মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

মধ্যাহ্ন

পারবেনতার জন্যে সাতজন সৎ ব্রাহ্মণকে সাতটা স্বর্ণমুদ্রা দিতে হবে সাতটা বৃষ উৎসর্গ করতে হবে এবং পূণ্যধাম কাশিতে মন্দিরে রাধাকৃষ্ণের মূর্তি স্থাপন করতে হবেরাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তি হতে হবে স্বর্ণেরহরিচরণ বললেন, আমার জাতে উঠার কোনাে ইচ্ছা নাইন্যায়রত্ন বললেন, কী বলেন এইসব ? আপনার তাে মফিষ্ক বিকৃতি হয়েছে। 

হরিচরণ বললেন, তা খানিকটা হয়েছেআপনি এখন গাত্রোত্থান করলে ভালাে হয়আমার কাজকর্ম আছে। হরিচরণ এই সময় সামান্য লেখালেখিও শুরু করলেন। দিনপঞ্জি জাতীয় লেখা। ………..অদ্য চৌবিংশতম আষাঢ় ১৩১৩ বঙ্গাব্দ 

ইংরেজি ১৯০৮ সােমবার গৃহদেবতায় নিবেদনমিদংকিছুদিন যাবৎ ঈশ্বরের স্বরূপ অনুসন্ধান করিতেছিইহা বৃথা অনুসন্ধানঅতীতে কেউ এই অনুসন্ধানে ফল লাভ করেন নাইআমিও করিব নাতাঁহার বিষয়ে যতই অনুসন্ধান করিব ততই অন্ধকারের গভীর তলে নিমজ্জিত হইবমানবের কাছে তাঁহার এক রূপমানব তাঁহাকে মানবের মতােই চিন্তা করিবে তাঁহার মধ্যে মানবিক গুণ এবং দোষ আরােপ করিবে আবার পশু তাহাকে পশুরূপেই চিন্তা করিবেবৃক্ষরাজী চিন্তা করিবে 

বৃক্ষরূপেএটা আমাদের চিন্তার দৈন্য, অন্য কিছু নয়হরিচরণ যখন এই রচনা লিখছেন তখন ঠাকুরবাড়ির রবীন্দ্রনাথ লিখছেন— 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

আমারে তুমি করিবে ত্রাণ, নহে মাের প্রার্থনা তরিতে পারি শকতি যেন রয়, আমার ভার লাঘব করি নাই বা দিলে সান্ত্বনা বহিতে পারি এমন যেন হয়বর্মাফেরত এক যুবা পুরুষ কোলকাতার কাছেই বাজেশিবপুরে বাসা নিয়েছেনতিনি একটি উপন্যাস লিখেছেনউপন্যাসটির বিষয়ে তার বিরাট অস্বস্তিউপন্যাসটি নিম্নমানের হয়েছেতিনি ঠিক করলেন এই উপন্যাস প্রকাশ করবেন নাতিনি পাণ্ডুলিপি তালাবদ্ধ করে ফেলে রাখলেনউপন্যাসের নাম দেবদাস। 

সেই বৎসরই (১৭ মে) মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নামে একজন ঔপন্যাসিক জন্মগ্রহণ করলেন। 

সেই বৎসরের জুন মাসের দুই তারিখে কোলকাতার কাছেই মানিকতলায় ইংরেজ সরকার একটা বােমা তৈরির কারখানা আবিষ্কার করেনঅরবিন্দ ঘােষকে গ্রেফতার করা হয়তাঁকে হাতকড়া দিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়অরবিন্দের গ্রেফতারের খবরে পুরাে বাংলায় প্রচণ্ড বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়স্বদেশী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠে। 

কমরেড মােজাফফর আহমেদ তার বিখ্যাত গ্রন্থ আমার জীবন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে লিখলেন— বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ থেকে আন্দোলনকারীরা প্রেরণা লাভ করিতেনএই পুস্তকখানি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে পরিপূর্ণএর মূলমন্ত্র ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দে মাতরমগানতাতে আছেবাহুতে তুমি মা শক্তি হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি তােমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

ত্বংহি দুর্গা দশপ্রহরণ ধরিণী... স্বদেশ বন্দনার নামে আন্দোলনকারীরা মুসলিম বিদ্বেষমূলক এই বন্দে মাতরমগানকে জাতীয়সঙ্গীত হিসেবে চালু করেএকেশ্বরবাদী কোনাে মুসলিম কি করে এই মন্ত্র উচ্চারণ করতে পারত? এই কথাটা কোনাে হিন্দু কংগ্রেস নেতাও কোনােদিন বুঝতে পারেন নি। 

ধনু শেখের লঞ্চটি একতলাকাঠের বডিযাত্রী ধারণক্ষমতা পঞ্চাশলঞ্চ চলাচল শুরু করেছে ধর্মপাশা সােহাগগঞ্জ রুটে লঞ্চের নাম এমএল বাহাদুরকমলানামই ঠিক ছিল, এর মধ্যে কমলার এক পুত্রসন্তান হওয়ায় নাম বদলেছেছেলের নাম বাহাদুরতার নামে লঞ্চের নামমেয়েছেলের নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া ঠিক নাএতে দোষ লাগেআয় উন্নতি হয় না। 

মাওলানা ইদরিস দোয়া পড়ে লঞ্চে বখশে দিয়েছেনকালিবাড়ির পুরােহিত এবং অম্বিকা ভট্টাচার্যও জবাফুল, গঙ্গাজল দিয়ে লঞ্চ শশাধন করে দিলেনসারেঙের ঘরে গণেশ মূর্তি বসানাে হয়েছেযাকে বলে আটঘাট বেঁধে নামানিজের লঞ্চ নিয়ে ধনু শেখ গেল ধর্মপাশায়প্রাক্তন মুনিব নিবারণ চক্রবর্তীর আশীর্বাদ নিতেউনাকে লঞ্চটা দেখানাের শখও আছেনিবারণ চক্রবর্তী বিস্মিত হয়ে বললেন, তুমি লঞ্চ কোম্পানি খুলেছ

ধনু বলল, জে কর্তা একটাই এখন লঞ্চ নাম দিয়েছি বাহাদুর দোতলা একটা স্টিল বডি কিনার শখ আছে, যদি আপনের আশীর্বাদ পাই। ……….এত টাকা পাইলা কই ? চুরিডাকাতি করছ নাকি ? ডাকাতি করার ইচ্ছাই ছিল, হঠাৎ একজন কিছু টেকা দিল সেই একজনটা কে ? জমিদার হরিচরণ বাবু। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

কাছখােলা জমিদার ? কাছা খুইলা চলাফেরা করেখড়ম পইরা জমিদারি দেখতে যায়সে শুনছি দুনিয়ার টাকা উড়াইতেছেতােমারে হঠাৎ টাকা দিল কেন ? তার মতলবটা কী ? …….ক্যামনে বলবকেউ কানে ধইরা উঠবােস করায়, কেউ লঞ্চ কিন্যা দেয়কারণ বােঝা মুশকিলদুনিয়া বড় জটিল। 

ঠিক কইরা বলাে তাে, তুমি আমার আশীর্বাদ নিতে আসছ, নাকি অন্যকিছু? …………অন্যকিছুই না। হরিচরণ কি আমার পিছে লাগছে ? তার সাথে তাে আমার কোনাে বিবাদ নাইআমার ব্যবসাতার জমিদারি। উনার কথা মনেও আনবেন নাসাধু মানুষরে টানাটানি করা ঠিক নাউনি বিরাট সাধু। 

আমারে উপদেশ দিবা নাকচুগাছের পাতা বড় হইলেই সে বটগাছ হয় কচুগাছ কচুগাছই থাকে। ……অবশ্যই থাকেখাঁটি কথা বলেছেনএজাজত দেন, বিদায় হই| ধনু শেখ হাসিমুখে বের হলােনিজের লঞ্চে করে সােহাগগঞ্জ ফিরলসারেংএর ঘরে বাতাস খেতে খেতে ফেরাএর মজাই অন্যরকম। 

প্রথম মাসের লাভের অর্ধেক সে দিতে গেল জমিদার হরিচরণকেহরিচরণ বললেন, আমি তাে তােমার সঙ্গে লঞ্চের ব্যবসায় নামি নাই। ……………….ধনু শেখ বলল, তাহলে টাকা দিয়েছেন কী জন্যে

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

তােমাকে সাহায্য করার জন্যেবিরাট বিপদে পড়েছিলানিরন্ন দিন কাটাইতেছিলা আমার কারণেই বিপদে পড়লা, তাই সামান্য সাহায্য। ………..টাকা ফেরত দেয়া লাগবে না ? ……..অন্যভাবে ফেরত দিবাডিসিট্রিক্ট বাের্ডের রাস্তায় মনিহারদির পুলটা ভাঙাভালাে কাঠের পুল বানায়া দিবা। 

পুল আপনে বানানআমার বানানাে পুলে হিন্দুরা কেউ উঠবে না। …..উঠলে না উঠবেআপনের কী ? হরিচরণ চুপ করে রইলেনধনু শেখ তীব্রগলায় বলল, পুলে উঠবে নাএইটা একটা কথা কইলেন ? এরারে আমি থাপড়ায়া পুলে তুলব। আমার নাম ধনু। 

 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *