এইসব দিনরাত্রি পর্ব – ৩৬ হুমায়ূন আহমেদ

এইসব দিনরাত্রি পর্ব – ৩৬

তোমার উৎসাহ আছে তো, নাকি আমাকে খুশি করবার জন্যে। শাহানা উত্তর দিল না। দ্বিতীয় মাস্টারও এক সপ্তাহের বেশি টিকলেন না। উনি খুব সিগারেট খান। সিগারেটের গন্ধে শাহানার মাথা ধরে যায়। তৃতীয় এক জন এলেন। ইনি কী করছেন না-করছেন জহির জানে না। গান শেখার সময়টাতে সে থাকে না। শাহানা রেয়াজ করে। কিনা তাও জহিরের জানা নেই। রেয়াজ করতে তাকে সে কখনো শোনে নি। জহির গানটাকে দেখছে। সময় কাটানোর একটা পথ হিসেবে। কিছু একটা নিয়ে শাহানা ব্যস্ত থাকুক। মনের অস্থিরতা কমুক। কিন্তু তা কি সত্যিই কমছে?

রফিকের অফিস শুরু হয়েছে গত মাসের গোড়ায়।শুরুর পনের দিন কিছু করার ছিল না। রফিকের কাজ ছিল সকালে এসে অফিসে বসে থাকা। দুপুরবেলা ঘন্টখানিকের জন্যে ছুটি। হোটেল থেকে খেয়ে এসে আবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত একনাগাড়ে বসে থাকা। কথা বলার দ্বিতীয় ব্যক্তি নেই, কারণ সাদেক আলি নানান জায়গায় ছোটাছুটি করছে। টাইপিস্ট হিসেবে একটি মেয়েকে এ্যাপয়েন্টমেন্ট দেয়া হয়েছে। সেও আসছে না। সাদেক আলিকে এই প্রসঙ্গে কিছু বলতেই বিচিত্র একটা ভঙ্গি করে বলেছে, সময় হলেই সে আসবে। কাজ নেই কোনো, এসে করবেটা কী? রফিক বিস্মিত হয়ে বলেছে, কাজ না থাকলে অফিসে আসবে না?

আসবে স্যার, আসবে। ওর কাজ তো স্যার অফিসে না। কাজ অন্য জায়গায়।তার মানে? এইসব স্যার এখন আপনার জানার দরকার নেই। তাহলে খারাপ লাগবে।রফিক আর কিছু জিজ্ঞেস করে নি। জিজ্ঞেস করবার ইচ্ছেও হয় নি। দু দিন মেয়েটির সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তার কাছে মনে হয়েছে বেশ ভালো মেয়ে। চেহারা ভালো, স্মার্ট। কথায়-কথায় হাসে, এবং বেশ রসিক। রফিকের দু-একটা রসিকতায় সে বেশ শব্দ করে হাসল। একটু গায়ে-পড়া ধরনের স্বভাব আছে। সেই স্বভাব রফিকের কাছে খুব খারাপ লাগে নি। প্রথম দিনেই সে রফিককে বলেছে, আমার ডাক নাম হল কুসুম। আপনি স্যার আমাকে কুসুম ডাকবেন। আমার ভালো নাম নিজের কাছেই সহ্য হয় না। অবশ্যি কুসুমও খুব বাজে নাম।আপনি টাইপ কেমন জানেন?

কাজ চালাবার মতো জানি। এইসব অফিসে তো স্যার মিনিটে পঞ্চাশ ওয়ার্ড টাইপ করার দরকার নেই। সমস্ত দিনে হয়তো তিন থেকে চারটা চিঠি টাইপ করা হয়।তাই নাকি? জি স্যার। কাজকর্ম হয় টেলিফেনে এবং টেলেক্সে। এই জাতীয় কাজের সঙ্গে আমি অনেক দিন থেকেই আছি। সবই জানি।অনেক দিন মানে কত দিন? প্ৰায়ছ বছর।আগের চাকরিটা ছাড়লেন কেন? খাটুনি বেশি ছিল, সেই তুলনায় রোজগার ছিল না। নতুন ফার্মগুলিতে খাটুনি থাকে কম, রোজগার হয় বেশি। স্যার, আপনি কিন্তু আমাকে তুমি করে বলবেন।কেন? ছোট ফার্ম, সবাই বলতে গেলে ফ্যামিলি মেম্বারের মতো। তাই নয় কি স্যার?

হ্যাঁ, তা তো বটেই।এক-একা অফিসে বসে থাকার মতো যন্ত্রণা অন্য কিছুতেই নেই। টেলিফোন লাইন এসেছে গত সপ্তাহে। ইদরিসের সঙ্গে কথাবার্তা বলে কিছু সময় কাটছে। তবে ইদরিসও ব্যস্ত মানুষ। বকবক করার সময় কোথায় তারা? টেলিফোন করলেই দু-একটা কথা বলার পরই বলে, দোস্ত, তাহলে রাখলাম। রফিক সহজে রাখতে দেয় না।ইদরিস, বসে থাকতে থাকতে তো শিকড় গজিয়ে গেল। কাজ-কর্ম কিছু নেই।হবে দোস্ত, হবে। ধৈর্য ধর ধৈর্য ধরা-বাঁধ বাঁধ বুক।আর কত ধৈৰ্য ধরব?

এইসব অফিসের কর্তাদের হতে হয় মাকড়সার মতো। জাল ফেলে লুকিয়ে বসে থাকতে হয়। জালে কিছু একটা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে সুতো দিয়ে পেচিয়ে ফেলতে হয়। এক বার তো পড়েছিল, তুই তো পেঁচাতে পারলি না, অন্য পার্টি নিয়ে নিল। চিন্তা করিস না, আমি সাদেক আলিকে একটা বড়ো টিপস দিয়েছি। হতে পারে।তাই নাকি? হ্যাঁ, হবার সম্ভাবনা আশি ভাগ, তবে এইসব লাইনে কিছুই বলা যায় না। শেষ দেখবি ডাইস উল্টে গেল। রাখলাম দোস্ত!ব্যাপারটা কী বল। কাজটা কী?

কাজ শুনে তুই করবিটা কী? বসে মাছি মারছিস, মাছি মার। যা করবার সাদেক আলি করবে। ও টাকা পয়সা যা চায়, সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দিবি কী জন্যে চাচ্ছে, কিছু জিজ্ঞেস করবি না।রহস্যসয়া ব্যাপার মনে হচ্ছে!রহস্য কিছু না। দোস্ত রাখলাম।ইদরিসের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয়েছে চার দিন আগে। এই চার দিনে কাজের অগ্রগতি কী হচ্ছে, রফিক কিছুই জানে না। সাদেক আলিকে যে কিছু জিজ্ঞেস করবে। তারও উপায় নেই। তার দেখাই পাওয়া যায় না।আজ রফিক অফিসে এসে খুব বিরক্তি বোধ করল। গাদাখানিক ম্যাগাজিন জোগাড় করে রেখেছিল, অফিসে নিয়ে আসবে। পড়ে সময় কাটাবে। আসার সময় ভুলে ফেলে এসেছে। আবার ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে না। অফিসে কোনো লোকও নেই যাকে পাঠানো যাবে। রফিকের ইচ্ছা ছিল এক জন অফিস এ্যাসিসটেন্ট রাখার। সাদেক আলি রাজি হয় নি। দাঁত বের করে বলেছে, এখনো সময় হয় নি স্যার। সময় হলে সব হবে।

অফিস এ্যাসিসটেন্ট হবে, পি.এ.হবে, ক্যাশিয়ার হবে, হেডক্লার্ক হবে। কয়টা দিন ধৈৰ্য্য ধরেন।রফিক ধৈৰ্য ধরেই আছে। ধৈর্যেরও সীমা আছে। এখন একেবারে সীমা অতিক্রম করার মতো অবস্থা। রফিক ইলেকট্রিক হিটার বসিয়ে দিল। আপাতত চমৎকার জাপানি কাঁপে চা খাওয়া যাক। চা খেতে-খেতে জীবন সম্পর্কে কিছু ফিলসফিক চিন্তা-ভাবনা করা যেতে পারে। লেখার অভ্যাস থাকলে সময়টা কাজে লাগত। দারুণ রোমান্টিক একটা গল্প ফাদা যেত। যেখানে তিনটি মেয়ে ভালোবাসে একটি ছেলেকে। ছেলেটি আবার চতুর্থ একটি মেয়েকে ভালোবাসে। কিন্তু সেই মেয়ে বিবাহিতা। স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখেই আছে। জটিল পঞ্চভুজ প্রেম। সবচে ভালো হয় নিজেকে নিয়ে গল্প শুরু করলে। ধনী বাবার কন্যা ভালবাসত প্রবাসী এক ছেলেকে।

হঠাৎ কী মতিভ্রম হল, বিয়ে করে বসল। চালচুলো নেই এক বেকার যুবককে। সেই বেকার যুবক হচ্ছে এক জন আদর্শবান, অনুভূতিপ্রবণ, কোমলহৃদয় পুরুষ।রফিক বসে আছে চুপচাপ। গল্প তরতর করে এগুচ্ছে। মনে মনে গল্প লেখার কাজটা এত সহজ, তার ধারণা ছিল না। নিতান্ত অনিচ্ছায় সে টেলিফোন ধরল।হ্যালো।স্যার, আমি সাদেক।কী খবর সাদেক সাহেব? হাজার পাঁচেক টাকা দরকার স্যার। আধা ঘণ্টার মধ্যে।কেন? ব্যাপার আছে স্যায়! একটা মেয়ে আসবে আপনার কাছে। তাকে টাকাটা দেবেন। নাম হচ্ছে নমিতা। নমিতা নাম বললেই টাকাটা দিয়ে দেবেন। আমি আসতে পারছি না। অন্য জোগাড়যন্ত্র করতে হচ্ছে।ক্যাশ টাকা তো নেই।ব্যাঙ্ক থেকে তুলে নিয়ে আসেন স্যার। যাবেন আর আসবেন। মেয়েটা যেন আবার না চলে যায়।মেয়েটা কে?

তা দিয়ে আমাদের দরকার নেই। কাজ হওয়া দিয়ে কথা। বহু কস্টে একে জোগাড় করা হয়েছে।ব্যাপারটা কী একটু বলুন।একটা ঘরোয়া ধরনের পার্টির মতো হবে। ঐ সব পাটির শোভা দুজন মেয়ে যাবে শোভা হিসেবে। একজন হচ্ছে আমাদের কুসুম, অন্য জননমিতা। রাস্তার মেয়ে তো আর পাঠানো যায় না। সবটা নির্ভর করছে ওদের উপর। স্যার, আমি টেলিফোন রাখলাম, আপনি টাকাটার জোগাড় দেখেন।নমিতা কোনো রকম কথা ছাড়া টাকাটা তার ব্যাগে তরল। কী মিষ্টি চেহারা মেয়েটির চোখ দুটি বিষন্ন। ছায়াময় চোখ বোধহয় একেই বলে। বড়ো বড়ো পল্লব ছায়া ফেলেছে চোখে। মেয়েটির গায়ে গাঢ় নীল রঙের একটা চাদর। এই নীল রঙের জন্যেই কি তাকে এত বিষণ্ণ দেখাচ্ছে?

নমিতা বলল, আমি আপনার অফিসে খানিকক্ষণ বসব। সাদেক আলি সাহেব এসে আমাকে নিয়ে যাবেন।বসুন।উনি কি আমার ড্রেস সম্পর্কে কিছু বলেছেন? না, কিছু বলে নি। যা পরে এসেছেন তাতেই আপনাকে খুব চমৎকার লাগছে। মেয়েটি এক পলক তাকালি রফিকের দিকে।বরফের মতো শীতল চোখ। কোনো রকম আবেগ-উত্তেজনা সেখানে নেই। রফিকু বলল, আপনি কি চা খাবেন? না।আমি খাব। আমার সঙ্গে এক কাপ চা খান।মেয়েটি হ্যাঁ-না কিছুই বলল না। রফিক দু কাপ চা বানোল। এক কাপ রাখল মেয়েটির সামনে। সে এই চা ছুঁয়েও দেখল না। ক্লান্ত গলায় বলল, দুটা প্যারাসিটামল এনে দিতে পারেন?এক্ষুণি এনেদিচ্ছি। যাব আর আসব।আপনি নিজেই যাবেন?

মেয়েটি হেসে ফেলল। কী সুন্দর হাসি! রফিকের ইচ্ছা হল বলে-আপনার কোথাও যেতে হবে না। আপনি বাড়ি যান। আমরা অধিকাংশ কথাই বলতে পারি না।শারমিন ছাদে একা-একা হাঁটছিল। এ বাড়ির ছাদে সে খুব কম আসে। কেন জানি তার ভালো লাগে না। ছাদে উঠলেই নিজেদের বাড়ির বিশাল ছাদের কথা মনে হয়। উঁচু রেলিংঘেরা ছোটখাট ফুটবল মাঠ। সেখানে যখন শারমিন গিয়ে দাঁড়াত, আশেপাশের কেউ তাকে দেখতে পেত না। কত সহজেই একা হওয়া যেত। এখানে সে সুযোগ নেই। চিলেকোঠার ঘরে থাকে আনিস। আশপাশের বাড়ির কয়েক জন ছেলেমেয়েও এখানে খেলতে আসে। চেঁচিয়ে মাথা ধরিয়ে দেয়।

আজ অবশ্যি কেউ নেই। আনিসের ঘর তালাবন্ধ। দরজার উপর একটা কাগজে বড়ো বড়ো করে লেখা-আমি এ সপ্তাহের জন্যে বাইরে গেলাম। সেই এক সপ্তাহ কবে শুরু হবে আকার কবেই—বা শেষ হবে, কে জানে। শারমিনের খুব ইচ্ছা করল ছোট ছোট করে লেখে—আপনার এই সপ্তাহ কবে থেকে শুরু।সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। শারমিনের মন খারাপ হয়ে গেল। ভেবেছিল সন্ধ্যা মেলানোর আগ পর্যন্ত ছাদে থাকবে। সূর্য ডোবা দেখবে সেটা আর সম্ভব হল না। পৃথিবীটাই এমন, যারা একা থাকতে চায়, তারা একা থাকতে পারে না। রাজ্যের মানুষ এসে তাদের চারপাশে ভিড় করে।

শারমিন।আরে ভাবী, তুমি! নাও, চা নাও।বুঝলে কী করে আমি ছাদে? নীলু হাসতে বলল, আমি হচ্ছি মহিলা শার্লক হোমস। ছাদে কী করছ? তেমন কিছু না। এবার শীত তেমন পড়ল না, তাই না ভাবী? হুঁ। ফাল্গুন চলে এসেছে নাকি? কী জানি। আমি এখন আর দিন-তারিখের হিসাব রাখি না।শারমিন রেলিং এ হেলান দিয়ে দাঁড়াল। নীল বলল, তোমার কী হয়েছে শারমিন, বল তো? কই, কিছু হয় নি তো।কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছ। রফিকের সঙ্গে কি কোনো কিছু নিয়ে বাক্যালাপ বন্ধ? না।

ও কী সব অফিস-টফিস খুলেছে, তুমি তো দেখতেও যাও নি! যাব একদিন, দেখে আসব।তুমি বাইরে চলে যাবে, এ-রকম একটা কথা শুনতে পাচ্ছি। এটা কি গুজব না। সত্যি? সত্যি।রফিক এক জায়গায়, তুমি এক জায়গায়? হ্যাঁ।এটা কি ভালো হবে? শারমিন অল্প হাসল। খুব সহজেই সেই হাসি ঠোঁট থেকে মুছে ফেলে বলল, কত ছেলেই তো বৌকে ফেলে পি-এইচ.ডি. করতে যায়। আমি গেলে সেটা দোষের হবে কেন? দোষের হবেনা। এখন তোমাদের দুজনেরই ভালোবাসাবাসির সময়। এ সময় আলাদা হওয়াটা ঠিক হবে না। তুমি আরো ভালো করে ভেবে দেখা।দিন-রাতই ভাবছি।

বরং একটা কাজ কর, তুমি তোমাদের বাড়িতে গিয়ে থাক। একটা বৈচিত্ৰ্য আসুক। দিনের পর দিন এক জায়গায় থেকে তুমি হাঁপিয়ে উঠেছ। কিছুদিন ওখানে থাকলে তোমার ভালোলাগবে।শারমিন সঙ্গে সঙ্গে বলল, আমিও তাই ভাবছি ভাবী।এত ভাবাভাবির কিছু নেই। বেশ কিছু দিন থেকে আসা। এখানে দিন-রাত কেমন গম্ভীর হয়ে থাক, আমার ভয়-ভয় লাগে। রফিকের না-।নীলু তরল গলায় হেসে উঠল। শারমিন বলল, আমি আজ সন্ধ্যায় চলে গেলে কেমন হয় ভাবী।আজই যাবে? বাড়িওয়ালার বাসা থেকে টেলিফোন করলেই গাড়ি চলে আসবে। ভাবী, যাব? বেশ তো, যাও। রফিককেও আমি পাঠিয়ে দেব।নীলু লক্ষ করল শারমিনের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। দিনের শেষ আলো পড়েছে শারমিনের চুলে। চুলগুলি কেমন লালচে দেখাচ্ছে। সুন্দর লাগছে। শারমিনকে।রফিক বাসায় ফিরল রাত নটায়। তাকে দেখেই টুনি বলল, ছোট চাচী চলে গিয়েছে।

রফিক বিস্মিত হয়ে বলল, কোথায় গেছে?ওনার নিজের বাড়িতে। সব জিনিসপত্র নিয়ে গেছে। মনে হয়। আর আসবে !রফিক গম্ভীর হয়ে গেল। রাত এগারটায় ম্যানেজার সাদেক আলি এসে ংশুমুখে বলল, স্যার, কাজটা হয় নি।রফিক শান্ত স্বরে বলল, না হলে কী আর করা যাবে? আপনি আপনার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। বাড়ি যান, বিশ্রাম করুন। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যে মারা যাবেন।সাদেক আলি মৃদুস্বরে বলল, ওরা স্যার আগেই অন্য পার্টির সঙ্গে সব ঠিকঠাক করে আমাকে বলেছে একটু আমোদ-আহল্লাদের ব্যাবস্থা করতে। বলেছে—আমাদের খুশি করে দিন, তারপর দেখুন। আপনাদের খুশি করতে পারি। কিনা।ঠিক আছে বাদ দিন। যা হবার হয়েছে।আমি বাদ দেব? বলেন কী স্যার? আমার নাম সাদেক আলি না? আমার সাথে মামদোবাজি করবে, আমি চুপ করে থাকব?কী করবেন আপনি?

আমি যে কী পরিমাণ শয়তান, আপনি তা জানেন না স্যার।সাদেক আলি সাহেব! জ্বি? কাজটা না-হওয়ায় আমি খুশিই হয়েছি। সামান্য একটা কাজের জন্যে আমি মেয়েমানুষ পাঠাব, এটা তো হয় না। আমি ভদ্রলোকের ছেলে। আমার বাবা জীবনে কোনো দিন মিথ্যা কথা বলেন নি। আমার এক মামা-কবির মামা, তিনি তাঁর নিজের জীবনটা দিয়ে দিয়েছিলেন অন্যের জন্যে। সাদেক আলি সাহেব, আমার সারাটা দিন খুব মনখারাপ ছিল। কাজটা হয় নি। শুনে মনটা ভালো হয়েছে।আপনি তো স্যার ব্যবসা করতে পারবেন না!বোধহয় পারব না। বসুন, এক কাপচা খেয়ে তারপর যান।

সাদেক আলি বলল, আপনার মন ভালো হয়েছে, খুব ভালো কথা। আমার মনটা এখনও খারাপ, ঐ শালাকে শিক্ষা দিতে না পারলে স্যার আমার মন ভালো হবে না। চা খাব না স্যার। আমি যাই। স্নামালিকুম।নীলগঞ্জ থেকে বাবলুর একটা চিঠি এসেছে। চিঠি কার কাছে লেখা বোঝা যাচ্ছে না, কারণ কোনো সম্বোধন নেই। চিঠির রক্তব্যও সার্বজনীন-এ আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছ? ইতি বাবলু। চিঠি যেমনই হোক চিঠির সঙ্গের শিল্পকর্মটি অসাধারণ-একটি তিন মাথাওয়ালা গরু, ঘাস খাচ্ছে। মনোয়ারা ছবি দেখে আঁৎকে উঠে বললেন-তোমাকে কত বার বলেছি বৌমা, ছোঁড়াটার মাথা খারাপ। তুমি তো বিশ্বাস কর না। দেখ একটা গরু এািকছে, মাথা তিনটা। নীলুহাসতে-হাসতে বলল, ছেলেমানুষ।

ছেলেমানুষ হলেই তিন মাথার গরু, আঁকতে হবে? ছিঃ ছি, কী ঘেন্নার কথা।ছবি দেখে টুনি বেশ মন খারাপ করল। বাবলু যে ছবি আঁকতে পারে, তাই তার জানা ছিল না। তাও এমন সুন্দর ছবি, যা সবাই কত আগ্রহ নিয়ে দেখছে! টুনি তার মাকে ধরল, মা, গরু, আঁকা শিখিয়ে দাও।নীলু বিরক্ত হয়ে বলল, গরু আঁকা আমি জানি না মা, তোমার দাদুর কাছে যাও।না, তুমি শিখিয়ে দাও।দেখছি না, আমি একটা চিঠি পড়ছি। কেন বিরক্ত করছি টুনি? না, তুমি শিখিয়ে দেবে। তুমি…

নীলু মেয়ের গালে একটা চড় বসিয়ে দিল। টুনি ইদানীং খুব বিরক্ত করছে। যা এক বার বলবে, তা-ই করতে হবে। গত রাতেও তাই করেছে। রাতে খাবার টেবিলে বলে বসিল, পোলাও খাব মা। নীলু বলল, পোলাও তো রান্না হয় নি, খাবে কী করে? এখন রাঁধ।কী বলছ টুনি এখন পোলাও রাঁধব কি? না, রাঁধতে হবে। এখনই রাঁধ।কাল পোলাও হবে। এখন খেয়ে নাও!

তাহলে আমি খাব না। টুনী টেবিল ছেড়ে উঠে গেল। কিছুতেই তাকে খেতে বসানো গেল না। ত্য-সত্যি রাত দশটায় রান্না চড়াতে হল। মনোয়ারা গজগজ করতে লাগলেন, একটা মাত্র বাচ্চা, এরকম তো করবেই। তিন-চারটা ভাইবোন থাকলে এমন হত না। কী আর করা যাবে? সবাই হয়েছে আধুনিক। একটামাত্র বাচ্চা। ছেলে হলেও একটা কথা ছিল, মেয়ে পরের বাড়ি চলে যাবে।কিছু দিন থেকেই মনোয়ারা এই লাইনে কথাবার্তা বলছেন। কথার সারমর্ম হচ্ছে, আরো ছেলেপুলে দরকার। বংশরক্ষার জন্যে হলেও ছেলে দরকার। তাছাড়া এক সন্তান সংসার?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *