Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

শ্রাবণমেঘের দিন পর্ব – ১৪ হুমায়ূন আহমেদ

হুঁ।খিদেও লেগেছে মারাত্মক।খিদে লাগলেও আপনাকে কিছু খেতে দেয়া হবে না। এখন খেলে রাতে আবার ভাত খাবেন না।তুমি তোমার আপাকে বল–আমি আসছি। সেজেগুজে নিজেকে প্রেজেন্ট করি। তোমরা যে আসলে রাজকন্যা তা তো জানতাম না। এখানে এসে জানলাম। রাজকন্যার সামনে তো আর গেঞ্জি গায়ে উপস্থিত হওয়া যাবে না।নীতু খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল, আমরা যে রাজকন্যা সেটা আমরাও জানতাম না।

এখানে এসে জেনেছি।মোহসিন হাসতে হাসতে বলল, তুমি এখন আমাকে একটা বুদ্ধি দাও। তোমার আপার সঙ্গে যখন দেখা হবে তখন কি কুর্নিশ করতে হবে? নীতু আবারো খিলখিল করে হেসে উঠল।চা দেয়া হয়েছে বারান্দায়। শাহানা একা অপেক্ষা করছে। সন্ধ্যা নামছে ঘন হয়ে। টেবিলে কেরোসিনের বাতি আছে কিন্তু নেভাননা। মোহসিনকে আসতে দেখে শাহানা হাসল। মোহসিন বলল, কেমন আছ হার হাইনেস?

ভাল।চোখের কোণে কালি, মুখ শুকনো। কি ব্যাপার বল তে? শরীর ভাল তো? ডাক্তারকে কখনো জিজ্ঞেস করতে নেই শরীর ভাল কি-না।সরি। তুমি যে একজন ডাক্তার মনেই থাকে না।শাহানা চা ঢালছে। মোহসিন বলল, শুধু চা দিচ্ছ? প্রচণ্ড খিদে লেগেছে।খিদে লাগলেও উপায় নেই। দাদাজানের নির্দেশ–বিকেলে তোমাকে যেন কিছু না দেয়া হয়। দুপুরে কিছু না খাওয়ায় উনি রেগে আছেন। তাঁর কাতল মাছের গতি হয়নি।

রাতে গতি হবে। কাতল মাছের দুঃখিত হবার কিছু নেই।শাহানা হাসতে হাসতে বলল, রাতে অন্য মাছ।সে কি! রাজবাড়ির কাণ্ডকারখানা অন্য রকম।সিগারেট খাওয়া যাবে তো? না-কিবিগারেট খেতে দেখলে তোমার দাদাজান রাগ করবেন? রাগ করবেন না, খাও।

মোহসিন সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, মিতু আমাকে প্রায় জোর করে পাঠিয়েছে। আমার দায়িত্ব হচ্ছে তোমাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া। মিতুর ধারণা, তোমাকে এই মুহূর্তে গ্রেফতার করে নিয়ে না গেলে তুমি আর যাবে না, থেকে যাবে।মিতুর ধারণা ঠিক না, আমি যাব।কবে যাবে? তুমি যখন যেতে বলবে। তুমি কবে যেতে চাও?

আমি তো এক্ষুণি যেতে চাই। প্রচণ্ড সব ঝামেলা ফেলে এসেছি। যাই হোক, কাল দুপুরের দিকে রওনা হলে রাতে ঢাকা পৌঁছতে পারি। তোমার অসুবিধা আছে? না, অসুবিধা নেই।এই সময়ের মধ্যে হার হাইনেসের রাজত্ব যতটা পারি দেখে নের। দেখার কিছু কি আছে এখানে? ছোট একটা দীঘি আছে। চারদিক কদমগাছে ঘেরা। শুধু যে অপূর্ব তাই না, মনে হয় জায়গাটা বেহেশতের একটা অংশ ছিল, ভুলে পৃথিবীতে চলে এসেছে। দীঘিটার নাম হল অশ্রুদীঘি।বল কি! গ্রামের এক দীঘির এ রকম কাব্যিক নাম? কে রেখেছে এই নাম?

আমি। তুমি? হুঁ। আমি।এত সুন্দর দীঘি যদি হয় তার নাম অশ্রুদীঘি হবে কেন? দীঘিটা দেখলে আনন্দে চোখে পানি এসে যায়, এই জন্যেই তার নাম রেখেছি, অশ্রুদীঘি।মোহসিন দ্বিতীয় সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, তোমার মধ্যে যেমন প্রবল কাব্য ভাব আছে তা জানতাম না।শাহানা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি নিজেও জানুতাগী এখানে এসে অনেক কিছু জেনেছি।যেমন?

যেমন, আগে ভাবতাম আমার স্বপ্ন হচ্ছে পৃথিবীর বড় ডাক্তারদের মধ্যে একজন হওয়া। এখানে এসে মনে হল এটা ভুল স্বপ্ন। আমার আসল স্বপ্ন অন্য।আসল স্বপ্ন কি? আসল স্বপ্ন গ্রাম্য একটা গানের দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পথে পথে গান গাওয়া–কে পরাইল আমার চউক্ষে কলংক কাজল।মিতু ঠিকই বলেছে–দ্রুত তোমাকে এখান থেকে সরিয়ে নেয়া উচিত।

শাহানা অস্পষ্ট গলায় বলল, সব মানুষের মধ্যে নানান ধরনের স্বপ্ন থাকে। তার মধ্যে কোটা সত্যি স্বপ্ন কোটা মিথ্যে স্বপ্ন সে ধরতে পারে না। মানুষ সব সময়ই বাস করে একটা বিভ্রমের ভেতর।মোহসিন হাসতে হাসতে বলল, তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে এক্ষুণি তোমাকে নিয়ে ঢাকা রওনা হওয়া উচিত।শাহানা হাসল। মোহসিন বলল, যাক, অনেকক্ষণ পর তোমার হাসি দেখলাম।

আগে একবার হেসেছি, তুমি লক্ষ্য করনি।মোহসিন বলল, তোমার কথাবার্তা খুব হাই ফিলসফির দিকে টার্ন করছে। সহজ কথাবার্তা কিছু বলা যায় না? যায়। চকোলেট রঙের এই শার্টে তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে এবং তুমি যে এত সুপুরুষ তা ঢাকায় থাকতে বুঝতে পারিনি।থ্যাংকস। এই তো, এখন কথাবার্তাগুলি শুনতে ভাল লাগছে। চল, তোমার অশ্রুদীঘি দেখে আসি।

এখন না। আরেকটু পরে চল। আজ পূর্ণিমা। চাঁদ উঠুক, তারপর যাব।অশ্রুদীঘির চারপাশে আমরা যদি হাত ধরাধরি করে হাঁটি তাহলে গ্রামের লোক কিছু মনে করবে না তো? না। আচ্ছা, তুমি কি গান শুনবে? কে গাইবে? তুমি? না। আমি গান জানি না কি? এখানে একজন গায়ক আছেন–মতি–উনাকে খবর দিলে…।

কাউকে খবর দিতে হবে না। আমরা হাত ধরাধরি করে অশ্রুদীঘির চারপাশে হাঁটব। গানের দরকার হবে না। আমাদের সবার ভেতর গান আছে বিশেষ বিশেষ সময়ে সেই গান আপনাআপনি কানে বাজতে থাকে… দেখলে তো, দার্শনিক কথাবার্তা আমিও বলতে পারি।

মোহসিন আন্তরিক ভঙ্গিতে হাসছে। পূর্ণিমার চাঁদ উঠে গেছে–এখনো আলো ছড়াতে শুরু করেনি। শাহানা অপেক্ষা করছে।মোহসিন বলল, রাজকন্যা তুমি কি আরেকবার আমার দিকে তাকিয়ে হাসবে?হাঁটু গেড়ে বস তারপর হাসব।মোহসিন সত্যি সত্যি হাঁটু গেড়ে বসতে গেল। শাহানা হাত ধরে থামাল।

আকাশে প্রকাণ্ড থালার মত চাঁদ উঠেছে। জোছনার প্রাবনে থৈ থৈ করছে সুখানপুকুর। তরল জোছনা, মনে হয় ইচ্ছে করলেই এই জোছনা গায়ে মাখা যায়।জোছনা গায়ে মেখে কুসুম জলচৌকিতে একা একা বসে আছে। সে সন্ধ্যা থেকেই কাঁদছে। তার ভেজা গালে জোছনা চক চক করছে। কুসুমের কান্না বাড়ির সবাই দেখছে কেউ গায়ে মাখছে না। বিয়ের কন্যাতো কাঁদবেই। কাঁদাটাইতো স্বাভাবিক।

কুসুমের বিয়ে ঠিক হয়েছে আজ বিকেলে। তার বড় খালা হুট করেই সব ব্যবস্থা করে ফেললেন। মনোয়ারাকে ডেকে বললেন, গরীব ঘরের মেয়ের বিয়া। জামাই হাতীর পিঠে চইড়া আসব না। জামাই ঘরে বসা। জিনিশটা ভাল দেখায় না। মৌলবী ডাক দিয়া কবুল দিয়া দেও। এজিন কাবিন হইয়া থাকুক। পরে এক সময় গেরামের মানুষের খাওয়াটা দিবা।মনোয়ারা বলেছেন–আফনে যেটা ভাল বিবেচনা করেন।আমি এইটাই ভাল বিবেচনা করি।ছেলেরে জিজ্ঞেস করা দরকার না বুবু তার একটা মতামত।জিজ্ঞেস করতাছি।

কুসুমের খুব আশা ছিল ছেলে রাজী হবে না। শখ করে কে চাইবে জ্বীনে পাওয়া মেয়েকে বউ করতে। কুসুমকে অবাক করে দিয়ে সুরুজ আলি মিনমিন করে লল, আফনে আমার মার মত। আফনে যা নির্ধারন করবেন… নিন্দালিশের খালা বললেন, আইজ পূর্ণিমা। পূর্ণিমার দিন বিবাহ সুখের হয় না। কাইল একজন মৌলবী খবর দিয়া আনি। দশ হাজার এক টাকা কাবিনে বিবাহ রাজি আছ? সুরুজ আলি পায়ের নখ দিয়ে মাটিতে আঁকিবুকি কাটতে কাটতে বলল, আফনে আমার মুরুব্বী।

তিনি একশ টাকার দুটা নোট বের করে দিয়ে বললেন, পায়জামা, পাঞ্জাবী আর টুপী কিনা আন। কালা টুপী কিনবা না।কুসুমকে হতভম্ভ করে সুরুজ আলি টাকা নিয়ে পায়জামা, পাঞ্জাবী কিনতে চলে গেল। তারপরেও কুসুমের মনে ক্ষীণ আশা ছিল হয়ত টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাবে। খালি হাতে পালিয়ে যাবার চেয়ে টাকা পয়সা নিয়ে পালিয়ে যাওয়া ভাল।সুরুজ আলি পালায় নি। সন্ধ্যার আগেই ফিরেছে। নাপিতের দোকানে চুল কাটিয়েছে।

মৌলবী ডাকিয়ে তিনবার কবুল বলিয়ে যে বিয়ে হবে তারও আয়োজন লাগে। কুসুমের বাড়ির সবাই সেই আয়োজনে ব্যস্ত। আশে পাশের বাড়ির মেয়েরাও এসে জুটেছে। চিকণ করে সুপারী কাটা হচ্ছে। পানের খিলি বানানো হচ্ছে। হাতের সেমাই বানানোর জন্যে চালের গুড়ি তৈরী হচ্ছে। পুষ্পের খুব শখ মাঝ রাত থেকে বিয়ের গীত হবে। সে গেছে বিয়ের গীতের মানুষ জোগাড় করতে।

বিয়ের গীতের আসল মানুষ মরিয়মের মা। খবর পেলেই তিনি চলে আসবেন। সাপের ওঝার যেমন সাপে কাটা রুগীর খবর পেলেই আসতে হয়। বিয়ের গীত যারা গায় তাদেরও তেমনি বিয়ের খবর পাওয়া মাত্র ছুটে আসতে হয়।মরিয়মের মা এলেই পাড়ার বাকি বৌ-ঝিরা আসতে শুরু করবে। মাঝ রাতের পর চারদিকে নিস্তব্ধ হয়ে গেলে শুরু হবে বিয়ের গান। একজন গাইবে বাকিরা ধোয়া ধরবে–

আইজ আমরার কুসুম বেটির বিবাহ হইব।

বিবাহ হইব। বিবাহ হইব।

হাসিয়া রঙ্গিলা কুসুম পিড়িতে বসিব

বিবাহ হইব। বিবাহ হইব।

পিড়িতে বসিয়া কুসুম সিনান করিব

বিবাহ হইব। বিবাহ হইব।

সিনান করিয়া পায়ে আলতা পরিব

বিবাহ হইব। বিবাহ হইব।

কুসুম জলচৌকি থেকে উঠল। হঠাৎ তার ভেতর সামান্য অস্থির দেখা গেল। সে চোখের পানি মুছে ফেলল। সবাই ব্যস্ত। কেউ তাকে লক্ষ্য করবে না। এই ফাঁকে চট করে মতি ভাইকে দুটা কথা বলে আসা যায়। কতক্ষণ আর লাগবে দুটা কথা বলতে। যাবে আর আসবে। বিয়ের কনেকে চোখে চোখে রাখার নিয়ম। কুসুমকে কেউ চোখে চোখে রাখছে না। সে পাঁচ দশমিনিটের জন্যে চলে গলে কেউ দেখবে না।

মতির জ্বর বেড়েছে। সে কাঁথা গায়ে শুয়ে ছিল। হারিকেন জ্বালায় নি। খোলা দরজা ও জানালা গলে চঁদের আলো এসে আলো হয়ে আছে। কুসুম দরজা ধরে দাঁড়াতেই মতি চমকে উঠে বলল, কে? কুসুম খুব নরম স্বরে বলল, আমি মতি ভাই।কি ব্যাপার কুসুম? আফনের জ্বর কেমন দেখতে আসছি। কাইল আমার বিবাহ। বিবাহের পরে তো আর যখন তখন আসন যাইব না। আফনের জ্বর কি বাড়ছে মতি ভাই।

হুঁ।কুসুম সহজ ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকল। মতির কপালে হাত রেখে উদ্বিগ্ন গলায় বলল, জ্বরে তো শইল পুইড়া যাইতেছে।মতি গম্ভীর গলায় বলল, রাইত কইরা তুমি আসছ কাজটাতো ভাল কর নাই কুসুম।আমার ভাল-মন্দ আফনের দেখনের দরকার নাই। নিজের ভাল-মন্দ দেখেন। রাজবাড়ির মেয়েরে খবর দৈন নাই। খবর পাইলে সে দৌড়াইয়া আইস্যা চিকিৎসা শুরু করব। আফনেরে সে খুব ভাল পায়।তুমি ভাল পাও না?

আমার ভাল পাওনে না পাওনে কিছু হয় না। আমি কে মতি ভাই। আমি কেউ।কুসুম খাটে বসল। মতি আতংকিত গলায় বলল–বাড়িত যাও কুসুম। বসলা যে? কাইল তোমার বিবাহ এই খবর পাইছি। বিয়ার কন্যা হইয়া… আফনেরে দুইটা কথা কইতে আইছি মতি ভাই। কথা দুইটা শেষ হইলেই এক দৌড় দিয়া চইল্যা যাব।কি কথা? ব্যাঙের মাথা।তামাশা করবা না কুসুম। যা বলনের বল–বইল্যা বাড়িতে যাও।

কুসুম মুহূর্ত চুপ করে থেকে শান্ত গলায় বলল, মতি ভাই আফনে আমারে একটু আদর কইরা দেন।মতি স্তম্ভিত হয়ে বলল, ছিঃ ছিঃ কুসুম। তুমি কি বলতেছ? এইসব কি কথা? কুসুম ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি হইলাম জ্বীনে ধরা মেয়ে। কোন সময় কি বলি কোন ঠিক নাই। ভুল হইলে মাফ কইরা দেন।ভুলতো অবশ্যই হইছে। এইসব পাপ চিন্তা মনে স্থান দিবা না। তুমি জান না তোমারে আমি অত্যাধিক স্নেহ করি।সত্যি? অবশ্যই সত্য। যাও অখন বাড়িত যাও।এ যদি না যাই?

মতি হতবুদ্ধি হয়ে গেল। মেয়েটা এইসব কি শুরু করেছে? জ্বীন তাকে দিয়ে এইসব করাচ্ছে। ভরা পূর্ণিমায় জ্বীনের আছর বেশী হয়।মতি ভাই, আমি ঠিক করছি এই চৌকির উপরে বইস্যা থাকব। লোকজন এক সময় আমার খুঁজে বাইর হইব। খুঁজতে খুঁজতে আমারে পাইব আন্ধ্যাইর ঘরে বসা।কুসুম হাসছে। খিলখিল করে হাসছে। স্বাভাবিক মানুষের হাসি না—অস্বাভাবিক হাসি। যে হাসি শুনলে গা ঝিম ঝিম করে।মতি ভাই?

হুঁ।আফনে কোন দিন বিবাহ করবেন না? না। আমার ওস্তাদের নিষেধ আছে। ওস্তাদ আমারে স্পষ্ট কইরা বলছে–সংসার আর গান দুইটা এক লগে হয় না। হয় সংসার করবা নয় গান।আফনের ওস্তাদ তো বিবাহ করছিল। করে নাই? হ্যাঁ করছে। এই জন্যেই তো তার গলাত গান বসে নাই।আফনের গলাত গান বসছে?

হ্যাঁ কুসুম বসছে। তুমি নিজেও জান বসছে। আমি গানে টান দিলে মাইনষের চউক্ষে পানি আয়। কি জন্যে আয়? কুসুম শান্ত গলায় বলল, হ্যাঁ মতি ভাই। আফনের গলায় গান বসছে। কথা সত্য।মতি আগ্রহের সঙ্গে বলল, এর জন্যে কষ্ট আমি কম করি নাই। অনেক কষ্ট করছি। মনে সুখ থাকলে গান হয় না–এই জন্যে সুখের আশা কোন দিন করি নাই।

মতির কথার মাঝখানেই কুসুম হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, যাই মতি ভাই। তার গলার স্বরে আগের শান্ত ভাব নেই। তার গলা ভেজা।আও তোমারে আগাইয়া দেই। আগাইয়া দেওনের দরকার নাই। কে না কে দেখব মতিও ঘর থেকে বের হল। তার বাড়ির উঠান জোছনায় ভরা। কুসুম বলল, কি চান্নি পসর দেখছেন মতি ভাই। এমন চান্নি কোনবার দেখি নাই।বলতে বলতে কুসুম শব্দ করে হাসল। মতি বলল হাস কেন? মাইনষে যেমন বৃষ্টির মইধ্যে গোসল করে আমার জোছনার মইধ্যে গোসল করনের ইচ্ছা করতেছে। গোসল করবেন মতি ভাই?

তুমি যে কি পাগলের মত কথা কও।কুসুম ধরা গলায় বলল, আর কোন দিন আফরের বিরক্ত করব না মতি ভাই। আইজ আমার কথা শুনেন, আইয়েন উঠানে ইফদুইজনে জোছনার মইধ্যে গোসল করি। শইল্যে চান্নি পসর মাখি।বাড়িত যাও কুসুম।কুসুম ক্লান্ত গলায় বলল, আচ্ছা যাইতেছি।কুসুম দ্রুত পায়ে চলে গেল। মতির ঘরে যেতে ইচ্ছা করছে না। সে উঠোনে বসে রইল। এক সময় কুসুমের মত তারো জোছনায় গোসল করতে ইচ্ছা করতে লাগল। কি আশ্চর্য জোছনা।

শাহানা ঢাকায় রওনা হবে দুপুরের পর। সন্ধ্যা বেলায় ঠাকরোকোনা থেকে ঢাকা যাবার ট্রেন ধরবে। ঠাকরোকোনা পর্যন্ত যাবার জন্যে ইঞ্জিনের নৌকা আনানো হয়েছে। সকাল থেকেই নৌকায় তোষক বিছিয়ে বিছানা করা হচ্ছে। নীতুর খুব মন খারাপ। জায়গাটা তার মোটেও ভাল লাগে নি। এই দশদিন নিজেকে সত্যি সত্যি বন্দিনী মনে হয়েছে।

এখন যাবার সময় হয়েছে এখন শুধু কান্না পাচ্ছে। সে শাহানাকে গিয়ে বলল, আপা এই যে আমরা চলে যাচ্ছি, তোমার খারাপ লাগছে না? শাহানা বলল, না খারাপ লাগছে না। ভাল লাগছে।আমার খুব খারাপ লাগছে আপা। আমার মনে হয় যাবার সময় আমি দাদাজানকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলব। কি বিশ্রী কাণ্ড হবে।বিশ্রী কাণ্ড হবে কেন?

মোহসিন ভাই নিশ্চয়ই এই নিয়ে পরে আমাকে ক্ষ্যাপাবে।সেই সম্ভাবনা তো আছেই। পৃথিবীর সব দুলাভাইরা মনে করে শালীদের ক্ষ্যাপানো তাদের পবিত্র দায়িত্ব।আপা, তুমি কি শেষবারের মত আজ বেড়াতে বের হবে না, সুখানুপুকুর হেঁটে হেঁটে দেখবে না? দেখতে পারি। সম্ভাবনা আছে।নীতু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আপা দাদাজান আজ সকাল থেকে কিছু খাননি। নিজের ঘরে চুপচাপ বসে আছেন, তা কি তুমি জান?

জানি।দাদাজানের খুব মন খারাপ।মন খারাপ হওয়াই স্বাভাবিক। এতদিন এক সঙ্গে ছিলাম হৈ চৈ করেছি–এখন আবার খালি হয়ে যাবে। তিনি বিশাল খালি বাড়ি একা একা পাহারা দেবেন।শাহানা শেষবারের মত সুখানপুকুর দেখতে বের হবে। মোহসিন বলল, আমি কি তোমার সঙ্গে থাকতে পারি। প্রিন্সেসের সঙ্গে এসকর্ট থাকবে না তা কি করে হয়। আসব তোমার সঙ্গে?

অবশ্যই আসবে। একটু অপেক্ষা কর আমি দাদাজানের সঙ্গে বিদায় দেখাটা করে আসি।মোহসিন বলল, এখন তো বিদায় নিচ্ছ না। বিদায় নিতে তো দেরী আছে।শাহানা হাসতে হাসতে বলল, ঐ পর্বটা আমি আগেই সেরে রাখতে চাই। আমার ধারণা বিদায় মুহূর্তে নীতু দাদাজানকে জড়িয়ে ভেউ ভেউ করে কাঁদতে থাকবে। তাকে দেখে আমি কাদতে থাকব। সুন্দর করে বিদায় নেয়া হবে না।

তোমরা তিন বোনই খুব ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টর। আমি লেখক হলে তোমাদের তিনজনকে নিয়ে চমৎকার একটা উপন্যাস লিখতাম। নাম দিতাম old man and these grand daughters. শাহানা ইরতাজুদ্দিন সাহেবের ঘরে ঢুকল। দরজা ভেজানো ছিল। শাহানা ঘরে ঢুকে আগের মত দরজা ভিজিয়ে দিল।ইরতাজুদ্দিন ইজিচেয়ারে শুয়ে ছিলেন। পুরানো দিনের ভারী ইজিচেয়ার। হাতলে অনায়াসে বসা যায়, শাহানা ইজিচেয়ারের হাতলে বসল। ইরতাজুদ্দিন বললেন, কিছু বলবি?

শাহানা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। ইরতাজুদ্দিন বললেন, বল কি বলবি।দাদীজানের যে ছবিটা আপনি আলমিরায় বন্ধ করে রাখেন ঐ ছবিটা দেখব। শুনেছি দেখতে অবিকল আমার মত। না দেখলে বিশ্বাস হবে না।ইরতাজুদ্দিন ছবি বের করে আনলেন। শাহানা অবাক হয়ে ছবির দিকে তাকিয়ে রইল। আশ্চর্য মিল তো।এত সুন্দর একটা ছবি লুকিয়ে রাখেন কেন দাদাজান?

দেখতে কষ্ট হয় এই জন্যে আড়াল করে রাখি অন্য কিছু না। তুই এই ছবিটা নিয়ে যা–তোর বাবাকে দিস সে খুশী হবে। আমি যতদূর জানি তার কাছে তার মার কোন ছবি নেই।আপনার এত প্রিয় একটা ছবি দিয়ে দিচ্ছেন? প্রিয়জনকেতো প্রিয় জিনিস দিতে হয়। প্রিয়জনকে কি অপ্রিয় জিনিস দেয়া যায়?

বাবা খুব খুশী হবে।তোর বাবাকে আরেকটা ব্যাপার বুঝিয়ে বলবি, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমি একটা ভুল করেছিলাম। অনিচ্ছাকৃত ভুল। সব সময় একা থাকতাম। কেউ আসত না আমার কাছে। এই সময় গানবোট নিয়ে একদল মিলিটারী উঠে এল…।ঐ প্রসঙ্গটা থাক দাদাজান।

না, প্রসঙ্গটা শুনে রাখ। মিলিটারীদের আমার বাড়িতে উঠতে দেখে আমি খুশীই হয়েছিলাম। ভাবলাম কিছুদিন বাড়িটা গমগম করবে। ওরা যে এই ভয়ংকর কাণ্ড করবে আমি চিন্তাও করি নি। তোর বাবাকে বলিস আমি আমার অপরাধ স্বীকার করি।বাবাকে আমি অবশ্যই বলব।ইরতাজুদ্দিন ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তোকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। তুই অসাধারণ একটা মেয়ে হয়ে পৃথিবীতে এসেছিস।এই কথা কেন বলছেন দাদাজান।

এই গ্রামের প্রতিটি মানুষ আমাকে ঘৃণার চোখে দেখতো। তোর কারণে সেই ঘৃণাটা এখন নেই। যে মানুষের এমন চমৎকার একটা নাতনী সেই মানুষকে ঘৃণা করা যায় না।এমন করে বলবেন না তো দাদাজান। আমার চোখে পানি এসে যাচ্ছে।তুই আমার কাছে কিছু একটা চা। তুই যা চাইবি তাই তোকে দেব।বর দিচ্ছেন? হ্যাঁ, বর ভাবলে বর।একটা বরতো দেয়া যায় না দাদাজান–তিনটা করে বর দিতে হয়। আমি তিনটা জিনিস চাইব আপনি আমাকে দেবেন–রাজি আছেন?

আচ্ছা যা দেব। ক্ষমতায় থাকলে অবশ্যই দেব।এক–আপনি ঢাকায় এসে আমাদের সঙ্গে থাকবেন।এটা পারলাম না। এই বাড়ি ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।দুই–গ্রামের সব মানুষকে ডেকে আপনি যে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় একটা করেছিলেন সেই ভুলের কথা বলবেন। তাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন।এটাও সম্ভব না।তিন–আমাদের এই বাড়িটাকে আপনি দান করে দেবেন। এস্থানে একটা সুন্দর আধুনিক হাসপাতাল হবে।

এটাও সম্ভব না। পৈতৃক বাড়ি–আদি ঠিকানা। এই ঠিকানা নষ্ট হতে দেয়া যায় না। তুই অন্য কিছু চা।আমার আর কিছু চাইবার নেই। দাদাজান আপনি বিশ্রাম করুণ আমি শেষবারের মত সুখানপুকুর দেখে আসি।ইরতাজুদ্দিন কিছুই বললেন না।শেষবারের মত সুখানপুকুর ঘুরে দেখবে বলে শাহানা বের হয়েছিল। মোহসিন ক্যামেরা হাতে সঙ্গে আছে। কয়েক পা এগিয়েই শাহানা বলল, চল বাড়ি চলে যাই।মোহসিন বিস্মিত হয়ে বলল, কেন?

ভাল লাগছে না।মোহসিন হাসতে হাসতে বলল, তোমার সঙ্গে জীবন যাপন করা খুব যন্ত্রণার ব্যাপার হবে। তুমি দারুণ মুডি। অন্য কোথাও যেতে না চাইলে যেও না, চল তোমার প্রিয় জায়গাটার একটা ছবি নিয়ে আসি–অশ্রু দীঘি।না, না। আমার কোথাও যেতে ইচ্ছা করছে না।মোহসিন লক্ষ্য করল শাহানার চোখ ভেজা। সে এই অদ্ভুত মেয়েটির গভীর আবেগের কোন কারণ ধরতে পারল না।

শাহানাদের নৌকায় তুলে দিতে এসে ইরতাজুদ্দিন হতভম্ভ হয়ে গেলেন। নৌকা ঘাট লোকে লোকারণ্য। সুখানপুকুরের সবাই কি চলে এসেছে? একি অস্বাভাবিক কাও।নীতু ফিস ফিস করে বলল, আপা তুমি যদি এখান থেকে ইলেকশান কর নির্ঘাৎ তোমার বিপক্ষে যারা দাঁড়াবে সবার জামানত বাজেয়াপ্ত হবে।শাহানা হাসতে হাসতে বলল, তাই তো দেখছি।

মোহসিন বিস্মিত গলায় বলল, শাহানা তুমি এতগুলি মানুষকে মুগ্ধ করলে কোন কৌশলে? মাই গড! এরা সবাই তোমাকে সি অফ করতে এসেছে ভাবতেই কেমন লাগছে। তুমি কি এদের সবার চিকিৎসা করেছ। এই ভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেক না। ওদের দিকে তাকিয়ে হাত টাত নাড়। নেতারা যে ভঙ্গিতে হাত নাড়েন সেই ভঙ্গিতে।

শাহানার চোখে পানি এসে গেছে। সে চোখের পানি সামলাতে গিয়ে আরো, বিপদে পড়ল। এখন মনে হচ্ছে চোখ ভেঙ্গে বন্যা নামবে।ইরতাজুদ্দিন শাহানার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তিনি হয়তবা শাহানাকে অস্বস্তি থেকে রক্ষা করার জনেই উঁচু গলায় বললেন–আপনারা সবাই আমার নাতনীদের জন্যে একটু দোয়া করবেন। ওর খুব ইচ্ছা আমার বাড়িটায় একটু হাসপাতাল হোক। ইনশাআল্লাহ হবে। আমি কথা দিলাম।

আপনাদের কাছে আরেকটা কথা–স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমি একটা অন্যায় করেছিলাম। মিলিটারীদের আমার বাড়িতে থাকতে দিয়েছিলাম। আমি ভয়ংকর অপরাধ করেছিলাম। আমি হাত জোড় করে আপনাদের কাছে ক্ষমা চাই।ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলির মধ্যে একটা বড় ধরনের গুঞ্জন উঠল। সেই গুঞ্জনও আচমকা থেমে গেল। ইরতাজুদ্দিন শাহানার দিকে তাকিয়ে বললেন–তোর তিনটা বরই তোকে দিলাম–এখন কান্না বন্ধ কর।শাহানা কান্না বন্ধ করতে চেষ্টা করছে পারছে না।

আকাশে প্রকাণ্ড থালার মত চাঁদ উঠেছে। জোছনার প্রাবনে থৈ থৈ করছে সুখানপুকুর। তরল জোছনা, মনে হয় ইচ্ছে করলেই এই জোছনা গায়ে মাখা যায়।জোছনা গায়ে মেখে কুসুম জলচৌকিতে একা একা বসে আছে। সে সন্ধ্যা থেকেই কাঁদছে। তার ভেজা গালে জোছনা চক চক করছে। কুসুমের কান্না বাড়ির সবাই দেখছে কেউ গায়ে মাখছে না। বিয়ের কন্যাতো কাঁদবেই। কাঁদাটাইতো স্বাভাবিক।

কুসুমের বিয়ে ঠিক হয়েছে আজ বিকেলে। তার বড় খালা হুট করেই সব ব্যবস্থা করে ফেললেন। মনোয়ারাকে ডেকে বললেন, গরীব ঘরের মেয়ের বিয়া। জামাই হাতীর পিঠে চইড়া আসব না। জামাই ঘরে বসা। জিনিশটা ভাল দেখায় না। মৌলবী ডাক দিয়া কবুল দিয়া দেও। এজিন কাবিন হইয়া থাকুক। পরে এক সময় গেরামের মানুষের খাওয়াটা দিবা।মনোয়ারা বলেছেন–আফনে যেটা ভাল বিবেচনা করেন।

আমি এইটাই ভাল বিবেচনা করি।ছেলেরে জিজ্ঞেস করা দরকার না বুবু তার একটা মতামত।জিজ্ঞেস করতাছি।কুসুমের খুব আশা ছিল ছেলে রাজী হবে না। শখ করে কে চাইবে জ্বীনে পাওয়া মেয়েকে বউ করতে। কুসুমকে অবাক করে দিয়ে সুরুজ আলি মিনমিন করে লল, আফনে আমার মার মত। আফনে যা নির্ধারন করবেন… নিন্দালিশের খালা বললেন, আইজ পূর্ণিমা। পূর্ণিমার দিন বিবাহ সুখের হয় না। কাইল একজন মৌলবী খবর দিয়া আনি। দশ হাজার এক টাকা কাবিনে বিবাহ রাজি আছ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *