রজনী পর্ব:০৩ হুমায়ূন আহমেদ

রজনী পর্ব:০৩

আচ্ছা ঠিক আছে, আমিই নিয়ে যাচ্ছি।তোমাকে নিতে হবে না।আপনি শুধু শুধু রাগ করছেন কেন? তোমার সঙ্গে আমি এই প্রসঙ্গে আর একটি কথাও বলতে চাই না।আমি খুব আহত হবার ভান করে বললাম, যাচ্ছি একটা চাকরির ব্যাপারে। পকেটে ইউরিন-ফিউরিন এই জন্যেই নিতে চাচ্ছিলাম না। না বুঝেই রাগ করেন।লক্ষ করছি, বাবা অপ্রস্তুত বোধ করতে শুরু করেছেন। মুখ কেমন লম্বা ধরনের হয়ে যাচ্ছে। চোখের দৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে বোকাটে। তিনি নিচু গলায় বললেন, কিসের ইন্টারভ্য? বেক্সিমকো বলে একটা কোম্পানি।তোর তো এমএ-র রেজাল্টই এখনো হয় নি! রেজাল্টের আশায় বসে থাকলে আরো তিন বছর লাগবে। এখনো ভাই হয় নি। ভাইভা হবে, তারপর টিচাররা দয়া করে খাতা দেখবেন, আবার এক মাস ঘুম।

তারপর চলে যাবেন বিদেশ। আর তাঁর কোনো খোঁজখবর পাওয়া যাবে না। আমাদের রেজাল্টও বন্ধ।বাবা তাঁর মুখ করুণ করে ফেললেন। বেচারাকে দেখে এখন মায়াই লাগছে। পুত্রের প্রতি সহানুভূতিতে তাঁর হৃদয় আর্দ্র।ইউরিন স্যাম্পলটা কোথায় রেখেছেন বাবা? বাথরুমের তাকে? থাক থাক। তোকে নিতে হবে না।কোনো অসুবিধা নেই।আহা, বললাম তো নিতে হবে না! যাচ্ছিস একটা শুভ কাজে।আমি প্রায় জোর করেই ইউরিন স্যাম্পল নিয়ে নিলাম। অপরাধবোধে বাবা এখন জর্জরিত। সারাক্ষণ অস্বস্তিতে ভুগবেন। দুপুর বেলা ভালো করে খেতেও পারবেন না। অথচ আর একটু হলেই উল্টো ব্যাপার ঘটত। আমি যদি বোতলটা না নিয়ে আসতাম, তাহলে অপরাধবোধ আমাকে কাবু করে ফেলত।

বারবার মনে হত, বুড়ো বাবার সামান্য একটা কাজ।ঘর থেকে পা ফেলবার ঠিক আগমুহূর্তে মা বললেন, ধীরেন বাবুর কাছ থেকে পুরোনো ঘিটা দিয়ে যাস তো বাবা।এক্ষুনি লাগবে? হুঁ। বুক ঘড়ঘড় করছে। মালিশ করে দেব।আমি তো তেমন কোনো ঘড়ঘড় শুনতে পেলাম না।যা বাবা নিয়ে আয়, কতক্ষণ আর লাগবে? মার চোখ এখন দেখাচ্ছে অবিকল গরুর মতো। ছলছল করছে, যেন এক্ষুনি পানি উপচে পড়বে। চোখের এই আবেগ অগ্রাহ্য করা অত্যন্ত কঠিন। তবে ইদানীং অনেক কঠিন কাজ বেশ সহজ ভঙ্গিতে করতে পারছি। আমি মার দিকে না তাকিয়ে বললাম, বিকেলে ফেরার পথে নিয়ে আসব। তুমি কোনো চিন্তা করবে না। বাবার কামান দাগা সন্ধ্যার আগে শুরু হবে বলে মনে হচ্ছে না।

মা আমার সঙ্গে-সঙ্গে আসছেন। তার মানে মার পেটে আরো কিছু কথা রয়ে গেছে। ঘর থেকে বেরুবার পর তিনি তা উগরে দেবেন। কী বলবেন তাও আঁচ করতে পারছি। নাখালপাড়া যেতে বলবেন। আজ মাসের চব্বিশ। এই সময়ে আমাকে নাখালপাড়া যেতে হয়। আমার বড় বোনের শ্বশুরবাড়ি। তার কাছ থেকে কিছু। টাকাপয়সা আনতে হয়। পরের মাসের তিন-চার তারিখে আমাকেই সেটা ফেরত নিয়ে যেতে হয়। গত মাসে টাকা ফেরত দেওয়া হয় নি, আবার এ মাসে যাওয়া! বাবা বীরু।বলে ফেল।অনুর কাছে আজ একবার যেতেই হবে। তিন শ টাকা নিয়ে আসবি। বাবা, মানিক।পাগল হয়েছ মা! আগামী এক সপ্তাহ নাখালপাড়ার দিকে যেতে পারব না।একটা পয়সা ঘরে নেই।বাবাকে বল–বাবার দায়িত্ব। সংসার চালানোর দায়িত্ব তোমাকে মাথায় নিতে কে বলেছে?

মাকে দ্বিতীয় কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে আমি রাস্তায় নেমে পড়লাম। চমৎকার একটা দিন। ঝকঝকে রোদ। বাতাস মধুর এবং শীতল। এই বাতাস আজ সারাদিনেও হয়তো তেতে উঠবে না। তবে একে না পাওয়া গেলে ভিন্ন কথা। তখন সবই অসহ্য বোধ হবে।এই বীরু, যাচ্ছিস কোথায়? আমি কয়েক মিনিট চিন্তা করলাম, জবাব দেব কী দেব না। টুকু নৰ্দমার পাশে পেচ্ছাব করতে দাঁড়িয়েছে। ঘাড় ঘুরিয়ে সেখান থেকেই কথা বলছে। তার ছোটখাটো মুখে বিশাল এক গোঁফ। কুৎসিত দেখাচ্ছে।ব্যাপার কী, সাউন্ড দিচ্ছি না কেন? যাচ্ছিস কোথায়?ঠিক নেই কিছু।তোর কাছে দশটা টাকা হবে নাকি?

না।পাঁচটা হবে কি না দেখু। শালা পকেট একেবারে ইয়ে।হবে না।তাহলে একটা সিগারেট খাওয়া দোস্ত। রিকোয়েস্ট।আমি দুটো সিগারেট কিনলাম। সিগারেট দিয়ে যদি সহজে তার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায় এই আশাতেই কেনা। টুকু ছোঁ মেরে সিগারেট নিয়ে হাসিমুখে বলল, একটা চায়ের পয়সা দিয়ে যা দোস্ত। তোর পায়ে ধরি।টুকু সত্যি-সত্যি পা ধরতে এল। গুণ্ডামি করলেও টুকু জাতে ওঠে নি। কেউ তাকে পাত্তা দেয় না। বিনা পয়সায় চা-সিগারেট খাওয়ায় না। নগদ পয়সা দিতে হয়।দোস্ত, আমার রিকোয়েস্টটা রাখ। একটা পাত্তি ছেড়ে দে।তুই অতসীদিকে কী বলেছিলি?

টুকু দপ করে নিভে গেল। মুখ আমশি করে বলল, মিসটেক হয়ে গেছে, বুঝতে পারি নি। আমি ভাবলাম নতুন কেউ। এমন লজ্জা পেয়েছি! আর বলিস না। রাতে ঘুম হয় নি।অতসীদি তোকে যেতে বলেছে।সত্যি? হুঁ।যাব কী করে, বল? হেঁটে হেঁটে যাবি। আর কীভাবে যাবি? তোর জন্যে পালকি লাগবে? অতসীদি আর কী বলল? উনি আর কিছু বলেন নি–আমি বললাম।কী বললি? বললাম, তুই ঠিক করে রেখেছিলি বড় হয়ে অতসীদিকে বিয়ে করবি।টুকু ফ্যাকাসে হয়ে গেল। কেমন অন্যরকম দেখাচ্ছে তাকে।আর কী বললি? জিজ্ঞেস করল, তুই আজকাল কী করি। আমি বললাম, ছিনতাইয়ের কাজ। করে। পার্ট-টাইম কাজ। ফুল-টাইম কাজ হচ্ছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা, পরিচিত। কাউকে পেলে ভিক্ষা চাওয়া।ব্লাফ দিচ্ছিস, ঠিক না?

ব্লাফ দেব কেন, ব্লাফ দেবার আমার দরকারটা কি? হাত ছাড়, আমার জরুরি। কাজ আছে।টুকু আমার হাত ছাড়ল না সঙ্গে-সঙ্গে আসতে থাকল। তার গা থেকে বিকট গন্ধ আসছে। আমি বললাম, আজকাল গাঁজা খাচ্ছিস নাকি? গন্ধে নাড়িভূড়ি উলটে আসছে।টুকু বিড়বিড় করে বলল, কী যে বলিস দোস্ত। ভদ্রলোকের ছেলে না আমি। সস্তার সিগারেট, এই জন্যেই গায়ে গন্ধ হয়ে গেছে। আচ্ছা দোস্ত, সত্যি কথাটা ব, অতসীদি কি যেতে বলেছে? হুঁ।ঐদিনের ব্যাপারটায় মাইভ করেছে, তাই না?

হুঁ। এখন হাত ছাড়ু। তুই আমার হাত গান্ধা বানিয়ে ফেলেছিস। অতসীদির কাছে যাবার আগে গরম পানি দিয়ে গোসল করিস।টুকু হাত ছেড়ে দিয়ে করুণ চোখে তাকিয়ে রইল। চায়ের পয়সা চাইল না। তার মুখের সিগারেটও নিভে গেছে। সে তা বুঝতে পারছে না। নেভানো সিগারেট প্রাণপণে টানছে। আমি বললাম, কী যন্ত্রণা, এখনো সঙ্গে-সঙ্গে আসছিস কেন? টুকু ফিসফিস করে বলল, হাজার পাঁচেক টাকা জোগাড় করে এনে দিতে পারবি? এক মাসে ডাবল করে রিটার্ন দেব। আপ অন গড়।করবি কী টাকা দিয়ে?

কাউকে বলিস না দোস্ত। একটা পিস্তল কিব। জার্মান জিনিস।তোর দৌড় ব্লেড পর্যন্ত। পিস্তল দিয়ে করবি কী? হাত ছাড়্‌।টুকু হাত ছেড়ে দিয়ে আবার রাস্তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ব্যাটার বহুমূত্র হয়েছে। কি না কে জানে। সব সময় দেখি রাস্তার পাশে প্যান্টের জিপার খুলে দাঁড়িয়ে আছে।পুলিশ বক্সের সামনে এশা নেই।মৈনাক পর্বতের সাইজের এক পুলিশ অফিসার পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে। যেন। সে চাচ্ছে, এ-শহরের সবাই তার দু পায়ের ফাঁক দিয়ে হামাগুড়ি দিক। সার্জেন্টের হাতে ওয়াকি টকি। কার সঙ্গে যেন খোশগল্প করছে। ঘন-ঘন বলছে, আরে ব্যাটা বুদ্ধ, সহজ কথা বুঝলি না? আমার জায়গায় মাসুম হলে পুলিশ সার্জেন্টকে দুম করে এক অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসত। হয়তো বলত, এই যে ব্রাদার, আপনি এত মোটা কী করে হলেন, কাইন্ডলি আমাকে বলবেন? অ্যাকাডেমিক ইন্টারেস্টে প্রশ্নটা করছি।

আমি ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশনের ছাত্র। প্রশ্ন শুনে সার্জেন্টের আক্কেল গুড়ুম হয়ে যেত। জবাব দেবার আগেই মাসুম দ্বিতীয় প্রশ্ন করত। সেটি হত প্রথমটির চেয়েও ভয়াবহ।পাবলিক লাইব্রেরিতে মাসুমের সঙ্গে গিয়েছি। মাসুমের কাজে। লাইব্রেরির সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই। কী একটা বই সে ঘন্টা খানিক ধরে খুঁজল। না পেয়ে মহা বিরক্ত। বিরক্তি কাটাবার জন্যেই বোধহয় আমাকে বলল, চল লাইব্রেরিয়ান ব্যাটাকে ভড়কে দিই। গেলাম তার সঙ্গে। লাইব্রেরিয়ান বেচারা বুড়ো মানুষ। কেমন ভালোমানুষ তালোমানুষ চেহারা। মাসুম তাঁর কাছে গিয়ে নিচু গলায় বলল, স্যার, মানুষ খুন করার সহজ পদ্ধতি, এই জাতীয় কোনো বইপত্র আছে? আমাদের বিশেষ দরকার।

লাইব্রেরিয়ান ভদ্রলোক হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন। কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। মাসুম গলার স্বর আরো খানিকটা নামিয়ে বলল, ছুরি, বোমা দিয়ে মানুষ মেরে তোতা স্যার কোনো থ্রিল নেই। আমরা চাচ্ছি নতুন ধরনের কিছু। হাইলি সাইন্টিফিক ধরনের। মডার্ন।মাসুমের মতো কিছু একটা করতে ইচ্ছে হচ্ছে। দুপা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশটাকে আর সহ্য করা যাচ্ছে না। আমি পুলিশ অফিসারটিকে চমকে দিয়ে বললাম, আচ্ছা ভাই, এখানে কি একটি মেয়েকে ঘোরাফেরা করতে দেখেছেন? পুলিশ সার্জেন্ট সত্যি-সত্যি চমকাল। অবাক হয়ে বলল, আমাকে বলছেন?

হ্যাঁ, আপনাকে। লম্বা একটা মেয়ে কোঁকড়ানো চুল। সাধারণত তার কাঁধে চটের একটা ব্যাগ ঝোলানো থাকে। পুলিশ-বক্সের সামনে তার অপেক্ষা করার কথা।এত জায়গা থাকতে পুলিশ-বক্সের সামনে কেন? পুলিশদের আশেপাশে ঝামেলা কম থাকে, এই জন্যেই বোধহয়। আপনি তাহলে দেখেন নি? লোকটি হেসে ফেলল। বেশ অন্তরঙ্গ হাসি। হাসতে-হাসতেই বলল, চা খাবেন? এবার আমার চমকাবার পালা। এ আমাকে চা খেতে বলছে কেন? যেভাবে বলছে, তাতে মনে হচ্ছে না ঠাট্টা করছে।আমি আপনাকে চিনি, আপনার নাম বীরু। শহীদুল্লাহ হলে আপনি রুম নাম্বার দুই হাজার তিরিশে মাঝে-মাঝে ঘুমাতেন।এখনো ঘুমাই।পাস করেন নি?

পরীক্ষাই হয় নি, পাস করব কীভাবে? ইউনিভার্সিটি থেকে বেরুতে আগে চার বছর লাগত, এখন দশ-বার বছর লাগে। আপনি কি শহীদুল্লাহ হলে ছিলেন নাকি? জ্বি। দুই হাজার তেইশ। অনার্স কমপ্লিট করে ঢুকে গেলাম পুলিশে। সারদায় দুবছর ট্রেনিং নিয়ে এখন সার্জেন্ট।ভালো করেছেন।একটু দাঁড়ান, চা নিয়ে আসছি। বাসা থেকে ফ্লাস্কে করে নিয়ে আসি। চা খেতে খেতে অপেক্ষা করুন, এর মধ্যে হয়তো আপনার রোগা লম্বা, চটের ব্যাগ কাঁধের মেয়ে চলে আসবে।বাসায় তৈরি চা, কিন্তু দোকানের চায়ের চেয়েও বিস্বাদ। তার উপর ঠাণ্ডা মেরে আছে। এরকম একজন জবরদস্ত পুলিশ সার্জেন্টের চোখের সামনে চা ঢেলে রাস্তায় ফেলে দেওয়া ঠিক হবে না। আমি বিরক্ত মুখে চায়ে চুমুক দিচ্ছি। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি, যদি এশার দেখা পাওয়া যায়।

বীর সাহেব।জ্বি, বলুন।আপনারা এখনো এম.এ. পাশ করতে পারেন নি, ভাবাই যায় না। আমি চাকরিতে জয়েন করে ভালোই করেছি, কী বলেন? খুব ভালো করেছেন। মিলিটারিতে ঢুকতে পারলে আরো ভালো করতেন।ঠাট্টা করছেন? হ্যাঁ ভাই, করছি। পুলিশের সঙ্গে ঠাট্টা করে দেখলাম কেমন লাগে।সে হেসে ফেলল। তাকে এখন আর আগের মতো ভয়াবহ মনে হচ্ছে না। তার দাঁড়িয়ে থাকার যে-ভঙ্গিটি এতক্ষণ অসহ্য মনে হচ্ছিল, এখন সেটাকেই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে পুলিশদের এভাবেই দাঁড়াতে হয়।বীরু সাহেব।জ্বি, বলুন।খুব টেনশনের চাকরি। টেনশনে শরীর ফুলে এরকম হয়েছে।বলেন কী। আমার তো ধারণা ছিল উল্টোটা হয়।

একেক জনের বেলায় একেক রকম হয়। টেনশনে হরমোন ব্যালেন্স নষ্ট হয়ে যায়, তার থেকে এই হয়। কেউ শুকিয়ে যায়, কেউ আমার মতো হয়।বাহ্ ইন্টারেস্টিং তো! আমি যদি কিছু নাও খাই, ফুলতে থাকব। এই যে এত বেলা হয়েছে, আমি কিন্তু চার কাপ চা ছাড়া কিছু খাই নি। ভাত খেতে খেতে দুটা বেজে যাবে।খিদে লাগে না? লাগে না আবার! এখন মনে হচ্ছে একটা বেবি ট্যাক্সি খেয়ে ফেলি। হা হা হা।আমি হাসিতে যোগ দিলাম না। এশার উপর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। এরকম করার মানে কি? কতক্ষণ আমি অপেক্ষা করব? শহীদুল্লাহ হলের এই প্রাক্তন ছাত্র মনে হচ্ছে অতিরিক্ত রকমের মাইডিয়ার। তার তেলতেলে ধরনের ব্যবহার এখন আর ভালো লাগছে না। ভাড়া ঠিক না-করেই আমি একটা খালি রিকশায় উঠে বললাম, চলি, কেমন?

আবার আসবেন। সকালবেলায় আমি এইখানেই থাকি। আর যদি আমাকে না। দেখেন, তাহলে জিজ্ঞেস করবেন—সার্জেন্ট শামসুদ্দিন কোথায়? ওরা ওয়াকি টকিতে ইনফরমেশন দিয়ে দেবে।আমি হেসে ফেললাম। সার্জেন্ট শামসুদ্দিন এমনভাবে কথা বলছে, যে শিগগিরই আমি তার বিরহে ব্যাকুল হয়ে ছুটে আসব পুলিশ-বক্সে। ওয়াকি টকির চল্লিশ মাইল ব্যাসার্ধে বারবার বলা হবে, সার্জেন্ট শামসুদ্দিন, আপনার বন্ধু আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন, চলে আসুন। হ্যালো, হ্যালো, সার্জেন্ট শামসুদ্দিন…।

বীর সাহেব।জ্বি বলুন।আবার দেখা হবে, কেমন? তা তো হবেই। মিছিল নিয়ে যখন আসব তখন দেখা হবে। পিটিয়ে লাশ বানিয়ে দেব।সার্জেন্ট শামসুদ্দিনের মুখ কেমন হয়ে গেল। সে যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। বিড়বিড় করে বলল, এসব কী বলছেন ভাই!সত্যি কথাই বলছি। দি টুথ। আমরা আপনাদের পেটাব, আপনারা আমাদের। আমরা ঢিল ছুঁড়বো। আপনারা আমাদের উপর ট্রাক তুলে দেবেন। টিয়ার গ্যাস, গুলি এইসব চলবে।আমাদের এসব বলছেন কেন? আমাদের দোষটা কোথায়?

ঠাট্টা করছি রে ভাই, ঠাট্টা। পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে রসিকতা।ও তাই বলুন।সার্জেন্ট শামসুদ্দিন হেসে ফেলল। তার দাঁতগুলো চমৎকার। টুথপেস্টের বিজ্ঞাপন হয়। নতুন ধরনের কোনো বিজ্ঞাপন কি দেয়া যায় না? একজন পুলিশ সার্জেন্ট টুথব্রাশ হাতে নিয়ে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিচে লেখা—শান্তির এই প্রহরীর হাসিটিও প্রশান্তির। কারণ ইনি ব্যবহার করেন পিয়া টুথপেস্ট। পিয়া টুথপেস্ট এখন নতুন মোড়কে পাওয়া যাচ্ছে।বাতাস আর মধুর মনে হচ্ছে না। রোদ ঝাঁঝাঁ করছে। আকাশ ধূসর বর্ণ। কড়া রোদে আকাশ ধূসর হয়ে যায়। তাকালেই বমি-বমি ভাব হয়। এ সঙ্গে থাকলে এই ধূসর আকাশই হয়তো অন্যরকম লাগত।

আমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে ভাবলাম—এশার সঙ্গে অনেক দিন পরপর আমার দেখা হয়।রিকশাওয়ালা ঘাড় ঘুরিয়ে বারবার আমাকে দেখছে। সার্জেন্টের সঙ্গে আমার খাতির দেখে সম্ভবত আক্কেল গুড়ুম হয়েছে। ভাড়া নিয়ে কোনো ঝামেলা করবে না। যা দেব তাই সোনা মুখ করে নেবে। অনেক দিন ধরেই পকেটে একটা তাপ্পি মারা পাঁচ টাকার নোট পড়ে আছে। চালানো যাচ্ছে না! এই রিকশাওয়ালার উপর একটা অ্যাটেস্পট নেয়া যেতে পারে।স্যার, কই যাইবেন?

তাই তো, কোথায় যাওয়া যায়। রিকশায় উঠলেই আমার একটা সমস্যা হয়। হঠাৎ মনে হয় আমার যেন কোথাও যাবার জায়গা নেই। বাসে এই সমস্যা নেই। বাসের একটা নির্দিষ্ট গন্তব্য আছে। রিকশার নেই। রিকশায় উঠে গন্তব্যের কথা বলে দিতে হয়।স্যার, কোন দিকে যাইবেন? আরে বাবা, তুমি চালাও না! এত অস্থির হয়ে গেলে কেন? রিকশাওয়ালা ঘাড় ফিরিয়ে কুৎসিত চোখে আমাকে দেখল, যেন আমরা একে অন্যের শত্ৰু। তারপর প্যাডেল চাপতে লাগল নিতান্ত অনিচ্ছায়। এক শত্ৰু অন্য শত্রুকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা মন্দ নয়। আমি সিগারেট ধরিয়ে ভাবতে লাগলাম, কোথায় যাওয়া যায়। যাত্রাবাড়ির দিকে গেলে কেমন হয়?

যাত্রাবাড়ি হচ্ছে এশাদের বাড়ি। এশার বাবা অন্য এক জনের জমি জবরদখল করে দুতিনটা ঘর তুলে দিব্যি আছেন। হাফ বিল্ডিং। পাকা দেয়াল। উপরে টিন।যাত্রাবাড়িতে গেলে এশাকে অবশ্যি পাওয়া যাবে না। এশা এমন মেয়ে, যাকে কোথাও পাওয়া যায় না। ওদের নিজের বাড়িতে তো নয়ই। আমি কখনো গিয়ে পাই। নি।রাত দশটায় একবার ওদের বাড়িতে গিয়ে শুনি, এশা এখনো ফেরে নি। কোথায় গিয়েছে কেউ বলতে পারে না। একটি মেয়ে যে এত রাত পর্যন্ত বাইরে, তা নিয়েও কাউকে চিন্তিত মনে হল না। এশার বাবা বিকট একটা হাই তুলে বললেন, তোমার খুব দরকার থাকলে অপেক্ষা কর, চলে আসবে।কোথায় গেছে সে?

বলে যায় নি তো! এত রাতে একা-একা ফিরবে? তিনি নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, কেউ দিয়ে যাবে নিশ্চয়ই।বিন্দুমাত্র উদ্বেগ আমি লোকটার মধ্যে দেখলাম না, যেন এশা রাতে বাড়ি না-ফিরলেও তাঁর ঘুমের তেমন অসুবিধা হবে না।কি, তুমি চলে যাবে, না থাকবে? বসি কিছুক্ষণ।তুমি কি ওর সঙ্গে পড়? জ্বি।ভালো খুব ভালো।আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম। এ-বাড়িতে অপেক্ষা করাও যন্?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *