কুটু মিয়া পর্ব – ৬ হুমায়ূন আহমেদ

কুটু মিয়া পর্ব – ৬

বিয়ে করবে তুমি, আমার ভালো মনে করাকরির তো কিছু নাই। এখনো সময় আছে। হ্যাঁ না ভেবে বলো। তুমি হ্যাঁ বললে আমি হামিদার কাছে চলে যাব। যেভাবে হোক তাকে রাজি করাব। বিয়েতে রাজি না হলে লোকমান ফকিরের খপ্পর থেকে তাকে উদ্ধার করার মাত্র ক্ষমতা আমার নাই।লোকমান কির কে?

ঐ হারামজাদার কথা একটু আগে না বললাম? গুণ্ডাপাণ্ডা পুষে। ওয়ার্ড কমিশনার। মদ খেয়ে একদিন রাস্তার উপর পড়েছিল। যে-ই পাশ দিয়ে যায় হামাগুঁড়ি দিয়ে তার পায়ে ধরতে যায়।জ্বি বুঝতে পেরেছি।এখন তুমি বলো— হামিদাকে রাজি করাব? জি আচ্ছা।তাহলে তুমি আর দোকান থেকে বের হয়ো না। খাওয়া দাওয়া করে বিশ্রাম। নাও। সব যদি ঠিকঠাক মতো হয় আমি কাঙ্খী ডেকে এনে আমার বাড়িতে বিয়ে পড়িয়ে দেব। এক জিনিস নিয়ে দিনের পর দিন আর কত ঘটঘট করব? ঠিক আছে? জ্বি।

এত শুকনা গলায় জ্বি বলছ কেন? জোর করে ধরে বেন্ধে তোমাকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি এরকম মনে করছ না তো? জি না।ভেরি গুড। দাও আরেকটা সিগারেট দাও। সিগারেটের ধোয়া দিয়ে মাথা খোলাসা করে কাজে নেমে পড়ি।আলাউদ্দিন দোয়া ইউনুস পড়া বন্ধ করলেন। দোয়া কাজ করেছে। হাজী সাহেব হস্তরেখা বিজ্ঞান বই-এর পাণ্ডুলিপি বিষয়ে কোনো কথা না বলেই উঠে পড়েছেন। তিনি যে বস্তুর সঙ্গে বের হয়েছেন তাতে মনে হয় না আজ আর পাণ্ডুলিপি প্রসঙ্গ উঠবে।

কুটু মিয়া পর্ব – ৬

আলাউদ্দিনের দুপুরের খাওয়াটা ভালো হলো না। কুটুর হাতের রান্না খেয়ে এমন হয়েছে অন্য কোনো কিছুই আর মুখে স্কুচে না। দুপুরে তিনি লম্বা ঘুম দিলেন। ঘুম ভাঙ্গল বিকেলে। হাজী সাহেবের দােকানের ম্যানেজার বলল, আপনাকে থাকতে বলেছেন। আপনার জন্যে জরুরি খবর আছে।আলাউদ্দিন বললেন, কী খবর? ম্যানেজার বলল, কী খবর তা তো জানি না। চা নাশতা কী খাবেন বলেন। গোশত পরোটা আনাই।আনাও।

ভরপেট গোশত পরোটা এবং দুকাপ চা খেয়ে আলাউদ্দিন আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুম ভাঙ্গল সন্ধ্যার পর। তিনি হয়তো আরো কিছুক্ষণ ঘুমাতেন, হাজী সাহেব নিজে গা ঝাকিয়ে ডেকে তুললেন। হাসি মুখে বললেন, আজই তোমার বিয়ে।হাজী সাহেব আলাউদ্দিনের জন্যে নতুন পায়জামা পাঞ্জাবি কিনে এনেছেন। তিনি গম্ভীর ভঙ্গিতে বললেন, তাড়াতাড়ি একটা সেলুন থেকে চুল কেটে আল। সাবান ডলা দিয়ে গোসল কর। পানির ব্যবস্থা দোকানেই করেছি।আলাউদ্দিন কোনো কিছু না বুঝেই বললেন, জি আচ্ছা।

দেনমোহরের ব্যাপার আগেই ঠিক করে ফেলি। পাঁচ লাখ টাকা দেন মোহর। অর্ধেক উসুল। ঠিক আছে? জি।তুমি খুশি তো? জি খুশি।মুখে হাসি নাই কেন? হাস। আচ্ছা থাক, পরে হাসলেও হবে। সময়ের টানাটানি। ম্যানেজারকে সঙ্গে নিয়ে নাপিতের দোকান থেকে চুল কেটে আস। বিয়ের আগে চুল কাটতে হয়, নখ কাটতে হয় অনেক দিনের নিয়ম।আলাউদ্দিন সুবোধ বালকের মতো ম্যানেজারকে নিয়ে চুল কাটতে গেলেন।রাত আটটায় বিয়ে হয়ে গেল।

কুটু মিয়া পর্ব – ৬

রাত আটটা চল্লিশে তিনি নিজের বাড়িতে চলে এলেন। কুটু দরজা খুলে দিল। আলাউদ্দিন বললেন, বাথরুমে গরম পানি আছে? গা কুট কুট করছে। গোসল করব।কুটু হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। তিনি সরাসরি বাথরুমে ঢুকে গেলেন।বাথরুমে শুধু যে গরম পানি আছে তা না। বাথরুমে কাঠের একটা চেয়ার নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

চেয়ারের ওপর পিরিচ দিয়ে ঢাকা একটা জগ রাখা আছে। জগে লাল রঙের কোনো বস্তু। বরফ ভাসছে। পাশেই খালি গ্লসি। দেয়াশলাই, সিগারেট এবং এসট্রে সাজানো আছে। আলাউদ্দিন বিস্মিত হয়ে বললেন- ইয়ে নাকি? কুটু বলল, জি স্যার।টমেটো জুস? কুটু জবাব দিল না।ইয়ে দেয়া আছে? জ্বি স্যার।পেয়েছ কোথায়? দুটা ভদকার বোতল কিনা আনছি স্যার। গুলশানে পাওয়া যায়। আটশ টাকা কইরা নিছে। মোট ষোল শ।

টাকা পেয়েছ কোথায়? আপনার সুটকেসে টাকা ছিল। চাবিটা ছিল ড্রয়ারে। ড্রয়ার থেইকা চাবি নিয়া স্যুটকেস খুইলা টাকা নিছি।আলাউদ্দিন বললেন, ও। তিনি বুঝতে পারছেন না, তার রাগ করা উচিত কি। মনে হচ্ছে রাগ করা উচিত। তাকে না বলে স্যুটকেস খুলে টাকা নিয়ে যাবে এটা কেমন কথা? এ তো রীতিমতো চুরি। তার অবর্তমানে সুটকেস খোলা। আলাউদ্দিন গম্ভীর হয়ে গেলেন।

গম্ভীর মুখেই গ্লাসে ঢেলে টমেটো জুস নিয়ে একটা চুমুক দিলেন। আজকের জুস অসাধারণ হয়েছে। তার রাগ পড়ে গেল। এখন মনে হচ্ছে রাগ করা উচিত না। টাকা তো কুটু নিজের জন্যে নেয় নি। সংসারের কাজেই নিয়েছে। তিনি যখন ঘরে থাকেন না তখন হুটহাট করে টাকার দরকার পড়তে পারে। দেখা গেল ঘরে চাল নেই। চাল কিনতে হবে। স্যুটকেস থেকে টাকা না নিলে এইসব সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে?

কুটু মিয়া পর্ব – ৬

কুটু! জ্বি স্যার।দাও, গোসল দিয়ে দাও।আরামে আলাউদ্দিনের চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। এখন মনে হচ্ছে কুটু যে বুদ্ধি করে টাকা নিয়ে ভদকা কিনে এনেছে কাজটা খুবই ভালো করেছে। এই জিনিস না। আনলে এমন আরামের ব্যবস্থা হতো না। এমনিতেই আজ মনের উপর প্রচণ্ড চাপ। গিয়েছে। তিনি বছর বয়সে বিয়ে করে ফেলা সহজ ব্যাপার না। কলিজা নড়ে যায়।কুটু! জ্বি স্যার।

আজ একটা ঘটনা ঘটেছে। শুনলে তুমি বিশ্বাস করবে না। ভাববে বানিয়ে বলছি। যদিও বানিয়ে বলার অভ্যাস আমার নাই।কী ঘটনা ঘটছে স্যার? বিয়ে করে ফেলেছি।কুটু গায়ে যেভাবে সাবান ডলছিল সে ভাবেই ডলতে থাকল। আলাউদ্দিনের কথায় তার কোনো ভাবান্তর হলো বলে মনে হলো না। কিংবা এও হতে পারে বিয়ে করা যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ঘটনা কুটু তা ধরতে পারছে না। তার কাছে হয়তো বিয়ে করা এবং নাপিতের দোকানে গিয়ে চুল কেটে আসা একই ব্যাপার।

কটু শুনেছ কী বলেছি? আজ আমি বিয়ে করেছি। বিবাহ। শুভ বিবাহ।ভালো করছেন।ভালো না মন্দ কে জানে! হাজী সাহেবের কথা ফেলতে পারলাম না। আমি এক সময় খুবই বিপদে পড়েছিলাম। না খেয়ে থাকার মতো অবস্থা হয়েছিল। হাজী সাহেব তখন কাজ দিয়ে আমাকে বাঁচান। আজ তিনি ভাগ্নিকে নিয়ে বিপদে পড়েছেন। এই বিপদে আমি তাকে সাহায্য করব না তা হয় না।

একজনের বিপদে অন্যজন দেখবে। এটাই মানব ধৰ্ম। ঠিক বলছি না কুটু? জ্বি।মেয়েটিও রূপবতী, নাম হামিদা বানু। নামটা একটু ইয়ে! স্কুলে হামিদ স্যার বলে আমার এক স্যার ছিলেন। খুবই রাগি। অঙ্ক না পারলে পেটের চামড়ায় ডুলা। দিতেন। হামিদা নামটা শুনলেই হামিদ স্যারের কথা মনে পড়ে। পেটে ব্যথার। মতো হয়।

কুটু মিয়া পর্ব – ৬

নামটা বদলায়ে দেন।তাই করতে হবে। সুন্দর কোনো নাম দিতে হবে। সে রাজি হবে কিনা কে জানে। কী নাম দেয়া যায় একটু চিন্তা করবে।জি আচ্ছা।আলাউদ্দিন প্রথম প্লাস শেষ করেছেন। দ্বিতীয় গ্লাস ঢালার পর জগের দিকে তাকিয়ে দেখেন জাগে এখনো অর্ধেক জুস আছে। দেখে বড়ই আনন্দ পেলেন। উদাস গলায় বললেন— মানুষ চিন্তা করে রাখে একটা, হয় আরেকটা।

তবে যা হয় দেবী যায় সেটাই ভালো। এই জন্যে কথায় আছে— আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্যে করেন। ঠিক না কুটু? জ্বি।যেমন ধর আজ কিন্তু আমার বাসায় ফেরার কথা ছিল না। বিয়ে হয়ে গেছে, স্ত্রীর সঙ্গে থাক— এটাই তো স্বাভাবিক। ব্যবস্থাও সেরকম ছিল। হাজী সাহেব বললেন তার বাড়িতেই বাসর হবে। তিন তলার একটা ঘর ঠিক করা হয়েছিল।

ফুলটুল দিয়ে সাজানো হয়েছিল। তখন লেগে গেল ঝামেলা।কী ঝামেলা হামিদা শুরু করল কান্না। হাউমাউ কাউ কাউ যাকে বলে মরা কান্না। সে রাতে আমার সঙ্গে ঘুমাবে না। তার কান্না দেখে হাজী সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন, আচ্ছা থাক স্বামী স্ত্রীর আজকেই যে একসঙ্গে থাকতে হবে তা না। দুএকটা দিন যাক। হামিদা ধাতস্থ হোক।… কুটু!

কুটু মিয়া পর্ব – ৬

জ্বি স্যার।হামিদা নামটা তো বদলাতে হয়। যেই মুহূর্তে আমি বললাম হামিদা আমি স্যারকে চোখের সামনে দেখলাম। মনে হলো স্যার পেটের চামড়া চেপে ধরেছেন। স্যার এমনভাবে চাপ দিতেন যে পেটে জন্ম দাগের মতো দাগ পড়ে যেত। হামিদা নামটা বদলাতেই হবে। একটা নাম চিন্তা করে বের কর।

জামিলা নামটা কি আপনার পছন্দ হয়? জামিলা শব্দের অর্থ সুন্দরী।খুব যে পছন্দ হচ্ছে তা না। হামিদা নামের মাঝের অক্ষর ম। আবার জামিলা নামের মাঝের অরও ম। এমন নাম দেয়া দকার যেখানে ম থাকবে না। তবে আপাতত জামিলা নামই থাকুক। ম ছাড়া নাম যখন পাওয়া যাবে তখন সেই নাম রেখে দেব। তুমি আরো নাম খুঁজতে থাক।জ্বি আচ্ছা।

আলাউদ্দিন দ্বিতীয় গ্লাস শেষ করে তৃতীয় গ্লাসের মাঝামাঝিতে চলে এসেছেন। আরামে শরীর যেন কেমন করছে। ইচ্ছা করছে বালিশ নিয়ে বাথরুমের মেঝেতে লম্বা হয়ে শুয়ে থাকেন। তিনি শুয়ে থাকবেন, কুটু গায়ের ওপর গরম পানি ঢালবে। সাবান ডলবে। মাঝে মাঝে কুটু তার মাথা উঁচু করে ধরবে, তিনি গ্লাসে চুমুক দিবেন।কুটু! জ্বি স্যার।জামিলা তোমাকে পছন্দ করবে কিনা কে জানে। পছন্দ না করলে বিরাট বিপদ হবে। তোমার কি ধারণা পছন্দ করবে।মনে হয় না।

তুমি ঠিক বলেছ— আমার ধারণা পছন্দ করবে না। কথায় আছে না পহেলা দর্শনধারী তারপরে গুণবিচারি। মেয়েদের ক্ষেত্রে এটা সত্য না। দর্শনধারী হলেই হলো। তোমার আবার চেহারা খুবই খারাপ। চেহারা খারাপ বলতে রাগ কর নাই তো? জি না। সত্য কথায় রাগ করতে নাই। তোমার চেহারা খুবই খারাপ। ছোট ছেলেমেয়েরা তোমাকে অন্ধকারে দেখলে ভয়ে চিৎকার দিবে। আমি নিজেই মাঝে মাঝে ভয় পাই। কুটু, আমাকে একটা সিগারেট ধরিয়ে দাও তো।

কুটু মিয়া পর্ব – ৬

কুটু সিগারেট ধরিয়ে দিল। আলাউদ্দিন সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললেন, ঘুম পাচ্ছে। ইচ্ছা করছে ঘুমিয়ে পড়ি। তোমাদের পাইলট স্যার কি বাথটাবে। ঘুমাতেন।শেষের দিকে ঘুমাইতেন।শেষের দিকে ঘুমাইতেন মানে কী? উনার শরীরটা যখন খারাপ হইয়া গেল তখন বাথটাবে শুইয়া থাকতেন। সেইখানেই ঘুমাতেন।শরীর খারাপ হয়ে গেল মানে কী? কী হয়েছিল?

ডাক্তার ধরতে পারে নাই। উনি অবশ্য ডাক্তারের কাছে যানও নাই। প্রথম দুই একদিন গেছিলেন, তারপর আর যান নাই।অসুখটা কী ছিল? শইল ফুইলা গেল। গা হাত পা মুখ ফুইলা গেল। গর্ভবতী মাইয়াগো শরীরে পানি আসলে যেই রকম হয় সেই রকম।বলো কী। আমারও তো শরীরে পানি আসার মতো হয়েছে। হাজী সাহেব আজ আমাকে বললেন, তোমার কি শরীরে পানি এসেছে? যাই হোক পাইলট সাহেবের কথা বলো। শরীর ফোলা ছাড়া আর কী হয়েছিল?

শইল জ্বলত। পানি দিয়া শরীর ভিজাইয়া রাখলে জ্বলুনি কমত। এই জন্যেই কি বাথটাবে শুয়ে থাকতেন? জ্বি।আমার তো শরীর জ্বলছে না! আপনার শইল কেন জ্বলব? আপনার তো কিছু হয় নাই।তাও ঠিক। খাওয়া দাওয়া বেশি করছি এই জন্যে শরীর ভারী হয়ে গেছে আর কিছু না। পাইলট সাহেব কি শেষমেষ শরীর জ্বলুনি রোগেই মারা গেলেন?

কুটু মিয়া পর্ব – ৬

জ্বি-না। সারা শইল দিয়া ফোসকার মতো বাইর হইল। পরিষ্কার ফোসকা। মনে হয় কাচের তৈরি। ফোসকা ভর্তি টলটলা পানি।বলো কী? ঐ পানির ভেতর পোকা হইয়া গেল। ছোট ছোট সাদা কৃমির মতো পোকা। তাব পোকাগুলির মাথা আছে। ছোট্ট মাথা। মাথার দুই দিকে চোখ। ব্যাঙাচির চোখের মতো। ঐ পোকাগুলা স্যাররে খুবই যন্ত্রণা দিছে।কীভাবে?

এরা মাংস খাওয়া শুরু করল।থাক, এই গল্প বন্ধ। উজগে টমেটো জুস যা ছিল আলাউদ্দিন পুরোটাই গ্লাসে ঢেলে নিলেন। পোকার গল্পটা শোনার পর থেকে শরীর কেমন যেন করছে।কুটু!জি স্যার।ভালো করে দেখ তো আমার শরীরে ফোসকা জাতীয় কিছু কি আছে? নাই সার।গুড। ফোসকাগুলির ভেতর যে পোকা হয় সেই পোকার মাথা আছে? মাথার দুপাশে চোখ আছে? জ্বি, খুব ছোট ছোট দাঁতও আছে।খালি চোখে দেখা যায়?

জ্বি-না খালি চোখে দেখা যায় না। তবে একটা ফোসকা পাইলট স্যারের চোখের মনির উপর হইছিল। সেই ফোসকার ভিতরে যে দুইটা পোকা হইছিল। সেইগুলি উনি পরিষ্কার দেখতেন। চোখ নষ্ট হইবার আগ পর্যন্ত উনি পোকাগুলি দেখছেন। বড় কষ্ট পাইছেন।চোখ নষ্ট হয়ে গেল? পোকাগুলি ডিম পাড়ল। সেই ডিম থেইকা বাচ্চা বাইর হইবার পর তারা চোখটা খাইয়া ফেলল। বাম চোখ চইলা গেল।তোমার নিজের তো ৰূম চোখ নষ্ট। ঠিক না।জ্বি। স্যার, ব্লডিমেরি কি আরেকটু খাইবেন? আইনা দেব?

কুটু মিয়া পর্ব – ৬

দাও আরেকটু, খাই। পোকার কথাগুলি শোনার পর থেকে শরীরটা যেন। কেমন করছে। গা গুলাচ্ছে। আরেকটা খৈলে মনে হয় ঠিক হবে। কুটু তুমি যাচ্ছ কোঘায়? আপনি যে বললেন ব্লাডিমেরি আনতে।একটু পরে যাও। গল্প করি। তোমার সঙ্গে তো গল্পই করা হয় না।জ্বি আচ্ছা।তুমি কি বিয়ে করেছিলে? জ্বি।স্ত্রীর নাম কী? নাম ইয়াদ নাই।বলো কী–স্ত্রীর নাম ভুলে গেছ? জি। ছেলেমেয়ে আছে? একটা কন্যা সন্তান আছে স্যার। তার নাম মনে আছে? জ্বি না। ইয়াদ নাই।

কন্যার নামও ইয়াদ নাই। তুমি দেখি এবসেন্ট মাইন্ডেড প্রফেসর হয়ে যাচ্ছি। এটা ঠিক না। স্ত্রী এবং কন্যার নাম ইয়াদ করার চেষ্টা কর।আচ্ছা করব।করব না, এখনই কর। আমি এখনই তাদের নাম শুনতে চাই। আমি এক থেকে একশ শ্রেণব। এর মধ্যেই এই দুজনের নাম শুনতে চাই। এক-দুই-তিনচার-পাঁচ…পঁচিশ পর্যন্ত এসেই আলাউদ্দিন বাথরুমের মেঝেতে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লেন।হামিদা বলল, তোমার নাম কুটু মিয়া।

হামিদার গলায় কৌতূহল, বিস্ময় এবং কিছুটা ঘেন্না। কুটু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি মেঝের দিকে। হঠাৎ জেরার মুখোমুখি হবে এই প্রস্তুতি হয়তো তার ছিল না।কুটু আজ সকালে তার বিছানাপত্র নিয়ে হামিদা বানুর বাড়িতে উঠেছে। আলাউদ্দিন সঙ্গে ছিলেন। তিনি কিছু কেনাকাটার জন্যে নিউ মার্কেটে গেছেন। স্ত্রীর সঙ্গে বাস করতে আসার প্রস্তুতি হিসেবে এইসব কেনাকাটা। কুটু বলে দিয়েছে কী কী লাগবে। কেনাকাটার লিস্টে আছে—

কুটু মিয়া পর্ব – ৬

স্পঞ্জের স্যান্ডেল

গেঞ্জি

পায়জামা-পাঞ্জাবি

রুমাল

তোয়ালে

টুথপেস্ট

টুথব্রাশ…

রুমাল ছাড়া লিস্টের সব জিনিসই আলাউদ্দিনের আছে। তারপরেও কুটু বলে দিয়েছে এই জিনিসগুলি নতুন হলে ভালো হয়। কেন ভালো হয় আলাউদ্দিন জিজ্ঞেস করেন নি। কুটুর বিবেচনার উপর তার গভীর আস্থা।ব্যবহারের জিনিসপত্র ছাড়া অন্য কিছু জিনিসের লিস্টও কুটু করে দিয়েছে— তার মধ্যে আছুে পনেরোটা বেলি ফুল, এক কেজি গরম জিলাপি, আধা কেজি নেসাস্তার হালুয়া। এই জিনিসগুলি হামিদা বানুর জন্যে এবং আনতেই হবে। এর ভেতরেও কুটুর হয়তো কোনো বিবেচনা আছে।

স্ত্রীর সঙ্গে বাস করতে আসার ব্যাপারে আলাউদ্দিন সাহেবের গভীর শংকা ছিল। অভ্যস্থ জীবন যাপনের বাইরে কিছু করার অর্থই ভীতি। কুটু এই ভীতি দূর করেছে। কুটুর কথাবার্তায় তিনি ভরসা পেয়েছেন। তবে একা একা টিভি দেখা, চ্যানেল বদলাতে বদলাতে ইয়ে মেশানো টমেটো জুস খাওয়া কীভাবে হবে তিনি ভেবে পাচ্ছিলেন না। কুটু বলেছে, মানুষ যেমন চায় তার দুনিয়া তেমন হয়। আপনের চিন্তার কিছু নাই।

কুটুর কথার অর্থ তার কাছে পরিষ্কার হয় নি, তবু তিনি। ভরসা পেয়েছেন। কারণ কুটু ভরসা দিয়ে কথা বলেছে। সান্ত্বনার কথা বলে নি।কুটু এখন দাঁড়িয়ে আছে হামিদা বানুর বসার ঘরের মাঝখানে। হামিদা তাকে ডেকে পাঠিয়েছে। হামিদার ভুরু কুঁচকে আছে। যে সব মেয়ে শুয়োপোকা ভয় পায় তাদের সামনে বিশাল আকৃতির শুয়োপোকা দাঁড়িয়ে থাকলে তাদের মুখের ভাব যেমন হয় হামিদার মুখের ভাব ঠিক সে-রকম।

কুটু মিয়া পর্ব – ৬

কী ব্যাপার, তোমাকে প্রশ্ন করছি তুমি জবাব দিচ্ছ না কেন? তোমার নাম কুটু?জ্বি আপা।প্রথমবার যখন প্রশ্ন করলাম তখনই তো জবাব দিতে পারতে। দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করতে হলো কেন? কুটু বিনীত ভঙ্গিতে বলল, আমার নাম তো আপা জানেন। জাইনাও জিজ্ঞাস করছেন এই জন্যে চুপ কইরাছিলাম।ভবিষ্যতে কিছু জিজ্ঞেস করলে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেবে। চুপ করে থাকবে না।জি আচ্ছা।

তুমি কি জানো তোমার মতো নোংরা মানুষ আমি আমার দীর্ঘ জীবনে দেখি নি? তোমার গা থেকে পচা গন্ধ আসছে— এটা তুমি জানো? কুটু জবাব দিল না। হামিদার রাগ ক্রমেই বাড়ছে। সে রাগটা সামলাবার চেষ্টা করছে। সামলাতে পারছে না। আজকের দিনে সে রাগতে চায় না।তুমি তো হাতের নখও কাট না।

নখ বড় হয়ে পাখির নখের মত বেঁকে গেছে। হাতের নখ কাট না কেন? একটু অসুবিধা আইে আপা।বলো কী অসুবিধা।আমার নখ শক্ত, ব্লেড দিয়া কাটে না। সারাদিন পানিতে ডুবাইয়া রাইখা নখ। নরম কইরা কাটতে হয়।তোমার মাথার চুলও কি শক্ত? লম্বা চুল ঘাড় পর্যন্ত চলে এসেছে। আমি নিশ্চিত তোমার মাথা ভর্তি উকুন।

তুমি যখন রান্না করতে লাসা তোমার মাথার উকুন এসে হাঁড়িতে পড়ে। বলো মাথার চুল কাট না কেন? আমার মাথার তালুতেওঁ অসুখ আছে আপা। চুলে টান পড়লে ব্যথা লাগে।হামিদা কঠিন গলায় বলল, তোমাকে আমি এই বাড়িতে রাখ না। অবশ্যই না। আমার রান্নাঘরের ত্রি-সীমানায় তোমার মতো কেউ ঘুরঘুর করছে ভাবতেই যেনা লাগছে। তুমি চলে যাও।চইলা যাব?

কুটু মিয়া পর্ব – ৬

অবশ্যই চলে যাবে। তোমার বেন যদি কিছু পাওনা থাকে, উনার কাছ থেকে এসে নিয়ে যাবে।এখন চইলা যা আপা।হ্যাঁ এখন চলে যাবে। পাঁচ মিনিটের মাথায় বিদায় হবে।কুটু বিনীত ভঙ্গিতে বলল, আপা একটা ছোট্ট কথা… যদি অনুমতি দেন বলি।বলো। সংক্ষেপে বলো।স্যারের সঙ্গে যদি দেখা না কইরা চইলা যাই স্যরি মনে খুব কষ্ট পাইবেন। উনি আমার স্নেহ করেন। স্যারের মানে মায়া মমতা বেশি।মায়া মমতা যে বেশি তা তো দেখতেই পাচ্ছি।

মায়া মমতা বেশি না হলে তোমার মতো কোনো জিনিসকে ঘরে রাখতে পারে না। তোমাকে ঘরে মানায় না। তোমাকে ম্যানহোলের নিচে মানায়।কুটু প্রায় অস্পষ্ট গলায় বলল, স্যারের খুব শখ ছিল আমার হাতের একটা রান্না আপনেরে খাওয়াইবেন। ইলিশ মাছের ডিমের ঝোল।তুমি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শেফ হলেও আমি তোমার হাতের রান্না খাব না। আমার ঘেন্না খুব বেশি।গোসল কইরা পরিষ্কার হইয়া নিব। নাপিতের কাছে গিয়া চুল কাটব।

কাঠমিস্ত্রির কাছে গেলে ওরা নখ কাইটা দিব। ওদের কাছে যন্ত্রপাতি আছে।ওরা করাত দিয়ে তোমার নখ কাটবে? জ্বি।আমি আমার জীবনে অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত কথাবার্তা শুনেছি, তোমার মতো অদ্ভুত কথা শুনি নি। আমার সামনে থেকে যাও।জ্বি আচ্ছা।এখনই তোমাকে বিদায় হতে হবে না। তোমার স্যার আসুক। তার কাছে বিদায় নিয়ে তারপর যাবে।চুলটা কাটায়ে আসব আপা?

Read more

কুটু মিয়া পর্ব – ৭ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *