তোমার শরীরের যে অবস্থা— এই অবস্থায় বই লেখা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। তুমি অতি দ্রুত কোনো হাসপাতালে বা ক্লিনিকে ভর্তি হও। আজ কালের মধ্যে ভর্তি হও।আলাউদ্দিন বললেন, আমার শরীরটা দুর্বল, এছাড়া আর কোনো অসুখ বিসুখ নাই।হাজী সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন, কী বলছ অসুখ বিসুখ নাই! তোমার তো হাত পায়ের সব আঙুল নীল হয়ে আছে।
আমার ধারণা তোমার সিরিয়াস কিছু হয়েছে। অবশ্যই তুমি আজ ডাক্তারের কাছে যাবে। আমি সন্ধ্যাবেলা গাড়ি নিয়ে আসব। তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব। ডাক্তার বললে হাসপাতালে ভর্তি হবে।আলাউদ্দিন বললেন, জি আচ্ছা।তুমি তৈরি থাকবে। আমি ঠিক চারটা থেকে পাঁচটার মধ্যে চলে আসব। হামিদাকে আজ আর অনলাম না। তোমাকে ডাক্তার নিশ্চয়ই হাসপাতালে ভর্তি করবে। হামিদা খালি বাড়িতে এসে কী করবে! ও কয়েক দিন পরে আসুক। আমি তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাব।জি আচ্ছা। আপনার অনেক মেহেরবানি।
মেহেরবানির কিছু না, এটা আমার কর্তব্য। তুমি তো বাইরের কেউ না। তুমি এখন আমার আত্মীয়। ভাগ্নিজামাই। তোমাকে তো আমি আসল কথাই বলতে ভুলে গিয়েছি। তোমার কাছে পুলিশ আসতে পারে। যদি আসে, বলবে আমি কিছুই জানি না। আমার শরীর খারাপ। রাত আটটার সময় দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছি।আলাউদ্দিন বলল, আপনার কথা বুঝতে পারছি না। আমি কী জানি না? ইয়াকুবকে কখন কুকুরে কামড়েছে আর কখন সে মারা গেছে কিছুই জানো। না।আমি তো আসলেই কিছু জানি না। ইয়াকুব কে?
কিছু যদি না জানো তাহলে ইয়াকুব কে এটাও জানার দরকার নেই। এই জগতে যত কম জানা যায় ততই ভালো। আমি উঠলাম। বিকেলে আসব। হামিদাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসি। তুমি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যাও।আপনি যা বলবেন আমি তাই করব। হাসপাতালে ভর্তি হতে বললে ভর্তি হব। যদি বলেন এই বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে আমি চলে যাব।
হাজী সাহেব ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, সেটা আমি জানি। তুমি নিতান্তই ভালো মানুষ। আফসোস, হামিদা এটা বুঝতে পারছে না। যাই হোক তোমার ঘরে আমি আর থাকতে পারছি না। পচা গন্ধে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। তোমার বাবুর্চিকে বলে সে যেন খাট পালঙ্ক সরিয়ে মরা ইঁদুর খুঁজে বের করে। গন্ধেই তো। মানুষ অসুস্থ হয়ে যাবে।
আলাউদ্দিন বললেন, আমার বাবুর্চি বিষয়ে একটা কথা ছিল। হামিদা বলেছে বাবুর্চিকে বিদায় করে দিতে। আজকেই চলে যেতে বলেছে। তাকে কি বিদায় করে দেব।হাজী সাহেব বললেন, আরে না ও থাকুক। যেতে হলে পরে যাবে। এখন। তাকে বলে— পচা ইঁদুরটা খুঁজে বের করতে।
আলাউদ্দিন চুপ করে রইলেন। পচা ইদরটা কোথায় তিনি জানেন। বুক। শেলফের পেছনে। কুটু মিয়াই এনে রেখেছে। কুটুর যুক্তি হলো— মদ যারা খায়। তাদের মুখ থেকে মদের গন্ধ বের হয়। ঘরে কোনো পচা ইঁদুর থাকলে সেই ইঁদুরের বিকট গন্ধে অন্য গন্ধ কেউ টের পাবে না। আলাউদ্দিন কুটুর বুদ্ধি দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। আসলেই তো ঘটনা সে-রকম। হাজী সাহেব কিছুই টের পান নি। পচা ইঁদুরের গন্ধে আলাউদ্দিনের নিজের অসুবিধা হচ্ছে না। পচা গন্ধটা নাকে সয়ে গেছে।
হাজী সাহেব দোতলার সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন। সিঁড়ির গোড়ায় কালো কুকুরটা দাঁড়িয়ে আছে। তার সঙ্গে আরেকটা কুকুর যুক্ত হয়েছে। দ্বিতীয় কুকুরটা ছোট। দুটা কুকুরই তাকিয়ে আছে তার দিকে। তাদের চোখ চকচক করছে। শ্বাপদ প্রাণীদের চোখ রাতে জ্বলে, এদের দেখা যাচ্ছে দিনেই জ্বলছে। হাজী সাহেব উপর থেকে বললেন- এই যাহ! দুটা কুকুর দুদিকে সরে গেল। তবে বেশি দূর গেল না। মাঝখানে জায়গা রেখে দুপাশে দাঁড়াল। এবং তাকিয়ে রইল হাজী সাহেবের দিকে। এক মুহূর্তের জানো ও দৃষ্টি সরালি না।
হাজী সাহেব একবার ভাবলেন কুটুকে সঙ্গে নিয়ে আসবেন। হাতে লাঠিসোঠা থাকবে। কুকুর দুটিকে দেখতে ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছে না। রাস্তার নেড়ি কুকুর যেরকম থাকে সে-রকম। কিন্তু এরাই তো ইয়াকুবকে কামড়ে মেরে ফেলেছে। যদি তাকে তাড়া করে। তাছাড়া এদের চোখের দৃষ্টি ভালো না। হাজী সাহেব নিচে নেমে এলেন। তিনি ঠিক করে রেখেছেন যদি তাকে দেখে কুকুর দুটা কাছে এগিয়ে আসে তাহলেই দোতলায় উঠে কুটুকে নিয়ে আসবেন। কুকুব দুটা যে-রকম দাঁড়িয়ে ছিল সে-রকম দাঁড়িয়ে রইল। হাজী সাহেব উঠোনে নামলেন।
কুকুর দুটা এখনো তাকিয়ে আছে। লেজ নাড়ছে, কিন্তু নড়ছে না। তিনি গেটের দিকে এগুচ্ছেন। কুকুর দুটা এখন তার পেছনে পেছনে আসছে। তার কাছে হঠাৎ মনে হলো এরা তাঁকে কামড়াবে। অবশ্যই কামড়াবে। যে-কোনো মুহূর্তে দুজন দুদিক থেকে তাঁর গায়ে ঝাপিয়ে পড়বে। আতঙ্কে হাজী সাহেবের শরীর হিম হয়ে গেল। তিনি শুনেছেন মানুষ যদি ভয় পায় কুকুর সেই ভয় বুঝতে পেরে আরো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। ভয় পাওয়া যাবে না।
কিন্তু তিনি ভয়ের হাত থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না। তার কপাল ঘামছে। প্রবল ইচ্ছা করছে দৌড় দিতে। তিনি গেটের কাছাকাছি চলে এসেছেন। কুকুর দুটার কিছু বোঝার আগেই তিনি দৌড়ে গেট পার হতে পারবেন। কিন্তু দৌড়ানো ঠিক হবে না। কুকুরের সামনে যারাই দৌড় দিয়েছে তারাই কুকুরের কামড় খেয়েছে। ইয়াকুব হঠাৎ ভয় পেয়ে দৌড় দিয়েছিল বলেই কামড় খেয়েছে।
হাজী সাহেব গেট পার হলেন। এখন তিনি রাস্তায়। রাস্তার পাশে গাছের নিচে একটা খালি রিকশা আছে। রিকশায় কোনোমতে উঠে পড়তে পারলে আর ভয় নেই। চলন্ত রিকশার কোনো যাত্রীকে কুকুর কামড়েছে বলে শোনা যায় না। এই কুকুর দুটা পাগলা কুকুরও না। পাগলা কুকুরের চালচলন আলাদা থাকে। এরা সারাক্ষণ মুখ হা করে থাকে। মুখ দিয়ে লালা পড়ে। পাগলা কুকুরের লেজ নামানো থাকে। এই কুকুর দুটির লেঞ্জ নামানো না। ভ্ৰাদের মুখ দিয়ে লালা ও পাড়ছে না।
হাজী সাহেব রিকশায় উঠলেন। রিকশাওয়ালাকে ক্ষীণ স্বরে বললেন, বাংলাবাজার যাও। রিকশাওয়ালা রিকশা চালাচ্ছে। কুকুর দুটা পেছনে পেছনে আসছে। আসুক, এখন আর কোনো সমস্যা নেই। হাজী সাহেব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। আর তখনই কুকুর দুটা দুদিক থেকে এসে তার উপর ঝাপিয়ে পড়ল। তিনি উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করলেন। রিকশা উল্টে গেল। কুকুর দুটা পায়ের মাংসে দাঁত বসিয়ে দিয়েছে। রিকশা উল্টে যাবার পরও এরা পালিয়ে গেল না। দাত বসিয়ে রাখল।
তিনি দুই হাত দিয়ে কালো কুকুরটার মাথা সরাতে চেষ্টা করলেন। কালো কুকুরটা তার পা ছেড়ে দিয়ে তার দিকে তাকাল। এবং তার মুখের দিকে এগিয়ে আসতে থাকল। তার কাছে মনে হলো কুকুরটা প্রকাণ্ড হা করেছে। কুকুরটা এখন তার পুরো মাথাটাই তার মুখের ভেতর ঢুকিয়ে নেবে।তিনি চিৎকার করে বললেন, বাঁচাও। আমাকে বাঁচাও।
হাজী সাহেবকে যখন কুকুর কামড়ে ধরেছে তখন হামিদা বাথরুমে গোসল করছিল। শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে শাওয়ারের নিচে মাথা দিয়েছে তখনই সে কুকুর দুটার গর্জন শুনল। সেই সঙ্গে স্পষ্ট শুনল— তার মামা চিৎকার করছেন, বাঁচাও আমাকে বাঁচাও।বাথরুম থেকে আধভেজা হয়ে সে ছুটে বের হলো। সিড়ি দিয়ে সে ছুটে নামছিল এবং চিৎকার করছিল, মামাকে কুকুর মেরে ফেলছে। মামাকে কুকুর মেরে ফেলছে।ঘরটা সুন্দর।
ডাক্তারের চেম্বার বলে মনে হয় না। পরিষ্কার দেয়ালে সুন্দর সুন্দর ছবি। পেইন্টিং না, ফটোগ্রাফ। একটা ছবিতে আট ন বছরের একটি মেয়ে কাঁদছে। তার চোখের পাপড়িতে বৃষ্টির ফোঁটার মতো অশ্রু জমা হয়ে আছে। হামিদা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে ছবিটার দিকে। ডাক্তার সাহেব বললেন, আমার মেয়ের ছবি। আমার তোলা ছবি।হামিদা বলল, অপূর্ব।
ডাক্তার সাহেব বললেন, ছবিটা অপূর্ব ঠিকই। কিন্তু ছবিটার ভেতর ফাঁকি আছে। ফাঁকির কথাটা যেই আপনাকে বলব আপনার আর ছবিটা অপূর্ব মনে হবে না।ফাঁকিটা কী? আমার মেয়ে কাঁদছিল না। ড্রপার দিয়ে এক ফোঁটা পানি তার চোখের পাপড়িতে দিয়ে ছবিটা তোলা। বাইরে থেকে চোখের পাপড়িতে আলো ফেলা হয়েছে যেন নকল অশ্রু বিন্দু ঝকমক করতে থাকে। এখন কি আপনার কাছে ছবিটা আগের মতো সুন্দর লাগছে?
হামিদা বলল, না। কিন্তু আপনি যে ফাঁকির ঘটনা স্বীকার করলেন এই জন্যে ভালো লাগছে। আমরা সবাই নানানভাবে ফাঁকি দেই কিন্তু কখনো স্বীকার করি না।ডাক্তার সাহেব হাসতে হাসতে বললেন ফাঁকির ঘটনা স্বীকার করাও অমাির একটা টেকনিক। যখন রোগীর কাছে ফার্কির ব্যাপারটা স্বীকার করি তখন তারা আমাকে একজন সৎ এবং ভালো মানুষ হিসেবে গ্রহণ করে।
আমার প্রতি তাদের এক ধরনের বিশ্বাস তৈরি হয়। রোগী ভরসা পায়। আমরা যারা মনোবিদ্যার চিকিৎসক তাদের জন্যে রোগীর কনফিডেন্সটা অসম্ভব দরকার।হামিদা বলল, আপনার প্রতি আমার কনফিডেন্স তৈরি হয়েছে। আপনি যদি কিছু জানতে চান আমি বলব। আপনি আমার মাথার ভেতর থেকে কুকুরের ডাকটা দূর করে দিন।ডাক্তার সাহেব বললেন, চা খাবেন?
হামিদা বলল, আমার ঘনঘন চা খাবার অভ্যাস নেই।ডাক্তার সাহেব বললেন, চায়ের একটা কাপ হাতে থাকা মানে এক ধরনের ভরসা। অসহায় বোধ করলে চায়ের পেয়ালা স্পর্শ করবেন। গরম কাপের স্পর্শে মনে হবে জীবন্ত কেউ আপনার কাছে আছে।হামিদা বলল, চা দিন।ডাক্তার সাহেব ফ্লাস্ক থেকে এক মগ চা ঢেলে হামিদার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বললেন— মাঝে মাঝে আমাদের কানে বাস্তব কিছু সমস্যা হয়। ইনার ইয়ারে খুব সূক্ষ্ম একটা হাড় থাকে।
হাড়টা থাকে তরল পদার্থে ডুবানো। এই তরলে যখন কোনো সমস্যা হয় ঘনত্বের সমস্যা, ভিসকোসিটির সমস্যা, ইলেকট্রিক্যাল সমস্যা তখন মানুষ মাথার ভেতর নানা রকম শব্দ শুনে। কেউ শুনে ঝিঝির ডাক, কেউ শুনে ঘুণপোকার ডাক। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একটা উপন্যাস আছে, নাম ঘুণপোকা। সেই উপন্যাসের নায়কের মাথার ভিতর সব সময় ঘুণপোকা ডাকত। আপনি কি উপন্যাসটা পড়েছেন?
জ্বি-না। আমার কানে কোনো সমস্যা নেই। ইএনটি স্পেশালিস্টকে দেখিয়েছি। তারা নানান রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। এবং যে কুকুরগুলির ডাক আমি শুনি ওরা কল্পনার কোনো কুকুর না। এদের অস্তিত্ব আছে। আমি তো আপনাকে বলেছি এরা থাকে আমার বাড়িতে।ডাক্তার সাহেব বললেন, কুকুর নিয়ে আপনি খুব বেশি ভেবেছেন। কারণ এর আপনার সাজানো সংসারে সমস্যা তৈরি করেছে। কুকুরের কারণে ভাড়াটে চলে গেছে।
অতিরিক্ত চিন্তার কারণে কুকুরের ডাক আপনার মাথায় ঢুকে গেছে। মস্তিষ্কের নিউরনে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এ রকম যদি চলতে থাকে আপনি শুধু যে কুকুরের ডাক শুনবেন তা না। কুকুরগুলি দেখতেও পাবেন। হঠাৎ গভীর রাতে যদি ঘুম ভেঙে যায় তাহলে দেখবেন আপনার ধারে কয়েকটা কুকুর বসে আছে। অডিটরি হেলুসিনেশন ভিস্যুয়েল হেলুসিনেশনে রূপ নেবে।এর হাত থেকে বাঁচার উপায় কী?
বাচার একটাই উপায়— হেলসিনেশনের ব্যাখ্যাটা বিশ্বাস করা। এবং হেলুসিনেশনকে গুরুত্ব না দেয়া। তাছাড়া আমি আপনাকে ওষুধপত্র দেব। আগে মনোবিশ্লেষণের মাধ্যমে মনোরোগের চিকিৎসা করা হতো। এখন আমাদের হাতে অনেক পাওয়ারফুল ড্রাগস আছে। আমি যে কথাগুলি বলছি আপনি কি বিশ্বাস হামিদা বলল, বিশ্বাস করার চেষ্টা করছি। পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছি না।কেন পারছেন না? আমি নিজে একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছি। আপনাকে বলব?
বলুন।আমি একশ ভাগ নিশ্চিত কেউ একজন পরিকল্পিতভাবে ঘটনাগুলি ঘটাচ্ছে। যেন আমি আমার বাড়িতে ফিরে না যাই। গোপন কিছু আমার বাড়িতে হচ্ছে। নিষিদ্ধ কোনো কর্মকাণ্ড। তারা চাচ্ছে না আমি সেই কর্মকাণ্ড জেনে ফেলি।ডাক্তার সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, আপনার ধারণা নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড করছে আপনার স্বামী আলাউদ্দিন সাহেব এবং তার হেল্পিং হ্যান্ড মিস্টার কুটু মিয়া?
জি। কুটু মিয়ার সুপারন্যাচারেল কিছু ক্ষমতা আছে।ডাক্তার সাহেব বললেন, আপনি খুব একটা ভুল বিশ্বাস নিয়ে ঘটনার ব্যাখ্যা। করার চেষ্টা করছেন। মানুষকে নানান প্রতিভা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছেসাহিত্যের প্রতিভা, সঙ্গীতের প্রতিভা, বিজ্ঞানের প্রতিভা কিন্তু সুপারন্যাচারেল কোনো ক্ষমতা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠানো হয় নি।
হামিদা বলল, মূসা নবীকে কিন্তু ক্ষমতা দিয়ে পাঠানো হয়েছিল। তিনি হাতের লাঠি যখন মাটিতে ফেলতেন সেই লাঠি সাপ হয়ে যেত।ডাক্তার সাহেব বললেন, ধর্মের সঙ্গে বিজ্ঞানকে মিলানো ঠিক হবে না। থিওসফি এবং পদার্থবিদ্যা এক জিনিস না।কুটুর যে সুপারন্যাচারাল ক্ষমতা আছে এটা আপনি বিশ্বাস করছেন না। আমি কিন্তু এ ব্যাপারে নিশ্চিত। আমি আপনাকে কিছু ঘটনার কথাও বলেছি। আপনার কি ধারণা আমি মিথ্যা কথা বলছি?
না, আপনি সত্যি কথাই বলছেন। আপনি যা সত্যি বলে বিশ্বাস করছেন তাই বলছেন। আপনার সত্যি এবং আমার সত্যি এক নাও হতে পারে। এক কাজ করলে কেমন হয়— আপনি কুটু মিয়াকে এখানে নিয়ে আসুন কিংবা আমাকে তার কাছে নিয়ে চলুন।আপনি যাবেন?
অবশ্যই যাব। মানুষ হিসেবে আমি খুবই কৌতূহলী। আমি তাকে জিজ্ঞেস করব— আমার সবচে প্রিয় খাবারের নাম বলতে। তাকে সেই খাবার তৈরি করতে হবে না। নাম বললেই হবে। আমি নিশ্চিত সে বলতে পারবে না। আমার সবচে প্রিয় খাবার হলো হিদল ভর্তা। এবং আমার প্রিয় পারফিউম হলো— পয়জন। কুটু মিয়ার গা থেকে পয়জনের গন্ধ আসে কি-না দেখি। লেবু ফুলের গন্ধ যদি আসতে পারে পয়জনের গন্ধ আসবে না কেন? কবে যাবেন?
কাল চলুন। দেরি করে লাভ কী? কাল সকাল দশটায় এখানে আসুন, আমি তৈরি থাকব। আজকের মতো বিদায়।হামিদা বলল, আমাকে ওষুধ দেবেন না? ডাক্তার সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, কুটু মিয়ার সঙ্গে দেখা করার পর আপনাকে ওষুব দেব। আপনাকে কী ডোজে ওষুধ দিতে হবে এটা ঠিক করার জন্যে কুটু মিয়ার সঙ্গে দেখা হওয়া দরকার।
হামিদা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল ডাক্তার সাহেব, আপনাকে আমার পছন্দ হয়েছে। আমি খুবই অনাগ্রহ নিয়ে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে এসেছিলাম। সেই অনাগ্রহ এখন আর নেই। আমি নিশ্চিত আপনি আমার মাথা থেকে কুকুরের ডাক দূর করতে পারবেন। তবে, ডাক্তার সাহেব বললেন, তবে মানে! তবে কী?
আমার ধারণা কটু এমন কোনো ব্যবস্থা করবে যে আপনি তার সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না।কুটর এত ক্ষমতা? হ্যাঁ তার এত ক্ষমতা।ডাক্তার সাহেব বললেন, আপনি কন্ডিশন্ড হয়ে আছেন। আপনার রোগ সারতে সময় নেবে। আমি আপনাকে ঘুমের ওষুধ দিচ্ছি। চৌদ্দ মিলিগ্রাম ডরমিকাম। অবশ্যই আজ রাতে আপনি ডরমিকাম খেয়ে ঘুমুবেন। একা ঘুমুবেন না। কাউকে না কাউকে সঙ্গে রাখবেন। আগামীকাল আমি তৈরি থাক। আপনি। চলে আসবেন সকাল দশটায়।
হামিদা বলল, আমি অবশ্যই আসব।হামিদা ডাক্তারের কথা মতো ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমুতে গেল। অন্যদিন ঘুমের ওষুধ খাবার পরেও ঘুম আসতে দেরি হয়। আজ দ্রুত ঘুম এসে গেল। গভীর গাঢ় ঘুম।ভারী নিঃশ্বাসের শব্দে হামিদার ঘুম ভাঙল। কেউ একজন তার কানের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে। নিশ্বাসের গরম হাওয়া গালে লাগছে। হামিদার শরীর হিম হয়ে গেল। কানের কাছে গরম নিঃশ্বাস ফেলছে কে?
ডাক্তার সাহেব তাকে একা ঘুমুতে নিষেধ করেছিলেন। তার পরেও সে একা ঘুমুচ্ছে। কাউকে সঙ্গে নিয়ে সে ঘুমুতে পারে না। মেঝেতে বিছানা করে আসিয়া ঘুমুতে পারত। কিন্তু সে ঘুমের মধ্যে কথা বলে। কাদে। কাজেই তাকে রাখা হয় নি। এখন মনে হচ্ছে ডাক্তার সাহেবের কথা শুনা উচিত ছিল।হামিদার হাতের কাছেই সুইচ বোর্ড। সে ইচ্ছা করলে বাতি জ্বালাতে পারে।
বাতি জ্বালাতে প্রচণ্ড ভয় লাগছে। যদি বাতি জ্বেলে দেখে কানের কাছে একটা ককর নিশ্বাস ফেলছে তাহলে কী হবে? এ রকম সম্ভাবনার কথা ডাক্তার সাহেব বলছেন।হালকা শব্দ হলো ঘরের ভেতর। মেঝেতে কেউ একজন নড়ে উঠল। হামিদা নিশ্চিত অবশ্যই মেঝেতে বড়সড় একটা কুকুর। থাবা গেড়ে বসে আছে। এ রকম কিছু যদি হামিদা দেখে তাহলে ধরে নিতে হবে এই কুকুর সত্যি কুকুর না। এটা তার মনের কল্পনা। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। সত্যিকারের কুকুরের ঘরে। ঢোকার কোনো সম্ভাবনা নেই।
হামিদা বাতি জ্বালাল। মেঝেতে দুটা কুকুর বসে আছে। একটা কালো একটা বাদামি রঙের। কালো কুকুরটা প্রকাণ্ড, বাদামিটা ছোট। ছোট কুকুরটা হা করে আছে। তার মুখ দিয়ে লালা পড়ছে। তারা এক দৃষ্টিতে হামিদার দিকে তাকিয়ে আছে। হামিদা মনে মনে বলল, আমি যা দেখছি তা ভুল। ভিসুয়াল হেলুসিনেশন হচ্ছে। আমাকে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। খুব ঠাণ্ডা রাখতে হবে।
আমি কুকুর দুটার দিকে তাকাব না। আমি খুব শান্ত ভঙ্গিতে খাট থেকে নামব। কুকুর দুটাকে পাশ কাটিয়ে দরজার কাছে যাব। দরজা খুলে ছাদে যাব। সিড়ি বেয়ে দোতলায় নেমে যাব। আসিয়াকে বলব— গরম এক কাপ চা বানিয়ে দিতে। উষ্ণ চায়ের কাপ বন্ধুর মতো এ জাতীয় কী একটা কথা যেন ডাক্তার সাহেব বলেছিলেন।
হামিদা খাট থেকে নামল। দরজা খুলে ছাদে চলে এলো। কুকুর দুটা নিঃশব্দে তার পিছনে পিছনে আসছে। হামিদা ছাদ থেকে নামার সিঁড়ি খুঁজে পাচ্ছে না। সিড়ি-ঘরে সব সময় বাতি জ্বলে, আজ বাতি নেই। কুকুর দুটা ঘড়ঘড় শব্দ। করছে। হামিদা তাকালো কুকুর দুটির দিকে। আতঙ্কে ও বিস্ময়ে হামিদা জমে গেল— কারণ কুকুর দুটি এখন তার উপর ঝাপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই তো লাফ দিল! হামিদা প্রাণপণে দৌড়াল। ছাদের শেষ মাথায় এসে পড়েছে। ছাদের এই অংশে রেলিং নেই। ভালোই হয়েছে। রেলিং থাকলে সে আটকা পড়ে যেত। হামিদা দোতলার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ল।পিজি হাসপাতালের মনোবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক ডা. আরেফিন চৌধুরী হামিদার জন্যে সকাল দশটা থেকে এগারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। হামিদা এলো না।
আরেফিন চৌধুরী বিস্মিত হলেন না। তিনি তার অভিজ্ঞতায় দেখেছেন শতকরা ষাট ভাগ মানসিক রোগী প্রথম সেশনের পর দ্বিতীয় সেশনে ডাক্তারের কাছে আসে না। হয় আপনা আপনি তাদের রোগ সেরে যায়–কিংবা মনোরোগ চিকিৎসকের। কোনো প্রয়োজন তারা বোধ করে না।
