মাহতাব সাহেব জবাব দেন নি। তিনি মেয়ের সামনে থেকে সরে গিয়েছেন। তার কিছুক্ষণ পরই ডাক্তার আসতে দেখে টুনটুনি ভাবল বাবা তার নিজের জন্যে ডাক্তার এনেছেন। দেখা গেল ঘটনা তা না। ডাক্তার অরণ্যের জন্য এসেছে। ব্লাড প্রেসার মাপছে, রক্ত নিচ্ছে। নানান ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে।টুনটুনি নিশ্চিত তার বাবা অরণ্যকে নিয়ে খুবই চিন্তিত। টুনটুনি চিন্তিত হবার মতো কিছু দেখছে না। মানুষটা রহস্যময় এবং বিস্ময়কর। কিন্তু চিন্তিত হবার মতো না। মানুষ চিন্তিত হবে হিংস্ৰ জন্তু দেখে। দুষ্ট মানুষ দেখে। অরণ্য হিংস্ৰ জন্তু না। দুষ্ট মানুষও না।
টুনটুনি অরণ্যের ছবির প্রিন্ট আউট দিয়েছে। কালার প্রিন্টার থেকে ছবি প্রিন্ট হচ্ছে। কী সুন্দর ছবি! মাহতাব উদ্দিন তাঁর সাভারের বাগানবাড়ির পুকুর পাড়ে বসে আছেন। তাঁর পাশে জালাল খাঁ বসে আছে। পুকুর পাড়ে দ্বিতীয় কোনো প্রাণী নেই। মাহতাব উদ্দিন কঠিন নিষেধ জারি করেছেন পুকুর পাড়ে যেন কেউ না আসে। পুকুরে খলিলুল্লাহকে নামানো হয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ হলো সে ডুব দিয়েছে। এখনো ভাসে নি। মাহতাব উদ্দিন বললেন, জালাল দেখ তো কতক্ষণ পার হয়েছে।জালাল খাঁ বললেন, সতেরো মিনিট।সতেরো মিনিট একটা মানুষ ডুব দিয়ে আছে। পানিতে নামানোর সময় একটা হাফপ্যান্ট পরে নেমেছে। এখনো ভেসে ওঠে নি। তোর কাছে কি কোন ব্যাখ্যা আছে?
না।কোনো ব্যাখ্যা নেই? না।কোনো মানুষের পক্ষে কি এই কাজটা করা সম্ভব? জালাল খাঁ গম্ভীর গলায় বললেন, মানুষের ক্ষমতা সীমাহীন। তার পক্ষে অনেক কিছুই সম্ভব, কিন্তু অক্সিজেন ছাড়া বাচা সম্ভব না।মাহতাব উদ্দিন বললেন, লোকটা অক্সিজেন ছাড়া বেঁচে আছে? জালাল খাঁ বললেন, হ্যাঁ।মাছ যেমন পানি থেকে অক্সিজেন নেয় সে কি এইভাবে নিচ্ছে না? না।কীভাবে বুঝলি না?
অক্সিজেন নিলে তাকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ছাড়তে হতো। তা সে করছে না। যদি করত পানিতে বুদবুদ দেখা যেত। পানিতে বুদবুদ দেখছি না। আরেকটা সম্ভাবনা আছে।কী সম্ভাবনা? আমাদের অরণ্য যদি তার শারীরবৃত্তীয় সমস্ত কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখে তাহলে অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়বে না।সেটা কি সম্ভব? প্রাচীন মুনিঋষিরা করতে পারতেন বলে বইপত্রে পড়ি। যোগীসাধকরাও না-কি পারেন। তবে আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য না। তোমার এই স্পেসিমেন আর যাই হোক কোনো মুনিঋষি না, যোগীসাধকও না।মাহতাব উদ্দিন বললেন, সে কে? জালাল খাঁ বললেন, জানি না। আমি একটা হাইপোথিসিস দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি।কী হাইপোথিসিস?
এখনো তেমন কিছু দাঁড় করাতে পারি নি, ভাবছি। আমাদের এগোতে হবে লজিকের মাধ্যমে। প্রসেস অব এলিমিনেশন পদ্ধতিতে।জালাল খাঁ সিগারেট ধরালেন। ঘড়ি দেখলেন। পঁচিশ মিনিট পার হয়েছে। মানুষটা এখনো পানিতে ডুব দিয়ে আছে। মাহতাব উদ্দিন বললেন, প্রসেস অব এলিমিনেশনটা কী? জালাল খাঁ বললেন, প্রথমে আমাদেরকে সিদ্ধান্তে আসতে হবে অরণ্য নামের জিনিসটি মানুষ না অন্য কিছু। যদি মানুষ হয় তাহলে এক ধরনের যুক্তি আর যদি অন্য কিছু হয় তাহলে অন্য ধরনের যুক্তি।মাহতাব উদ্দিন বললেন, অন্য কিছুটা কী হতে পারে?
রোবট হতে পারে।রোবট? হ্যাঁ, রোবট। দেখতে মানুষের মতো। কথাবার্তা মানুষের মতো। যেহেতু রোবট, তার অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়ছে না। সে পানির নিচে যতক্ষণ ইচ্ছা থাকতে পারবে।তোর ধারণা সে রোবট? আমার কোনো ধারণা নেই। প্রসেস অব এলিমিনেশনের ভেতর দিয়ে যেতে হলে প্রথমে তাকে রোবট ভাবতে হবে। তারপর যুক্তি দিয়ে দেখাতে হবে সে রোবট না। তখন রোবট ক্যাটাগরি বাদ পড়বে।মাহতাব উদ্দিন ছোন্ত নিশ্বাস ফেলে বললেন, সে রোবট না। তার ব্লাড টেস্ট করা হয়েছে। ব্লাডের গ্রুপ 0 পজেটিভ। ইউরিন, স্টুল সব একজামিন করা হয়েছে, ইসিজি করা হয়েছে, প্রেশার মাপা হয়েছে, এক্স-রে নেয়া হয়েছে। সব কিছুই সাধারণ মানুষের মতো, শুধু হার্ট সামান্য এনলার্জড।
জালাল খাঁ বললেন, তাহলে তাকে বরং মানুষ হিসেবে ধরে নিয়ে এগোতে থাকি। ধরা যাক সে মানুষ, তবে অস্বাভাবিক ক্ষমতা সম্পন্ন মানুষ। Homo superior. মাহতাব উদ্দিন বললেন, Homo superior ব্যাপারটা কী? তুই আগেও একবার বলেছিস।জালাল খাঁ বললেন, জন বেরেসফোর্ড নামের একজন লেখক The Hampdensire Wonder নামে একটা বই লিখেছিলেন।
বইটা ১৯১১ সনে প্রকাশিত হয়েছিল। এই বই-এ তিনি Homo superior-এর কথা প্রথম বলেছেন। তার ধারণা পৃথিবীর বর্তমান মানবসম্প্রদায়ের পরিবর্তে নতুন মানবসম্প্রদায় চলে আসবে। তারা দেখতে মানুষের মতো হলেও তাদের থাকবে অস্বাভাবিক ক্ষমতা। এরাই পৃথিবী শাসন করবে। এরাই গ্রহ-নক্ষত্র জয় করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে।
এরা আসবে কোত্থেকে? মিউটেশনের মাধ্যমে মানুষের ডিএনএ পরিবর্তিত হয়ে Homo superior তৈরি হবে। এরা হলো কার্টুনে দেখা কল্পনার Superman।ডারউইনের বিবর্তনবাদ? বিবর্তিত হয়ে মানুষ এরকম হবে? জালাল খাঁ বললেন, ডারউইনের বিবর্তনবাদের সমস্যা হচ্ছে এই থিওরি অতীতের বিবর্তনের ধারা বলতে পারে কিন্তু ভবিষ্যতে কী বিবর্তন হতে যাচ্ছে তা বলতে পারে না। মানুষের ডিএনএ-র পরিবর্তনটা কীভাবে হবে ডারউইনের থিওরি সেটা বলছে না। হঠাৎ করে একজন Homo superior তৈরি হবে না-কি পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় এদের দেখা যাবে তা কেউ বলতে পারছে না।
জালাল, তোর ধারণা খলিলুল্লাহ নামের মাটিকাটা কুলি একজন Homo superior? হতে পারে। তার অস্বাভাবিক ক্ষমতা তো চোখের সামনে দেখছি। যন্ত্রপাতির উপর তার কী পরিমাণ দখল সেটাও দেখতে পাচ্ছি।আমাদের এখন করণীয় কী? আমাদের করণীয় একটাই–অরণ্যের সঙ্গে কথা বলা। তার সাহায্য নিয়েই বের করা সে কে? তার DNA-র সিকোয়েন্সগুলি কী তা জানা। যে পড়াশোনা জানে না তাকে পড়াশোনা শেখাননা। সে যদি Homo superior হয় তাহলে মানবসম্প্রদায়ের অর্জিত জ্ঞানের সবটুকু সে নিজের ভেতর অতি দ্রুত নিতে পারবে।মাহতাব উদ্দিন বললেন, কতক্ষণ পার হয়েছে দেখ তো?
এক ঘণ্টা পনেরো মিনিট।তাকে কি ডেকে তুলব না সে আরো কিছুক্ষণ পানিতে থাকবে? জালাল খাঁ বললেন, থাকুক পানিতে। আমাকে তুই একটা কাগজ কলম দে। তাকে যে সব প্রশ্ন করব তা লিখে ফেলি। থাক কাগজ কলম লাগবে না। জালাল খাঁ পুকুরের দিকে তাকিয়ে আছেন। মাহতাব উদ্দিনও তাকিয়ে আছেন। কেউ কোনো কথা বলছেন না। পুকুরের পানি শান্ত। সেখানে কোনো আলোড়ন নেই।
জালাল খাঁ মাহতাব উদ্দিন সাহেবের বাগানবাড়ির বসার ঘরে সোফায় বসে আছেন। তাঁর সামনে বেতের চেয়ারে খলিলুল্লাহ বসে আছে। সব মিলিয়ে পানিতে দুঘণ্টা ছাব্বিশ মিনিট ছিল। এক ঘণ্টা হলো সে পানি থেকে উঠে এসেছে। সামান্য কিছু খাওয়া-দাওয়া করে সে এসে বসেছে বসার ঘরে। জালাল খাঁ তাঁর সঙ্গে কিছু কথা বলতে চান। মাহতাব উদ্দিনেরও এই আসরে থাকার কথা ছিল।
তাঁর হঠাৎ প্ৰবল মাথার যন্ত্রণা শুরু হয়েছে বলে তিনি অন্য একটা ঘরে দরজা জানালা বন্ধ করে শুয়ে আছেন। তাঁর মাইগ্রেনের সমস্যা আছে। হঠাৎ হঠাৎ মাইগ্রেনের ব্যথা উঠে তাঁর জগৎ সম্পূৰ্ণ এলোমেলো করে দেয়। আজকের মাথা ব্যথার ধরন সেরকম।জালাল খাঁ অরণ্যের দিকে তাকিয়ে বললেন, কেমন আছ? অরণ্য বলল, ভালো আছি।পানির নিচে থাকতে কেমন লাগে? ভালো লাগে।শুকনায় থাকতে ভালো লাগে না-কি পানিতে থাকতে ভালো লাগে?
দুটাই ভালো।তোমাকে আমি কিছু প্রশ্ন করব, জবাব দেবে? জ্বি, দেব।তোমার কিছু অস্বাভাবিক ক্ষমতা যে আছে এটা তুমি জানো? আগে জানতাম না। এখন জানি।তুমি পানিতে ডুবে থাকতে পারো এটা দেখলাম। এছাড়া আর কী পারো? শূন্যেও ভেসে থাকতে পারো? পারি।জালাল খাঁ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকলেন। নিজেকে সামলে নিয়ে আবারো বললেন, তুমি শূন্যে ভেসে থাকতে পারো?
পারি।
তাহলে ভেসে দেখাও।
এখন পারব না।
কখন পারবে?
যখন আশেপাশে কেউ থাকে না তখন পারি।
কতক্ষণ ভেসে থাকতে পারো?
অনেকক্ষণ পারি।
তুমি কে এটা বললা।
আমি জানি না আমি কে।
তোমার কি জানতে ইচ্ছা হয় তুমি কে?
না।
কিন্তু আমি জানতে চাই তুমি কে? তুমি আমাকে সাহায্য করো। তুমি সাহায্য করলেই আমি তোমার ব্যাপারে জানতে পারব। তুমি সাহায্য না করলে পারব না। আচ্ছা শোননা, তুমি কি রোবট? রোবট কী? রোবট হলো যন্ত্ৰমানব। যাদের ক্ষুধাতৃষ্ণা নেই, আবেগ নেই। তোমার ক্ষুধাতৃষ্ণা আছে? আছে।আবেগ আছে? কষ্ট পেলে কাঁদো? না।কষ্ট পেলে কাঁদো না? কখনো তোমার চোখে পানি আসে নি?
একবার এসেছে।
সেটা কখন?
আম্মাজি তার মার কথা বলছিল। তার মাকে সে কখনো দেখে নাই। মার কথা বলতে গিয়ে সে এত মন খারাপ করল যে আমার চোখে পানি এসে গেল।এর অর্থ হচ্ছে তোমার আবেগ আছে। আচ্ছা, তুমি তোমার বাবা-মাকে মনে করতে পারো? তারা কোথায়? জানি না।বাবা-মার কথা কিছুই জানোনা? আমার কিছু মনে নাই। একবার আমার খুব বড় অসুখ হয়েছিল। অসুখ হবার পর অসুখের আগের সবকিছু ভুলে গেছি।
কী অসুখ হয়েছিল? মাথায় যন্ত্রণা।
দুঃস্বপ্ন দেখতাম।
কী দুঃস্বপ্ন?
নানান রকম কলকজা ঘুরছে। অদ্ভুত অদ্ভুত যন্ত্র। অসুখের সময় বড় কষ্ট করেছি।জালাল খাঁ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, যন্ত্রের কথায় মনে পড়ল তুমি নষ্ট যন্ত্রপাতি ঠিক করতে পারে। এই প্রমাণ আমরা দেখেছি। যে নষ্ট যন্ত্র ঠিক করতে পারে সে যন্ত্র বানাতেও পারে। তুমি যন্ত্র তৈরি করতে পারবে? কী যন্ত্র? আমাদের জানা নেই এমন।আপনি বলেন কী যন্ত্র বানাতে চান।জালাল খাঁ আগ্রহ নিয়ে বললেন, একটা টাইম মেশিন কি বানোননা যায় এইচ জি ওয়েলস-এর টাইম মেশিন।
সেই মেশিনে কী হয়? সেটা একটা অদ্ভুত মেশিন। এই মেশিনে করে মানুষ অতীত থেকে বর্তমানে আসতে পারে। বর্তমান থেকে ভবিষ্যতে যেতে পারে।আপনার কথা বুঝতে পারছি না।জালাল খাঁ উত্তেজিত ভঙ্গিতে হাত পা নেড়ে এমন ভঙ্গিতে বলা শুরু করলেন যেন টাইম মেশিন বানাতে পারে এমন একজন ইনজিনিয়ার ভার সামনে বসে আছে। ব্যাপারটা শুধু বোঝানোর অপেক্ষা, বোঝানো হয়ে গেলে টাইম মেশিন তৈরি হয়ে যাবে। তাৎক্ষণিক ডেলিভারি।মেশিনটা হবে এরকম—মনে করে আমি মেশিনটায় বসলাম, সুইচ টিপলাম। অমনি আমি চলে গেলাম অতীতে, যখন আমার বাবার বয়স মাত্ৰ সাত বছর।
এই যন্ত্র তৈরি করা যাবে না।
কেন তৈরি করা যাবে না?
নিয়মের মধ্যে পড়বে না।
কিসের নিয়ম?
জগতের নিয়ম। এই যন্ত্র তৈরি হলে জগতের নিয়মে গণ্ডগোল হয়ে যাবে। জগতের নিয়মে গণ্ডগোল হয় এমন কিছু জগৎ তৈরি করতে দেয় না।জালাল খাঁ নিশ্বাস ফেলে বললেন, তুমি ঠিকই বলেছ। টাইম মেশিন ফিজিক্সের সূত্র গ্রহণ করে না। ধররা আমি যদি অতীতে ফিরে গিয়ে আমার সাত বছর বয়সী বাবাকে মেরে ফেলি তাহলে কী হবে? তাহলে আমি কীভাবে বেঁচে থাকব? আমার বাবাই তো সাত বছর বয়সে মারা গেছেন। তিনি বড় হয়ে বিয়ে করতে পারেন নি। কাজেই আমার জন্ম হয় নি। তাহলে আমি কোত্থেকে এলাম?অরণ্য এক দৃষ্টিতে জালাল খাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে চাপা কৌতূহল। যেন সে কিছু বলতে চায়। জালাল খাঁ বললেন, তুমি কিছু বলবে?
আমি আম্মাজির জন্যে একটা যন্ত্র বানাব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।কার জন্যে যন্ত্র বানাবে, টুনটুনির জন্যে? জি।কী যন্ত্র? আম্মাজি এই যন্ত্রে তার মায়ের কথা শুনতে পাবে। অনেক কাল আগে যে সব কথা বলেছিল সে সব কথা।কীভাবে? মানুষের কথা নষ্ট হয় না। মানুষের কথা থেকে যায়। ঘরের দেয়ালে থাকে, বাতাসে থাকে। সেখান থেকে কথা বের করে আনা যাবে।কীভাবে? সেটা আপনাকে বুঝিয়ে বলতে পারব না। আমি বুঝতে পারছি কিন্তু আপনাকে বোঝাতে পারব না।যন্ত্রটা তৈরি করতে তোমার কী লাগবে? কলমের মতো একটা যন্ত্র যে আপনার আছে সেটা লাগবে। আরো কিছু জিনিস লাগবে।
তোমার যা যা লাগবে সবই আমি জোগাড় করে দেব। তুমি যন্ত্রটা বানাও। আমরা এই যন্ত্রের নাম দেব Past Rocorder, PR। বাংলায় তার নাম হবে অতীত-কথন। আচ্ছা তুমি কি যন্ত্রটা একা একা তৈরি করতে পারবে? তোমাকে সাহায্য করার লোক লাগবে না? আমাকে সাহায্য করার লোক আছে। কোথায় আছে? অরণ্য জবাব দিল না। চুপ করে বসে থাকল। সে এখন তাকিয়ে আছে তার পায়ের বুড়ো আঙুলের দিকে। বুড়ো আঙুল উঠানামা করছে।জালাল খাঁ তার দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, তুমি কে? অরণ্য বলল, আমি জানি না আমি কে? বলেই সেও জালাল খাঁর দিকে ঝুঁকে এসে বলল, আপনি কি জানেন আপনি কে? জালাল খাঁ হতাশ গলায় বললেন, আমিও জানি না আমি কে।
হাবীবুর রহমান সাহেব চিকিৎসার জন্যে ঢাকা চলে এসেছেন। খালি হাতে আসেন নি-তিন কেজি মাষকলাইয়ের ডাল, পাঁচ কেজি কালিজিরা পোলাওয়ের চাল, দুটা বিশাল সাইজের মিষ্টিকুমড়া নিয়ে এসেছেন। তিনি হাত বাড়িয়ে মাহতাব সাহেবের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন। হ্যান্ডশেকের পর কোলাকুলি করলেন। মাহতাব সাহেবের বাড়িঘর দেখে বেচারা পুরোপুরি হকচকিয়ে গেছেন। এই জিনিস তাঁর কল্পনাতেও ছিল না। বসার ঘরের মেঝের অর্ধেকটা মার্বেলের, বাকি অর্ধেক মনে হচ্ছে কাচের, নিচ থেকে সবুজ আলোর আভা আসছে। হাবীবুর রহমান সাহেব বললেন, ভাইসাহেব, ভালো আছেন? মাহতাব উদ্দিন বললেন, ভালো আছি।যাকে পাঠিয়েছিলাম, খলিলুল্লাহ, সে কেমন আছে?
সেও ভাল আছে।তার মাধ্যমেই আপনার সঙ্গে পরিচয়, জগতের কী অদ্ভূত লীলা।অদ্ভূত লীলা তো বটেই! জনাব, আপনি বলেছিলেন আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন।মাহতাব উদ্দিন শুকনো গলায় বললেন, চিকিৎসার ব্যবস্থা অবশ্যই করা হবে। আপাতত বিশ্রাম করুন। আপনাকে গেস্টম দেখিয়ে দেবে।শুকরিয়া। জনাব, খলিলুল্লাহর সঙ্গে একটু কথা বলি। সে আছে কোথায়? সে ভালো মতেই আছে। তার সঙ্গে আপনার কথা বলার প্রয়োজন দেখছি। না।
না না, কোনো প্রয়োজন নাই। সে থাকবে তার মতো। আমি থাকব আমার মতো। আমার খুবই ভালো লাগছে যে আপনার আশ্রয়ে এসে দরিদ্র মানুষটার একটা গতি হয়ে গেল। সবই আল্লাহর ইচ্ছা। আমরা উপলক্ষ মাত্র। জনাব, কেবলা কোনদিক? তিন ওয়াক্ত নামাজ কাজা হয়েছে। মাগরেবের ওয়াক্তও হয়ে গেছে।আপনি আপনার ঘরে যান। কেবলা কোনদিকে তা আপনাকে দেখিয়ে দেবে জায়নামাজ এনে দেবে।জায়নামাজ আমার সঙ্গেই থাকে জনাব। জায়নামাজ আর কোরান শরিফ। এই দুটা জিনিস ছাড়া আমি ঘর থেকে বের হই না। ছোটবেলার অভ্যাস।
মাহতাব উদ্দিন বসার ঘর থেকে বের হলেন। এখন সন্ধ্যা হয় হয়। বাসায় যখন থাকেন সন্ধ্যাবেলা ছাদে হাঁটাহাঁটি করেন। সূর্যাস্ত দেখেন। গ্রামে সূর্যাস্ত দেখার একরকম আনন্দ। শহরে দালানকোঠার ঘরে খলিলুল্লাহকে নিয়ে আসা হয়েছে। এই ঘরটিও তালাবন্ধ। তাতে খলিলুল্লাহর কোনো সমস্যা হচ্ছে না। সে নিজের মনেই আছে। এই ঘরটা বেশ বড়। ঘরের মেঝেতে পাটি বিছানো। পাটিভর্তি হাজারো খুঁটিনাটি যন্ত্রপাতি। দুটা কম্পিউটারের মাদারবোের্ড। একটা মনিটর। ইলেকট্রিকের তার। সোল্ডারিং গান। খলিলুল্লাহ যা যা চেয়েছে জালাল খাঁ খবই জোগাড় করে দিয়েছেন।
তাকে নিয়ে ইলেকট্রনিকের দোকানে ছেড়ে দিয়েছেন। সে যা যা চেয়েছে সবই তাকে দেয়া হয়েছে। প্রায় পাঁচ কেজি ওজনের একটা মোমের টুকরার উপর জিনিসগুলি বসেছে। মোমের টুকরাটি মনে হয় মূল বেস। প্রতিদিন তাকে প্রচুর বরফ দিতে হচ্ছে। বরফ কী জন্যে লাগছে কে জানে। বরফের আপাতত কোনো ব্যবহার দেখা যাচ্ছে না।মাহতাব উদ্দিন খলিলুল্লাহর ঘরের জানালার কাছে এসে দাঁড়ালেন। জানালায় টোকা দিয়ে বললেন, কেমন আছ খলিলুল্লাহ?খলিলুল্লাহ মুখ তুলল না। কাজ করতে করতেই বলল, ভালো আছি।যন্ত্র তৈরি হচ্ছে?
জ্বি।
এই যন্ত্রে অতীতের কথা শোনা যাবে?
জ্বি। শুধু কথা শোনা যাবে না। ছবিও দেখা যাবে।
বলো কী! ছবিও দেখা যাবে?
জ্বি। যন্ত্রটা এই ঘরে ফিট করা হয়েছে, কাজেই এই ঘরে পনেরো বিশ কুড়ি বছর আগে কী হয়েছিল সেটা দেখা যাবে।
এমন যন্ত্র সত্যি তৈরি হবে?
জ্বি হবে। হবে না, হয়েছে। আমি পরীক্ষাও করেছি।
মাহতাব উদ্দিন আগ্রহের সঙ্গে বললেন, পরীক্ষায় কী দেখলে?
দেখলাম এই ঘরে একজন মহিলাকে তালাবন্ধ করে রাখা হতো। মহিলার চোখ নীল।
তাই দেখলে?
জ্বি।
খুব ভালো যন্ত্র। পুরোপুরি তৈরি হোক, তারপর আমাকে খবর দিও। আমি এসে দেখে যাব।
জ্বি আচ্ছা।
অন্ধকারে কাজ করছ কীভাবে?
আমার অসুবিধা হয় না।
অসুবিধা না হলে তো ভালোই।
মাহতাব উদ্দিন আবার হাঁটতে শুরু করলেন। পুরোপুরি অন্ধকার না হওয়া। পর্যন্ত তিনি ছাদের এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত হটলেন। এশার নামাজের। আজানের পর তিনি নিচে নামলেন। আজ সারাদিন টুনটুনির সঙ্গে দেখা হয় নি মেয়েটির সঙ্গে দেখা হওয়া দরকার। বারেক খবর দিয়েছে টুনটুনির জ্বর। চারদিকে ভাইরাস ফিভার হচ্ছে। টুনটুনিকেও কোনো একটা ভাইরাসে ধরেছে কিনা কে জানে।টুনটুনি ঘর অন্ধকার করে শুয়েছিল। মাহতাব উদ্দিন ঘরে ঢুকে বাতি জ্বালালেন। টুনটুনি চাদর গায়ে বিছানায় শুয়ে আছে। তার চোখ লাল। মাহতাব উদ্দিন বললেন, জ্বর কি খুব বেশি রে মা?
টুনটুনি বাবার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল, বাবা, তুমি আমাকে অরণ্যের সঙ্গে দেখা করতে দিচ্ছ না কেন? তাকে নিয়ে ছাদের চিলেকোঠায় আটকে রেখেছ। আমাকে কেউ ছাদে যেতে দিচ্ছে না।মাহতাব সাহেব বললেন, খলিলুল্লাহ হোর জন্যে কী একটা যন্ত্র বানাচ্ছে। যন্ত্রটা পেয়ে তুই খুব সারপ্রাইজড হবি। সেই সারপ্রাইজটা যেন নষ্ট না হয় সে জন্যেই তোকে যেতে দিচ্ছি না।যন্ত্রটা দিয়ে কী হয়? কী হয় আগে বললে তো সারপ্রাইজ থাকবে না।টুনটুনি বিছানায় উঠে বসতে বসতে বলল, বাবা, মানুষকে তালাবন্ধ করে রাখতে তুমি খুব মজা পাও—তাই না? তার মানে?
চিলেকোঠার ঐ ঘরে তো তুমি আমার মাকেও তালাবন্ধ করে রাখতে।মাহতাব সাহেব শান্ত গলায় বললেন, টুনটুনি, তোমাকে আমি বলেছি তোমার মা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাকে তালাবন্ধ করে রাখা ছাড়া আমার দ্বিতীয় পথ ছিল না।টুনটুনি তাকিয়ে আছে। তার চোখ রক্তাভ।মাহতাব সাহেব বললেন, এভাবে তাকিয়ে আছ কেন? আর কিছু বলতে চাও? টুনটুনি বলল, না।
রাত একটা।মাহতাব উদ্দিন তাঁর ঘরে বসে আছেন। তার সামনে মাথা নিচু করে বারেক দাঁড়িয়ে আছে। মাহতাব সাহেব বললেন, হাবীবুর রহমান সাহেবকে কাল ভালো ডাক্তার দেখাবার ব্যবস্থা করবে।বারেক বলল, জ্বি করব।মাহতাব উদ্দিন সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে শান্ত গলায় বললেন, খলিলুল্লাহর একটা ব্যবস্থা আজ রাতেই করতে হবে। কী ব্যবস্থা বুঝতে পারছ?
পারছি।আর যাই করে তাকে পানিতে ফেলবে না। পানিতে ফেলে কিছু করা যাবে না। এ অন্য জিনিস।বারেক চাপা গলায় বলল, স্যার এই বিষয় নিয়া আপনি মোটেই চিন্তা করবেন না। আমাদের ইটের ভাটা আছে।ঠিক আছে, এখন যাও।রাত দুটা কুড়ি মিনিটে খলিলুল্লাহকে হাত-পা বেঁধে ইটের ভাটায় ফেলে দেয়া হলো।
রাত দুটা পঁচিশ মিনিটে টুনটুনির জ্বর খুব বাড়ল। গা দিয়ে রীতিমতো আগুন বের হচ্ছে। মাহতাব উদ্দিন মেয়েকে বাথটাবে শুইয়ে দিয়ে নিজেই গাড়ি নিয়ে ডাক্তার আনতে ছুটে গেলেন। জ্বরের ঘোরে টুনটুনি পানির নিচে চলে গিয়েছে। তখন খুব অদ্ভুত একটা ব্যাপার হলো। টুনটুনি লক্ষ করল সে পানির নিচে ডুবে থাকতে পারছে, তার কোনো সমস্যা হচ্ছে না। সে একসঙ্গে অসংখ্য নারী পুরুষের গলা শুনছে। সবাই বলছেটুনটুনি, দ্বিতীয় মানব সম্প্রদায়ের জগতে স্বাগতম। তুমি এখন আমাদের একজন।
Read more
