• Wednesday , 25 November 2020

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –২৪

কুষ্ঠরোগের প্রধান লক্ষণ স্পর্শানুভূতি চলে যাওয়া । তার মতো পুণ্যবান মানুষের কুষ্ঠরোগ হওয়ার কোনোই কারণ নেই ।

কাশির পথে পথে কুষ্ঠরোগীর ছালা গায়ে বসে থাকে । তাদের সামনে থাকে ভিক্ষাপাত্র । কুষ্ঠরোগীদের কারোর কারোর হাত এবং পায়ের আঙুল পচে গলে হাড় বের হয়ে পড়েছে । সেখানে মাছি ভনভন করে । এই দৃশ্য হরিশংকরের সহ্য হয় না । তিনি নিয়মিত কাকভোজন করালেও কুষ্ঠরোগীদের প্রতি কোনো দয়া দেখান না । কুষ্ঠরোগীরা অভিশপ্ত । তাদের দয়া করলে পুণ্য অর্জন হয় না।

আজ শনিবার অমাবস্যা । কালীপূজার যোগ পড়েছে । হরিশংকর সকাল সকাল ঘরে ফিরেছেন । কালীপূজার রাত শাক্তদের । অন্যরা এই সময় গভীর রাত পর্যন্ত বাইরে থাকবে না, এটাই বিধি ।

দরজা খুলে হরিশংকর হতভম্ব । আকিকা বেগম খাটে পা ঝুলিয়ে বসে আছে । আকিকা বেগমের পাশে তার বান্ধবী অম্বা । দুজনের মুখ হাসি হাসি । অম্বা পরিচিতজনের মতো করে বলল, কেমন আছেন ?

হরিশংকর মনে মনে রাম নাম জপ করতে লাগলেন । প্রশ্নের জবাব দিলেন না । প্রেতযোনির প্রশ্নের জবাব দিতে নেই । জবাব দিলে তারা পেয়ে বসে । অম্বা বলল, আপনার পায়ে কী হয়েছে ? কুষ্ঠ ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৪

হরিশংকর বললেন, কুষ্ঠ কেন হবে । বাত হয়েছে বাত । অমাবস্যা পূর্ণিমায় বাতের ব্যথা বাড়ে । আজ অমাবস্যা । বাতের প্রকোপের এই কারণেই বৃদ্ধি ।

প্রেতযোনির সঙ্গে কথাবার্তায় জড়াতে নেই-এই সত্য জেনেও হরিশংকর কথাবার্তা শুরু করেছেন । তিনি আবারও রাম নামে ফিরে গেলেন ।

আকিকা বেগম বলল, আমার বাবা দিল্লীর সম্রাট বাদশাহ্ হুমায়ূন কোথায়?

আমি জানি না ।

আকিকা বলল, আপনি কেন জানেন না ?

হরিশংকর মূর্ছিত হয়ে পড়ে গেলেন ।

হুমায়ূন আছেন যোধপুর রাজ্যের সীমানার একটি পরিত্যক্ত গ্রামে । গ্রামের নাম ভকুর । সেইসময় মাঝে মাঝেই কিছু জনপদ পরিত্যক্ত হতো । ডাকাতের আক্রমণ, পাশের কোনো রাজ্যের রসদ সংগ্রহ অভিযানের কারণে এটা ঘটত । মহামারি তো আছেই। মহামারীতে জনপদের পর জনপদ উজাড় হওয়ার মতো ঘটনা নিয়মিতই ঘটত ।

হামিদা বানু একটি মাটির ঘরের বারান্দায় দেয়ালে হেলান দিয়ে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসে আছেন । একটু দূরে মশাল জ্বালানো হয়েছে । মশাল ঘিরে পোকা নাচানাচি করছে । তাদের কেউ কেউ সরাসরি আগুনে ঢুকে পড়ায় পট পট শব্দ হচ্ছে । হামিদা বানু পোকাদের খেলা দেখছেন ।

রাতের খাবার হিসেবে লবণ দিয়ে গম সিদ্ধ করা হচ্ছে । ভগ্নহৃদয় হুমায়ূন অন্য আরেকটি ঘরের বারান্দায় আফিম খাচ্ছেন । তাঁর সৈন্যদের বেশির ভাগ তাঁকে ছেড়ে গেছে । বৈরাম খাঁ ছাড়িয়ে দিয়েছেন । কারণ তাদের বেতন দেওয়ার সামর্থ্য হুমায়ূনের নেই । আমীরদের মধ্যে পাঁচজন এখনো আছেন ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৪

হুমায়ূন দূর থেকে লক্ষ করলেন, হামিদা বানু কী যেন খাচ্ছেন । বেশ আরাম করে চিবিয়ে চিবিয়ে খাওয়া । হামিদা বানুর সঙ্গে কোনো খাবার নেই । কৌতূহলী হয়ে হুমায়ূন এগিয়ে গেলেন ।

কী খাচ্ছ ?

হামিদা বানু লজ্জিত গলায় বললেন, খুব বেদানা ‍খেতে ইচ্ছা করছিল তাই বেদানা খাচ্ছি ।

বেদানা কোথায় পেলে ?

কোথাও পাই নি । কল্পনায় খাচ্ছি ।

হুমায়ূন দুঃখিত হয়ে লক্ষ করলেন, হামিদা বানু কল্পনার বেদানা ভেঙে দানা মুখে দেওয়ার ভঙ্গি করছেন । দানা কিছুক্ষণ চিবানোর পর থু করে বিচি দূরে ফেলে দিচ্ছেন ।

হামিদা বানু বললেন, জাহাঁপনা, বেদানা খুব মিষ্টি । কয়েকটা দানা খেয়ে দেখবেন ?

হুমায়ূন বললেন, এই ছেলেখেলার কোনো মানে হয় ?

হামিদা বানু বললেন, ছেলেখেলা ছাড়া আমাদের এখন কী আর আছে ?

হুমায়ূন মাথা নিচু করে স্ত্রীর সামনে থেকে বের হয়ে এলেন । তখন একটি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল । সম্রাট হুমায়ূনের সব জীবনীকার এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন । আবুল ফজলের গ্রন্থেও এর উল্লেখ আছে । ঘটনাটা এ রকম-

হুমায়ূন স্ত্রীর সামনে থেকে বের হয়ে কিছুদূর এগুতেই অপরিচিত এক লোক তাঁকে কুর্নিশ করল। হুমায়ূন বললেন, আপনি কে ?

সে বলল, আমি দুর্ভাগ্যতাড়িত এক ব্যবসায়ী । ডাকাতরা আমার সর্বস্ত্র নিয়ে গেছে । এখানে আগুন জ্বলছে দেখে এসেছি । আমি তৃষ্ণার্ত এবং ক্ষুধার্ত ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৪

হুমায়ূন বললেন, আমি আপনার চেয়ে খুব ভালো অবস্থায় নেই । তৃষ্ণা নিবারণ করুন । খাদ্য প্রস্তুত হচ্ছে, আমাদের সঙ্গে খাদ্য গ্রহণ করুন ।

বণিক বলল, আমার কাছে কিছুই নেই যা দিয়ে একজন সম্রাটকে সম্মান জানানো যায় । আমার সঙ্গে বড় একটা বেদানা আছে । যদি গ্রহণ করেন ।

বণিক থলে থেকে বিশালাকৃতির একটা বেদানা বের করল । পেকে লাল টুকটুক করছে ।

হামিদা বানু হাতে বেদানা পেয়ে অবাক হয়ে বললেন, বেদানা কোথায় পেলেন ?

হুমায়ূন বললেন, আমি হিন্দুস্থানের সম্রাট । আমার স্ত্রীর বেদানা খেতে ইচ্ছে করছে । আমি সামান্য একটা বেদানা জোগাড় করতে পারব না ?

যোধপুরের রাজা মালদেবের কাছে শের শাহ্-পুত্র জালাল খাঁ একটি গোপন পত্র পাঠিয়েছেন । পত্রের বিষয় একসময়কার দিল্লীর সম্রাট হুমায়ূন জালাল খাঁ লিখেছেন-

যোধপুরকে আমরা আমাদের বন্ধু রাজ্য বলে গণ্য

করি । বন্ধুত্ব কখনো এক পক্ষীয় বিষয় না । আপনি

আমাদের সম্পর্কে কী ভাবছেন তা জানা প্রয়োজন ।

আমাদের শক্তি সামর্থ্যের প্রমাণ আপনার

চোখের সামনেই আছে । একসময়কার ক্ষমতাধর

মোঘল সম্রাট আজ প্রাণভয়ে পথে-প্রান্তরে

বনেজঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে ।

আমরা আশা করি, আপনি যেভাবেই হোক

পলাতক হুমায়ূনকে খুঁজে বের করবেন। আমন্ত্রণ

জানিয়ে নিজ রাজ্যে নিয়ে আসবেন । তার কাছে

মহামূল্যবান হীরক কোহিনুর আছে । আপনি এই

হীরকখণ্ড রেখে দেবেন। রত্নের উপর আমার পিতা

বা আমার কোনো মোহ নেই। আমরা হুমায়ূনকে

জীবিত অবস্থায় চাই ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৪

আপনাকে যা জানানোর আমরা স্পষ্ট ভাষায়

জানালাম। আপনি কী করবেন তা আপনার

বিবেচ্য ।

আপনার অবগতির জন্যে জানাচ্ছি, হুমায়ূনের

সব ভাইরা আমাদের সঙ্গে আছে ।

ইতি

জালাল খাঁ

মীর্জা কামরানের কাছে তার বোন গুলবদন বেগম এসেছে । তার হাতে কারুকার্যময় রুপার থালায় মিষ্টান্ন। গুলবদন বলল, ভাই মিষ্টি খাও ।

মীর্জা কামরান বললেন, মিষ্টি খাওয়ার মতো বিশেষ কোনো ঘটনা কি ঘটেছে ?

গুলবদন বলল, রাজপুরুষদের মিষ্টান্ন খেতে বিশেষ কোনো ঘটনার প্রয়োজন পড়ে না । তারপরেও ছোট্ট একটা উপলক্ষ আছে ।

উপলক্ষটা কী ?

আমি ভাই হুমায়ূনের মঙ্গল কামনা করে কোরান খতম এবং দোয়ায় ইউনূস খতম দিয়েছি । এই মিষ্টান্ন আমার নিজের হাতে বানানো ।

মীর্জা কামরান বললেন, দোয়া দরুদে কি ভাগ্য পরিবর্তন হয় ? তোমার আদরের ভাইয়ের জন্যে অনেকেই প্রার্থনা করছে । তার মধ্যে আমার নিজের মা’ও আছেন । ওনার ভাগ্য কি বদলেছে ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৪

আল্লাহপাক যখন চাইবেন তখন ভাগ্য বদলাবে, তার আগে না । তারপরেও আমরা প্রার্থনা করি নিজেদের মনের শান্তির জন্যে ।

তোমার বানানো মিষ্টান্নের একটি খেলে যদি তোমার মন শান্ত হয় তাহলে আমি মিষ্টি অবশ্যই খাব ।

মীর্জা কামরান মিষ্টি মুখে দিতে-দিতে বললেন, তোমার আদরের ভাইয়ের বর্তমান অবস্থা জানতে চাও ?

চাই ।

সে সম্পূর্ণ আশাহত । সে মক্কা শরীফে চলে যেতে চাইছে । তাঁর এই সিদ্ধান্ত ভালো । শেষ বয়সে মক্কা শরীফে সন্ন্যাস জীবন ।

আপনাকে এই খবর কে দিল ?

তাঁর দলত্যাগী আমীরদের একজন আমার কাছে আশ্রয় নিয়েছেন । গুলবদন বলল, আমি আমার ভাইকে একটি চিঠি লিখেছি । কোনোভাবে কি এই চিঠি তাঁর কাছে পৌঁছানো সম্ভব  ?

না ।

আপনার নিজের হাতেও তো তিনি ধরা পড়তে পারেন, তখন কি তাঁকে পত্রটা দেওয়া যায় না ?

মীর্জা কামরান জবাব দিলেন না । গুলবদন বলল, ওনাকে ধরার জন্যে আপনি অভিযানে যাচ্ছেন এই খবর আমি জানি । চিঠিটা দিই, সঙ্গে রাখুন ।

চিঠিতে কী লেখা  ?

খোলা চিঠি । আপনি ইচ্ছা করলে পড়ে দেখতে পারেন । বোন ভাইকে সান্ত্বনা দিয়ে লিখেছে । আনব ?

মীর্জা কামরান হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন ।

হুমায়ূনকে লেখা গুলবদনের পত্র

আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয়, আমার নয়নের নয়ন ভাই

হিন্দুস্থানের সম্রাট বাদশাহ হুমায়ূন ।

ভাই, আপনার এই বোন আপনার জন্যে

সারাক্ষণ প্রার্থনা করে যাচ্ছে । তার দিবস এবং

রজনী আপনার করুণা কামনায় নিবেদিত ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৪

এই চিঠি যদি আপনার হাতে না পৌঁছয়

তাহলে বুঝতে হবে আল্লাহপাক আপনার প্রতি

করুণা করেন নি । আমরা সবাই তাঁর ইচ্ছার

অধীনে । ভাগ্যকে স্বীকার করে নেওয়া ছাড়া

আমাদের কিছুই করার নেই ।

প্রিয় ভাই! আপনার কোমল মুখ একবার না

দেখে যদি আমার মৃত্যু হয় তা হবে আমার জন্যে

সপ্ত নরকের অভিশাপ ।

প্রিয় ভাই! চিঠির অনেক লেখাই আপনার কাছে

অস্পষ্ট লাগবে । আমার চোখের জলের

কারণে এটা ঘটেছে । এই হতভাগ্য বোনের ভাইকে

দেওয়ার মতো চোখের জল ছাড়া আর কিছুই নেই ।

গুলবদন

জওহর আবতাবচি, সম্রাট হুমায়ূনের ব্যক্তিগত পানিবাহক । তাঁর লেখা তাজকিরাতুন ওয়াকিয়াত গ্রন্থে রাজ্যহারা হুমায়ূনের সেই সময়ের কিছু করুণ চিত্র আছে ।

‘‘দ্বিপ্রহরে যাত্রা শুরু হলো । সেদিনের অবশিষ্ট দুই প্রহর, রাত্রির চার প্রহর এবং পরদিনের তিন প্রহর বেলা পর্যন্ত কাফেলাকে অব্যাহতভাবে চলতে হলো । পথিমধ্যে কোথাও পানি পাওয়া গেল না ।পানির অভাবে দলের লোকজন মৃতকল্প হয়ে পড়ল । দিনের মাত্র এক প্রহর অবশিষ্ট ছিল । লোকেরা হয়রান পেরেশান হয়ে চারদিকে পানির খোঁজ করতে লাগল । এই সময় একটি মরুদ্বীপ নজরে পড়ল । সেখানে পানিভর্তি একটি জলাশয় দেখা গেল।’’

পানির অভাবে সেদিন অনেকেই মারা গিয়েছিলেন । জওহর আবতাবচির গ্রন্থে জানা যায় তাদেরকে সেখানেই দাফনের ব্যবস্থা করা হয় ।

ক্যামব্রিজ গিস্টরি অব ইন্ডিয়া বইটিতে লেখা হয়েছে- ‘‘মরুপথের এ সফরে পানির অভাবে সম্রাটের দলের বহু লোক মৃত্যুমুখে পতিত হয়।’’

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –২৫

 

Related Posts

Leave A Comment