কেউ কি হাঁটছে বারান্দায় ? পা টিপে টিপে হটছে ? অনিল বাগচী শুয়েছিল, উঠে বসল। তার শরীর ঝিম ঝিম করছে, পানির পিপাসা লেগেছে। সামান্য শব্দেই তার এখন এমন হচ্ছে। শরীরের কলকজা সম্ভবত সবই নষ্ট হয়ে গেছে। মাথার ভেতরটা সারাক্ষণ ফাকা লাগে। তার নাক পরিষ্কার, সর্দি নেই, কিছু নেই, কিন্তু এই মুহূর্তে সে হা করে মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
আবার পায়ের শব্দ। শব্দটা কি বারান্দায় হচ্ছে না রাস্তায় হচ্ছে ? অনিলের কান এখন খুব তীক্ষ। অনেক দূরের শব্দও সে এখন পরিষ্কার শুনতে পায়। হয়ত রাস্তায় কেউ হেঁটে যাচ্ছে। কিন্তু রাতের বেলা কে হাঁটবে রাস্তায় ? এখনকার রাত অন্যরকম রাত। দরজা জানালা বন্ধ করে বসে থাকার রাত। রাস্তায় হেঁটে বেড়াবার রাত না ।
কা-কা শব্দে কাক ডাকল। অনিল ভয়ংকর চমকে উঠল। এমন চমকে উঠার কিছু না। একটা কাক তার জানালার বাইরে বাসা বেঁধেছে। সে তাে ডাকবেই, কিন্তু কা-কা করে শব্দটা ঠিক যেন তার মাথার ভেতর হয়েছে। কাকটা যেন তার মগজে পা রেখে দাঁড়িয়েছিল। কা-কা ডেকে ঠোট দিয়ে অনিলের মাথার মগজ খানিকটা ঠোকরে নিল। ব্যথায় শরীর পাক খাচ্ছে। চোখে পানি এসে যাচ্ছে। পিপাসায় বুক শুকিয়ে কাঠ।
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০১
এতটা ভয় নিয়ে বেঁচে থাকা কি সম্ভব ? এরচে’ মরে যাওয়া কি অনেক সহজ না ? বাড়ির ছাদে উঠে রাস্তায় লাফিয়ে পড়লে কেমন হয় ? ছাদে উঠার দরজাটা কি খােলা ? মেসের মালিক কামাল মিয়া ভারি ভারি সব তালা লাগিয়েছেন। সদর দরজায় ভেতর থেকে দুটা তালা লাগানাে হয়। ছাদে যাবার দরজাও নিশ্চয়ই বন্ধ। সেখানেও তালা।
অনিল হাত বাড়িয়ে পানির জগ নিল। তার গ্লাস ভেঙে গেছে, জগে মুখ লাগিয়ে পানি খেতে হয়। শােবার সময় সে জগ ভর্তি করে পানি এনে রাখে। কিছুক্ষণ পর পর কয়েক ঢােক করে পানি খায়। ভােরের মধ্যে পানির জগ শেষ হয়ে যায়। ভয়। তীব্র ভয়। সারাক্ষণ ভয়ে অনিলের শরীর কাপে। সে অবশ্যি জন থেকেই ভীতু ধরনের। ছােটবেলায় অন্ধকারে কখনাে ঘুমুতে পারত না। বাতি
জ্বালিয়ে রাখতে হত। সে সময়টা আবার ফিরে এসেছে। এখন সে অন্ধকারে ঘুমুতে পারে না। রাত এগারােটার পর বাতি নিভিয়ে দিতে হয়। সে জেগে থাকে। মাঝে মাঝে অন্ধকার অসহ্য বােধ হলে বালিশের নিচে রাখা টর্চ জ্বালায় । তীরের মতাে আলাের ফলা দেয়ালের নানান জায়গায় ফেলে। ঘরের অন্ধকার তাতে কমে না। খুব সামান্য অংশই আলােকিত হয়। বাকি ঘরে আগের মতােই অন্ধকার থাকে। অন্ধকার কমে না।
অনিলের ভয়ও কমে না। অনিল বালিশের নিচ থেকে দ’ ব্যাটারীর টর্চটা বের করল আলাে ফেলল দেয়ালে। আলাে তেমন জোরালাে না। ব্যাটারি কিনতে হবে। কি কি কিনতে হবে তা দিনে মনে থাকে না। রাতে শুধু মনে হয়। টর্চের ব্যাটারি, একটা পানির গ্লাস, মােমবাতি, কাগজ, লেখার কাগজ। কাল রাতে চিঠি লেখার ইচ্ছা করছিল। কাগজের অভাবে চিঠি লেখা হয় নি।
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০১
অনিল টেবিলে রাখা টেবিল ঘড়িটিতে আলাে ফেলল। রাত বেশি না, কিন্তু মনে হচ্ছে নিশুতি। সে এবার আলাে ফেলল দেয়ালে। আলােটা পড়ল ঠিক ক্যালেন্ডারটার উপর। ওষুধ কোম্পানির চোখে বাংলাদেশ। পালতােলা নৌকা যাচ্ছে। মাঝি হাল ধরে বসে আছে। তার মুখভর্তি হাসি। তার হাসি মনে হতে পারে নৌকার হাল ধরে বসে থাকার মধ্যেই জীবনের পরম শান্তি ।।
ক্যালেন্ডারে পাশেই স্বামী বিবেকানন্দের বাধানাে ছবি। অনিলের বাবা এই ছবি ছেলেকে উপহার হিসেবে দিয়েছেন। ছবিটির নিচে বিবেকানন্দের এটি বাণী লেখা। বাণীটি হচ্ছে- “যে ঈশ্বর মানুষকে ইহকালে ক্ষুধার অন্ন দিতে পারেন তিনি পরকালে তাদের পরম সুখে রাখবেন তা আমি বিশ্বাস করি না।”
ছবির বিবেকানন্দ রাগী চোখে তাকিয়ে আছেন। ঘরের যে দিকে যাওয়া যাক মনে হবে স্বামীজী সে দিকেই তাকিয়ে আছেন। রাগ ছাড়াও তার চোখের ভাষায় এক ধরনের ভৎর্সনা আছে। তিনি যেন বলছেন, ‘রে মুখ, জীবনটা নষ্ট করছিস কেন?
অনিল টর্চ লাইটের আলাে নিভিয়ে ফেলল। ছবিটা সরানাে দরকার । নষ্ট করে ফেলা দরকার, কিংবা লুকিয়ে ফেলা দরকার। বিবেকানন্দের ছবি ঘরে রাখা এখন ভয়াবহ ব্যাপার। ছবিটা সরাতে হবে। এখনই কি সরাবে? আবার কাক ডাকল । অনিল ভয়ে একটা ঝাকুনি খেল। অনিলের বাবা রূপেশ্বর মডেল হাই স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক সুরেশ বাগচী, ছেলের চরিত্রে অস্বাভাবিক ভয়ের ব্যাপারটি লক্ষ্য করেই বােধহয় ছেলের খাতায় একদিন বড় বড় করে লিখে দিলে।
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০১
“Cowards die many times before their death.”
গম্ভীর গলায় বললেন, ‘রােজ সকালে এই লেখাটার দিকে তাকিয়ে থাকবি। ধ্যান করবি। লেখাটার মানে হল— ভীতুদের মৃত্যুর আগেও অনেকবার মৃত্যুবরণ করতে হয়। যে সে মানুষের লেখা না। শেকসপিয়ারের লেখা। দেখি শেকসপিয়ার বানান কর তাে ?’ সুরেশ বাগচীর অভ্যাসই হচ্ছে যে কোন কথা
বলেই ফট করে বানান জিজ্ঞেস করা। অনিল ক্লাস থ্রীতে যখন পড়ে তার পেটে তীব্র ব্যথা শুরু হল। সুরেশ বাবু ছেলেকে কোলে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন। পথে নেমেই বললেন, ব্যথা বেশি হচ্ছে বাবা?’ অনিল কাদতে কাঁদতে বলল, হুঁ।’ ‘খুব বেশি?’
‘আচ্ছা বাবা বল তাে ব্যথার ইংরেজি কি ? অনিল চোখ মুছতে মুছতে বল, পেইন।‘এই তত হয়েছে। আচ্ছা বাবা, এখন পেইন বানান করতে। কোন কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকলে ব্যথা কম লাগবে। বানান করতে পেইন। আচ্ছা, আমি তােমাকে সাহায্য করছি। প্রথম অক্ষর হল পি।
সুরেশ বাগচীর প্রাণপণ চেষ্টাতেও অনিলের ইংরেজি বিদ্যা বেশিদূর অগ্রসর হয় নি। ইংরেজিতে আই. এ. পরীক্ষায় রেফার্ড পেয়ে গেল। সুরেশ বাগচী মনের দুঃখে পুরাে দিন না খেয়ে রইলেন এবং সন্ধ্যাবেলা দরজা বন্ধ করে ঘােট ছেলেমেয়েদের মতাে শব্দ করে কাদতে লাগলেন। অনিল শুকনাে মুখে বারান্দায় বসে রইল। অনিলের বড় বােন অতসী বাবার ঘরের দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে বলতে লাগল, দরজা খােল বাবা । দরজা খােল। সুরেশ বাগচী বললেন, এই কুলাঙ্গারকে বেরিয়ে যেতে বল অতসী। কুলাঙ্গারের মুখ দেখতে চাই না।’
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০১
অনিল ঘর থেকে বের হয়ে একা একা রূপেশ্বর নদীর ঘাটে বসে রইল। অন্ধকার রাত। জনমানব শূন্য নদীর ঘাট। ওপারে শ্মশান, মড়া পুড়ানাে হয়। কয়দিন আগেই মড়া পুড়িয়ে গেছে। ভাঙা কলসী, পােড়া কাঠ আবছা করে হলেও নজরে পড়ে। অনিলের গা ছমছম করতে লাগল। মনে হতে লাগল অশরীরী মানুষজন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে দেখছে। নিঃশব্দে চলাফেরা করছে তাকে ঘিরে। এই তাে কে যেন হাসল। শিয়াল ডাকছে। শিয়ালের ডাক এমন ভয়ংকর লাগছে কেন?
অনিল ভয়ে কাঁপতে লাগল। সে যে দৌড়ে বাড়ি চলে যাবে সেই সাহসও রইল না। গভীর রাতে হারিকেন হাতে সুরেশ বাগচী ছেলেকে খুঁজতে এলেন। নদীর পাড়ে এসে কোমল গলায় বললেন, ‘অনিল বাবা, আয় বাড়ি যাই।’ তিনি হাত ধরে ছেলেকে নিয়ে এগুতে লাগলেন। এক সময় বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘এমন কাপছিস কেন?
‘ভয় লাগছে বাবা। “আরে বােকা, কিসের ভয়? শেকসপিয়ার কি বলেছিলেন, কাউয়ার্ডস ডাই মেনি টাইমস বিফোর দেয়ার ডেথ। ভীতুদের মরবার আগেও অনেকবার মরতে হয়। বলতে শেকসপিয়ারের কোন বইয়ে এই লেখাটা আছে। তােকে আগে একবার বলেছি। কি, পারবি না ?
ছেলেবেলার অন্ধ, তীব্র ভয় আবার ফিরে এসেছে। অনিল এখন ঘুমুতে পারে না । রাত জেগে জেগে নানান ধরনের শব্দ শুনে। আতংকে কেঁপে কেঁপে উঠে। সবচে’ বেশি ভয় পায় যখন কাক ডেকে উঠে। আচমকা এই কাকটা কা কা করে আত্মা কাঁপিয়ে দেয়। পরিষ্কার চটি পায়ে হাটার শব্দ। কে হাঁটছে চটি পায়ে? রহিম সাহেব ? রহিম সাহেবের মাঝে মাঝে গভীর রাতে হাঁটার অভ্যাস আছে। তার তাে আজ সকালে চলে যাবার কথা ছিল। যেতে পারেন নি ? অনিল বলল, কে ? কে হটে ?
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০১
কেউ জবাব দিল না। হুস করে একটা ট্রাক চলে গেল। কুকুর ডাকছে। ঢাকা শহরের কুকুরগুলি এখন খুব ডাকছে। মিলিটারী না-কি অনেক কুকুর মেরেছে। রাত দুপুরে কুকুরগুলি আচমকা ডেকে উঠছে—মিলিটারীরা ভয় পেয়ে এলােপাতাড়ি গুলি ছুঁড়ে। কুকুর এখন মিলিটারী চিনে ফেলেছে। হঠাৎ কোন রাস্তা কুকুরশূন্য হলে বুঝতে হবে মিলিটারী সেখানে আছে। কিংবা তারা আসছে। বাঘের আগে ফেউ ডাকার মততা, মিলিটারীর আগে কুকুর ডাকে।
পায়ের শব্দটা আবার আসছে। ঠিক তার দরজার কাছে এসে শব্দ থেমে গেল। অনিল ক্ষীণ স্বরে বলল, ‘কে?’ তার নিজের গলার শব্দ সে নিজেই শুনতে পেল না। তাকে ধরার জন্যে কি মিলিটারী চলে এসেছে? একটু আগে যে ট্রাকের শব্দ শােনা গেল, সেই ট্রাকে করেই কি তাকে অজানা কোন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে ? সে দরজা খুলবে আর তাকে নিয়ে ট্রাকে তুলবে। এরা কি গাড়িতে ভােলার সময় চোখ বেঁধে তুলে ? কেন তাকে শুধু শুধু তুলবে ?
সে তাে কিছুই করে নি। সে কোন মিছিলে যায় নি। তার ভয় লাগে। সাতই মার্চের ভাষণ শােনার জন্যে রেসকোর্সের মাঠে যাবার ইচ্ছা ছিল, তবু যায় নি। তার মন বলছিল ঝামেলা হবে। লােকজন ছােটাছুটি শুরু করবে। মরতে হবে মানুষের পায়ের নিচে চাপা পড়ে। জন্মাষ্টমীর রথযাত্রা উপলক্ষে বিরাট মেলা হয় নান্দিগ্রামে। ছােটবেলায় বাবার হাত ধরে সেই মেলা সে দেখতে গেল। কি প্রচণ্ড ভীড়! যাতে হারিয়ে না যায় সে জন্যে সে দুহাতে শক্ত করে বাবার হাত ধরে রাখল। তারপরও সে হারিয়ে গেল।
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০১
লােকজনের চাপে ছিটকে কোথায় চলে গেল। মেলার সবগুলাে মানুষ যেন হঠাৎ পাগল হয়ে গেল। যে যে-দিকে পারছে ছুটছে। বেদেনীর সাপের ঝুড়ি থেকে দুটা কাল সাপ না-কি বের হয়ে পড়েছে। ছােটাছুটি এই কারণে। অনিল দৌড়াচ্ছিল চোখ বন্ধ করে। হঠাৎ কে যেন তাকে তাকে ধরে ফেলল। অনিল তাকাচ্ছে কিন্তু কিছু দেখছে না। তার চোখে সব দৃশ্য এলােমেলাে হয়ে গেছে।
শুধু সে শুনছে বুড়াে এক ভদ্রলােক বলছেন, এই ছেলেটা এমন করছে কেন? এ কেমন যেন নীল হয়ে যাচ্ছে। এই ছেলেটাকে বাতাস কর। ছেলেটাকে বাতাস কর।’ অনিল সারাজীবন সব রকম ঝামেলা থেকে দূরে থাকতে চেয়েছে। আর আশ্চর্য! বেছে বেছে তাকেই একের পর এক ঝামেলায় পড়তে হয়েছে। রূপেশ্বরে
এক পাগলি আছে—“মােক্তার পাগলি’ । সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। তাকে মােক্তার বললেই বাঘিনীর মতাে ছুটে যায়। বাচ্চা-কাচ্চারা তাকে দেখলেই ঢিল ছুঁড়ে । মােক্তার’ বলে চিৎকার করে ক্ষেপায় । পাগলি তাদের তাড়া করে । অনিল কোনদিন মােক্তার পাগলিকে দেখে হাসে নি। তার গায়ে ঢিল ছুঁড়ে নি কিংবা মােক্তার বলে চেঁচায় নি।
তারপরেও এই পাগল শুধু তাকেই খুঁজে বেড়াত। দেখা হলেই তাড়া করত। হয়ত সে বই নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে। বটগাছের আড়ালে। থেকে মােক্তার পাগলি বের হয়ে এল। বই-খাতা ফেলে অনিল ছুটছে। পেছনে পেছনে লম্বা লম্বা পা ফেলে ছুটছে মােক্তার পাগলি। রূপেশ্বরে এটা ছিল সাধারণ ঘটনা। কেউ অনিলকে সাহায্য করার জন্যে এগিয়ে আসত না। দূরে দাঁড়িয়ে মজা দেখত। কেউ কেউ হাততালি দিয়ে চেঁচাত— ‘লাগ ভেলকি লাগ।
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০১
একদিন অনিল ধরা পড়ে গেল মােক্তার পাগলির হাতে। তখন ক্লাস সেভেনে পড়ে। হাফইয়ার্লি পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি ফিরছে। পােস্টাপিসের কাছে আসামাত্র মােক্তার পাগলি ছুটে এসে অনিলকে হাত চেপে ধরল। মেলায় যেমন হয়েছিল অনিলের সে রকম হল। মনে হল সে কিছু দেখতে পারছে না।
তার হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে। এক্ষুণি বােধহয় হৃৎপিণ্ড ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। নাক দিয়ে সে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। হা করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। চারদিকে লােক জমে গেছে। সবাই মজা দেখছে। বড়ই মজাদার দৃশ্য। মােক্তার পাগলি এক ঝটকায় অনিলকে কোলে তুলে ফেলল। তার অনাবৃত স্তনে অনিলের মুখ চেপে বলল, ‘খা দুধ খা। খা কইলাম।।
দর্শকরা বিপুল আনন্দে হেসে ফেলল। অনিলের নাম হয়ে গেল দুদু খাওয়া অনিল। দুটি অনিল ছিল ক্লাসে। একজন শুধু অনিল, অন্যজন দুদু খাওয়া অনিল। অনিল ক্লাসে যাওয়া ছেড়ে দিল। স্কুলের সময় দরজা বন্ধ করে বসে থাকত। চেঁচিয়ে কাঁদত। অতসী বাবাকে গিয়ে বলত, থাক বাবা, আজ স্কুলে না গেল।
একদিন সুরেশ বাগচী ছেলেকে ডেকে বললেন, ‘তােকে দুধ খাইয়েছে তাে কি হয়েছে ? মাতৃস্নেহে দুগ্ধপান করানাের চেষ্টায় দোষের কিছু না। মাতৃভাবে তাকে সম্মান করবি, তাহলেই হবে। আয় তাের ভয় ভাঙিয়ে দিয়ে আসি।’ অনিল বলল, না।’
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০১
না বলবি না। না বলা দুর্বল মানুষের লক্ষণ। আয় আমার সাথে। অতসী তাের মা’র একটা শাড়ি বের করে দে। অতসী বলল, শাড়ি কি করবে ? ‘মােক্তার পাগলিকে দেব। নগ্ন ঘুরে বেড়ায় দেখতে খারাপ লাগে।’ ‘মা’র শাড়ি কাউকে দিতে দিব না বাবা।‘নতুন শাড়ি কেনার পয়সা নাইরে মা। দে, তাের মা’র একটা শাড়ি দে। মা’র স্মৃতি তাে শাড়িতে থাকে না রে মা। মা’র স্মৃতি থাকে অন্তরে।
এক হাতে লাল পাড় শাড়ি নিয়ে অন্য হাতে শক্ত করে অনিলের হাত ধরে সুরেশ বাগচী নগ্ন পাগলিকে খুঁজে বের করলেন। পাগলি কঠিন চোখে তাকাল। সুরেশ বাগচী বললেন, আমার এই পুত্র আপনার ভয়ে অসম্ভব ভীত। আমি শুনেছি আপনি তাকে পুত্রস্নেহে দুগ্ধ পান করাবার চেষ্টা করেছেন। কাজেই সে আপনার পুত্রস্থানীয় । আপনি আপনার পুত্রের ভয় ভাঙিয়ে দিন।’
পাগলি এইসব কঠিন কথার কি বুঝল কে জানে, তবে সে হাতে ইশারা করে অনিলকে কাছে ডাকল। অনিল ভয়াবহ আতঙ্কে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। সুরের বাগচী বললেন, ‘ছেলে আপনার জন্যে একটা শাড়ি এনেছে, তার মায়ের ব্যবহারী শাড়ি। আপনি গ্রহণ করলে আমরা খুশি হব।’
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০১
পাগলি হাত বাড়িয়ে শাড়ি নিল।সুরেশ বাগচী বললেন, ‘পুত্রের কাছে নগ্ন অবস্থায় উপস্থিত হওয়া শােভন নয়। আপনি শাড়িটা পরে আমার ছেলের গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিন।পাগলি বলল, ‘দূর হ হারামজাদা।‘আমি হাতজোড় করে মিনতি করছি। আপনি তাকে আর ভয় দেখাবেন না। মা-মরা ছেলে, সে জন্ম থেকেই ভীতু। আপনি তার মাতৃস্থানীয়। আপনার ভয়ে সে স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছে।’ পাগলি নিজের গায়ে শাড়ি মেলে ধরতে ধরতে হাসি মুখে বলল, ‘দূর হ, দূর হ কইলাম।’
আশ্চর্যের ব্যাপার! পাগলি আর কোনদিনই অনিলকে ভয় দেখায় নি। লালপেড়ে শাড়ি তাকে কখনাে পরতে দেখা যায় নি। সে নগ্ন হয়েই ঘুরত। অনিলকে দেখলে থমকে দাড়িয়ে লাজুক গলায় বলতাে, এই পুলা, মাথার চুল আচড়াও না ক্যান? একটা চিরুণি আনবা, চুল আঁচড়াইয়া দিমু।’ অনিল দৌড়ে পালিয়ে যেত। তার ভয় কাটে নি। শরীরের সমস্ত স্নায়ু অবশ করে দেয়া তীব্র ভয়।
দরজার কড়া নড়ে উঠল।অনিলের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। কেউ একজন দরজার পাশে তাহলে দাড়িয়ে ছিল ? কে সে? কে ? অনিলের ঘাম হচ্ছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে।‘অনিল ঘুমাচ্ছ ? গফুর সাহেবের গলা। তবু অনিল বলল, কে কে? ‘আমি। ভয়ের কিছু নাই। আমি। দরজা খােল।
অনিল বিছানা ছেড়ে উঠেছে। সুইচ বাের্ড খুঁজে পাচ্ছে না। সমস্ত দেয়াল হাতড়ে বেড়াচ্ছে সুইচ বাের্ডের জন্যে। তার বালিশের নিচে টর্চ লাইট। একবারও টর্চ লাইটের কথা তার মনে আসছে না। তাকে ডাকছেন গফুর সাহেব। সর্ব দক্ষিণের সিঙ্গেল রুমে থাকেন। এজি অপিসের সিনিয়ার অ্যাসিসটেন্ট। এই বছরেই রিটায়ার করার কথা। ঢাকায় বাসা করে থাকতেন।
Read more
