খলিলুল্লাহ চলে গিয়েছে। মাহতাব সাহেব একা ইজিচেয়ারে শুয়ে আছেন। অফিসের প্রচুর কাজ জমে আছে। কাজ করতে ইচ্ছা করছে না। মাথার ভেতর। খলিলুল্লাহর ব্যাপারটা ঘুরপাক খাচ্ছে। ইলেকট্রনিক্সের কিছুই জানে না একটা লোক ইলেকট্রনিক্সের যন্ত্রপাতি ঠিক করে ফেলবে এটা হতে পারে না। অক্সিজেন মাস্ক ছাড়া একটা মানুষ পানির নিচে শুয়ে থাকবে এটা হতে পারে না। প্রকৃতি মানুষকে সেভাবে বানায় নি। খলিলুল্লাহ মানুষ না, অন্যকিছু। সেই অন্যকিছুটা কী?
মানুষ তার সমাজে মানুষের রূপে অন্যকিছু পছন্দ করে না।এমনকি পাগলদেরকেও তারা চিকিৎসার নাম করে আলাদা সরিয়ে রাখে। খলিলুল্লাহ যদি সেরকম অন্যকিছু হয় তাকেও আলাদা সরিয়ে রাখতে হবে। মানুষের সমাজে তাকে থাকতে দেয়াটা বিরাট বোকামি হবে। এত বড় বোকামি আর যেই করুক তিনি করতে পারেন না। খলিলুল্লাহর ব্যাপারটা কারো সঙ্গে আলাপ করতে পারলে ভালো হতো। এমন কেউ যে সমস্যার গুরুত্ব বুঝতে পারবে। বেশিরভাগ মানুষ শুরুতেই সমস্যার গুরুত্ব বুঝতে পারে না। যখন বুঝতে পারে তখন আর সমস্যা হাতের মুঠোয় থাকে না। হাতের মুঠো থেকে বের হয়ে যায়।
মাহতাব সাহেব মোবাইল টেলিফোন হাতে নিলেন। জালালের সঙ্গে কথা বলবেন। তার টেলিফোন নাম্বার মনে নেই, তবে জোগাড় করা সমস্যা হবে না। জালাল খাঁ তার কলেজ-জীবনের বন্ধু। বই পড়া তার জীবনের একমাত্র ব্রত। তার সকাল শুরু হয় হাতে একটা বই নিয়ে। রাতে যখন ঘুমুতে যায় তখনো হাতে বই থাকে। চাকরি বাকরি নিলে পড়াশোনার সময় কমে যাবে এই যুক্তিতে সে চাকরিই নিল না। অবশ্যি যে পরিমাণ টাকাপয়সা তার বাবা মা তার জন্যে রেখে গেছে তাতে জালাল খাঁর পরের তিন পুরুষেরও কিছু করতে হবে না। এখানেও শুভংকরের ফাঁকি, জালাল বিয়েই করে নি।তার টেলিফোন নাম্বার পাওয়া গেল। বেশ কয়েকবার চেষ্টার পর তাকে ধরা গেল। মাহতাব বললেন, জালাল, কেমন আছিস?
জালাল শুকনো গলায় বললেন, ভাল।
মাহতাব সাহেব বললেন, কী করছিস?
পড়ছি। আপনাকে চিনতে পারছি না। আপনি কে?
আগে বল কী পড়ছিল, তারপর বলব আমি কে?
ফাইবার অপটিক্সের উপর একটা পপুলার বই।
বইটা কেমন লিখেছে?
মোটামুটি। তথ্য কম, বর্ণনা বেশি। লেখক খুব সহজ ভাষায় জটিল জিনিস বলতে গিয়ে লেজে-গোবরে করে ফেলেছেন। বেশি সহজ হয়ে গেছে। নিউজ পেপারের সায়েন্স আর্টিকেল হয়ে গেছে।খটমট কিছু না হলে তোর ভালো লাগে না? তা-না। আমি আপনাকে এখনো চিনতে পারছি না। দয়া করে নামটা বলুন।মাহতাব।জালাল খাঁ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, ও আচ্ছা, তুই? টুনটুনি কেমন আছে? ও আমাকে একটা জটিল প্ৰশ্ন করেছিল। আমি তাকে বলেছিলাম বই দেখে প্রশ্নের উত্তর দেব। বাসায় এসে প্রশ্নটা ভুলে গেছি। টুনটুনিকে একটু জিজ্ঞেস করতো প্রশ্নটা কী? তাকে জিজ্ঞেস করতে পারব না, সে আশেপাশে নেই। আমি অফিস থেকে টেলিফোন করছি। তুই কি আজ সন্ধ্যায় আমার বাসায় আসতে পারবি? কেন?
অদ্ভুত এক হিউম্যান স্পেসিমেন দেখবি।সব হিউম্যান স্পেসিমেনই তো অদ্ভুত।এ একটু বেশি অদ্ভুত। সে নষ্ট কলকবজা ফইড় করতে পারে।মানে কী? যে-কোনো ইলেকট্রনিক্সের জিনিস ঠিক করতে পারে।সে তাহলে ভালো একজন ইলেকট্রিক্যাল ইনজিনিয়ার। এতে অদ্ভুতের কী আছে!তার কোনো ডিগ্রি নেই।এটাও কোনো ব্যাপার না। নিজে নিজে পড়াশোনা করে মানুষ অনেকদূর উঠতে পারে।
সে পড়াশোনাও জানে না।অনেক ভালো মিস্ত্ৰি আছে পড়াশোনা জানে না।জালাল শোন, আমি যার কথা বলছি সে মাটিকাটা শ্ৰমিক। তার হাতে যেকোনো জটিল যন্ত্র দিলে সে কীভাবে কীভাবে সেটা ঠিক করে ফেলে। শোনা কথা না। আমার নিজের দেখা। তার কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা নেই। সে কোনোর ওস্তাদের সঙ্গে কখনো এ্যাসিসটেন্ট হিসেবে কাজ করে নি। তার সঙ্গে কোনো এমিটার, ভোল্টামিটার নেই। সে কাজ করে তার দুটা হাত দিয়ে।তা কী করে হবে?
আমিও বলছি—তা কী করে হবে। কিন্তু হচ্ছে। সমস্যাটা এইখানেই। তোর সামনে আমি পরীক্ষাটা করতে চাই। তোর সামনে আমি একটা নষ্ট টিভি সারাতে দেব।নষ্ট টিভি সারানোর দরকার কী? আমি এক কাজ করি, বেশকিছু আইসি নিয়ে আসি, তার মধ্যে একটা আইসির লজিক গেট থাকবে নষ্ট। সে আইসিগুলি হাতে নিয়ে বলুক কোনটা নষ্ট।তুই যেটা ভালো বুঝিস। আমি ঠিক সন্ধাবেলা ততকে নিয়ে যেতে গাড়ি পাঠাব।গাড়ি পাঠাতে হবে না।অবশ্যই পাঠাতে হবে। গাড়ি না পাঠালে তুই ভুলে যাবি।
মাহতাব সাহেব ইজিচেয়ার ছেড়ে টেবিলের কাছে চলে এলেন। হাবীবুর রহমানকে আরেকটা চিঠি পাঠাতে হবে। আজ দিনে দিনে লোক মারফত চিঠি পাঠিয়ে দিতে হবে। যে চিঠি নিয়ে যাবে সে-ই উত্তর নিয়ে আসবে। দেরি করা যাবে না। মাহতাব সাহেব নিজের ভেতর চাপা অস্থিরতা অনুভব করছেন। মনে হচ্ছে প্রেসার বেড়েছে। ডাক্তার ডেকে প্রেসার ছাপানো দরকার। তিনি বেল টিপে ডাক্তারকে খবর দিতে বললেন। ডাক্তার আসতে আসতে দ্রুত চিঠি লিখে ফেললেন।
জনাব হাবীবুর রহমান সাহেব,
আপনি লিখেছেন আপনার বড় বৌমা খলিলুল্লাহ সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানে। আমি নিজে আপনার বড় বৌমার সঙ্গে কথা বলতে চাই। আপনি ব্যবস্থা করে দিন।
আপনি চিকিৎসার জন্যে যে-কোনো সময় ঢাকা আসতে পারেন। বাকি ব্যবস্থা আমি করে দেব।
বিনীত
মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী
যা ভেবেছিলেন তাই। প্রেসার বেড়েছে ১৩০/১০০। ডাক্তার সাহেব বললেন, আপনি কি কোনো কিছু নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করছেন।
মাহতাব সাহেব বললেন, না।
বিলাক্সেন ট্যাবলেট খেয়ে রেস্ট নিন।
মাহতাব সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন, আমি রেস্টেই আছি।টুনটুনি মুগ্ধ গলায় বলল, খলিল ভাই, আমি তো আপনাকে চিনতেই পারি নি। খলিলুল্লাহ টুনটুনিকে আম্মাজি ডাকলেও টুনটুনি ঠিক করেছে তাকে সে খলিল ভাই ডাকবে।খলিলুল্লাহ লজ্জিত গলায় বলল, নাপিতের কাছে গেছিলাম। চুল কাটছি। শেভ হইছি।যে সবুজ সার্টটা পরেছেন সেই সার্টেও আপনাকে দারুণ মানিয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে আপনার বয়সও অনেক কমে গেছে। এখন আপনাকে দেখে কেউ বলবে না যে আপনি একজন মাটি-কাটক। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি ইউনিভার্সিটিতে পড়েন।খলিলুল্লাহ মাথা নিচু করে হাসল। টুনটুনি বলল, আপনাকে এখন আর খলিলুল্লাহ নামে মানাচ্ছে না। আপনার জন্যে নতুন একটা নাম বের করতে হবে।কী নাম?
চিন্তা করছি, সুন্দর কোননা নাম মাথায় আসলেই সেই নাম আপনাকে দিয়ে দেব। ঠিক আছে? ঠিক আছে আম্মাজি।দুটা নাম এই মুহূর্তে মাথায় এসেছে। দুটা নামের শুরুই অ দিয়ে। একটা হলো অরণ্য, আরেকটা অমিয়। এর মধ্যে আপনার কোন্টা পছন্দ? আম্মাজি, আপনার যেটা পছন্দ আমার সেইটাই পছন্দ।আমার পছন্দ অরণ্য। এখন থেকে আপনার নাম খলিলুল্লাহ না, এখন থেকে আপনার নাম অরণ্য।
জ্বি আইচ্ছা।
অরণ্য নামের মানে জানেন?
জ্বে না।
অরণ্য নামের অর্থ হলো—বন, জঙ্গল, Forest। আর অমিয় নামের অর্থ হলো সুধা। বরিষে অমিয় ধারা। সুধা বৰ্ষণ হচ্ছে। কী বলছি কিছু বুঝতে পারছেন? জ্বে না।অরণ্য ভাইয়া শুনুন, নাম বদলের সঙ্গে সঙ্গে কথাবার্তা বলার ভঙ্গিও বদলাতে হবে। যার নাম অরণ্য, সে নিশ্চয়ই গ্রাম্য ভাষায় কথা বলবে না। এখন থেকে শুদ্ধ শহুরে ভাষায় কথা বলবেন।
জ্বে আইচ্ছা।
জ্বে আইচ্ছা না। বলুন জ্বি আচ্ছা। আইচ্ছা থেকে ইবাদ দিন।
খলিলুল্লাহ বলল, জ্বি আচ্ছা।
টুনটুনি বলল, ছাদে চলুন। আমি স্ক্র্যাপ বুক বানাচ্ছি, সেখানে ছবি থাকবে। আপনার বায়োডাটা থাকবে। আপনার ছবি তুলতে হবে।
জ্বি আচ্ছা!।
টুনটুনি গম্ভীর গলায় বলল, আপনার নাম কী?
খলিলুল্লাহ শুদ্ধ বাংলায় বলল, আমার নাম অরণ্য।
ছবি তোলার পর কী হবে জানেন?
না।
লেখাপড়া সেশন। আপনাকে অক্ষর শেখাব। ঠিক আছে? হুঁ।দুটা বা তিনটা অক্ষর মিলে মিশে যখন শব্দ হবে তখন খুব মজা পাবেন। উদাহরণ দিয়ে বোঝাই। একটা অক্ষর হলো ক, একটা ল। এই দুটা অক্ষর মিলে মিশে হয় কল।খলিলুল্লাহ বলল, কলা কীভাবে হয়? টুনটুনি অবাক হয়ে বলল, বা আপনার তো ভালো বুদ্ধি। আকার বলে আমাদের বাংলা ভাষায় একটা জিনিস আছে। যে-কোন অক্ষরের সঙ্গে আকার যুক্ত হলে আ এসে লাগে। লর সঙ্গে আকার যুক্ত হলে হয় লা। বলুন দেখি ক এর সঙ্গে আকার যুক্ত হলে কী হয়?
কা।
এই তো পেরেছেন। এখন বলুন কলা কীভাবে হবে?
ক, আর সঙ্গে ল, ল-এর সঙ্গে আকার।
আপনি খুব দ্রুত লেখাপড়া শিখতে পারবেন। এখন চলুন ফটোসেশনে।
ফটোসেশন কী?
ফটোসেশন হলো ছবি তোলার কর্মকাণ্ড। আমার হাতে যে ক্যামেরাটা দেখছেন এই ক্যামেরাটা সাধারণ ক্যামেরা না। এর নাম ডিজিটাল ক্যামেরা। আমার একটা ম্যাকিনটস কম্পিউটার আছে। ডিজিটাল ক্যামেরায় আপনার ছবি তুলে কম্পিউটারের মেমোরিতে দিয়ে দেব। দেখতে আপনার খুব মজা লাগবে। আপনি যে সবুজ সার্ট পরে আছেন ইচ্ছা করলেই আমি ছবিতে সবুজ সার্টের রঙ বদলে দিতে পারব। আপনার চোখের কালো মণিগুলি নীল করে ফেলতে পারব।চোখের মণি নীল করলে কী হয়?
আমার কাছে খুব ভালো লাগে। মনে হয় খানিকটা সমুদ্র চোখে চলে এসেছে। আমার মার চোখের মণির রঙ ছিল হালকা নীল।খলিলুল্লাহ ছবি তোলার জন্যে সুইমিং পুলের পাশে চেয়ারে বসেছে। টুনটুনি চোখের সামনে ক্যামেরা ধরেছে। অটো ফোকাস ক্যামেরা। ক্যামেরা নিজেই ফোকাল লেংথ ঠিক করে জানান দেবে—সব ঠিক আছে, সাটারে চাপ দাও। ক্যামেরায় সবুজ বাতি জ্বলছে। টুনটুনি সাটারে টিপ না দিয়ে বিস্মিত হয়ে বলল-আশ্চর্য তো আপনার চোখের মণি হালকা নীল। আমি আগে কেন লক্ষ করি নি? আমার ধারণা ছিল আপনার চোখের মণি কালো। এখন দেখছি নীল।
খলিলুল্লাহ হাসছে। টুনটুনি বিভিন্ন ভঙ্গিমায় খলিলুল্লাহর দশটা ছবি তুলল।জালাল খাঁকে আনতে গাড়ি গিয়েছিল সন্ধ্যায়। তিনি এসেছেন রাত নটায়। পিটার নিকলস-এর একটা বই পড়ছিলেন—Holocaust and Catastrophe. বই হাত থেকে নামাতে পারছিলেন না বলে এত দেরি। বই-এর শেষ দুটা পাতা গাড়িতে বসে পড়েছেন।জালাল খাঁর বয়স পঞ্চাশ। এই বয়সে মানুষের মাথায় কাঁচাপাকা চুল থাকে। জালাল খাঁর মাথার সব চুল পাকা। টকটকে গৌরবর্ণের একজন মানুষ যার মাথা ভর্তি শরতের মেঘের মতো ধবধবে সাদা চুল। পৃথিবীতে সবচে বেশি সংখ্যক বই পড়েছেন এই সূত্রে মানুষটার নাম গিনেস বুক অব রেকর্ডস-এ যেতে পারত। কিন্তু গিনেস বুকওয়ালাদের এ ধরনের কোনো ক্যাটাগরি নেই।
মাহতাব সাহেব বললেন, তুই কি আইসি এনেছিস?
জালাল খাঁ বললেন, কীসের আইসি?
মাহতাব সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন, কীসের আইসি মানে? তোকে না। বললাম, একজন মানুষকে টেস্ট করা হবে।জালাল খাঁ বললেন, তোকে তো খুবই উত্তেজিত মনে হচ্ছে। এত উত্তেজিত কেন? এত উত্তেজিত হবার মতো কিছু পৃথিবীতে ঘটে না। এটম বোমা পড়ার ঘটনা এই পৃথিবীতে মাত্র দুবার ঘটেছে।তোকে আনাই হয়েছে লোকটাকে পরীক্ষা করার জন্যে।পরীক্ষা করা হবে। পরীক্ষার ব্যবস্থা করা আছে। আমার একটা ডিজিটাল ভয়েস রেকর্ডার আছে। নষ্ট হয়ে গেছে। ভয়েস রেকর্ড হয় না। সেটা এনেছি। তোর মিস্ত্রিকে সেটা ঠিক করতে দেয়া হবে। তুই শান্ত হ। ডাক তাকে। তার আগে ব্রিফিং দেলোকটার ব্যাপারটা কী? সে কি ভিলেজ ইডিয়ট? ভিলেজ ইডিয়ট মানে? সব গ্রামে একজন থাকে মহানিৰ্বোধ। তাকে নিয়ে সবাই হাসাহাসি করে। সে যখন হঠাৎ কিছু বুদ্ধির পরিচয় দেয় তখন হৈচৈ পড়ে যায়। সেরকম না তো?
না, সেরকম না। লোকটা নির্বোধ না। পড়াশোনা কিছুই জানে না। তার। জীবিকা হলো মাটি কাটা।জালাল খাঁ বললেন, তোর কথা বুঝতে পারছি নালোকটার যদি যন্ত্রপাতি ঠিক করার জাদুকরি ক্ষমতা থাকে তাহলে সে মাটি কাটবে কেন? সে একটা ওয়ার্কশপ দিয়ে দুহাতে টাকা কামাবে। এটা সে কেন করছে না? মাহতাব সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন, তুই ডেকে জিজ্ঞেস কর কেন করছে না।আমি রহস্যভেদ করতে পারছি না বলেই তোক ডেকেছি।জালাল খাঁ হাসতে হাসতে বললেন, জানি না তোর কী হয়েছে। তুই খুবই উত্তেজিত। উত্তেজনায় তোর কথাবার্তাও জড়িয়ে যাচ্ছে। ডাক তোর মিস্ত্রিকে। কথা বলি।
মাহতাব সাহেব বন্ধুকে নিয়ে লাইব্রেরি ঘরে বসলেন। বারেককে পাঠালেন খলিলুল্লাহকে আনতে। বিশেষ করে বলে দিলেন খলিলুল্লাহর সঙ্গে টুনটুনি যেন না আসে। টুনটুনি সারাক্ষণ খলিলুল্লাহর সঙ্গে লেগে আছে—এটা মাহতাব সাহেবের ভালো লাগছে না। লাইব্রেরি ঘরে খলিলুল্লাহর বসার জন্যে একটা টুল রাখা হলো। টুলের সামনে দুটা সোফা। একটিতে মাহতাব সাহেব, অন্যটিতে জালাল খাঁ। রীতিমতো ভাইবা পরীক্ষা।
খলিলুল্লাহকে দেখে মাহতাব উদ্দিন চমকে উঠলেন। এ কে? এ তো খলিলুল্লাহ না। এ অন্য কেউ। কী সুন্দর চেহারা! মুখের চামড়ায় রোদে পোড়া ভাব নেই। মেয়েদের চামড়ার মতো কমনীয় চামড়া। চোখের মণির রঙ নীলাভ। এটা অবশ্যি সবুজ রঙের শার্ট পরার কারণে হতে পারে। সার্টের সবুজ রঙ পড়েছে চোখের মণিতে। আগে লোকটা কুঁজো হয়ে দাঁড়াত, এখন সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের পায়ের বুড়ো আঙুলের দিকে তাকাচ্ছে না। বরং কৌতূহলী চোখে জালাল খাঁকে দেখছে।জালাল খাঁ বিস্মিত হয়ে চাপা গলায় মাহতাব সাহেবকে বললেন, এই কি তোর সেই খলিলুল্লাহ?
মাহতাব সাহেব বললেন, হুঁ।
মাটি কাটা যার জীবিকা?
হুঁ।
দেখে তো সেরকম মনে হচ্ছে না।
মাহতাব সাহেব কিছু না বলে সিগারেট ধরালেন। সিগারেট ধরাতে গিয়ে লক্ষ করলেন তার হাত কাঁপছে। টেনশনের লক্ষণ। তার ভেতর চাপা টেনশন কাজ করছে। প্রেসার কি আবারো বেড়েছে।জালাল খাঁ খলিলুল্লাহর দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার নাম কী? আমার নাম অরণ্য।জালাল খাঁ তাকালেন মাহতাব সাহেবের দিকে। মাহতাব সাহেব নিজের মনে সিগারেট টানছেন। খলিলুল্লাহর কথায় তাঁর কোনো ভাবান্তর হলো না।
তোমার নাম অরণ্য?
জ্বি।
তুমি লেখাপড়া জানো?
জানতাম না। এখন শিখছি।
কে শেখাচ্ছে।
আম্মাজি শিখাচ্ছেন।
আম্মাজিটা কে?
আম্মাজির নাম টুনটুনি।
ও আচ্ছা, আমাদের টুনটুনি হলো শিক্ষিকা? খুব ভালো। কতদিনে লেখাপড়া শিখে ফেলতে পারবে বলে তোমার ধারণা।বেশিদিন লাগবে না।শুনেছি তুমি গ্রামে থাকতে। মাটি কাটার কাজ করতে। এটা কি সত্যি? জ্বি সত্যি।গ্রামের একজন মাটি কাটা শ্ৰমিক গ্রাম্য ভাষায় কথা বলবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তুমি শুদ্ধ ভাষায় কথা বলছ।আম্মাজি আমাকে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে বলেছেন।তোমার আম্মাজি তোমাকে যা বলে তাই করো?
খলিলুল্লাহ কিংবা অরণ্য এই প্রশ্নের জবাব দিল না। সে জালাল খাঁর দিকে তাকিয়ে হাসল। এই হাসিতে কোনো সংকোচ নেই, দ্বিধা নেই।জালাল খাঁ বললেন, শুনেছি তুমি ইলেকট্রনিক্সের যন্ত্রপাতি নষ্ট হলে সারতে পারো।ইলেকট্রনিক্সের যন্ত্রপাতি কী আমি জানি না। রেডিও-টিভি সারতে পারি।আমার সঙ্গে একটা ডিভিআর আছে। ডিভিআর হলো ডিজিটাল ভয়েস রেকর্ডার। জিনিসটা দেখতে কলমের মতো। পকেটে রেখে দিলে আধ ঘণ্টা পর্যন্ত মানুষজনের কথাবার্তা রেকর্ড হয়। যন্ত্রটা কাজ করছে না। তুমি এটা ঠিক করতে পারবে?
খলিলুল্লাহ হাত বাড়িয়ে বলল, যন্ত্রটা দেন।জালাল খাঁ ডিজিটাল ভয়েস রেকর্ডারটা দিলেন। বারেক কফি নিয়ে এসেছে। জালাল খাঁ কফির মগ হাতে নিয়ে খলিলুল্লাহর দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছেন। তাঁর চোখে কৌতুক ঝিকমিক করছে। তিনি যে ডিজিটাল ভয়েস রেকর্ডার দিয়েছেন সেটা ঠিক আছে। বারো ভোল্টের নিকেল ক্যাডমিয়াম ব্যাটারিটা রেকর্ডারে ফিট করা নেই। তিনি পকেটে করে নিকেল ক্যাডমিয়াম ব্যাটারি এনেছেন তবে সেই ব্যাটারি ক্যামেরার ব্যাটারি। ছয় ভোল্টের ব্যাটারি।
খলিলুল্লাহ কলমের মতো ছোট্ট জিনিসটা একবার ডান হাতে নিল। আরেকবার বাম হাতে নিল। সে যন্ত্রটার দিকে তাকাচ্ছে না। তবে তার চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে আছে। যেন সে হাত দিয়ে ছুঁয়ে জটিল কোনো জিনিস বোঝার চেষ্টা করছে।জালাল খাঁ বললেন, তোমার কাছে ছোট স্কু ড্রাইভার আছে? স্কু ড্রাইভার থাকলে যন্ত্রটা খুলে দেখ—কোন জিনিস নষ্ট না খুলে বুঝবে কী করে?
খলিলুল্লাহ ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে বলল, যন্ত্রটা ঠিক আছে। যন্ত্র ঠিক আছে তাহলে চলে না কেন? খলিলুল্লাহ ব্যাটারি চেম্বার খুলে বলল, এই জায়গায় একটা জিনিস লাগবে।ব্যাটারির কথা বলছ? এটা হলো ব্যাটারি চেম্বার। আমার কাছে একটা ব্যাটারি আছে। দেখ তো এটা দিয়ে হবে কি না।খলিলুল্লাহ ব্যাটারি হাতে নিয়েই বলল, এটা দিয়ে হবে না। আচ্ছা দেখি, যাতে হয় সেই ব্যবস্থা করি।কী ব্যবস্থা করবে?
খলিলুল্লাহ হাসছে। ভালো কোনো ম্যাজিক দেখানোর আগে ম্যাজিসিয়ানরা যে ভঙ্গিতে হাসে সেই ভঙ্গির হাসি।জালাল খাঁ লক্ষ করলেন খলিলুল্লাহ হাতের নখ দিয়ে ডিভিআর এর অতি ক্ষুদ্র স্কু খুলে ফেলছে। ভোলা স্তুগুলো কোথাও রাখছে না, হাতের তালুর ভাঁজেই আছে। কাজটা সে এত দ্রুততার সঙ্গে করছে যে মনে হচ্ছে হাতের নখ দিয়ে স্ক্রু খোলা হলো লোকটার পেশা। গত বিশ পঁচিশ বছর ধরে সে এই কাজই করছে।কোন স্কু কোথায় লাগবে তোমার মনে আছে? একেকটা তো একেক রকম।মনে আছে।তোমার কতক্ষণ লাগবে?
খলিলুল্লাহ জবাব দিল না। এখন সে কাজ করছে চোখ বন্ধ করে। জালাল খাঁ মাহতাব সাহেবের দিকে তাকিয়ে ইংরেজিতে বললেন, ছয় ভোল্টের ব্যাটারি দিয়ে বারো ভোল্টের ডিভিআর চলবে না। তোমার এই লোক কী করছে সেই জানে, তবে তার কর্মপদ্ধতি মজার। যন্ত্রপাতি সম্পর্কে এই লোক কিছু জানে না—তাও ঠিক না। সে অবশ্যই জানে। ডিভিআর হাতে নিয়েই সে বলেছে এটা ঠিক আছে। ব্যাপারটা সত্যি হলেও আমার ধারণা কাকতালীয়ভাবে মিলে গেছে।জালাল খাঁর কথার মাঝখানেই খলিলুল্লাহ বলল, স্যার নেন। এখন ঠিক হয়েছে।ঠিক হয়েছে মানে?
খলিলুল্লাহ ছোট্ট করে নিশ্বাস নিল। জালাল খাঁ ভয়েস রেকর্ডার হাতে নিলেন। বোতাম টিপে কয়েকবার হ্যালো হ্যালো, ওয়ান টু থ্রি বললেন। রিপ্লে করলেন। ভয়েস রেকর্ডার থেকে কথা শোনা গেল হ্যালো হ্যালো, ওয়ান টু থ্রি।জালাল বিস্মিত গলায় ইংরেজিতে বললেন, ব্যাপারটা অস্বাভাবিক। যন্ত্রের কোনো এক জায়গায় রেজিসটেন্স বদলাতে হয়েছে। সেটা কী করে সম্ভব আমি বুঝতে পারছি না। আমি পুরোপুরি কনফিউজড।খলিলুল্লাহ বলল, স্যার আমি যাই?
জালাল খাঁ বললেন, যাও। যন্ত্রটা হাতে করে নিয়ে যাও। এটা আমি তোমাকে উপহার দিলাম।আমার দরকার নাই।খলিলুল্লাহ চলে যাচ্ছে। জালাল খাঁ একবার তাকাচ্ছেন খলিলুল্লাহর দিকে, একবার তাকাচ্ছেন মাহতাব সাহেবের দিকে। দুজনের কেউই কোনো কথা বলছেন না। মাহতাব সাহেবের ঘাড়ে ব্যথা হচ্ছে। কপাল ঘামছে। অবশ্যই প্রেসার বাড়ার লক্ষণ।
Read more
