শাহানার বাসায় ফিরতে ফিরতে তিনটা বেজে গেল। বাসায় কেউ নেই, শুধু শফিক বসে আছে বসার ঘরে।ওরা কোথায় ভাইয়া?খিলগাঁয়।তুমি আজ এত সকাল-সকাল যে?এসে পড়লাম একটু আগে আগে।শরীর খারাপ নাকি? না, শরীর ভালোই আছে।আজ আমাদেরও সকাল সকাল ছুটি হয়েছে। ফার্স্ট ইয়ারের একটা মেয়ে মারা গেছে—এজন্যে ছুটি।কীভাবে মারা গেল? জানি না। এ্যাকসিডেন্ট না কি যেন হয়েছিল।শাহানা কাপড় বদলাতে গেল। বাড়িটা ফাঁকা বলেই কেমন অচেনা লাগছে। মনে হচ্ছে অন্য কোনো মানুষের বাড়ি। আর খিলগীয় যখন গিয়েছে, তখন রাত দশটা—এগারটার আগে ফিরবে না। শাহানার দারুণ মন খারাপ হয়ে গেল।
শাহানা, শাহানা।কী ভাইয়া? চা বানাতে পারিস? পারব না কেন, তুমি আমাকে কী ভাব? বানা এক কাপ চা।শাহানা অত্যন্ত উৎসাহে চা বানাতে গেল। রান্নাঘরে যাবার সে কোনো সুযোগ পায় না। মনোয়ারার কঠিন নিষেধ আছে। বিয়ের অ্যাগে রান্নাঘরে যাওয়া যাবে না। আগুনের আঁচে গায়ের রঙ নষ্ট হয়। রান্নাবামা যা শেখার বিয়ের পর শিখলেই হবে।শফিক চায়ের কাপ নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। শাহানা এল তার পিছু পছু।তোর গোলাপ গাছে অনেক ফুল ফুটেছে রে শাহানা।শাহানা হাসল। গাছের প্রসঙ্গে কেউ কোনো কথা বললেই শাহানার বড়ো ভালো লাগে।তোর গাছগুলি তুই শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যাবি, না রেখে যাবি আমাদের ?
কী যে তুমি বল ভাইয়া!শাহানার লজ্জা করতে লাগল। ভাইয়া গভীর ধরনের মানুষ, ঠাট্টা-তামাশা কখনো করে না। কিন্তু শাহানা লক্ষ করেছে, বিয়ের প্রসঙ্গে সে মাঝে মাঝে হালকা কথাবার্তা বলে।কয়েক দিন আগে তারা খেতে বসেছে। খাবার তেমন কিছু নেই। ভাইয়া হঠাৎ বলল, এত বড়ো লোকের স্ত্রী এক জন খেতে বসেছে, আর এই খাওয়া! শাহানার লজ্জায় মরে যাবার মতো অবস্থা। সবাই খুব হাসাহাসি করল। বাবার হাসি তো আর থামেই না। শেষটায় বিষম খেয়ে ফেললেন।আজ শফিকের মুখ অন্ধকার হয়ে আছে। একটু আগে সে ঠাট্টা করেছে। কিন্তু তাকে দেখে মনে হচ্ছে তার মন পড়ে আছে। অন্য কোথাও। শফিক বলল, তোর ভাবী কখন আসে? পাঁচটার মধ্যে এসে পড়ে। চারটা পর্যন্ত অফিস।ওদের গাড়ি এসে দিয়ে যায়।গাড়ি এসে দিয়ে যায়?
জানতাম না তো। আমাকে তো কিছু বলে নি!এই মাস থেকেই নিয়ে যাচ্ছে, দিয়ে যাচ্ছে।শাহানার মনে হল, শফিক আরো গম্ভীর হয়ে গেছে। এতে তো হবার কথা, গভীর হবে কেন? শাহানা বলল, ভাইয়া, আমি একটু ঘুরে আসি।কোথায় যাবি? ছাদে।ছাদ ফাঁকা। শাহানার মনে হচ্ছিল, আনিস ভাইকে তার ঘরে পাওয়া যাবে। কিন্তু ঘর তালাবন্ধ। কাপড় শুকোবার দড়িতে ধবধবে সাদা রঙের কয়েকটা কবুতর। এদের পোষ মানানো হচ্ছে ম্যাজিকে লাগবে। শাহানা কবুতরের খাঁচায় হাত রাখতেই একটি কবুতর ঘাড় বাঁকিয়ে তার হাতে ঠোকর দিল। এই বুঝি পোষ্যমান কবুতরের নমুনা!শাহানা একা এক ছাদে হাঁটতে লাগল। শীত লাগছে। ঠাণ্ডা বাতাস দিচ্ছে। কেমন মন খারাপ করিয়ে দেবার মতো একটা সন্ধ্যা নামছে। কোনো রকম কারণ ছাড়াই শাহানার চোখ ভিজে উঠতে শুরু করেছে। খাচার কবুতরগুলি আগ্রহ নিয়ে তাকে দেখছে।
ছাদ থেকেই দেখা গেল। রফিক আসছে। সে চার দিনের জন্যে যশোর গিয়েছিল। কেন গিয়েছিল, কী, কাউকে বলে যায় নি। চাকরির কোনো ব্যাপার হবে বোধহয়। আজকাল চাকরির ব্যাপারে সে কারো সঙ্গে কথা বলে না। শাহানা নিচে নেমে এল। রফিক তার দিকে তাকিয়ে হাসল। কেমন রোগা লাগছে রফিককে।কেমন আছেন শাহানা বেগম? ভালো আছি। তুমি কেমন? ভালোই।কেমন খুশি-খুশি লাগছে তোমাকে। চাকরি-টাকরি কিছু হয়েছে? না। আমার ঐসব হবে না। বিজনেস করব ঠিক করেছি। বাসায় কেউ নেই নাকি? না। খিলগাঁয়ে গিয়েছে। ভাবী এখনো ফেরেনি।চট করে চা বানা। খুব কড়া করে। হাই পাওয়ারড্ টী দরকার। কেউ কি আমার খোঁজ করেছিল? না কারোর খোঁজ করার কথা?
উঁহু।নীলু আজও ফিরতে দেরি করছে। সন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে-সাড়ে ছটা বাজে। এতটা দেরি করার কথা না। শফিক শাহানাকে বলল, তোর ভাবী কি দেরি হবার কথা কিছু বলে গেছে? না।প্রায়ই কি সন্ধ্যা পার করিয়ে আসে? না। বীণাদের বাসা থেকে অফিসে টেলিফোন করে দেখব? দরকার নেই।শাহানা বলল, আরেক কাপ চা বানিয়ে দেব ভাইয়া? না।শফিকের সিগারেট শেষ হয়ে গিয়েছে। কোনো কাজের মানুষ নেই বাড়িতে। রফিককে বললে সে এনে দেবে। বলতে ইচ্ছা করল না। শফিক নিজেই চাদর গায়ে দিয়ে বেরুল। শাহানা বলল, যাচ্ছ কোথায় ভাইয়া? সিগারেট কিনব।আমিও আসি তোমার সাথে?
আয়।সারাটা পথ শাহানা কথা বলতে বলতে যাচ্ছে। শফিক হাঁটছে। অন্যমনহঙ্ক ভঙ্গিতে। শাহানা কী বলছে, তার কানে যাচ্ছে কিনা সন্দেহ। সে অবশ্যি হ্যাঁ হুঁ দিয়ে যাচ্ছে।ভাবীর সঙ্গে তুমিও চলে যাও না কেন সুইডেনে। সে যা এ্যালাউন্স পাবে তাতে তোমরা দু জন দিব্যি থাকতে পারবে। আমরা রাখব টুনীকে। কোনোই অসুবিধা হবে না। তা ছাড়া টুনী তো রাতে থাকে। বাবার সাথে। তোমাদের জন্যে সে খুব কাঁদবে-টাদৈবে বলে মনে হয় না। আসবার সময় তার জন্যে একগাদা খেলনা নিয়ে আসবে। শোন ভাইয়া, বিদেশে ডিল হাউস বলে একটা খেলনা পাওয়া যায়। যা সুন্দর। চমৎকার একটা বাড়ি। সব রকম আসবাবপত্র আছে। এমনকি বাথরুমে বেসিন, কমোড সব আছে। ঐ একটা নিয়ে আসবে।
শফিকের মনে হল, শাহানা মানসিক দিক দিয়ে এখনো বড় হয় নি! ছোটই রয়ে গেছে। হুঁট করে তার বিয়ে ঠিক করাটা বোধহয় ভালো হয় নি।ভাইয়া, সিগারেট কিনেই কি তুমি বাসায় চলে আসবে? হ্যাঁ, কেন? চল না। ঐ বাসষ্ট্যাণ্ড পর্যন্ত যাই।সেখানে কী?ভাবীর মাইক্রোবাস সেখানে থামে। তাবী বাস থেকে নেমেই আমাদের দেখবে। খুব অবাক হবে। যাবে ভাইয়া? চল যাই।দু জনে হাঁটতে শুরু করল। শাহানা মৃদুস্বরে বলল, তোমাকে একটা গোপন খবর দিতে পারি ভাইয়া! কী খবর? খুবই গোপন। কাউকে কিন্তু বলতে পারবে না।গোপন খবর হলে না-বলাই তো ভালো। গোপন খবর তো বলে দেয়ার জন্যে না।শাহানা চুপ করে গেল। ভাইয়ার সঙ্গে অন্য কোনো মানুষের কোনো মিল নেই।
অন্য কেউ হলে বলত, কাউকে বলব না, খবরটা কী বল। ভাইয়া সেটা বলবে না। শাহানার খুব ইচ্ছা করছে খবরটা বলে। ভাবী সতের শ টাকা দিয়ে একটা ঘড়ি কিনেছে শফিকের জন্যে। ম্যারেজ এ্যানিভারসারি উপলক্ষে সেটা শফিককে দেওয়া হবে। এই হচ্ছে খবর।ঘড়ি কেনার সময় নীলু শাহানাকে নিয়ে গিয়েছিল। শাহানা অবাক হয়ে বলেছিল, এত দাম দিয়ে ঘড়ি কিনবে! নীলু লাজুক হেসে বলেছে, ওকে ভালো কিছু দিতে চাই।কিন্তু ভাইয়া তো তোমাকে কখনো কিছু দেয় নি।কোত্থেকে দেবে? ওরা কি টাকা আছে?
টাকা থাকলেও দিত না। এসব দিকে তার কোনো নজরই নেই। কথাটা খুবই সত্যি। গত ম্যারেজ এ্যানিভারসারিতে নীলু, দুপুরবেলা শফিকের অফিসে উপস্থিত হল। শফিক অবাক হয়ে বলল, কী ব্যাপার, তুমি! নীলু হেসে বলেছে, এমনি দেখতে এলাম কী করছ।শুধু শুধু আসবে কেন? নিশ্চয়ই কোনো কাজ আছে। টুনীকে কার কাছে রেখে এসেছ? কার কাছে আর রাখব, মার কাছে। তুমি কি আজ ছুটি নিতে পার? কেন? খিদে লেগেছে খুব। কোনো একটি রেস্টুরেন্টে বসে লাঞ্চ খাওয়া যেত। আজকের তারিখটা তোমার মনে নেই, তাই না?
তারা প্ৰায় আধা ঘণ্টার মতো দাঁড়িয়ে রইল। নীলুর বাস এল না। শফিক বলল, চল যাই, ঠাণ্ডা লাগছে।একটু দাঁড়াও ভাইয়া, এসে পড়বে।শফিক কোনো জবাব না দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। শাহানা বলল, আর একটুখানি থাকি না ভাইয়া। আমার মনে হচ্ছে পাঁচ-দশ মিনিটের মধ্যে এসে পড়বে।আসুক। দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছে না।এল নটার একটু আগে। তাদের এক কলিগ অফিস ছুটির আগে আগে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। অফিসের মিনিবাসে করে তাকে শেরে বাংলা হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। অন্য সবাইও গিয়েছে সেখানে। ডাক্তাররা বললেন, হাট এ্যাটাক। ভদ্রলোকের এখনো জ্ঞান ফেরে নি। তার স্ত্রী এবং দুটি ছেলে হাসপাতালে এসে খুব কান্নাকাটি করছে।
শফিক কোনো রকম উৎসাহ দেখাল না। ঠাণ্ডা গলায় বলল, খবর তো দেবে।কীভাবে দেব খবরটা? সারাক্ষণ তো হাসপাতালে ছিলাম।তুমি তো হাসপাতালে থেকে কিছু করতে পারছিলে না। শুধু শুধু আমাদেরকে দুশ্চিন্তায় ফেললে।এক জন কলিগের এত বড়ো দুঃসময়ে আমি যাব না? শফিক গম্ভীর গলায় বলল, তৰ্ক পরে করবে, এখন দেখ খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। কিনা। রান্নাবান্না কিছুই তো হয় নি।নীলুর প্রচণ্ড মাথা ধরেছিল। সে মাথাধরা নিয়েই রান্নাঘরে ঢুকল। শাশুড়ি খাওয়াদাওয়া শেষ করে ফিরবেন। কিনা কে জানে।দুপুরের তরকারি নেই। রাতের বেলার জন্যে কী রাঁধবে, নীলু ভেবে পেল না। রফিককে ডিম কিনে আনার জন্যে পাঠাতে হবে।
রফিক ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে। নীলু ডাকতেই সে ক্লান্তস্বরে বলল, ভাবী, আমার জ্বর। হঠাৎ করে জ্বর এসে গেছে। বিশ্বাস না হলে কপালে হাত দিয়ে দেখ।নীলু আনিসের খোঁজে ছাদে গেল। আনিস ছিল না! নীলু ফিরে এল মন খারাপ করে। ডাল-ভাতই খেতে হবে। রান্নাঘরে ঢুকতে ইচ্ছা করছে না, খুব ক্লান্তি লাগছে। নীলু, শাহানাকে ডেকে বলল, তুমি রফিকের পাশে বসি, মাথায় হাত-টাত বুলিয়ে দাও। ওর জ্বর।শাহানার ইচ্ছা করছিল নীলুর সঙ্গে গল্প-টল্প করে। কিন্তু সে গেল রফিকের ঘরে। জ্বরে সত্যি সত্যি রফিকের গা পুড়ে যাচ্ছে। শাহানা বলল, চুল টেনে দেব? রফিক বলল, চুল ধরে টানাটানি করার কোনো দরকার নেই। তুই নিজের কাজে যা।জ্বরের সময় কোনো একটা কথা কানে গেলে সেটা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। চুল টানার ব্যাপারটা রফিকের মাথায় ঘুরতে লাগল। তার মনে হতে লাগল। তিন-চার জন অল্পবয়েসী মেয়ে একঘেয়ে গলায় তার কানের
কাছে চেঁচাচ্ছে–
চুল টানা, বিবিয়ানা
সাহেব বাবুর বৈঠকখানা।
সাহেব বলেছে যেতে
পান সুপারি খেতে
পানের ভেতর মৌরি বাটা।
ইস্ক্রুপের চাবি আঁটা।।
চুল টানা বিবিয়ানা
চুল টানা বিবিয়ানা।
হোসেন সাহেবরা এলেন রাত এগারটায়। সে-সময় রফিকের মাথায় পানি ঢালা হচ্ছে। গ্রিন ফার্মেসির ডাক্তার অজয় বাবু চিন্তিত মুখে বসার ঘরে বসে আছেন। আনিস আছে, রশিদ সাহেব আছেন। জ্বর উঠেছে এক শ পাঁচ পর্যন্ত। রফিক বিড়বিড় করে ছড়াজাতীয় কী যেন বলছে। শাহানার বুক ধড়ফড় করছে। একি কাণ্ড! সুস্থ মানুষ। এসে চা খেল, গোসল করল আর ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে আকাশ-পাতাল জ্বর! মনোয়ারা কাঁদতে শুরু করলেন। হোসেন সাহেবের মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেল। অজয় বাবু বললেন, ভয়ের কিছু নাই, জ্বর রেমিশন হবে। অস্থির হবার কিছু নাই।রাত তিনটার দিকে রফিকের জ্বর অনেকখানি কমল। সে উঠে বসে স্বরে বলল, কিছু খেতে— টোতে দাও ভাবী। মুড়ি ভেজে আন ঝাল দিয়ে।নীলু ঘুমুতে গেল রাত চারটার দিকে। শফিক তখনো জেগে আছে। নীলু ক্লান্ত স্বরে বলল, ঘুমুবে না? রাত তো বেশি বাকি নেই, ঘুমিয়ে কী হবে?
আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না।শুয়ে পড়।নীলু শুয়ে পড়ল। টুনী আজ তাদের সঙ্গে ঘুমিয়েছে। অনেক বড়ো হয়ে গেছে মেয়েটা। দেখতে দেখতে কেমন বড়ো হয়ে যাচ্ছে। নীলু টুনীকে বুকের কাছে টেনে আনল। টুনী ঘুমের মধ্যেই মাকে জড়িয়ে ধরল। আহা, সারা দিন দেখা হয় নি মেয়েটিকে। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করেছে কিনা কে জানে। কেমন রোগা— রোগ লাগছে হাত-পা। কপালের কাছে লাল একটা দাগ, ফুলে উঠেছে। পড়ে গিয়ে ব্যথাট্যাথা পেয়েছে নিশ্চয়ই। নীলু চুমু খেল কপালের কাটা দাগে।শফিক বাতি নিভিয়ে ঘুমুতে এল। নীলু বলল, টুনী কেমন ব্যথা পেয়েছে দেখেছ? কপাল ফুলে উঠেছে।
শফিক কিছু বলল না। নীলু বলল, আরেকটু হলে চোখে লাগত।যাদের বাবা-মা দুজনেই ব্যস্ত তাদের ছেলেমেয়েরা অবহেলার মধ্যেই বড়ো হবে। এটা নিয়ে দুঃখ করা ঠিক না। তুমি ঘুমাও।নীলু মৃদুস্বরে বলল, আমার চাকরিটা তোমার পছন্দ না, তাই না? শফিক চুপ করে রইল।বল, তোমার কি ইচ্ছা না। আমি চাকরি করি? শফিক শান্ত স্বরে বলল, আমার কাছে মনে হয়, পরিবারের প্রতি মেয়েদের দায়িত্ব অনেক বেশি।সেই দায়িত্ব আমি পালন করছি না? রাত-দুপুরে এ নিয়ে তর্ক করতে ভালো লাগছে না।তর্ক না। তোমার মতামতটা শুনি।মতামত তো দিলাম। টুনী বড়ো হচ্ছে অযত্ব অবহেলায়। যার ফল হিসেবে তার মানসিক বিকাশ অন্যসব শিশুদের মতো হবে না।টুনীর মানসিক বিকাশ হচ্ছে না?
আমি ইন জেনারেল বলছি। চাকরিজীবী মহিলার কাছে ঘর-সংসারের চেয়ে তাদের ক্যারিয়ারই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। অফিসের এক জন কলিগের অসুস্থতা তার কাছে বিরাট ব্যাপার মনে হয়। যেমন তোমার উদাহরণটাই ধরা যাক।আমার কী উদাহরণ? সুইডেনের ব্যাপারটায় তুমি কী রকম উল্লসিত হয়ে উঠলে। এক বারও ভাবলে না, এই ছয় মাস টুনী কীভাবে থাকবে।ভাবি নি তোমাকে কে বলল? ভাবলেও সেটাকে তেমন গুরুত্ব দাও নি। পাসপোর্ট করা, এই করা সেই করাতেই ব্যস্ত।তুমি চাও না। আমি যাই? শফিক, জবাব দিল না।বল তুমি চাও না? না।চাকরি করি, তাও চাও না?
আমি না-চাইলেই তুমি ছেড়ে দেবে? তা পারবে না। এক বার যখন ঢুকেছ, সেখান থেকে কিছুতেই বেরুতে পারবে না। সংসার যদি ভেসে যায়, তাতেও না।এতটা নিশ্চিত হয়ে কথা বলছি কীভাবে? নিশ্চিত হয়ে বলছি, কারণ আমি জানি। যে মেয়ে চাকরি করে, সে কিছু পরিমাণে স্বাধীন। সেই স্বাধীনতা কোনো মেয়েই ছাড়বে না। সে সংসার ছেড়ে দেবে, কিন্তু স্বাধীনতা ছাড়বে না।মেয়েরা স্বাধীন হোক, সেটা তুমি চাও না? শফিক বলল, যথেষ্ট তর্ক হয়েছে, এখন ঘুমুতে যাও।নীলু ঘুমতে পারল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফজরের আজান শোনা গেল। ভোর হচ্ছে। শুরু হচ্ছে আরেকটি দিন। এই দিন অন্যসব দিনের মতো নয়। এটি একটি বিশেষ দিন। এই দিনে সাত বছর আগে তাদের বিয়ে হয়েছিল।
বৈশাখ মাস।আকাশে মেঘা জমতে শুরু করেছে। ধরন দেখে মনে হয় কালবৈশাখী হবে। পাখিরা অস্থির হয়ে ওড়াউড়ি করছে। ওরা টের পায়। কবির মাস্টার দ্রুত পা চালাচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে আছে শওকত। শওকতের মাথায় বিছানার চাদর দিয়ে বাঁধা গাদাখানেক বই। বইগুলি যোগাড় হয়েছে নীলগঞ্জ পারলিক লাইব্রেরির জন্যে। পারলিক লাইব্রেরি আপাতত তাঁর শোবার ঘরে। খুব শিগগিরই ঘর তোলা হবে। জমি খানিকটা পেলেই হয়। জমি পাওয়া যাচ্ছে না!কবির মাস্টার আকাশের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত স্বরে বললেন, তাড়াতাড়ি পা চালা শওকত। তুই দেখি বইগুলি ভেজানোর মতলব করছিস!আর কত তাড়াতাড়ি যাইতাম কিন? আমি তো আর ঘোড়া না। মাথার উপরে আছে তিনিমুণি বোঝা।
লম্বা লম্বা পা ফেল রে বাবা। বই ভিজিলে সৰ্ব্বনাশ!লম্বা লম্বা পা ফেলেও রক্ষা হল না। কালী মন্দিরের কাছাকাছি আসতেই চেপে বৃষ্টি এল। সেই সঙ্গে প্রচণ্ড বাতাস। তারা ছুটতে ছুটতে কালী মন্দিরে উঠল। মন্দিরটি জরাজীর্ণ। পূজা-টুজা হয় না। দীর্ঘ দিন। কালীমূর্তির মাথা নেই। মন্দিরের চাতাল গোবরে ভর্তি। কবির মাস্টারের এক পা গোবরে ড়ুবে গেল।এহ, কী কাণ্ড রে শওকত!পাকা দালানের বাড়ি। ছাদ ফেটে গেছে। পানি আসছে ভাঙা ছাদ থেকে। শওকত বলল, হাত তালি দেন স্যার।কেন?
জায়গাটা সাপে ভর্তি।বলিস কী!দুইটা ছাগল মরাল সাপের কামড়ে।আরো ব্যাটা, আগে বলবি তো!কবির মাস্টার এই একটি প্রাণীকে ভয় করেন। এই প্ৰাণীটির সঙ্গে কেন যেন তাঁর বারবার দেখা হয়।শওকত! জ্বি স্যার।চল, রওনা দিই।এই তুফানের মইধ্যে কই যাইবেন? জবর তুফান হইতাছে।বাতাসের বেগক্রমেই বাড়ছে। মন্দিরের দরজা-জানালা কিছু নেই। বৃষ্টির ঝাপটায় দু জনেই কাকতেজা হয়ে গেল। কবির মাস্টার একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। এক কালে কত জাঁকজমক ছিল মন্দিরের। প্রতি অমাবস্যায় ঢাক-ঢোল বাজিয়ে পূজা হত। এখন কিছুই হয় না। গরু-ছাগল চরে বেড়ায়। বিত্তশালী হিন্দুদের কেউই নেই। সবার ধারণা হয়েছে, সীমান্ত পার হতে পারলেই মহা সুখ।পালবাবুরা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর একটি ছেলে মারা গেল।
পালিয়ে যাবার সময় তাঁর বড়ো ছেলের বৌ বরুণা রহস্যময়ভাবে মিলিটারিদের হাতে পড়ল। তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। মেয়েটি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে!পালবাবু প্ৰায় জলের দরে বিষয়সম্পত্তি বিক্রি করলেন। সবাই বলল, এখন আর ভয় কী? এখন কেন যাবেন? পালবাবু থাকলেন না। দেশ ছাড়ার আগে কবির মাস্টারকে বলে গেলেন, মাস্টার, বসতবাড়ি আর দশ বিঘা ধানী জমি বিক্রি করি নাই, এইগুলি আমি তোমারে দিয়া যাইতাছি।কবির মাস্টার অবাক হয়ে বললেন, কেন?
আমার বৌমা যদি কোনো দিন আসে এগুলি তুমি তারে দিবা। আমার কেন জানি মনে হয় বৌমা বাঁইচা আছে। সে একদিন-না-একদিন আসব নীলগঞ্জে।সে বেঁচে আছে, এটা মনে করার কারণ কী? আমি স্বপ্নে দেখছি মাস্টার।সে যদি আসে, আমি নিজে পৌঁছে দেব আপনার কাছে।না মাস্টার, তার দরকার নাই।কেন? দরকার নেই কেন?
পালবাবু জবাব না দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।বরুণা ফিরে আসে নি। দশ বিঘা জমি এবং বসতবাড়ি আছে আগের মতোই। এক বার ফজল মিয়া দলিল বের করল একটা, বসতবাড়ি এবং জমি তাকে দলিল করে দিয়ে গেছে। পালরা। সেই দলিল আদালতে টিকল না। কিছু দিন হল ফজল আলির ভাগ্নে মিম্বর মিয়া একটি হ্যাণ্ডনেট বের করেছে, যার মর্মার্থ হচ্ছে, উনিশ শ সত্ত্বর সনে পালবাবু তার কাছে এগার হাজার বত্ৰিশ টাকা কার্জ নিয়েছে। সে টাকা শোধ হয় নি। টাকা শোধ কিংবা অনাদায়ে বাড়িঘর নিলামে তোলার জন্যে সে চেষ্টা-তদবির করছে।
