চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস পর্ব – ১৫ হুমায়ূন আহমেদ

চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস পর্ব – ১৫

রানী মেয়েটিকে আগে যেমন সুন্দর দেখেছিলেন, এবার তার কাছে আরো সুন্দর লাগছে। বিয়ের কথাবার্তা শুরু হলেই মেয়েরা সুন্দর হতে থাকে। সবচে বেশি সুন্দর হয় গায়ে হলুদের দিন। বিয়ের রাত থেকে তাদের সৌন্দর্য কমতে শুরু করে। এটা হলো সাধারণ কথা। রানীর বিয়ের কথা শুরু হয়েছে বলেই সে সুন্দর হচ্ছে, এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত। এ বাড়িতে এসেই রানীকে তিনি একটা শাড়ি দিয়েছেন।

মুরুব্বিরা বেড়াতে এলে কাপড়চোপর, মিষ্টি নিয়ে আসে। সেইভাবে আনা, তবে শাড়িটা নিয়ে তার সামান্য মন খুঁত খুঁত করছে। কারণ এই শাড়ি ফরহাদ তার বউ-এর জন্যে কিনেছিল। সুন্দর করে প্যাকেট করা। ফরহাদকে জিজ্ঞেস না করেই দিয়েছেন। ফরহাদের এসব মনে থাকবে না। এখন তার হচ্ছে মাথার ঘায়ে কুত্তা পাগল অবস্থা।রানী শাড়ির প্যাকেট হাতে নিয়ে অবাক হয়ে বলল—শাড়ি কেন?

তিনি মধুর ভঙ্গিতে বললেন, তোমাকে কখনো কিছু দেয়া হয় না। কিছু দিতে ইচ্ছা করে। ফরহাদকে বললাম একটা শাড়ি কিনে দিতে। সে নিজেই পছন্দ করে কিনে এনেছে। বুঝতে পারছি না তোমার পছন্দ হবে কি না।রানী লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, নতুন শাড়ি পরতে আমার সব সময় ভাললা লাগে।রাহেলা বললেন, শাড়ি হাতে নিয়ে বোঝা যায় না সুন্দর না অসুন্দর। শাড়ি সুন্দর শরীরে। শাড়িটা পরে আস মা। লাল ব্লাউজ আছে না? লাল ব্লাউজ যে কোনো শাড়ির সঙ্গে মানায়। লাল ব্লাউজ দিয়ে শাড়িটা পর। দেখি তোমাকে মানায় কি-না।

রানী হ্যাঁ সুচক মাথা নেড়ে লজ্জিত এবং আনন্দিত ভঙ্গিতে বের হয়ে গেল।রাহেলা মেয়েটাকে শাড়ি পরে আসতে বলেছেন কারণ নতুন শাড়ি পরলেই সবাই জানতে চাইবে শাড়িটা কোত্থেকে এসেছে। এটা সবার জানা দরকার। কেউ যেন মনে না করে তিনি আশ্রিতা হিসেবে মেয়ের বাড়িতে উঠেছেন। এতে তার যেমন অপমান। তার মেয়েরও অপমান। তিনি যতদিন থাকবে।

খরচাপাতি করে থাকবেন। এমনভাবে খরচ করবেন যেন সবার চোখে পড়ে। কাল পরশু বিশাল একটা কাতল মাছ কিনে আনাবেন।রানীকে শাড়ি তিনি অনেক বিচার বিবেচনা করেই দিয়েছেন। শুধু শাড়িটা কিনেছে ফরহাদ এই কথাটা না বললে ভালো হত। রানী যদি কোনোদিন ফরহাদকে কিছু জিজ্ঞেস করে তাহলে সমস্যা হবে।

আজকালকার মেয়ে, অকারণে কথা বলা এদের স্বভাব। ফরহাদকে দেখে বলে বসতে পারে। আপনি তো ভালো শাড়ি চিনেন। রঙটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আর ফরহাদ এমন গাধা। এ রকম কোনো কথা বললে, সে সঙ্গে সঙ্গে বলবে—কই আমি তো তোমার জন্যে শাড়ি কিনি নি!রাহেলা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলেন রানী শাড়ি পরে তাঁকে এসে সালাম করবে। তিনি বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলেন মেয়েটা এল না। বাড়ির পেছনে কোর্ট কেটে ব্যাডমিন্টন খেলা হচ্ছে।

তিনি বারান্দা থেকে দেখলেন রানী ব্যাডমিন্টন খেলছে। তাকে দেখে লজ্জা পাবার মতো ভাবও করল না। রানীর সঙ্গে লম্বামত যে মেয়েটি খেলছে তাকে তিনি চিনতে পারলেন না। এদের কোনো আত্মীয় স্বজন হবে। এখন থেকে এ বাড়ির সবাইকে চিনতে হবে। তাদের আচার আচরণ বিশ্লেষণ করতে হবে। সবার মন যুগিয়ে এমনভাবে চলতে হবে যেন কেউ বুঝতে না পারে তিনি সবার মন যুগিয়ে চলছেন। একবার বুঝে ফেললে–সর্বনাশ।

আশ্রিতের জীবন ভয়াবহ জীবন। এই জীবন সহনীয় করার কোনো ব্যবস্থা নেই। নিজেকে এই পরিবারের কাছে অতি প্রয়োজনীয় করে তুলতে পারলে জীবনযাত্রা সহজ হবে, কিন্তু এমন সম্ভাবনা একেবারেই নেই। এদের বিরাট পরিবার। অনেক লোকজন। চার পাঁচটা কাজের মেয়ে। নদশ বছর বয়েসী দুটা ছেলে—যাদের একমাত্র কাজ একটু পর পর দোকানে যাওয়া এটা ওটা নিয়ে আসা।

বাজার করার লোকও আলাদা। বিশাল বলশালী একজন মানুষ। মাথা কামানো। তাকে দেখলেই মনে হয় কিছুক্ষণ আগে একটা খুন করে এসেছে। পরিশ্রম হয়েছে বলে ক্লান্ত হয়ে চা খাচ্ছে। চা খেয়ে দ্বিতীয় খুনটা করতে যাবে।রাহেলা এই বাড়ির ভাব ধরার চেষ্টা করছেন। ধরতে পারছেন না। এত সহজে ধরা যাবে না। সময় লাগবে। জাহানারার কাছে শুনেছেন এরা একান্নবর্তি পরিবার।

কিন্তু এখন দেখছেন—সবার জন্যে একসঙ্গে রান্না হয় এটা যেমন ঠিক আবার প্রত্যেক পরিবারের আলাদা রান্নাঘর আছে। সেখানেও রান্না হয়। এটাও ঠিক।রাতে জামাইয়ের সঙ্গে রাহেলার দেখা হলো। জামাই বিনয়ে কাচুমাচু হয়ে বলল, সাভারে গিয়েছিলাম। এই কিছুক্ষণ আগে ফিরেছি। আম্মা খাওয়া দাওয়া হয়েছে।রাহেলা বললেন, জি বাবা খেয়েছি। খাওয়া দাওয়ার কোনো অসুবিধা হলে আমাকে বলবেন।না বাবা অসুবিধা কি হবে।

আমাদের মানুষ বেশি। অসুবিধা হবেই। সবার রুচির দিকে লক্ষ রেখে তো রান্না করা সম্ভব না। এই জন্যে বলে দেয়া আছে—দিনে মাছ, রাতে মাংস।বাবা আমার কোনোই অসুবিধা হচ্ছে না। আর কয়েকটা দিনের তো ব্যাপার। মঞ্জু একটা বাড়ি ঠিক করে ফেলেছে। বাথরুমের কিছু কাজ করাবার জন্যে তিন চার দিন নাকি লাগবে।

তিন চার দিন লাগুক, বা তিন চার মাস লাগুক। আম্মা এটা আপনার নিজের বাড়ি। জাহানারা মোবাইলে বলেছিল অফিসের টিভিটা আনতে। সাভার থেকে এসেছি তো মা ভুলে গেছি। কাল সকালে অফিসে গিয়েই টিভি পাঠিয়ে দিব।বাবা তুমি ব্যস্ত হয়ো না। এটাকি আর টিভি দেখার বয়স? আল্লা আল্লা করে দিন পার করা। তুমি পরিশ্রম করে এসেছ যাও হাত মুখ ধুয়ে খাওয়া দাওয়া কর।

জামাইয়ের কাছ থেকে এরচে ভালো ব্যবহার তিনি আশা করেন নি। ভবিষ্যতে তার জন্যে কি অপেক্ষা করছে তিনি জানেন না। ভবিষ্যৎ খুব সুখের তা মনে হয় না। স্ত্রীর ভবিষ্যৎ স্বামীর সঙ্গে যুক্ত। যেখানে স্বামী থেকেও নেই সেখানে আর ভবিষ্যৎ কি? রাত দশটার দিকে জাহানারা পানদান নিয়ে উপস্থিত হলো। রাহেলা বললেন, খাওয়া দাওয়া করেছিস?

জাহানারা বসতে বসতে বলল, না। আমার খেতে বসতে বসতে রাত বারটা বাজবে।রাহেলা পান মুখে দিতে দিতে বললেন, দুপুরের পর থেকে তোর বাবার সঙ্গে দেখা হয় নি। সে আছে কোথায় জানিস।টিভি দেখছেন।জামাই-এর বাড়িতে এসে এত টিভি দেখাদেখি কি? ওকে এসে ঘুমুতে বল।একতলায় ভাইয়াদের জন্যে যে ঘর রেখেছি, বাবা বলেছেন সেখানে থাকবেন।

রাহেলা আঁৎকে উঠে বললেন, কী সর্বনাশের কথা লোকজন কি বলবে? আমি এক ঘরে সে এক ঘরে। বুড়োকে এক্ষুনি আসতে বল। তোর বাবা বড় যন্ত্রণা করছে।জাহানারা শান্ত গলায় বলল, বাবা যেখানে থাকতে চাচ্ছেন সেখানে থাকুন। লোকজন কি বলবে এটা নিয়ে তোমাকে এত মাথা ঘামাতে হবে না। এ বাড়ির লোকজন এত মাথা ঘামায় না।

তাই বলে স্বামী-স্ত্রী আলাদা ঘুমুচ্ছে এটা চোখে পড়বে না। সবার চোখে পড়বে।কার চোখে কি পড়ছে এটা নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছ কেন? তুমি থাক তোমার মতো।রাহেলা বললেন, তুই এত রাগী রাগী গলায় কথা বলছিস কেন? ঘটনা কি? এ বাড়িতে পা দেয়ার পর থেকে তুমি ক্রমাগত মিথ্যা বলে যাচ্ছ। এই জন্যে রাগ লাগছে।কোন মিথ্যা বললাম?

এই যে বলছ বাড়ি ভাড়া হয়েছে। বাথরুম ঠিক হয় নি বলে যেতে পারছ না। ভাইয়ারা তোমাদের হোটেলে রুম ভাড়া করে দিতে চাচ্ছিল। আসল ব্যাপার তো আমি জানি। ভাইয়ার সঙ্গে কথা হয়েছে। যেখানে তার চাকরি পর্যন্ত নেই সেখানে উদ্ভট কথাবার্তা বলার দরকার কি? তার উপর হুট করে তুমি রানীকে শাড়ি কিনে দিলে কেন? আমার তো মনে হয় এই শাড়িও তুমি নিজে কেন নি। ভাইয়া তার বিয়ের জন্যে যে কটা শাড়ি কিনেছিল তার একটা দিয়ে দিয়েছ।যদি দিয়েও থাকি তাতে দোষ কি?

দোষ আছে। যখন তোমাকে বলেছিলাম রানীর সঙ্গে ভাইয়ার বিয়ের ব্যবস্থা করে দাও তখন পা ভারী হয়ে গিয়েছিল—এক পরিবারে বিয়ে, নতুন আত্মীয় হবে না। কত রকম কথা। আজ যখন দেখছ সাত হাত পানির নিচে চলে গেছে তখন রাতারাতি শাড়ি।শাড়িটা আমি আদর করে দিয়েছি। বিয়ের ব্যাপার আমার মাথার মধ্যে নেই।

আদর করে তুমি কিছু দাও নি। এত আদর মা তোমার মধ্যে নেই। তোমার মাথায় সব সময় নানান রকম পরিকল্পনা থাকে। এখানে আমাকে না জানিয়ে কোনো পরিকল্পনা করবে না। রানীর সঙ্গে ভাইয়ার বিয়ে নিয়ে কোনো কথা বলবে না। তার বিয়ের মোটামুটি পাকা কথা হয়ে গেছে। এই বৃহস্পতিবারের পরের বৃহস্পতিবারে পানচিনি হবে। ছেলে ব্যাংকার। মেয়ে দেখে পছন্দ করে গেছে।রাহেলা ক্ষীণ স্বরে বললেন, ফরহাদের ব্যাপারে তাদের আর আগ্রহ নেই।

জাহানারা বিরক্ত গলায় বলল, তোমার যত বয়স হচ্ছে ততই কি বুদ্ধিসুদ্ধি কমে যাচ্ছে যে ছেলে বিয়ে করতে যাচ্ছিল, কোনো একটা সমস্যায় হঠাৎ বিয়ের তারিখ পাল্টেছে তার ব্যাপারে আগ্রহ কেন থাকবে বাজারে কি ছেলে কম পড়েছে? ফরহাদের বিয়েটা তো আর হচ্ছে না।ঐ প্রসঙ্গ নিয়ে আমি তোমার সঙ্গে আর কথা বলতে চাচ্ছি না। তুমি এখন এসো আমার সঙ্গে।কোথায় যাব? আমার শাশুড়ি তোমাকে ডাকছেন? এত রাতে কি ব্যাপার?

এ বাড়ির লোকজন কেউ রাত একটার আগে ঘুমুতে যায় না। কাজেই তাদের হিসেবে রাত বেশী হয় নি। আমার শাশুড়ির কাছে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে আক্তারী খানম নামের এক মহিলা আসেন। তিনি ধর্ম নিয়ে কথাটথা বলেন। জিগির করেন। আমার শাশুড়ি এই মহিলার খুব ভক্ত।

আমি তো ঘুমের অষুধ খেয়ে ফেলেছি।বেশিক্ষণ থাকার দরকার নেই। উনার সঙ্গে দেখা করে চলে এসো।রাহেলা বিছানা থেকে উঠতে উঠতে কোমল গলায় বললেন, তুই আমার উপর এত রেগে আছিস কেন রে মা? ভুল ত্রুটি আমার আছে। বয়স হয়েছে ভুল ত্রুটি হবে না?

জাহানারা ক্লান্ত গলায় বলল, আমি মোটেও রেগে নেই। তোমাদের অবস্থা দেখে খারাপ লাগছে। তোমরা কোন অবস্থায় পৌঁছেছ সেই সম্পর্কে তোমাদের কোনো ধারণাও নেই। দিব্যি বড় বড় কথা বলে বেড়াচ্ছ। বাবা মহাসুখে টিভিতে ছায়াছবির গানের অনুষ্ঠান দেখছেন।তোর বাবার কথা ভিন্ন। ওর মাথারই ঠিক নেই।মাথা তোমাদের কারোরই ঠিক নেই মা।

জাহানারা মাকে তার শাশুড়ির ঘরে পৌঁছে দিয়ে বাবার সন্ধানে গেল। জোবেদ আলি টিভির অনুষ্ঠান শেষ করে ঘুমুতে এসেছেন। তাঁর মন আজ সামান্য ভালো। ঘুমুবার জন্যে একা একটা ঘর পেয়েছেন। নিশ্চিন্ত মনে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সিগারেট খাওয়া যাবে। কারোর কিছু বলার থাকবে না। অনেক দিন পর টিভি দেখলেন। ভালো লাগল। এ বাড়ির লোকজনদেরও তার পছন্দ হয়েছে। সবাই বেশ হাসি খুশি।

গাছপালা বিষয়ে যার সঙ্গেই তিনি কথা বলছেন সেই মন দিয়ে শুনেছে। একজন তো বলেই ফেলল—চাচা আপনি ঐ জাপানি গাছের একটা চারা এনে দিন তো টবে লাগাব। টবে হয়তো। কথাটা যে বলেছে তাকে তিনি চেনেন না। তবে যেই বলুক সে জাহানারার শ্বশুর বাড়ির। কাজেই তার কথার মর্যাদা রক্ষার জন্যে একটা চারা কাল সকালেই আনতে হবে।

চারার দাম বাবত তার কাছ থেকে টাকা চাওয়া যায় না। কিন্তু তার নিজের হাত একেবারেই খালি। মঞ্জু বা ফরহাদের কাছে যে টাকা চাইবেন সে উপায় নেই। তারা কোথায় থাকে তিনি জানেন না। এটা একটা ভুল হয়েছে। এরা কে কোথায় থাকে তা জেনে আসা দরকার ছিল। কখন কী প্রয়োজন পড়ে। রাহেলার কাছে টাকা আছে তা তিনি জানেন। থাকলেও কোনো লাভ হবে না। তিনি যদি রাহেলার পা ধরেও বসে থাকেন তাতেও কিছু হবে না।

জাহানারার কাছ থেকে ধার হিসেবে নিয়ে নেয়া যায়। বাবা তার মেয়ের কাছে ধার চাইতেই পারে। এতে লজ্জা বা অপমানের কিছু নেই। ধার নিয়ে ফেরত না দেয়াটা লজ্জার। তিনি ফেরত তো দেবেনই। ফরহাদের সঙ্গে যেদিন দেখা হবে তার পরদিনই ফেরত দেবেন।বাবা পান খাবে? জোবেদ আলি আনন্দিত চোখে মেয়েকে দেখলেন। তিনি পান খান না। তারপরেও আগ্রহের সঙ্গে পান নিতে নিতে বললেন মা শোন আমাকে সামান্য কিছু টাকা ধার দিতে পারবি? কত টাকা?

আড়াইশ। চারা কিনব, দুশ টাকা দাম। টবের মাটি তৈরির কিছু খরচ আছে। কয়েক পদের সার দিতে হবে, পটাশ, ইউরিয়া। ক্যামিকেল পটাশ দিব না। হাড়ের গুড়া পাওয়া যায়। তাই দেব। নার্সারীতে আসা যাওয়ার রিকশা ভাড়া আছে। সেটা ধরছি না। কারণ আমি রিকশায় উঠি না বললেই হয়। হাঁটি, এতে টাকা বাঁচে আবার ব্যায়ামও হয়। আমার যে বয়স এতে ব্যায়ামটা খুবই দরকার। এই বয়সে কুন্তীর আখড়ায় ভর্তি হওয়াতে সম্ভব না। হাঁটাহাঁটিটা সম্ভব। সেটাই করি। হা হা হা।

জাহানারা বিস্মিত হয়ে বাবাকে দেখছে। তার কাছে মনে হচ্ছে মা যে একটু আগে বলেছেন মানুষটার মাথা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে সেটা খুবই সত্যি।বাবা টাকাটা কি তোমার এখনই দরকার? না এখন দরকার নেই। সকালে দিলেও হবে। আর মা শোন আরেকটা কথা। জামাইয়ের সঙ্গে আলাপ করে দেখিস তো—তাদের এত বড় বাড়ি, পেছনে এত জায়গা খামাখা পড়ে আছে।তুমি বাগান করবে?

কোনো অসুবিধা নেই—আমার একটা কোদাল লাগবে, একটা খুরপাই, পানি দেয়ার জন্যে ঝাঝড়ি। দামটা হিসাব করি—একটা কোদাল একশ টাকা, খুরপাই পঁচিশ, ঝাঝড়ি একশ। মাত্র দুই আড়াইশ টাকার মামলা। চারা কিনতে হবে। সেটার খরচ আলাদা। নার্সারীওয়ালাদের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। নাম মাত্র মূল্যে চারা এনে দিব। বাড়ির সামনে ফুলের বাগান। পিছনে ফলের। তবে বাড়ির সামনে কিছু নারিকেল গাছ লাগিয়ে দেব। এই ধর পঞ্চাশটা নারিকেল গাছ। নিউনেশান নার্সারীতে কেরালা থেকে নারিকেল চারা এসেছে। গাছ বেশি বড় হয়

তবে দুই বছরে ফল দিবে। বছরে একেকটা গাছ থেকে তুই খুব কম করে হলেও দুশ নারিকেল পাবি। একেকটা নারিকেল পঞ্চাশ টাকা করে ধরলে কত হয়? চট করে হিসাব করে বল তো- দুশ গুণন পঞ্চাশ। কত হয়? আজকাল আর বড় বড় হিসাব কাগজ কলম ছাড়া করতে পারি না।জোবেদ আলি উত্তরের জন্যে অপেক্ষা করছেন। জাহানারা ভাবছে আর দেরী করা ঠিক হবে না। তার বাবাকে অতি দ্রুত কোনো ভালো ডাক্তার দেখাতে হবে।

রাহেলাকে দেখে মনে হবে তিনি গভীর আগ্রহে আক্তারী বেগমের কথা শুনছেন। আসলে তা না। ঘুমের অষুধ খাবার কারণে ঘুমে তার চোখ জড়িয়ে আসছে। তিনি চেষ্টা করছেন জেগে থাকতে। যে ঘরে বসেছেন—সেই ঘরের দরজা জানালা বন্ধ। আগরবাতি জ্বলছে। আগরবাতি ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসছে। জাহানারার শাশুড়ি আবার ঘরে ঢুকা মাত্র হাতের চেটোয় আতর ঘসে দিয়েছেন। আতরের কড়া গন্ধও শরীর যেন কেমন করছে।

ঘরটা ছোট সেই তুলনায় অনেক মহিলা বসে আছেন। শুধু যে এ বাড়ির মহিলারাই আছেন তা না, মনে হয় বাইরে থেকেও কেউ কেউ এসেছেন।আক্তারী বেগম মহিলাদের মধ্যে বসে থাকলেও বোরকা পরে আছেন। কালো বোরকার ভেতর থেকে তার চোখ শুধু দেখা যাচ্ছে। চোখ দুটা বড় বড় এবং শান্ত। তিনি মিষ্টি গলায় কবরের আজাবের কথা বলছেন। বেনামাজীর কি শাস্তি কবরে হবে তার বর্ণনা।

কবরে বেনামাজীর কি শাস্তি জানেন? সুজা আকরার সঙ্গে বেনামাজীর দেখা হবে কবরে। সুজা আকরা কে জানেন? সুজা আকরা একটা সাপের নাম। অজগর সাপ। সেই সাপ মানুষের মতো কথা বলবে। সাপটা পৃথিবীর সাপের মতো না। অন্য রকম। এই সাপের নখ আছে। কত বড় নখ শুনবেন? একজন মানুষ একদিনে যত পথে হাঁটতে পারে তত বড়। অর্থাৎ প্রায় চল্লিশ মাইল।

এই সাপ বেনামাজীর গায়ে নখ দিয়ে আঘাত করবে। এক একটা আঘাতে বেনামাজী মাটির নিচে পঞ্চাশ গজ ডেবে যাবে। বুঝেন অবস্থা।শাস্তি আরো আছে—কবর আপনি যত বড় করেই বানান-বেনামাজীর কবর ছোট হতে থাকে। কবর শরীরের উপর চাপ দেয়। কেমন সেই চাপ? এমন চাপ যে পাজরের বাম দিকের হাড় চলে আসে ডানদিকে। আর ডানদিকের হাড় চলে যায় বাম দিকে।…

রাহেলা বেগম ঘুম কাটানোর অনেক চেষ্টা করছেন। ধর্মীয় আসরের মাঝখানে ঘুমিয়ে পড়া খুবই অন্যায় হবে। এই আসর কখন ভাঙ্গবে কে জানে। সুজা আকরা নামের সাপটা নিয়ে তিনি এই মুহূর্তে কোনো চিন্তা করছে না। সময় আসুক তখন দেখা যাবে। আপাতত যে কাজটা করতে হবে তা হচ্ছে জেগে থাকা…।রানী মেয়েটাও সুজা আকরা সাপের কথা শুনছে। তবে মাঝেমধ্যে ফিক ফিক করে হাসছে। মেয়েটা তার দেয়া শাড়িটা পরল না কেন? রঙ পছন্দ হয়নি? না-কি মেয়েটা তাকে বুঝিয়ে দিতে চাচ্ছে—খাতির করতে এসো না।

রাণী মন খারাপ করে ঘুমুতে গেছে। ঘুমুতে যাবার আগে সবার সঙ্গে কিছুক্ষণ রাগারাগি করেছে। সবচে বেশি করেছে তার ভাবীর সঙ্গে। রাণীর একটা সুবিধা আছে যার সঙ্গে সে রাগারাগি করে সে সেটা বুঝতে পারে না। সে ভাবে নিতান্তই স্বাভাবিক ভাবে কিছু কথা বলা হল। কারণ ঝগড়া করার সময় রাণীর মুখ হাসিখুশি থাকে। এ রকম স্বভাব তার আগে ছিল না। আগে রাগারাগির সময় তার মুখ লাল হয়ে যেত। হাত পা কাঁপতে থাকত।

কলেজে ভর্তি হবার পর হঠাৎ একদিন মনে হল, আচ্ছা রাগারাগি হাসিমুখে করা যায় না। কঠিন কঠিন কথা হেসে গড়িয়ে পড়তে পড়তে বললে কেমন হয়? সেই থেকে সে নতুন পদ্ধতি চেষ্টা করে যাচ্ছে। শুরুতে পদ্ধতিটা ঠিকমত প্রয়োগ করা যেত না। এখন যায়। রাণী নিজেই নিজের অভিনয়ে মুগ্ধ হয়। আজও হয়েছে। জাহানারাকে সে হাসতে হাসতে কঠিন কিছু কথা বলেছে। এই কথাগুলিই না হেসে সে যদি শুধু স্বাভাবিক গলায় বলতো তা হলে জাহানারা নিশ্চয়ই কেঁদে ফেলত।

রাণী রাতের খাওয়া শেষ করে তার ঘরে গিয়েছে। দাঁত মাজবে। মুখে ফেস ক্রিম দিয়ে গল্পের বই নিয়ে বিছানায় যাবে। গল্পের বই পড়তে পড়তেই ঘুমিয়ে পরবে। রাতে আবার যখন ঘুম ভাঙ্গবে তখন বাতি নেভাবে। এই হল পরিকল্পনা। তখন জাহানারা ঢুকল। ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল, এই তোর কাছে রিলাক্সেন জাতীয় কোন ট্যাবলেট থাকলে দেতো।

 

Read more

চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস পর্ব – ১৬ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *