দ্বিতীয় মানব পর্ব:৪ হুমায়ূন আহমেদ

দ্বিতীয় মানব পর্ব:৪

রাত দশটা বাজে।মাহতাব ঘুমুবার আয়োজন করছেন। তিনি কখনোই রাত বারটার আগে ঘুমুতে যান না। আজ তাঁর শরীর খারাপ লাগছে। বিকেল থেকেই প্রচণ্ড মাথার যন্ত্রণা ছিল। কড়া পেইন কিলার খেয়ে মাথার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। যন্ত্রণা চলে গেছে কিন্তু সে তার পালক ফেলে গেছে। সেই পালকের নাম ভোতা অবসাদ। তিনি রাতে খাবার খান নি। হঠাৎ করে আবার এসিডিটি দেখা দিয়েছে। এন্ডােসকপির মতো কষ্টকর প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে আবার মনে হয় যেতেই হবে।দরজায় টোকা পড়ছে। মাহতাব সাহেব বললেন কে? টুনটুনির গলা শোনা গেল। টুনটুনি বলল, বাবা আমি। আমি কি ভেতরে আসব?

মাহতাব সাহেব বললেন, দরজা খোলা আছে। মা, তোমাকে আমি অনেকবার বলেছি আমি তোমাদের স্কুলের হেড মিসট্রেস না। আমার ঘরে ঢোকার সময় তোমার অনুমতি নিতে হবে না। যখন ইচ্ছা ঘরে ঢুকবে। যখন ইচ্ছা বার হয়ে যাবে।টুনটুনি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। মাহতাব সাহেবের ঘরে খাটের পাশে কার্পেটের উপর আখরোট কাঠের একটা রকিং চেয়ার আছে। টুনটুনি রকিং চেয়ারে বসে দোল খেতে লাগল। তার মুখ বিষন্ন। মাহতাব সাহেব বললেন, মা, কোনো কারণে তোমার কি মন খারাপ?টুনটুনি জবাব দিল না। মাহতাব সাহেব বললেন, মা শোন, তোমার সঙ্গে আমার একটা অলিখিত চুক্তি আছে। চুক্তিটা মনে আছে?

মনে আছে।

বলো দেখি চুক্তিটা কী?

আমার যদি মন খারাপ হয় তাহলে কেন মন খারাপ সেটা তোমাকে জানাব।মাহতাব সাহেব মেয়ের সামনে বসতে বসতে বললেন, টুনটুনি মা শোনো। তোমার মা বেঁচে নাই। তোমার মা বেঁচে থাকলে তিনি নিজেই বের করে ফেলতেন কেন তোমার মন খারাপ। মা-দের পক্ষে অনেক কিছু সম্ভব যা বাবাদের পক্ষে সম্ভব না। কাজেই তোমাকেই মুখ ফুটে বলতে হবে কেন তোমার মন খারাপ।টুনটুনি দোল খাওয়া বন্ধ করে বলল, অরণ্যকে তুমি তালাবন্ধ করে রেখেছ কেন? অরণ্যটা কে?

অরণ্য কে তুমি খুব ভালো করে জানো। আমি খলিলুল্লাহ নাম বদলে অরণ্য নাম দিয়েছি।মাহতাব সাহেব শীতল গলায় বললেন, মা, একটু কি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না? তার নাম তুমি বদলাবে কেন? টুনটুনি বলল, বাবা, তুমিও কি একটু বাড়াবাড়ি করছ না। তাকে তুমি কেন তালাবন্ধ করে রাখবে? আমাদের এই বাড়িটা তো জেলখানা না। এবং সে এমন কোনো অপরাধও করে নি।তাকে তালাবন্ধ করে রেখেছি এই জন্যে কি তোমার মন খারাপ? টুনটুনি জবাব দিল না। আবারো দোল খেতে লাগল। মাহতাব সাহেব সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, খলিলুল্লাহকে শাস্তি দেবার জন্যে তালাবন্ধ করে রাখা হয় নি। ও যেন চলে যেতে না পারে সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমি লোকটির কর্মকাণ্ডে শঙ্কিত। আমি স্বস্তি বোধ করছি না। আমার মনে হচ্ছে something is wrong somewhere. তুমি কি লোকটাকে ভয় পাচ্ছ?

হয়তো পাচ্ছি। যারা স্বাভাবিক মানুষ তারা অস্বাভাবিক মানুষের আশেপাশে অস্বস্তি বোধ করে। কালো আফ্রিকানদের দেশে প্রথম যখন সাদা চামড়ার মানুষ গেল, আফ্রিকানরা সেই সাদা চামড়ার মানুষকে সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলল। শুধু যে মেরে ফেলল তা না, আগুন দিয়ে ঝলসে খেয়েও ফেলল। একইরকম ঘটনা ঘটল সাদা চামড়াদের দেশে। তাদের কাছে যখন হঠাৎ কালো চামড়ার একজন এসে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে অশুভ মানুষ হিসেবে তাকে পুড়িয়ে মারা হলো।

তুমি অরণ্যকে ভয় পাছ?

অরণ্য অরণ্য করবে না মা। তার যা নাম তাকে তাই ডাকো। সেটাই শোভন ও সুন্দর।

তুমি খলিলুল্লাহ ভাইকে ভয় পাচ্ছ?

হ্যাঁ, পাচ্ছি। কিছুটা ভয় পাচ্ছি।

তাহলে একটা কাজ করো, ওকে ছেড়ে দাও। সে যেখানে থেকে এসেছিল সেখানে চলে যাবে।

এটা সম্ভব না।

সম্ভব না কেন?

সম্ভব না, কারণ আমি তাকে ছাড়ব না। আমার কাছ থেকে যাবার আগে সে তার সব রহস্য ভেঙে তারপর যাবে। আমি রহস্য পছন্দ করি না।বাবা, আমি তোমার কথা শুনে খুব অবাক হচ্ছি।অবাক হলেও কিছু করার নেই। মা শোননা, আমার শরীরটা ভালো লাগছে। না। আমি শুয়ে পড়ব।টুনটুনি বলল, তোমার সঙ্গে আমার যে লিখিত চুক্তি ছিল তার দুটা পার্ট আছে। প্রথম পার্টে আমি আমার মন খারাপের কথা তোমাকে বলব। দ্বিতীয় পার্টে আছে তুমি চেষ্টা করবে আমার মন খারাপ ভাবটা দূর করতে। তা কিন্তু তুমি করছ না।

কী করলে তোমার মন খারাপ ভাব দূর হবে? ওকে ছেড়ে দিলে? ওকে আমি ছাড়ব না। তালাও খোলা হবে না। তবে একটা কাজ করতে পারিতোমাকে তালার চাবিটা দিতে পারি। তোমার যখনই তার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করবে তুমি তালা খুলে তার সঙ্গে কথা বলতে পারবে। কথা শেষ হবার পর আবার তালাবন্ধ করে ফেলবে। এবং চাবি আমার কাছে ফেরত দেবে। রাজি আছ? হ্যাঁ, রাজি আছি।মাহতাব সাহেব ড্রয়ার খুলে মেয়ের হাতে চাবি দিলেন। টুনটুনি চাবি নিয়ে চলে গেল। মাহতাব সাহেব বাথরুমে ঢুকে চোখেমুখে পানি দিলেন। তার সারা শরীর কেন জানি জ্বালা করছে। বাতি নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়তে পারলে ভালো হতো। এখন তা করা যাবে না। টুনটুনি ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। মাহতাব সাহেব আবার তাঁর ড্রয়ার খুললেন। হাবীবুর রহমান সাহেবের কাছ থেকে যে চিঠি এসেছে সেটা আবার পড়লেন

চৌধুরী সাহেব,

আসসালাম। আপনার পত্ৰ পাইয়াছি। আপনি অতি মহানুভব ব্যক্তি। আপনি আমাকে ঢাকায় আসিতে বলিয়াছেন। আমার চিকিৎসার যাবতীয় ব্যবস্থা করিবেন বলিয়া জানাইয়াছেন। আমি যুগপৎ আনন্দিত ও বিস্মিত হইয়াছি। আজকালকার যুগে এতটা কেউ করে না। আমি অতি দ্রুত ঢাকা আসিবার ব্যবস্থা করিতেছি।

আপনার কথামতো বড় বৌমার নিকট খলিলুল্লাহর বিষয়ে সন্ধান নিব বলিয়া মনস্থির করিয়াছি। এখননা ব্যবস্থা নিতে পারি নাই। আপনি আমার বড় বৌমার সহিত সাক্ষাতে আগ্রহ প্রকাশ করিয়াছেন। ইহা আমার জন্যে অতীব সৌভাগ্যের বিষয়। কিন্তু জনাব আমার বড় বৌমার পিতামাতা অত্যন্ত রক্ষণশীল ধারার মানুষ। তের বৎসর বয়স হইতেই বড় বৌমার বাপের বাড়ির সকল মেয়েদের বোরকা পরিধান করতে হয়। এমতাবস্থায় আপনাকে ঐ বাড়িতে নিয়া গেলেও বিশেষ সুবিধা হইবে বলিয়া মনে হয় না। তবে বড় বৌমা সন্তান প্রসবের পর আমার বাড়িতে আসিলেই আপনি তাহার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পারিবেন।

আমার বড় বৌমা তাহার শাশুড়ি মাতার সহিত (অর্থাৎ আমার স্ত্রী) যে আলাপ করিয়াছে তাহা অতি সম্প্রতি আমি আমার স্ত্রীর নিকট হইতে উদ্ধার করিয়াছি। আপনার জ্ঞাতার্থে আপনাকে তাহা জানাইতেছি। আমার বড় বৌমার ধারণা খলিলুল্লাহ মানুষ নহে, সে জিন।জিন ও ইনসানের কথা পবিত্র কোরান শরিফে উল্লেখ আছে। হযরত সোলায়মান আয়হেস সালামের অধীনে জিন সম্প্রদায় কর্মকাণ্ড করিত ইহাও কোরান শরিফে উল্লেখ আছে।আপনার অবগতির জন্য জানাইতেছি সর্বমোট তিন প্রকারের বুদ্ধিমান সম্প্রদায় আল্লাহপাক সৃষ্টি করিয়াছেন। যেমন ফেরেশতা। ইহারা আগুনের তৈয়ারি। ইহারা সন্তান সন্ততির জন্ম দিতে পারে না। ইচ্ছামতো যে-কোনো রূপ ধারণ করতে পারে।

ফেরেশতাদের পরেই আছে জিন সম্প্রদায়। ইহারাও আগুনের তৈয়ারি। তবে ইহারা সংসারধর্ম পালন করে। সন্তান সন্ততির জন্ম দেয়। মানুষের মতোই ইহাদেরও জন্ম-মৃত্যু আছে। শয়তান (ইবলিশ) জিন সম্প্রদায়ভুক্ত। যদিও অনেকে শয়তানকে পথভ্ৰষ্ট ফেরেশতা মনে করে। ইহা সঠিক না।বড় বৌমা কেন খলিলুল্লাহকে জিন ভাবিয়াছে তাহা আমি বলিতে পারি না। তবে ইহা অবশ্যই সত্য নয়। মেয়েছেলেরা দুর্বলচিত্ত হইয়া থাকে। রজ্জ্বকে সর্প ভ্রম করা তাহাদের স্বভাব।জনাব আপনার নিকট দীর্ঘ পত্ৰ দিয়াছি। পত্রের দোষত্রুটি নিজগুণে ক্ষমা করিবেন। আল্লাহপাক আপনার মঙ্গল করুক।

ইতি

নাদান

হাবীবুর রহমান

চিঠি পড়তে পড়তেই মাহতাব সাহেবের মাথা ব্যথা ফিরে এল। চোখ টনটন করতে লাগল। আজ কড়া কোনো ঘুমের ওষুধ না খেলে ঘুম আসবে বলে মনে হচ্ছে না। তিনি কি বেশি টেনশান করছেন? বাড়াবাড়ি ধরনের এই টেনশানের মানে কী? মাহতাব সাহেব টেলিফোন হাতে নিলেন। জালাল খাঁর সঙ্গে কথা বললে যদি টেনশান কিছু কমে। সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ। জালাল নিজে টেনশানমুক্ত জীবনযাপন করে। যে নিজে টেনশানমুক্ত জগতে বাস করে সে অন্যদের টেনশান দূর করতে পারে না।

হ্যালো জালাল?

হ্যাঁ। কে?

চিনতে পারছি না কে?

না।

আমি মাহতাব।

ও আচ্ছা তুই। তোর টেলিফোন পাব এটা আমি ভাবছিলাম। অরণ্যের খবর কী? জানি না কী খবর। তাকে তালাবন্ধ করে রেখেছি।সে-কী! কেন? আমি তার ব্যাপারে কনফিউজড।কনফিউজড হলেই তাকে তালাবন্ধ করে রাখতে হবে? তুই একটা কাজ কর। তাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দে।অসম্ভব! তাকে আমি হাতছাড়া করব না।জালাল খাঁ হেসে ফেললেন। মাহতাব বললেন, তুই হাসছিস কেন?

তুই অসম্ভব রকম টেনস্ হয়ে আছিস এই জন্যে হাসছি। আমার ধারণা তোর প্রেসার বেড়েছে। ড্রপ বিট হচ্ছে। তুই একজন ডাক্তার ডেকে আন।জালাল শোন, আগামী বৃহস্পতিবারে তোর কি অবসর আছে? আমার সব দিনই অবসর, আবার সবদিনই ব্যস্ততা।বৃহস্পতিবারটা তুই অবশ্যই অবসর রাখবি। আমার বাগানবাড়িতে যাবি। সেখানে খলিলুল্লাহকে নিয়ে জটিল একটা এক্সপেরিমেন্ট করব।তুই বারবার তাকে খলিলুল্লাহ বলছিস কেন? টুনটুনি তার নাম দিয়েছে। অরণ্য। তাকে অরণ্য ডাকবি। মাহতাব শোন, আমি তোর এই অদ্ভুত মানুষ নিয়ে ভাবছি। কিছু পড়াশোনা করছি। আমার ধারণা সে Homo superior।

Homo superior কী?

ডারউইনের এডভালিউশনের ধারায় মানুষের পরের বিবর্তন হলো Homo superior |

ভালো করে বুঝিয়ে বল।বুঝিয়ে বলার সময় এখনো আসে নি। যখন সময় আসবে তখন বুঝিয়ে বলব। মাহতাব, আমি টেলিফোন রাখলাম। পড়ার মাঝখানে কেউ টেলিফোন করলে আমার খুবই বিরক্তি লাগে।মাহতাব সাহেব খানিকটা বিব্রত গলায় বললেন, তোকে একটা হাস্যকর প্রশ্ন করছি, তুই কিন্তু হাসবি না।জালাল খাঁ বললেন, তুই কন্ট্রাডিকটরি কথা বলছিস। হাস্যকর কথা বলবি অথচ আমি হাসতে পারব না? আচ্ছা চেষ্টা করব না হাসতে, বল কী কথা?

এমন কি হতে পারে যে খলিলুল্লাহ আসলে মানুষ না। জিন।

জিন?

হ্যাঁ, জিন।

মাটির কলসিতে যারা বন্দি থাকে তারপর ধোয়া হয়ে বের হয় সেরকম কিছু? মাহতাব বিরক্ত গলায় বললেন, তুই আমার কথাগুলি ফানের দিকে নিয়ে যাচ্ছিস। আমি ফান করছি না।জালাল খাঁ বললেন, তোর ঘরে কি ঘুমের ওষুধ আছে? আছে।কয়েকটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে তুই ঘুমিয়ে পড়। আমি ভোরবেলা তোর সঙ্গে কথা বলব। সকালে তুই আরেকটা কাজ করবি—অরণ্যকে কোনো এক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবি। ডাক্তার তার ব্লাড গ্রুপ পরীক্ষা করবে, ইসিজি নেবে। ডাক্তার যখন বলবে অরণ্যের ব্লাড গ্রুপ ও পজিটিভ তখন নিশ্চয়ই ভাববি না যে অরণ্য মানুষ না জিন। জিনদের ও পজিটিভ ব্লাড গ্রুপ থাকার কথা না।

খলিলুল্লাহর ব্লাড গ্রুপ ও পজিটিভ তোকে কে বলল?

কেউ বলেনি, কথার কথা বলছি। তুই কি আর কিছু বলবি?

না।আমি কি টেলিফোন নামিয়ে রাখতে পারি?

মাহতাব সাহেব কিছু বললেন না। জালাল খাঁ টেলিফোন নামিয়ে রাখার পরেও তিনি বেশ কিছু সময় রিসিভার কানে নিয়ে বসে রইলেন।ঘড়িতে এখন এগারোটা বাজে। টুনটুনির জন্যে অপেক্ষা করতে হবে। বাতি নিভিয়ে বিছানায় যাওয়া যাবে না। মাহতাব সাহেব দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেকেন্ডের কাটা নড়ার কট কট শব্দ শোনা যাচ্ছে। তিনি যে উত্তেজিত এই কট কট শব্দ তার প্রমাণ। উত্তেজিত হলেই সেকেন্ডের কাঁটা নড়ার কট কট শব্দ তিনি শুনতে পান। ঘড়িটি কি দেয়াল থেকে নামিয়ে ফেলবেন?

এখন বাজছে এগারোটা এক। আশ্চর্য, মাত্র এক মিনিট পার হয়েছে? সময় কি থমকে গেছে? মাহতাব সাহেবের মনে হচ্ছে তিনি অনন্তকাল ধরে বসে আছেন। দেয়াল ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটার কট কট শব্দ শুনছেন।টুনটুনি খলিলুল্লাহর ঘরে বসে আছে। সে বসেছে চেয়ারে। খলিলুল্লাহ দেয়ালে হেলান দিয়ে বিছানায় বসে আছে। টুনটুনি বলল, আপনাকে যে তালাবন্ধ করে রাখা হয়েছে এতে কি আপনার খারাপ লাগছে?

না।

খারাপ লাগছে না কেন?

আম্মাজি, আমার কোনো কিছুতেই খারাপ লাগে না।

আমাকে আপনি আম্মাজি ডাকেন কেন?

খলিলুল্লাহ জবাব দিল না, হাসল।

আপনার মা কি দেখতে আমার মতো ছিলেন।

আমার মায়ের কথা আমার মনে নাই।

মাকে কখনো দেখেন নি?

মনে নাই।

আপনার বাবাকে আপনি দেখেছেন?

মনে নাই।

আপনার কিছুই মনে নাই এটা কেমন কথা?

আম্মাজি, আমার একবার খুব কঠিন অসুখ হয়েছিল। অসুখের পর আগের কথা সব ভুলে গেছি।কী অসুখ হয়েছিল? মাথায় যন্ত্রণা হয়েছিল। এমন যন্ত্রণা যার কোনো মা-বাপ নাই। তখন চোখের সামনে শুধু কলকজা দেখতাম।স্বপ্নে দেখতেন? স্বপ্নে দেখতাম না বাস্তবে দেখতাম সেটা খেয়াল নাই। শুধু দেখতাম কলকবজা। বড় কষ্ট করেছি। অসুখ অনেকদিন ছিল।

এখন সেই স্বপ্ন দেখেন না?

না, এখন অন্য কিছু দেখি।

কী দেখেন?

খলিলুল্লাহ জবাব দিল না। হাসল। টুনটুনি বলল, আজ আমার খুব মন খারাপ।খলিলুল্লাহ বলল, কেন মন খারাপ? আজ আমার মায়ের মৃত্যুদিন। বাবা দিনটার কথা ভুলে গেছেন। আজ তোমার মায়ের মৃত্যুদিন।হ্যাঁ। আপনার যেমন আপনার মায়ের কথা কিছু মনে নেই আমারও আমার মায়ের কথা কিছু মনে নেই। আমার যখন দুবছর বয়স তখন আমার মা মারা যান। দুবছর বয়সের স্মৃতি মানুষের মাথায় থাকে না।তোমার বাবা আর বিয়ে করেন নি?

বিয়ে করেছিলেন। নতুন মা রোড এক্সিডেন্টে মারা যান। চিটাগাং থেকে ঢাকা আসার পথে রোড এক্সিডেন্ট হয়। ড্রাইভার এবং মা দুজনই মারা যান। বাবা আহত হয়েছিলেন। অনেক দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল।টুনটুনি ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে বলল, আসল মার কথা আমার মনে নেই, কিন্তু নতুন মার কথা মনে আছে। উনি আমাকে খুব আদর করতেন। আমার টুনটুনি নাম উল্টো করে আমাকে ডাকতেন নিটুনটু। আচ্ছা আপনি ঘুমান, আমি উঠি। আপনার ঘর আমি তালাবন্ধ করে রাখব, আপনি রাগ করবেন না।আমি রাগ করব না।আপনার যদি কখনো মনে হয় আপনি এখানে থাকবেন না, পালিয়ে যাবেন-তাহলে আমাকে বলবেন, আমি গভীর রাতে এসে তালা খুলে দেব। আপনি বাড়ির পেছনে চলে যাবেন, সেখান থেকে দেয়াল টপকে পালিয়ে যাবেন। পারবেন না? হ্যাঁ পারব।টুনটুনি খলিলুল্লাহর দরজায় তালা লাগিয়ে দিল।

মাহতাব উদ্দিন ঘুমুতে গেলেন রাত একটায়। ঘুমুতে যাবার আগে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে একটা ডরমিকাম খেলেন। সাত মিলিগ্রামের ডরমিকম, নিশ্চিন্ত ঘুমের জন্যে যথেষ্ট। ঘুমের ওষুধ খাবার সঙ্গে সঙ্গে বিছানায় যাবার নাকি নিয়ম নেই। পাঁচ দশ মিনিট পরে যেতে হয়। শরীর বিলাক্স করার জন্যে সামান্য হাঁটাহাঁটি করতে হয়। বিছানায় যাবার ঠিক আগে আগে এক কাপ গরম দুধ এবং এক গ্লাস হিম শীতল পানি খেতে হয়। তিনি সবই করলেন কিন্তু তার ঘুম এলো না। দেয়াল ঘড়ির সেকেন্ডের কাটা প্রথমে দেয়ালে তারপর দেয়াল থেকে তার মাথার ভেতরে কট কট করতে লাগল। তিনি বিছানা থেকে উঠে ঘড়ি নামিয়ে তার ব্যাটারি খুলে রাখলেন। তারপরেও সেকেন্ডের কাটার কটকটানি বন্ধ হলো না। মাথার ভেতর কট কট করতেই থাকল।

তাঁর ঘুম এলো ফজরের নামাজের পর। ঘুমের মধ্যে তিনি ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখলেন। যেন তিনি তাঁর বিছানায় শুয়ে আছেন। ঘুম ভাঙতেই চারদিকে লালাভ আলো দেখতে পেলেন। সেই সঙ্গে শো শোবিজ বিজ শব্দ। ব্যাপারটা কী জানার জন্যে চারদিকে তাকাচ্ছেন, হঠাৎ চোখ পড়ল ঘরের মেঝের দিকে। ঘরের মেঝেটা বদলে গেছে। এটা এখন আর মেঝে না, গলিত লাভার মতো হয়ে গেছে। লাভা ফুটছে। বুদবুদ ভাঙছে। সেখান থেকেই বিজ বিজ শব্দ হচ্ছে। ঘটনা কী? তিনি কি কোনো এক অদ্ভুত উপায়ে আগ্নেয়গিরির ভেতরে ঢুকে পড়েছেন? তিনি আতঙ্কে অস্থির হয়ে খাটে উঠে বসলেন এবং লক্ষ করলেন তার রট আয়রনের খাটের পায়া জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির লাভাতে গলে গলে যাচ্ছে তিনি দ্রুত নেমে যাচ্ছেন লাভা সমুদ্রে। যে দিকে চোখ যাচ্ছে গলন্ত লভা।

শোঁ শোঁ শব্দ আসছে। শব্দটা হচ্ছে ঠিক মাঝখানে। কোনো একটা ঘটনা সেখানে ঘটছে। ভয়ঙ্কর কোনো ঘটনা। মাহতাব সাহেব স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। কিছু একটা বের হয়ে আসছে। একটা মানুষের মাথা। মানুষটা কে? খলিলুল্লাহ? হ্যাঁ খলিলুল্লাহই তো। মাহতাব সাহেব চেঁচিয়ে বললেন, কী চাও তুমি, কী চাও? মানুষের মাথার মুখ হা হয়ে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, আমি কিছু চাই না।

চলে যাও তুমি, চলে যাও।

কোথায় চলে যাব?

যেখান থেকে এসেছ সেখানে চলে যাও।যাব কীভাবে? আপনি তো আমাকে তালাবন্ধ করে রেখেছেন! মাহতাব সাহেব স্বপ্নের ভেতর চেঁচাচ্ছেন টুনটুনি, চাবি দিয়ে তালা খুলে দে। চলে যাক। এ যেখান থেকে এসেছে সেখানে চলে যাক।মাহতাব উদ্দিনের ঘুম ভেঙে গেল। তিনি দেখলেন তাঁর সারা শরীর ঘামে ভেজা।

টুনটুনি তার ম্যাকিনটস কম্পিউটারের সামনে বসে আছে। সে খুব অবাক হয়ে কম্পিউটারের পর্দার দিকে তাকিয়ে আছে। পর্দায় অরণ্যর ছবি। স্ক্র্যাপ বুক বানানোর জন্যে সে ডিজিটাল ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলি কম্পিউটারে ঢুকিয়েছে। আগে তোলা ছবি এবং পরে তোলা ছবি পাশাপাশি দেখে তার খুবই অবাক লাগছে। প্রথমদিকে তোলা ছবিগুলির সঙ্গে শেষের দিকে তোলা ছবির বড় অমিল আছে। চোখের মণির রঙে অমিল। প্রথম যে ছবিগুলি তোলা হয়েছিল সেখানে চোখের মণির রঙ কালো। এখনকার ছবিতে হালকা নীল।

মানুষের চোখের মণির রঙ কি পাল্টাতে পারে? অসম্ভব। মানুষ গিরগিটি না যে রঙ পাল্টাবে। তাহলে কি ডিজিটাল ক্যামেরায় কোনো গণ্ডগোল হয়েছে? সেই সম্ভাবনাও ক্ষীণ। কারণ টুনটুনির মনে আছে সে খালি চোখে দেখেছে। অরণ্যের চোখের রঙ হালকা নীল।যদি দেখা যায় যে মানুষটা ইচ্ছামতে চোখের মণির রঙ পাল্টাতে পারে তাহলে মন্দ হয় না। টুনটুনির ইচ্ছা করছে অরণ্যকে জিজ্ঞেস করতে। সেটা সম্ভব না, কারণ টুনটুনির বাবা অরণ্যকে লোক দিয়ে সাভার পাঠিয়ে দিয়েছেন। কেন পাঠিয়েছেন বলেন নি। জিজ্ঞেস করার পরেও বলেন নি। শুধু বাবাকে খুব চিন্তিত মনে হয়েছে। তিনি অরণ্যকে নিয়েই চিন্তিত এটা বোঝা যাচ্ছে। কারণ তিনি টুনটুনিকে ডেকে বলেছেন, তুমি যখন-তখন খলিলুল্লাহর ঘরে যাবে না।

টুনটুনি বলেছে কেন যাব না?

আমি নিষেধ করছি সেই জন্যে যাবে না।

তুমি নিষেধ করছ কেন?

নিষেধ করছি কারণ তুমি একটি অল্পবয়েসী মেয়ে। হুটহাট করে একটা যুবক ছেলের ঘরে কেন ঢুকবে? বাবা অরণ্য কিন্তু আমাকে মা ডাকে।সে তোমাকে মা ডাকুক, খালা ডাকুক, দাদি ডাকুক কিছু আসে যায় না। আমি তোমাকে যেতে নিষেধ করছি, তুমি যাবে না।রেগে যাচ্ছ কেন বাবা?

রেগে যাচ্ছি না। আমার যা বলার আমি সহজভাবেই বলছি।তুমি মোটেই সহজভাবে কিছু বলছ না। তোমার গলার স্বর নিচু, এটা ঠিক আছে। কিন্তু রাগে তোমার হাত-পা কাঁপছে। তোমার চোখ লাল হয়ে আছে। আমার ধারণা তুমি অসুস্থ। তুমি কি দয়া করে একজন ডাক্তার দেখাবে?

 

Read more

দ্বিতীয় মানব শেষ : পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *