বিভিন্ন পীর–ফকির এসে এই মহিলাকে ঝাড়তাে। ফকিরের ঝাড়ার একটা দৃশ্য এখনাে মনে আছে। মহিলাকে বসানাে হয়েছে ভেতরের উঠোনের এক চৌকিতে । তিনি বিরাট ঘােমটা টেনে মাথা নিচু করে বসে আছেন। তাঁর সামনে ফকির সাহেব একটা শলার ঝাড় হাতে দাঁড়ানাে।
ফকির সাহেবের মুখভর্তি দাড়ি। কুস্তিগিরের মতাে বলশালী শরীর। ফকির সাহেব যখন মন্ত্র পড়ে ফুঁ দেন তখন পারুলের বাবা তার স্ত্রীর মাথায় এক কলসি পানি ঢালেন। পানি ঢালা শেষ হতেই ফকির সাহেব শলার ঝাড় দিয়ে মহিলার পিঠে প্রচণ্ড বাড়ি দেন। মহিলা ও আল্লাগাে বলে চাপা চিৎকার করেন। এই হচ্ছে প্রক্রিয়া। চিকিৎসার শেষ পর্যায়ে কী হয় সেটা আমার দেখা হয় নি। কারণ ফকির সাহেব এক পর্যায়ে পুলাপান সরাও বলে হুঙ্কার দিতেই আমাদের বের করে দেয়া হয়।
আমার প্রতি পারুল আপা তীব্র যে মমতা দেখিয়েছেন তার উৎস ফ্রয়েডীয়। তখন কিছুই বুঝি নি, এখন বুঝতে পারছি। আমি পশ্চিমা দেশের লেখক হলে কী কারণে ফ্রয়েডীয় বলছি ব্যাখ্যা করতাম। বাংলা ভাষার লেখকদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে।
কিছু শৈশব-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ
আমাদের পাড়ায় এক বিহারি পরিবার থাকত। তাদের তিন মেয়ে, তিনটাই পরীর মতাে সুন্দর। মেয়ে তিনটা কারাে সঙ্গে মিশত না। বাড়ির ভেতর ঘুরঘুর করত। মা’কে কাজে সাহায্য করত। ঐ বাড়িতে আমার খুবই যাতায়াত ছিল। তিন বােনের মধ্যে ছােট দুজনকেই আমি আলাদাভাবে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছি। যতদূর মনে পড়ে দুজনই মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়েছে।
বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার ব্যাপারে আমার মধ্যে লজ্জা কখনাে কাজ করে নি। আমি সরাসরি বলেছি, বড় হয়ে আমাকে বিয়ে করবে ?
বিয়ের প্রতি আমার প্রবল আগ্রহের কারণ মহাজন সাহেবের বাড়ি। আমাদের বাসার কাছেই এক ব্যবসায়ী দ্রলােকের বিশাল বাড়ি ছিল। সে বাড়িতে কিছুদিন পরপরই বিয়ের অনুষ্ঠান হতাে। অতি জঁকজমকের বিয়ে । পরিবারসুদ্ধ সেই বাড়িতে আমাদের দাওয়াত থাকত। আমি সারাদিনই বিয়ে বাড়িতে পড়ে থাকতাম আর ভাবতাম কবে যে বড় হয়ে বিয়ে করব!
পৃথিবীর সবচে বড় ঘড়ি ? ঐতিহাসিক আলী আমজাদের ঘড়ি
একদিনের কথা মনে আছে। ছুটির দিন, বাবার অফিস নেই, ঘরে বসে বই পড়ছেন। মা বাবার কাছে নালিশ করলেন, তােমার ছেলেকে শক্ত করে একটা চড় দাও।
বাবা বই থেকে মুখ না সরিয়েই বললেন, তার অপরাধটা কী?
মা বললেন, সে বিয়ে করতে চায়।
বাবা বললেন, বিয়ে করতে চায়, বিয়ে দাও। তার পছন্দের কোনাে মেয়ে কি আছে ?
কিছু শৈশব-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ
মা কিছু বলার আগেই আমি চিকন গলায় বললাম, আছে। বাবা শব্দ করে হেসে উঠলেন। তিনি মা‘কে বললেন, আমি আমার এই ছেলেকে খুব অল্পবয়সে বিয়ে দেব। আমার চোখের সামনে ছেলে তার বউ নিয়ে রান্নাবাটি খেলবে— এই দৃশ্য দেখব। আমি দুইজনকে দুই কোলে নিয়ে বেড়াতে যাব।
বাবার এটা মুখের কথা ছিল না। তিনি তাঁর কর্মজীবনে যেখানেই কোনাে রূপবতী মেয়ে দেখেছেন সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বড়ছেলের সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে দেবার কথা ভেবেছেন।
পরম করুণাময় আমার বাবার প্রতি তেমন করুণা করেন নি। তিনি তাঁর কোনাে ছেলেমেয়ের বিয়ে দেখে যেতে পারেন নি। অন্য বাড়ির কোনাে মেয়ে এসে তাকে মিষ্টি গলায় বাবা‘ ডাকে নি। অন্য বাড়ির কোনাে ছেলে তাঁর সামনে পুত্রসম এসে দাঁড়াবার সুযােগ পায় নি । আহারে!
পিতা শৌখিনদার! নেত্রকোনা এবং সিলেট অঞ্চলে ‘শৌখিনদার‘ শব্দটা প্রচলিত। শৌখিনদার হলাে বড়লােক পিতার অলস সন্তান। কাজ নাই, কর্ম নাই, দুশ্চিন্তা নাই। জীবন চর্যা শখ মিটানােতে সীমাবদ্ধ। পায়রা উড়াও, মােরগের লড়াইয়ের ব্যবস্থা করাে, বন্দুক হাতে পাখি শিকারে যাও। জীবনের উদ্দেশ্য একটাই–– শখ মিটানাে।
কিছু শৈশব-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ
আমার বাবা ছিলেন দরিদ্র শৌখিনদার। অন্য শৌখিনদারের সঙ্গে তার আরেকটা পার্থক্য ছিল— জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বড় ছিল।
তাঁর ফটোগ্রাফির শখ ছিল। যেখানে যেতেন কোডাক ক্যামেরা সঙ্গে থাকত। বাসার একটা ঘরে ডার্করুম বানিয়ে নিজেই ছবি ডেভেলপ করতেন। আমার জীবনের আনন্দময় স্মৃতির একটি হলাে, সব ভাইবােন পানির গামলার চারপাশে গােল হয়ে বসে আছি। গামলায় পােস্টকার্ড সাইজ শাদা কাগজ ছাড়া হয়েছে। আস্তে আস্তে কাগজে রঙ ধরছে। ছবি ভেসে উঠছে। কী দুর্দান্ত ম্যাজিক! বাবা ম্যাজিশিয়ান। | তাঁর বই কেনার শখ ছিল। বড় বড় ট্রাঙ্ক ভর্তি ছিল বইয়ে। প্রতি শীতে একবার সমস্ত বই বের করে রােদে দেওয়া হতাে। এই কাজটা করতাম আমরা ভাইবোনরা। বাসার সামনে পাটি পেতে গাদাগাদা করে বই রাখা। রুটি ভাজার মতাে বই উল্টে দেয়া।
বাসার সামনের রাস্তা দিয়ে যারা যেত তারাও দৃশ্যটা আগ্রহ নিয়ে দেখত। কেউ কেউ কাছে এসে দাঁড়াত; বিস্মিত গলায় বলত, এত বই!” আমার খুব আনন্দ হতাে। আমি গম্ভীর গলায় বলতাম, আরাে আছে। ঘরে রাখা আছে। এটা মিথ্যা ভাষণ। সব বইই রােদে দেয়া হয়েছে।
কিছু শৈশব-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ
তাঁর মহাপুরুষদের ছবি বাঁধিয়ে ঘরে টানিয়ে রাখার শখ ছিল। ঘরভর্তি শুধু ছবি । মাইকেল মধুসূদন যেমন আছেন, জর্জ বার্নাড শ‘ও আছেন। কোন ছবিটা কার এটা জানা আমাদের বাধ্যতামূলক ছিল। বার্নাড শ‘র ছবি কোনটা তা আমি যেমন জানতাম আমাদের কাজের ছেলে রফিকও জানত।
তাঁর গান–বাজনার শখ ছিল। প্রতি সপ্তাহে বাসায় গানের আসর হতাে। গভীর রাত পর্যন্ত গানবাজনা চলত। তিনি নিজে বেহালা বাজানাে শিখবেন বলে বেহালা কিনেছেন। ওস্তাদ রেখে বেহালা শেখার সামর্থ্য হয় নি বলে কোনােদিন বেহালা বাজানাে হয় নি। দীর্ঘদিন তিনি এই বেহালা যক্ষের ধনের মতাে আগলে রাখলেন।
আমি লেখক জীবনের এক পর্যায়ে হিমু নিয়ে উপন্যাস শুরু করলাম। হিমু’র বাবা ছেলেকে মহাপুরুষ বানানাের চেষ্টা করেন। নানান পরিকল্পনা কঠিন ট্রেনিং। এই চরিত্রের ধারণা কি আমি আমার বাবার কাছ থেকে পেয়েছি ? সম্ভাবনা একেবারেই যে নেই তা–না। বাবা একই কাজ করেছেন। ছেলেমেয়েদের নানান বিষয়ে আগ্রহী করার চূড়ান্ত চেষ্টা চালিয়েছেন। যেমন তিনি ঘােষণা দিলেন, ‘সঞ্চয়িতা থেকে কেউ পুরাে একটা কবিতা মুখস্থ শােনাতে পারলে একআনা পয়সা পুরস্কার। আমরা মহাউৎসাহে কবিতা মুখস্থ করতে লেগে গেলাম। | ছবি আঁকার দিকে আমাদের সবার প্রবল ঝোঁক। বাবা ঘােষণা করলেন, ছবির অ্যাক্সিবিশন হবে, সবাই ছবি এঁকে জমা দাও। ফার্স্ট প্রাইজ দুই আনা, সেকেন্ড প্রাইজ এক আনা। আমরা মহাউৎসাহে ছবি আঁকায় লেগে গেলাম।
আমার গল্পের বই পড়ার তীব্র নেশা। একদিন আমাকে নিয়ে কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সদস্য করে দিলেন। সপ্তাহে দুটা করে বই আনা যাবে। আমি তখন ক্লাস টুতে পড়ি। আমার ধারণা কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের আমিই সর্বকনিষ্ঠ সদস্য।
Read more