Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

শ্রাবণমেঘের দিন পর্ব – ১০ হুমায়ূন আহমেদ

তোর বাবার বুদ্ধি বেশি তো–সবকিছুতে মাতব্বরি করবে। ব্যক্তিগত একটা চিঠি বাংলা একাডেমীকে দেয়ার কি আছে? যাই হোক, আমি যা বলতে চাচ্ছি তা হচ্ছে–আমাদের এই বাড়ি ছিল বিখ্যাত এক বাড়ি–হাওড় অঞ্চলের এই বাড়ি সবার চোখে পড়ে। সেটাই স্বাভাবিক। একাত্তর সনের মে মাসে পাকিস্তানী মিলিটারী যখন গানবোট নিয়ে হাওড় অঞ্চলে ঢুকল তাদের চোখেও এই বাড়ি পড়ল। তারা তো অন্ধ না। তাদের চোখ আছে।

নীতু মনে মনে হাসল। দাদাজান কি বলতে চাচ্ছেন সে এখন বুঝতে পারছে। কিন্তু তাঁকে সে কিছু বুঝতে দিল না–এমন ভাব করল যেন সে কিছুই বুঝতে পারছে না। ইরতাজুদ্দিন বললেন, ওরা গানবোট নিয়ে আমার বাড়ির ঘাটে ভিড়ল। আমি দেখা করতে গেলাম। ওরা আমার সঙ্গে খুবই ভদ্র ব্যবহার করল। আমার বাড়িতে উঠে কিছুক্ষণের জন্যে বিশ্রাম করতে চাইল। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত একদল মানুষ। বিশ্রাম করতে চাইলে আমি কি বলব–না, বিশ্রাম করা যাবে না?

ওরা তো খালি হাতে আসেনি–অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ নিয়ে এসেছে। নিরস্ত্র মানুষের মুখের উপর না বলা যায়, অস্ত্রধারী মানুষের মুখের উপর না বলা যায় না। এই সত্য পৃথিবীর সবাই জানে–শুধু তোর বাবা জানে না। এই জন্যেই তোর বাবাকে আমি শুধু গাধা বলি না, বলি শ্ৰেষ্ঠ গাধা।নীতু লক্ষ্য করল, তার দাদাজান অসম্ভব রেগে গেছেন। তার ফর্সা মুখ লাল টকটকে হয়ে গেছে–তিনি অল্প অল্প কাঁপছেন।

ইরতাজুদ্দিন বিলের পানিতে একদলা থুথু ফেলে বললেন, কেউ বলুক দেখি এই গ্রামের কোন মানুষ মিলিটারী মেরেছে কি না। কেন মারেনি? আমার জন্যেই মারেনি। এত কিছু তোর বাবা জানে–এটা জানে না? তার কতবড় সাহস–সে সে সে… ইরতাজুদ্দিন কথা শেষ করলেন না, টকটকে লাল চোখে তাকালেন। নীতু কিছু বলবে না বলবে না করেও শান্ত স্বরে বলল, দাদাজান, বাবা আমাদের বলেছেন যে মিলিটারী এই গ্রামের কাউকে মারেনি… কিন্তু… কিন্তু আবার কি?

বাবা বলেছেন এই গ্রামের ছটা মেয়েকে মিলিটারী ধরে নিয়ে এসেছিল–আমাদের এই বাড়িতেই তাদের রেখেছিল। মিলিটারী চলে যাবার সময় তাদের সঙ্গে করে নিয়ে যায়। পরে এই মেয়েগুলির আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।ইরতাজুদ্দিন তাকিয়ে আছেন। তাঁর চোখে পলক পড়ছে না। নীতু তার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল।ঘাটে নৌকা ভিড়েছে। ইরতাজুদ্দিন নামলেন। তার পা খানিকটা টলতে লাগল।

ইরতাজুদ্দিন সাহেবের পেছনে পেছনে নীতু নামল। নৌকার মাঝি দুজন মাথা নিচু করে বসে আছে। একবারও মাথা তুলছে না। তীরে নেমে নৌকার মাখা শক্ত করে ধরা দরকার এ কথাও তাদের মনে নেই।মাঝিরা নৌকা নিয়ে ফিরে যাচ্ছে–উত্তরের নৌকা, ঘাটায় নৌকা রেখে আসবে। মাঝিদের একজন অস্পষ্ট গলায় বলল–এক আঙুল মেয়ে কিন্তু কি সাহস! এইটা হইল কশের গুণ–কত বড় বংশ দেখন লাগব না? জোকের মুখে এক মুঠ লবণ দিয়া দিছে। আচানক ব্যাপার।

মতি টাকা ধার করেছে। সুদিতে একশ টাকা। সে জানে এই টাকাটা ফেরত দিতে বিরাট যন্ত্রণা হবে। প্রতি মাসে পঁচিশ টাকা করে দেয়া সহজ কথা না। আসল থেকেই যাবে। আসল আর দেয়া হবে না। কি আর করা–সুন্দর করে একটা গানের আসর করতে টাকা লাগে। আবদুল করিমকে আনতেই একশ টাকা বায়নায় চলে যাবে। হ্যাজাক বাতি লাগবে। গানের দিন বৃষ্টি নামলে সাড়ে সর্বনাশ।

গানের জায়গা নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। মতির ইচ্ছা গান রাজবাড়িতে হবে না। রাজবাড়িতে গান হলে গাঁয়ের লোক শুনতে পাবে না। রাজবাড়িতে গান হওয়ার একটাই সুবিধা–বৃষ্টি-বাদলায় কিছু হবে না।….. গানের দিন মতি গায়ে কি দেবে তা নিয়েও দুশ্চিন্তা হচ্ছে। সিল্কের হলুদ পাঞ্জাবিটা কনুইয়ের কাছে অনেকখানি হেঁড়া। সুন্দর করে রিপু না করলে দেখা যাবে। দলের অধিকারী ছেঁড়া পাঞ্জাবি পরে উপস্থিত হওয়া ভাল লক্ষণ না। এতে দলের উপর আস্থা কমে যায়।

সাদা সিল্কের একটা উনি থাকলে গলায় ঝুলিয়ে দেয়া যেত। তাতে পাঞ্জাবির হাতার ভেঁড়া ঢাকা পড়ত। তার কোন উর্নি নেই। বিছানার চাদর গলায় ঝুলিয়ে তো আর আসরে নামা যায় না। কাজলদানী খুঁজে বের করে কাজল বানাতে হবে। চোখে কাজল দিতে হবে। তার ওস্তাদ বলেছিলেন–মতি মিয়া শোন–আসরে যখন নামবি–চোখে কাজল দিবি, মুখে ছুনু-পাউডার দিবি।

কাঁকই দিয়া সুন্দর কইরা চুল আঁচড়াইবি, যেন আসরে নামলেই পরথম সবে বলে আঁহা কি সৌন্দর্য! পরথমে দর্শনদারি, তারপর গুণ বিচারি। আসলে আদব-কায়দার দিকে খিয়াল রাখবি–গানের চেয়ে বড় আদব-কায়দা। আদব-কায়দা চোখে পড়ে–গান পড়ে কানে। চোখ কানের চেয়ে বড়। ধুন রাখিসরে ব্যাটা। এইটা ধুন রাখার বিষয়।ধুন রাখার বিষয় হলেও মতি রাখতে পারছে না। সব কিছুতেই টাকা লাগে। টাকা পাবে কোথায়?

মতি টিনের ট্রাঙ্কের ভেতর থেকে পাঞ্জাবি বের করল। কুচড়ে মুচড়ে কি হয়ে আছে। সেই তুলনায় পায়জামাটা ভাল আছে এক জোড়া পাম্প সু দরকার ছিল। পাম্প সু নেই। কিনতে হবে।কুসুমকে বললে সে কি পাঞ্জাবিটা রিফু করে দেবে না? তাছাড়া এম্নিতেই কুসুমের সঙ্গে দেখা করা দরকার–মোবারক চাচার সন্ধান কিছু পেয়েছে কি না জানা দরকার। এটা তো আরেক চিন্তার ব্যাপার হল।

কুসুম কলসি নিয়ে পানি আনতে বের হবে এমন সময় মতি উপস্থিত হল। কুসুমের বুক ধ্বক করে উঠল। এই ধ্বক ধ্বক অনেকক্ষণ ধরে করবে তারপর আস্তে আস্তে কমবে। ধ্বকধ্বকানি না কমা পর্যন্ত কথা বলা ঠিক না।যাও কোথায় কুসুম? দড়ি কলসি লইয়া বাইর হইছি। কই যাই বুঝেন না? চাচা কি ফিরছে? না, ফিরে নাই।চিডিপত্র দিছে? চিড়িপত্রও দেয় নাই–আফনে কি বাপজানের খুঁজ নিতে আইছেন না অন্য বিষয় আছে?

মতি ইতঃস্তত করে বলল, একটা কাম কইরা দিবা কুসুম? কি কাম? পাঞ্জাবির হাতাটা একটু রিফু কইরা দিবা? দেন–দিমু নে।এমন কইরা দিবা যেন সেলাই বুঝা না যায়।চিকন কাম কি আর আমি পারি! আমার হইল সব মোটা কাম।গানের আসর করতাছি। শুক্কুরবার দিবাগত রাত্র।শুনছি।তুমি আসবা কিন্তু। রাজবাড়িতে আমারে কে ঢুকতে দিব? রাজবাড়িতে না–গান হইব গেরামে…।

কুসুম গম্ভীর গলায় বলল, রাজবাড়ির মাইয়া গেরামে আইস্যা গান শুনব না। গান তো আফনে আমরার জন্য করতাছেন না, তারার জন্য করতাছেন। মাটির উফরে বইস্যা গান শোনার শখ তারার নাই।মতি উৎসাহের সঙ্গে বলল, তুমি তারে চিন না বইল্যা এমন একটা বেফাস কথা বললা। এই মেয়ে রা দশটা মেয়ের মত না।এ আসমান থাইক্যা পড়ছে? হুঁ। আসমান থাইক্যাই পড়ছে।

কুসুম খিলখিল করে হাসছে। যে ভাবে হাসছে তাতে মনে হয় কাঁখের কলসি না মাটিতে পড়ে ভেঙে টুকরা টুকরা হয়।মতি বিরক্ত গলায় বলল, হাস ক্যান? হাসির ফাঁকে ফাঁকে কুসুম বলল, কেন হাসি আইজ বলব না। কোন একদিন বলব।রহস্য কইরা কথা বলবা না কুসুম। রহস্য করা ভাল না।জগৎটার মইধ্যেই খালি রহস্য। রহস্য না কইরা কি করব?

কুসুম কলসি নিয়ে রওনা হয়েছে। মতি মিয়া যাচ্ছে তার পেছনে পেছনে। কসুম বলল, আপনে পিছে পিছে আসতাছেন ক্যান? মতি থমকে দাঁড়াল। তাই তো, সে কেন পেছনে পেছনে যাচ্ছে? কুসুমের মন খারাপ হল। মতি পেছনে পেছনে আসছিল–এত ভাল লাগছিল কুসুমের! সে নিজেই তা বন্ধ করল। কেন? কেন?

মতি বলল, কুসুম, আমি যাই–পাঞ্জাবিটা ঠিকঠাক কইরা রাখবা।কুসুম জবাব দিল না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল মতি হন হন করে যাচ্ছে। একবার কি সে পেছনে ফিরবে না? পেছন ফিরলেই দেখত কুসুম দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কুসুম পানি না এনেই বাড়িতে ফিরে এল।মনোয়ারার পেটের ব্যথা সকাল থেকে শুরু হয়েছে। ব্যথা এখন অল্প। ব্যথার লক্ষণ ভাল না। তিনি লক্ষণ দেখেই বলতে পারছেন।

অল্প ব্যথাই কিছুক্ষণের ভেতর প্রবল হবে এবং তার জগৎ-সংসার অন্ধকার করে দেবে। তখন বার বার শুধু মনে হবে–ইশ, একটু বিষ কেউ যদি এনে দিত। বিষ খেয়ে শান্তিতে ঘুমানো যেত। মৃত্যু তো ঘুমের মতই।মনোয়ারা চাপা ব্যথা নিয়ে খাটে বসে আছেন ভয়াবহ ব্যথার যে সময় তাঁর সামনে তার কথা ভেবে বিষণ্ণ বোধ করছেন। তাঁর খুব ইচ্ছা রাজবাড়ির ডাক্তার মেয়েটাকে শরীরটা দেখান। যে মেয়ে দূর্গাকে মৃত্যুর কোল থেকে তুলে নিয়ে এসেছে।

তাকে কি সামান্য ব্যথার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না? অবশ্যই পারবে কিন্তু রাজবাড়ির মেয়েকে খবর দিয়ে এখানে আনেন কি করে? সেটা কিছুতেই সম্ভব না। মেয়েটা প্রায়ই বেড়াতে বের হয়। একা একা পাগলের মত হাঁটে। এ রকম কোন একটা সময়ে সে যদি নিজেই হাঁটতে হাঁটতে চলে আসত! মনোয়ারা দেখলেন কুসুম ফিরেছে। গেল আর ফিরল, এর মধ্যে পানি আনা হয়ে গেল? না, পানি নিশ্চয়ই আনেনি। তার শরীরে আবার সেই জ্বীন ভর করেছে। তিনি ক্ষীণ গলায় ডাকলেন, কুসুম।কুসুম দরজা ধরে দাঁড়াল। জবাব দিল না।পানি আনছস?

না। না ক্যান? ইচ্ছা করছে না এই জন্যে আনি নাই।ঘরে এক ফোঁটা পানি নাই।ঘরে তো চাউল নাই, টেকাপয়সাও নাই–খালি পানি দিয়া কি হইব–ভাল। হইছে পানিও নাই।মনোয়ারা মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। আহা রে, কি মিষ্টি কি সুন্দর মুখ! এ রকম একটা সুন্দর মেয়ের তিনি কিনা বিয়ে দিতে পারছেন না। মনোয়ারা হঠাৎ লক্ষ্য করলেন–কুসুমের গলায় পীর সাহেবের হলুদ সূতাগাছা নেই। সুতাগাছা সে কি করেছে? ফেলে দিয়েছে? সে কি জানে না এটা কত বোড় অলক্ষণ…

মেয়ের সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলতে তার ইচ্ছা করছে না। প্রবল ব্যথায় তার শরীর থর থর করে কাপছে। তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। এই তীব্র যাতনা সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই–তার কেন, কারোরই নেই।কুসুম, ও কুসুম।কি? মইরা যাইতাছি রে মা! না না, তিনি ভুল বলেছেন। তিনি মরে যাচ্ছেন না–তিনি বেঁচে আছেন এবং অনেক দিন এই ভয়ংকর কষ্ট সহ্য করার জন্য বেঁচে থাকবেন। তার জন্যে মৃত্যু হবে আনন্দময় অভিজ্ঞতা।

রাজবাড়ির মেয়েটা একবার যদি তাকে দেখত! তার মন বলছে মেয়েটা এসে তার পেটে হাত রাখামাত্রই তার ব্যথা কমে যাবে।কুসুম, ও কুসুম! হুঁ।রাজবাড়ির মেয়েটারে খবর দিয়া আনবি মা? না।মইরা যাইতাছি রে বেটি, মইরা যাইতাছি।মইরা যাওন তো ভাল মা। মরণের মত শান্তি বাঁচনের মধ্যে নাই।ব্যথার ধাক্কা মনোয়ারা আর সহ্য করতে পারছেন না তিনি কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে পড়লেন। একটু পর পর মৃগী রোগির মত তাঁর শরীর শুধু কাঁপছে। তার চোখ ঘোলাটে।

কুসুম বলল, মা, আমি উনারে আনতে যাইতাছি… আসব কিনা জানি না।মনোয়ারা জানেন ঐ মেয়ে আসবে। খবর পাওয়ামাত্র ছুটে আসবে। রাজবাড়িতে থাকলেও ঐ মেয়ে রাজবাড়ির মেয়ে না, সে অন্য এক মেয়ে যে মৃত্যুর হাত থেকে জীবন ছিনিয়ে নিয়ে আসতে পারে। এই মেয়েটা এসে তার পেটে হাত রাখলেই তার ব্যথা কমে যাবে। মনোয়ারা বিড় বিড় করে সূরা ইয়াছিন পড়ার চেষ্টা করছেন। মৃত্যু। যদি এসেই থাকে সূরা ইয়াছিন পাঠে মৃত্যুযন্ত্রণা কমে যাবে…

মনোয়ারার অনুমান ঠিক হয়েছে। রাজবাড়ির পরীর মত মেয়েটা তার পেটে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল, কোথায় ব্যথা বলুন তো? তিনি ব্যথা কোথায় বলতে পারলেন না। অবাক চোখে কুসুমের দিকে তাকালেন। তারপর তাকালেন পুষ্পের দিকে। পুষ্পের পাশে ফুটফুটে নীতুকেও দেখলেন।শাহানা বলল, বলুন কোথায় ব্যথা? একটু আগে তীব্র ব্যথা ছিল এখন তার লেশমাত্র নেই।

কি অদ্ভুত কাণ্ড! রাজবাড়ির মেয়ে তার মত হতদরিদ্রের ঘরে উপস্থিত হয়েছে। জানতে চাচ্ছে কোথায় ব্যথা কিন্তু তিনি বলতে পারছেন না। তার লজ্জা লাগতে লাগল। শাহানা বলল, এখন ব্যথা নেই? জ্বি না আম্মা।ব্যথাটা যখন উঠে কতক্ষণ থাকে? এই প্রশ্নের জবাবও মনোয়ারা দিতে পারলেন না। কতক্ষণ থাকে কে জানে। কখনো মনে রাখার চেষ্টা করেন নি। তীব্র কষ্টের ব্যাপার কে আর মনে করে রাখে? মনে করতে পারছেন না, না?

জি না আম্মা।ব্যথাটা কি হঠাৎ বাড়ে না আস্তে আস্তে বাড়ে? মনোয়ারা অসহায় চোখে তাকাচ্ছেন। কোন জবাব দিতে পারছেন না। তিনি আরেকটা ব্যাপারে খুব অবাক হচ্ছেন। মেয়েটা তার পেটে হাত রেখেছিল, হাত এখনও সরিয়ে নেয়নি।এখন বলুন তো ব্যথাটা ভাত খাবার আগে হয় না পরে হয়? আম্মা বলতে পারতেছি না।তিনি যে মেয়েটার প্রশ্নের জবাব দিতে পারছেন না–তাতে মেয়েটা রাগ করছে না বরং হাসছে।

কি সুন্দর করে হাসছে! আহা রে, এরকম একটা মেয়ে যদি আমার থাকত! মনোয়ারা সবাইকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ বললেন, আম্মাজি, আফনের উপর আল্লাহপাকের খাস রহমত আছে। আমার বড় মেয়েটার বিবাহ হইতেছে না। আপনে যদি আমার বড় মেয়েটার জন্য একটু দোয়া করেন তাইলে মেয়েটার ভাল বিবাহ হবে।শাহানা খিলখিল করে হেসে উঠল। শাহানার সঙ্গে গলা মিলিয়ে হেসে উঠল নীতু।

কুসুম এবং পুষ্প হাসল না। মনে হল তারা দুজনই লজ্জা পাচ্ছে। শাহানা বলল, আপনার কি জন্যে ধারণা হল আমার উপর আল্লাহর রহমত আছে? মনোয়ারা শান্ত গলায় বললেন, আম্মাজি, আপনে দূর্গারে মরণের হাত থাইক্যা টাইন্যা বাইর কইরা আনছেন। আমি পেটের ব্যথায় মইরা যাইতেছিলাম। আপনে পেটে হাত দিছেন সাথে সাথে ব্যথা নাই।আপনার ব্যথাটা আলসারের। এইসব ব্যথা হঠাৎ করে আসে আবার হঠাৎ করে যায়। আমি হাত না রাখলেও ব্যথাটা চলে যেত।

আম্মাজি, আপনে আমার মেয়েটার জন্যে দোয়া করেন। আমার মন বলতেছে আপনে বললেই আল্লাহপাক শুনবে।শাহানা অস্বস্তি বোধ করছে। সে অস্বস্তি দূর করে কুসুমের দিকে তাকিয়ে সহজ গলায় বলল, আপনার এই মায়াবতী মেয়েটার যেন খুব ভাল বিয়ে হয় এই প্রার্থনা করছি। তার বর যেন হয় জ্ঞানবান, বুদ্ধিমান, বিত্তবান ও হৃদয়বান।নীতু হাসতে হাসতে বলল, তুমি অনেক কিছু বাদ দিয়ে গেছ আপা–ন্যায়বান, কান্তিমান ও দয়ালু।

শাহানা বলল, হ্যাঁ, সে হবে ন্যায়বান, কান্তিমান ও দয়ালু।মনোয়ারার মুখ দেখে মনে হচ্ছে তিনি মোটামুটি নিশ্চিত এ জাতীয় একটি ছেলের সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে হতে যাচ্ছে।শাহানা বলল, আপনার কন্যার বিবাহপর্ব শেষ হল, এখন আসুন আপনার অসুখের ব্যাপার দখি। আমার কাগজ-কলম লাগবে–নোট নেব। কাগজ কলম আছে?

কুসুম না-সূচক মাথা নাড়ল।পুষ্প যাও, কোনখান থকে কাগজ কলম নিয়ে আস।কাগজ-কলম আনতে পুষ্প রাজবাড়ির দিকেই ছুটে গেল। বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে শাহানা অপেক্ষা করছে। এত বড় একটা গ্রাম, কাগজ কলম আছে এমন কেউ নেই? স্কুল, মাদ্রাসা মক্তব কিছুই নেই? জায়গাটা কি সত্য পৃথিবীর বাইরে? গানের আসর বসেছে। মঞ্চ তৈরি হয়েছে। রইসুদ্দিনের বাংলাঘরের দর্মার বেড়া সরিয়ে তৈরী হয়েছে মঞ্চ।

চারদিক খোলা, উপরে টিনের ছাদ। দুটা হ্যাজাক বাতি উপর থেকে ঝুলছে। চাটাই পেতে গায়কদের ও বাজনাদারদের বসার ব্যবস্থা। যাত্রার মঞ্চের মত মঞ্চ–চারদিকেই দর্শক।দর্শকদের বসার কোন ব্যবস্থা নেই। যে যেখানে পেরেছে বসেছে। শাহানা ও মিতুর জন্যে চেয়ার এসেছে। সেই চেয়ার পাতা হয়েছে বাঁশের চাটাইয়ের উপর। প্রচুর লোক সমাগম হয়েছে। শুধু শাহানাদের চারপাশ খালি। এদের আশেপাশে কেউ বসছে না।

মঞ্চের দক্ষিণ দিকের একটা অংশ মেয়েদের জন্যে আলাদা করা। সেখানে গাদাগাদি ভিড়। এই ছোট্ট গ্রামে এত মানুষ আছে শাহনা ভাবেনি। রীতিমত জনসমুদ্র। মাইক নেই–সবাই কি শুনতে পারবে? দুবোন কৌতূহলী চোখে চারদিক দেখছে–তাদের পায়ের কাছে পুষ্প। আনন্দ ও উৎসাহে সে ঝলমল করছে। পুষ্প ধারাবর্ণনা দিয়ে যাচ্ছে।

ঐ যে বুড়া লোকটা দেখতাছেন আপা–উনার নাম পরাণ। পরাণ ঢোলী–পিথিমীর মইধ্যে শ্রেষ্ঠ।শাহনা হাসিমুখে বলল–শিল্পীদের মধ্যে পিথিমীর শ্রেষ্ঠ আর কে কে আছে? করিম সাব আছে–ঐ যে মোটাগাটা। বেহালা বাজায়। বেহালার ওস্তাদ কারিগর।নীতু বলল–একটা লোক যে ঘুমাচ্ছে ও কে? আমরার গেরামেরই–তাল দেয়। মন্দিরা দিয়া তাল দেয়। সে ঘুমাচ্ছে কেন? ঘুমাইতাছে না আপা, চোখ বন্ধ কইরা আছে।কেন? চোখ বন্ধ করে আছে কেন?

শইলডা মনে হয় ভাল না আপা।মাঠে শরীর খারাপ নিয়ে গান করতে এসেছে কেন? শাহানা বলল, চুপ কর তো নীতু–তুই বড় পেঁচাতে পারিস। চুপ করে গান নে।গান তো শুরু হয়নি যে শুনব।পুষ্প উৎসাহের সঙ্গে বলল, অক্ষন শুরু হইব। আপা, পরথম হইব বন্দনা তারপর গান। আমার কুসুম বুবু আসছে। ঐ দেহেন একলা একলা বইস্যা আছে–।

নীতু বলল, আমাদের কাছে এসে বসতে বল।বইল্যা লাভ নাই, আসব না।শাহানা তাকাল। কুসুমের সঙ্গে আগে দুবার দেখা হলেও এখনকার আলোআধারীতে তাকে চেনা যাচ্ছে না। অন্য রকম লাগছে।নীতু বলল, মেয়েটা কি মিষ্টি দেখেছ আপা? শাহানা হাসতে হাসতে বলল, পিথীমীর শ্রেষ্ঠ মিষ্টি।নীতু খিলখিল করে হাসছে। পুষ্পও হাসছে। কুসুম হাসির শব্দে সচকিত হয়ে ওদের দিকে তাকাল। তারপরই উঠে গিয়ে ভিড়ের ভেতর মিশে গেল। আজ সে খুব সেজেছে।

চোখে কাজল দিয়েছে। পায়ে আলতা দিয়েছে। লম্বা চুলে সুন্দর বেণী। পুষ্প বলল, হারমনি বাজাইব যে লোকটা তার নাম কুদ্স। হে তিনটা বিয়া করছে।নীতু বলল, কেন? শাহানা বলল, চুপ কর তো নীতু, ও তিনটা বিয়ে করেছে কেন সেটা পুষ্প কি করে বলবে? লোকটাকে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করব আপা? তুই বড্ড যন্ত্রণা করিস নীতু।নীতু খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ অতিরিক্ত রকম উৎসাহের সঙ্গে বলল, আপা দেখ দেখ। আমাদের গায়ক মতি মিয়াকে দেখ। দেখছ?

হুঁ।পুষ্প বলল, মতিভাই গানের দল করছে।নীতু বলল, গানের দল করলে এরকম বিশ্রী রঙের পাঞ্জাবি পরতে হবে? পাঞ্জাবিটার দিকে তাকালে বমি এসে যায় না? বমি না আসলেও চোখ কট কট করে। পিথিমীর নিকৃষ্ট হলুদ রঙ।আপা, ভদ্রলোক আমাদের দিকে আসছেন। সর্বনাশ হয়েছে! হয়ত তোমাকে সভাপতি হবার জন্যে অনুরোধ করবেন।গ্রামের অনুষ্ঠানে সভাপতি-টতি হবার নিয়ম নেই।তাহলে আসছেন কেন?

পুষ্প বলল, আফনাদের জইন্যে পান আনতাছে।নীতু অবাক হয়ে বলল, পান আনবে কেন? আমরা তো পান খাই না। নাকি গানের আসরে এলে পান খেতে হয়? মতি কঁসার বাটিতে বানানো খিলিপান এনে অতি বিনয়ের সঙ্গে শাহানার সামনে টেবিলে রাখল। শাহানা সঙ্গে সঙ্গে এক খিলি পান তুলে নিল।নীতু বলল, আপনি এই কুৎসিত পাঞ্জাবিটা কেন পরেছেন? কটকটা হলুদ রঙের পাঞ্জাবি কেউ পরে? ও কি, চোখে কাজল দিয়েছেন নাকি?

মতি বিব্রত গলায় বলল, গাওয়ার দিন সাজসজ্জা করা আমার ওস্তাদের আদেশ।নীতু গম্ভীর গলায় বলল, আপনার ওস্তাদকে বলবেন তার আদেশ মানার জন্যে আপনাকে ভূতের মত লাগছে। আর কাজলও তো ঠিকমত দিতে পারেননি–এক চোখে বেশি এক চোখে কম… শাহানা নীতুকে থামিয়ে দিয়ে বলল, আপনাদের অনুষ্ঠান কখন শুরু হবে?

আফনের দাদাজান আইলেই শুরু হইব। উনি এই অঞ্চলের পরধান। উনারে ছাড়া শুরু করণ যায় না।উনি আসবেন না। শুরু করে দিন। অনুষ্ঠান চলবে কতক্ষণ? সারারাত ধইরা চলব।সে কি? গেরাম দেশের আসরের এইটাই নিয়ম। মসজিদে ফজরের আজান হইব–গাওনা শেষ।শাহানা বলল, নীতু তো কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়বে। তারচেয়েও বড় কথা, আকাশের অবস্থা দেখেছেন–বৃষ্টি নামবে। দেরি না করে শুরু করে দিন।

অনুষ্ঠান শুরু হল বাজনা দিয়ে। মূল বাদক পরাণ। সে ঢোলে বোল তুলল। মনে হচ্ছে সে বাজিয়ে ঠিক আরাম পাচ্ছে না–নড়াচড়া করছে–ঢোলের জায়গা বদল করছে। কখনও রাখছে বাপাশে, কখনও সরিয়ে নিয়ে আসছে ডানপাশে। সেলের সঙ্গে যুক্ত হল–খঞ্জনী, তার সঙ্গে বাঁশি। পরাণ ঢোলী তাপরেও স্বস্তি পাচ্ছে না–বার বার কেমন যেন অসহায় দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। সম্ভবত তার কোন সমস্যা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *