আলাউদ্দিন বললেন, তাড়াহুড়া করার দরকার কী! ধীরে সুস্থে পাই। এখন যে জিনিসটা খাচ্ছি তার নাম কী? এর নাম স্যার জিন।অতি সুস্বাদু। পাইলট স্যার কি এই জিনিস খেতেন? জ্বি খাইতেন। উনার পছন্দের জিনিস ছিল জিন এবং রাম।রাম আবার কী? মিষ্টি জাতীয়। খাইতে ভালো।তোমার সঙ্গে থেকে অনেক কিছু শিখলাম। রাম, লক্ষণ, সীতা… হা হা হা। রাম তো খাওয়া হয় নি। একদিন ব্যবস্থা করা।জি আচ্ছা।
আমি একা একা এতসব ভালো জিনিস খাচ্ছি— আমার খারাপই লাগে। তুমি থাও না কেন? তুমিও খাও। কোনো অসুবিধা নেই। আমার কাছে সব মানুষ সমান। বাবুর্চিও যা খাদ্যমন্ত্রী ও তা। যাও, একটা গ্লাস নিয়ে এসো। খেতে খেতে দুজনে গল্প করি।আমি এইসব জিনিস খাই না স্যার।খাও না? জ্বি না।কোনোদিনই খাও নি? জ্বি না।আফসোস, একটা ভালো জিনিস থেকে বঞ্চিত থেকে গেলে। খুবই আফসোসের কথা। কুটু শোন, তোমার কি গরম লাগছে?
স্যার আইজ গরম ভালো পড়ছে।এক কাজ কর— বাঘটাৰে পানি দাও। পানির মধ্যে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকি।এখন রাইত একটা বাজে। এত রাইতে বাথটাবে নামবেন? কোনো অসুবিধা আছে? জি না।আমি ঠিক করেছি আজ বাথটাবেই ঘুমাব। কেন ঠিক করেছি বলতে পারবে? গরম লাগছে এই জন্যে।হয় নাই। দশে শূন্য পেয়েছ। আজ বাথটাবে গোসল করব, কারণ হলো— মানুষের যখন যা করতে ইচ্ছা হয় তা করা উচিত। মানুষ আর বাজে কত দিন! ঠিক না? জ্বি।
একটা কচ্ছপ তিনশ বছর বাঁচে। আর মানুষের দিকে তাকিয়ে দেখ। যাট হয়েছে কী শেষ। আমার হয়েছে তিপ্পান, আর মাত্র সাত বছর বাকি। কাজেই আমি ঠিক করেছি এখন থেকে যা করতে ইচ্ছা করবে তাই করব? কে কী চিন্তা করছে এইসব নিয়ে ভাবব না।জি আচ্ছা।বাথটাবে পানি লাগাও। গ্লাস শেষ হয়ে গেছে, এই জিনিস আরো দাও।
জি আচ্ছা।আমাদের সুখের দিন শেষ হয়ে আসছে কুটু। বুধবার জামিল চলে আসবে।তাই না? জি। চলে এলেও কিছু করার নেই, সব নিয়তি।জ্বি স্যার নিয়তি।কুকুরের ডাক মনে হয় একটু কমেছে।জ্বি কমছে।সর্বমোট কয়টা কুকুর?এখন আছে পাঁচটা।এরা কী করছে? বাড়ির চারদিকে চক্কর দিচ্ছে?
জ্বি স্যার।খুবই আশ্চর্যজনক ঘটনা। এদের কারণে বাইরের কেউ আমাদের কাছে আসতে পারছে না— এই একটা ভালো দিক। তুমি এখন থেকে এদের এক থালা করে খাবার দিও। জীবে দয়া করে যেই জন, সেই জন সেবিচ্ছে ঈশ্বর। কথাগুলি কে বলেছে ভুলে গেছি কিন্তু খুবই দামি কথা। রোজ এদের ভালোমন্দ খাওয়াবে।
জ্বি আচ্ছা।বাথটাবে কি পানি দেওয়া হয়েছে? আপনার সঙ্গে কথা বলছি তো স্যার।বাথরুমে যাই নাই।আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। বাথরুম থেকে কথা বলো। গ্লাসটা খালি। তাড়াতাড়ি তোমার জিনিস নিয়ে আস। টাইম ইজ শর্ট। অর্থাৎ সময় সীমিত। মাত্র আট বছরেই সব শেষ। আমার আছে মাত্র সাত বছর। বিরাট আফসোস।
রাত তিনটা। বাথটাবে শরীর ডুবিয়ে আলাউদ্দিন শুয়ে আছেন। বাড়ির সমস্ত বাতি নেভানো। তবে বাথরুমে সামান্য আলো আছে। শোবার ঘরে টিভি চলছে। টিভি স্ক্রিনের নীলাভ আলো বাথরুমে পর্যন্ত এসেছে। কুটু মিয়া বাথটাবের পাশে বসে আছে। আলাউদ্দিন চোখ মেলতে পারছেন না। তাঁর কথাও জড়িয়ে আসছে। প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে। তবে তিনি ঘুমুচ্ছেন না— কষ্ট করে জেগে আছেন। তিনি খুবই আনন্দ। পাচ্ছেন। ঘুমিয়ে পড়লেই তো সব আনন্দ শেষ। আনন্দ উপভোগ করতে হলে। জেগে থাকতে হয়।কুটু?
জ্বি স্যার।বড় আনন্দ লাগছে কুট। শুধু চোখ মেলে রাখতে পারছি না— এইটাই সমস্যা।চোখ বন্ধ কইরা রাখেন স্যার।রাতে আর ভাত খাব না।জ্বি আচ্ছা।এখন থেকে একবেলা ভাত খাব। কুকুরদের যখন খেতে দিবে তখন আমাকেও দিও। ওরা যা খাবে আমিও তাই খাব। কুকুর বলে ওদের অবহেলা করা ঠিক হবে না। কবি বলেছেন— জীবে দয়া করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর। কুকুর ও একটা জীব।
জ্বি।পাইলট সাহেব কি কুকুর পছন্দ করতেন? খুবই পছন্দ করতেন। উনার তিন জাতের কুকুর ছিল। এ্যালশেশিয়ান ছিল, জার্মান একটা কুকুর ছিল থাবরা নাকী, আর দুইটা কুকুর ছিল পর্তুগালের। মেয়ে কুকুর। উনি ঐগুলারে আদর কইরা ইকড়ি মিকড়ি নামে ডাকতেন।
উনার বিদেশী আর আমার দেশী নেড়ি কুত্তা। যাই হোক, আমার কাছে দেশী বিদেশী সবই সমান। গাহি সাম্যের গান। আমার চক্ষে দেশী বিদেশী কোনো ভেদাভেদ নাই… আচ্ছা কুটু শোন, প্রায়ই ভাবি একটা কথা তোমাকে জিজ্ঞেস করব। পরে আর মনে থাকে না। এখন মনে পড়েছে। জিজ্ঞেস করি? জ্বি স্যার করেন।পাইলট সাহেব ছাড়াও তো কুয়েতি এক ভদ্রলোকের বাড়িতে তুমি কাজ করতে। তার কথা তো তুমি কিছু বলে না। উনি লোক কেমন ছিলেন?
অতি ভালো লোক ছিলেন স্যার। উনার তিন স্ত্রী ছিল। স্ত্রীদের সঙ্গে বনিবনা হইল না। আলাদা বাড়ি বানায়ে থাকা শুরু করলেন।শুধু তুমি আর উনি? জি।উনার বাড়িতে কি বাথটাব ছিল? উনি আশীর মানুষ, উনার বাড়িতে বাথটাব তো থাকবই। উনার বাথটাবের সব ফিটিংস ছিল সোনার।বলো কী? উনার বাথরুমে সোয়ানা ছিল, জুকুচি ছিল।ঐগুলা কী?
সোয়ানা হইল পানির গরম ভাপ গোসলের ব্যবস্থা। আর জুকুচি বাথটাবের মতো পানির বুদবুদ হয়। শইলে পানি দিয়া আপনা আপনি ম্যাসাজ হয়।উনার নাম কী? শেখ আব্দাল রহমান। অত্যন্ত পরহেজগার আদমি ছিলেন স্যার। যখন উনার শরীরে গোটা গোটা ফোসকা উঠল, উনি বিছানা থেইকা উঠতে পারেন না–তখনো নামাজ কাজা করে নাই। শুইয়া শুইয়া আঙুলের ইশারায় নামাজ পড়ছেন।আলাউদ্দিন বিস্মিত হয়ে বললেন, উনার শরীরেও ফোসকা উঠেছিল না কি?
কুটু বলল, জ্বি।সালাউদ্দিন বললেন, ফোসকার ভেতরে পোকাও ছিল? জ্বি।এটা খুবই আশ্চর্যজনক ঘটনা তোমার ভাগ্যে সব ফোসকাওয়ালা লোক পড়ে যাচ্ছে।জ্বি। এইটা ভাই মনটা খারাপ।আলাউদ্দিন কুটুকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললেন, মন খারাপ করবে না। তাদের কপালে ছিল ফোসকা। তুমি আমি কী করব বলো। তোমার আমার কিছুই করার নাই…।
বাক্য শেষ করার আগেই আলাউদ্দিন ঘুমিয়ে পড়লেন। মাঝে মাঝে কুকুরের চিৎকারে ঘুম ভাঙ্গে। তিনি ভীত গলায় ডাকেন— কুটু।কুটু তার ঘর থেকে সাড়া দেয়— জ্বি স্যার।আলাউদ্দিন সাহেবের ভয় কেটে যায়, তখন তার গল্প করতে ইচ্ছা করে।তাঁর কাছে মনে হয় আহারে মানব জনম বড়ই মধুর। আল্লাহপাক মানুষ বানিয়ে তাকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে বলেই না তিনি এত আনন্দ করতে পারছেন।
মুরগি বানিয়ে পৃথিবীতে পাঠালে তো কুটু মিয়া জাতীয় কেউ একজন তাকে রান্না করে ফেলত। লোক খেয়ে বলত— মজা হয়েছে তবে ঝাল একটু বেশি। গরু বানিয়ে পৃথিবীতে পাঠালে লোকজন তার শরীরের চামড়ায় জুতা বানিয়ে হাঁটাহাঁটি। করত। তার কত সৌভাগ্য মানুষ হয়ে তিনি পৃথিবীতে এসেছেন। পাইলট স্যারের মতো ভাগ্যবান হতে পারেন নাই।
জীবনে কখনো বিমানে চড়েন নাই পাইলট হওয়া তো দূরের কথা। পাইলট না হয়েও তিনি যা পেয়েছেন তাও তো কম না। এই পরম সৌভাগ্য নিয়ে কথা বলার জন্যে তিনি ছটফট করতে থাকেন। এক সময় অস্থির হয়ে ডাকেন, কুটু কুটু কুটু।কুটু সাড়া দেয় না। কুকুরগুলি ঘেউ ঘেউ করতে থাকে।আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে? কে দেখা করতে এসেছে? ঐ যে লোকটা শইল্যে বন ঘেরান।কুটু মিয়া? জ্বে কুটু মিয়া। আাগো আমার ডর লাগতাছে।
হামিদা বিছানায় শুয়ে ছিল, উঠে বসল। তার ইচ্ছা আসিয়াকে একটা কড়া। ধমক দেয়। আহ্লাদী ধরনের কথা অসহ্য লাগে। আমার ভয় লাগতাছে মানে কী? ভর লাগার কী হয়েছে? এইসব হচ্ছে মন রাখার কথা। আলিয়া বুঝতে পারছে কুটুকে তার আপা অপছন্দ করছে- কাজেই সে ডুর লাগার কথা বলছে। যদি এমন হতো সে কুটুকে পছন্দ করত তাহলে আসিয়া বলত— লোকটা এমুন ভালো। দেখলেই মনে শান্তি শান্তি লাগে।হামিদা বলল, সে কী চায়?
আফনের সাথে কথা বলতে চায়। হাতে আইসক্রিমের বাটি। মনে হয় তরকারি আনছে। আফাগো হের তরকারি খাইয়েন না। হের শইল দিয়া ভুরভুর কইরা পচা গোবরের বাস আসতাছে।হামিদা বলল, আসিয়া এত কথা বলার দরকার নেই। আমি ওর তরকারি খাব কি খাব না সেটা আমি ঠিক করব। আজ কি বার? বুধবার।আজ কি নয় তারিখ? জানি না আফা।
আজ যে নয় তারিখ, বুধবার এই তথ্য হামিদার জানা আছে। তারপরেও অন্যের কাছে জানতে চাওয়ার অর্থ কি এই যে হামিদা চাচ্ছে না আজকের দিনটা বুধবার হোক? তার অবচেতন মন আসিয়ার কাছ থেকে অন্য কিছু শুনতে চাচ্ছে। হামিদা খাট থেকে নামল। ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে ঘরের কোণার দিকে তাকাল। দুটা সুটকেস রেডি করা আছে। কুটুর হাতে স্যুটকেস দুটা দিয়ে সে এখনই চলে যেতে পারে। যেতেই মুম্বন হবে আগে যাওয়াই কি ভালো না? কিন্তু মন টুনিছে না। একেবারেই মন টানছে না।
হাজী সাহেবের বসার ঘরে কুটু দাঁড়িয়ে আছে। হামিদাকে দেখে সে বিনীত ভঙ্গিতে সালাম দিল। হামিদা বলল, কী ব্যাপার কুটু? কুটু জবাব দিল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। কুটুর গা থেকে কোনো পচা গন্ধ আসছে না। লেবুর গন্ধের মতো গন্ধ আসছে। অতি হালকা ঘ্রাণ কিন্তু স্পষ্ট।
লেবু বাগানে যখন লেবু ফুল ফুটে তখন বাগানের আশেপাশে এমন সৌরভ পাওয়া যায়। আসিয়া বলছিল পচা গোবরের গন্ধ। আসিয়ার কথা সত্যি না।হামিদা দ্রুত চিন্তা করছে। কুটুর গা থেকে আগেও একবার লেবুর গন্ধ এসেছিল। আজ আসছে। এর পেছনে কোনো কারণ কি আছে? কুটু কি জানে লেবুর গন্ধ তার খুব পছন্দের?
কুটু বলল, আপনার জন্য তরকারি আনছি। কাইল রাইতে এই তরকারিটা খাইয়া স্যার খুব পছন্দ করছিলেন। স্যার বললেন, আপনার জন্য এক বাটি পাঠাইতে।হামিদা বলল, তুমি কিসের তরকারি এনে আমি একটু আন্দাজ করি। দেখি আমার আন্দাজ ঠিক হয় কি-না। তুমি এনেছ শিং মাছের ডিমের তরকারি। আমার আন্দাজ কি ঠিক হয়েছে?
কুটু চাপা গলায় বলল, জ্বি আপা।হামিদা বলল, আমার অনুমান করার শক্তি দেখে তুমি মুগ্ধ হও নি? কুটু জবাব দিল না। হামিদা বলল, আমি নিজে কিন্তু মুগ্ধ হয়েছি। অনুমান। কীভাবে করলাম জানো? শিং মাছের ডিমের কোল আমার খুব পছন্দের। দেশের বাড়িতে মা এই রান্নাটা রাধতেন। ভালো কোনো খাবারের কথা মনে হলেই আমার শিং মাছের ডিমের কথা মনে হয়।
আমার পছন্দের জিনিসগুলি তুমি কীভাবে টের পাচ্ছ? কুটু মেঝের দিকে তাকিয়ে চুপ করে আছে। যে আইসক্রিমের বাটিতে করে সে ডিম নিয়ে এসেছিল সেই বাটি সে এখন পিঠের দিকে সরিয়ে রেখেছে।হামিদা বলল, তুমি কি মানুষের মনের কষ্মা বুঝতে পার? দাঁড়িয়ে থেক না। কথার উত্তর দাও।কুটু না-সূচক মাথা নাড়ল।
হামিদা বলল, তুমি আমাকে চা বানিয়ে খাইয়েছিলে। দেখা গেল যে চা আমাকে খাইয়ে সেই মশলা চা অনেক দিন থেকেই আমার খাওয়ার শঙ্খ। আমার জন; তরকারি নিয়ে এসেছ। দেখা গেল যে তরকারি এনেছ সেই তরকারি অনেক দিন থেকে আমার খাওয়ার শখ। আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না।কুটু বিড়বিড় করে বলল, আমি নিজেও কিছু বুঝি না আপা।হামিদা বলল, আজ আমি ঐ বাড়িতে যাচ্ছি। সে-রকম কথা আছে। তুমি কি সেটা জানো? জানি।
যদি জানো তাহলে তরকারি নিয়ে এলে কেন? কুটু নিচু গলায় বলল, আপনারে বলতে আসছি যেন আপনি না যান।আমার নিজের বাড়িতে আমি যাব না? অবশ্যই যাইবেন আপা। কয়েকটা দিন পরে যাইবেন। কয়েকটা কুত্তা আইসা। জুটছে। কুত্তাগুলা খুবই উপদ্রব করতেছে। এর মধ্যে একটা কুত্তার হইছে জ্বলাতঙ্ক। পাগলা কুত্তা।তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ? আমি আমার নিজের বাড়িতে যাব না— কুকুরের ভয়ে? আমি অবশই যাব। আজই যাব।জ্বি আচ্ছা।
কুটু শোন, বাড়িতে গিয়ে আমি যেন তোমাকে দেখতে না পাই। তোমার চাকরি অনেক দিন হয়েছে। এখন চাকরি শেষ। বুঝতে পারছ কী বলছি? জ্বি। তরকারিটা কি রাইখা যাব, না নিয়ে যাব? হামিদা ক্লান্ত গলায় বলল, তরকারি যা ইচ্ছা কর। ঐ তরকারি আমি খাব না। এখন আমার সামনে থেকে বিদেয় হও। সাময়িক বিদায় না পুরোপুরি বিদায়। আমি আমার বাড়িতে যখন যাব তখন যেন তোমাকে না দেখি।
হাজী সাহেব বইয়ের দোকানে বসে আছেন। তাঁর চোখ মুখ শুকনা। মুখ হা করা। তিনি পান খাচ্ছিলেন। পান চিবানো বন্ধ হওয়ায় মুখে পানের রসের আস্তরণ জমে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে কেউ তার মুখের ভিতরে খয়েরি রং করে দিয়েছে। হাজী সাহেব দশ মিনিট আগে খবর পেয়েছেন ইয়াকুব ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছে। কুকুরের কামড়ে কেউ মারা গেছে এটা তিনি আগে শুনেন নি। কুকুর সুন্দরবনের বাঘ না।
ঝেড়ে লাথি দিলে কুকুর পালাবার পথ পায় না। সেই কুকুর কামড়ে মানুষ মেরে ফেলেছে— এটা কেমন কথা! ইয়াকুবের এক চাচাতো ভাই দোকানের সামনে এসে বিরাট হৈচৈ শুরু করেছে। তাকে ঘিরে মানুষের ভিড়। সে আকাশ ফাটিয়ে চিক্কার করছে— কুত্তা দিয়া আমার ভাইরে খাওয়াইছে। কী সর্বনাশ করছে গো! কুত্তা দিয়া আমার ভাইরে খাওয়াইছে। আফনেরা বিচার করেন। আমার আদরের ভাইরে কুত্তা খাইয়া সেলাইই।
হাজী সাহেব ম্যানেজারকে বললেন, টাকা দিয়ে যেন এর মুখ বন্ধ করা হয়। তারপর আড়ালে নিয়ে যেন শক্ত থাপ্পড় দেয়া হয়।হাজী সাহেবের মেজাজ খুবই খারাপ হয়েছে। তার সামনে নানান ঝামেলা। হাসপাতাল থেকে ডেডবড়ি আসবে। সেই ডেডবড়ি গ্রামের বাড়িতে পাঠাতে হবে।
সঙ্গে টাকা পয়সা দিতে হবে। পুলিশের ঝামেলা ও হবে। গন্ধে গন্ধে পুলিশ চলে আসবে। অস্বাভাবিক মৃত্যু মানেই পুলিশের মুখে হাসি। ওসি সাহেব তদন্তে আসবেন। গলা নিচু করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলবেন- ইয়াকুব হলো প্রেসের কর্মচারী। সে তো দারোয়ানের কাজ জানে না। তারপরেও তাকে আপনি দারোয়ানের কাজে কেন পাঠালেন?
যে কুকুরগুলি মানুষ মেরেছে তারা তো আপনার ভাগ্নির পোষা কুকুর। আমরা গোপন সূত্রে খবর পেয়েছি কুকুরগুলি আপনাদের লোকের ইশারায় ঝাপিয়ে পড়েছে। ঘটনা কি সত্যি সত্যি হোক আর মিথ্যা হোক, আপনাকে আর আপনার ভাগ্নিকে একটু থানায় যেতে হবে।পুলিশের হয়রানি থেকে বাঁচার জন্যে ম্যানেজারকে আগেভাগেই থানায় পাঠানো দরকার। হামিদার বাড়িতেও যাওয়া দরকার। আলাউদ্দিনকে সবকিছু বুঝিয়ে আসতে হবে।
পুলিশ যদি তদন্তে আসে তাহলে যেন উল্টাপাল্টা কিছু না। বলে। তাকে বলতে হবে নকশন কুকুর কামড়েছে আমি কিছুই জানি না।আমার শরীর খারাপ ছিল। আমি দরজা বন্ধ করে ঘুমাচ্ছিলাম।লাশের সুরতহাল হবে। সুরতহালের রিপোর্টে যেন কিছু না থাকে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। সুরতহাল যে ডাক্তার করবে তাকে টাকা খাইয়ে রাখতে হবে। যেন সে ঠিকঠাক লেখে কুকুরের কামড়ে মৃত্যু। উল্টাপাল্টা কোনো লাইন লিখে ফেললে সাড়ে সর্বনাশ।
হাজী সাহেব দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। সভাবে মরেও রক্ষা নাই। চারদিকে টাকা খাওয়াতে হচ্ছে। এরচে আফসোসের কারণ আর কী হতে পারে! ইয়াকুবের ভাইয়ের চিঙ্কার বন্ধ হয়েছে। তাকে সাতশ টাকা দেয়া হয়েছে। সে এখন বেশ খুশি মনেই দোকানের এক কোণায় বসে পিরিচে ঢেলে চা খাচ্ছে। দোকানের সামনে মানুষের ভিড় কমছে না। বরং বাড়ছে।হাজী সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। আজ আর দোকান খোলা রাখা যাবে না।
বসতে হলে প্রেসে গিয়ে বসতে হবে। তারও আগে আলাউদ্দিনের কাছে যেতে হবে। হামিদাকে আজ কেন আনলেন সেটা তাকে বলা দরকার। সে নিশ্চয়ই আগ্রহ নিয়ে বসে আছে। হয়তো দেখা যাবে হামিদার বাড়ির সামনে ও রাজ্যের ভিড়। টিভি ক্যামেরা চলে এসেছে। চ্যানেল গুলি চালু হওয়ায় আজকাল নতুন জিনিস শুরু হয়েছে। অন দা স্পট নিউজ। চেংড়া কোনো ছেলে হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে হামিদার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রিপোর্ট করবে—
এই সেই ঘাতক বাড়ি। এই বাড়িরই দুটি কুকুরের আক্রমণ প্রাণ দিতে হলো নিরীহ ইয়াকুবকে। ঐ যে দেখা যাচ্ছে ঘাতক কুকুর দুটিকে। তাদের শান্ত চেহারা, আলস্যের লেজ নাড়া লেখে কে বলবে এরা দুই হন্তারক! হাজী সাহেব হামিদার বাড়ির সামনে এসে খুবই অবাক হলেন। নিরিবিলি বাড়ি পড়ে আছে। চারপাশে কেউ নেই।
হাজী সাহেব ভয়ে ভয়ে গেট খুললেন। তার মনে শঙ্কা কখন কুকুর দুটি ছুটে আসে। বাড়ির আশেপাশে কোনো কুকুরই নেই। দোতলায় উঠার সিড়ির গোড়ায় একটা কালো কুকুর দেখা গেল। সে হাজী। সাহেবকে দেখে কুঁই কুঁই করে উঠে চলে গেল। কুকুরটাকে মোটেই ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছে না। রাস্তার নেড়ি কুকুর কখনো ভয়ঙ্কর হয় না। এদের জীবন কাটে ডাস্টবিনে ডাস্টবিনে খাবারের সন্ধানে। কুকুরসুলভ গুণাবলী এদের মধ্যে দেখা যায় না।
হাজী সাহেব কুকুরটার দিকে তাকিয়ে যাহ বলতেই কুকুরটা যেভাবে চমকে লাফিয়ে উঠল এবং কুই কুই করতে করতে পালিয়ে গেল তা দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় মানুষকে কামড়ানোর সাহস এই কুকুর কোনোদিনও সংগ্রহ করতে পারবে না।কলিং বেল টিপতেই দরজা খুলে দিল কুটু। সে হাজী সাহেবকে দেখে বিয়ে। প্রায় নুয়ে গেল। হাজী সাহেব বললেন, কেমন আছ? কুটু বলল, ভালো আছি জনাব।আলাউদ্দিন বাসায় আছে? জি আছেন। শুয়ে আছেন।শুয়ে আছে কেন? শরীর খারাপ জি।হয়েছে কী–জ্বর? জ্বর সামান্য আছে। শইলে পানি আইছে।বলো কি? ডাক্তার দেখিয়েই?
জ্বি না। দেখি স্যার যদি রাজি হন তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়া যাব।আলাউদ্দিনকে দেখে হাজী সাহেব চমকে উঠলেন। এই কদিনে কী হয়েছে। মানুষটাকে তো চেনাই যাচ্ছে না। মুখ এ ফুলেছ যে চোখই ঢাকা পড়ার অবস্থা। জায়গায় জায়গায় চুল উঠে যাচ্ছে। এখন তাঁর মাথায় খাবলা খাবলা চুল। শরীরে মনে হয় রক্ত নেই। মুখ সাদা, ঠোঁট সাদা। হাজী সাহেব কুটুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ঘরে বিকটু পচা গন্ধ। গন্ধটা কোথেকে আসছে?
কুটু বলল, ইঁদুর মইরা পইচা গেছে। পচা ইঁদুরের গন্ধ। কোন চিপা চাপায় মরছে খুঁইজা পাইতেছি না।দরজা জানালাও তো সব বন্ধ। দরজা জানালা খোল, পর্দা সরাও, ঘরে আলো বাতাস আসুক। দরজা জানালা খুলে রাখলে পচা গন্ধ কিছু কমবে। মেঝে ফিনাইল। দিয়ে ধুয়ে দাও।কুটু মিয়া বলল, জ্বি আচ্ছা।হাজী সাহেব আলাউদ্দিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার ব্যাপারটা কী বলো তো? আলাউদ্দিন ফিসফিস করে বললেন, আপনার কাছে আমি ক্ষমা চাই।হাজী সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, ক্ষমা চাচ্ছ কেন? অপরাধটা কী করেছ? বইটা লিখতে পারছি না। হস্তরেখা বিজ্ঞান।
