েই পারে না‘ 

হলও তাই। একটা কালভার্ট পার হবার সময় চাকার হাওয়া চলে গেলমামা বললেন, কি, দেখলি? বিশ্বাস হল আমার কথা ? এখন বসেবসে আঙুল চোষ। 

স্পেয়ার চাকা লাগতেও অনেক সময় লাগলমামা ছাড়া অন্য কাউকে বিচলিত হতে দেখলাম নাবরযাত্রীদের উৎসাহ মনে হল আরাে বেড়েছেচিৎকার হৈচৈ হচ্ছেএকজন গান গাওয়ার চেষ্টা করছেশুধুমাত্র বিয়েবাড়িতে পৌছানাের পরই সবার উৎসাহে খানিকটা ভাটা পড়ল। 

বৃহন্নলা-পর্ব-(১)

মফস্বল শহরের বড় বাড়িগুলি সাধারণত যেরকম হয়, সেরকম একটা পুরনাে ধরনের বাড়িএইসব বাড়িগুলি এমনিতেই খানিকটা বিষন্ন প্রকৃতির হয়এই বাড়ি দেখে মনে হল বিরাট একটা শশাকের বাড়িখাঁখাঁ করছে চারদিকলােকজন নেইকলাগাছ দিয়ে একটা গেটের মতাে করা হয়েছে, সেটাকে গেট নাবলে গেটের প্রহসন বলাই ভালােএকদিকে রঙিন কাগজের চেইন, অন্য দিকে খালিহয় রঙিন কাগজ কম পড়েছে, কিংবা লােকজনের গেট প্রসঙ্গে উৎসাহ শেষ হয়ে গেছেআমার মামা হতভম্ববরযাত্রীরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেব্যাপারটা কি

হাফশার্টপরা এক চ্যাংড়া ছেলে এসে বলল, আপনারা বসেনবিশ্রাম করেন। 

আমি বললাম, আর লােকজন কোথায়? মেয়ের বড়চাচা কোথায়?সেই ছেলে শুকনাে গলায় বলল, আছে, সবাই আছেআপনারা বিশ্রাম করেন। 

আমি বললাম, কোনাে সমস্যা হয়েছে? সেই ছেলে ফ্যাকাসে হাসি হেসে বলল, জ্বিনা, সমস্যা কিসের?এই বলেই সে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেলআর বেরুল না

বসার ঘরে চাদর পেতে বরযাত্রীদের বিশ্রামের ব্যবস্থাবারান্দায় গােটা দশেক ফোল্ডিং চেয়ারবিয়েবাড়ির সজ্জা বলতে এইটুকুই। 

মামা বললেন, বলেছিলাম না অলক্ষণ? এখন বিশ্বাস হল ? কী কাণ্ড হয়েছে কে জানে! আমার তাে মনে হয় বাড়িতে মেয়েই নেইকারাের সঙ্গে পালিয়েটালিয়ে গেছেমুখে জুতাের বাড়ি পড়ল, স্রেফ জুতাের বাড়ি। 

বৃহন্নলা-পর্ব-(১)

মামা অল্পতেই উত্তেজিত হনগত বছর তাঁর ছােটখাটো স্ট্রোক হয়ে গেছেউত্তেজনার ব্যাপারগুলি তাঁর জন্যে ক্ষতির কারণ হতে পারেআমি মামাকে সামলাতে চেষ্টা করলামহাসিমুখে বললাম, হাতমুখ ধুয়ে একটু শুয়ে থাকুন তাে মামাআমি খােজ নিচ্ছি কী ব্যাপারমামা তীব্র গলায় বললেন, হাতমুখটা খােব কী দিয়ে, শুনি? হাতমুখ ধােবার পানি কেউ দিয়েছে? বুঝতে পারছিস না? এরা বেইজ্জতির চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছে। 

কী যে বলেন মামা

কথা যখন অক্ষরেঅক্ষরে ফলবে, তখন বুঝবি কী বলছিকাপড়চোপড় খুলে ন্যাংটো করে সবাইকে ছেড়ে দেবেপাড়ার লােক এনে ধােলাই দেবেআমার কথা বিশ্বাস নাহয়, লিখে রাখ। 

মামার কথা শেষ হবার সঙ্গেসঙ্গেই খালিগায়ে নীল লুঙ্গিপরা এক লােক প্লাস্টিকের বালতিতে করে এক বালতি পানি এবং একটা মগ নিয়ে ঢুকলপাথরের মতাে মুখ করে বলল, হাতমুখ ধােনচা আইতাছে

মামা বললেন, খবরদার কেউ চা মুখে দেবে না, খবরদার! দেখি ব্যাপার কী। 

ভেতরবাড়ি থেকে কান্নার শব্দ আসছেবিয়েবাড়িতে কান্না কোনাে অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়কিন্তু এই কান্না অস্বাভাবিক লাগছেমধ্যবয়স্ক এক লােক এক বিশাল কেটলিতে করে চা নিয়ে ঢুকল!! আমি তাঁকে বললাম, ব্যাপার কী বলেন তাে ভাই? সেই লােক বলল, কিছু নাভেতরবাড়ির কান্না এই সময় তীব্র হলকান্না এবং মেয়েলি গলায় বিলাপকান্না যেমন হঠাৎ তুঙ্গে উঠেছিল, তেমনি হঠাৎই নেমে গেলতার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মেয়ের বড়ােচাচা ঢুকলেন

বৃহন্নলা-পর্ব-(১)

ভদ্রলােককে দেখেই মনে হল তার ওপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে গেছেতিনি নিচু গলায় যা বললেন, তা শুনে আমরা স্তম্ভিতকী সর্বনাশের কথা ! জানলাম যে কিছুক্ষণ আগেই তাঁর বড়ছেলে মারা গেছেঅনেক দিন থেকেই অসুখে ভুগছিলআজ সকাল থেকে খুব বাড়াবাড়ি হলসব এলােমেলাে হয়ে গেছে এই কারণেইতিনি তার জন্যে লজ্জিত, দুঃখিত অনুতপ্ততবে যত অসুবিধাই হােকবিয়ে হবেআজ রাতে সম্ভব হবে না, পরদিন। 

 

Read more

বৃহন্নলা-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *