কিছু শৈশব-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ

তখনকার বাজার একটু অন্যরকম ছিল। আজকাল যেমন মাছ–সবজি এক ব্যাগে থাকে তখন তা করা হতাে না। মাছের আঁশটে গন্ধ যেন অন্য কিছুতে না লাগে তার ব্যবস্থা করা হতাে। মাছ দড়িতে ঝুলিয়ে এক হাতে নেয়া হতাে, অন্য হাতে আনাজের ব্যাগ। কিছু শৈশব

সেই ভদ্রলােক মাছ হাতে ঝুলিয়ে অন্য হাতে ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ আমার সেই বন্ধু উল্কার বেগে ভদ্রলােকের দিকে ছুটে গেল। এক হ্যাচকা টানে তার হাত থেকে মাছ কেড়ে নিয়ে ডাবল উল্কার বেগে হাওয়া। ভদ্রলােক হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন। বিপদ বুঝে আমরাও দৌড়। 

ঘটনার উত্তেজনায় আমরা বিমােহিত। কী অসম্ভব ঘটনা! কী উত্তেজনা। মাছটা কিছুক্ষণ সবার হাতে হাতে ঘুরল, তারপর আমরা সেই মাছ কুয়ায় ফেলে ভদ্রছেলের মতাে যে যার বাড়িতে ফিরে গেলাম, যেন কিছুই ঘটে নি । 

এই অতি বিপদজনক খেলা নিত্যদিন হওয়ার জিনিস না। নিত্যদিন হতেও । হঠাৎ মক্কেল পাওয়া যেত, যে আমাদের পাড়ার না, বাইরের । অল্পবয়েসি জোয়ান ছেলে না, বুড়াে মানুষ, যিনি মাছ চোরের পেছনে দৌড়াতে পারবেন না, সে–রকম কাউকে পেলে আমাদের চোখে চোখে ইশারা খেলে যেত । টগর উঠে চলে যেত, কারণ সে ভালাে দৌড়াতে পারে না এবং এই খেলাটা তার পছন্দ না। | মাছ–খেলা কতবার খেলা হয়েছে বলতে পারব না, তবে, তিন–চারবারের বেশি না। এই তিন–চারবারই কিন্তু যথেষ্ট। খেলায় যে উত্তেজনা পেয়েছি তার এক সময়ের প্রমত্তা সুরমা নদী এখন তার জৌলুস হারিয়েছে। স্রোতহীন সুরমার বুকে শ্রীহীন বিবর্ণ। দাড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী ঐতিহাসিক কীন ব্রীজ। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ

তুলনা শুধুমাত্র রােলার কোস্টার রাইডের সঙ্গেই হতে পারে। শোঁ শোঁ করে রােলার কোস্টার নামছে। উত্তেজনায় গা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে, সেই সঙ্গে কী আনন্দ! 

মাছ–খেলা কীভাবে বন্ধ হলো এই গল্পটা বলি। এবারে আমাদের মক্কেল জরাজীর্ণ প্রৌঢ়। চোখে চশমা। কুঁজো হয়ে হাঁটছেন। আস্তে আস্তে পা ফেলছেন। তাঁর হাঁটার ভঙ্গি থেকেই বলে দেয়া যায় তিনি শান্ত মানুষ। শিশুদের পেছনে ছুটে বেড়াবার মানুষ না। মাছ চোর খেলার লিডার শিকারের দিকে এগিয়ে গেল। তার টেকনিক এখন অনেক উন্নত। আগে সে দৌড়ে যেত। এখন দৌড়ে যায় না। শিকারের পেছনে পেছনে আস্তে আস্তে কিছুক্ষণ হেঁটে হঠাৎ মাছ ধরে টান দেয়। 

এইবার এই কাণ্ড ঘটল। তবে আমাদের লিডার হ্যাচকা টানে মাছ ছুটাতে পারল না। বৃদ্ধ বেশ শক্ত করেই মাছের দড়ি ধরে রইলেন। আমাদের লিডারের উচিত ছিল মাছ ছেড়ে দিয়ে চলে আসা। সে তা না করে দড়ি টানাটানি খেলার মতাে মাছ টানাটানি করতে লাগল। প্রৌঢ় খুবই অবাক হয়ে বললেন, তােমার ঘটনা কী? মাছ ধরে টানতেছ কেন ? তুমি কোন বাড়ির ছেলে ? মাছটা পছন্দ হয়েছে ? বাসায় নিতে চাও ? আচ্ছা যাও নিয়ে যাও। 

লিডার মাছ নিয়ে বিষন্দু মুখে ফিরে এলাে। এইবার দৌড়ে এলাে না। প্রৌঢ় চশমার ফাক দিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। আমাদের মধ্যে মাছ নিয়ে 

কোনাে উত্তেজনা তৈরি হলাে না। বরং বিষাদ ভর করল। ঈশপ সাহেব বেঁচে থাকলে এই গল্প শুনলে সুন্দর কোনাে মরাল বের করতেন। আমি পারছি না। 

মাছ চোর লিডার কিছুদিন পর আরেকটা খেলা আবিষ্কার করল। মানুষের জিনিসপত্র কুয়ায় ফেলা দেয়া। তখনকার সিলেট শহরে বাড়িতে বাড়িতে কুয়া ছিল। প্রতিটি কুয়াই ছিল যথেষ্ট গহীন। কুয়াতে কিছু ফেললে পর কুয়ার ভেতর থেকে শব্দ পাওয়া যেত। শব্দ কখন শােনা যাবে, প্রতীক্ষার সেই সময়টাই ছিল উত্তেজনার। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ

একদিন উত্তেজনা অনেকদূর বাড়াবার ব্যবস্থা হলাে। আমাদের লিড়ার কুয়ার ভেতর জ্যান্ত মুরগি ফেলে দিল। মুরগির পাখা ঝাপটানাে, চিল্কারে হৈচৈ পড়ে গেল। কুয়ার পাড়ে আমাদের উঁকিঝুঁকি দিতে দেখে খবর রটে গেল, একটা বাচ্চা পানিতে পড়ে গেছে। সব মায়েরা ছুটে এসে যার যার বাচ্চা জড়িয়ে ধরলেন। এরপর শুরু হলাে মুরগি উদ্ধার অভিযান। কুয়াতে বালতি নামানাে হলাে। বালতি দেখে মুরগি যখন লাফ দিয়ে উঠবে, তাকে তখন টেনে তােলা হবে। মুরগি বালতিতে উঠল ঠিকই, কিন্তু বালতি কিছুদূর টানার পরই সে ঝাঁপ দিয়ে বালতি থেকে পানিতে পড়ে গেল। যতবার বালতি নামানাে হয় ততবারই এই অবস্থা। দর্শকদের কী উত্তেজনা! 

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *