ভদ্রমহিলার আচার-আচরণ দেখে কিছুই বোঝা গেল না। সাড়ে চারটায় তাদের এক জায়গায় দাওয়াত আছে, তাড়াহুড়া করে চলে গেলেন। মনোয়ারার মন খারাপ হয়ে গেল। মেয়ে ওদের পছন্দ হয় নি। পছন্দ হলে চলে যাবার জন্যে এত ব্যস্ত হয়ে উঠত না। চা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কাঁপে চুমুক পর্যন্ত দিল না। ভদ্রতা করে হলেও কাঁপে একটা চুমুক দেবার দরকার ছিল। কালো মহিলাটি সারাক্ষণই নাক উঁচু করে ছিল। কপাল কুঁচকে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাকাচ্ছিল।নীলু, শাহানাকে নিয়ে ছবি তুলতে গেল সন্ধ্যার আগে আগে। দুটি ছবি তোলা হল। একটিতে নীলু এবং শাহানা। অন্যটিতে শুধু শাহানা। অনেকগুলি টাকা খরচ হল শুধু শুধু। ছবি ভালো আসবে কিনা কে জানে। স্টুডিওর মালিক এক জন বুড়ো লোক। সে চোখেই দেখে না ছবি তুলবে কী?
ফেরবার পথে শাহানা বলল, চল ভাবী, ফুচকা খাই। এখানে একটা ফুচকার গাড়ি আছে।কোথায়? আরেকটু সামনে যেতে হবে। চল যাই। ফুচকা খাবার পর আমরা একটু হাঁটব, কী বল? সন্ধ্যাবেলা শুধু শুধু হাঁটব কেন? আর এখানে হাঁটার জায়গা কোথায়? তোমার সঙ্গে আমার একটা কথা আছে তাবী। হাঁটতে হাঁটতে কথাটা বলব।এখনই বল।শাহানা শান্ত স্বরে বলল, তুমি ভাবী। খুব কায়দা করে শাড়ি পরিয়েছ। সাজগোজ করিয়েছ। ঐ মহিলা দুটি আমাকে দেখতে এসেছিলেন। ঠিক কিনা বল।ঠিক।আমি তো ভাবী তোমার মতো বুদ্ধিমান নই, সহজে কিছু বুঝতে পারি না। ওরা যে আমাকে দেখতে এসেছিলেন, সেটা বুঝলাম। এই অল্প কিছুক্ষণ আগে।নীলু হাসল। কিছু বলল না। শাহানা বলল, তোমরা আমাকে বিয়ে দেবার যত চেষ্টাই কর না কেন লাভ হবে না।তুমি বিয়ে করবে না?
যদি করি, করব আমার পছন্দমতো ছেলেকে।এমন কেউ কি পছন্দের আছে? শাহানা জবাব দিল না। তার ফর্সা গাল লাল হয়ে উঠেছে। শেষ সূর্যের আভায় বড়ো সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে। নীলু বলল, ছেলেটা কে শাহানা? শাহানা মাথা নিচু করে বলল, আমি যাকে বিয়ে করব সে খুবই সাধারণ একজন মানুষ। তোমরা কেউ তাকে পছন্দ করবে না।আমরা পছন্দ করব না, এমন কাউকে তুমি কেন বিয়ে করবে? কারণ আমি তাকে পছন্দ করি।ছেলেটি কে–আনিস? শাহানা জবাব দিল না। তার ভাসা ভাসা ঘন কালো চোখে জল চিক-চিক করতে লাগল। নীলু হালকা গলায় বলল, নিয়ে চল তোমার ফুচকার গাড়িতে। বেশি দূর নাকি?
পরবর্তী এক সপ্তাহে খুব দ্রুত কিছু ঘটনা ঘটল।সোমবার বাসায় টিভি এল। বার ইঞ্চি চমৎকার একটা টিভি। হোসেন সাহেব শিশুদের মত হৈচৈ শুরু করলেন। সন্ধ্যা থেকে রাত এগারটা পর্যন্ত টিভির সামনে থেকে নড়লেন না। মনোয়ারা কয়েক বার বললেন, এ রকম করছ, যেন টিভি কোন দিন চোখে দেখ নি।প্রথম দিকে মনে হচ্ছিল টিভি আনার ব্যাপারটা মনোয়ারা ঠিক পছন্দ করছেন না। কিন্তু ফিরোজা বেগমের গানের সময় তিনিও খুব আগ্রহ করে সামনে বসলেন। শুধু শফিক এল না। হোসেন সাহেব রাত দশটার খবরের সময় উঁচু গলায় ডাকলেন, আস সবাই, খবর হচ্ছে—খবর। যেন খবরটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, এটা শুনতেই হবে। শফিক তখনই শুধু বসল। খানিকক্ষণ। হোসেন সাহেব সারাক্ষণই বলতে লাগলেন, এত সুন্দর রিসিপশন আমি কোনো টিভিতে দেখি নি। আর কী সুন্দর সাউণ্ড!
মঙ্গলবার মনোয়ারাকে অবাক করে দিয়ে ফর্সা ও মোটা মহিলাটি বুড়ো এক ভদ্রলোককে সঙ্গে নিয়ে সকালবেলা উপস্থিত হলেন। তাঁরা দীর্ঘ সময় কথা বললেন হোসেন সাহেবের সঙ্গে! শফিকের অফিসে যাওয়া হল না। তাদের কথাবার্তায় নীলুর ডাক পড়ল না। মনোয়ারা শুধু অত্যন্ত উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলে গেলেন, ওদের শাহানাকে পছন্দ হয়েছে। সেদিনই বিকেলে একটি বিশেষ সময়ে নীলুকে যেতে হল নিউমার্কেটে। নীলুর সঙ্গে শাহানা। নীলুর ভান করতে হল যে সে বই কিনছে। শাহানা সারাক্ষণই অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে রইল এবং এক সময় বলল, যার আমাকে দেখার কথা, সে কি দেখেছে?
নীলু অন্য দিকে তাকিয়ে বলল, দেখাদেখির কোনো ব্যাপার এর মধ্যে নেই। বই কিনতে এসেছি, বই কিনে চলে যাব।কেন আমাকে মিথ্যা কথা বলছ ভাবী? কালো সুট পরা লোকটি এসেছিল আমাকে দেখতে।খুব সুন্দর না ছেলেটা? শাহানা জবাব দিল না। নীলু বলল, এমন চমৎকার ছেলের কথা শুধু গল্প উপন্যাসেই পড়া যায়। শাহানা গম্ভীর হয়ে রইল। সে রাতে ভাত খেল না। তার নাকি মাথা ধরেছে।নীলুর মনে হল বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে আর এগোন ঠিক না। কিন্তু ঘটনাগুলি ঘটছে খুব দ্রুত। এক সময় আর ফেরা যাবে না। রাতের বেলা সে শফিককে বলল, শাহানার এই বিয়েতে মত নেই।শফিক বিরক্ত হয়ে বলল, ওর মতামতটা চাচ্ছে কে? যে বিয়ে করবে, তার কোনো মতামত থাকবে না? ধর যদি অন্য কোনো ছেলের প্রতি তার কোনো দুর্বলতা থাকে, তখন?
কী যে বাজে কথা বল।ও যে-রকম মেয়ে, কোনো একটা কাণ্ডটাণ্ড করে বসতে পারে। কিছুই করবে না। আমি কথা বলব ওর সাথে।কখন? এখনই ডাক। কথা বলছি।থাক, আজ আর না বললেও হবে।আজ অসুবিধাটা কী? মাথা ধরেছে, শুয়ে আছে।তুমি বল, আমি ডাকছি। প্লীজ, আজ না। যা বলার অন্য এক দিন বলো।বৃহস্পতিবার সন্ধ্যাবেল ফস মোটা মহিলাটি অনেককে নিয়ে এলেন। তাদের সঙ্গে প্রচুর মিষ্টি। তারা শাহানার হাতে হীরে বসান একটি আঙটি পরিয়ে দিলেন। মনোয়ারা বললেন, মা, ইনাকে সালাম কর। শাহানা বাধ্য মেয়ের মতো সালাম করল।সেই রাতেই শফিক শাহানার সঙ্গে অনেক সময় ধরে কথা বলল। নীলু সেই আলোচনায় থাকল না।
কিন্তু লক্ষ করল, শাহানার মনের অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। অন্ধকার ভাবটা আর নেই।সহজভাবে টিভির সামনে এসে বসল। গানের ভুবন অনুষ্ঠানটি খুব আগ্রহ নিয়ে দেখল। সেখানে এক জন শিল্পীকে একটি মাছি বড়ো বিরক্ত করছে। বারবার মাছিটি গিয়ে বসছে তার নাকে। শিল্পী নির্বিকার থাকতে চেষ্টা করছেন, পারছেন না। দৃশ্যটি দেখে শাহানা অন্য সবার মতোই হাসতে হাসতে ভেঙে পড়ল। নীলুর মনে হল, শাহানাকে নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। এই বিয়েতে সে সুখীই হবে।অনেক রাতে শাহানা নীলুকে বলল, ভাবী, আঙটিটাি কি পরে থাকব, না খুলে বাক্সে তুলে রাখব? বাক্সে তুলে রাখার দরকার কী? এত দামী আঙটি হাত থেকে খুলে পড়ে যায় যদি! না, পড়বে না। আঙটিটা তোমার পছন্দ হয়েছে শাহানা?
শাহানা কিছু বলল না। নীলু নিঃশ্বাস ফেলে বলল, যাক, তোমার কল্যাণে হীরা দেখা হল। আমি হীরা আগে দেখি নি।শফিক অফিসে এসে শুনল, বড়োসাহেব সকাল আটটায় এসেছেন, কয়েক বার শফিকের খোঁজ করেছেন। তাঁর মেজাজ অবশ্যি ভালো। অন্য দিনের মতো চেঁচামেচি করছেন না। শফিক ঘড়ি দেখল, দশটা চল্লিশ। আজ তার অফিসে আসতে দেরি হল। এটা সে কখনো করে না। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, যে দিন সে দেরি করে আসে, বেছে বেছে সুরেনসেন ঠিক সেদিনগুলিতেই আসে।স্যার, মে আই কাম ইন? কাম ইন। কেমন আছ শফিক? ভালো।আজকের ওয়েদার কেমন চমৎকার, লক্ষ করেছ? ব্ৰাইট সানশাইন। কুল ব্রিজ।শফিক ব্যাপার কিছু পারল না। বাতাসে কোনো মিষ্টি গন্ধ নেই,
কাজেই বড়ো সাহেব প্রকৃতিস্থই আছেন। সকালবেলার চমৎকার ওয়েদার নিয়ে তাঁর কাব্যভাবের কোনো কারণ নেই। আজকের সকাল অন্য দিনের সকালের মতোই। আলাদা কিছু নয়।শফিক।বলুন স্যার।তুমি কি আমার প্রসঙ্গে কোনো গুজব শুনেছি? আমাকে নিয়ে দুটি গুজব প্রচলিত। একটি হচ্ছে, তোমাদের অফিসের একটি মেয়েকে বিয়ে করে ফেলছি। আমি এই গুজবটির কথা বলছি না। আমি বলছি অন্য গুজবটির কথা।না স্যার, আমি কিছু শুনি নি।ঠিকই শুনেছ। এখন প্রিটেণ্ড করছি। তাতে অবশ্যি কিছুই যায় আসে না।শফিক চুপ করে রইল। বড়োসাহেবের কথাবার্তা হেঁয়ালির মতো লাগছে।আমাকে হেড অফিস জানিয়েছে যে তারা মনে করছে। আমি এখানকার কাজকর্ম ঠিকমতো চালাতে পারছি না। কাজেই তারা আমার এক জন রিপ্লেসমেন্ট পাঠাচ্ছে।কবে?
এই সপ্তাহেই। তোমার জন্যে যে সুপারিশ আমি করেছিলাম, সেটিও বাতিল হয়েছে। কাজেই তুমি ফিরে যাবে তোমার আগের জায়গায়।শফিক সিগারেট ধরাল। সুরেনসেন শান্ত স্বরে বলল, আমার ব্যাপারে ওদের ডিসিশন ঠিকই আছে। আমি মোটামুটি একটি অপদার্থ। কিন্তু তোমার ব্যাপারে ওরা ভুল করল। আমি খুবই দুঃখিত। ঠিক আছে, তুমি এখন যাও। আমি চার্জ হ্যাণ্ডওভার করব, তার জন্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করতে সাহায্য কর।শফিক দীর্ঘ সময় তার ঘরে চুপচাপ বসে রইল। সুরেনসেনের বদলে অন্য কেউ এলে ভালো হবারই কথা।
এখানকার এ্যাডমিনিসটেশন অত্যন্ত দুর্বল। প্রায় এগারটার মতো বাজে, এখনো অফিসের সব কর্মচারী এসে উপস্থিত হয় নি। কর্মচারীদের আনা-নেয়ার জন্যে কোনোগাড়ি নেই। অথচ গাড়ির স্যাংশন হয়ে আছে দু বছর আগে। অত্যন্ত জরুরি ছাপ মারা ফাইলগুলিও সে ফেলে রাখবে সপ্তাহের পর সপ্তাহ। তার মুড আসছে না, কিংবা মাথা ধরেছে। কিংবা এই ব্যাপারটি নিয়ে সে আরো চিন্তা-ভাবনা করতে চায়।কিন্তু তবুও সুরেনসেন এক জন ভালো মানুষ। জগতের বেশির ভাগ অপটু মানুষরা সাধারণত ভালো মানুষ হয়ে থাকে, এর কারণ কি? নিজের অক্ষমতাকে ভালোমানুষী দিয়ে আড়াল করে রাখার একটা চেষ্টা কি?
সিদ্দিক সাহেব এসে ঢুকলেন। হাসি-হাসি মুখ। যেন এইমাত্র মজার কিছু ঘটে গেছে।কী শফিক সাহেব, সকালবেলাতেই মুখ এমন গম্ভীর কেন? বড়ো সাহেবের খবরে আপসেট নাকি? কিছুটা তো আপসেট বটেই।যাকে নিয়ে আপসেট, সে কিন্তু সুখেই আছে। সকালে এসে গুনগুন করে গান গাইছে। আসলে বাংলাদেশ থেকে বেরুতে পেরে ব্যাটা খুশি।তাই কি? তাই। নয়তো এতটা ফুর্তি হবার কথা না। বেল টিপুন, চা দিতে বলুন। আপনি কি অফিশিয়াল অর্ডার পড়ে দেখেছেন?না।
আছে আমার সঙ্গে। চা খাবার পর পড়ে দেখবেন।শফিক ব্যাপারটা বুঝতে পারল না। অফিস অর্ডার সিদ্দিক সাহেবের কাছে যাবে কেন? বুঝলেন শফিক সাহেব, এবার আমরা অফিস এ্যাডমিনিসটেসন টাইট করব। আপনার ফুল কো-অপারেশন দরকার। আমাদের নিজেদের সারভাইভেলের জন্যেই এটা দরকার। অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, এতে কোম্পানি বিজনেস গুটিয়ে ফেলবে। বিদেশী কোম্পানিগুলি এদেশে আসে কাঁচা পয়সা নিতে। ভ্যাকেশন কাটাতে তো আসে না। এদের পয়সা তৈরির সুযোগ করে দিতে না পারলে তো আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, কী বলেন?
শফিকের কাছে ব্যাপারটা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। হেড অফিস সিদ্দিক সাহেবের প্রমোশন দিয়েছে। অফিস অর্ডার তাঁর কাছে যাবার রহস্য হচ্ছে এই।শফিক সাহেব।বলেন।বড়োসাহেবের একটা জমকাল ফেয়ারওয়েল দেবার ব্যবস্থা করা যাক। এই দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে। ছোটখাট একটি ফাংশান, তারপর ডিনার। ফাংশান সবাই এ্যাটেণ্ড করবে, ডিনার শুধুমাত্র অফিসারদের জন্যে। এবং সবার তরফ থেকে তাঁকে আমরা একটা গিফটও দিতে চাই। কী দিলে ভাল হয় সেটা নিয়েও একটু চিন্তা করবেন। বাংলাদেশের ল্যাণ্ডস্কেপের উপর একটা অয়েলপেইন্টিং পাওয়া যায়। কিনা দেখতে হবে। আপনার চেনা-জানা কেউ আছে আটিস্ট? না।আমি অবশ্যি দু-এক জনকে চিনি। দেখব কি করা যায়।সিদ্দিক সাহেব প্ৰায় এক ঘণ্টার মতো বসলেন। তিনি সম্ভবত এই হঠাৎ আসা প্রমোশনের খবরে শফিকের কাছে লজ্জিত বোধ করছিলেন। লজ্জা ঢাকার জন্যেই বাসা।
শাহানাদের কলেজ আজ দুপুরবেলা ছুটি হয়ে গেল। ফাষ্ট্র। ইয়ারের একটি মেয়ে কুমিল্লা যাচ্ছিল বাবা-মার সঙ্গে। এ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। মারা গেছে তিন দিন আগে। খবর পাওয়া গেছে আজ। সেজন্যেই ছুটি এবং শোকসভা।শোকসভায় এক মিনিট নীরবতা পালন করা হল। ভাইস-প্রিন্সিপ্যাল সাহেব বক্তৃতা দিলেন। যার ভাবাৰ্থ হচ্ছে, সংসার অনিত্য, জনিলে মরিতে হবে। ভাইস প্রিন্সিপ্যাল সাহেবের লম্বা বক্তৃতা দেয়ার বদঅভ্যাস আছে। সুযোগ পেয়ে তিনি প্রায় পঞ্চাশ মিনিট কথা বললেন। খুবই বিরক্তিকর ব্যাপার।শাহানার সবচে প্রিয় বান্ধবী মিলি, ফিসফিস করে বলল, আগে আগে ছুটি হয়ে লাভটা কি হল? সেই তো সাড়ে বারটা বাজিয়ে ফেলেছে।শাহানা বলল, এখন দেখবি লীনা আপা বক্তৃতা দেবে।সর্বনাশ হবে তাহলে। লীনা। আপা ঝাড়া দু ঘণ্টা বলবে!
ওদের আজ নিউ মার্কেটে যাবার কথা। লীনা। আপা ডায়াসে গেলে সেটা সম্ভব হবে না। শাহানা অস্বস্তি নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। সম্ভবত আজ আপা কিছু বলবে না। ঘন ঘন ঘড়ি দেখছেন। তাঁরও নিশ্চয়ই কোথাও যাবার কথা। হলভর্তি ছাত্রী মুখ শুকনো করে বসে আছে। শোকসভা না হয়ে অন্য কিছু হলে এতক্ষণে স্যাণ্ডেল ঘষাঘষি শুরু হত। আজ তা করা যাচ্ছে না। দুঃখী-দুঃখী মুখ করে সবাই বসে আছে।শাহানার মন খারাপ করিয়ে লীনা আপা বক্তৃতা দিতে উঠলেন। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মানসী কাব্যগ্রন্থে একটি কবিতার…
শাহানা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। সূচনা দেখেই বোঝা যাচ্ছে এটা একটা লম্বা ব্যাপার হবে। অথচ যে মেয়েটি মারা গেছে তাকে এই আপা হয়তো চেনেনও না। কিন্তু কত ভালো ভালো কথা বলা হবে! এমনভাবে সবাই বলবে, যেন ঐ মেয়েটির মতো ভালো মেয়ে পৃথিবীতে জন্মায় নি। এবং তার মৃত্যুতে সবার একটা বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল। কোনো মানে হয়? শাহানার ঐ মেয়েটির উপর রাগ লাগতে লাগল। কী দরকার ছিল তার কুমিল্লা যাবার? শাহানা সময় কাটানোর জন্যে অন্য কিছু ভাবতে চেষ্টা করল। এই কাজটা সে খুব ভালো পারে। ক্লাসে কোনো লেকচার যখন তার পছন্দ হয়। না, তখন স্যারের দিকে তাকিয়ে থেকে সম্পূর্ণ অন্য জিনিস নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে। বেশ লাগে তার।
শাহানা ভাবতে লাগল বাসায় ফিরে গিয়ে কী করবে। করার কিছুই নেই। এমন নিরানন্দ জীবন। কিছুক্ষণ পড়াশোনা, টিভি দেখা, রাতের পর ঘুমানো, ব্যস। দিনের পর দিন একই রুটিন। এতটুকুও ভালো লাগে না, প্রায়ই ইচ্ছা করে কোথাও পালিয়ে যেতে। ছেলে হয়ে জন্মালে সে নিশ্চয়ই পালিয়ে যেত। মেয়ে হয়ে পালিয়ে যাওয়াও সম্ভব না। পত্রিকা খুললেই সেয়েদের নিয়ে এমন সব আজেবাজে খবর দেখা যায়। এসব খবর শাহানার পড়তে ভালো লাগে না। কিন্তু মা আবার বেছে বেছে সেই খবরগুলিই ভাবীকে পড়ে শোনাবেন।বৌমা, শুনে যাও, কী লিখেছে। মানুষ আর মানুষ নেই। জানোয়ার হয়ে গেছে। ফরিদপুরের নবগ্রামে তিন জন যুবক কর্তৃক এগারো বৎসর বয়েসী। কুলসুমকে… এসব খবর কি জোরে জোরে পড়ে শোনানের জিনিস?
কিন্তু মাকে বলবে কে? যতই দিন যাচ্ছে, মা ততই অন্য রকম হয়ে যাচ্ছে! কী বাজে স্বভাব যে তার হচ্ছে অবশ্যি এখন তার সঙ্গে মা খুব ভালো ব্যবহার করছে। যে মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে, তার সঙ্গে হয়তো খারাপ ব্যবহার করার নিয়ম নেই। আগে টুনীকে নিয়ে ছাদে গেলে এক শ বার জবাবদিহি করতে ছাদে গিয়েছিলি কেন? দিনের মধ্যে দশ বার ছাদে যাওয়া লাগে কেন? খবরদার, আর যেন না দেখি। এত বড়ো মেয়ে ছাদে ঘুরঘুর করবে: কেন? ছাদ কি হাওয়া খাবার জায়গা? এখন মা কিছুই বলে না। কয়েক দিন আগে কলেজ থেকে ফেরবার সময় গলির মাথায় আনিস ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। দু জন কথা বলতে বলতে আসছে। মা ব্যাপারটা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখল। এই নিয়ে কিছুই বলল না। অন্য সময় হলে এক লক্ষ প্রশ্ন করত।কী ?
