স্ত্রী মারা যাবার পর বাসা ছেড়ে মেসে এসে উঠেছেন। একা মানুষ। বাসা ভাড়া করে এতগুলি টাকা নষ্ট করতে ইচ্ছে করে নি। প্রয়ােজনও নেই। দুটি মেয়ে । দুজনেরই বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। একজন থাকে রাজশাহীতে, একজন খুলনায় । সুইচ বাের্ড খুঁজে পাওয়া গেল। অনিল বাতি জ্বালাল, দরজা খুলল। গফুর সাহেব বললেন, ‘ঘুম আসছিল না, এ জন্যেই ডাকলাম। অন্য কিছু না।
‘এতক্ষণ ধরে আপনিই কি হাঁটাহাঁটি করছিলেন?’ ‘ই। বৃষ্টি হবে বলে মনে হচ্ছে। আকাশে খুব মেঘ। তুমি কি চা খাবে অনিল ? রাতে ঘুম ভালাে হয় না। একটু পরে পরে চা খাই। খাবে? ‘ ‘আস না, একটু চা খাও। সময় খারাপ। কথাটথা বললে ভালাে লাগে। গফুর সাহেব কথাগুলি বলার সময় একবারও অনিলের দিকে তাকালেন । অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বললেন।
কারণ তিনি অনিলের দিকে সরাসরি তাকাতে পারছেন না। আজ দুপুরে একটা ছেলে অনিলের একটা চিঠি দিয়ে গেছে তার হাতে। চিঠিটা অনিলকে পৌঁছানাের দায়িত্ব তার। সেই খােলা চিঠি তিনি কয়েকবার পড়েছেন। ভয়ংকর দুঃসংবাদের এই চিঠি তিনি অনিলকে দেয়ার মতাে মনের জোর সংগ্রহ করতে পারেন নি। রূপেশ্বর স্কুলের হেড মাস্টার মনােয়ার উদ্দিন খাঁ লিখেছেন
বাবা অনিল,
তােমাকে একটি দুঃখের সংবাদ জানাইতেছি। এপ্রিল মাসের নয় তারিখে রূপেশ্বরে পাক মিলিটারী উপস্থিত হয়। তাহাদের আকস্মিক আগমনের জন্যে আমরা কেহই প্রস্তুত ছিলাম না। তাহারা রূপেশ্বরে অবস্থান নেয়। এপ্রিল মাসের বার তারিখে আরাে অনেকের সঙ্গে তাহারা তােমার বাবাকে হত্যা করে। আমরা তাঁহাকে বাঁচানাের সবরকম চেষ্টা করিয়াছি। এর বেশি আমি আর কি বলিব ? তােমার ভগ্নিকে আমি আমার বাড়িতে আনিয়া রাখিয়াছি।
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০২
তাহার বিষয়ে তুমি চিন্তা করিবে না । আল্লাহ পাকের নামে শপথ নিয়া বলিতেছি, আমার জীবন থাকিতে আমি অতসী মায়ের কোন অনিষ্ট হইতে দিব না। তােমার পিতার মৃত্যুতে রূপেশ্বরের প্রতিটি মানুষ চোখের জল ফেলিয়াছে। এই কথা তােমাকে জানাইলাম। জানি না ইহাতে তুমি মনে কোন শান্তি পাইবে কি-না। আল্লাহ পাক তাঁহার আত্মার শান্তি দিন, এই প্রার্থনা করি। তুমি সাবধানে থাকিবে। ভুলেও রূপেশ্বরে আসিবার কথা চিন্তা করিবে না। একদল মুক্তিযােদ্ধা রূপেশ্বর থানা আক্রমণ করিবার চেষ্টা করায় ভয়াবহ ফল হইয়াছে। রূপেশ্বরে বর্তমানে কোন যুবক ছেলে নাই।…
গফুর সাহেব ভেবেছিলেন রাতে চিঠিটা দেবেন। এখন অনিলের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে চিঠি না দেয়াই ভালাে। ছেলেটা ভয়ে অস্থির হয়ে আছে। এই খবর পেলে কি করবে কে জানে। ‘অনিল। “জি। ‘আস আমার ঘরে আস, চা খাও।। অনিল উঠে এল। গফুর সাহেব কেরােসিনের চুলায় কেতলি বসিয়ে দিলেন। দু’জন মেঝেতে মুখােমুখি বসে আছে। কারাে মুখেই কোন কথা নেই।অস্বস্তি কাটাবার জন্যে গফুর সাহেব বললেন, আজকের পূর্বদেশটা পড়েছ ?
অনিল বলল, না। আমি এখন খবরের কাগজ পড়ি না। পড়তে ইচ্ছা করে না। ‘আমারাে পড়তে ইচ্ছা করে না। অভ্যাসের বসে পড়ি। তবে আজকের পূর্বদেশটা তােমার পড়া উচিত। নাও, এই জায়গাটা পড়। মন দিয়ে পড়।‘অনিল পড়ল। “পাকিস্তানের আজাদী দিবস উপলক্ষে গােলাম আযমের আহ্বান। আযাদী দিবস উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শান্তিকমিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কার্জন এক বিশাল সভার আয়ােজন করে। সেই সভায় জনাব আযম পাকিস্তানের দুশমনদের মহল্লায় মহল্লায় তন্ন তন্ন করে খুঁজে তাদের অস্তিত্ব বিলােপ করার জন্য দেশপ্রেমিক নাগরিকদের শান্তি কমিটির সঙ্গে সহযােগিতা করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান।”
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০২
‘পড়েছ অনিল ? ‘জি। ‘তােমার খুব সাবধানে থাকা দরকার। মেসে থাকাটা একেবারেই উচিত । মিলিটারীর তিনটা টার্গেট আওয়ামী লীগ, হিন্দু, যুবক ছেলে। তারপর আবার শুনলাম মেসে কারা কারা তাদের নাম-ধাম পরিচয় জানতে চেয়ে চিঠি এসেছে। কামাল মিয়া বলল। ‘কে চিঠি দিয়েছে ?
স্থানীয় শান্তি রক্ষা কমিটির এক লােক— এস এম সােলায়মান। মজার ব্যাপার কি জান— আগে এই লােক ঘাের আওয়ামী লীগারে ছিল। শেখ সাহেবের ভাষণ ক্যাসেট করে নিয়ে এসেছিল। মাইক বাজিয়ে মহল্লায় শুনিয়েছে। এখন সে বিরাট পাকিস্তানপন্থি। মানুষের চরিত্র বােঝা খুব কঠিন। তবে আমি তাকে ঠিক দোষও দিচ্ছি না। সে হয়ত যা করছে প্রাণ বাঁচানাের জন্যে করছে। এসব না করলে আওয়ামী লীগার হিসেবে তাকে মেরে ফেলত। ঠিক না?’
অনিল কিছু বলল না। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে নিঃশব্দে চুমুক দিতে লাগল। চা-টা খেতে ভালাে লাগছে। বেশ ভালাে লাগছে। | ‘চায়ের সঙ্গে আর কিছু খাবে ? চানাচুর আছে। দেব চানাচুর ? টেনশানের সময় খুব ক্ষিধা পায়।অনিল বলল, আমি আর কিছু খাব না। চা থাকলে আরেকটু নেব।’ গফুর সাহেব আবার কাপ ভর্তি করে দিলেন। নিচু গলায় বললেন, তুমি বরং মেসটা ছেড়ে দাও।
‘মেস ছেড়ে যাব কোথায় ? ঢাকা শহরে আমার পরিচিত কেউ নেই। ফতুল্লায় এক মামা থাকতেন। এখন আছেন কি-না তাও জানি না।’ গফুর সাহেব হঠাৎ অপ্রাসঙ্গিকভাবেই জিজ্ঞেস করলেন, তােমার বাবার শেষ চিঠি কবে পেয়েছ? ‘কেন জিজ্ঞেস করছেন ? ‘এমি জানতে চাচ্ছি। কোন কারণ নেই।বাবার শেষ চিঠি পেয়েছি চার মাস আগে। এখন কেমন আছেন কিছুই জানি না। আমি বেশ কয়েকটা চিঠি দিয়েছি। জবাব পাচ্ছি না।’
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০২
গফুর সাহেব বলরেন, যাও শুয়ে পড়। রাত অনেক হয়েছে। অনিল নিজের ঘরে চলে এল। বাতি নিভিয়ে বিছানায় যাওয়ামাত্র বৃষ্টি শুরু হল। ঝুম বৃষ্টি।জানালা খুলে একটু বৃষ্টি দেখলে কেমন হয় ? কত দিন জানালা খুলে ঘুমানাে হয় না। আহা কেমন না জানি লাগে জানালা খােলা রেখে ঘুমুতে। দেশ স্বাধীন যদি সত্যি সত্যি হয় তাহলে সে কয়েক রাত রাস্তার পাশে পাটি পেতে ঘুমুবে। সে রাতগুলােতে ঘুম আসবে না সে রাতগুলাে কাটাবে রাস্তায় হেঁটে হেঁটে।
ভাল বৃষ্টি হচ্ছে তাে। ঝড় বৃষ্টির সময় মিলিটারীরা রাস্তায় থাকে না। এরা বৃষ্টি ভয় করে। তােক বৃষ্টি। দেশ ভাসিয়ে নিয়ে যাক। পদ্মা-মেঘনা-যমুনায় বান ডাকুক। শো শো শব্দে ছুটে আসুক জলরাশি। | টকটক শব্দে টিকটিকি ডাকছে। এই ঘরে চারটা টিকটিকি আছে। একটার গা ধবল কুষ্ঠের রুগীর মতাে সাদা। একটা মাকড়সা আছে। সে সম্ভবত আয়নার পেছনে থাকে।
ঠিক রাত আটটায় পেছন থেকে এসে আয়নার উপর বসে থাকে। এমন নিখুত সময়ে ব্যাপারটা ঘটে যে মনে হয় মাকড়সাটার নিজের কাছেও কোন ঘড়ি আছে। সম্ভবত টিকটিকিগুলাে তাকে খেয়ে ফেলেছে। সারভাইভাল অব দি ফিটেস্ট। যে ফিট সে টিকে থাকবে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। নীল আলােয় ঘর ভেসে গিয়ে আবার সব অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। অল্প বৃষ্টি হলেই মেসের সামনের রাস্তাটায় এক হাঁটু পানি হয়।
সারারাত বৃষ্টি হােক, রাস্তায় এক কোমর পানি জমে যাক। পানি ভেঙে মিলিটারী জীপ আসবে না। ওরা শুকনাে দেশের মানুষ। পানিতে ওদের খুব ভয়। ঝড় হচ্ছে না-কি ? জানালায় শব্দ হচ্ছে। কাকটা তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। সাধারণত একটা কাক ডাকলে দশটা কাক এসে উপস্থিত হয়। কিন্তু এই কাকটা নিঃসঙ্গ, বন্ধুহীন। এর ডাকে কখনাে কাউকে সাড়া দিতে অনিল শুনে নি। সে থাকেও একা একা। তার পুরুষ বন্ধুও তাকে ছেড়ে গেছে। সে কি দরজা খুলে কাকটাকে ভেতরে আসতে বলবে ?
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০২
ঘুমে অনিলের চোখ জড়িয়ে আসছে। সারাদিন অসহ্য গরম ছিল। এখন পৃথিবী শীতল হয়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে ভয় কেটে যাচ্ছে। বার বার মনে হচ্ছে— এমন দুর্যোগে মিলিটারী পথে নামবে না। অন্তত আজকের রাতটা মানুষের শান্তিতে কাটবে। অনিল ঘুমিয়ে পড়ল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চমৎকার স্বপ্ন দেখল । অনিল যেন খুব ছােট। তারা নৌকায় করে মামার বাড়ি যাচ্ছে ।রূপবতী একজন তরুণীর কোলে সে বসে আছে। তার খুব লজ্জা লাগছে। অনিলের বাবা বললেন, ‘ছেলে দেখি লজ্জায় মারা যাচ্ছে।
আরে বােকা, এটা তাের মা। মার কোলে বসায় আবার লজ্জা কি ?’ রূপবতী তরুণীটি বলছে— আহা ও কি আমাকে চিনে। লজ্জা তাে পাবেই। এটাই তাে স্বাভাবিক।’ রূপবতী তরুণীর মুখ তখন খানিকটা মােক্তার পাগলির মতাে হয়ে গেল।এবং সে বলতে লাগল— চিরণিটা কই? দেখি অতসী চিরণিটা দে তাে। আমি বাবুর চুল আঁচড়ে দেই। অতসী খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল, “ওকে বাবু ডাকছ কেন? ওর নাম আনিল।’ তখন কোখেকে যেন কাক ডাকতে লাগল- কা-কা-কা।
কা-কাকা-কা। আসলেই কাক ডাকছে। কাকের চিৎকারে অনিলের ঘুম ভাঙল। জানালা খােলা। গত রাতের ঝড়ে এক সময় ছিটকিনি খুলে গেছে। বৃষ্টির ছাটে বিছানার এক অংশ ভেজা। অনিলের পাও ভিজে আছে। তার ঘুম ভাঙে নি। এখন ঘুম ভাঙল কাকের ডাকে। নিঃসঙ্গ কাকটা জানালায় বসে অনিলের দিকে তাকিয়েই ডাকছে। অনিল বিছানা ছেড়ে নামল। ঘরের ভেতরটা অন্ধকার । জানালার পাশে চলে গেল। সামান্য আলাে হয়েছে। ভাের হচ্ছে। ভাের, নতুন আরেকটি দিনের শুরু।
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০২
রাস্তা-ঘাট ফাকা। এখানে-ওখানে পানি জমে আছে। পানির উপর দিয়ে ছপ ছপ করতে করতে একটা কুকুর এগিয়ে গেল। শুকনাে জায়গাও আছে। কুকুরটা সেদিকে গেল না। পানির উপর দিয়ে হাঁটতেই তার বােধহয় ভালাে লাগছে। লাইটপােস্ট-এর ইলেকট্রিক তারে এক ঝাক শালিক বসে আছে। কয়টা শালিক সে কি শুনে দেখবে? সুরেশ বাগচী এই ভাবেই তাকে গুনতে শিখিয়েছেন।
ট্রেনে করে যাচ্ছে, জানালা দিয়ে মুখ বের করে দেখা গেল টেলিগ্রাফের তারে কয়েকটা ফিঙ্গে বসে আছে। সুরেশ বাবু বললেন, ‘ও বাবু, ও অনিল গুনে ফেল তাে বাবা কটা পাখি।অনিল বলল, না। আমি শুনব না।’ অতসী বলল, আমি শুনব বাবা? সুরেশ বললেন, “উহু উহু, অনিল গুনবে। ক’টা অনিল ? ক‘টা? গােনার আগেই ট্রেন পাখি ছাড়িয়ে অনেক দূর চলে গেল। সুরেশ বাগচীর মুখ দেখে তখন মনে হতে পারে তার খুব ইচ্ছা চেন টেনে ট্রেনটাকে তিনি থামান। পুত্রকে নিয়ে চলে যান হাঁটতে হাঁটতে যাতে সে ফিঙ্গে গুনে আসতে পারে।
শৈশবের অভ্যাসেই অনিল এখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শালিক পাখি গুনছে। পাখিগুলি স্থির হয়ে বসে আছে। পুরােপুরি ভাের না হওয়া পর্যন্ত এরা বােধহয় নড়বে না। কিংবা কে জানে এরা বােধহয় বুঝতে পারছে অনিল নামের ছাব্বিশ বছরের এক যুবক তাদের গুনছে। নড়াচড়া করলে যুবকের গুনতে অসুবিধা হবে।রাস্তা এখনাে ফাঁকা, রিকশা নেই, গাড়ি নেই, একটা মানুষ নেই। কার্ফ সকাল ছ’টা পর্যন্ত। কাজেই ছ’টার আগে কাউকে দেখা যাবে না। এই সময় রাস্তার ঠিক মাঝামাঝি দাড়িয়ে বললে কেমন হয় আমি কাফু মানি না।
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০২
একটা জীপ চলে গেল।মিলিটারী জীপ। ড্রাইভারের পাশে যে অফিসারটি বসে আছে তার চোখে সানগ্লাস। এই ভাের বেলা, যখন দিনের আলাে পর্যন্ত স্পষ্ট হয় নি তখন অফিসারটি চোখে সানগ্লাস পরে বের হল কেন? সে কি চারদিক অন্ধকার করে রাখতে চায়? আশেপাশের কিছু দেখতে চায় না? জানালাটা বন্ধ করে দেয়া উচিত। সব বাড়ির জানালা বন্ধ। তারটা ভােলা। সহজেই চোখে পড়ে যাবে। কারাে মনে হয়ে যেতে পারে- এই বাড়িতে কোন রহস্য আছে।
অনিল জানালা বন্ধ করে ভেতরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল। ভেতরের দিকে মেস ঘরের উঠানে বিশাল এক কাঠাল গাছ। মেসের মালিক কামাল মিয়া প্রতিবারই বলেন, গাছ কাটিয়ে ফেলবেন কোনবারই কাটা হয় না।সব গাছেরই কিছু নিজস্ব রহস্য আছে। এই গাছেরও আছে। এই গাছে কখনাে পাখি বসে না, পাখি বাসা বাঁধে না। অনিল বারান্দায় দাড়িয়ে গাছটার দিকে তাকিয়ে আছে। গাছের মাথায় রােদ এসে পড়েছে। কাল রাতে বৃষ্টিতে পাতাগুলি ভেজা।
সেই ভেজা পাতা রােদে চিকমিক করছে। মনে হচ্ছে গাছটা মাথায় সােনার টোপর পরেছে। কি আশ্চর্য সুন্দর! কি অদ্ভুত সুন্দর! বাবা তার সঙ্গে থাকলে মুগ্ধ হয়ে দেখতেন। বিস্মিত হয়ে বলতেন- “আহা রে, আহা রে, কি সুন্দর! কি সুন্দর। এই জিনিসের ছবি আঁকা যাবে না। বুঝলি অনিল, এই জিনিসের ছবি আঁকা খুব সমস্যা।যে কোন সুন্দর জিনিস দেখলেই সুরেশ বাগচীর প্রথম চিন্তা এটার ছবি আঁকা যাবে কি-না। ভাবটা এ-রকম যেন ছবি আঁকা গেলে তিনি তৎক্ষণাৎ রং তুলি দিয়ে ছবি এঁকে ফেলতেন।
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০২
দিঘির জলে আকাশের ছায়া দেখাবার জন্যে সুরেশ বাবু একবার অনিলকে নিয়ে গেলেন। সেটা না-কি একটা দেখার মতাে ব্যাপার। যার ছবি আঁকা অসম্ভব। অনিলের বয়স তখন ছয় কি সাত । হাঁটতে হাঁটতে পায়ে ব্যথা। সুরেশ বাগচী বললেন, কষ্ট হচ্ছে না-কি রে বাবু?’অনিল বলল, বাবু বলবে না। “আচ্ছা যা বলব না। কষ্ট হচ্ছে না-কি রে অনিল?
অনিল বলল, ‘হু।‘যে কোন ভালাে জিনিস দেখার জন্যে কষ্ট করতে হয় । আয় কাঁধে উঠে পড়।’ পাচ মাইল দূরে বিরামপুর দিঘি। মহারাজ কৃষ্ণকান্তর কাটা দিঘি। বাঁধানাে ঘাট। সুরেশ তার ছেলেকে নিয়ে ঘাটে উপস্থিত হলেন। লােকজন কাপড় কাচছে, গােসল করছে। তিনি বললেন, আপনাদের কাছে আমার বিনীত অনুরােধ, ঘন্টা খানেকের জন্য দিঘির জল কেউ নাড়াবেন না। নিস্তরঙ্গ জলে আকাশের ছায়া দেখাবার জন্যে আমি আমার পুত্রকে নিয়ে এসেছি। অনেক দূর থেকে এসেছি।’
আধবুড়াে এক লােক বিরক্ত হয়ে বলল, “আপনে কেডা?’ ‘আমার নাম সুরেশ বাগচী। আমি একজন শিক্ষক। দিঘির জল ঘণ্টা খানেকের জন্যে না নাড়ালে বড় ভালাে হয়।’কাজকামের সময় চুপচাপ কে বসে থাকবে বলেন ? বিকালে আসবেন।আচ্ছা, আমরা বরং অপেক্ষা করি। অপেক্ষারও আনন্দ আছে। ক্ষিধে পেয়েছে না-কি রে অনিল?’
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০২
‘অতসীকে নিয়ে আসলে ভালাে হত। বেচারীর এত শখ ছিল দেখার। ভাবলাম, মেয়ে মানুষ এত দূর হাঁটবে। মেয়ে হলে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হতে হয়। তাের ঘুম পাচ্ছে না-কি? ঝিমাচ্ছিস কেন?’
দিঘির ঘাট আর জনশূন্য হয় না। লােকজন আসছেই। দুঘন্টা বসে থাকার পরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। ঝুম বৃষ্টি। সুরেশ বাগচী দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “আর হবে না, চল ফিরে যাই।’ ছাতা নেই। ভিজতে ভিজতে ফেরা। রাস্তা হয়েছে পিছল। সুরেশ বাগচীকে ছেলে কাঁধে নিয়ে এগুতে হচ্ছে। তিনি বিড় বিড় করে বলছেন, এ তত বড়ই যন্ত্রণা হয়ে গেল। নির্ঘাৎ জ্বর-জ্বারি হবে।
তারা বাড়ি পৌঁছল সন্ধ্যা মিলিয়ে যাবার পর। সুরেশ বাগচী বাড়ি পৌঁছে শুনলেন তাঁর মেয়ে সারাদিন কিছু খায় নি। দরজা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে আছে। সুরেশ বাগচী উদাস গলায় বললেন, ভুল হয়ে গেছে রে মা। তােকে সঙ্গে নেয়া উচিত ছিল। আমরাও কিছু দেখতে পারি নি। আবার যেতে হবে। তখন নিয়ে যাব। গায়ে হাত দিয়ে বলছি রে মা।।
অতসী ফুপাতে ফুপাতে বলল, “ভেজা হাত সরাও তাে বাবা। নিজেরা সব ভালাে ভালাে জিনিস দেখবে।‘ভুল হয়ে গেছে রে মা। বিরাট ভুল হয়ে গেছে। তবে আমরা ভালাে জিনিস কিছু দেখতেও পাই নি। বিশ্বাস কর। এবার থেকে ভালাে জিনিস যা দেখব, তােকে নিয়ে দেখব।
Read more
