খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, কবির মাস্টারের মৃত্যু এ বাড়ির কাউকে তেমন স্পর্শ করল না। রফিক তার নতুন অফিস, নতুন ব্যবসা নিয়ে অসম্ভব ব্যস্ত। ভোরবেলা বেরিয়ে যায় ফেরে। অনেক রাতে। শফিকেরও এই অবস্থা। তার দায়িত্ব দিন-দিন বাড়ছে। সালফিউরিক অ্যাসিড প্লান্টের কাজ এগুচ্ছে দ্রুতগতিতে। শফিকের বেশির ভাগ সময়ই চলে যাচ্ছে সেখানে। যখন বাসায় ফেরে, এমন ক্লান্ত থাকে যে ভাত খেয়ে বিছানায় যেতে-না-যেতেই ঘুমে চোখজড়িয়ে আসে।দায়িত্ব বেড়েছে নীলুরও। সে একটি প্রমোশন পেয়েছে। অফিসে তার এখন ঘর আলাদা। ঘরের সামনে টুল পেতে এক জন বেয়ারা বসে থাকে। অফিসের নানান সমস্যা নিয়ে তাকে প্রতিদিনই মিটিং করতে হয়। এতসব ঝামেলা তার আগে ছিল না।
হোসেন সাহেবও ব্যস্ত। তিনি একটি বই লেখার কাজে হাত দিয়েছেন, বইটির নাম সহজ হোমিওপ্যাথি যে-সব ডাক্তার গ্রামে চিকিৎসা করেন, বইটি লেখা হচ্ছে তাঁদের উদ্দেশ্য করে। কাজেই লিখতে হচ্ছে খুব সহজ ভাষায়। তিনি জোর দিচ্ছেন কেইস হিস্ট্রিতে। প্রতিটি রোগের জন্যে বেশ কয়েকটা কেইস হিস্ট্রি দিতে হচ্ছে। সে-সব খুঁজে বের করতে সময় নিচ্ছে। বেশ কিছু হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের সঙ্গেও তিনি যোগাযোগ করছেন। তাদের এ ব্যাপারে তেমন আগ্রহ নেই। এতে হোসেন সাহেবের উৎসাহে ভাঁটা পড়ছে না।মনোয়ারা আগের তুলনায় খানিকটা শান্ত। কাজের একটি মেয়ে রাখা হয়েছে, নাম-নাজমা। তাঁর বেশির ভাগ সময়ই কাটছে নাজমার খুঁত ধরে। এই মেয়েটার কোনো কিছুই তাঁর পছন্দ নয়। নামাটাও অপছন্দ।
তাঁর ধারণা, নাজমা হচ্ছে ভদ্রলোকের নাম। কাজের মেয়ের এ-রকম নাম থাকবে কেন? নাজমা মেয়েটির বয়স আঠার-উনিশ। এইটিও তাঁর পছন্দ নয়। এই বয়সের মেয়ে ঘরে রাখা মানে আগুন ঘরে রাখা। কোনো দিন কী-এক ঝামেলা বাধাবে, ছিছি পড়ে যাবে চারদিকে। মনোয়ারার বেশির ভাগ সময় এখন কাটছে কী করে মেয়েটিকে তাড়ানো যায়, এই বুদ্ধির সন্ধ্যানে। তেমন কোনো পথ পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ নাজমা মেয়েটি খুবই কাজের। অতি অল্প সময়েই সে নিজেকে অপরিহার্য করে তুলেছে। তবু মনোয়ারা চেষ্টার ত্রুটি করছেন না। আজ ভোরবেলা তিনি রাগে কাঁপতে-কাঁপতে বললেন, এই, তুই ঘর মুছলি কেন? সকালবেলা পানি দিয়ে ঘর ভাসিয়ে ফেলেছিস।
নাজমা সহজ স্বরে বলল, আপনেই তো কইছিলেন দাদী।আমি কখন বললাম? আপনে কইছিলেন সপ্তাহে একদিন ঘর এ তোর ঘর ধোয়ার নমুনা? পানিতে চারদিক ছয়লাপ।কই দাদী, পানি তো নাই। শীতের দিনে পানি শুকায় তাড়াতাড়ি।আসলেই তাই, ইতোমধ্যেই চারদিক শুকনো খটখট করছে। মনোয়ারা কিছুতেই মেয়েটিকে জব্দ করতে পারেন না। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েন না। তীক্ষ্ণ নজর রাখেন, যদি বেচাল কিছু চোখে পড়ে।এই, তুই কোথায় ছিলি এতক্ষণ? ছাদে গেছিলাম দাদী।তোকে না বললাম ছাদে যাবি না। ব্যাটাছেলে থাকে।কাপড় শুকাতে গেছিলাম।কাপড় শুকাতে সারা দিন লাগে? গেলাম আর আসলাম দাদী, বেশিক্ষণ তো থাকি নাই।আবার মুখে-মুখে কথা। তুই কি মনে করিস তোর মতলব আমি বুঝি না? আমি কচি খুকি? বিশ্বাস করেন। দাদী, আমার কোনো মতলব নাই। তুই কাল সকালেই বিছানা-বালিশ নিয়ে বিদায় হবি। আমার পরিষ্কার কথা।সত্যি যাইতে বলেন দাদী?
আমি কি তোর সাথে মশকরা করছ? ফাজিল কোথাকার! বড়ো বৌমা আসুক, তোকে আমি আজই বিদায় করব। পাখা উঠেছে!নীলু এই মেয়েটির বিদায়ের কথা শুনতেই পারে না। নাজমা তাকে অনেকভাবে নিশ্চিন্ত করেছে, নীলু এই সুখ হারাতে রাজি নয়। উল্টো মেয়েটার কাছে তার নিজেকে কেমন অপরাধী মনে হয়। যে-সংসার তার দেখার কথা, তা দেখছে সংসারের বাইরের এক জন মানুষ। মমতা এবং ভালোবাসা নিয়েই দেখছে। এটা যেন ঠিক নয়, অন্যায়।আগে সংসারের অনেকখানি দায়িত্ব শারমিন পালন করত। তার দায়িত্বও কমেছে। সে এখন পুরো সময় দিচ্ছে পড়াশোনায়।ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির অ্যাসিসটেন্টশিপের চিঠি এসেছে। ভিসার জন্য আই টুয়েন্টি তারা পাঠিয়েছে, এখনও এসে পৌঁছায় নি। এখন আর সময় নষ্ট করার উপায় নেই। শারমিন রাত-দিন পড়ে। রফিক দেখে, কিছু বলে না। তারা দুজন এমনভাবে জীবন যাপন করে, যেন কেউ কাউকে চেনে না।
এই পরিবারের সব কটি মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলে দিল শওকতের একটা চিঠি-কবির মাস্টারের কুলখানি। সবই যেন আসে। সে থাকার ব্যবস্থা গরিবি হালতে করে রেখেছে।কারোরই যাওয়ার ইচ্ছা নেই। অনিচ্ছার বিষয়টাও তারা চেপে রাখতে চায়। এই ব্যাপারটা নীলুর মন খারাপ করে দিল। এ-রকম কেন হবে? যে-মানুষটি এ পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্যে গাঢ় ভালবাসা পোষণ করেছেন, তাঁর মৃত্যু উপলক্ষ করে এরা কেউ সামান্য ত্যাগ স্বীকার কেন করবে না? এক দিন সে রফিককে কথায়-কথায় জিজ্ঞেস করাল, কবে যাচ্ছ রফিক? রফিক খুব অবাক হয়ে বলল, কোথায় যাব? মামার কুলখানিতে যাবে না?
মামার কুলখানি তো দূরের কথা, আমার নিজের কুলখানি হলেও যেতে পারব না।তোমার কি মনে হয় না, যাওয়া উচিত? না। এসব লোকদেখানো ব্যাপার। মারা গেল ফুরিয়েগেল। আর কী? তাই বুঝি।হ্যাঁ, তাই। তা ছাড়া এসব কুলখানি হচ্ছে হিন্দুয়ানি ব্যাপার। হিন্দুরা যেমন মৃত্যুর পর শ্ৰাদ্ধ করে, ওদের দেখাদেখি আমরা কুরি কুলখানি।ধর্মজ্ঞানও তোমার হয়েছে মনে হয়।তুমি এমন করে তাকাচ্ছ কেন ভাবী? আমার শতেক ঝামেলা। আমি পারছিনা।শফিকও যাবে না। সে ছুটির চেষ্টা করেছিল। টলম্যান ছুটি দেয় নি। বলেছে।–অসম্ভব। আগামী দু মাস কোনো ছুটি নেই। সামনের মাস থেকে শুক্রবারেও তোমাকে কাজ করতে হবে।
শফিক মনে হল এতে খুশিই হয়েছে। অন্তত তার না-যাওয়ার একটা কঠিন অজুহাত আছে। ঠিক হল, হোসেন সাহেব সোভােহানকে নিয়ে যাবেন। হোসেন সাহেব শেষ পর্যন্ত যেতে পারলেন না। ঢাকা থেকে গেল শুধু সোভােহান। বাবলুকে সঙ্গে নিয়ে গেল।কুলখানির দিন রাতে শফিক হঠাৎ বলল, খুব অন্যায় হয়েছে নীলু আমাদের সবার যাওয়া উচিত ছিল। আমার খারাপ লাগছে!এখন খারাপ লাগলেও তো কিছু করার নেই।তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। নীলু, ছেলেবেলায় মামার কী পরিমাণ আদর যে আমরা পেয়েছি!নীলু চুপ করে রইল। সে এ বাড়ির সবার উপর খুব বিরক্ত হয়েছে।শফিক বলল, আজ অফিসে বসে ভাবছিলাম—কোনো দিন আমাকে আমরা কিছু দিই নি।
তিনি কিছু ফেরত পাবার আশায় নিশ্চয়ই তোমাদের ভালবাসেন নি? কিন্তু আমাদের একটা দায়িত্ব ছিল।হ্যাঁ ছিল।এবার দেখলাম তাঁর স্যুয়েটারটা ছেঁড়া। আমি কি পারতাম না একটা নতুন স্যুয়েটার কিনে মামাকে বলতে-মামা, তোমার জন্যে এনেছি? নিশ্চয়ই পারতে।তাহলে কেন এটা বললাম না? এখন আর এসব চিন্তা করে লাভ নেই। এস, শুয়ে পড়।তারা বাতি নিভিয়ে দুজনই শুয়ে পড়ল। কিন্তু কেউই ঘুমুতে পারল না। রাত একটার দিকে অদ্ভুত একটা ব্যাপার হল। প্রচণ্ড শব্দে তাদের দরজায় ধাক্কা পড়তে লাগল।দরজা খুলে দেখা গেল-রফিক। সে থরথর করে কাঁপছে। শফিক বলল, কী হয়েছে রে?
রফিক কাঁপা গলায় বলল, সাংঘাতিক ভয় পেয়েছি। বসার ঘরে হঠাৎ দেখি কবির মামা বসে আছেন। আমাকে দেখে হাসলেন। আমি চিৎকার দিয়ে উঠতেই দেখি কেউ নেই।দরজা খুলে সবাই বের হয়ে এসেছে। রফিক লজ্জা পাচ্ছে। কিন্তু তার ভয় এখনও কাটে নি। সে মৃদু গলায় বলল, আমি সত্যি দেখেছি, স্পষ্ট দেখলাম। মনের ভুল না।নীলু বলল, তোমার মনে অপরাধবোধ কাজ করেছিল, তাই এসব দেখছি। যাও, শুয়ে পড়।ভাবী, আমি সত্যি দেখেছি।এস, তোমাকে চা বানিয়ে দিচ্ছি। চা খেয়ে ঘুমাও।মনোয়ারা বললেন, চা না, ওকে এক গ্লাস লবণপানি দাও। এটা খাওয়া দরকার। দেখা না কেমন ঘামিছে।
রফিক ভালোই ভয় পেয়েছে, কারণ তার জ্বর এসে গেল। বেশ ভালো জ্বর-একশ দু পয়েন্ট পীচ। শারমিনকে অনেক রাত পর্যন্ত মাথায় পানি ঢালতে হল। রফিক ক্ষীণস্বরে বলল, কেমন ছেলেমানুষি কাণ্ড করলাম, বল তো। দিনের বেলা সবাই এটা নিয়ে হাসাহাসি করবে।করলে করবে, তুমি চুপ করে থাক।আমি কিন্তু সত্যি দেখেছি। বিশ্বাস কর।তুমি কিছুই দেখ নি। ভাবী যা বলেছে সেটাই সত্যি।স্পষ্ট দেখলাম শারমিন। কমলা রঙের স্যুয়েটার গায়ে। আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন।ঠিক আছে, থাক। এখন এসব গল্প করতে হবে না।তোমার ভয় লাগছে? না, ভয় লাগছে না। ভয় কেন লাগবে? তাঁকে যদি দেখেই থাক, তাতে ভয়ের কী?
রফিক জবাব দিল না। চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল। শারমিন অনেক দিন পর তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমুতে গেল। রফিক বলল, ভয় পেয়ে একটা লাভ হয়েছে। তুমি কাছে এসেছী। কবির মামাকে ধন্যবাদ।বসার ঘরে বাকি সবাই গোল হয়ে বসে আছে। তাদের কেউই সেই রাতে ঘুমুল না। সবাই যেন কবির মামার উপস্থিতি অনুভব করছে। যেন এক্ষুণি ছায়াময় কোনো জগৎ থেকে তিনি দৃশ্যমান হবেন। এক সময় ভোর হল। গাছে গাছে পাখি ডাকতে লাগল।নীলু হা করে তাকিয়ে আছে। তার চোখে গভীর বিস্ময়।কি রে, এমন করে দেখছিস কেন? চিনতে পারছিস না? পারছি, পারব না কেন? তোর এ কী হাল হয়েছে।বন্যা হাসল। হাসি আর থামেই না। আশপাশের সবাই তাকাচ্ছে। অফিসে এসে কেউ এমন করে হাসে? নীলু বলল, এ্যাই, তোর কী হয়েছে? কিছু হয় নি।এত হাসছিস কেন?
জানি না কেন হাসছি। পাগল-টাগল হয়ে যাচ্ছি বোধহয়। তুই আমাকে কিছু টাকা ধার দিতে পারবি? নীলু বন্যাকে ক্যান্টিনে দিয়ে গেল। তার মনে হল বন্যা ঠিক প্রকৃতিস্থ নয়। চেহারা ভীষণ খারাপ হয়েছে। মাথার সামনের দিকের চুল উঠে কপাল অনেক বড়ো বড়ো লাগছে। শাড়িতে ইন্ত্রি নেই। ইন্ত্রি-ছাড়া শাড়িতে বন্যাকে কল্পনাও করা যায় না। নীলু বলল, তোর কী হয়েছে বল তো? কিছুই হয় নি।চাকরি ছেড়ে দিয়েছিস? হুঁ, সে তো এক বছর আগে। তুই কোনো খোঁজখবর নিতি না, কাজেই জানিস না। কেউ খবর রাখে না।নীলু লজ্জিত বোধ করল। সে সত্যিই কোনো খোঁজ নেয় নি। অথচ তার আজকের এই চাকরি বন্যাই জোগাড় করে দিয়েছে। কত উৎসাহে সে ছোটাছুটি করেছে। কত ঝামেলা করেছে।নীলু, আমাকে হাজারখানেক টাকা দিতে পারবি?
পারব। কাল আসতে হবে। কাল আয়, আমি টাকা জোগাড় করে রাখব।এখন তোর কাছে কত আছে? পঞ্চাশ টাকার মতো আছে।পঞ্চাশ টাকাই দে। কাল আবার আসব।নীলু ব্যাগ খুলে টাকা বের করল। নিচু গলায় বলল, তোর আর সব খবর বল। কর্তা কেমন আছে? জানি না কেমন আছে। আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।বলছিস কী তুই!ডিভোর্স হয়েছে তিন মাস হল।নীলু ভয়ে-ভয়ে বলল, তোর বাচ্চাটা কার কাছে থাকে? তোর কাছে? না।ওনার সঙ্গে থাকে? না, কারো সঙ্গেই থাকে না। চা খাওয়া তো নীলু চায়ের সাঙ্গে আর কিছু থাকলে তাও দিতে বল। খিদে লেগেছে।ভাত খাবি?
না, ভাত খাব না।বন্যা চায়ের কাঁপে চুমুক দিয়ে নিতান্ত স্বাভাবিক গলায় বলতে লাগল, বাচ্চাটা মরে গেল, বুঝলি? চার মাস হবার আগেই শেষ। ওর ধারণা হল, আমার জন্যেই মরেছে। আমি যত্ন নিই নি, অফিস নিয়ে থেকেছি। কী যে কু ৎসিত ঝগড়া! শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে দিলাম। তাতেও কিছু লাভ হল না। রোজ ঝগড়া। রোজ হৈচৈ, চিৎকার। এক দিন কী হয়েছে জানিস? লোকজনের সামনে হঠাৎ আমাকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিয়ে বলল– থাক, শুনতে চাই না। এখন কী করছিস তুই? কিছু করছি না। বড়ো ভাইয়ের বাসায় থাকি আর ভাবীর সঙ্গে ঝগড়া করি। ভাবী কী যে ঝগড়া করতে পারে, তুই কল্পনাও করতে পারবি না। ঝগড়ায় কোনো ডিগ্রি থাকলে ভাবী পি-এইচ.ডি. পেয়ে যেত।
বন্যা। আবার হাসতে শুরু করল। হাসাতে-হাসতে তার চোখে পানি এসে গেল। নীলুতাকিয়ে রইল অবাক হয়ে। বন্যা বলল, আমার হাসিরোগ হয়েছে, বুঝলি? গতকাল ভাবী আমাকে কালনাগিনী বলে গাল দিয়েছে। রাগ ওঠার বদলে আমার হাসি উঠে গেল। হাসি দেখে ভাবী মনে করল, আমি পাগল হয়ে গেছি। ভয়ে তার চোখ ছোট ছোট হয়ে গেল। হিহিহি।নীলু বলল, এই বন্যা। চুপ করতো।তোরও কি ধারণা, আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে? না হলেও শিগগিরই হবে। তুই একটা চাকরি-টাকরি করা। কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাক।হ্যাঁ, তাই করব।বন্যা উঠে দাঁড়াল। সহজ স্বরে বলল, যাই রে নীলু কাল আবার আসব, টাকাটা জোগাড় করে রাখবি।টাকা ফেরত দিতে হবে না।তাহলে তো আরো ভাল।
নীলু বন্যাকে এগিয়ে দিতে গেল। তার খুবই খারাপ লাগছে। ইচ্ছা হচ্ছে বন্যার সঙ্গে চলে যেতে। দুজনে মিলে সারা দিন ঘুরে বেড়াতে পারে। বন্যার ঠিক এই মুহূর্তে এক জন বন্ধু দরকার। যে তাকে সাহস দেবে, ভরসা দেবে। মাঝে-মাঝে জীবন ভিন্ন খাতে বইতে থাকে, সব কেমন জট পাকিয়ে যায়-তখন এক জন প্রিয়জনকে কাছে থাকতে হয়।নীলু, যাই রে।কাল আসিস।আসব। একটা কথা নীলু, আচ্ছা, তোর কি মনে হয় আমি যদি চাকরি না করতাম, যদি বাসায় থেকে বাচ্চার দেখাশোনা করতাম, তাহলে সে?এখন আর এসব নিয়ে কেন ভাবছিস? ভাবছি না তো! এমনি মনে হল, তাই বললাম।আর ভাবিস না।না, ভাবব না। বাচ্চাটার জন্যে বড়ো কষ্ট হয় নীলু ওর নাম রেখেছিলাম অভীক। নামটা সুন্দর না? হ্যাঁ, সুন্দর।নামের মানে বল তো? নীলু তাকিয়ে রইল।
সারা দিন তার আর অফিসের কাজে মন বসল না। বন্যার মতো প্ৰাণময় মেয়ের আজ কী অবস্থা! কী কঠিন দুঃসময়! সন্তানের মৃত্যুর পুরো দায়ভাগ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে তার উপর। বন্যা নিজেও তা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।নীলু ঠিক করল, আগামী কাল সে ছুটি নেবে। বন্যা এলেই তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়বে। দূরে কোথাও যাবে বেড়াতে। বোটানিক্যালে গার্ডেনে কিংবা বলধা গার্ডেনে। কোথায় যেন সে পড়েছিল, গাছপালা মানুষের বিক্ষিপ্ত মনকে শান্ত করতে পারে।বন্যা পর দিন এল না। অফিস চারটায় ছুটি হয় নীলু পাঁচটা পর্যন্ত তার জন্যে অপেক্ষা করল। অফিসের গাড়ি চলে গিয়েছে। সে এক-একা বাসায় রওনা হল। রিকশা নিতে ইচ্ছা করছে না। হাঁটতে ভালো লাগছে। সন্ধ্যা নামছে। সন্ধ্যার বিষণ্ণ আলোয় তার মন কেমন করতে থাকে। জগৎ-সাংসার তুচ্ছ মনে হয়।
নীলুর হাতব্যাগে এক হাজার টাকা। তার কেন যেন মনে হল, এই টাকা নিতে বন্যা কোনো দিনই আর আসবে না।শাহানা অসময়ে শুয়ে আছে।এখন বাজছে সন্ধ্যা সাতটা। অথচ শাহানা মশারি খাটিয়ে শুয়ে আছে। জহির বিস্মিত হয়ে, ঘুমুচ্ছ নাকি? শাহানা বলল, হ্যাঁ।একটু মনে হয় সকাল—সকাল শুয়ে পড়লে? ভালো লাগছে না। ভালো না-লাগলে শুয়ে পড়তে হয় নাকি? কী করব তাহলে? কত কিছু করার আছে-বই পড়, টিভি দেখ, তোমাদের বাসা থেকে বড়িয়ে আস, শপিং-এ যাও।শাহানা তার মাথার উপর লেপ টেনে দিল। সে আর কোনো কথা-বার্তায় উৎসাহী নয়। এখন সে ঘুমুবে।জহির বলল, শাহানা, বাতি নিভিয়ে দেব? দাও।রাতে কিছু খাবে না? না।
আমার উপর কি কোনো কারণে রাগ করেছ? শাহানা জবাব না-দিয়ে পাশ ফিরল। এর মানে পরিষ্কার বোঝা গেল না। হয়তো রাগ করেছে। অনেক চিন্তা করেও রাগের কারণ কী, জহির বের করতে পারল না। সে বাতি নিভিয়ে বসার ঘরে চলে গেল। টিভি চলছে। পর্দায় নানান ছবি, কিন্তু শব্দ নেই। এও শাহানার কাণ্ড। সে সন্ধ্যা হতেই টিভি ছেড়ে সামনে বসে থাকে। শব্দ ছাড়া টিভি দেখে। এর কী মানে, কে জানে! চেনাজোনা কোনো সাইকিয়াটিষ্ট থাকলে আলাপ করা যেত। তেমন কেউ নেই। জহিরের মনে হয় যে-কোনো কারণেই হোক, শাহানার মন খুব বিক্ষিপ্ত। প্রচুর কাজে তাকে ড়ুবিয়ে রাখতে পারলে মানসিক এই অবস্থাটা হয়তো কাটত। তাও করা যাচ্ছে না। শাহানা আর পড়াশোনা করতে রাজি নয়। সে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে, কিন্তু ক্লাসে যাচ্ছে না। আর পড়াশোনা করবে না, এ-রকম একটা ঘোষণা গত সপ্তাহে দিয়েছে। জহির বলেছে, কোন পড়াশোনা করবে না?
ভালো লাগে না, তাই করব না।সময় কাটবে কী করে? যেভাবে কাটছে সেইভাবে কাটবে। আমাকে নিয়ে তোমার এত ভাবতে হবে না।কেন ভাবতে হবে না? জানি না। আমি এত সব প্রশ্নের উত্তর জানি না।এই বলেই শাহানা উঠে গিয়ে শব্দহীন টিভির সামনে বসেছে। বসার ভঙ্গি দেখে মনে হয়, পর্দার ছবিগুলির নড়াচড়া দেখে সে খুব মজা পাচ্ছে। জহির এসে বসল। তার পাশেই! শাহানা তা যেন লক্ষই করল না। জহির বলল, সাউণ্ড দাও। বিনা শব্দের ছবিতে কী আছে? শাহানা ক্লান্ত গলায় বলল, আমার এইভাবেই দেখতে ভালো লাগে।শব্দ তোমার ভালো লাগে না? না।আগে লাগত? যখন তুমি তোমাদের বাড়িতে থাকতে?
জানি না। তোমাকে তো বলেছি, আমি এত সব প্রশ্নের উত্তর জানি না। জহির চুপ করে গেল। সে বুঝতে পারছে, তাদের দু জনের ভেতর দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে। এটাকে আর বাড়তে দেওয়া উচিত নয়। কীভাবে দূরত্ব কমান যায় তাও তার জানা নেই। এক দিন সে বলল, গান শিখবে শাহানা? গানের মাস্টার রেখে দিই? শাহানা হাঁ-না কিছুই বলল না। গানের মাস্টার এক জন এলেন। হারমোনিয়াম, তবলা, সেতার এল। হুঁলুস্কুল ব্যাপার। শাহানা দু দিন মাস্টারের কাছে বসে তৃতীয় দিনে বলল, ওনার কাছে গান শিখব না।জহির বিস্মিত হয়ে বলল, কেন? উনি কথা বলার সময় মুখ থেকে থুথু বের হয়। আমার গায়ে থুথু লেগে যায়।নতুন এক জনকে রেখে দেব? দাও।
