পারবেন। তার জন্যে সাতজন সৎ ব্রাহ্মণকে সাতটা স্বর্ণমুদ্রা দিতে হবে । সাতটা বৃষ উৎসর্গ করতে হবে এবং পূণ্যধাম কাশিতে মন্দিরে রাধাকৃষ্ণের মূর্তি স্থাপন করতে হবে। রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তি হতে হবে স্বর্ণের। হরিচরণ বললেন, আমার জাতে উঠার কোনাে ইচ্ছা নাই। ন্যায়রত্ন বললেন, কী বলেন এইসব ? আপনার তাে মফিষ্ক বিকৃতি হয়েছে।
হরিচরণ বললেন, তা খানিকটা হয়েছে। আপনি এখন গাত্রোত্থান করলে ভালাে হয়। আমার কাজকর্ম আছে। হরিচরণ এই সময় সামান্য লেখালেখিও শুরু করলেন। দিনপঞ্জি জাতীয় লেখা। ………..অদ্য চৌবিংশতম আষাঢ় ১৩১৩ বঙ্গাব্দ
ইংরেজি ১৯০৮ সােমবার গৃহদেবতায় নিবেদনমিদং। কিছুদিন যাবৎ ঈশ্বরের স্বরূপ অনুসন্ধান করিতেছি। ইহা বৃথা অনুসন্ধান। অতীতে কেউ এই অনুসন্ধানে ফল লাভ করেন নাই। আমিও করিব না। তাঁহার বিষয়ে যতই অনুসন্ধান করিব ততই অন্ধকারের গভীর তলে নিমজ্জিত হইব। মানবের কাছে তাঁহার এক রূপ। মানব তাঁহাকে মানবের মতােই চিন্তা করিবে । তাঁহার মধ্যে মানবিক গুণ এবং দোষ আরােপ করিবে । আবার পশু তাহাকে পশুরূপেই চিন্তা করিবে। বৃক্ষরাজী চিন্তা করিবে
বৃক্ষরূপে। এটা আমাদের চিন্তার দৈন্য, অন্য কিছু নয়। হরিচরণ যখন এই রচনা লিখছেন তখন ঠাকুরবাড়ির রবীন্দ্রনাথ লিখছেন—
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ
আমারে তুমি করিবে ত্রাণ, এ নহে মাের প্রার্থনা তরিতে পারি শকতি যেন রয়, আমার ভার লাঘব করি নাই বা দিলে সান্ত্বনা বহিতে পারি এমন যেন হয়। বর্মাফেরত এক যুবা পুরুষ কোলকাতার কাছেই বাজে–শিবপুরে বাসা নিয়েছেন। তিনি একটি উপন্যাস লিখেছেন। উপন্যাসটির বিষয়ে তার বিরাট অস্বস্তি। উপন্যাসটি নিম্নমানের হয়েছে। তিনি ঠিক করলেন এই উপন্যাস প্রকাশ করবেন না। তিনি পাণ্ডুলিপি তালাবদ্ধ করে ফেলে রাখলেন। উপন্যাসের নাম ‘দেবদাস‘।
সেই বৎসরই (১৭ মে) মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নামে একজন ঔপন্যাসিক জন্মগ্রহণ করলেন।
সেই বৎসরের জুন মাসের দুই তারিখে কোলকাতার কাছেই মানিকতলায় ইংরেজ সরকার একটা বােমা তৈরির কারখানা আবিষ্কার করেন। অরবিন্দ ঘােষকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁকে হাতকড়া দিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়। অরবিন্দের গ্রেফতারের খবরে পুরাে বাংলায় প্রচণ্ড বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। স্বদেশী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠে।
কমরেড মােজাফফর আহমেদ তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আমার জীবন ও ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি‘–তে লিখলেন— বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ থেকে আন্দোলনকারীরা প্রেরণা লাভ করিতেন। এই পুস্তকখানি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে পরিপূর্ণ। এর মূলমন্ত্র ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দে মাতরম‘ গান। তাতে আছে—বাহুতে তুমি মা শক্তি হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি তােমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ
ত্বংহি দুর্গা দশপ্রহরণ ধরিণী... স্বদেশ বন্দনার নামে আন্দোলনকারীরা মুসলিম বিদ্বেষমূলক এই বন্দে মাতরম‘ গানকে জাতীয়সঙ্গীত হিসেবে চালু করে। একেশ্বরবাদী কোনাে মুসলিম কি করে এই মন্ত্র উচ্চারণ করতে পারত? এই কথাটা কোনাে হিন্দু কংগ্রেস নেতাও কোনােদিন বুঝতে পারেন নি।
ধনু শেখের লঞ্চটি একতলা। কাঠের বডি। যাত্রী ধারণক্ষমতা পঞ্চাশ। লঞ্চ চলাচল শুরু করেছে ধর্মপাশা সােহাগগঞ্জ রুটে । লঞ্চের নাম ‘এমএল বাহাদুর’ । কমলা‘ নামই ঠিক ছিল, এর মধ্যে কমলার এক পুত্রসন্তান হওয়ায় নাম বদলেছে। ছেলের নাম বাহাদুর। তার নামে লঞ্চের নাম। মেয়েছেলের নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া ঠিক না। এতে দোষ লাগে। আয় উন্নতি হয় না।
মাওলানা ইদরিস দোয়া পড়ে লঞ্চে বখশে দিয়েছেন। কালিবাড়ির পুরােহিত এবং অম্বিকা ভট্টাচার্যও জবাফুল, গঙ্গাজল দিয়ে লঞ্চ শশাধন করে দিলেন। সারেঙের ঘরে গণেশ মূর্তি বসানাে হয়েছে। যাকে বলে আটঘাট বেঁধে নামা। নিজের লঞ্চ নিয়ে ধনু শেখ গেল ধর্মপাশায়। প্রাক্তন মুনিব নিবারণ চক্রবর্তীর আশীর্বাদ নিতে। উনাকে লঞ্চটা দেখানাের শখও আছে। নিবারণ চক্রবর্তী বিস্মিত হয়ে বললেন, তুমি লঞ্চ কোম্পানি খুলেছ ?
ধনু বলল, জে কর্তা । একটাই এখন লঞ্চ নাম দিয়েছি বাহাদুর । দোতলা একটা স্টিল বডি কিনার শখ আছে, যদি আপনের আশীর্বাদ পাই।। ……….এত টাকা পাইলা কই ? চুরি–ডাকাতি করছ নাকি ? ডাকাতি করার ইচ্ছাই ছিল, হঠাৎ একজন কিছু টেকা দিল । সেই একজনটা কে ? জমিদার হরিচরণ বাবু।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ
কাছখােলা জমিদার ? কাছা খুইলা চলাফেরা করে। খড়ম পইরা জমিদারি দেখতে যায়। সে শুনছি দুনিয়ার টাকা উড়াইতেছে। তােমারে হঠাৎ টাকা দিল কেন ? তার মতলবটা কী ? …….ক্যামনে বলব। কেউ কানে ধইরা উঠবােস করায়, কেউ লঞ্চ কিন্যা দেয়— কারণ বােঝা মুশকিল। দুনিয়া বড় জটিল।
ঠিক কইরা বলাে তাে, তুমি আমার আশীর্বাদ নিতে আসছ, নাকি অন্যকিছু? …………অন্যকিছুই না। হরিচরণ কি আমার পিছে লাগছে ? তার সাথে তাে আমার কোনাে বিবাদ নাই। আমার ব্যবসা। তার জমিদারি। উনার কথা মনেও আনবেন না। সাধু মানুষরে টানাটানি করা ঠিক না। উনি বিরাট সাধু।
আমারে উপদেশ দিবা না। কচুগাছের পাতা বড় হইলেই সে বটগাছ হয় । কচুগাছ কচুগাছই থাকে। ……অবশ্যই থাকে। খাঁটি কথা বলেছেন। এজাজত দেন, বিদায় হই। | ধনু শেখ হাসিমুখে বের হলাে। নিজের লঞ্চে করে সােহাগগঞ্জ ফিরল। সারেং–এর ঘরে বাতাস খেতে খেতে ফেরা। এর মজাই অন্যরকম।
প্রথম মাসের লাভের অর্ধেক সে দিতে গেল জমিদার হরিচরণকে। হরিচরণ বললেন, আমি তাে তােমার সঙ্গে লঞ্চের ব্যবসায় নামি নাই। ……………….ধনু শেখ বলল, তাহলে টাকা দিয়েছেন কী জন্যে ?
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ
তােমাকে সাহায্য করার জন্যে। বিরাট বিপদে পড়েছিলা। নিরন্ন দিন কাটাইতেছিলা । আমার কারণেই বিপদে পড়লা, তাই সামান্য সাহায্য। ………..টাকা ফেরত দেয়া লাগবে না ? ……..অন্যভাবে ফেরত দিবা। ডিসিট্রিক্ট বাের্ডের রাস্তায় মনিহারদির পুলটা ভাঙা। ভালাে কাঠের পুল বানায়া দিবা।
পুল আপনে বানান। আমার বানানাে পুলে হিন্দুরা কেউ উঠবে না। …..উঠলে না উঠবে। আপনের কী ? হরিচরণ চুপ করে রইলেন। ধনু শেখ তীব্রগলায় বলল, পুলে উঠবে না। এইটা একটা কথা কইলেন ? এরারে আমি থাপড়ায়া পুলে তুলব। আমার নাম ধনু।।
