নীতু রান্নাঘরের দিকে গেল। রমিজার মা রান্নাঘরে আছে। তার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করা যায়। এই মহিলাটাও খুব ভাল শুধু হাসে। নীতু বলেছিল, আপনি এত হাসেন কেন? সে বলেছে–মনের দুঃখে হাসি। মনে দুঃখ বেশি তো, এই জন্যে হাসিও বেশি। দার্শনিক ধরনের উত্তর। নীতুর ধারণা, গ্রামের মানুষরা সহজ সরল হলেও সহজভাবে তারা কথা বলতে পারে না। সব কথাতেই শেষ দিকে তারা ছোট একটা প্যাঁচ লাগিয়ে দেয়।
এদের কথা বলার ধরনই বোধহয় এ রকম।নীতু রান্নাঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, কি করছেন? রানতেছি গো ময়না। খিদা লাগছে? উহুঁ।দেরি হইব না, তরকারি নামালেই ভাত দিয়া দিমু।আপনারে তো বলেছি–আমার খিদে লাগেনি।কোন দুপুরে ভাত খাইছ–খিদা তো লাগনেরই কথা।বলেছি তো খিদে হয়নি।
নীতু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। গ্রামের মানুষের এই আরেক সমস্যা–তারা নিজে কি ভাবছে সেটাই বড়। অন্যে কি ভাবছে কি ভাবছে না সেটা জরুরি না। নীতু রান্নাঘর থেকে বের হল। ছাদে উঠলে কেমন হয়? কাঠের সিড়ি তো আছেই–চুপি চুপি উঠে গেলেই হয়। ছাদে উঠে খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা। এর মধ্যে যদি আপা তাকে খুঁজতে শুরু করে এবং খুঁজে না পায় তাহলে বেশ ভাল হয়। তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করার শাস্তি হয়।
ছাদের সিঁড়িটা নড়বড়ে। নিচ থেকে একজনকে ধরতে হয়, তবু খুব সাবধানে উঠলে হয়ত ওঠা যাবে। নীতু সাবধানী মেয়ে। সে সাবধানে উঠবে। হঠাৎ করে বৃষ্টি না নামলেই হয়। আর নামলেও ক্ষতি কি সে ভিজবে। একটু ভিজলেই তার ঠাণ্ডা লাগবে জ্বর হবে নিওমোনিয়া হবে অনেক চিকিৎসা করেও তাকে বাঁচানো যাবে না।
শাহানা অনেকক্ষণ হল ঘর অন্ধকার করে শুয়ে ত যে শুয়ে আছে। ঠিক আলসেমির জন্যে যে শুয়ে আছে তা না–ভাল লাগছে না। মানুষের স্বভাব খানিকটা বোধহয় শামুকের মত। নিজের শক্ত খোলসের ভেতর মাঝে মাঝেই তাকে ঢুকে যেতে হয়। অতি প্রিয়জনের সঙ্গও সে সময় অসহ্যবোধ হয়।শুয়ে শুয়ে শাহানা ভাবছে, অতি প্রিয়জন বলে তার কি কেউ আছে?
মা-বাবাকে প্রিয়-অপ্রিয় কোন দলেই ফেলা যায় না। মা-বাবা শরীরের অংশের মত। কারোর হাত বা পা যেমন প্রিয়-অপ্রিয় কোনটাই হতে পারে মা, মা-বাবাও পারে না। ভাই বোন শরীরের অংশের মত নয়। প্রিয়-অপ্রিয় ব্যাপারটা তাদের ক্ষেত্রে হয়ত আসে… নীতু তার খুবই প্রিয়। কিন্তু নীতুর বছরের বড় মিতু তার তেমন প্রিয় নয়। মিতুর সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলতে লাগে না। মিতুর কথা দীর্ঘ সময় শুনতেও ভাল লাগে না। অথচ মিতু চমৎকার একটা মেয়ে। তাহলে সে তার প্রিয় নয় কেন? রহস্যটা কোথায়?
শাহানা সুখানপুকুর আসবে শুনে সবচে বেশি লাফালাফি শুরু করেছিল মিতু। শাহানা বলল, দল বেঁধে সবাই চলে গেলে মার সঙ্গে কে থাকবে? মার শরীর ভাল না। মার সঙ্গে তো একজন কারও থাকা দরকার। মিতু কয়েক মুহূর্ত শাহানার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, আচ্ছা আমি থাকব।
কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার মধ্যে মিতু চোখে চোখে অনেক কথা বলে ফেলল। সেই কথাগুলি হচ্ছে—তুমি আমাকে নিতে চাচ্ছ না কেন আপা? আমি কি করেছি? কিছুদিন পরে তুমি বাইরে চলে যাচ্ছ, আবার কবে আসবে না আসবে কে জানে! এই কিছুদিন তোমার সঙ্গে সঙ্গে থাকতে চাই। তুমি তাতে রাজি হচ্ছ না কেন? আমি যে তোমাকে কি প্রচণ্ড ভালবাসি তুমি জান না?
মিতুর প্রতি কি শাহানার গোপন কোন ঈর্ষা আছে? হয়ত আছে। ঈর্ষা করার মত কিছু কি তার আছে? মিতু সহজ সরল ধরনের মেয়ে। তার পড়তে ভাল লাগে না। বইয়ের ধারে কাছেও সে যায় না।পরীক্ষার আগে আগে বই নিয়ে বসে আর প্রতি দশ মিনিট পর পর বলে–সর্বনাশ হয়েছে, এইবার ধরা খাব।মা কঠিন গলায় বলেন–ধরা খাব আবার কি রকম কথা? ধরা খাব মানে কি?
ধরা খাব মানে হচ্ছে গোল্লা খাব।কথাবার্তাগুলি আরেকটু সুন্দর কর মা।আচ্ছা যাও–এখন থেকে সুন্দর করে কথা বলব–শান্তিনিকেতনী ঢং-এ অর্ধেক কথা বলব নাকে–হি হি হি।মিতু কোন পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করতে পারেনি–সব পরীক্ষায় টেনে টুনে সেকেন্ড ডিভিশন মার্ক। এতেই সে খুশি। সে সব কিছুতেই খুশি। তাকে কেউ বকলেও সে খুশি। যেন এই পৃথিবীতে সে বকা খেয়ে খুশি হবার জন্যে এসেছে। মিতুকে কি শাহানা তার এই খুশি হবার অস্বাভাবিক গুণের জন্যে ঈর্ষা করে? করতে পারে।
শাহানার বিয়ে ঠিকঠাক করার পর তার মন খুব খারাপ হল নিতান্তই অপরিচিত একটি ছেলে। কয়েকদিন মাত্র দেখা হয়েছে। দুবার রেস্টুরেন্টে গিয়ে চা খেয়েছে। একবার গাড়িতে করে মেঘনা ব্রীজ পর্যন্ত গিয়ে ফিরে এসেছে। ছেলেটি কেমন সে কিছুই জানে না। তার সঙ্গে জীবনের বাকি অংশটা কাটাতে হবে। কি রকম হবে সে জীবন? গভীর রাতে যদি তার হঠাৎ প্রিয় কোন বইয়ের কয়েকটা পাতা পড়তে ইচ্ছা করে তাহলে সে কি বলবে—রাত তিনটায় বাতি জ্বালিয়েছ কেন?
বাতি নেভাও। চোখে আলো লাগছে। কিংবা মাঝে মাঝে যখন মানুষের শামুকের মত তার নিজেকে গুটিয়ে ফেলতে ইচ্ছা করে তখন সে বিরক্ত হয়ে বলবে না তো–কি হয়েছে তোমার, দরজা বন্ধ করে বসে আছ কেন? সমস্যাটা কি? সে তো সমস্যাটা কি বলতে পারবে না। তখন কি হবে? বিয়ের কিছুদিন পর ছেলেটিকে যদি অসহ্যবোধ হয়–তখন?
বুক ভর্তি ঘৃণা নিয়ে সে প্রতি রাতে তার সঙ্গে ঘুমুতে যাবে? মাঝে মাঝে সে যখন জড়ানো গলায় বলবে–এই, কাছে আস। তখন তাকে কাছে এগিয়ে যেতে হবে? সমস্ত অন্তরাত্মা হাহাকার করে উঠলেও তাকে হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরতে হবে ঘামে ভেজা একটা শরীর। কোন মানে হয়? এই অবস্থায় মিতু একদিন এসে বলল–আপা, তোমার সঙ্গে কিছু জরুরি কথা আছে। শুনবে?
শাহানা না বলার আগেই মিতু তার কথা বলা শুরু করল—বিয়ে ঠিকঠাক হবার পরে তুমি ভয়ে এমন অস্থির হয়ে পড়েছ কেন? একজন মানুষের ভেতর অনেক রহস্য থাকে, বুঝলে আপা, রহস্যের জট খুলতে খুলতে সাত-আট বছর লেগে যায়। এই সাত-আট বছরে সংসারে নতুন শিশু আসে–পারিবারিক বন্ধনে জড়িয়ে যেতে হয়। বিয়েটা মজার এবং আনন্দের একটা ব্যাপার। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তোমার ফঁসির হুকুম হয়েছে। আর তুমি তো প্রচণ্ড বুদ্ধিমতী মেয়ে।
তুমি তো তোমার স্বামীকে খুব সাবধানে নিজের মত করে তৈরি করে নিতে পারবে। তুমি যা চাও, দেখবে, আস্তে আস্তে অবস্থা এমন হবে যে ভদ্রলোকও তা-ই চাইবেন। মাঝরাতে বাতি জ্বালিয়ে গম্ভীর গলায় বলবেন–শাহানা, কিছু মনে কর না, হঠাৎ ঘুম ভাঙল। এখন আমার প্রিয় উপন্যাসের পাতা না পড়লে আর ঘুম আসবে না। অবস্থা এ রকম হতে বাধ্য। অসুবিধা হবে আমার বা আমার মত মেয়েদের।কি অসুবিধা?
আমি তো আপা হাবা-টাইপ মেয়ে। আমি বিয়ের পর পর স্বামীর প্রেমে হাবুডুবু খেতে থাকব। আমার মনে হতে থাকবে, এই পৃথিবীতে আমার জন্ম হয়েছে স্বামী নামক মানুষটিকে খুশি করার জন্যে এবং সেই খুশি করতে গিয়ে এমন সুর ছেলে মানুষি করব যে আশেপাশের সবাই বলবে-ছিঃ ছিঃ!মেয়েটার কি লজ্জাশরম নেই?তোর কি ধারণা তুই হাবা-টাইপ মেয়ে?
না, আমি আসলে খুব বুদ্ধিমতী মেয়ে, তবে চিন্তা-ভাবনা করি হাবার মত।কেন? এম্নি। আচ্ছা তুমি এমন মুখ শুকনো করে থেকো না। চল এক কাজ করি–তিনজনে মিলে কোথাও ঘুরে আসি–খুব হৈ চৈ করে আসি।কোথায় যাবি?সুখানপুকুর যাবে? চল দাদাজানকে দেখে আসি। ঐ বাড়িটাতে আমার খুব যেতে ইচ্ছা করে। চল না আমরা তিন বোন মিলে হুট করে এক রাতে উপস্থিত হয়ে দাদাজানকে চমকে দেই।
শাহানা শান্ত স্বরে বলেছিল, কাউকে চমকে দিয়ে আমি তোর মত আনন্দ পাই না। আমি ঢাকাতেই থাকব–কোথাও যাব না।শহরের বাইরে কিছুদিন থাকলে তোমার কিন্তু খুব ভাল লাগবে আপা। ঠাণ্ডা মাথায় বিয়ে টিয়ে এইসব নিয়ে চিন্তা করতে পারবে। এক কাজ কর–আমাদের নেবার দরকার নেই–তুমি বরং মনসুর ভাইকে নিয়ে যাও। বিয়ের আগের ভালবাসাবাসি দাদাজানের রাজপ্রাসাদে হোক। আমি বলব মনসুর ভাইকে?
না।একটা সেকেন্ড থট দাও আপা, প্লীজ।কোন থটই দেব না।শাহানা তার কথা রাখেনি। ঢাকার বাইরে তার থাকার ব্যাপার নিয়ে সে অনেক ভেবেছে। তারপর হঠাৎ ঠিক করেছে–সে যাবে সুখানপুকুর কিন্তু মিতুকে সঙ্গে নেবে না। মানুষের মন এত বিচিত্র কেন? বৃষ্টি পড়ছে। কি সুন্দর ঝম ঝম শব্দ! শাহানা উঠে বসল। রমিজের মা হারিকেন ” হাতে ঘরে ঢুকে বলল–ছোট আফা কই? ছোট আফা?
ঘরেই আছে। কোথায় যাবে।ঘরে নাই। আমার বুক ধড়াস ধড়াস করতাছে আফা।বুক ধড়াস ধড়াস করার কিছু নেই–ও ছাদে উঠে ভিজছে।কি কন আফা! কি সর্বনাশের কথা! কোন সর্বনাশের কথা না–চল যাই, আমি নামিয়ে আনছি।বৃষ্টিতে ভিজে ছাদ পিচ্ছিল হয়ে আছে। রেলিং-নেই ছাদের এক কোণায় উবু হয়ে নীতু বসে আছে। শাহানা বলল, কি হয়েছে নীতু?
নীতু জবাব দিল না।তুই কি আমার উপর রাগ করে ছাদে এসে বসে আছিস? হুঁ।আয় নিচে যাই। সাবধানে পা ফেলবি। যা পিছল ছাদ! আমার হাত ধর।নীতু বলল, আমার কারো হাত ধরার দরকার নেই।সময় হোক তখন দেখা যাবে, কারোর না কাঠের হাত ধরার জন্যে পাগল হয়ে গেছিস।রমিজার মা নিচে কাঠের সিড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। রমিজার মার পাশে ইরতাজুদ্দিন সাহেব। একজন কামলা ইরতাজুদ্দিন সাহেবের মাথায় ছাতা ধরে আছে। ইরতাজুদ্দিন সাহেব বিস্মিত হয়ে ভাবছেন–মেয়ে দুটির মাথা কি পুরোপুরি খারাপ?
ইরতাজুদ্দিন সাহেব নীতুকে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে বের হয়েছেন। তাঁর মন বিষণ্ণ। ভুরু কুঁচকে আছে। তিনি দুই নাতনীকে সঙ্গে নিয়েই বেড়াতে বের হতে চেয়েছিলেন। শাহানা আসতে রাজি হয়নি। তার মুখের উপর কেউ না বলবে এতে তিনি এখনো অভ্যস্ত হননি যদিও এই ব্যাপারটি এখন হচ্ছে।শ্রাবণ মাসের সকাল। আকাশে চকচকে রোদ। রোদ তাদের কাবু করতে পারছে। কারণ তারা যাচ্ছে ছায়ায় ছায়ায়। তারপরেও দুজন লোক দুটা ছাতা হাতে পেছনে পেছনে আছে।
নীতুর শরীর ভাল না। বৃষ্টিতে ভিজে ঠাণ্ডা লেগে গেছে। সর্দি হয়েছে–নাক বন্ধ। মনে হয় একটু জ্বরও এসেছে। জ্বরের কথা সে কাউকে বলেনি। নিজের অসুখবিসুখের কথা তার কাউকে বলতে ভাল লাগে না। ছায়ায় ছায়ায় হাঁটতে তার বেশ মজা লাগছে–শুধু কাদার জন্যে পা নোংরা হয়ে গা ঘিনঘিন করছে এইটুকুই কষ্ট। গ্রামের একটা জিনিশই তার খারাপ লাগে–কাদা।
ইরতাজুদ্দিন বললেন–এই গ্রামের জমিজমা যা দেখছিস সবই একসময় ছিল। আমাদের।নীতু বলল, এখন আমাদের না? না।না থাকাই ভাল। আমার জমিজমা একদম ভাল লাগে না। আমার ভাল লাগে সমুদ্র। সমুদ্র যদি কেনা যেত তাহলে আমি একটা ছোটখাট সমু্দ্র কিতাম।ইরতাজুদ্দিন সাহেবের ভুরু আরও কুঁচকে গেল। মেয়েটা প্রাকটিক্যাল হয়নি। বাস করেছে ঘোরের মধ্যে। নীতু বলল, দাদাজান, আমিন গম্ভীর হয়ে আছেন কেন?
আমি সবসময়ই গম্ভীর।একা একা থাকেন তো, এই জন্যেই গম্ভীর হয়ে পড়েছেন। একা একা থাকলেই মানুষ গম্ভীর হয়, বদমেজাজী হয়।একা থাকা ছাড়া আমার উপায় কি? ঢাকায় চলে আসুন। আমাদের সঙ্গে থাকুন। আমাদের বাড়িটা তো অনেক বড়–আপনাকে আলাদা একটা ঘর দেয়া হবে। আপনি চাইলে আপনার ঘরটা আমি সুন্দর করে সাজিয়ে দেব। আমার ঘরটা আমি নিজে সাজিয়েছি।
সুন্দর করে সাজিয়েছিস? হ্যাঁ! খুব সুন্দর। আমার ঘরে দোতলা খাট আছে। দোতলা খাট আবার কি?খাটটার দুটা ভাগ আছে, একটা নিচে, একটা উপরে।তুই কোথায় ঘুমাস, নিচে না উপরে? আমি নিচে। দাদাজান, আপনি কি এসে থাকবেন আমাদের সঙ্গে? না।না কেন? তোর বাবাকে আমি পছন্দ করি না। তোর বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গাধাগুলির মধ্যে একটা।বাবা শ্রেষ্ঠ গাধা কেন?
ইরতাজুদ্দিন বিরক্ত মুখে বললেন–কোন ছেলে যদি বাবার ভুল ধরতে চেষ্টা করে তাহলে বুঝতে হবে সে গাধা। ছেলে যদি কখনো তার বাবাকে বলে–আপনি কোনদিন আমার সামনে আসবেন না। আমি আপনার মুখ দেখতে চাই না, তাহলে বুঝতে হবে সেই ছেলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গাধা।নীতু সহজ গলায় বলল, আপনি তো খুব বড় অন্যায় করেছেন এই জন্যে বাবা এইসব কথা বলেছেন। আপনি অন্যায় না করলে বাবা কখনো এইসব কথা বলতেন না। বাবা আপনাকে দারুণ পছন্দ করে।ইরতাজুদ্দিন স্তম্ভিত হয়ে বললেন, আমি অন্যায় করেছি?
নীতু সঙ্গে সঙ্গে বলল, হ্যাঁ।যেন এই ব্যাপারে তার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। ইরতাজুদ্দিন বললেন, আমি কি অন্যায় করেছি সেটাও কি তোর বাবা বলেছে? হ্যাঁ বলেছেন। একবার না, অনেকবার বলেছেন।ও আচ্ছা! আর কি বলেছে? আর বলেছেন মানুষ মাত্রই ভুল করে–তার ভুল বুঝতে পারে। তোমার দাদাজান একমাত্র ব্যক্তি যে ভুল করে কিন্তু ভুল করেছে তা বুঝতে পারে না।তোর বাবা ভুল করে না?
নিশ্চয়ই করেন–ছোটখাট ভুল করে আপনার মত বড় ভুল করেন না।ইরতাজুদ্দিন অনেক কষ্টে রাগ সামলালেন। বাচ্চা একটা মেয়ের সঙ্গে তর্কে-বির্তকে যাওয়ার কোন প্রশ্ন উঠে না। মেয়েগুলির শিক্ষা ঠিকমত হচ্ছে না। শিক্ষায় ত্রুটি আছে। মুরুব্বীদের সঙ্গে কথাবার্তার সময় যে সামান্য আদব-কায়দা রাখতে হয় তাও তারা জানে না। মনে যা আছে ফট করে বলে ফেলে। মনের কথা চেপে রাখতে পারাও বড় গুণের একটি।
ইরতাজুদ্দিন সাহেবের স্বাস্থ্য এই বয়সেও বেশ ভাল, তারপরেও তিনি খানিকটা ক্লান্তিবোধ করছেন। পিপাসা বোধ হচ্ছে। কোথাও বসে ডাবের পানি খেতে পারলে হত। বসার জায়গা নেই। কোন এক বাড়ির সামনে দাঁড়ালে তারা ছুটাছুটি করে চেয়ারের ব্যবস্থা করবে–তার ইচ্ছা করছে না। গ্রামের কোন বাড়িতে তিনি যান না, বসে গল্পগুজবের তো প্রশ্নই উঠে না।ক্লান্ত হয়েছিস নাকি রে নীতু?
না। পা খোব দাদাজান, পায়ে কাদা লেগেছে।ইরতাজুদ্দিন নাতনীর হাত ধরে নৌকা-ঘাটার দিকে যাচ্ছেন। নৌকা-ঘাটায় কয়েকটা নৌকা বাঁধা আছে। তার একটাতে উঠেই মেয়ে পা ধুতে পারবে। ফেরার পথে হেঁটে না ফিরে নৌকায় ফিরলেই হবে। নৌকা থামবে বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া ঘাটে।
নৌকা ঘাটায় যারা ছিল তাদের মধ্যে এক ধরনের চাঞ্চল্য দেখা দিল। সবাই ছুটে এসে বিনীত ভঙ্গিতে ইরতাজুদ্দিনকে ঘিরে দাঁড়াল। পঁচজন মানুষের সবাই আলাদা আলাদাভাবে বলল স্লমালিকুম। ইরতাজুদ্দিন তাদের সালামের জবাব না দিয়ে বললেন–তোদের খবর কি? বুড়ো এক লোক হাত কচলাতে কচলাতে বলল–জ্বে খবর ভাল।বড় ঐ নৌকটা কার?
বছিরের নৌকা।বছিরকে বলিস ওর নৌকা নিয়ে যাচ্ছি। আমার বাড়ির ঘাটে, নৌকা যাবে, আমাদের নামিয়ে দিয়ে তারপর চলে আসবে।বলাবলির কিছু নাই বড় সাব–লইয়া যান।তোদের কারোর সঙ্গে যাবার দরকার নেই–আমার মাঝি আছে।জ্বে আচ্ছা। জ্বে আচ্ছা।সবাই ব্যস্ত হয়ে মুহূর্তের মধ্যে নৌকার পাটাতনে পাটি পেতে দিল। তেল-চিটটিটে দুটা বালিশ জোগাড় হল। ইরতাজুদ্দিন কাউকে কিছু বলেননি—তারা ডাব কেটে নিয়ে এল। নীতু বলল, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমার খুব তৃষ্ণা পেয়েছিল। একটা গ্লাস দিতে পারবেন?
বুড়ো মাঝি বলল, ডাবের পানি গেলাসে ঢাললে গুণ নষ্ট হইয়া যায় গো মা। উপুত কইরা টান দেন।উপুত কইরা টান দেন। কি অদ্ভুত বাক্য! ডাব খেতে গিয়ে ডাবের পানিতে নীতু তার স্কার্টটা পুরো ভিজিয়ে ফেলল– সবাই তাতে খুব মজা পেল। হাসতে হাসতে এক একজন কুটি কুটি।নৌকায় উঠা নিয়েও এক কাণ্ড। কাদা ভেঙে নৌকায় উঠতে হয়। বুড়ো মাঝি ছুটে এসে নীতুকে বলল, আম্মা আসেন আপনেরে কোলে কইরা পার কইরা দেই।
এত বড় একটা মেয়ে হয়ে সে কারোর কোলে উঠবে ভাবতেই কেমন লাগে–কিন্তু মানুষটা এমন আগ্রহ করে হাত বাড়িয়েছে–না বলতে নীতুর খারাপ লাগল। বুড়ো মাঝি নীতুকে কোলে নিয়ে খুশি খুশি গলায় বলল–আম্মাজীর শইল্যে কোন ওজন নাই। পাখির মতন শইল।এটা এমন কোন হাসির কথা না অথচ সবাই হাসছে।নৌকায় উঠেই নীতু বলল, এরা আপনাকে খুব সম্মান করে। তাই না দাদাজান?ইরতাজুদ্দিন গম্ভীর গলায় বললেন–না করার কোন কারণ নেই।
সবাই তো তোর বাবার মত না।বাবার কথায় আপনি কি রাগ করেছেন?ইরতাজুদ্দিন জবাব দিলেন না। আরো গম্ভীর হয়ে গেলেন। নৌকা তীর ঘেঁসে ঘেঁসে যাচ্ছে–গ্রামে কি খবর হয়ে গেছে? নানান বাড়ি থেকে বৌ-ঝিরা উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। একদল ছেলেমেয়ে নৌকার সঙ্গে সঙ্গে তীরে তীরে ছুটছে। নীতুর খুব মজা লাগছে।নীতু বলল, দাদাজান, আপনি মন খারাপ করে বসে থাকবেন না। আপনার মন খারাপ দেখে আমারও খারাপ লাগছে। দেখেছেন দাদাজান, বাচ্চাগুলি কি মজা করছে?
ইরতাজুদ্দিন অস্পষ্টভাবে কি যেন বললেন। পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত গলায় বললেন–নীতু শোন, আমাদের এই কাঠের দোতলা অনেক দূর থেকে দেখা যায়। চারদিকে হাওড়, আশেপাশে কোন দোতলা বাড়ি নেই। সারা রাতেই অনেকগুলি বাতি জ্বলে…
নীতু তাকিয়ে আছে। দাদাজান কি বলতে চাচ্ছেন সে বুঝতে পারছে না। দাদাজানের কথা শুনতে এখন তার ভাল লাগছে না– ছুটতে ছুটতে যে বাচ্চাগুলি যাচ্ছে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতেই ভাল লাগছে। এরা এত মজা করছে, আশ্চর্য! একজন আবার ইচ্ছা করে একটু পর পর কাদায় গড়াগড়ি খাচ্ছে– নীতু।জি।আমাদের এই বাড়িতে অনেক বড় বড় মানুষ এসেছেন।
শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এসেছিলেন পাখি শিকারে। দেশবন্ধু সি. আর. দাস এসেছিলেন। একবেলা থাকবেন বলে এসে চারদিন ছিলেন। আমার বাবা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন–অনেকের সঙ্গে তার জানাশোনা ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন শান্তিনিকেতন শুরু করেন তখন তিনি তার ফান্ডে পাঁচ হাজার এক টাকা চাঁদা দিয়েছিলেন। সেই সময় পাঁচ হাজার এক টাকা–অনেক টাকা।পাঁচ হাজারের সঙ্গে আবার এক কেন দাদাজান?
আল্লাহ বেজোড় সংখ্যা পছন্দ করেন, এই জন্যে দান-টান করলে বেজোড় সংখ্যায় দিতে হয়।ও আচ্ছা।পাখি শিকারের জন্যে বাবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও দাওয়াত করেছিলেন। উনি পাখি শিকার পছন্দ করেন না বলে আসেননি। উনি খুব সুন্দর একটা চিঠি লিখে জবাব দিয়েছিলেন। সেই চিঠি তোর বাবার কাছে আছে।বাবার কাছে নেই দাদাজান। বাবা সেই চিঠি বাংলা একাডেমীতে দিয়ে দিয়েছেন।
