মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

মধ্যাহ্ন

কার্তিক মাসের শেষ। উত্তরের গারাে পাহাড় থেকে শীতের হিমেল হাওয়া উড়ে আসতে শুরু করেছেএবারের লক্ষণ ভালাে নামনে হয় ভালাে শীত পড়বেদুবছর পরপর হাড় কাঁপানাে শীত পড়েগত দুবছর তেমন শীত পড়ে নি। হরিচরণ চাদর গায়ে পুকুরপাড়ে এসে বসেছেনতার মন বেশ খারাপতিনি খবর পেয়েছেন ধনু শেখের দোতলা লঞ্চে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে

ভেদবমি করতে করতে একজন মারা গেছেবান্ধবপুরে কলেরা এসে ঢুকেছেগ্রামের পর গ্রাম শূন্য করে দেয়া এই ব্যাধির কাছে মানুষ অসহায়তিনি মনে মনে বললেন, দয়া কর দয়াময়যেন দেবী ওলাউঠা লঞ্চে করে বান্ধবপুর নানামেনতার প্রার্থনার সময় বিস্ময়কর এক ঘটনা ঘটল

তার দিঘিতে একজোড়া শীতের হাঁস নামলশীতের পাখি নামে হাওরে, মনে হচ্ছে এই প্রথম কোনাে দিঘিতে নামলদিঘিও এমন কিছু বড় দিঘি নাএরা কি মনের ভুলে নেমে পড়েছে ? নাকি কোনাে কারণে দলছুট হয়েছে ? দলছুট হবার সম্ভাবনাই বেশি

দুটি হাঁসের একটি পানিতে স্থির হয়ে আছেঅন্যটি একটু পরপর ডুব দিচ্ছেএদের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সুযােগ থাকলে জিজ্ঞেস করা যেত, ঘটনা কী

হরিচরণ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলেনদু’টা পাখিই ঘাটের কাছে ভয় পেয়ে ওদের উড়ে যাওয়া উচিত, তা গেল নাসম্ভবত এরা মানুষ দেখে অভ্যস্ত 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

মানুষ যে বিপদজনক প্রাণী এই তথ্য এখনাে জানে নাহরিচরণ বললেন, তােদের সমস্যা কী রে ? একটা হাস তার দিকে তাকালদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ক্লান্ত রােগা শরীরদুই থেকে আড়াই মাস এরা থাকবেমােটাতাজা হয়ে দেশে ফিরে যাবেএকটা পাখি তার একজীবনে কতবার আসা যাওয়া করে এই তথ্য কি কেউ জানে ? হরিচরণ ঠিক করে ফেললেন গদিতে পৌছেই পাখিবিষয়ক কোনাে বইপত্র পাওয়া যায় কিনা জানতে চেয়ে কোলকাতায় চিঠি 

লিখবেনমানব বুক হাইসনামে একটা বইয়ের দোকানের সঙ্গে তার যােগাযােগ হয়েছেতার প্রয়ােজনীয় বইপত্র এরাই পাঠায়। জুলেখা বাটিভর্তি খেজুরের রস নিয়ে এসেছেনিজেদের গাছের রসসে জ্বাল দিয়ে ঘন করেছেঅপূর্ব ঘ্রাণ ছেড়েছেখেজুরের রস খেজুরপাতা দিয়ে জ্বাল না দিলে ভালাে ঘ্রাণ হয় নাজুলেখা খেজুরপাতা দিয়েই রস জ্বাল দিয়েছে। 

জুলেখা লজ্জা লজ্জা গলায় বলল, আপনার জন্যে খেজুরের রস আনছি। …..ভালাে করেছরস ভালাে হয়েছেসুঘ্রাণ ছেড়েছেতাকিয়ে দেখ দিঘিতে দুটা হাঁস নেমেছে। ………আল্লাকী আচানক! আরাে কি নামবে

নামতে পারেসব পশুপাখি নিজেদের ভেতর যােগাযােগ রাখে এই দুটা পাখি হয়তাে অন্যদের খবর দিবেআমি ঠিক করেছি আজ আর গদিতে যাব ।………..ঘাটে বসে থাকব দেখি আরাে পাখি নামে কিনা। ….জুলেখা মুখে আঁচল চাপা দিতে দিতে বলল, বাবা, আপনি আজব মানুষ। 

হরিচরণ বললেন, আমরা সবাই আজব মানুষতুমি আজব, তােমার ছেলেআজব, তােমার স্বামী আজবঈশ্বর নিজে আজব, সেই কারণে তিনি আজব জিনিস তৈরি করতে পছন্দ করেনরসের বাটিটা দাও, এক চুমুকে খেয়ে ফেলি। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

জুলেখা বিস্মিত হয়ে বলল, এতটা রস একসঙ্গে খাবেন ? কোনাে অসুবিধা নাই, দুপুরে ভাত খাব না। ..হরিচরণ তৃপ্তি করে বাটিভর্তি ঘন খেজুরের রস শেষ করলেনপুকুরের পানিতে ঠোট ধুতে ধুতে বললেন, মা, তুমি নানান সময়ে নানান ভাবে আমার সেবা করছতােমাকে একটা উপহার দিতে চাইকী পেলে তুমি খুশি হবে

জুলেখা জবাব দিল নাযদিও তার ইচ্ছা করছে বলে, আমাকে একটা কলের গান কিনে দেনএই যন্ত্রটার জন্যে আমি আমার জীবন দিয়ে দিতে রাজিকী অদ্ভুত জিনিস! পিতলের এক চোঙচোঙের ভেতর দিয়ে আসে কী সুন্দর গানএকটা গান ইচ্ছা করলে দশবার শােনা যাবেসুরে ভুল হবে নাতালে ভুল হবে নাবাজনায় ভুল হবে নাকী আজব যন্ত্র ! ইশ সে যদি তার বাপজানকে যন্ত্রটা দেখাতে পারত

হরিচরণ বললেন, তােমার মনের মধ্যে কিছু আছে, বলে ফেলজুলেখা বলল, মনের মধ্যে কিছু নাই। …বলতে বলতে সে হরিচরণের পাশে বসলহরিচরণ বললেন, এই হাঁসের একটা নাম আছে, সেটা জানাে ? ….জুলেখা বলল, না। 

এর নাম দেশান্তরী পাখিএক দেশ থেকে আরেক দেশে যায়, এই জন্যেই দেশান্তরী | জুলেখার মনে হলােকী সুন্দর নাম! দেশান্তরীপাখিদের মতাে দেশান্তরী মানুষও তাে আছে যাদের কাজ এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়াতার নিজের বাবাও তাে দেশান্তরী জুলেখার ইচ্ছা করছে দেশান্তরী দিয়ে একটা গান লেখে

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

প্রথম লাইন দেশান্তরী বান্ধই গাে, কোন দেশেতে যাও? পরের লাইনটা মাথায় আসছে না। সে যদি লেখাপড়া জানত এই লাইনটা লিখে রাখত লেখাপড়া শেখা খুব কি জটিল ? সে কোরান মজিদ পাঠ করতে পারেলিখতে পারে না| হরিচরণ বললেন, জুলেখা, তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও ? বলতে চাইলে বলাে। 

জুলেখা মাথা নিচু করে বলল, আমি বাংলা লেখা বাংলা পড়া শিখতে চাই । | হরিচরণ বেশ কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থাকা তরুণীর দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, আমি নিজে তােমাকে শেখাব তুমি তােমার স্বামীর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে রাখবেমুসলমানদের মধ্যে এই বিষয়টা দেখেছিতারা স্ত্রীদের লেখাপড়া পছন্দ করে না। 

জুলেখা বলল, স্ত্রী লেখাপড়া শিখলে স্বামীর হায়াত কমে, এইজন্যে পছন্দ করে না। এইসব তাে ভুল কথাসবাই জানে ভুল কথা, তারপরও ভুল কথাই মানেতুমি সুলেমানকে আমার কাছে পাঠাবা, আমি তারে বুঝায়া বলব। 

সে দেশে নাইমৈমনসিং গেছে কামেফিরতে একমাস লাগবআমি কি এর মধ্যে শিখতে পারব না ? …………হরিচরণ কিছুক্ষণ জুলেখার দিকে তাকিয়ে বললেন, অবশ্যই পারবা বল। জুলেখা বলল, এখন বলাে, জুলেখা বলল, । …এক টুকরা কয়লা আনআমি অক্ষর দুইটা লিখবআজ সন্ধ্যায় তোমার জন্যে বাল্যশিক্ষা কিনে আনব। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

জুলেখা এক টুকরাে কয়লা এনেছেশ্বেতপাথরে সেই কয়লার দাগ বসছে হরিচরণ উঠে দাঁড়ালেনঘাটে বসে থাকার পরিকল্পনা তিনি বাদ দিয়েছেনতিনি বাজারে যাবেনমেয়েটার জন্যে স্লেট পেন্সিল কিনবেনবাল্যশিক্ষা কিনবেন। 

হরিচরণ ঘাট থেকে যাবার কিছুক্ষণ পরই বিস্ময়কর ঘটনা ঘটলদিঘিতে ঝাকে ঝাকে হাঁস নামতে শুরু করল। দেখতে দেখতে দিঘি হাঁসে পূর্ণ হলাে অদ্ভুত দৃশ্যযেন দিঘিতে হাঁসের সর পড়েছেসেই সর উঠানামা করছেহাঁসদের কারণে দিঘি থেকে হো হো হো জাতীয় গম্ভীর ধ্বনি উঠছে। 

একই সময় বাবু মনিশংকরের বাড়ি থেকে অসময়ে শাঁখের শব্দ হতে লাগলমনিশংকরের এক জেঠির ভেদ বমি শুরু হয়েছে আশঙ্কা করা হচ্ছে দেবী ওলাউঠার দয়া দেবীকে দূর করার জন্যেই শঙ্খধ্বনিঅদ্ভুত শব্দ আসছে শঙ্খ থেকেওভো ভো ভোযেন দূর থেকে লঞ্চ ভো দিচ্ছেশঙ্খের শব্দের সঙ্গে হাঁসের শব্দ মিলে একাকার হয়ে গেল

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *