নতুন প্রহসনে হাত দিয়েছি প্রহসন লেখা কোনাে খেলা কথা না। প্রহসন লিখতে গিয়ে মাইকেল মধুসূদনের মতাে লােকের মাথার চুল পেকে গিয়েছিল। শেষে কলপ দিয়ে রক্ষা। যা তাের মামিকে বলে আয় যেন আমার ঘরে না আসে।
আচ্ছা বলছি।
আর শােন, খাতির জমাবার চেষ্টা করবি না। খেয়াল রাখবি ও হচ্ছে শত্রুপক্ষ। ও অবশ্যি তােদের হাত করার চেষ্টা করবে। রাম কী করেছিল ? রাবণকে পরাজিত করবার জন্যে রাবণের অতি প্রিয়জন বিভীষণকে হাত করেছিল। মনে থাকে যেন, ইতিহাস থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে হয়। ইতিহাস শুধু পড়লেই হয় না।
দেখলাম মামার কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে। নতুন মামি ছােটদের হাত করার জন্যে দারুণ ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। মিষ্টি মিষ্টি করে সবার সঙ্গে কথা বলছেন, আদর করছেন। আমাদের মধ্যে দুর্বল চরিত্রের যারা তারা অল্প সময়েই মামির দিকে ঝুঁকে পড়ল।
আমার ছােটবােন শেফু পুরােপুরি মহিলা বিভীষণ হয়ে গেল। সারাক্ষণ মামির পেছনে পেছনে ঘুরছে। খামচি রানী বকুল আপাও তাই করল। মুখে সারাক্ষণ নতুন মামি, নতুন মামি! রাগে আমার গা জ্বলে গেল। কতবার বলা হয়েছে, মামি আমাদের শত্রুপক্ষ— তাও বুঝতে পারছে না ।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৭)
ঝা” ।
মামি যে আমাদের শত্রুপক্ষ তা নাটকের দিন জলের মতাে পরিষ্কার হয়ে গেল। দেখা গেল নাটকের সবচে‘ করুণ দৃশ্যগুলিতে যেখানে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠা উচিত সেখানে মামি খিলখিল করে হেসে ফেলেছেন।
একটা দৃশ্যে রাজকুমারী কাঁদতে কাঁদতে বলছে— রাজকুমারী : এ–কী অমানিশা মাের চারপাশে
হুতাশন জ্বলে ধিক ধিক। এ জীবন রেখে কী হবে বলে
জীবন দেয়াই হবে সঠিক। এবং এটা বলেই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছে, তখন বনের পাখি বলছে বিনের পাখির ভূমিকায় অভিনয় করছে আমার ছােট বােন শেফু ।
বনের পাখি : ঝাপ দিও না, ঝাপ দিও না কন্যা গাে
ঝাঁপ দিও না জলে। খুবই করুণ দৃশ্য। এই দৃশ্যে মামি এমন হাসি শুরু করলেন যে স্টেজে বনের পাখি নিজেও ফিক করে হেসে ফেলল। সেই হাসি দেখে ‘রাজকুমারী সুবর্ণরেখা’ মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসতে লাগল এবং তার ডায়ালগ ভুলে গেল। বনরক্ষক আয়ােস্কান্ত হাসতে লাগল হাে–হাে করে । চারদিকে হাসাহাসির ধুম পড়ে গেল।
উইংসের আড়ালে বড় মামা রাগে-দুঃখে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, এটা হচ্ছে স্যাবােটেজ। ইচ্ছাকৃত স্যাবােটেজ। ঐ মেয়ে হচ্ছে শনিগ্রহ। শনি। আমার জীবনে শনি।
ড্রপসিন ফেলে দিয়ে দশ মিনিট পর আবার অভিনয় শুরু হলাে। কিন্তু অভিনয় জমল না। করুণ দৃশ্যগুলাে এলে হাসাহাসির ধুম পড়ে যায়। নতুন মামি হাসেন, আমার মা হাসেন, বাবা হাসেন। বকুল আপার বাবা হাসেন ঘর কাঁপিয়ে আর বলেন, ভেরি ফানি! বড় মামা পাথরের মতাে শক্ত হয়ে যান।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৭)
একসময় তিনি রাগে কিড়মিড় করতে করতে বলেন এই মেয়েটাকে জীবন্ত কবর দিয়ে দেয়া উচিত। প্রথমে একটা গর্ত করে কাটা বিছিয়ে দিতে হবে। তার উপর মেয়েটাকে শুইয়ে আরেক প্রস্থ কাঁটা। তারপর মাটিচাপা ।
নতুন মামি যেন মামার ঘরে না যান সে বিষয়ে কঠিন আদেশ জারি করা হয়েছিল, তবু এক রাতে দেখলাম মামি মামার ঘরে গেছেন। লুকিয়ে বড়দের কথা শােনা খুব অন্যায়, তবু আমি এবং শেফু জানালার পাশে দাড়িয়ে তাদের
কথাবার্তা শুনতে লাগলাম । বলা যায় না— রাগের মাথায় বড় মামা যদি নতুন মামির গলা চেপে ধরেন, তাহলে দৌড়ে মা’কে খবর দিতে হবে। নতুন মামি আমাদের শত্রুপক্ষ হলেও মেয়ে খুব ভালাে।
আমরা শত্রুপক্ষ জেনেও তিনি আমাদের এত আদর করেন যে, আমাদের মিত্রপক্ষ হতে ইচ্ছা করে। ইচ্ছা। করলেও তাে উপায় নেই। বড়মামার দল ছেড়ে তাে আমরা মামির দলে যেতে পারি না। একবার একটা দল করলে সেই দল ভেঙে অন্য দলে যাওয়া যায় না।
যাই হােক, জানালার ওপাশে দাড়িয়ে আমরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে মামা–মামির কথা শুনছি। মামা বসে আছেন বিছানায়। মামি দাঁড়িয়ে আছেন টেবিলের পাশে। মামি একটু সাজগােজ করেছেন। পরনে লাল রঙের শাড়ি। পান খেয়ে ঠোট করেছেন টুকটুকে লাল । চুল বেণি করে বাঁধা। যা সুন্দর লাগছে মামিকে!
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৭)
বড় মামা : তােমাকে না নিষেধ করা হয়েছে আসতে। কেন এলে ? মামি : কাজে এসেছি। বড় মামী : কী কাজ? মামি : তােমার বইপত্রগুলাে নিতে এসেছি। তুমি তাে আর
পড়াশােনা করবে না। আমি পড়াশােনা করছি। পরীক্ষা
দেব। বড় মামা : পরীক্ষা তাে আমিও দেব। মামি : পড়াশােনা না করেই পরীক্ষা দেবে ? বড় মামা : হুঁ। মামি ; ভালাে। আমি পড়ব । বইগুলাে আমাকে দাও। বড় মামা : আমার বইয়ে হাত দেবে না। খবরদার । মামি : ঠিক আছে হাত দেব না। এমন রেগে রেগে কথা বলছ কেন ?
আমি কী করলাম ? বড় মামা : বিনা অনুমতিতে ঘরে প্রবেশ করেছ, তাতেই রাগ করেছি। মামি : আর প্রবেশ করব না। বড় মামা : যারা পড়াশােনা, পরীক্ষা এইসব নিয়ে মাতামাতি করে
তাদের আমি দু‘চোখে দেখতে পারি না।
Read more
