আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৭ হুমায়ূন আহমেদ

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৭

কালু আহত গলায় বলল, জহির উদ্দিন সাব হাতির মালিকতারে আপনে নামে চিনবেন না সেইটা ক্যামনে বুঝবলাথ মাইরা ফেলতে চাইলে ফেলেনআমরা গরীবআমরার জন্ম হইছে লাথ খাওনের জন্যে। চুপচাপ তেল মালিশ করকথা বন্ধকালু পায়ে তেল মালিশ করে যাচ্ছেহারুন এমন ভঙ্গিতে বসে আছে যেন সে ঘােরের মধ্যে চলে গেছেচারপাশে কী হচ্ছে বুঝতে পারছে না

জহির উদ্দিন মারা গেছে এরচেআনন্দের সংবাদ আর কী হতে পারেলটারিতে লাখ টাকা পাওয়ার আনন্দের মতাে আনন্দহাতির মালিক মারা গেছেহাতি এখন আর কাউকে ফেরত দিতে হবে নাপাওনা টাকাও দিতে হবে নাস্বাধীন বাংলা সার্কাস পার্টি এখন একটা হাতির মালিক। কালু বলল, হাতির মালিক তাে স্যার এখন আমরা। 

হারুন বলল, আমরা হাতির মালিক হব কী জন্যে ? জহির উদ্দিন সাবের ওয়ারিশানরা হাতির মালিককোর্টের কাগজপত্র নিয়া ওয়ারিশান আসলে হাতি ফিরত দিব । ম্যানেজার সাব ভিন্ন কথা বলেছেকী ভিন্ন কথা

ম্যানেজার সাব বলেছেন হাতি খরিদের বায়না দলিল গত মাসে করা হয়েছেজাহির উদ্দিন সাব মাসে মাসে টেকা উসল হবে এই কড়ারে হাতি বেচে দিয়েছেন। হারুন অতি দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, চিন্তাভাবনার মধ্যে থাকিপায়ে যন্ত্রণাএইসব কারণে আসল কথা মনে থাকে নাহাতি যে আমরা খরিদ করে নিয়েছি এই কথাটা ভুলে গেছি

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৭

খরিদ অবশ্যই করেছিকাগজপত্র ম্যানেজারের কাছে আছেটাকাপয়সাও যতদূর মনে হয় দেওয়া হয়ে গেছেদেখি ম্যানেজারকে জিজ্ঞাস করিঅল্প কিছু যদি বাকি থাকে দিয়ে দেওয়া দরকারঋণ রাখা আমার পছন্দ নাঠিক আছে তুমি যাও আজ মনে হয় ব্যথা উঠবে নাম্যানেজাররে পাঠাও! আমার গ্লাস খালিগ্লাসে জিনিস দিয়ে যাও। 

তেঁতুলের জোগাড় দেখবাএই জিনিস যদি আমারে তেঁতুল ছাড়া খাইতে হয় তাইলে তােমার খবর আছেকানে ধইরা তাঁবুর চাইর দিকে তােমারে চক্কর দেওয়াব বুঝেছ

জি বুঝেছি। ম্যানেজাররে পাঠাওপা ছেছড়াইতে ছেছড়াইতে যাবা নাবন্দুকের গুলির মতাে যাও। কালু বিষন্ন মুখে বের হয়ে গেলহারুন তেঁতুল বিহীন জিনের গ্লাসে লম্বা চুমুক দিয়ে বুঝল তার নেশা হয়েছেজিনের নেশা হুট করে উঠে, তাই হয়েছেকিছুক্ষণ আগে তার যে জগৎ ছিল এখন সে জগৎ নাইএখনকার জগৎ আন্দময় জগৎহঠাৎ হাতির মালিকানা পেয়ে যাওয়া একটা কারণ হতে পারে। তৈয়ব এসে বলল, আমারে ডেকেছেন

হারুন বিরক্ত গলায় বলল, না ডাকলে তুমি আস না ? তুমি নবাব সিরাজউদ্দৌলা হয়েছ

তৈয়ব মেঝেতে দৃষ্টি নিবন্ধ রাখলহারুন গ্লাসে লম্বা চুমুক দিয়ে বলল, জহির সাব ইন্তেকাল করেছেনএই খবর কবে পেয়েছ

গতকাল। গতকাল খবর পেয়েছ, আমাকে দেও নাই কেন ? নাকি ভুলে গেলা স্বাধীন বাংলা সার্কাসের মালিক আসলে কে ? তুমি তাে ভেবে বসে আছ তুমিই মালিকমনে রাখবা তুমি দুই পয়সা দামের ম্যানেজারএক মিনিটের নােটিশে পাছায় লাথি মেরে তােমারে রাস্তায় ফেলে দিতে পারিপারি কিনা বলাে। জে পারেনএখন বলাে এত বড় একটা সংবাদ লুকায়ে রেখেছ কেন ?

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৭

তৈয়ব ছােট্ট করে নিঃশ্বাস ফেললকিছু বলল নাহারুন কড়া গলায় বলল, ফোস ফোস করে নিঃশ্বাস ছাড়বা নাবলাে, কী ব্যাপার

তৈয়ব শান্ত গলায় বলল, উনার মৃত্যুসংবাদ প্রচার করার আগে হাতিটা যে আমরা আগেই খরিদ করেছি এইটা প্রচার করা দরকারতা না হলে সবেই ভাববে হাতির মালিক মারা গেছে আর আমরা হাতি মেরে দিয়েছি। হারুন কিছু না বলে পরপর কয়েক দফা জিনের গ্লাসে চুমুক দিল ম্যানেজারের প্রতি এই মুহূর্তে অত্যন্ত প্রসন্ন বােধ করছে হারুন

প্রসন্ন ভাবটা সে গােপন রাখবে কী রাখবে না বুঝতে পারছে নাবড় একটা দল চালাতে হলে অনেক কিছু ভাবতে হয়বড় দল চালানাের কিছু কঠিন নিয়মকানুন আছে। একটা প্রধান নিয়ম হলাে দলের কারাে উপর খুশি হলে খুশি ভাব গােপন রাখতে হবেযার উপর খুশি তাকে তা কখনাে জানানাে যাবে নাতৈয়ব বলল, আমি যাইহারুন বলল, ঘটনা তাে কিছুই শুনলাম না, যাই যাই করছ কেন

হাতির অবস্থা ভালাে নাপশু ডাক্তারের সন্ধানে যাবসদরে একজন ভেটেনারি সার্জন আছেতাকে নিয়ে আসব। আচ্ছা যাওএকটা জিনিস শুধু খেয়াল রাখবা, আমি তােমার উপর বেজারযেকোনাে সময় লাথি দিয়ে তােমাকে দল থেকে বের করে দিবআমার এখানে কারাে চাকরিই পার্মানেন্ট নাআমি যে কাউকে এক সেকেন্ডের নােটিশে দল থেকে বের করে দিতে পারিনিজেকেও পারিআমিই সার্কাস দলের মালিক আমিই নিজেকে দল থেকে বের করে দিলামভালাে না ?

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৭

জি ভালাে। জামদানী মেয়েটাকে আমার কাছে পাঠাওহাতির বিষয়ে সে কী যেন কথা বলেছিল, কথাটা শুনি। ওরা ঘুমায়ে পড়েছে। ঘুম থেকে ডেকে তুলে পাঠাওদেশের যেমন বাদশা থাকেসার্কাস দলেরও বাদশা থাকেবাদশার হুকুম শুনতে হয়। তৈয়ব বের হয়ে গেলহারুন মাথায় ছােট্ট একটা চক্কর অনুভব করল নেশা জমে গেছেশরীর হালকা লাগছে

মনে ফুর্তির ভাব প্রবল হচ্ছেএই সময়টা খারাপএখন যদি দুঃখের কোনাে কথা মনে পড়ে তাহলে ফুর্তির বদলে মন ভরে যাবে দুঃখেতখন টপটপ করে চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকবেনেশা খুব খারাপ জিনিসশুরু হলাে আনন্দের জন্যে, শেষ হলাে দুঃখেভেউ ভেউ কান্নাচোখের পানি নাকের সর্দিতে মাখামাখিসর্বশেষ ঘর ভাসিয়ে বমি বমির উপর শুয়ে থাকা। 

জামদানী ঘরে ঢুকলসে কিছু বলার আগেই হারুন আনন্দিত গলায় বললকী খবর কী খবর কী খবর

নেশা ভালােমতাে ধরেছেনেশার নিয়ম হলাে ভালােমতাে ধরলে সব বাক্য তিনবার চারবার করে বলা হয়তারপরেও মনে হয় ঠিকমতাে বলা হলাে নাকিছু যেন বাকি থেকে গেল। জামদানী বলল, কী জন্যে ডেকেছেন

হারুন বলল, খুব জরুরি একটা কাজে ডেকেছিজরুরি কাজটা কী ভুলে গেছিদাঁড়ায়ে আছে কেন, বসাে। জামদানী বসলহারুন আগ্রহ নিয়ে বলল, নেশা করলে কী হয় জানাে? অল্প নেশা করলে স্মৃতিশক্তি বাড়েনেশা একটু বেশি হয়ে গেলে স্মৃতিশক্তি ধুপ করে পড়ে যায়আমারটা ধুপ করে পড়ে গেছে

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৭

আচ্ছা! মনে পড়েছেতুমি বলেছিলে হাতির কী অসুখ হয়েছে তুমি জানােসাপের অসুখের বিষয়ে যে জানে তাকে বলে সর্পরাজতােমার টাইটেল দিলাম হস্তিরানীহা হা হা। হারুন হাসতে হাসতে বিছানায় গড়িয়ে পড়ার মতাে অবস্থায় চলে গেলহাসি থেকে তার হেঁচকি উঠে গেলহেঁচকির ফাঁকে ফাঁকে বলল, বলাে দেখি হস্তিরানী, আমার হাতির অসুখটা কী

জামদানী শান্ত গলায় বলল, হাতিটার সন্তান হবে, প্রসব ব্যথা উঠেছেহারুন তীক্ষ্ণ গলায় বলল, কী বললা ? জামদানী বলল, হাতিটার সন্তান হবেহারুন বলল, উল্টা পাল্টা কথা বলে তুমি আমার নেশা কাটায়ে দিয়েছঅনেক কষ্টের নেশা, তৈরি করতে সময় লাগেযাও, ঘুমাতে যাওএকটা কথা মনে আসল আর বলে ফেললাএটা ঠিক নাতুমি হাতির লেডি ডাক্তার নাযাও আমার সামনে থেকে। 

হারুন অনেকদিন পর মনের আনন্দে নেশা করলজিনের পুরাে বােতল শেষ করার পর লুকিয়ে রাখা ভদকার একটা বােতল বের করা হলােএকা একা মদ্যপান করা যায় নাএখন হারুনের সঙ্গী কালুনেশাগ্রস্ত অবস্থায় কালুকে হারুনের বন্ধুর মতাে লাগছেসে যে বাবুর্চির অ্যাসিসটেন্ট, তার প্রধান কাজ চুলায় লাকড়ি দেয়া, খড়ি ফাড়াএটা আর মনে হচ্ছে না

বরং হারুনের মনে হচ্ছে কালু যথেষ্ট জ্ঞানী একজন মানুষতার সঙ্গে সুখ দুঃখের কথা যেমন আলাপ করা যায় তেমনি জটিল সমস্যার সমাধানও চাওয়া যায়। হারুন কালুর পিঠে হাত রেখে বলল, জহির সাহেবের মৃত্যুতে বড় কষ্ট পেয়েছিকালু বলল, কষ্ট পাওয়ার কথাকতদিনের পুরনাে চিনা জানা লােক| হারুন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, স্ত্রীপুত্রকন্যা কেউ নাই, একটা লােক ফুট করে মরে গেল

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৭

কালু বলল, এটা খারাপ নাদুঃখ করার কেউ নাই। হারুন বলল, দুঃখ করার একেবারে কেউ না থাকাটাও ঠিক নাএক দুইজন থাকবে, মৃত্যুর পরে ভেউ ভেউ করে কাঁদবে। কালু বলল, অবশ্যই। হারুন বলল, আমারও তাে জহির সাবের মতােই অবস্থাতারও কেউ ছিল নাআমারও কেউ নাইসেও ছিল হাতির মালিকআমিও হাতির মালিকএখন ইচ্ছা করতেছে ঘরসংসার করিবয়সটা হয়ে গেছে সমস্যা পাঁচপঞ্চাশ। 

কালু বলল, পাঁচপঞ্চাশ কোনাে বয়সই না। হারুন বলল, জামদানীর মতাে একটা মেয়ে পাওয়া গেলে ভালাে হতােখুবই ভালাে একটা মেয়েমাথায় সামান্য গণ্ডগােল আছেএটা থাকবেইসব ভালাে মানুষের মাথায় সামান্য গণ্ডগােল থাকে। কালু বলল, অতি সত্য কথাএকমাত্র আপনাকে দেখলামঅতি ভালােমানুষ কিন্তু মাথা পরিষ্কারমাথায় কোনাে গণ্ডগােল নাই। 

মাথায় গণ্ডগােল নাই তােমাকে কে বলল! গণ্ডগােল অবশ্যই আছেগণ্ডগােল না থাকলে নিজের মেয়ের মতাে যাকে বড় করেছি তাকে বিয়ে করতে চাইছিঃ ছিঃ, ভাবতেও লজ্জা। কালু বলল, আরেক গ্লাস খান, তাহলে লজ্জাটা কমে যাবেদাও, আরেক গ্লাসআজ বমি না হওয়া পর্যন্ত খাবযা থাকে কপালে। 

হারুন তার কথা রাখল, বমি করে ঘর ভাসিয়ে না দেয়া পর্যন্ত ক্রমাগত খেয়ে গেল রাত তিনটায় সে এবং কালু যখন নিজেদের বমির উপর অর্ধচেতন হয়ে পড়ে আছে তখন খবর এলােহাতির একটা মেয়ে বাচ্চা হয়েছেহারুন খবরটার গুরুত্ব কিছুই বুঝল নামাথা তুলে খবরটা শুনে আবারাে বমির উপর শুয়ে পড়ল

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৭

তিনজনই বােরকা পরেছে। পয়সার খুব মজা লাগছেসে সবাইকে দেখছে, তাকে কেউ দেখতে পাচ্ছে এখন মনের আনন্দে ঘােরাফেরা করা যায়কেউ বুঝবে না সে কেতবে ইবাদত নগর ছছাট জায়গাছােট জায়গায় বােরকা পরা তিনজন হাঁটাহাঁটি করছে এটা চোখে পড়বেইচোখে পড়লেও সমস্যা হবে নাকেউ গিয়ে এসে জিজ্ঞেস করবে না, আপনারা কে ? তারা যে সার্কাসের মেয়ে এটা কি বুঝবে ?

বুদ্ধি থাকলে বুঝবে। জামদানী বলল, আমার দম বন্ধ লাগে । পয়সা হাসতে হাসতে ভেঙে পড়ছে দমবন্ধ লাগার কথায় হাসির কিছু নেইপয়সার সমস্যা হলাে যখন তার মন ভালাে থাকে তখন যেকোনাে কথায় সে হাসেআজ তার মন ভালােমন ভালাে হবার প্রধান কারণহাতি তার বাচ্চার কাছে কাউকেই ঘেঁসতে দিচ্ছে নাশুধু পয়সার ব্যাপারে কিছু বলছে না

পুরাে সার্কাসের দলে পয়সা একমাত্র মেয়ে যাকে হাতি তার বাচ্চার কাছে যেতে দিয়েছেমজার ব্যাপার হলাে, হাতিটার সঙ্গে পয়সার ঘনিষ্ঠতাই সবচেকমআসমানী বলল, পয়সা, হাসি বন্ধ করখামাখা হাসিপয়সা বলল, খামাখা হাসি নাজাম বুবুর দমবন্ধ এই জন্যে হাসি। পয়সা জামদানীকে সংক্ষেপ করে ডাকে জাম বুবুজামের সঙ্গে মিলিয়ে আসমানীকে ডাকে আম বুবু

সবকিছুর একটা নাম দিয়ে দেয়ার প্রবণতা পয়সার আছেহাতির বাচ্চার নাম সে দিয়েছে এলংজামদানীর সঙ্গে এই নাম নিয়ে কথা কাটাকাটিও হয়েছেজামদানী বলেছে, এলংআবার কী নাম ? বাচ্চাটা এত সুন্দরসুন্দর একটা নাম দেপয়সা মুখ বাঁকা করে বলেছেসুন্দর নাম তুমি দাওআমি এরে ডাকব এলং

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৭

জামদানীর মেজাজ খারাপ হয়েছে, কারণ সে জানে যত সুন্দর নামই দেয়া হােক শেষপর্যন্ত পয়সার দেয়া নামই স্থায়ী হয়ে যাবেএত সুন্দর একটা জামদানী বাজিতে হেরে গেলহাতি আসমানী জামদানী কাউকেই কাছেআসতে দিচ্ছে না অথচ পয়সাকে কিছুই বলছে নাপয়সা তীক্ষ গলায় ডাকল‘এলং, এলংহাতির বাচ্চা হাতির চারপায়ের মাঝখানে লুকিয়ে আছেসেখান থেকে শুড় বের করে পয়সাকে ছুঁয়ে দিলপয়সা হেসে ভেঙে পড়েছেপয়সার সঙ্গে সঙ্গে দুবােনও হাসছে

তিনজনের হাসির শব্দ হারুন সরকারের মাথায় তীরের ফলার মতাে বিধছেসে চিৎকার করে বলল, হাসি বন্ধযদিও সে চিৎকার করছে কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনােই আওয়াজ বের হলাে নাতার অবস্থা খুবই খারাপযন্ত্রণায় মাথা ছিড়ে পড়ে যাচ্ছেরাতে সে বমির উপর পড়েছিলএখন বমি নেইকালু সব পরিষ্কার করেছে

ভেজা গামছা দিয়ে গা মুছিয়ে দিয়েছেএখনাে হারুন সরকারের মাথায় ভেজা গামছাশীতে শরীর কাঁপছেজ্বর আসার লক্ষণ। এই অবস্থায় মাথায় ভেজা গামছা রাখা ঠিক নাভেজা গামছার কারণে মাথার যন্ত্রণাটা সামান্য কম লাগে বলে গামছা সরানাে যাচ্ছে নাগায়ে চাদর দিয়ে দিলে শীতের কাঁপুনি বন্ধ হতােদিয়ে দিবে কে ?

কালু গেছে ডাক্তার আনতেহারুন সরকার চাপা গলায় ডাকল, কালু, কালু! সে জানে কালু আশেপাশে নেইতারপরেও তাকে ডাকার কারণ গলার স্বর ফিরে এসেছে কিনা তা পরীক্ষা করাগলার স্বর ফিরে নিফ্যাসফাস আওয়াজ বের হচ্ছেকেউ যে তাকে দেখতে আসবে সেই সম্ভাবনাও ক্ষীণযখনতখন তার ঘরে ঢােকা নিষেধ আছে মেয়ে তিনটা এখনাে হাসছেহাতির বাচ্চা দেখে হাসছে এটা বােঝা যাচ্ছেবাচ্চাটা এখনাে দেখা হলাে না

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৭

সবাই দেখেছে অথচ হাতির মালিক সেদেখে নিএটা বিরাট একটা আফসােসের ব্যাপারহাতির বাচ্চা এবং হাতির মা এই দুজনকে নিয়ে কোনাে একটা খেলা বের করতে হবেবল ছােড়াছুড়ি খেলামাহাতি একটা বল ছুড়ে মারল তার বাচ্চার দিকে, বাচ্চা সেই বল ফেরত পাঠাললাল রঙের বিরাট একটা বল লাগবেসেই বল খুব ভারী হলেও হবে নাআবার হালকা হলেও হবে নাহাতি অতি বুদ্ধিমান প্রাণী, যে কোনাে খেলা সে অতি দ্রুত শিখে ফেলেকেউ কেউ আবার নিজে নিজেও খেলা বের করে। 

হারুন সরকার কল্পনায় দেখছেহাতি এবং হাতির বাচ্চা লাল বল ছােড়াছুড়ির খেলা খেলছেএই কল্পনা করাটা ঠিক হয় নিকড়া লাল রঙ এখন মাথার ভেতর ঢুকে দপদপ করছেহারুন সরকার কল্পনায় বলের রঙ লাল থেকে নীল করলতাতে লাভ হলাে নারঙ বদলাল নাবরং আরাে গাঢ় হলােমাথার উপর রাখা ভেজা গামছা শুকিয়ে গেছেআবারাে ভিজিয়ে মাথার আমার কাছে গিয়ে দেখতে ইচ্ছা করছেএইটাই দরকারবুবু, স্পিড বােটগুলাে দেখেছ কত সুন্দর! সুন্দর না

জামদানী বলল, হুঁ সুন্দরপয়সা বলল, দেখে মনে হচ্ছে বিরাট মজার সার্কাসআসমানী বলল, উল্টাপাল্টা কথা বলিস না তাে পয়সাসার্কাস আর ব্রিজ তৈরি এক জিনিস

আমার কাছে এক জিনিসচল নৌকা ভাড়া করিআসমানী বলল, নাপয়সা বলল, তােমরা না গেলে আমি একা যাবসাহস থাকলে যা একা। তােমরা কি ভেবেছ আমার সাহস নেই ? তােমাদের ছাড়া একা যেতে পারব না ? আমি কিন্তু যেতে পারব। 

জামদানী বলল, পঞ্চাশ টাকা বাজি, যেতে পারবি না। পয়সা গটগট করে এগােচ্ছেএকবারও পেছনের দিকে তাকাচ্ছে নাজামদানী ভীত গলায় বলল, বুবু, সত্যি সত্যি চলে যাবে না তাে ?

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৭

আসমানী বলল, না, নদীর পাড় পর্যন্ত যাবেনৌকার মাঝিদের সঙ্গে কথা বলবেভাব করবে যেন সত্যি সত্যি নৌকায় উঠছে। যদি সত্যি সত্যি যায়

গেলে যাবেএকা একা নৌকা নিয়ে নদীর মাঝখান পর্যন্ত যাওয়ার সাহস থাকা তাে ভালােই। জামদানী বলল, চল আমরাও যাই। আমরা কী করবএখানে দাঁড়িয়ে থাকব

আয় এক কাজ করি, চায়ের দোকানটার আড়ালে চলে যাইযেন পয়সা আমাদের না দেখতে পায়যেন ভাবে আমরা তাকে ফেলে চলে গেছি। দুই বােন চায়ের দোকানের আড়ালে চলে গেল

 

Read more

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৮ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *