Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

শ্রাবণমেঘের দিন পর্ব – ১২ হুমায়ূন আহমেদ

মনোয়ারা উঠোনে বসে আছেন। পুষ্প তাঁর মাথার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। পুষ্পের মুখও শুকনো। সে কাল রাতে রাজবাড়ি থেকে চলে এসেছে। সারারাত কেঁদেছে। কি হয়েছে কিছুই বলেনি। মনোয়ারাও জিজ্ঞেস করেননি। তিনি অস্থির তার নিজের চিন্তায়। অন্যের সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামানোর মত তার মনের অবস্থা না। মনোয়ারা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন রাস্তার দিকে।

কাউকে আসতে দেখলে প্রবল উত্তেজনা বোধ করছেন–কেউ কি আসছে? দুঃসংবাদ নিয়ে ক্লান্ত পায়ে কোন একজন–যে অনেক ভনিতা করে শেষটায় বলবে–সবই আল্লাহপাকেরু ইচ্ছা।মনোয়ারার বুক ধ্বক করে উঠল, কে যেন আসছে। এখনো অনেক দূরে, তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না কিন্তু হাঁটার ভঙ্গিটা পরিচিত। মনোয়ারারুদ্ধকণ্ঠে বললেন, ও পুষ্প, এইটা কে আসে, তোর বাপজান না?

পুষ্প চুলের বিলি কাটা বন্ধ করে এক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে আছে। হ্যাঁ, সেরকমই তো মনে হচ্ছে। উনার পিছনে আরো একজন কে যেন আসছে।মনোয়ারা কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন—পুষ্প তোর বাপজান না? পুষ্প বিকট একটা চিৎকার দিয়ে ছুটতে শুরু করল। পুষ্পের চিৎকারে ঘরের ভেতর থেকে কুসুম বের হল। এত বড় মেয়ে কিন্তু হায়াশরম বিসর্জন দিয়ে ছোটবোনের মতই বিকট চিৎকার দিয়ে সেও ছুটতে শুরু করল।

মনোয়ারার চোখে পানি এসে গেছে। তিনি চোখের পানি মুছে ফেললেন। একটু আগেই তিনি যে আল্লাহর দয়া সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করেছিলেন তার জন্যে তাঁর লজ্জার সীমা রইল না।রাস্তার উপরই মোবারককে তার দুই মেয়ে জড়িয়ে ধরে ফেলেছে। মোবারক কপট ধমক দিচ্ছেন–তোরা আদবকায়দা কিছুই জানস না–রাস্তার উপরে কি শুরু করছস! ছাড় দেখি ছাড়। আহা রে যন্ত্রণা!

মোবারকের পেছনে লাল শার্ট পরা ছেলেটি বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে আছে। সম্ভবত এমন আবেগঘন মুহূর্ত দেখে তার অভ্যেস নেই। তার তাকিয়ে থাকতে লজ্জা লাগছে, আবার চোখ নামিয়ে নিতেও পারছে না।মোবারক হাসিমুখে বললেন, সুরুজ, এই দুইটা আমার দুই পাগলা মাইয়া। বড়টার নাম কুসুম, আর ছোটটা পুষ্প।সুরুজ চোখ নামিয়ে ফেলল, অস্বস্তি নিয়ে কাশল। কুসুমের বুক ধ্বক ধ্বক করে উঠল। সুরুজ নামের এই যুবন এমন ভঙ্গিতে চোখ নামিয়ে নেবে কেন? এমন ভঙ্গিতে কাশবে কেন? বাপজান এই ছেলেকে কেন নিয়ে এসেছে?

মোবারকের সঙ্গে সুরুজের পরিচয় নিন্দালিশ বাজারে। এক কাঠের দোকানে সে পেটে-ভাতে কাজ করে। রাতে দোকানে শুয়ে থাকে। ঘর পাহারা দেয়। বাবা-মা নেই, অনাথ ছেলে। নৌকার জন্যে কাঠ কিনতে গিয়ে ছেলেটাকে তার বড়ই পছন্দ হল। বড়ই নরম স্বভাব। চেহারা-ছবি সুন্দর। কিছুক্ষণ কথা বলার পরেই ছেলেটাকে ঘরের ছেলে বলে মনে হতে লাগল। মোবারক এক পর্যায়ে বললেন, চল আমার সঙ্গে। এক লগে ব্যবসাপাতি করবা। নৌকা লইয়া দেশ-বৈদেশ ঘুরি, সাথে আপনার লোক থাকলে ভাল লাগে। যাইবা? সুরুজ সঙ্গে সঙ্গে বলল, জ্বি আইচ্চা।নৌকা বাইতে পার?

জ্বে না।নৌকা বাওন এমন কোন শক্ত কাম না।শক্ত কামরে আমি ডরাই না মোবারক ভাই।মোবারক খানিকক্ষণ এক দৃষ্টিতে সুরুজের দিকে তাকিয়ে বলল, শোন, তুমি বয়সে মেলা ছোট। আমারে ভাই ডাকব মাচা ডাকবা। কোন অসুবিধা আছে? জ্বে না।

সম্পর্ক পাল্টানোর পেছনে মোবারকের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা কাজ করেছে। হেলেটাকে তার ভালই মনে ধরেছে। কুসুমের সঙ্গে বিয়ে দেয়া যেতে পারে। ছেলের চেহারা-ছবি ভাল, আদব-কায়দা ভাল। সমস্যা একটাই–অনাথ ছেলে। অনাথ ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক করতে নেই। অনাথ ছেলে মানে ভাগ্যহীন ছেলে। ভাগ্যহীনের সাথে সম্পর্ক করলে মেয়ের ভাগ্যও নষ্ট হবে। মেয়েও কষ্ট করবে সারাজীবন। এইসব মুরুব্বীদের কথা। মুরুব্বীরা তো না জেনে-শুনে কথা বলেন না।

মনোয়ারার আনন্দের কোন সীমা নেই। শাহানাকে দিয়ে তিনি যখন প্রার্থনা করিয়েছেন তখনি বুঝে গেছেন কাজ হবে। এক একজন মানুষ আল্লাহর রহমত নিয়ে পৃথিবীতে আসে। এই মেয়েটিও এসেছে। তার কথা আল্লাহ অগ্রাহ্য করেননি। সঙ্গে সঙ্গে ছেলে জোগাড় করে দিয়েছেন। অনাথ ছেলে, ঘরবাড়ি নেই, টাকা-পয়সা নেই–তাতে কি? আল্লাহপাকের এনে দেয়া ছেলে, তিনিই রিজিকের ব্যবস্থা করবেন। শুকরানা আদায়ের জন্যে তিনি জুম্মাঘরে শুক্রবারে সিন্নি মানত করলেন। ছেলেটাকে তিনি যত দেখছেন তত তার ভাল লাগছে।

কি সুন্দর করে চাচী ডাকে! কি নরম করে কথা বলে, চোখ তুলে তাকায় না। দেখেই বোঝা যায়, এই ছেলে কোনদিন মায়ের আদর পায়নি। আদর-যত্নের সঙ্গে সে পরিচিত নয়। আদর পেলেই চেহারা কেমন হয়ে যায়। দুপুরে ভাত বেড়ে দিয়ে তিনি ইচ্ছা করেই কুসুমকে বললেন–ও কুসুম, গরম আইজ বেজায় পড়ছে, পাংখা দিয়া বাতাস কর।কুসুম হাসিমুখে বলল, পাংখা দিয়া মাথার মধ্যে একটা বাড়ি দিয়া দেই মা? ক্যান, বাড়ি দিবি ক্যান?

ইচ্ছা করতাছে।মনোয়ারা আতংকিত গলায় বললেন, থাউক বাতাস লাগব না। মেয়ের মতগতি ঠিক নেই। পাখা দিয়ে বাড়ি দিয়েও বসতে পারে। জ্বীনের আছর যে মেয়ের উপর আছে এতে অস্বীকার করার কিছু নেই। সাধারণত পুরুষ জ্বীনগুলি কুমারী মেয়েদেরই বিরক্ত করে। বিয়ের পর আর করে না। আল্লাহ আল্লাহ করে বিয়ে দিয়ে দিতে পারলে জ্বীনের উপদ্রব থেকেও বাঁচা যায়।ছেলেটারে তোর কেমন লাগে রে কুসুম?

ভাল।অনাথ ছেলে তো–এরার মায়া-মুহব্বত থাকে বেশি।মায়া-মুহব্বত বেশি থাকনই ভাল।মনোয়ারা প্রায় অস্পষ্ট গলায় বললেন–দেখি যদি আল্লাহ পাকের ইচ্ছা হয়… তিনি কথা শেষ করলেন না। ব্যাপার এখনই বলা ঠিক হবে না। মেয়ের মেজাজের ঠিক নেই। ফট করে উল্টে যেতে পারে। কি দরকার ঝামেলা বাড়ানোর। ভালয় ভালয় মেয়ে পার করতে পারলে আল্লাহর দরবারে হাজার শুকরিয়া।

কুসুম বলল, কথা তো মা শেষ করলা না।তোর বাপজানের ইচ্ছা তোর সাথে বিবাহ দেয়।ও আইচ্ছা।আমরার ইচ্ছা-অনিচ্ছায় কিছুই হইব না। সবই আল্লাহপাকের উপরে। কার সাথে কার বিবাহ হইব এইটা আল্লার ঘরে সোনার কলম দিয়া লেখা থাকে। মানুষের করনের কিছু নাই–তবু একটা চেষ্টা।কুসুম হাসছে। মনোয়ারার মনে হল সে খুশি হয়েই হাসছে। হাসলে এত সুন্দর লাগে তার মেয়েটাকে! বিয়া কবে হইতাছে মা?

শ্রাবণ মাস বিয়ার জন্য ভাল–দেখি কি হয়। এক কথায় তো আর বিয়া হয়। জোগাড়যন্ত্র আছে।জোগাড়যন্ত্রের কি আছে, মৌলবী ডাইক্যা আন–কবুল কবুল কবুল। বিয়া শেষ।মনোয়ারা শংকিত চোখে মেয়েকে দেখছেন। মেয়ের কথাবার্তা সাধারণ মানুষের মত মনে হচ্ছে না, কথাবার্তা-হাবভাবে জ্বীনের ইশারা আছে। বিয়ে যত তাড়াতাড়ি হয় ততই ভাল।

মার পীড়াপীড়িতেই কুসুমকে তেল দিয়ে চুল বাঁধতে হল। দুই বেনীতে কুসুমকে ভাল লাগে। দুই বেনী করা হয়েছে। এক রঙের দুটা ফিতা থাকলে সুন্দর হত। দুই রঙের দুটা ফিতা। একটা লাল একটা সবুজ। তাতেও কুসুমকে সুন্দর লাগছে। চোখে কাজল দিয়েছে গাঢ় করে। কুসুমের সুন্দর চোখ আরো সুন্দর লাগছে। বাপের এবারে আনা এক রঙের সবুজ শাড়ি খুব ফুটেছে। কুসুম যেন ঝলমল করছে।

মোবারক ফিরেছেন শুনে মতি এসেছে দেখা করতে। ঘরের উঠানে কুসুমের সঙ্গে দেখা। মতি হকচকিয়ে গেল। ঝাটা হাতে উঠান ঝাট দিচ্ছে ফুটফুটে এক পরী। মতি কিছু বলার আগেই কুসুম বলল, আমরার গাতক ভাইয়েরাই ভাল? হা শইল ভাল। এমন সাজ কেন কুসুম? কুসুম হাসিমুখে বলল, বিয়ার কন্যা, না সাজলে কর? বিয়ার কন্যা?

কুসুমের হাসি আরো বিস্তৃত হল। মাথার বেনী দুলিয়ে বলল, আফনে ভাবছিলেন কি জন্মে আমার বিবাহ হইব না? আমি কানাও না, লেংড়াও না। আমার চেহারা ছবি ভাল। এই দেহেন কত লম্বা চুল। আমার বিয়া হইব না ক্যান? কি কও তুমি, বিয়া তো হইবই। বিয়া না হওনের কি আছে? সবের তো হয় না। আল্লার ঘরে সোনার কলম দিয়া লেখা না থাকলে বিয়া হয় না।পাত্র কে? পাত্রের নাম ক্যামনে কই, পাপ হইব না? দিনে দুপুরে আসমানে যে জিনিশ থাকে সেই জিনিশের নামে তার নাম।সুরুজ?

এই তো পারছেন। লোকে আফনেরে বোকা কয় এইটা ঠিক না। আফনের বুদ্ধি আছে। অল্পবিস্তর হইলেও আছে।কুসুম গভীর দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করল, বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে এই খবরে মতি মোটেই বিচলিত হচ্ছে না। বরং তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে খুশি হয়েছে। বেশ খুশি।মতি আগ্রহের সঙ্গে বলল, বিয়ার তারিখ হইছে? না হয় নাই, তয় শ্রাবণ মাসেই হইব। শ্রাবণ মাস বিয়াশাদীর জন্য ভাল।তোমার বিয়ার দিন বড় কইরা একটা গানের আসর করব কুসুম।কইরেন।

ধুম বাদ্য-বাজনা হইব।আমার শুননের উপায় নাই। আমি হইলাম বিয়ার কইন্যা।মোবারক চাচা কই? জানি না কই। পাড়া ঘুরতে গেছে।উনারে বলবা খুঁজ নিতে আসছিলাম।বলব, অবশ্যই বলব।তোমার বিবাহ, এইটা শুইন্যা মনে বড় আনন্দ হইতাছে কুসুম। বড় আনন্দ!আমারো আনন্দ হইতাছে। বাপ-মার গলার মধ্যে কই মাছের কাঁটা হইয়া বিন্দা ছিলাম। কাটা হওনের দুঃখু আছে। আছে না?

অবশ্যই আছে। অবশ্যই আছে। তোমারে আইজ বড়ই সৌন্দর্য লাগতাছে কুসুম। বড়ই সৌন্দর্য।সৌন্দর্য মাইনষের চউক্ষে। যার চউখ সুন্দর তার সব সুন্দর। আফনের চউখ সুন্দর।মতি কুসুমের বাড়ি থেকে বিষণ্ণ মুখে ফিরল। কুসুমের বিয়ে শ্রাবণ মাসে ঠিক হয়ে গেলে সমস্যা আছে। হাত একেবারে খালি। গানের আসর করার কথা দিয়ে ফেলেছে। আসরটা সে করবে কি ভাবে?

রাত নটা। ইরতাজুদ্দিন খেতে বসেছেন। তাঁর সামনে শাহানা বসেছে। সহজ ভঙ্গিতেই বসেছে। সে তার দাদাজানের দিকে প্লেট এগিয়ে দিল। ইরতাজুদ্দিন গম্ভীর গলায় বললেন, নীতু খাবে না? শাহানা বলল, না।সে কাল রাতে খায়নি। আজ সারাদিনেও না। শাহানাকে তা নিয়ে মোটেও। বিচলিত মনে হচ্ছে না। ইরতাজুদ্দিনের বিস্ময়ের সীমা রইল না।

মেয়ে দুটি আশ্চর্য স্বভাবের।ইরতাজুদ্দিন বললেন, তুই ওকে সাধাসাধি করিসনি? করলে লাভ হবে না। কঠিন মেয়ে।না খেয়ে কদিন থাকবে? আরো তিনদিন।এতো মারা পড়বে।শাহানা শান্ত গলায় বলল, না, মারা পড়বে না। পানি খাচ্ছে, চা খাচ্ছে। চায়ে চিনি আছে–শর্করা। ক্যালোরি খানিকটা চিনি থেকে পাবে।তোর কাছ থেকে ডাক্তারিবিদ্যা শুনতে চাচ্ছি?

কি শুনতে চাচ্ছেন তা তো জানি না দাদাজান।কিছুই শুনতে চাচ্ছি না। আমি ওর মুখ হা করে ধরব–তুই দুধ ঢেলে দিবি।শাহানা সহজ গলায় বলল, সেটা ঠিক হবে না দাদাজান। শ্বাসনালীতে দুধ চলে যেতে পারে। ফোর্স ফিডিং যদি করাতেই হয় টিউব দিয়ে করাতে হবে।তোর কি মোটেই দুঃশ্চিন্তা লাগছে না? দুঃশ্চিন্তা করার এখনো কিছু হয়নি।বাড়িতেও কি সে এ রকম করে? না, হাঙ্গার স্ট্রাইক এই প্রথম করল।ইরতাজুদ্দিন কঠিন গলায় বললেন, তোদের খুব বেশি হয়ে গেছে। এত তেজ হবার কারণটা কি?

কারণটা জেনেটিক। বংশসূত্রে পাওয়া।ইরতাজুদ্দিন খেতে বসেও খেতে পারছেন না। তিনি দুপুরে খাননি। প্রচণ্ড খিদে থাকা সত্ত্বেও তিনি প্লেট সরিয়ে উঠে পড়লেন। অথচ শাহানা শান্ত ভঙ্গিতে খেয়ে যাচ্ছে। যেন কিছুই হয়নি।ইরাতাজুদ্দিন পুষ্পকে আনতে লোক পাঠিয়ে ঢুকলেন নীতুর ঘরে। নীতু শুয়ে শুয়ে বই পড়ছিল, সে উঠে বসল। দাদাজানের দিকে তাকিয়ে হাসল। ইরতাজুদ্দিন বসলেন তার পাশে।কি বই পড়ছিস? ভূতের বই দাদাজান। নিশিরাতের আতংক।খুব ভয়ের? খুব ভয়ের না, মোটামুটি ভয়ের?

ইরতাজুদ্দিন ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, পুষ্পকে আনতে লোক। পাঠিয়েছি।থ্যাংক য়্যু দাদাজান।ও এলে কি করতে হবে–তোর সামনে ক্ষমা চাইতে হবে? আমার সামনে না চাইলেও হবে।ইরতাজুদ্দিন পকেট থেকে সিগারেট বের করলেন। তিনি সিগারেট খান না। বললেই হয়। হঠাৎ হঠাৎ সিগারেট ধরান।নীতু! জ্বি।পুষ্প মেয়েটা রাতে কোথায় ঘুমায়? তোর সাথে, না নিচে তার নিজের মাদুরের বিছানায়?

ও নিচে ঘুমায়।ইরতাজুদ্দিন সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললেন—মেয়েটা তোর হাত ধরে হাঁটছিল বলে আমি রাগ করেছিলাম। তোর কাছে মনে হল কাজটা খুব অন্যায় হয়ে গেছে। মানুষে মানুষে আমি প্রভেদ করে ফেলেছি। সেই প্রভেদটা তো তোর মধ্যেও আছে। তুই তো মেয়েটাকে পাশে নিয়ে ঘুমুচ্ছিস না? ওকে ঘুমুতে হচ্ছে মেঝেতে।

নীতু তাকিয়ে আছে। কিছু বলছে না।ইরতাজুদ্দিন বললেন–যে ত্রুটি নিজের মধ্যে আছে সেই ত্রুটির জন্যে অন্যের উপর কি রাগ করা যায়? নীতু বলল, না।আমরা মুখে বলি–সব মানুষ সমান। মনে কিন্তু বিশ্বাস করি না। শুধুমাত্র মহাপুরুষরাই এই কাজটা পারেন। মনে যা বিশ্বাস করেন মুখে তাই বলেন। মহাপুরুষ চেষ্টা করে হওয়া যায় না। মহাপুরুষের বীজ ভেতরে থাকতে হয়। তোর ভেতর এই জিনিশটা নেই।

নীতু চুপ করে রইল। ইরতাজুদ্দিন বললেন–তোর ভেতর না থাকলেও শাহানার ভেতর এটা আছে।কি করে বুঝলেন আপার আছে? বোঝা যায়।নীতু নিচু গলায় বলল–দাদাজান, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আপার মধ্যে এটা আছে। আমাদের বাসায় কাজের মেয়েদের যখন অসুখ হয় তখন ভাত মেখে আপা তাদের মুখে তুলে খাওয়ায়। দেখেই আমার যেন কেমন কেমন লাগে। আমি এই কাজটা কখনো করতে পারব না।

ইরতাজুদ্দিন বললেন, আয়, খেতে আয়। নীতু সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। ইরতাজুদ্দিন বললেন, আমি যদি ভাত মেখে তোর মুখে তুলে দেই তাহলে কি তোর কেমন কেমন লাগবে? নীতু বলল, লাগবে।খাবার টেবিলে ইরতাজুদ্দিন নীতুকে নিয়ে বসেছেন। নতুন করে মাছ ভাজা হচ্ছে। গরম গরম ভেজে পাতে তুলে দেবে। নীতু প্লেটে ভাত নিয়ে লজ্জিত ভঙ্গিতে অপেক্ষা করছে।

ইরতাজুদ্দিন বললেন, কাল ভোরে মজার একটা ব্যাপার হবে। ভাবছিলাম তোদের বলব না, অবাক করে দেব। বলেই ফেলি–মিতু আসবে। সম্ভবত মোহসিনও আসবে।বলেন কি? শাহানাকে কিছু বলার দরকার নেই। ওকে চমকে দেব।আপাকে চমকে দেবার জন্যেই কি এটা করেছেন? না। আমি কাজটা করেছি নিজের স্বার্থে। ওরা এলে তোরা হয়ত আরো কয়েকদিন বেশি থাকবি। বাড়িটা গমগম করবে। মানুষ খুব স্বার্থপর প্রাণী, তারা নিজের স্বার্থটা দেখে।

প্রকাণ্ড এক টুকরা ভাজা মাছ চলে এসেছে। ভাজা মাছের গন্ধে বাড়ি ম-ম করছে। নীতুর জিবে পানি চলে এসেছে। এরকম তার আগে কখনো হয়নি। ইরতাজুদ্দিন হাসিমুখে নীতুর খাওয়া দেখছেন।নীতুর অনেকদিন পর আজ প্রথমৃশ–তার দাদাজান মানুষটাকে যতটা খারাপ ভাবা গেছে তত খারাপ না।দাদাজান! হুঁ।আপনি কি কোন ভয়ংকর ভূতের গল্প জানেন? জানি। শুনবি?

হ্যাঁ শুনব।খাওয়া শেষ করে আয় আমার ঘরে।পুষ্প যদি আসে তাকে কি সঙ্গে করে নিয়ে আসব? নিয়ে আসিস।পুষ্প এল না। আসবে কি করে? তার বাড়িতে আনন্দের সীমা নেই। বাপজান এসেছে এতদিন পর। বাপের সঙ্গে এসেছে সুরুজ ভাই। ভাবভঙ্গি থেকে মনে হচ্ছে, সুরুজ ভাইয়ের সঙ্গে কুসুম বুর বিয়ে হবে। বাপজান আর মার মধ্যে ফিসফাস কথা হচ্ছেই। নিন্দালিশের বড় খালা এসেছেন। ফিসফাসের সঙ্গে তিনিও যুক্ত হয়েছেন। কুসুম বু সেজেগুজে ঘুরঘুর করছে।

রোজ রাতে নারকেল তেল দিয়ে তার চুল বেঁধে দেয়া হচ্ছে। নিন্দালিশের বড় খালা নীলরঙা একটা শাড়ি এনেছেন। সেই শাড়ি পরার পর কুসুমবুকে আর পৃথিবীর মেয়ে বলে মনে হয় না। মনে হয় সে আকাশের মেয়ে–এক্ষুণি উড়ে আকাশে গিয়ে মিশে যাবে। এত মজা ছেড়ে রাজবাড়িতে আসার তার ইচ্ছে হচ্ছে না। ইরতাজুদ্দিন সাহেবের সামনে পড়তেও তার ভয় লাগছে। রাজবাড়ি থেকে দূরে থাকাই ভাল।

নীতুর দাদাজানের খাটটা ফুটবল খেলার মাঠের মত বিশাল। নীতু সেই বিশাল খাটের মাঝামাঝি বসে আছে। তার সামনে বালিশে হেলান দিয়ে ইরতাজুদ্দিন ভূতের গল্প শুরু করলেন— আমি তখন যুবক মানুষ। এলএলবি পাশ করেছি। ময়মনসিংহ কোটে এসেছি–হাবভাব বুঝব। বিলেতে গিয়ে ব্যারিস্টারী পড়ার কথা হচ্ছে।

আমার বাবা ময়েজউদ্দিন চৌধুরী যেদিন বলবেন বিলেত যা, সেদিনই যাব। তার কথার উপর কথা বলার সাহস কারোর নেই। তিনি বলেছেন, কিছুদিন কোটে ঘোরাফিরা কর। তাই করছি। ময়মনসিংহে বিরাট একটা বাড়ি ভাড়া করা হয়েছে।একা থাকি। মাঝে মাঝে ময়মনসিংহ কোর্টের পেশকার ফখরুল আমিন সাহেবের বাড়িতে যাই দাবা খেলার জন্যে। আমার তখন দাবা খেলার খুব নেশা…

নীতু বলল, দাদাজান, এটা কি ভূতের গল্প।না, ঠিক ভূতের গল্প না। এটা শুনে, তারপর ভূতের গল্প বলব। একদিন আমিন সাহেবের বাড়িতে দাবা খেলতে গেছি–গিয়ে শুনি উনি কি কাজে বিক্রমপুর গেছেন। তার বড় মেয়ে পর্দার আড়াল থেকে বলল, আপনি বসুন, চা খেয়ে যান। আমি বসলাম। মেয়েটা চা এনে দিল। নিজেই এনে দিল।উনিই কি আমার দাদীজান? ইরতাজুদ্দিন ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, হ্যাঁ। তারপর?

মেয়েটাকে বিয়ে করলাম। বাবা খুব বিরক্ত হলেন। সামান্য পেশকারের মেয়েকে তাঁর ছেলে বিয়ে করবে এটা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না। আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে বাড়িতে উঠলাম। বাবা মূল বাড়ির থেকে দূরে–এখানে যে কাঁঠালগাছটা আছে সেখানে ঘর বানিয়ে দিলেন। জোহরার থাকার জায়গা হল ঐ ঘরে।উনার নাম জোহরা?

হুঁ।আপনিও ঐ ঘরে থাকতে? না। বাবা আমাকে বিলেত পাঠিয়ে দিলেন। ও একাই থাকত। বিলেত থাকার সময়ই খবর পাই ছেলে হতে গিয়ে ও মারা গেছে। ডাক্তার ছিল না, ওষুধপত্র ছিল না। অনাদর অবহেলায় তোর বাবার জন্ম হয়। তোর বাবা কি কখনো এইসব নিয়ে তোদের সঙ্গে গল্প করেছে?

না, তবে বাবা বলেছেন তিনি মানুষ হয়েছেন তার বড় মামা-মামীর কাছে।এই বাড়িটা ছিল তোর বাবার কাছে এক দুঃস্বপ্নের বাড়ি। এখনো তাই আছে। সে কখনো আসে না–তার মেয়েদেরও আসতে দেয় না। এই বাড়িটা তার কাছে বন্দিশিবির।আসলেই তো বন্দিশিবির।বুবলি রে নীতু, এই বন্দিশিবিরে আমি সারা জীবন একা একা কাটিয়েছি। আমি কিন্তু দ্বিতীয়বার বিয়ে করিনি। ইচ্ছা করলেই বিয়ে করতে পারত ইচ্ছে হয়নি।

এই ব্যাপারটা তোর বাবার চোখে পড়ল না। তোর বাবার শুধু চোখে পড়ল–আমার কারণে তার মা বন্দি হলেন রাজবাড়িতে। আমার কারণে তাঁর মৃত্যু হল।আমার দাদীজান কি সত্যি সত্যি এই রাজবাড়িতে বন্দি হয়ে ছিলেন? হ্যাঁ। আমার বাবা তাকে ঐ ঘর থেকে বের হতে দিতেন না। জোহরার মা বাবাভাই-বোন কারো সঙ্গে তাকে দেখা করতেও দেননি। বিলেত থাকার সময় আমি যেসব চিঠিপত্র তাকে লিখেছি সেসবও তাকে দেয়া হয়নি। তার কোন চিঠিও আমার কাছে পাঠানো হয়নি।উনি কি খুব সুন্দরী ছিলেন দাদাজান?

হ্যাঁ।উনার কোন ছবি আছে? একটা আছে। দেখবি? হ্যাঁ দেখব।ইরতাজুদ্দিন খাট থেকে নামলেন। চাবি দিয়ে আলমারি খুলে ছবি বের করে। নীতুর হাতে দিলেন। কালো মেহগনি কাঠের ফ্রেমে বাধা ছবি। নীতু ছবি হাতে নিয়ে হতভম্ব গলায় বলল, এ তো অবিকল আপার ছবি!

ইরতাজুদ্দিন ক্লান্ত গলায় বললেন, হ্যাঁ, শাহানার সঙ্গে ওর সাংঘাতিক মিল।ছবিটা আপনি সরিয়ে রাখেননি কেন দাদাজান? লুকিয়ে রেখেছেন কেন?ইরতাজুদ্দিন জবাব দিলেন না। নীতু বলল, দাদীজানের কথা আরো বলুন, আমার খুব শুনতে ইচ্ছে করছে। উনি কি খুব হাসিখুশি মহিলা ছিলেন? না। চুপচাপ থাকত। তবে ভয়ঙ্কর জেদ ছিল। যা বলবে তাই।আমার মত?

হুঁ। খানিকটা তোর মত; যা নীতু, ঘুমুতে যা–রাত অনেক হয়েছে।নীতু বলল, আজ আমি আপনার সঙ্গে ঘুমুব দাদাজান। যদি আপনার কোন আপত্তি না থাকে।ইরতাজুদ্দিনের পাশে নীতু শুয়ে আছে। এক সময় তার মনে হল তার দাদাজান কাঁদছেন। নীতু ভয়ে ভয়ে একটা হাত তার দাদাজানের গায়ের উপর রাখল। ইরতাজুদ্দিন কাঁদছেন। তার শরীর কাপছে, সেই সঙ্গে কাঁপছে নীতুর ছোট্ট হাত।যে হাত একজন নিঃসঙ্গ মানুষের প্রতি মমতায় আর্দ্র।

সুরুজ আলি অনেক রাতে খেতে বসেছে। অন্দরবাড়িতেই তাকে খেতে দেয়া হয়। আজ বাংলাঘরে খাচ্ছে। পুষ্প ভাত-তরকারি এগিয়ে দিচ্ছে। দরজার বাইরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে কুসুম।মনোয়ারার ব্যথা ওঠেছে। ব্যথায় কাটা মুরগির মত ছটফট করছেন। মনোয়ারার বড় বোন আনোয়ারা বোনের পাশে আছেন। আজ তার চলে যাবার কথা ছিল। মনোয়ারার ব্যথা ওঠার কারণে যেতে পারছেন না।

আনোয়ারা এসেছিলেন কুসুমের বিয়ের ব্যাপারটা ফয়সালা করতে। তিনি মোটামুটিভাবে করেছেন। ছেলে তার খুব পছন্দ হয়েছে। তিনি কুসুমকে বলেছেন–অনাথ ছেলে হলেও সে যে উঁচু বংশের তা বোঝা যায়। কারণ ভাত খাওয়ার সময় এই ছেলে ছোট ছোট ভাতের নলা করে মুখে দেয়। ভাতের নলা যার যত ছোট তার বংশ তত উঁচু।

কুসুম তার উত্তরে বলেছে, তাহলে তো খালাজান মুরগির বংশ সবচাইতে উঁচা।মুরগি একটা একটা কইরা ভাত খায়।কুসুমের কথায় তিনি খুবই বিরক্ত হয়েছেন। তার ধারণা হয়েছিল, কুসুম বোধূয় এই বিয়েটা চাচ্ছে না। তিনি কুসুমকে আড়ালে ডেকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে নিশ্চিন্ত হলেন যে, কুসুমের কোন আপত্তি নেই। ছেলে কুসুমেরও পছন্দ।তিনি কুসুমকে আশ্বস্ত করে বলেছেন–ছেলে কাজকাম করে না এইটা নিয়া তুই চিন্তা করিস না।

রুটি-রুজির মালিক মানুষ না, আল্লাহপাক। আর পুরুষ মাইনষের ভাগ্য থাকে ইস্তিরির শাড়ির অঞ্চলে বান্দা।আমার শাড়ির অঞ্চলে তো খালাজান কিছুই নাই।আছে কি নাই এইটা তোর জানার কথা না। জাঞ্জেল্লাহপাক। আর আমরা তো আছি। বানে ভাইস্যা যাই নাই।কুসুমের আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে তার খালুজনই অবস্থাসম্পন্ন। কুসুমের বিয়ের খরচপাতির বেশিরভাগই তিনি করবেন কাজে তার কথাবার্তা গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *