শুভ্র গেছে বনে পর্ব – ৫ হুমায়ূন আহমেদ

শুভ্র গেছে বনে পর্ব – ৫

আমার এখন এই অবস্থা পৃথিবীর সব কিছু খেয়ে ফেলতে ইচ্ছা করছে। আমার সবচেয়ে পছন্দের খাবার কী জানেন? মাছ মাংস কিছু না। রসুনের ভর্তা। রসুন পুড়িয়ে শুকনা মরিচ দিয়ে ভর্তাটা বানানো হয়। আমার এখন রসুনভার্তা দিয়ে ভাত খেতে ইচ্ছা করছে।যুথী রাত আটটায় প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে বাসায় ফিরেছে।আজহার বাসার সামনের বারান্দায় টুল পেতে উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, তোকে না অফিসের গাড়ি নামিয়ে দেবে! রিকশায় করে এসেছিস কেন? যুথী বলল, অফিসের গাড়ির চাকা পাংচার হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে আমার নিজের চাকরিও পাংচার।আজহার বললেন, তার মানে কী?

এখন মানে টানে বলতে পারব না; আমার মাথায় পানি ঢালতে হবে, প্ৰচণ্ড জ্বর।জ্বর হলো কেন? যুথী বলল, ভাইরাসঘটিত জ্বর না বাবা, চাকরি পাংচার হবার কারণে জ্বর।সালমা মেয়ের কপালে হাত দিয়ে চমকে উঠলেন। ভীত গলায় বললেন, তোর গা তো পুড়ে যাচ্ছে রে!যুথী বলল, পুড়ে যাওয়াই ভালো। গা পুড়ে কয়লা হয়ে যাবে। সেই কয়লা দিয়ে আগুন করে তোমরা চা খাবে। এবং গীত গাইবে—

পুড়ল কন্যা উড়ল ছাই

তবেই কন্যার গীত গাই।

আজহার বললেন, জ্বর মেয়ের মাথায় উঠে গেছে। বাথরুমে নিয়ে যাও, ননষ্টপ মাথায় পানি ঢালতে থাকো। মেয়েকে শক্ত করে ধরে। মাথা এলিয়ে পড়ে যাচ্ছে তো। আমি ডাক্তার নিয়ে আসি।মাথায় পানি ঢালতে ঢালতেই দিনে বাসায় যে নাটক হয়েছে সালমা মেয়েকে জানালেন। যুথী বলল, বড় ধরনের অন্যায় করেছ মা। কতটা সমস্যায় পড়লে একটা মেয়ে সুটকেস হাতে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে উপস্থিত হয় এটা বুঝতে পারছ না?

সালমা বললেন, টুনু কত বড় অন্যায় করেছে এটা বুঝতে পারছিস না? সে বাপের ঘাড়ে বসে খাচ্ছে। আয় নাই, রোজগার নাই, এরমধ্যে গোপনে বিয়েও করেছে।যুথী বলল, ভাইয়া ভুল করা বা অন্যায় করার মতো মানুষ না। খুব যারা ভালো মানুষ, যেমন আমি, আমরা হলাম গিনি সোনা। গিনি সোনা কী জানো? গিনি সোনা হলো বাইশ ভাগ সোনা দুভাগ তামা। আর ভাইয়ার পুরোটাই সোনা।সালমা বললেন, আমি কী? যুথী বলল, তুমি হলে গিনির উল্টা—নিগি। বাইশ ভাগ তামা আর দুভাগ সোনা।তোর বাবা কী?

বাবার মধ্যে সোনার কোনো কারবার নেই, উনার সবটাই তামা।আজহার ডাক্তার নিয়ে এসেছেন। থার্মোমিটারে জ্বর পাওয়া গেল একশ তিন। ডাক্তার প্যারাসিটামল এবং ঘুমের ওষুধ দিল। ভিজিট নিল না। সে এবছরই ইন্টার্নি পাশ করে তাজ ফার্মেসিতে বসা শুরু করেছে। সে ঘোষণা দিয়েছে প্রথম তিনমাস কোনো ভিজিট নেবে না; আজহারের গোপন ইচ্ছা তার সঙ্গে যুথীর বিয়ে হোক। ডাক্তারের চেহারা সুন্দর। সে তার নিজের লাল রঙের একটা গাড়ি চালিয়ে ফার্মেসিতে আসে। ডাক্তারের নামটাও আজহারের পছন্দ। ভারিক্কি নাম-আমিরুল ইসলাম চৌধুরী। পুরুষের তিন শব্দের ভালো নাম আজহারের অত্যন্ত পছন্দ।

যেসব ডাক্তার ভিজিট নেয় না। তারা রোগীর বাড়িতে চা-বিসকিট খায়, কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে। এই ডাক্তার সেরকম না। প্রেসক্রিপশন লিখেই সে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে হকে বলল, আপনার বান্ধবী নীপা আমার খালা হন। দূরসম্পর্কের খালা।যুথী সঙ্গে সঙ্গে বলল, তাহলে আপনি অবশ্যই আমাকে খালা ডাকবেন।আজহার বিরক্ত গলায় বললেন, এইসব কী ধরনের কথা? ডাক্তার সাহেব, কিছু মনে করবেন না। জ্বর মাথায় উঠে যাওয়ায় যুথ আবোল তাবোল বকছে।ডাক্তার বলল, যুথী খালার কথায় আমি কিছুই মনে করছি না।

শুভ্ৰ লাইলিকে নিয়ে গেছে নীপাদের বাড়িতে। ঘটনা শুনে নীপা বলেছে—একটা মেয়ে বিপদে পড়েছে, সে যতদিন ইচ্ছা আমার এখানে থাকবে। দুটা গেস্টরুম খালি পড়ে আছে, কোনো সমস্যা নেই। যুথীর সঙ্গে কথা বলে আমিই সমস্যার সমাধান করে দেব। আপনি এটা নিয়ে আর ভাববেন না। আপনি বাড়িতে চলে যান। গাড়ি দিচ্ছি। গাড়ি আপনাকে নামিয়ে দেবে।শুভ্ৰ বলল, গাড়ি লাগবে না; আমি হেঁটে হেঁটে যাব। আকাশে মেঘ জমেছে। বৃষ্টি হবে। আমি বৃষ্টিতে ভিজব। অনেকদিন বৃষ্টিতে ভিজি না।

রাত বাজে বারোটা।আজহার এখনো স্টিলের ছাতা হাতে বারান্দায় বসে আছেন টুনুর প্রতীক্ষায়। তার দেখা নেই। সে মনে হয় ঘটনা আঁচ করতে পেরে পালিয়ে গেছে। যুথী মরার মতো ঘুমাচ্ছে। সালমা মেয়ের পাশে জেগে বসে আছেন। লাইলি মেয়েটা কোথায় আছে। এই নিয়ে হঠাৎ দুশ্চিন্তা শুরু করেছেন। পুরো বিষয়টা ভুলে থাকতে চেষ্টা করছেন।হয়েছে পারছেন না। তাঁর মন বলছে টুনু মেয়েটাকে বিয়ে করে নি। হয়তো ভাব হয়েছে। এই মেয়ের সঙ্গে টুনুর ভাব কীভাবে হলো সেও এক রহস্য।লাইলি দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল করেছে। নীপার দেওয়া নাইটি পরেছে। পোশাকটা অশ্লীল ধরনের। লাইলির লজ্জা লাগছে, আবার ভালোও লাগছে।

নীপা বলল, এসো ছবি দেখি। বাড়িতে হোম থিয়েটার আছে। হোম থিয়েটারে ছবি দেখতে অন্যরকম মজা। বাবা যখন বাড়িতে থাকেন, তখন আমরা দুজনে মিলে হোম থিয়েটারে ছবি দেখি।লাইলি বলল, হোম থিয়েটার কী? হোম থিয়েটার হলো মিনি সিনেমাহল। Sixty two inches, টিভিতে ছবি দেখা। চারদিকে সাউন্ড বক্স দেওয়া। বসার সিট গুলিও সিনেমা হলের সিটের মতো। একসঙ্গে বিশজন মিলে সিনেমা দেখার ব্যবস্থা। ভয়ের ছবি দেখবে? দেখব।সাইনিং ছবিটা দেখেছ? স্ট্যানলি কুব্রিকের? চমৎকার ছবি। আমি একবার দেখেছি। আরেকবার দেখতে কোনো সমস্যা নাই।আপনার বাবা কোথায় থাকেন?

উনি জাহাজে জাহাজে থাকেন। আর আমার মা বাবার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর প্রেমে পড়ে তার সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছেন। আমি উনাকে ডাকতাম মজুচাচা। খুব মজা করতেন, এইজন্যে মজুচাচা। মা এখন মজুচাচার সঙ্গে অস্ট্রেলিয়াতে থাকেন। মায়ের একটা ছেলে হয়েছে। ছেলের নাম মা আমাকে রাখতে বলেছিলেন। আমি রেখেছি। তার নাম দিয়েছি বন্ধু! নামটা সুন্দর না? লাইলি তাকিয়ে আছে। নীপা নামের মেয়েটা কত সহজেই না নিজের কথা বলে যাচ্ছে। সে কি কোনোদিন এভাবে কথা বলতে পারবে? বিশাল যারা বড়লোক তারা মনে হয় এভাবেই কথা বলে। আর যারা তার মামার মতো অভাবী মানুষ, তাদের কথাগুলিও হয় অভাবী।

শুভ্ৰ সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে সিমেন্টের বেঞ্চে বসে আছে। জায়গাটা অন্ধকার না। স্ট্রীট ল্যাম্পের আলো আছে। বসে থাকতে শুভ্ৰয় খারাপ লাগছে না। কিছুক্ষণ আগে একপশলা বৃষ্টি হয়েছে। শুভ্রর শার্ট ভিজেছে। বাতাসে ভেজা শার্ট থেকে ঠান্ডা গায়ে লাগছে। গা কেঁপে উঠছে। তার কাছে মনে হচ্ছে সে অতিরিক্ত ঠান্ডা কোনো এসি ঘরে বসে আছে। তার বাবার অনেকগুলি অফিসের একটা এরকম ঠান্ডা। চিকেন ফেদার কোম্পানির এমডির অফিস।চিকেন ফেদার নামটাও শুভ্রর দেওয়া। এবং কাগজেকলমে শুভ্ৰ সেই অফিসের এমডি; যদিও মাত্র দুবার সেই অফিসে গিয়েছে।

শুভ্ৰ হঠাৎ একটু নড়েচড়ে বসল। তার বেঞ্চের এক কোনায় অল্পবয়েসী একটা মেয়ে এসে বসেছে; বাচ্চা মেয়ে। পনেরো-ষোল বছরের বেশি বয়স হবে। না। মেয়েটা এত রাতে পার্কে কী করছে কে জানে! তবে মেয়েটা বেশ সহজস্বাভাবিক। তার সঙ্গে লাল রঙের ভ্যানিটিব্যাগ। সে ব্যাগ খুলে একটা লিপষ্টিক বের করল। আয়না বের করল। এখন সে আয়োজন করে ঠোঁটে লিপষ্টিক দিচ্ছে। এত রাতে মেয়েটা সাজগোজ শুরু করেছে কেন কে জানে! শুভ্র আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। এখন সে কপালে একটা লাল রঙের টিপ দিয়ে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, ভাইজান দেখেন তো টিপটা মাঝখানে পড়ছে?

শুভ্ৰ বলল, হ্যাঁ।মেয়েটা শুভ্রর দিকে পুরোপুরি ফিরে বলল, এই পরথম টিপ মাঝখানে পড়ছে। সবসময় আমার টিপ হয় ডাইনে বেশি যায়, নয় বাঁয়ে বেশি যায়। এর ফলাফল খুব খারাপ। ফলাফল কী জানেন? না।ফলাফল সতিনের সংসার।শুভ্র বলল, এত রাতে তুমি এখানে কী করছ? মেয়েটা অবাক হয়ে বলল, এত রাইতে এইখানে কী করি আপনে বুঝেন না? শুভ্র বলল, না। তবে তোমার উচিত বাসায় চলে যাওয়া। ঢাকা শহরে অনেক দুষ্টলোক থাকে। তুমি যদি চাও আমি তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিতে পারি।মেয়েটা বলল, আমার চড়নদার লাগে না। আপনে পার্কে আসছেন কী জন্যে? মেয়েমানুষের সন্ধানে আসেন নাই?

শুভ্ৰ অবাক হয়ে বলল, মেয়েমানুষের সন্ধানে কেন আসব? আমার মা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। কাজেই আমি পার্কে বসে আছি।মেয়েটি বলল, আমারও আপনার মতো অবস্থা। আমার বাবা-মাও আমারে বাইর কইরা দিছে। বলছে, রোজগার কইরা খা। আমি রোজগারে বাইর হইছি। এখন বুঝেছেন? শুভ্র বলল, না। তোমার নাম কী? ফুলকুমারী। বাহ, নামটা তো খুব সুন্দর।ব্যবসার জন্যে এই নাম নিছি। আসল নাম মর্জিনা।

শুভ্ৰ বলল, তোমার কিসের ব্যবসা? মর্জিনা বলল, কিসের ব্যবসা আপনার না জানলেও চলবে। খাওয়াদাওয়া করেছেন? দুপুরে খেয়েছি। রাতে কিছু খাই নি।ক্ষিধা লাগছে? হ্যাঁ। মানিব্যাগ রেখে এসেছি তো। ক্ষিধে লাগলেও কিছু খেতে পারব না।চলেন আমার সাথে।শুভ্ৰ বলল, কোথায় যাব? মর্জিনা বলল, আপনারে খানা খাওয়াব। খাবেন গরিবি খানা? খাব।বাপজান রান্ধে। সে ভালো বাবুর্চি। আগে রিকশা চালাইত। ঠ্যাং কাটা পড়ায় ঘরেই থাকে। আমার জন্যে রান্ধে। তার হাতের পাক খাসির মাংস যদি খান জীবনে ভুলবেন না। আপনার নাম কী?

শুভ্র।দুজন হাঁটছে। শুভ্র যাচ্ছে মেয়েটার পেছনে পেছনে। তার যে এতটা ক্ষিধে লেগেছে তা সে বুঝতে পারে নি।মর্জিনা বলল, আপনার সাথে আমি ভাই পাতাইলাম। ঠিক আছে? শুভ্র বলল, অবশ্যই ঠিক আছে। এবং আমার ধারণা তুমি খুবই ভালো একটা মেয়ে। অচেনা একজনকে ভাত খাওয়ানোর জন্যে নিয়ে যাচ্ছ।অচেনা হবেন কী জন্যে? আপনার সাথে ভাই পাতাইলাম না? আমার কী ধারণা জানেন, বাসায় গিয়া দেখব বাপজান খাসি পাকাইছে। খাসি আর পোলাও।এরকম ধারণা হলো কেন?

মর্জিনা বলল, আল্লাপাক মানুষ বুইঝা রিজিক বাটে। আপনেরো খাইতে নিতেছি—এইটাও আল্লাপাকের ইশারা।তুমি খুব আল্লাহভক্ত মেয়ে? জি ভাইজান।তোমার বাসা কোথায়? প্রায় চইলা আসছি। আমরা পাইপের ভিতর থাকি। তিনটা পাইপ ভাড়া নিছি। একটাত বাপজান থাকে, একটাত আমি, আরেকটা থাকে খালি। তয় বিছানা পাতা আছে। শীতলপার্টি আছে, কোলবালিশ আছে, হাতপাখা আছে।শুভ্র বলল, পাইপের বাসা ব্যাপারটা কী? গেলেই দেখবেন। বড় বড় পাইপের ভিতর সংসার।মর্জিনার বাবা ইয়াকুব সত্যি সত্যি খাসির মাংস এবং পোলাও রান্না করেছে। মর্জিনা শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, ভাইজান, আমার কথা সত্য হইছে?

শুভ্ৰ বলল, হয়েছে।মর্জিনা বলল, আরাম কইরা খান। খায়া পাইপের ভিতর ঘুম দেন। ঝুম বৃষ্টি নামব। দেহেন আসমানের অবস্থা।খেতে খেতে শুভ্ৰ ইয়াকুবকে বলল, আপনার রান্না অসাধারণ। খাসির মাংসের এই স্বাদ অনেকদিন আমার মুখে লেগে থাকবে। আপনি একটা রেস্টুরেন্ট দেন না কেন? ইয়াকুব বলল, বাবা, টাকা থাকলে রেস্টুরেন্ট দিতাম। মূল জিনিসই নাই। মূল ছাড়া বিদ্যা কাজে লাগে না। তবে বাবা, একসময় আমার টাকা ছিল। পদ্মার ধারে টিনের ঘর ছিল। দুইটা গাভি ছিল। নৌকা ছিল। ধানী জমি ছিল কুড়ি বিঘা। বসতবাড়িতে আমগাছ ছিল এগারোটা, কাঁঠাল গাছ দশটা, গাব গাছ ছিল তিনটা। জাম্বুরা গাছ নয়টা…

মর্জিনা বলল, বাপজান, গাছের হিসাব বন্ধ করো।ইয়াকুব বলল, গাছের হিসাব দিতে ভালো লাগে। মনে হয় এখনো সব আছে।শুভ্র বলল, আপনার ঘরবাড়ি কোথায় গেছে? পদ্মায় ভাইঙা নিয়া গেছে। তবে এখন খবর পাইছি বিরাট চর জাগছে। যাদের ঘর ভাঙছে, সরকার তারারে চরে জমি দিতেছে। ইচ্ছা করে একবার চেষ্টা নেই। আগের জমির দলিল সবই আমার কাছে আছে।শুভ্র বলল, চেষ্টা নিতে সমস্যা কী? মর্জিনা বলল, একটাই সমস্যা। আমরা গরিব। চরের দখল কোনোদিন গরিবে পায় না। এই আলোচনা বাদ। ভাইজান, পান খাইবেন?

শুভ্র বলল, পান আমি খাই না, কিন্তু আজ খাব।হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামল। পান মুখে দিয়ে শুভ্ৰ পাইপের বিছানায় ঘুমুতে গেল। মর্জিনা মাথার কাছে কুপি এবং ম্যাচ রেখে বলল, ভাই পাতাইলে ভাইরে কিছু দিতে হয়। ধরেন ভাইজান, বিশটা টাকা রাখেন।শুভ্র বলল, থ্যাংক য়্যু।সে আগ্রহ করে টাকাটা নিল। পাইপের বিছানায় রাতে তার খুব ভালো ঘুম হলো।সকাল এগারোটা। চিকেন ফেদার-এর হেড অফিসে হঠাৎ করেই তুমুল ব্যস্ততা। এমডি সাহেব এসেছেন। তাঁর ঘরের তালা খুলে দেওয়া হয়েছে! ইলেকট্রিসিটি নেই বলে এসি চালু করা যাচ্ছে না। জরুরি ভিত্তিতে জেনারেটার দিয়ে এমডি সাহেবের এসি চালু করা হয়েছে।

চিকেন ফেদারের জেনারেল ম্যানেজার আহসান টেবিলের স্মাওনে দাঁড়িয়ে আছেন। এমডি সাহেবের অনুমতি ছাড়াই তিনি বসবেন কি বসবেন না। এই সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। তাকে খুবই চিন্তিত দেখাচ্ছে।শুভ্ৰ বলল, বসুন। দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আহসান বসলেন।শুভ্র বলল, মনে হয় আজ সন্ধ্যায় বাবার জাপান থেকে ফেরার কথা।আহসান বিস্মিত হয়ে বললেন, উনি তো গতকাল ফিরেছেন! স্যার আপনি জানেন না? শুভ্ৰ বলল, আমি বাড়িতে ছিলাম না। আমার এক বোনের সঙ্গে ছিলাম। বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ নেই। যাই হোক, আমার কিছু টাকা দরকার। কীভাবে পাব? টাকার পরিমাণ কত স্যার?

দুলাখ হলেই চলবে।আহসান বললেন, একটা ক্লিপ দিয়ে ক্যাশিয়ারের কাছ থেকে নিয়ে নিতে পারেন। কিংবা চেক কাটতে পারেন। আপনার ড্রয়ারে চেক বই আছে। চেক কাটলে একটু সময় লাগবে।শুভ্ৰ স্লিপ লিখে টাকা নিল।আহসান বললেন, চা খাবেন স্যার? শুভ্ৰ বলল, চা খাব। চা দিতে বলুন। আমি দুটা চিঠি লিখে দিচ্ছি। একটা যাবে আমার মার কাছে। আরেকটা যাবে একটা মেয়ের কাছে। তার ঠিকানা জানি না, তবে বাসা চিনি। আমার গাড়ির ড্রাইভার তার বাসা চেনে। তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন।আহসান বলল, অবশ্যই নিয়ে যাব। স্যার, আপনার বোনের বাসা কোথায়?

ও বস্তিতে থাকে। ঠিক বস্তিও বলা যাবে না। পাইপের ভেতর সংসার। জায়গাটা কাটবনের আশেপাশে। রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজের গুদামঘরের বাউন্ডারির ভেতর।আহসান বলল, স্যার, আমি খুবই কনফিউজড বোধ করছি।শুভ্র বলল, কনফিউজড় হবার কিছু নেই। অনেকেই এ ধরনের বাড়িতে থাকে। ফুটপাতে থাকার চেয়ে ভালো।স্যার, আপনি কি বড় সাহেবের সঙ্গে কথা বলবেন? আমি লাইন করে দেব? শুভ্র বলল, বাবার সঙ্গে এখন কথা বলব না। চা খেয়ে বিদায় হব।কোথায় যাবেন?কিছু বইপত্র কিনব।স্যার, বইয়ের লিষ্ট দিয়ে দিন, আমি কিনে নিয়ে আসছি।আমি নিজে দেখেশুনে কিনব।আহসান বিব্রত গলায় বলল, স্যার, আপনার বোনের নামটা কি জানতে পারি?

শুভ্র বলল, অবশ্যই পারেন। ওর আসল নাম মর্জিনা। তবে ওকে সবাই ফুলকুমারী নামে চেনে। ওর বাবার নাম ইসহাক। আগে রিকশা চালাতেন। ট্রাকের ধাক্কায় পা কাটা পড়েছে। এখন পাইপেই বেশির ভাগ সময় থাকেন। উনার রান্নার হাত খুবই ভালো।আহসান হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে এক্ষুনি তার বড় সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করা দরকার। সেটাও করা সম্ভব হচ্ছে না। এমডি সাহেব সামনে বসে আছেন।শুভ্ৰ চা খেয়ে টাকা নিয়ে উঠে দাঁড়াল।আহসান বলল, স্যার, আমি কি আপনার সঙ্গে আসব? শুভ্ৰ বলল, না।আপনি তো গাড়ি আনেন নি। অফিসের গাড়ি দিয়ে দেই?

শুভ্র বলল, না। রিকশায় করে ঘুরতে আমার চমৎকার লাগে।শুভ্রর লেখা চিঠিটা রেহানা এই নিয়ে চারবার পড়লেন। পঞ্চমবার পড়তে যাচ্ছেন তখন মেরাজউদ্দিন বললেন, দেখি কী লিখেছে। রেহানা স্বামীর হাতে চিঠি দিয়ে চোখ মুছলেন। শুভ্র চলে যাবার পর থেকে একটু পর পর তাঁর চোখে পানি আসছে।

শুভ্র লিখেছে—

মা,

কাল রাতে তোমাকে স্বপ্নে দেখেছি। স্বপ্নটা বেশ মজার। আমি চশমা হারিয়ে ফেলেছি। আর তুমি বলছ, কান্না বন্ধ করো। একটা স্পেয়ার চশমা সবসময় তোমার ড্রয়ারে থাকে। তুমি কি ড্রয়ার খুলে দেখেছ? আমি ড্রয়ার খুললাম। দেখি ড্রয়ারে শুধু আমার মানিব্যাগটা আছে। আমি মানিব্যাগ খুলে দেখি মানিব্যাগের ভেতর আমার চশমা।স্বপ্নে অনেক অদ্ভুত ব্যাপার হয় মা। মানিব্যাগের ভেতর টাকার বদলে চশমা পাওয়া যায়। তবে স্বপ্ন যত অদ্ভুতই হোক তার ব্যাখ্যা থাকে। চশমা ছাড়া আমি আচল, কাজেই যে-কোনো দুঃস্বপ্নে আমি চশমা দেখব। এটাই স্বাভাবিক।টাকা পয়সার হঠাৎ অভাবে ঝামেলায় পড়েছিলাম বলে মানিব্যাগ স্বপ্নে দেখেছি।

মা শোনো। আমি চিকেন ফেদার অফিসের ক্যাশিয়ারের কাছ থেকে দুলক্ষ টাকা স্লিপ কেটে নিয়েছি। বাবা ঘটনাটা জানলে হয়তো মনে কষ্ট পাবেন। বাবা আমার আইডল। আমি কোনো অবস্থাতেই বাবাকে কষ্ট দিতে চাই না। মা, তুমি তোমার কাছ থেকে দুলক্ষ টাকা অফিসে জমা দিয়ে দিও। আমি ভালো আছি। বেশ ভালো আছি। তুমি এবং বাবা তোমাদের দুজনের ধারণা আমি তোমাদের প্রটেকশন ছাড়া অচল। ধারণা মিথ্যা।মা শোনো। ঐদিন একটা অসহায় মেয়েকে তুমি সাহায্য করো নি। আমার খুব মন খারাপ হয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই আমি জেনে এসেছি, তুমি এবং বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ। এর ব্যতিক্রম যখনই দেখি তখন অস্থির লাগে।মা, তুমি ভালো থেকে এবং আমার ওপর রাগ করো না। কেউ আমার ওপর রাগ করে থাকলে আমার কেমন জানি লাগে। নিজেকে তখন ক্ষুদ্র এবং তুচ্ছ মনে হয়।

ইতি

শুভ্র

মেরাজউদ্দিন বললেন, রেহানা, তুমি upset হয়ে না। সবকিছু কনট্রোলের ভেতর চলে আসবে। আমাদের হিসেবে সামান্য ভুল হয়েছে। ভুল হবেই। ভুল থেকে আমরা শিখব। আহসান কি এসেছে? হ্যাঁ, ড্রয়িং রুমে বসে আছে।ওকে ডাকো। ওর সামনে এমন কিছু করবে না যাতে অস্থিরতা প্রকাশ পায়। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতি অস্থির হলে সেই অস্থিরতা সৈন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।রেহানা বললেন, আমরা কি যুদ্ধে নেমেছি? প্রচুর বিত্ত মানেই যুদ্ধ। বিত্ত সামলানোর যুদ্ধ। বিত্ত বাড়ানোর যুদ্ধ।মেরাজউদ্দিন এবং রেহানা খাবার টেবিলে বসে ছিলেন। আহসানকে ভীত এবং সংকুচিত ভঙ্গিতে তাদের সঙ্গে বসতে হলো।মেরাজউদ্দিন বললেন, আহসান, কেমন আছ?

আহসান বলল, স্যার ভালো আছি।আজ আমার বাড়িতে কেক কাটার মতো একটা আনন্দময় ঘটনা ঘটেছে। এই বিষয়ে কি কিছু জানো? জানি না স্যার।শুভ্রর M.Sc. পরীক্ষার রেজাল্ট হয়েছে। ও রেকর্ড নাম্বার পেয়ে প্রথমশ্রেণীতে প্রথম হয়েছে। সে যে KNS তা জানো? জানি না। স্যার। KNS কী? কালিনারায়ণ স্কলার। যাই হোক, চিকেন ফেদার অফিসে এই উপলক্ষে তোমরা একটা কেক কাটবো।অবশ্যই স্যার।

মেরাজউদ্দিন আহসানের দিকে সামান্য ঝুঁকে এসে বললেন, এডোলোসেন্স পিরিয়ড ১৯ বছরেই শেষ হবার কথা। অনেকের হয় না। শুভ্রর হয় নি। হয় নি বলেই সে পাইপের ভেতর বাস করার অদ্ভুত কাণ্ড করছে। তার বিষয় হচ্ছে Physics, পাইপ না।অবশ্যই স্যার।সে কোথায় থাকে কী ব্যাপার খোঁজ নিয়েছ? নিয়েছি স্যার। তারা কেউ এখন সেখানে নেই। কোথায় গেছে কেউ বলতে পারছে না। রেহানা বললেন, যে মেয়েটিকে সে বোন বলছে, মর্জিনা না কী যেন নাম, ওই মেয়েটি কে? আহসান বিব্রত গলায় বলল, বলতে লজ্জা পাচ্ছি ম্যাডাম। মেয়েটা একটা প্রস্টিটিউট।কী বললে? ম্যাডাম, ভাসমান পতিতা।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *