এই যেমন আরেক ভদ্রলোকের বোতলের জিনিস উধাও। বোতল আছে, জিনিস নাই। পানি ভরে দিয়ে দিয়েছে। অত্যন্ত গর্হিত কাজ হয়েছে। এর শাস্তি দিতেই হবে।তারপর আছে অন্ধকারে তার রান্না করার বিষয়টা। তিনি অনেক দিন থেকেই লক্ষ করছেন রাতেরবেলায় রান্নার সময় ঘরের সব আলো নেভানো থাকে। চুলার আগুনের শিখায় কিছুটা ভালো হয়।
কটু হয়তো সেই আলোতেই দেখতে পায়। অনেকের দৃষ্টিশক্তি ভালো থাকে। কুটু হয়তো সেই অনেকের মধ্যে একজন। তবুও অন্ধকারে রান্না করা ঠিক না। পাতিলের ভেতর কোনো পোকামাকড় উড়ে পড়বে। কুটু সেটা দেখতে পাবে না। চিকেন ফ্রাই-এর পাশাপাশি মিডিয়াম সাইজ একটা মাকড়সাও ফ্রাই হয়ে পড়ে থাকল। তিনি পিয়াহ মনে করে খেয়ে ফেলবেন। কে জানে হয়তো এর মধ্যে খেয়েছেনও। এটা তো হতে দেয়া যায় না।
কুটুকে এই বিষয়ে ধরতে হবে। কঠিন ধরা ধরতে হবে। আজ কুটুর ক্ষমা নেই। আজ কুটুকে সাইজ করা হবে। আজ হলো মহান সাইজ দিবস।আলাউদ্দিন বিছানায় শুয়ে পড়েছেন। তার মুখে জর্দা দেয়া মিষ্টি পান। জর্দার পরিমাণ বেশি হয়েছে। একেকবার পানের রস গিলছেন আর মাথা কেমন চুকুর দিয়ে উঠছে। এই চক্করটা ভালো লাগছে। খুবই আরামের চক্কর। আলাউদ্দিনের আঙুলের ফাকে সিগারেট। কুটু লাইটার দিয়ে সিগারেট ধরিয়ে দিল। আলাউদ্দিন সিগারেটে টান দিয়ে বললেন, কুটু তোমাকে আজ কিছু কথা বলব।
কুটু মিয়া পর্ব – ৫
কুটু বলল, জি আচ্ছা।আলাউদ্দিন বললেন, কথাগুলি কঠিন। শুনে তুমি হয়তো মনে কষ্ট পাবে। কষ্ট পেলেও আমার কিছু করার নেই।কুটু বলল, জি আচ্ছা।আলাউদ্দিন সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে কথা বলার জন্যে প্রস্তুত হলেন। কী বলবেন মনে পড়ছে না। মাথা একেবারেই ফাকা হয়ে আছে। যে সব কথা বলবেন বলে ঠিক করেছিলেন সে সব কথা পয়েন্ট আকারে একটা কাগজে লিখে রাখা দরকার ছিল। বিরাট ভুল হয়েছে।কুটু! জ্বি স্যার।
তোমার অনেক জিনিস আছে যা আমার অপছন্দ। এইসব বিষয় নিয়ে কথা বলব। তুমি যদি নিজেকে বদলাতে পার তাহলে তুমি থাকবে, বদলাতে না পারলে চলে যাবে। ভাত ফেললে কাকের অভাব হয় না। বেতন ফেললে বাবুর্চি পাওয়া যায়। বুঝতে পারছ? জি।
আলাউদ্দিন অনেক চেষ্টা করলেন, কুটুকে সাইজ করার মতো কোনো কথাই মনে পড়ল না। তিনি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন— কুটু ঠিক আছে তুমি যাও। কথাবার্তা আজকের মতো মুলতবি। ঘুমের আগে আগে কঠিন কথাবার্তা না হওয়া ভালো। এতে সুনিদ্রার ব্যাঘাত হয়। একটা কাজ কর— আমাকে জর্দা দিয়ে আরেকটা পান দাও। জর্দা বেশি করে দিবে।
জি আচ্ছা।আর টিভিটা চালু করে দাও। সাউন্ড দিও না। শুধু ছবি। টিভি দেখতে দেখতে ঘুমাব।জ্বি আচ্ছা।তুমি মনে করো না যে তুমি ছাড়া পেয়ে গেলে। মামলা ডিসমিস হয়ে গেল। আসলে সাময়িক বিরতি। আদালত আবার বসবে। আমি নিজেই বাদি, আমিই বিচারক। তোমার খবর আছে কুটু মিয়া।জর্দা ভর্তি পান মুখে নিয়ে আলাউদ্দিন ঘুমিয়ে পড়লেন। টিভি চলতে থাকল।
কুটু মিয়া পর্ব – ৫
এক সময় আলাউদ্দিনের ঘুম ভাঙল। কোনো কারণ ছাড়াই তার বুক ধ্বক করে। উঠল। এই ঘরে কিছু একটা হয়েছে। ঘরটা বদলে গেছে। কোনো কিছুই মনে হচ্ছে আগের মতো নেই। ঘর ভর্তি ধোয়া। এত ধোয়া কোত্থেকে এলো। কোথাও কি আগুন লেগেছে! খড় পোড়ার গন্ধ ও নাকে আসছে। নাক জ্বালা করছে। খাটের নিচ থেকে গোঙানির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
হাঁটাহাঁটি হচ্ছে। মাঝে মাঝে ক্ষীণ গলায় কেউ একজন বলছে— বাঁচান, আমারে বাঁচান। সে কথা শেষ করতে পারছে না। তার আগেই কেউ একন তার মুখ চেপে ধরছে। আবারো হুটোপুটি হচ্ছে। বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ।আলাউদ্দিন টিভির দিকে তাকালেন। টিভি খোলা আছে। নাটকের মতো কী যেন হচ্ছে। মারামারির দৃশ্য। ঘটনা কি এ রকম যে টিভিতে মারামারি হচ্ছে, কিন্তু তার কাছে মনে হচ্ছে শব্দটা আসছে খাটের নিচ থেকে।
এটাই তো যুক্তিসঙ্গত কথা। কিন্তু ঘরে এত ধোয়া কেন? আলাউদ্দিন ক্ষীণ স্বরে ডাকলেন, কুটু মিয়া!খাটের নিচ থেকে কেউ একজন ভারী শ্লেষ্মা জড়িত গলায় বলল, জি স্যার।গলাটা কার? গলা কুটু মিয়ার ? সে খাটের নিচে কী করছে? কাকে সে চেপে ধরেছে। আলাউদ্দিন আবারো কাপা কাঁপা গলায় বললেন— কুটু মিয়া? জ্বি।খাটের নিচে কী করছ?
কুটু মিয়া পর্ব – ৫
কুটু জবাব দিল না। খাটের নিচের হুটোপুটি অনেক বাড়ল। এখন গোঁ গোঁ শব্দ হচ্ছে। আলাউদ্দিন বললেন, কী হচ্ছে ওখানে? কুটু চাপা গলায় বলল, বালিশ দেন। স্যার, তাড়াতাড়ি একটা বালিশ দেন।কী দিব? বালিশ।বালিশ দিয়ে কী হবে? হারামজাদার মুখের উপর বালিশ চাইপা ধরব।কার মুখের উপর বালিশ চেপে ধরবে? কটু জবাব দিল না।
আলাউদ্দিন হতভম্ব হয়ে দেখলেন খাটের নিচ থেকে একটা হাত বের হয়ে আসছে। ময়লা নোংৱা হাত। বড় বড় নখ। পাখির নখের মতো বেঁকে গেছে। হাতটা কেন আসছে? তাকে ধরার জন্যে? আলাউদ্দিন ভয়ে শিটিয়ে গেলেন।বালিশ দেন।আলাউদ্দিন একটা বালিশ কুটুর হাতের দিকে এগিয়ে দিলেন।
খাটের নিচ থেকে আঁ আঁ শব্দ হচ্ছে। বালিশে চাপা দিয়ে কাউকে কি মারা হচ্ছে? কোনো একটা সূরা পড়া উচিত। কোনো সূরা মনে আসছে না। তিনি কি দুঃস্বপ্ন দেখছেন? হ্যাঁ এটাই হবে। দুঃস্বপ্ন। দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছু না। স্বপ্নটা ভেঙে গেলেই দেখবেন সব স্বাভাবিক আছে। তখন তিনি কুটুকে ডেকে চা দিতে বলবেন।
চা খাওয়ার আগে গোসল করা দরকার। শরীর ঘামে ভিজে গেছে। স্বপ্নটা কখন ভাবে? চিৎকার করে কুটকে ডাকলে কি ঘুম ভাঙলে? আলাউদ্দিন ফুসফুস ফাটিয়ে চিক্কার করলেন— কুটু! কুটু! গলা দিয়ে ফ্যাস ফ্যাস জাতীয় আওয়াজ হলো। এই স্বপ্ন মনে হয় ভাবে না। স্বপ্ন চলতেই থাকবে। মেয়েলি গলায় কে যেন কাঁদছে। দেয়ালে শব্দ হচ্ছে। সাইফুল্লাহলের বাড়িতে কি? না-কি এটা স্বপ্ন। আলাউদ্দিন ক্লান্ত হতভম্ব গলায় ডাকলেন, কুটু।
কুটু মিয়া পর্ব – ৫
তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বসার ঘরের বাতি জ্বলে উঠল। থপথপ পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। কুটু আসছে।কুটু! কুটু তুমি কোথায়? দরজা ঠেলে কুটু ঢুকল।আলাউদ্দিন ধরা গলায় বললেন, বাতি জ্বালাও।কুটু বাতি জ্বালাল। আলাউদ্দিন বললেন, দুঃস্বপ্ন দেখেছি।কুটু বলল, চা খাইবেন স্যার? আলাউদ্দিন বলেন, চা খাব।চা আনতেছি।আলাউদ্দিন বললেন, তুমি কি কোনো চিৎকার, হুটোপুটির শব্দ শুনেছ?
কুটু বলল, জ্বি না।আলাউদ্দিন বললেন, শোনার কথাও না। স্বপ্ন দেখছি আমি। তুমি কেন শব্দ শুনবে! কুৎসিত স্বপ্ন। ধোয়া, চিৎকার, বালিশ দিয়ে মুখ চাপাচাপি।চা নিয়া আসি স্যার।যাও নিয়ে আস। চা আনার আগে একটা কাজ কর— আমার বালিশটা নিচে পড়ে গেছে। ধাক্কা খেয়ে খাটের নিচে চলে গেছে। বালিশটা দাও।
কুটু খাটের সামনে উপুড় হয়ে বসে বালিশটা এনে আলাউদ্দিনের হাতে দিয়ে রান্নাঘরের দিকে রওনা হলো। আলাউদ্দিন বালিশের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। বালিশের এক পিঠে ছোপছোপ রক্ত লেগে আছে। টাটকা রক্ত, এখনো শুকিয়ে কালচে হয় নি।আয়াতুল কুরশি সূন্নাটা মনে পড়েছে। আলাউদ্দিন বিড়বিড় করে আয়াতুল কুরশি পড়ছেন…
আল্লাহু লাইলাহা ইল্লাহুয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম। লতা খুজুহু সিনাতাও ওয়ালা নাওম! লাহু মা ফিছছামাওয়াতে ওয়াল আরদ্বি… খুবই আশ্চর্যজনকভাবে রাতে আলাউদ্দিনের ভালো ঘুম হলো। ঘুমের ভেতর তিনি স্বপ্নও দেখলেন। কাটা কাটা স্বপ্ন। একটা স্বপ্নে তার বাবা মুনশি মোহম্মদ দুশির তাকে জিজ্ঞেস করছেন, রোজা ভেঙ্গেছিস কী জন্যে? তিনি বললেন, এটা তো রমজান মাস না।
কুটু মিয়া পর্ব – ৫
এখন রোজা রাখার প্রশ্ন আসছে কে? উত্তর শুনে মুনশি মোহম্মদ ছগির খুব রেগে গিয়ে বললেন– পরহেজগার আদমির জন্যে সারা বছরই রমজান মাস। রোজা ভেঙ্গেছিস, তার শাস্তি আগামী জুম্মাবারে মুসুল্লিদের সামনে এক লক্ষার কানে ধরে উঠবোস করবি। আলাউদ্দিন বললেন, জ্বি আচ্ছা। এরপর শুরু হলো কানে ধরে উঠবোসের স্বপ্ন দেখা।
ছাড়া ছাড়াভাবে এই স্বপ্ন চলল ঘুম না ভাঙ্গা পর্যন্ত। তিনি উঠবোস করেই যাচ্ছেন, মুসুল্লিরা হো হো করে হাসছে। ঘুম থেকে উঠে তিনি চা খেলেন। হো হো হাসির শব্দের একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে। টিভিতে দর্শকদের উপস্থিতিতে কী একটা অনুষ্ঠান হচ্ছে। উপস্থাপকের প্রতিটি কথায় দর্শক হাসছে। আলাউদ্দিন আগ্রহ নিয়ে টিভির দিকে তাকিয়ে রইলেন। টিভির সাউন্ড অফ করা ছিল। এখন সাউন্ড আছে। আলাউদ্দিন সাউন্ড অফ করে দিলেন। তিনি রাতে যে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলেন এটা ভেবে তার একটু হাসিই পেল।
হামিদা বানু ঠিকই বলেছে— উত্তপ্ত মস্তিষ্কের চিন্তা। শুধু যখন কুটুর কাছে শুনলেন গতকাল রাতে সাইফুল্লাহ সাহেবের বাড়িতে কী নাকি সমস্যা হয়েছে, সাইফুল্লাহ সাহেবের মাথা ফেটে গেছে, রক্তে বাড়ি ভেসে গেছে, শেষ রাতে এম্বুলেন্স এসেছে, পুলিশ এসেছে— তখন সামান্য খটকার মতো লাগল।আলাউদ্দিন বললেন, পুলিশ এসেছিল কেন? কুটু বলল, জানি না স্যার। সাইহি সাহেবের বাসায় কাইল রাইতে যে মেয়েটা ছিল পুলিশ তারে ধইরা নিয়া গেছে।মেয়ে কী করেছে? জানি না স্যার।মেয়েটা কে?
কুটু মিয়া পর্ব – ৫
গার্মেন্টসের এক মেয়ে। সাইফুল্লাহ সাহেবের এখানে একেক সময় একেক মেয়ে থাকে। নানান ভ্যাজাল।ভ্যাজাল তো বটেই।উনার যে অবস্থা দেখলাম স্যার, নাক মুখ দিয়া রক্ত পড়তেছে। কাউরে চিনতে পারে না। বাঁচে কি-না সন্দেহ।দেখতে গিয়েছিলে? জ্বি না। সিঁড়ি দিয়া নামানির সময় দেখলাম। মন খারাপ হইয়া গেল। কে জানে কী বৃত্তান্ত।মন খারাপ হবার কথা। হাজার হোক প্রতিবেশী।স্যার, চা আরেক কাপ দিব?
আলাউদ্দিন ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, দাও। তিনি মাথা থেকে পুরো ব্যাপারটা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছেন। নাশতা খেয়েই আজ বাংলাবাজার চলে যাবেন।বালিশটা আরেকবার দেখতে ইচ্ছা করছে। কাল রাতে মনে হয়েছিল রক্ত লেগে আছে। এখনও কি তাই? রক্ত শুকিয়ে হয় কালো। কালো কোনো দাগ কি বালিশে আছে। আলাউদ্দিন দুটা বালিশই উল্টে পাল্টে দেখলেন।
কোনো দাগ নেই। তিনি অনিন্দিত গলায় ডাকলেন, মাই ডিয়ার কুটু! আরেক কাপ চা দাও।হাজী একরামুল্লাহ বললেন, তোমার কী হয়েছে? আলাউদ্দিন জবাব না দিয়ে চোখ পিটপিট করতে লাগলেন। হাজী সাহেব বললেন, চোখ পিটপিট করছ কেন? আলাউদ্দিন বললেন, রোদটা কড়া। চোখে লাগছে।হাজী সাহেব বললেন, ঘরের ভেতরে রোদ কোথায়? চোখ পিটপিটানি বন্ধ করে বলো তো তোমার ঘটনা কী?
কুটু মিয়া পর্ব – ৫
আলাউদ্দিন চুপ করে রইলেন। বলার মতো কোনো ঘটনা ঘটে নি। দিনের পর দিন তিনি নিজের শোবার ঘরের খাটের ওপর ছিলেন। নদিন পর আজ প্রথম বাইরে এসেছেন। আলো চোখে লাগছে। দোকানের ভেতর রোদ নেই ঠিকই, কিন্তু বাইরে ভাদ্র মাসের রোদ ঝলমল করছে। রোদের দিকে তাকালেই চোখ জ্বালা করে।হাজী সাহেব বললেন, তোমার শরীরে পানি এসেছে না-কি? হাত-পা-মুখ ফোলা ফোলা। সমস্ত শরীরে গোল ভাব চলে এসেছে। সারাদিন কী কর? ঘুমাও?
আলাউদ্দিন সিগারেট ধরালেন। হাজী সাহেব বললেন, সিগারেট খাচ্ছি কারখানার চিমনির মতো। দশ মিনিটও হয় নি এসেছু, এর মধ্যে চারটা সিগারেট খেয়ে ফেললে।আলাউদ্দিন চুপ করেই আছেন। হাজী সাহেবের সিগারেটের হিসেবে ভুল হয়েছে। সিগারেট চারটা খাওয়া হয় নি, তিনটা খাওয়া হয়েছে। এই নিয়ে তর্ক শুরু করা যায় না। হাজী সাহেব রেগে আছেন। ব্লগের মুহূর্তে তর্ক চলে না।হস্তরেখা বই-এর পাণ্ডুলিপি কোথায়? এনেছ? আলাউদ্দিন ক্ষীণ গলায় বললেন, এনেছি।শেষ করেছ?
জ্বি।কই দেখি।একটু পরে দেই। বুঝিয়ে দিতে হবে।হাজী সাহেবের রাগী মুখ সহজ হয়ে এলো। আলাউদ্দিন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। এই স্বস্তি সাময়িক, কারণ তিনি হস্তরেখা বিজ্ঞান বই-এর পাণ্ডুলিপি আনেন নি। যে বই লেখাই হয় নি তার পাণ্ডুলিপি অনবে কীভাবে? শিররের চ্যাপ্টারটা মাত্র শুরু হয়েছিল। পাণ্ডুলিপি না এনেও বলা হয়েছে এনেছি। এই মিথ্যা শেষ পর্যন্ত কীভাবে সামাল দিবেন কে জানে। আলাউদ্দিনের বুকের ভেতর ধুক বুক শব্দ হতে লাগল। ভালো ঝামেলায় পড়া গেল।হাজী সাহেব সহজ স্বাভাবিক গলায় বললেন, দেখি তোমার একটা সিগারেট খেয়ে দেখি।
কুটু মিয়া পর্ব – ৫
আলাউদ্দিন সিগারেটের প্যাকেট বের করে দিলেন। হাজী সাহেব সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, তোমার আসার কথা ছিল বুধবারে। তুমি যখন বুধবারে এলে না, বৃহস্পতিবার চলে গেল, শুক্রবার চলে গেল তারপরেও তোমার খোঁজ নেই তখন একবার মনে হয়েছিল বই নিয়ে ব্যস্ত। বই শেষ না করে আসবে না। আমি ম্যানেজারকে সে-রকমই বলেছি। চা খাবে?
জ্বি না।জি না আবার কী!চা খাও। মালাই চা।জ্বি আচ্ছা।আলাউদ্দিন মনে মনে দোয়া ইউনুল পড়ছেন। এই দোয়া পড়লে যে-কোনো বড় বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া যায়। আলাউদ্দিন ঠিক করলেন পাণ্ডুলিপির প্রসঙ্গ আবার না আসা পর্যন্ত তিনি এই দোয়া পড়তেই থাকবেন। এমন হওয়া বিচিত্র না।
যে দেখা যাবে দোয়া ইউনুস পড়ার কারণে হাজী সাহেব পাণ্ডুলিপির প্রসঙ্গটা তুলতে ভুলে যাবেন। অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। এমন একটা ঘটনা টানো আল্লাহর জন্যে কোনো ব্যাপারই না।চা চলে এসেছে। চা এবং পিরিচ ভর্তি জর্দা দেয়া পান। হাজী সাহেব অতি দ্রুত কয়েকটা চুমুক দিয়ে চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে মুখ ভর্তি করে পান নিলেন।
পান চিবাতে চিবাতে সহজ গলায় বললেন, আমার ভাগ্নি হামিদাকে বিবাহের কথা নিয়ে কিছু ভেবেছ? ইচ্ছা না থাকলে না বলে দাও। কোনো অসুবিধা নেই। হামিদাও বেঁকে বসেছে। শুরুতে হ্যাঁ বলেছিল, এখন না বলছে। মেয়েদের এই সমস্যা। স্থিরতা বলে কিছু নেই। সাগরের ঢেউ— এই আছে এই নাই। তোমার নিজেরও তো বিয়ের ব্যাপারে অনাগ্রহ আছে। ঠিক না। এই বয়সে সংসারের ঝামেলায় যেতে ইচ্ছা না করারই কথা।
কুটু মিয়া পর্ব – ৫
আলাউদ্দিন বললেন, আমি বিবাহ করব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তবে উনার মত না থাকলে তো কিছু করার নাই। সবই আল্লাহপাকের ইচ্ছা। উনার ইচ্ছা ছাড়া গাছের পাতা ও কালে না। আমরা তুচ্ছ।হাজী সাহেব বললেন, তুমি বিবাহ করতে চাও? আলাউদ্দিন হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন। মেয়ে যেখানে বেঁকে বসেছে সেখানে হ্যাঁ বলতে বাধা নাই।
তিনি যতই হ্যাঁ বলুন বিয়ে তো হবে না।ভালো মতো ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়ে? জি।তোমার কোনো আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলেছ? জি না। তবে কুটুকে বলেছি।কুটুকে বলেছ। কুটু কে? আমার বাবুর্চি।আরে রাখ তোমার বাবুর্চি। বাবুর্চির সঙ্গে কেউ নিজের বিয়ে নিয়ে আলাপ করে না-কি?
আলাপ করার মতো আমার কেউ নাই।আলাপ করার কেউ না থাকলে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেবে। ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে চাকর বাকরের সঙ্গে কেউ আলাপ করে? নাও, পান খাও।আলাউদ্দিন আগ্রহের সঙ্গে পান মুখে দিলেন। মনে মনে দোয়া ইউনুস তিনি এখনো পড়ছেন। দোয়ায় মনে হয় একশন শুরু হয়েছে। হাজী সাহেব পাণ্ডুলিপির প্রসঙ্গে যাচ্ছেন না। মনে হচ্ছে পাণ্ডুলিপির চেয়ে তিনি তার ভাগ্নি হামিদা বানুর বিবাহ নিয়ে বেশি উৰ্ঘিশ্ন।
কুটু মিয়া পর্ব – ৫
হাজী সাহেব খানিকটা কুঁকে এসে বললেন, তুমি তাহলে বিবাহের ব্যাপারে পজেটিভ সিদ্ধান্ত নিয়েছ? জ্বি।তাহলে তো হামিদাকে রাজি করানো দরকার। রাজি কেন করানো দরকার এটা শোন। পাড়ার মাস্তানদের গডফাদার টাইপ এক লোকের চোখ পড়েছে হামিদার দিকে। বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে। নানান ভাবে যন্ত্রণা করছে। অতি বদ লোক। অতি হারামজাদা। থাকে মদের উপর। গুণ্ডাপাত্তা পুষ।
স্ত্রী মারা গেছে–আবার বিবাহ করবে। এর কাছে মেয়ে বিয়ে দেয়া আর মেয়ের গলায় দড়ি দিয়ে নিজের হাতে তেতুল গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেয়া একই কথা। বুঝতে পারছ? জ্বি।তুমি বুঝতে পারছ না। এই জাতীয় বদলি যে মানুষের উপর কী পরিমাণ জুলুম করতে পারে তোমার কোনো ধারণাই নেই। হামিদার রূপে পাগল হয়ে সে যে হামিদাকে বিয়ে করতে চাচ্ছে তা কিন্তু না। হামিদাকে বিয়ে করতে চাচ্ছে। বাড়িটার জন্যে।বাড়িটার জন্যে মানে?
হামিদার যে বাড়িতে তোমাকে নিয়ে গিয়েছিলাম সেটা হামিদার নিজের বাড়ি। তার স্বামী বানিয়ে রেখে গিয়েছিলেন। ঢাকা শহরে পাঁচ কাঠা জমির উপর দোতলা বাড়ি সহজ ব্যাপার তো না। যে কটা পাত্র হামিদাকে বিয়ে করার আগ্রহ দেখিয়েছে সবার নজর বাড়িটার দিকে। এর মধ্যে একজন আবার বাড়ির দলিল দেখতে চেয়েছিল। বুঝ অবস্থা। একমাত্র তোমাকে দেখলাম এই ব্যাপারে কোনো আগ্রহ নাই।
কুটু মিয়া পর্ব – ৫
আলাউদ্দিন চুপ করে রইলেন। তিনি এখনো দুশ্চিন্তা মুক্ত হতে পারছেন না। হাজী সাহেব যদি ফস করে বলে বসেন— পাণ্ডুলিপিটা কোথায়? বের কর দেখি কয় ফর্মা হয়েছে। তাহলে কী হবে? আলাউদ্দিন জ্বি।তুমি লোক ভালো। আমার ভাগ্নির জন্যে একজন ভালো মানুষ দরকার। আর কোনো কিছুরই দরকার নাই।
তুমি যদি সত্যি সত্যি বিয়েতে রাজি থাক তাহলে আমি আমার ভাগ্নিকে রাজি করাব। কী বলো তুমি? তোমার মন ঠিক আছে তো? আলাউদ্দিন ক্ষীণ স্বরে বললেন, জ্বি।এই বয়সের বিয়েতে তো আর প্যান্ডেল বানানো হবে না। তুমিও পাগড়ি পরে ঘােড়ায় চড়ে বিয়ে করতে যাবে না। কাজীকে ডেকে আনব। তিনবার কবুল বলা হবে— মামলা ডিসমিস।
না-কি উৎসব করতে চাও? জ্বি না।আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেও তো তোমার যোগাযোগ নাই।জ্বি না।তাহলে আর কী? কাজী ডেকে ঝামেলা মিটিয়ে দেই। বিয়ের পরে না হয় কিছু লোকজন ডেকে চাইনিজ হোটেলে রিসিপসনের মতো করলে। কী বলে? আলাউদ্দিন ক্ষীণ স্বরে বললেন, আপনি যা ভালো মনে করেন।
Read more
