কিছু শৈশব-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

লেখালেখিতে উৎসাহী করার জন্যে প্রতি বছরই তিনি তার সব ছেলেমেয়েকে একটা করে ডায়েরি দিতেনআমাদের দায়িত্ব ছিল, ডায়েরি ভর্তি করে গল্পকবিতা লিখতে হবে। 

কিছু শৈশব

একটা ঘটনা বলিআমার সর্বকনিষ্ঠ ভাই আহসান হাবীব তার ডায়েরিতে একটা কবিতা লিখে বাবার কাছে জমা দিলকবিতার শিরােনাম জিনিশ তুলিবে। 

জিনিশ তুলিবেজিনিশ পাইলে তুলিবে তুলিবে তুলিবে তুলিবে যদি না তুলিবে তবে পরে হইবে দরকার। 

বাবা বললেন, কবিতা তাে অতি হৃদয়গ্রাহী হয়েছে, কিন্তু বাবা এর অর্থ কী

আহসাব হাবীব বলল, সে নানান সময় দেখেছে মূল্যবান জিনিস বারান্দায়, ঘরের কোনায় পড়ে থাকে, কেউ তুলে গুছিয়ে রাখে নাপরে যখন দরকার হয় তখন খুঁজে পাওয়া যায় নাএই বিষয়ে কবিতা। 

বাবা বললেন, অসাধারণউপদেশমূলক সাহিত্যের প্রয়ােজন আছেআরাে লেখ। 

বাবার একটি বিচিত্র অভ্যাসের কথা বলিতিনি ছেলেমেয়েদের নাম বদলাতে পছন্দ করতেনহঠাৎ একদিন ঘোষণা করবেন, আজ থেকে তােমার এই নাম। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

আমার শুরুর নাম ছিল শামসুর রহমানফয়জুর রহমানের সঙ্গে মিলিয়ে শামসুর রহমানহঠাৎ একদিন হয়ে গেল হুমায়ূন আহমেদজাফর ইকবালের ডাক নাম ছিল বাবলু কিংবা বাবুলছােটবােনের নাম প্রথমে ছিল শেফালি, পরে হয়ে গেল সুফিয়া আহসান হাবীবের নাম ছিল কুদরতে খুদা। 

তবে আহসান হাবীবের নাম বাবা বদলান নি, আমি বদলেছিআমি তখন ক্লাস টেনে পড়িথাকি বগুড়ায়একদিন বাবাকে ভয়ে ভয়ে বললাম, কুদরতে খুদা নামটা আমার পছন্দ না। 

বাবা বললেন, কেন পছন্দ না ? কুদরতে খুদা আমাদের দেশের এত বড় একজন সায়েন্টিস্ট। 

আমি বললাম, তারপরেও পছন্দ না। সে যখন বড় হবে তখন তার এই নাম নিয়ে মন খারাপ করবে। 

ঠিক আছে তুই তার একটা নাম দে, যে নাম বড় হয়ে সে অপছন্দ করবে নাআমি নাম দিলাম আহসান হাবীবকবি আহসান হাবীব সাহেবের নামের সঙ্গে মিলিয়ে এই নাম নাআমাদের ক্লাসে আহসান হাবীব নামের ব্রিলিয়ান্ট এক ছাত্র ছিল তার সঙ্গে মিলিয়ে রাখা নাম। 

আমার ধারণা বাবা আরাে কিছুদিন বেঁচে থাকলে আমাদের সবার নাম আরেক দফা পাল্টাতেন। 

বাবার কাছ থেকে জেনেটিক্যালি আমি যা পেয়েছি তা হলাে মুগ্ধ হবার ক্ষমতাতিনি অতি তুচ্ছ জিনিসে মুগ্ধ হতেনতার চোখে পানি চলে আসতআমিও অতি তুচ্ছ জিনিসে মুগ্ধ হইবাবার মুগ্ধতার একটা নমুনা দেইআমরা তখন পিরােজপুরে জাফর ইকবাল বারান্দায় বসে আছেরাত

কিছু শৈশব-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

বারান্দায় হাত মুখ ধুয়ে সে ঘুমাতে যাবেহঠাৎ সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে বসল, কত তারা আকাশে

বাবা মােহিতকী সুন্দর একটা বাক্য কত তারা আকাশেতিনি মুগ্ধতা ধরে রাখতে পারলেন নাএকটা নাটক লিখে ফেললেননাটকের নামকত তারা আকাশে। 

পুলিশের জটিল চাকরিতে কোনাে ছুটিছাটা নেইরাত দশটাএগারােটার আগে কোনােদিনই বাসায় ফিরতেন নাএর মধ্যেও লেখালেখির সময় বের করতেনঅনেকবার গভীর রাতে ঘুম ভেঙে দেখেছি, তিনি বুকের নিচে বালিশ রেখে নিবিষ্ট মনে লিখছেন। 

আমি যখন ক্লাস টেনে পড়ি তখন তাঁর একটি বই প্রকাশিত হয়গল্প সংকলননাম রিক্তশ্রী পৃথিবীসস্তা নিউজপ্রিন্টে ছাপা কভারে একটি মেয়ের ছবি, সেই ছবি আমার আঁকা অতি অখাদ্য এক প্রেস থেকে বাবা নিজেই বইটি ছাপিয়েছেনবইটি কিছুটা দৃষ্টিনন্দন করা যায় কিনা সেই চেষ্টায় তিনি লাল রঙ কিনে আনলেনপিতাপুত্র মিলে বইয়ের চারদিক লাল রঙ করলামবইটির চেহারা আরাে খারাপ হয়ে গেলবাবা তাতেও মুগ্ধবাহ, ভালাে হয়েছে তাে

পাঠক মাত্রই জানতে চাইবেন গল্পগুলি কেমন ? পুরনাে ধারার লেখকদের গল্পের মতো গল্পপ্রচুর আবেগফ্লাওয়ারী ভাষাচরিত্র চিএনের চেয়ে ভাষার 

কিছু শৈশব-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

পড়াশােনা নামক কষ্টকর অধ্যায়ের শুরু কিশােরী মােহন পাঠশালায়এটি এখন কিশােরী মােহন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। 

খেলা প্রধানঅপ্রধান বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়াএই মুহূর্তে একটি গল্প মনে পড়ছেএকটা কাজের ছেলের বসন্ত রােগ হয়েছেসে বলছে বড় কুলচায়‘। সে বলতে চাচ্ছে বড় চুলকায়, সে তার সাহেবকে এরকম বলতে শুনেছে এখন গুবলেট করে ফেলেছেএখন বলছে কুলচায়বিষয়টা নিয়ে গল্প লেখা চলে না, প্রসঙ্গক্রমে আসলে আসতে পারে। 

বাবার জীবনে প্রকাশিত একমাত্র বইটির কোনাে কপি আমাদের কারাের কাছেই নেইথাকলে আরেকবার পড়তাম। 

রিক্তশ্রী পৃথিবীপ্রকাশ করা নিয়ে অনেককাল পরে আমি নিজে একটি গল্প লিখিগল্পটির নাম আনন্দ বেদনার কাব্যগল্পটি দিয়ে দিচ্ছিগল্প পড়লেই আমার বাবাকে কিছুটা চেনা যাবে। 

আনন্দ বেদনার কাব্য বইটির নাম রিক্তশ্রী পৃথিবী। 

প্রচ্ছদে একটি মেয়ের মুখের ছবি। মেয়েটি কাঁদছেতার মুখের পাশে একটি গ্লোবএকটি বিকটদর্শন নরকঙ্কাল গ্লোবটি বাঁ হাতে জড়িয়ে ধরে আছেকঙ্কালটির ডান হাতে একগুচ্ছ রজনীগন্ধা। যথেষ্ট জটিলতাপৃথিবীর রিশ্ৰী ফুটিয়ে তােলার আয়ােজনে কোনাে ত্রুটি নেইধরনের প্রচ্ছদচিত্রের বইগুলাের পাতা সাধারণত উল্টানাে হয় না

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *