সম্রাট পর্ব – ৭ হুমায়ূন আহমেদ

সম্রাট পর্ব – ৭

অ্যাটেনশন। স্ট্যান্ড এট ইজ। রাইট টান। স্কোয়াড় মার্চ। লেফট লেফট। লেফট লেফট। হল্ট। লেফট টার্ন স্কোয়াড মার্চ। লেফট লেফট। লেফট লেফট। হল্ট। আধা ঘন্টা ফুট ড্রিলের পর ছটি দলকে তাদের নিজেদের এনসিওর হাতে ছেড়ে দেওয়া হল। এরা তার নিজের, নিজের দলকে দুপুর বারটা পর্যন্ত ফুট ড্রিল করাবে। জনাথন ঘুরেঘুরে দেখতে লাগল। কাজ ভালোই এগুচ্ছে।

মাঝে-মাঝেই অবশ্যি জনাথনের উচ্চকণ্ঠ শোনা যাচ্ছে, এই যে, তোমার নাম কি? পিটার স্যার।শোন পিটার, তোমার বাম হাত যদি ডান পার সঙ্গে সমান ভাবে ওঠানামা নাকরে, তাহলে বাম হাতটি টেনে ছিঁড়ে ফেলব। অবাধ্য হাতের আমার কোনো প্রয়োজন নেই। বুঝতে পারছ? পারছি স্যার।এই যে তুমি, সাদাগেঞ্জি, ঠিকমতো পা ফেল।

তুমি নিশ্চয়ই চাও না তোমার পা টেনে ছিঁড়ে ফেলি? নাকি চাও? জনাথন আকাশের দিকে তাকাল। রোদের তেজ বাড়তে শুরু করেছে। ঘড়িতে বাজছে মাত্র সাড়ে দশটা। রোদ আরো বাড়বে। সে এনসিওদের ডেকে আনল।এখন আমরা যাব বনে। গাছপালার ভেতর কীভাবে নিঃশব্দে দ্রুত হাঁটা যায়, সেটা শেখাব। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনিং। রোজ খানিকক্ষণ এই ট্রেনিং হবে।

এখন সবাই দৌড়াও আমার সঙ্গে। স্কোয়াড কুইক মার্চ।হাঁপাতে-হাঁপাতে দৌড়াতে শুরু করল সবাই। আকাশে গগনে সূর্য। দেখে মনে হচ্ছে ক্লান্ত মানুষগুলো যে-কোনো সময় একে অন্যের ওপর গড়িয়ে পড়বে।দৌড়াও, দৌড়াও। বড়-বড় স্টেপ ফেল। এতে পরিশ্রম হবে কম। সামনের দিকে একটু ঝুঁকে থাক। বাই দা লেফট। বাই দা লেফট।বিকেল চারটায় সবাই এসে দাঁড়াল তাঁবুর সামনে। এন্ড্রু জনাথনের হাতে একটি রাইফেল।

তার সামনে একটি টেবিলে একটি সাব-মেশিনগান। এন্ড্রু জনাথন রাইফেল হাতে এগিয়ে এল কয়েক পা। দলের সবাই খানিকটা পিছিয়ে গেল।যে-রাইফেল তোমাদের দেওয়া হয়েছে, তার নাম কালাসনিকভ অ্যাসন্ট উইপন। সংক্ষেপে AK-7.62. সবাই একে আদর করে ডাকে কলা রাইফেল। তার কারণ, এর ম্যাগজিনগুলি হচ্ছে কলার মতো বাঁকানো।

তোমরা তোমাদের স্ত্রীকে যেভাবে চেন, এই রাইফেলটিকে তার চেয়েও ভালোভাবে চিনবে। এর রেঞ্জ কম। কিন্তু দু শ গজ পর্যন্ত এটি অত্যন্ত নিখুঁত। এ দিয়ে একটি-একটি গুলি করা যায় আবার প্রয়োজনে প্রতি মিনিটে দু শ রাউন্ড করেও গুলি করা যায়। এটা হচ্ছে একটা ডিফেনসিভ উইপন।

এখন সবাই মন দিয়ে আমার এই উপদেশ শোন। যারা পুরোনো সৈন্য, তাদের এ উপদেশ জানা আছে, যারা নতুন, তাদের জানা নেই। তবে এ-উপদেশ সবার জন্যেই। এখন থেকে রাইফেলটি থাকবে তোমাদের সঙ্গে-সঙ্গে। বাথরুমে যাও, গোসলখানায় যাও বা ঘুমাতে যাও, রাইফেল থাকবে তোমার সঙ্গে, যতক্ষণ-না এটা তোমাদের একটি বাড়তি হাতের মতো হয়।

তোমরা নিজেদের শরীরের যেমন যত্ন নাও, রাইফেলটিকেও তেমনি যত্ন করবে। এখন তোমাদের দেখাচ্ছি এটা কী করে খুলতে হয় এবং ফিট করতে হয়।রাতের খাওয়া সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে শেষ হয়ে গেল। সাড়ে সাতটায় মেসের হলঘরে জনাথন দেখাল লাইট RPD মেশিনগান।

তোমরা সবাই অস্ত্রটি ভালো করে চিনে রাখ, এর নাম RPD লাইট মেশিনগান। এটিও তৈরি হয়েছে শক্তিশালী একটি দেশে। তবে সেখানে এখন আর এর ব্যবহার নেই। পৃথিবীতে যে-কটি হালকা মেশিনগান আছে এটি হচ্ছে তার মধ্যে একটি। ওজন মাত্ৰ ১৯৩ পাউন্ড। ব্যানানা রাইফেলে যেগুলি ব্যবহার করা হয়, এতেও সেই গুলিই।

ব্যবহার হয়। প্রতি মিনিটে এর সাহায্যে দু শ পঞ্চাশ রাউন্ড করে গুলি ছোঁড়া যায়। সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় একটি অস্ত্র, এবং চমৎকার একটি জিনিস। আমাদের যে-পাঁচটি দল আছে, তাদের সঙ্গে দুটি করে থাকবে। অর্থাৎ সর্বমোট দশটি অস্ত্র থাকবে। তবে সবাইকে এই অস্ত্র চালানো শিখতে হবে।

রাত আটটায় মেসঘরের বাতি নিভিয়ে দেওয়া হল। শেষ হল প্রথম দিনের ট্রেনিং।হঠাৎ করে জুলিয়াস নিশোর শরীর খুব খারাপ হয়ে পড়েছে। পুরোনো সব অসুখ নতুন করে দেখা দিতে শুরু করেছে। শ্বাসকষ্ট তার একটি। কাল রাতে খুব কষ্ট হল। এত বাতাস পৃথিবীতে, অথচ তিনি তাঁর ফুসফুস ভরাবার জন্যে যথেষ্ট বাতাস যেন পাচ্ছেন। না। আশেপাশে কেউ নেই যে ডেকে বলবেন পাশে এসে বস। হাত রাখ আমার বুকে।

শেষরাতের দিকে তাঁর মনে হল মৃত্যু এগিয়ে আসছে। তিনি মৃত্যুর পদধ্বনি শুনলেন। নিজেকে তিনি সাহসী মানুষ বলেই এতদিন জেনে এসেছেন। কাল সে-ভুল। ভাঙল। কাল মনে হল, তিনি সাহসী নন। মৃত্যুকে সহজভাবে নিতে পারছেন না। ভয় লাগছে। তীব্র ভয়, যা মানুষকে অভিভূত করে দেয়। মাওয়া সকালে খাবার নিয়ে এসে ভীত স্বরে বলল, আপনার শরীর বেশ খারাপ মনে হচ্ছে।নিশো দুর্বল ভঙ্গিতে হাসলেন।রাতে ভালো ঘুম হয় নি? না।রাতের খাবারও মনে হয় খান নি?

না, খাই নি।মাওয়া চিন্তিত বোধ করল। এই লোকটিকে বিনা চিকিৎসায় থাকতে দেওয়া যায় না। অথচ ডাক্তার আনা মানেই বাইরের একজনকে জানানো নিশো বেঁচে আছেন।ভালে কফি এনেছি, খাবেন? না।একটু খান, ভালো লাগবে।মাওয়া কাপে কফি ঢালল। নিশো বললেন, পৃথিবীতে সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হচ্ছে প্রতীক্ষা করা। মনে কর, একটি অচেনা স্টেশনে তুমি অপেক্ষা করছ ট্রেনের জন্যে। ট্রেন আসছে না।

কখন আসবে তুমি জান না। নাও আসতে পারে, কিংবা কয়েক মিনিটের মধ্যে এসে পড়তে পারে। কেমন লাগবে তখন মাওয়া? মাওয়া জবাব দিল না।আমার ঠিক সে-রকম লাগছে।কফি নিন।নিশো কফির পেয়ালা হাতে নিলেন, কিন্তু চুমুক দিলেন না। হালকা গলায় বললেন, অনেক দিন পর কাল রাতে একটা কবিতা লিখলাম। দীর্ঘ কবিতা। কবিতা তোমার কেমন লাগে?

ভালো লাগে না। সাহিত্যে আমার কোনো উৎসাহ নেই।আমার ইচ্ছা করছে কবিতাটা কাউকে শোনাই। তুমি শুনবে? মাওয়া জবাব দিল না। চিন্তিত মুখে তাকিয়ে রইল। নিশো হাত বাড়িয়ে কবিতার খাতা নিলেন। মাওয়া লক্ষ করল, খাতা নেবার মতো সামান্য কাজেও তিনি ক্লান্ত হয়েছেন। খাতাটি নেওয়ার সময় তাঁর হাত সামান্য কাঁপছিল।নিশোভরাট গলায় পড়লেন–

জোছনার ছাদ ভেঙে পাখিরা যাচ্ছে উড়ে যাক বাতাসে, বারুদ গন্ধ থাক অনুভবে।কবিতাটি দীর্ঘ। সেখানে বারবার বারুদের গন্ধের কথা আছে। মাওয়া কিছুই বুঝল না, বোঝার চেষ্টাও করল না।কেমন লাগল? ভালো।মাওয়া, আমি সম্ভবত একমাত্ৰ কবি, যে কখনো প্রেমের কবিতা লেখে নি। প্রেমের মতো একটি বড় ব্যাপারকে আমি অগ্রাহ্য করেছি।

আপনি শুয়ে থাকুন। বেশি কথা বলাটা ঠিক হবে না।এখন কেন যেন শুধু প্রেমের কবিতা লিখতে ইচ্ছা হচ্ছে। কয়েক দিন ধরেই ভাবছি, একটি দীর্ঘ প্রেমের কবিতা লিখব। প্রথম লাইনটিও ভেবে রেখেছি—আমার ভোরের ট্রেন। মা বললেন—ঘুমো, তোকে ডেকে দেব ফজরের আগে। লাইনটি। কেমন? ভালো।ছেলেটি শুয়ে থাকবে, কিন্তু ঘুমুতে পারবে না।

পাশের বাড়ির কিশোরী মেয়েটির কথা শুধু ভাববে।আপনি শুয়ে থাকুন, আমি সন্ধ্যাবেলা একবার আসব। চেষ্টা করব একজন ডাক্তার নিয়ে আসতে।সেই ডাক্তার এক জন মৃত মানুষকে বসে থাকতে দেখে অবাক হবে না তো? মাওয়া কিছু বলল না। নিশো বললেন, আমরা খুব-একটা খারাপ সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। এক জন জীবিত মানুষকে মৃত বানিয়ে রেখেছি। জেনারেল ডোফা যথেষ্ট বুদ্ধিমান, কিন্তু এই একটি কাঁচা কাজ সে করেছে।

মাওয়া কিয়ে রইল।ঘটনাটি প্রকাশ হবে। তুমি নিজেই একদিন বলবে। তুমি না-বললেও কেউ-না- কেউ বলবে–বলবে না? হয়তো বলবে।একজন মানুষকে মেরে ফেলা এক কথা, কিন্তু একজন জীবিত মানুষকে মৃত বলে ঘোষণা দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।আপনি বিশ্বাস করুন, আমি সন্ধ্যাবেলা আসব।আমার মনে হয় না তুমি সন্ধ্যাবেলা আসবে। তুমি হচ্ছ একজন রাজনীতিবিদ, যারা কথা দেয় কিন্তু কথা রাখে না।

তুমি অনেক বার বলেছিলে রাতে আমার মুখের ওপর এই বাতিটি জ্বালিয়ে রাখবে না, কিন্তু বাতি ঠিকই জ্বলছে।মাওয়া ঘর ছেড়ে চলে গেল। সন্ধ্যাবেলা সে ঠিকই এল না, তবে প্রথম বারের মতো মুখের ওপরের বাতি নিভে গেল। অন্ধকার হয়ে গেল চারদিক। ভয়ানক অন্ধকার। নিশোর মনে হল, বাতি থাকলেই যেন ভালো হত।ট্রেনিং ক্যাম্প।লরেনকো মারকুইস।২৩ ডিসেম্বর। মঙ্গলবার।মোজাম্বিক, আফ্রিকা।

ট্রেনিংয়ের ধরন পাল্টেছে। এন্ড্রু জনাথনের সঙ্গে যোগ দিয়েছে রবিনসন। তার ট্রেনিং জনাথনের মতো ভয়াবহ নয়। রবিনসন কথা বলে নিচু গলায় এবং হাসিমুখে। কমান্ডোদের জন্যে এটা একটা বড় পাওনা। জনাথনকে তারা ভয় করে। ভালবাসে রবিনসনকে।মঙ্গলবারের ভোরবেলায় রবিনসন সবাইকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। তারা প্রায় চল্লিশ মিনিট চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। জনাথনের বেলায় তা হত না। এই চল্লিশ মিনিট সে কাটাত ফুট ড্ৰিল করিয়ে।

রবিনসনের চোখে সানগ্লাস। মাথার ধবধবে সাদা চুল বাতাসে উড়ছে।তার হাতে একটা কফির মগ। সে কফিতে চুমুক দিচ্ছে এবং এক জন এক জন করে সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে। তার মাথায় কোনো পরিকল্পনা আছে নিশ্চয়ই।কমান্ডোরা, এবার আমরা ট্রেনিংয়ের মূল পর্যায়ে এসে গেছি। তোমরা তোেমাদের সামনে হার্ডবোর্ডের যে-জিনিসগুলি দেখছ, সেগুলি ফোর্টনকের আদলে তৈরি। ফটোগ্রাফ থেকে তৈরি করা হয়েছে।

কাজেই মোটামুটি নিখুত বলা চলে। যে-সব জায়গায় সেন্ট্রি থাকে, সে-সব জায়গায় ডামি রাখা হয়েছে। রাস্তা দেখানো হয়েছে চকের গুঁড়ো দিয়ে। যেসব জায়গায় ডাবল লাইন দেখছ, সে-সব রাস্তা একটু উঁচু। ট্রিপল লাইন মানে আরো উঁচু।লক্ষ করছ নিশ্চয়ই, ফোর্টনক কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা। তবে সুখের বিষয়, কাঁটাতারের সঙ্গে কোনো অ্যালার্ম সিস্টেম নেই।

কাজেই আমরা সহজেই কাঁটাতার কেটে ভেতরে ঢুকতে পারব। আমাদের হাতে চারটি ভিন্ন ভিন্ন প্ল্যান আছে। প্রতিটি প্ল্যানই আমরা পরীক্ষা করব।কোন প্ল্যান নেওয়া হবে সেটা ঐ মুহূর্তেই ঠিক করা হবে। হয়তো এমন হতে পারে, সব কটি প্ল্যান বাতিল করে আমাদের নতুন কিছু ভাবতে হবে।…… যেমন ধর, আমরা জানি ফোর্টনকে বর্তমান সৈন্যসংখ্যা তিন শ পঞ্চাশ।

গিয়ে দেখলাম রাতারাতি সেখানে এক ডিভিশন সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে। তখন নিশ্চয়ই আমাদের তৈরি প্ল্যান খাটবে না। কী বল? স্যার, সেরকম কোনো সম্ভাবনা কি আছে? থাকবে না কেন? নিশ্চয়ই আছে। কেন, ভয় লাগছে? কমান্ডোদের মধ্যে বেশ কয়েক জন উঁচু গলায় হেসে উঠল। এমন করাটা জনাথনের সঙ্গে সম্ভব ছিল না।

প্রথম পরিকল্পনাটি এরকম—আমরা দক্ষিণ দিক থেকে আসব—এই যে দেখ, এইদিক থেকে। আট জন সেন্ট্রিকে শেষ করবার দায়িত্ব থাকবে আট জনের। ওপর। কাজটি করতে হবে বেয়োনেটের সাহায্যে, কোনক্রমেই গুলি করা যাবে না। ঠিক একই সময় দুজন চলে যাবে কারারক্ষী মাওয়ার বাসভবনে। মাওয়া থাকে এইখানে—দোতলায়। দোতলায় ওঠার সিঁড়ি আছে। সিঁড়িতে কোনো দরজা নেই।

মাওয়ার বাড়ির সামনে থাকে এক জন সেন্ট্রি। তাকে সামলানোর পর এরা ঢুকবে মাওয়ার ঘরে এবং চাবি নিয়ে দ্রুত চলে আসবে এই জায়গায়। এখানে আছেন জুলিয়াস নিশো। তারা চাবি নিয়ে এখানে এসেই দেখবে, আমি সেলের সামনে অপেক্ষা করছি।স্যার, যদি চাবি না-পাওয়া যায়? না-পাওয়া গেলেও কোনো সমস্যা হবে না। আমাদের সঙ্গে তালা ভাঙার যন্ত্র আছে।

তবে আমি সেটা ব্যবহার করতে চাই না। এতে অনেক সময় নষ্ট হবে। আমাদের হাতে এত সময় নেই।এবার আমি তোমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ব্যারাকেই সব সৈন্যরা থাকবে। খুব সম্ভব ঘুমিয়ে থাকবে। আমাদের পনের জনের একটি দলের ওপর দায়িত্ব থাকবে ব্যারাক সামলানোর।কিভাবে সামলানো হবে? ভালোভাবেই সামলাতে হবে।

আমরা পেছনে কিছু রেখে যাব না। এখন পর্যন্ত পঁচিশ জন কমান্ডো ব্যবহার করা হয়েছে। আমাদের হাতে আছে আরো পঁচিশ জন। ঠিক না? জ্বি স্যার।এই পঁচিশ জনের দশ জন থাকবে রিজার্ভে। এদের দায়িত্ব হচ্ছে নিশোকে ঠিকমত বের করে নিয়ে আসা।বাকি পনের জনের? বাকি পনের জনের দায়িত্ব ফোটনকে নয়। তারা সরাসরি চলে যাবে এয়ারপোর্টে।

সেটা তারা দখল করবে এবং আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবে। তাদের দায়িত্বে থাকবে এমন একজন লোক, যার ওপর ভরসা করা চলে। বেন ওয়াটসন। বেন ওয়াটসন হচ্ছে একাই একটি ব্রিগেড। তোমরা যারা তার সঙ্গে কাজ করবে, তারাই সেটা টের পাবে। ফোর্টনকের জন্যে যেমন পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে, এয়ারপোর্টের জন্যে সেরকম কিছু তৈরি করা হয় নি। তার কারণ, বেন ওয়াটসন কোনো রকম প্ল্যানিং-এ বিশ্বাসী নয়। একেক জনের কর্মপদ্ধতি একেক রকম।…….

এখন আমরা এ-জায়গা থেকে পঁচিশ গজ দূরে চলে যাব। সবাইকে আমি কাজ ভাগ করে দেব। আমি দেখাব, কী করে আসতে হবে, কোন দিক দিয়ে আসতে হবে। এবং আমরা চেষ্টা করব, কত কম সময়ে কাজটা শেষ করতে পারি সেটা দেখতে। তোমাদের একটা কথা মনে রাখতে হবে, আমাদের হাতে সময় খুব কম, এক ঘন্টা কুড়ি মিনিট। এর মধ্যে আমাদের কাজ শেষ করে প্লেনে উঠতে হবে।

কেউ কিছু জিজ্ঞেস করতে চাও? কাঁটাতারের বেড়া কে কাটবে? রবিনসন হেসে ফেলল এবং হাসতে-হাসতে বলল, আমি। ঐ কাজটি আমি খুব ভালো করতে পারি। এস, এখন শুরু করা যাক। প্রথম প্ল্যানটি আমরা এখন দেখব। স্কোয়াড, অ্যাটেনশন। টু দা লেফট, কুইক মার্চ।মোরান্ডা। ২৪শে ডিসেম্বর। বুধবার। সকাল ৯টা।জেনারেল ডোফা গার্ড রেজিমেন্ট পরিদর্শনে এসেছেন। তাঁর মুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর।

তাঁর সঙ্গী-সাথীরা এর কারণ বুঝতে পারছিল না। তারা শঙ্কিত বোধ করছিল।জেনারেল ডোফা পরিদর্শনের কাজ সারলেন। প্রথাগত বক্তৃতা দিলেন-সৈন্যদের কাজ হচ্ছে দেশের আদর্শকে সামনে রাখা। দেশের প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করা ইত্যাদি ইত্যাদি। পরিদর্শনের শেষে চা-চক্রের ব্যবস্থা ছিল। ডোফা চা-চক্রে রাজি হলেন না। আগের চেয়েও গম্ভীর মুখে প্রেসিডেন্ট হাউসের দিকে রওনা হলেন।

আজ ক্রিসমাস ইভ। ক্রিসমাস ইভের প্রাক্কালে তিনি সবসময়ই একটি ভাষণ দেন। সেই ভাষণ প্রচার হয় বেতার ও টিভিতে। আজকের ভাষণটি তৈরি হয়েছে এবং তাঁর কাছে কপি এসেছে। ভাষণ তাঁর পছন্দ হয় নি। বক্তৃতা-লেখককে কিছু কড়া-কড়া কথা শুনিয়েছিলেন। নতুন একটি ভাষণ তৈরি করে আনার কথা।

নতুন ভাষণটি আগেরটির চেয়েও বাজে হয়েছে। ডোফা ধমকে উঠলেন, এক জিনিসই তো আপনি লিখে এনেছেন। দু-একটা শব্দ এদিক-ওদিক হয়েছে। এর বেশি কিছুই তো করা হয় নি। নতুন কিছু লিখুন।বক্তৃতা-লেখক বিনীতভাবে বললেন, কি লিখব, যদি একটু বলে দেন।জুলিয়াস নিশোর কথা তো বক্তৃতায় কিছুই নেই। তাঁর কথা থাকা উচিত। তাঁর স্মৃতিরক্ষার্থে কি কি করা হবে তা বলা দরকার।

কি কি করবেন, স্যার? সংগ্রহশালা করা যায়। এই জাতীয় কিছু লিখে আনুন, সব কি আমিই বলে দেব নাকি? মাউ উপজাতিদের সম্বন্ধেও কিছু লেখা উচিত। যান, নতুন করে লিখুন। আমার প্রতিটি বক্তৃতায় একই জিনিস থাকে।বিকেলে তিনি গেলেন প্রেসিডেন্ট রেজিমেন্ট পরিদর্শনে। এটা তাঁর হঠাৎ পরিদর্শন।

আগে কিছুই ঠিক করা ছিল না। তাঁর মুখ আগের মতোই গম্ভীর। প্রেসিডেন্ট রেজিমেন্টের জেনারেল র্যাবি এর কারণ বুঝতে পারলেন না। কোথাও কোনো ঝামেলা হয়েছে কি? হবার তো কথা নয়। সবকিছু বেশ স্বাভাবিক। প্রেসিডেন্ট কি মাউ উপজাতিদের নিয়ে চিন্তিতঃ চিন্তিত হবার মতো তেমন কোনো কারণ কি সত্যি-সত্যি আছে?

 

Read more

সম্রাট পর্ব – ৮ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.