মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ

মধ্যাহ্ন

গারােদের ধুতি পরা মনিশংকর বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যেককেই আলাদা করে বলছেন, শেখের পােরা প্রাসাদ না নিয়া কেউ যাবে না সইন্ধ্যাকালে বাইজি নাচ হবেদলেবলে আসবামেয়েছেলেদের জন্যে চিকের পর্দার ব্যবস্থা আছে

পূজা নিয়ে জুলেখার সংসারে বিরাট অশান্তি শুরু হলােজুলেখা স্বামীর কাছে বায়না ধরেছে পূজা উপলক্ষে তাকে নতুন লাল শাড়ি দিতে হবেসুলেমান বিস্মিত হয়ে বলেছে, তােমারে শাড়ি দিব কেন ? তুমি কি হিন্দু

জুলেখা বলল, ঈদেও শাড়ি দেন নাই। …………পয়সার অভাবে দিতে পারি নাইএখন তাে পয়সা হইছেনয়া বাবুর কাম করেছেনএখন দেন। ……….সুলেমান মহাবিরক্ত হয়ে বলেছে, পূজার সময় শাড়ি দেয়া ইসলামধর্মে নিষেধ আছেবিরাট পাপ হয়। যে শাড়ি দিবে সে যেমন পুলসেরাত পার হইতে পারবে না, যে শাড়ি পরবে সেও পারবে না। 

আপনেরে বলছে কে? ……..বলাবলির কিছু নাইসবাই জানেপ্রয়ােজনবােধে জুম্মাঘরের ইমাম সাবরে জিগাইতে পার। ………আমার একটা মাত্র শাড়িভিজা শাড়ি শরীরে শুকাইতে হয়। …….সুলেমান দরাজ গলায় বলল, পূজার ঝামেলা শেষ হােক, একটা শাড়ি কিন্যা দেব । 

লাল শাড়ি। ……সন্তান হওনের পর লাল শাড়ি পরা নিষেধজিনভূতের নজর থাকে লাল শাড়ির দিকেতারপরেও দেখি বিবেচনা করে। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ

জুলেখার লাল শাড়ির শখ অদ্ভুত উপায়ে মিটে গেলমনিশংকর বাবু পূজা উপলক্ষে বিতরণের জন্যে একগাদা শাড়ি নিয়ে এসেছিলেনপূজার দ্বিতীয় দিনে তিনি আঁকাভর্তি শাড়ি নিয়ে বিতরণে বের হলেন হিন্দু মুসলমান বিবেচনায় নাএনে সবাইকে শাড়ি দিতে লাগলেনজুলেখার বাড়ির সামনে যখন এসে দাঁড়ালেন তখন দুপুরজুলেখা পুকুরে গােসল সেরে ভেজা শাড়িতে উঠানে এসে দাঁড়িয়েছেসুলেমান বাড়িতে নেইতার ছেলেও বাড়িতে নেইমনিশংকরকে দেখে গায়ে লেপ্টে থাকা ভেজা শাড়ির জন্যে তার লজ্জার সীমা রইল নাতার ইচ্ছা করল আবার ঝাপ দিয়ে পুকুরে পড়তে। 

মনিশংকর বললেন, মাগাে, আমি আপনার পুত্রপুত্রের কাছে মাতার লজ্জার কিছু নাইদেবী দুর্গা আপনার জন্যে সামান্য উপহার পাঠিয়েছেনগ্রহণ করলে ধন্য হবাে। ……..জুলেখা বলল, কে পাঠায়েছেন ? আমার মাধ্যমে দেবী দুর্গা পাঠিয়েছেনআমি মুসলমানজানিমাগাে, পছন্দ করে একটা শাড়ি নেন। 

জুলেখা কাঁপা কাঁপা হাতে একটা শাড়ি নিল তার কাছে মনে হলাে সে তার জীবনে এত সুন্দর শাড়ি দেখে নি জবাফুলের মতাে লালশাড়িআঁচলে সােনালি ফুলফুলগুলি থেকে সােনালি আভা যেন ঠিকরে পড়ছেশাড়ি নিয়ে সুলেমান কোনাে ঝামেলা করল নাপূজার পরে তাকে শাড়ি কিনে দিতে হবে এই স্বস্তিই কাজ করল। 

হরিচরণের বাড়িতে মনিশংকর উপস্থিত হয়েছেনতার হাত ধরে আছে পুত্র শিবশংকরছেলেটা বাবার ন্যাওটাবাবাকে ছেড়ে একমুহূর্তও থাকতে পারে নাপূজাবাড়ির হৈচৈ ফেলে সে বাবার হাত ধরে ঘুরছে। 

হরিচরণ ব্যস্ত হয়ে উঠানে এসে দাঁড়াতেই মনিশংকর বললেন, আমার বাড়িতে মা এসেছেনআপনি নাই কেন? …………হরিচরণ বললেন, আমি কীভাবে যাব ? আমি পতিতজন

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ 

মনিশংকর বললেন, মাকাছে কেউ পতিত নাআমি আপনাকে নিতে এসেছি। ……….পূজামণ্ডপে আমি উপস্থিত হলে অন্যরা আপনাকে ত্যাগ করবে। …….অন্যরা ত্যাগ করলে করবেমা আমাকে ত্যাগ করবে নাআপনি যদি আমার সঙ্গে না যান আমি কিন্তু আপনার উঠানে উপবাস করব । 

দীর্ঘদিন পর হরিচরণের চোখে পানি এসে গেল। মনিশংকর ছেলেকে বললেন, যাও কাকাকে প্রণাম কর। ………..হরিচরণ আঁৎকে উঠে বললেন, নানা। …মনিশংকর বললেন, আপনি অতি পূণ্যবান ব্যক্তিআপনাকে প্রণাম না করলে কাকে করবে

মূল মণ্ডপের বাইরে উঠানে হাঁটুগেড়ে জোড় হস্তে হরিচরণ বসেছেনতাঁর চোখ বন্ধঘণ্টা এবং ঢাকের আওয়াজ কানে আসছেনাকে আসছে ধূপের গন্ধতার উচিত দেবী দুর্গার বন্দনা করাতিনি একমনে বলছেন, কৃষ্ণ কোথায় ? আমার কৃষ্ণ! কৃষ্ণ। 

এইসময় একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটলমােটামুটি অপরিচিত লােকজনের মধ্যে পরিচিত একজনকে দেখে দৌড়ে এসে তার কোলে ঝাঁপ দিয়ে পড়লজহিরহরিচরণ অনেকদিন আগে দেখা স্বপ্নে ফিরে গেলেনতাঁর মনে হলাে, সত্যি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তার কোলেজ্ঞান হারিয়ে উঠানে পড়ে গেলেনচারদিকে হৈচৈ পড়ে গেলপূজারি ঠাকুর ঘােষণা করলেন, ধর্মচ্যুত মানুষ দেবীর কাছাকাছি আসায় এই বিপত্তিদেবী বিরক্তি হয়েছেনদেবীর বিরওি দুকরতে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবেআলাদা পূজাপাঠ লাগবে। 

হরিচরণ দুর্বল শরীরে শুয়ে আছেনতাঁকে দেখতে এসেছেন শশীভট্টাচার্যডাক্তার কবিরাজের মতাে গম্ভীর ভঙ্গিতে নাড়ি ধরে থেকে বলেছে, আপনার কি মৃগী আছে ? হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া মৃগীর লক্ষণ। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ

আমার মৃগী নাই। ……..নাই, হতে কতক্ষণ ? সাবধানে থাকবেনএকডােজ ওষুধ দিচ্ছি, খেয়ে ঘুমিয়ে থাকুনওষুধের কারণে সুদ্রিা হবেক্লান্তি দূর হবে। …….হরিচরণ বিস্মিত হয়ে বললেন, তুমি ডাক্তারি কর নাকি ? …শশী ভট্টাচার্য বললেন, আমি শখের চিকিৎসকবায়ােকেমিক চিকিৎসা করি বায়ােকেমিক চিকিৎসা বিষয়ে কি আপনি কিছু জানেন

 

 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *