কিছু শৈশব-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ

মামি সত্যি সত্যি চলে গেলেনমা এবং বাবা অনেক বুঝিয়েও তাঁকে রাখতে পারলেন নাশত্রুপক্ষ চলে যাওয়ায় আমার খুশি হওয়া উচিত, কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেলচোখে পানি এসে গেলতবু এমন ভাব করলাম যেন খুব খুশি হয়েছি। 

কিছু শৈশবরাতে বড়মামার ঘরে গিয়েছিমামা বললেন, এবার নিশ্চিন্ত মনে লেখালেখি করা যাবে, কী বলিস

তবে আমি ঠিক করেছি মেয়েটাকে একটা শিক্ষা দেবওর ধারণা আমি বােকা। 

ভুল ধারণা মামা

ভুল ধারণা তাে বটেইপরীক্ষায় পাস করলেই মানুষ বুদ্ধিমান হয় নাবরং ইতিহাস পর্যালােচনা করে দেখা যায়, গাধাটাইপ ছেলেপুলে পরীক্ষায় ফাস্ট সেকেন্ড হয়পাঠ্যবই ছাড়া এরা আর কিছু বুঝে নাবইয়ের পােকা ছাড়া তাদের অন্যকিছু ভাবা ঠিক না। 

তুমি মামিকে কীভাবে শাস্তি দেবে

পরীক্ষায় ফার্স্ট সেকেন্ড হয়ে দেখিয়ে দেব এটা কিছুই নাবরং হাতির ছবি আঁকা এরচে অনেক কঠিন। 

ফার্স্টসেকেন্ড কীভাবে হবে ? সব মুখস্থ করে ফেলব ঝাড়া মুখস্থদাড়িসেমিকোলনসহপারবে

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ

পারব না কেন? মানুষের অসাধ্য কিছুই নেইএকটু কষ্ট হবে, উপায় কী? কবিতা মুখস্থ করা সহজইতিহাস, লজিক এইসব মুখস্থ করা কঠিনতবে অসাধ্য কিছু নাকাল থেকে মুখস্থ করা শুরু করব। 

মামা বই মুখস্থ করা শুরু করে দিলেনবড়ই কঠিন কাজএক পাতা মুখস্থ করে মাথা গরম হয়ে যায়, তখন রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ে মাথা খানিকটা ঠাণ্ডা করে দ্বিতীয় পাতা মুখস্থ করেনতৃতীয় পাতা মুখস্থ করার পর দেখা যায় প্রথম পাতাটা ভুলে গেছেনআবার গােড়া থেকে শুরু করতে হয়মামা হাল ছাড়েন। 

প্রতিভাবান মানুষরা সহজে হাল ছাড়েন নাসাধারণ মানুষের সাথে এইখানেই তাদের তফাতমামা তাে আর সাধারণ মানুষ না। 

এইবার গল্পের শেষটা বলি। 

মামি আমাদের সাথে আছেনপরীক্ষা দিতে এসেছিলেনপরীক্ষা দেয়ার পর আর ফিরে যান নিঅবশ্যি মামার সাথে তার ভাব হয় নিরাতে শেফুর সাথে ঘুমানমামার সাথে কখনাে দেখা হলে মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখেনবড় মামা তার মুখ দেখতে চান নাএটা বােধহয় তার খুব মনে লেগেছেবড়রা ছােটদের মতাে না। কেউ কোনাে একটা কথা বললে তারা অনেক দিন মনে পুষে রাখেন

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ

যাই হােক, এসব নিয়ে আমরা এখন মােটেই চিন্তিত নাআমাদের নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেইনতুন নাটকের রিহার্সেল হচ্ছেএবারের নাটকও রাজকুমারী সুবর্ণরেখাকে নিয়ে খুব করুণ নাটকআগের বারের চেয়েও অনেক করুণনাটক দেখতে হলে চোখ মােছার জন্যে রুমাল আনলে চলবে নাবিছানার চাদর আনতে হবে, এমন অবস্থাআই. . পরীক্ষার রেজাল্ট হবার আগেই নাটক নামিয়ে ফেলতে হবে

না, পরীক্ষা নিয়ে মামার কোনাে ভয় নেইখুব ভালাে পরীক্ষা দিয়েছেন, বাংলা পরীক্ষায় তিনটা বাড়তি খাতা নিয়েছেনএই অবস্থায় নিজেকে নিয়ে তার চিন্তা নেইতবে তার ধারণা রেজাল্টের পর মামি যখন দেখবে কাগজে তাঁর নাম নেই আর মামার নাম প্রথম বিভাগে তখন ভয়াবহ শক খাবেএই অবস্থায় মামি নাটক দেখতে উৎসাহ পাবে না। 

আমি বললাম, মামি নাটক না দেখলে কী হবে ? না দেখলেই তাে ভালােআগের বারের মতাে হাসাহাসি করবে। 

মামা বললেন, তাের মামিকে দেখানাের জন্যেই এই নাটকওর কথা মনে করেই লেখা। 

কেন

ওর ধারণা আমার প্রতিভা নেইনাটক দেখলে বুঝবে প্রতিভা কত প্রকার কী কী

আমাদের রিহার্সেল পুরােদমে চলছেএর মধ্যে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতাে আগে আগে আই. . পরীক্ষার রেজাল্ট হয়ে গেলবাবা গম্ভীর মুখে খবরের কাগজ নিয়ে ঘরে এলেনমামা হাসিমুখে বললেন, অবস্থা কী দুলাভাই ?

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ

বাবা বললেন, অবস্থা ভালােই। 

মামা বললেন, অবস্থা যে ভালাে তা জানি কতটা ভালাে সেটা বলেনফার্স্ট ডিভিশনে আছি

বাবা গম্ভীর গলায় বললেন, খবরের কাগজে তােমার নাম নেইকোথাও খুঁজে পেলাম না। 

আচ্ছা। 

আগের তিনবার যেমন ছাপাখানার ভুলে তােমার নাম উঠে নি, এবারাে বােধহয় তাই হয়েছে। 

বড়মামা পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেনতিনি চলে যাবার পর জানলাম নতুন মামি পাস করেছেনতিনটা মেয়ে ফার্স্ট ডিভিশন 

পেয়েছেমামি ঐ তিনজন মেয়ের মধ্যে প্রথমজন। 

বড়দের কাণ্ডকারখানা আমি কিছু বুঝি নামামি পাস করেছেন, তার শত্রু ফেল করেছে, মামির উচিত খুশি হওয়া। তিনি কেঁদেটেদে অস্থির হয়েগেলেনকেউ তাঁকে সান্ত্বনা দিতে পারছে না। 

মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আহা বেচারা কী কষ্টটাই না পাচ্ছেআমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে। আমার সত্যি মরে যেতে ইচ্ছে করছে। 

দুপুরে বড়মামা খেতে এলেন নামামিও খেলেন নাদরজা বন্ধ করে কাদতে লাগলেনমামা মুখ শুকনাে করে রাতে ফিরলেনআমাকে ফিসফিস করে বললেন, তাের মামিকে একটু আমার ঘরে আসতে বল তাে। 

আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, কেন ? সে এত ভালাে একটা রেজাল্ট করেছে, তাকে অভিনন্দন দেওয়া উচিত না ? মেয়েদের মধ্যে ফার্স্ট হয়েছেসহজ কথা তাে না নিতান্ত গ্রামের একটা মেয়েযা করেছে নিজের চেষ্টায় করেছেকিছু ফুল নিয়ে এসেছি, ভাবছি ফুলগুলাে দেবএমন পচা শহর, ফুল পাওয়া যায় নাদশটা গােলাপ জোগাড় করতে জীবন বের হয়ে গেছে । 

আমি বললাম, তােমার ঘরে আসতে বললে মামি আসবে বলে তাে মনে হয় না। 

আসবে না

আমারও তাই ধারণা না এলে ফুলগুলাে চুপিচুপি দিয়ে আসিস। 

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *