কিছু শৈশব-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

মার্বেলের কাছাকাছি আরেকটা খেলা ছিল, চাড়া খেলা নাম সাতটা মাটির বাসন ভাঙা চাড়া একের উপর এক সাজিয়ে দূর থেকে নিশানা করে মেরে সপ্তসৌধ ভেঙে দেয়াএই খেলায় আমি মজা পেতাম না, কারণ আমার নিশানা ভালাে না সিগারেটের খালি প্যাকেট দিয়ে একটা খেলা ছিলচাড়া খেলারই অন্য ভার্সানএই খেলায় টাকাপয়সা লেনদেন হতাে টাকাপয়সা মানে সিগারেটের প্যাকেট

কিছু শৈশব

ক্যাপসটেন সিগারেটের প্যাকেটের মূল্যমান একশটাকা, সিজার সিগারেটের প্যাকেট পঞ্চাশ টাকাসবচেদামি ছিল থ্রি ক্যাসেল সিগারেটের প্যাকেটখুবই কম পাওয়া যেত বলে এর দাম দিল পাঁচ হাজার টাকাআমরা শিশুরা যখন খেলতে যেতাম আমাদের চোখ থাকত রাস্তায়, ডাস্টবিনেযদি 

কোনাে খালি প্যাকেট পাওয়া যায়! একদিনের ঘটনা বলিগরম পীরের মাজারের সামনে দিয়ে যাচ্ছিহঠাৎ দেখি রাস্তায় কী যেন চকচক করছেদূর থেকে থ্রি ক্যাসেল সিগারেটের প্যাকেটের মতাে দেখাচ্ছেআসলেই কি তাই? আমি ছুটে গেলামযা ভেবেছি তাইআমার হাতপা গেল ঠাণ্ডা হয়েবুক ধ্বক ধ্বক করছেগলা শুকিয়ে কাঠএত সৌভাগ্য কারাে হয়

কিছু শৈশব-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

একবার এক পত্রিকায় ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে আমি আমার জীবনের কিছু আনন্দময় অলৌকিক মুহূর্তের কথা বলেছিলামযেমন, নর্থ ডেকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির রসায়ন বিভাগের দীর্ঘ করিডােরে আমি হাঁটাহাঁটি করছিটেনশনে অস্থিরকিছুক্ষণ আগেই আমি Ph.Dভাইবা দিয়েছিবিচারকরা এখন রুদ্ধদ্বার বৈঠক করছেনবৈঠক শেষে জানাবেন আমাকে ডক্টরেট ডিগ্রি দেয়া যাবে কি যাবে নাএকসময় দরজা খুললবাের্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর জেনাে উইকস গম্ভীর ভঙ্গিতে এগিয়ে এলেনআমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, হ্যালাে ডক্টর হুমায়ূনমুহূর্তটা ছিল অলৌকিক। 

ইট, চুন, সুরকিতে তৈরি এই কলতলাতেই ছিলাে একটি কুয়া (কূপ)। 

আরেকটা বলিআমার প্রথম মেয়ে নােভার জন্ম হয়েছে ধানমণ্ডির কোনাে এক ক্লিনিকে আমি আমেরিকায়ক্লিনিক থেকে তার জন্মসংবাদ আমাকে দেয়া হলােমেয়ে নাকি জন্মের পর থেকে কেঁদেই যাচ্ছেআমি টেলিফোনটা মেয়ের কাছে নিয়ে যেতে বললাম, তার কান্না যদি শােনা যায়তার মা তাই করল, আমি মেয়ের কান্না শুনলামআহা কী আনন্দময় অলৌকিক মুহূর্ত

আমরা যখন জীবনের হিসাব মেলাই তখন শৈশবের অলৌকিক আনন্দময় অংশটা বাদ থাকেবাদ থাকে বলেই লেখক হুমায়ূন আহমেদের অলৌকিক আনন্দময় মুহূর্তের যে তালিকা পত্রিকাওয়ালারা ছাপে তাতে থ্রি ক্যাসেল সিগারেটের প্যাকেট প্রাপ্তির অলৌকিক আনন্দের কথা থাকে না। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

শৈশবের একা হাঁটাহাঁটি, এরতার বাড়িতে ঘরের ছেলের মতাে ঢুকে যাওয়ায় জীবনকে কত বিচিত্র মহিমাতেই না দেখার সুযােগ হলাে! একটা উল্লেখ করি। 

গরম পীরের মাজারের পেছনে একটা টিনের বাড়ি ছিলচারদিকে টিনের বেড়াউঠোন ঝকঝকে তকতকেএই বাড়িতে আমার খেলার বয়েসি কেউ নেই বলে কখনাে যেতাম নাএকদিন কী মনে হলাে, বাড়িতে ঢুকলাম। 

ঢুকেই চমকালাম রূপবতী এক মহিলা উঠোনে বসে তার শিশুসন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেনতার বুকের কাপড় সম্পূর্ণ ভােলাএকটা বাচ্চাছেলেকে দেখে তিনি নির্বিকার রইলেনআমি মুগ্ধ হয়ে দৃশ্যটা দেখছিমুগ্ধ হবার প্রধান কারণ, বাচ্চাটা মায়ের এক বুক থেকে দুধ খাচ্ছে আর অন্যটা থেকে ফিনকি দিয়ে দুধ বের হচ্ছে। 

এরপর থেকে আমার প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়াল, এই বাড়িটির আশেপাশে ঘুরঘুর করামহিলা যখন বাচ্চাকে দুধ খাওয়ান তখন সামনে উপস্থিত হওয়া। 

মহিলা নিশ্চয়ই আমার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছিলেনকারণ একদিন তিনি বললেন, দুধ খাওয়ানাে দেখতে ভালাে লাগে

আমি হাঁসূচক মাথা নাড়লামতিনি বললেন, দুধ খাইতে ইচ্ছা করে

আমি আবারাে হাসূচক মাথা নাড়লামমহিলার ঠোটে হাসির আভাস দেখা গেলতিনি পাশে রাখা একটা কাপ ভঁর খালি বুকের সামনে ধরলেনকিছুক্ষণের মধ্যেই কাপ অর্ধেকের মতাে ভরে গেল

কিছু শৈশব-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

তিনি কাপ আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, নে খা । 

আমি আগ্রহ নিয়ে খেলামতিনি বললেন, রােজ আইসা দুধ খাইয়া যাবিকাউরে এই ঘটনা বলবি । 

আমি দুর্বোধ্য এই ঘটনা কাউকে বলি নি এবং সেই বাড়িতে আর কোনােদিনও যাই নিকেন যাই নি সেটাও এক রহস্য। 

প্রাণসখা শৈশব কৈশােরে প্রাণসখা হয় নাখেলার সাথি হয় শৈশবের বন্ধুদের কথা এই কারণেই কারাে মনে থাকে নাখেলা শেষ, বন্ধুত্বও শেষআমি অনেক চেষ্টা করেও খেলার সাথিদের নাম মনে করতে পারছি নাএকজন ছিল শঙ্কর (মাথামােটা শঙ্কর নামে তাকে ডাকা হতাে), তার কথা আমার ছেলেবেলাবইটিতে বিস্তারিত লিখেছিজীবন তার প্রতি করুণা করে নি

পত্রিকার হকারএবং বাদামওয়ালা হয়ে সে কোনােক্রমে জীবন টেনে নিচ্ছিলবছর দুই আগে পত্রিকায় পড়লাম শঙ্কর খুন হয়েছেতার মৃতদেহ ভেসে উঠেছে এক পানাপুকুরেকে বলবে এটাই হয়তাে সেই পুকুর যেখানে আমি শঙ্করকে নিয়ে দাপাদাপি করে শৈশব যাপন করেছি। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

টগর নামের এক খেলার সাথির কথা মনে পড়ছেআমার চেয়ে সে বছর খানিকের বড়খেলাধুলায় অপটু, মারামারিতে অতি দুর্বলদুর্বলরা কথাবার্তায় দড় হয়, সেও তাই ছিলসারাক্ষণ উপদেশ এবং জ্ঞান বিতরণআমাকে সে একদিন গম্ভীর হয়ে বলল, আমার গায়ের রঙ কালাে, কারণ আল্লাহ আমাকে মাটি দিয়ে বানিয়েছেনআর তােমার গায়ের রঙ শাদা, কারণ তােমাকে গু দিয়েবানিয়েছেনভালাে করে হাত শুকে দেখ গুয়ের গন্ধ পাবে(যারা আমাকে সামনা সামনি দেখেছেন তাঁরা জানেন আমার গাত্রবর্ণ কালাে

মনে হচ্ছে শৈশবে ফর্সাভাব ছিলযাই হােক পুরনাে প্রসঙ্গে যাইটগরের কথামতাে আমি আমার হাত শুকলাম এবং গুয়ের গন্ধ পেলামকী সর্বনাশ! বন্ধুবান্ধব যাদের গাত্রবর্ণ গৌর তাদের সবার গায়েই গুয়ের বদ গন্ধ! টগরের কথা বিশ্বাস হলোকাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরে মাকে জিজ্ঞেস করলাম, মা, আমাকে কি আল্লাহ গু দিয়েবানিয়েছেন ? বাসায় বিরাট হাসাহাসি পড়ে গেলআমার মা তার বড় ছেলেকে নিয়ে কোনাে গল্প বলতে গেলেই এই গল্পটা করেন। 

টগরের জ্ঞান বিতরণের আরেকটি গল্প বলিএকদিন সে সবাইকে ডেকে বলল, মাথার উপর দিয়ে প্লেন উড়ে যেতে দেখলেই সবাই যেন দৌড়ে বাড়িতে 

ঢুকে পড়ে কিংবা গাছতলায় দাঁড়ায়কারণ প্লেনের যাত্রীদের পেসাব পায়খানা সব নিচে পড়েট্রেনের বাথরুম যেমন প্লেনের বাথরুমও সেরকম নিচে ফুটো। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

এরপর থেকে আকাশে বিমান দেখা গেলে কিংবা বিমানের শব্দ পাওয়া গেলেই শিশুদের মধ্যে তীব্র চাঞ্চল্য এবং শঙ্কা দেখা দিতকোনােক্রমে দৌড়ে গাছতলায় আশ্রয় নেয়াএকবার সবাই দৌড়াচ্ছি গাছতলার দিকে, এক পথচারী জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে ? আমাদের মধ্যে একজন জবাব দিল, আকাশ থেকে গু পড়ছেপথচারী বললেন, কী সর্বনাশ আসমানের গু! তিনিও ছুটতে শুরু করলেনকী সব রঙিন দিনই না গিয়েছে

আমার এক সঙ্গী ছিল, গাট্টাগুট্টা, বেঁটে, দৌড় চ্যাম্পিয়ান মুহূর্তের মধ্যে ভো দৌড় দিতে পারতছেলেটির নাম মনে করতে পারছি না, তবে তার উজ্জ্বল মুখ এখনাে চোখে ভাসছেএই ছেলে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের এক খেলা বের করে শিশুমহলে বিরাট হৈচৈ ফেলে দিলএমন উদ্ভাবনী খেলার নজির পাওয়া ভারখেলাটা ব্যাখ্যা করিকল্পনা করুন, কোনাে এক ভদ্রলােক বাজার নিয়ে ফিরছেন

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *