এরকমই কথা ছিল। আফজাল সাহেব বলে দিয়েছিলেন কোমরে দড়িবাঁধা অবস্থায় মবিনুর রহমানকে গেটের বাইরে দাড়া করিয়ে ওসি সাহেব তার বাড়িতে চা নাশতা খবেন।ওসি সাহেব এই কাজটিই এখন করছেন। তবে কাজটি করতে তাঁর খুব ভালো লাগছে না। লোক জমছে। অনেক মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। মানুষ বেশি জমলেই তারা একসঙ্গে এক জাতীয় চিন্তা-ভাবনা শুরু করে। যার নাম মব সাইকোলজি। এই চিন্তা হঠাৎ কোন দিকে যাবে বলা মুশকিল। জড়ো হওয়া মানুষগুলি যদি মনে করে কাজটা অন্যায় হয়েছে তাহলে মুহুর্তের মধ্যে ক্ষেপে যাবে। ক্ষেপা জনতা— ভয়ঙ্কর।রূপা বারান্দায় এসে শান্ত চোখে দৃশ্যটা দেখল। একবার মবিনুর রহমানের দিকে তাকিয়ে সে তাকাল তার বাবার দিকে। তারপর তাকাল ওসি সাহেবের দিকে।ওসি সাহেব বললেন, আপনার মেয়ে?
আফজাল সাহেব বললেন, জি। এর নাম রূপা।ওসি সাহেব বললেন, কেমন আছ মা? রূপা বলল, ভালো আছি। আপনি স্যারকে কোমবে দড়ি বেঁধে আমাদের বাড়ির সামনে দাঁড়া করিয়ে রেখেছেন কেন? আসামিকে থানায় নিয়ে যাওয়ার এইটাই পদ্ধতি, আসামি যে-ই হোক না কেন তাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যেতে হবে।স্যারের বাড়ি থেকে থানায় যাবার রাস্তা তো এটা না। আপনি অনেকখানি ঘুরে আমাদের বাড়ির সামনে এসেছেন। কেউ নিশ্চয়ই এই কাজটা করার জন্যে আপনাকে বলেছে। তাই না?
ওসি সাহেব আফজাল সাহেবের দিকে তাকালেন।আফজাল সাহেব কড়া গলায় বললেন, ভেতরে যাও রূপা।রূপা কয়েক মুহুর্ত বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে ভেতরে চলে গেল।বাড়ির সামনে লোক বাড়ছে।ওসি সাহেব চা শেষ না করেই উঠে পড়লেন। ব্যাপারটা আর ভালো লাগছে না। এত লোক জমছে কেন? মবিনুর রহমানকে হাজতে ঢোকানোর তিন ঘণ্টার ভেতর থানার চারপাশে দুতিন হাজার মানুষ জমে গেল। তারা হৈচৈ, চিৎকার কিছুই করছে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সবাই শান্ত। এই লক্ষণ ভালো না। খুব খারাপ লক্ষণ। এরা থানা আক্রমণ করে বসতে পারে। থানায় আগুন লাগিয়ে দিতে পারে। থানায় টেলিফোন আছে–অতিরিক্ত ফোর্স চেয়ে টেলিফোন করা যায়। কিন্তু টেলিফোন গত এক সপ্তাহ থেকে নষ্ট।
ওসি সাহেব থানার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বললেন, আপনারা সরকারি কাজকর্মে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছেন। এর ফলাফল ভালো হবে না। আমরা আসামি ধরে এনেছি। আসামিকে কোর্টে চালান করে দেব। সেখান থেকে জামিন হবে। যান, আপনারা বাড়ি চলে যান। ভীড় বাড়বেন না।কেউ নড়ল না।দুপুর গড়িয়ে গেল। মানুষ বাড়তেই থাকল।ওসি সাহেব সেকেন্ড অফিসারকে বললেন হেড অফিসে খবর দিতে। আসামিকে ছেড়ে দিলে এখন কোনো লাভ হবে না। হিতে বিপরীত হবে। লোকজন থানান্য আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। এই রিস্ক নেয়া যায় না।সেকেন্ড অফিসার সাহেব থানা ছেড়ে বেরুতে গেলেন, লোকজন তাকে ঘিরে ফেলল। নিরীহ গলায় বলল, স্যার কোথায় যান? তা দিয়ে আপনি কী করবেন?
যেতে পারবেন না স্যার।যেতে পারব না। মানে? এটা কি মগের মুলুক নাকি? সেকেন্ড অফিসার ভয়াবহ পুলিশী গর্জন দিতে গিয়েও থেমে গেলেন। লোকজন কেমন যেন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। এই দৃষ্টির সঙ্গে তিনি পরিচিত। এই দৃষ্টির নাম–উন্মাদ দৃষ্টি।জেবা চা খাচ্ছে। পিরিচে করে চা খাচ্ছে।পিরিচ ভর্তি চা নিয়ে চুকচুক করে চুমুক দিচ্ছে। তাকে কেন জানি খুব আনন্দিত মনে হচ্ছে। রূপা ঘরে ঢুকে জেবাকে দেখল। জেবা বলল, ফুপু আমি চা খাচ্ছি। বলেই খিলখিল করে হাসল। চা খাওয়ার মধ্যে হাসির কী আছে রূপা বুঝতে পারছে না। আসলে এখন সে কিছুই বুঝতে পারছে না। তার কাছে সবই এলোমেলো হয়ে গেছে।
ফুপু।কী? তুমি চিন্তা কববে না। ফুপু, আমি তোমার দলে।আমি কোনো চিন্তা করছি না। আর শোন, আমি কোনো দল কবছি না।তোমার স্যারকে নিয়েও তুমি চিন্তা কববে না। আমি ব্যবস্থা করছি।তুমি ব্যবস্থা করছি মানে? সব মানুষ ক্ষেপে যাবে। ওলা থানা আক্রমণ করবে। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেবে। সাংঘাতিক মজার ব্যাপার হবে।কী বলছ তুমি? আমি কোনো মিথ্যা কথা বলি না ফুপু। সন্ধ্যার মধ্যে ভয়ঙ্কর কাণ্ড শুরু হবে।জেবা হাসল খিলখিল করে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে খুব আনন্দিত।
নীলগঞ্জ থানার ওসি সাহেব অস্থির বোধ করছেন। দুপুরে তিনি বাসায় ভাত খেতে যান নি। শুধু তিনি কেন, থানার কেউই দুপুরে খায় নি। সেপাইদের সবাইকে রাইফেল হাতে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। ওসি সাহেব বিপদের ঘাণ পাচ্ছেন। মানুষ ক্রমেই বাড়ছে। এখন মনে হচ্ছে দূর দূর থেকে মানুষ আসছে। অনেকের হাতেই বর্শা। বর্শা হলো এ অঞ্চলের যুদ্ধান্ত্র যার স্থানীয় নাম অলংগা। কারো কারো হাতে লম্বা বাঁশের লাঠিও আছে। এখনো সন্ধ্যা হয় নি। কিন্তু অনেকেই হারিকেন নিয়ে এসেছেন। মনে হয় তাদের সারারাত জেগে থাকার পরিকল্পনা। ওসি সাহেব মবিনুর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। হাজতের দরজা খুলতেই মবিনুর রহমান বিস্মিত গলায় বললেন, এত লোক কেন চারদিকে?
ওসি সাহেবের প্রথমেই মনে হলো, ব্যাটা সব জেনেশুনে ঠাট্টা করছে। পরমুহুর্তেই মনে পড়ল। এই লোক মিথ্যা বলে না। ঠাট্টাও করে না। চন্দ্রবোড়া সাপ নিয়ে সত্যি কথাই বলেছিল।মবিন্নুর রহমান আবার বললেন, এত লোক কেন? ওসি সাহেব ভুরু কুঁচকে বললেন, জানি না। আপনি কি চা খাবেন? জি-না।সিগারেট? সিগারেট লাগবে? আনিয়ে দেব? জি-না।ওসি সাহেব কথা বলার আর কিছু পেলেন না। নিজের অফিস ঘরের দিকে ফিরে চললেন। লোক আরো বাড়ছে। দ্রুত কোনো একটা বুদ্ধি বেব কবে এদের দূর করতে হবে। ভয় দেখিয়ে দূর কবা যাবে না। এক মানুষ ভয প।ায়। জনতা ভয় পায় না। মবিনুর বহমানকে ছেড়ে দিলেও কোনো লাভ হবে না।
এরা তাহলে নিজেদের বিজয়ী ভাববে। বিজয়ী মানুষদের জয় উল্লাসও ভয়াবহ হয়ে থাকে। আনন্দেই এরা হয়তো থানা জ্বালিয়ে দেবে। এমন কিছু করতে হবে যাতে মবিনুব রহমানের কোমরে দড়ি বেঁধে হাজতে নিয়ে আসা যুক্তিযুক্ত মনে হয়। কীভাবে তা সম্ভব? অতি দ্রুত কিছু ভেবে বের করতে হবে। অতি দ্রুত। এমন কিছু বলতে হবে যাতে সবাই বলে কোমবে দড়ি বেঁধে থানায় আনার প্রয়োজন ছিল।ওসি সাহেব তাঁর অফিসে ঢুকেই দেখলেন, নীলগঞ্জ হাই স্কুলের ধর্ম শিক্ষক জালালুদ্দিন বসে আছেন। জালালুদ্দিন সাহেবের মুখ অতিরিক্ত গম্ভীর।কেমন আছেন জালালুদ্দিন সাহেব? জি জনাব, ভালো। আপনার কাছ থেকে একটা বিষয় জানতে এসেছি।অবস্থা তো দেখতেই পাচ্ছেন। এর মধ্যে কী জানতে চান? অবস্থা সম্পর্কেই একটা প্রশ্ন। মবিনুর বহমান সাহেবকে আপনারা কোমরে দড়ি বেঁধে হাজতে এনেছেন। কী জন্যে এনেছেন? গম চুরিব একটা মিথ্যা মামলার কারণে না অন্য কিহুচ?
অন্য কিছু।বলুন শুনি।ওসি সাহেব সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন–অন্য ব্যাপার। সামান্য কারণে তার মতো লোককে তো এভাবে থানায় আনা যায় না। পুলিশ হয়েছি বলে তো আর আমরা অমানুষ না। মানী লোকের মান আপনারা যেমন বুঝেন আমরাও বুঝি। উনার বিরুদ্ধে অসামাজিক কাৰ্যকলাপের গুরুতর অভিযোগ আছে।কী বললেন? ওসি সাহেব নিজেকে গুছিয়ে নেবার জন্যে কিছুটা সময় নিলেন। সিগারেট ধরালেন। সুন্দর একটা গল্প ফাঁদতে হবে। বিশ্বাসযোগ্য গল্প। সিগারেট টানতে টানতে কঠিন মুখে বললেন— একটা রেপ কেইস হয়েছে। ভিকটিমের জবানবন্দি অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।রেপ কেইস?
জি, রেপ কেইস। এই কারণেই কোমরে দড়ি বেঁধে থানায় এনেছি।জালালুদ্দিন হতভম্ব মুখে তাকিয়ে আছেন।ওসি সাহেব এই হতভম্ব দৃষ্টি দেখে খানিকটা সাত্ত্বিনা পেলেন। মনে হচ্ছে কাজ হবে। জালালুদ্দিন যখন তাঁর কথায় হকচকিয়ে গেছে তখন অন্যরাও যাবে। এই ঘটনায় লোকজন বুঝবে কোমরে দড়ি বেঁধে থানায় আনা উচিত ছিল। বাতাস ঘুরে যাবে। মবের চিন্তা-ভাবনা একদিন থেকে অন্যদিকে অতি দ্রুত ঘুরতে পারে। এখন যা করতে হবে তা হচ্ছে মামলা সাজানো। একটা মেয়ে জোগাড় করতে হবে, যে হবে ফরিয়াদি। তেমন মেয়ে জোগাড় করা কঠিন হবে না। পুলিশের কাছে কোনো কাজই কঠিন নয়।
তানভির বাগানে একা একা বসে ছিল।রূপা বারান্দায় আসতেই সে ডাকল, রূপা শুনে যাও তো।রূপা শান্তমুখে বাগানে নামল। তানভির বলল, তোমার স্যারের কাণ্ড শুনেছ? রফিক ভাই এইমাত্র বলে গেলেন। তিনি বাজার থেকে শুনে এসেছেন। তুমি শুনতে চাও? না।না কেন? একটা মানুষকে ঠিকমতো জানতে হলে তার ভালো-মন্দ সবই জানতে হয়।আপনার বলার ইচ্ছা খুব বেশি হলে বলুন, শুনব।জোর করে শুনাতে চাচ্ছি না। তবুও আমি মনে করি তোমার শোনা উচিত। তোমার স্যার একটা মেয়েকে নির্জন বাড়িতে রেপ করেছেন, যে কারণে পুলিশ তাকে কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে গেছে।আপনি কি এটা বিশ্বাস করেন?বিশ্বাস না করার তো কিছু দেখছি না। নারীসঙ্গবৰ্জিত একজন মানুষ নির্জন জায়গায় একা একা থাকে…।নারীসঙ্গবৰ্জিত অনেক সাধক মানুষও নির্জন জায়গায় একা একা থাকে।তোমার ধারণা উনি সাধক মহাপুরুষ?
হ্যাঁ।তাহলে তো আর কিছু বলার নেই।না। আর কিছু বলার নেই।রূপা বাগান থেকে উঠে এলো। তানভির প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে ফেলল, এই বুদ্ধিমতী শক্ত ধাঁচের মেয়েটিকেই তার বিয়ে করতে হবে। জোর করে হলেও করতে হবে। মেয়েটির মনে সাময়িক যে মোহ আছে তা বিয়ের পর কেটে যাবে। অল্পবয়সের মোহ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এই মোহ অনেকটা শিশুদের হামের মতো, সবারই হবে। আবার সেরে যাবে।ওসি সাহেবের পরিকল্পনা কাজ করেছে। লোকজন চলে যেতে শুরু করেছে। মানুষ অসত্যকে সহজে বিশ্বাস করে। মবিনুর রহমানের মেয়েঘটিত ব্যাপার তারা বিশ্বাস করেছে। এর নাম মিব সাইকোলজি–এই উত্তর এই দক্ষিণ। মাঝামাঝি কোনো ব্যাপার নেই।
ওসি সাহেব ডাকলেন, কবির মিয়া।ডিউটির সেন্ট্রি বলল, জি স্যার।দেখে আস তো মবিনুর রহমান কী করছে? দেখে এসেছি স্যার। উনি ঘুমুচ্ছেন।হারামজাদা।হারামজাদা কাকে বলা হলো, কেন বলা হলো কবির মিয়া ঠিক বুঝতে পারল না। ওসি সাহেব বললেন, লোকজন এখনো আছে? কিছু আছে স্যার।হারামজাদা।কিছু বললেন স্যার? না কিছু বলি নাই। তুমি যাও ডিউটি দাও। আর শোন আমি এখন বেরুব! আমি ফিরে না। আসা পর্যন্ত যেন থানা ছেড়ে কেউ না যায়।ওসি সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়েছে। ভয়ঙ্কর একটা দিন গিয়েছে। বিশ্রামের উপায় নেই। এখন যেতে হবে একটা মেয়ের সন্ধানে, যাকে ফরিয়াদি করে মামলা দাড়া করানো যায়,।
নীলগঞ্জ বাজারে কয়েকঘর পতিতা থাকে। ওদের কাছ থেকেই সংগ্ৰহ করতে হবে। অল্পবয়সী হলে ভালো হয়। বয়স যত কম হবে ততই ভালো। নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।পাওয়া গেল। সাবিহা বেগম নামের পনেরো বছরের এক বালিকা দুদিন আগের তারিখে থানায় জি.ডি এন্ট্রি করাল। তার গল্পটি এককম–সে সকালে বাড়ি যাচ্ছিল। মবিনুর রহমানের বাড়ির কাছ দিয়ে যাবার সময় মবিনুর রহমান তাকে বলল, তুমি কি বাজারে যাও? সে বলল, হ্যাঁ।তুমি আমার জন্যে কিছু লবণ কিনে আনবে? লবণের অভাবে কিছু রাঁধতে পারিছ না। আধা কেজি লবণ আনতে পারবে? সে বলল, পারব।পার? হেড মাস্টার সাহেব বললেন, গরু কিছু মুখে দিচ্ছে না, ব্যাপার কী কালিপদ?
কালিপদ চোখ তুলে তাকাল। চোখ নামিয়ে নিল না। তাকিয়েই রইল। এ রকম সে কখনো করে না। হেড মাস্টাব সাহেব অকারণেই খানিকটা অস্বস্তিবোধ করতে লাগলেন। প্রথম প্রশ্নটি দ্বিতীয়বার করলেন, গরু কিছু মুখে দিচ্ছে না, ব্যাপার কী কালিপদ? কালিপদ বলল, সেইটা গরুরে জিজ্ঞেস করেন।হেড মাস্টাব সাহেব হতভম্ব হয়ে গেলেন। হারামজাদার এত বড় সাহস! কী কথা বলছে? তারপরেও তাকিয়ে আছে। চোখ নামিয়ে নিচ্ছে না। জুতিয়ে হারামজাদার গাল ভেঙে দেওয়া দরকার।কী বললা কালিপদ? বললাম, গরু কেন খায় না সেইটা গরুরে জিজ্ঞাসা করেন। আমি গরুর ডাক্তার না।তোমার সাহস অনেক বেশি হয়ে গেছে। তুমি কী বলছ তুমি নিজেও জানো না।কালিপদ এইবার চোখ নামিয়ে নিয়ে ক্ষীণ গলায় বলল, আমার মাথার ঠিক নাই। নিরপরাধ একটা মানুষরে কোমরে দড়ি বাইন্দা নিয়া গেছে।
আমার মাথার ঠিক নাই। কি বলতে কি বলছি, মনে কিছু নিয়েন না।নিরপরাধ বলছি কেন? তুমি কি জানো না সে একটা মেয়ের সর্বনাশ করেছে? মেয়ের নাম সাবিহা।এইগুলা দুষ্ট লোকের মিথ্যা রটনা।তোমারে কে বলল মিথ্যা রটনা? আমি জানি মিথ্যা রটনা। আফনেও জানেন, আফনে জানেন না। এমন না। অখনও সময় আছে স্যার।কী বললা? বললাম অখনো সময় আছে। সময় শেষ হইলে আফসোস করবেন।কী বলছ তুমি? অতি সত্য কথা বলতেছি। অতি সত্য কথা।কালিপদ হাঁটা ধরল। বিস্মিত হেড মাস্টার বললেন, যাও কোথায় তুমি?
সাবিহা বেগমের কাছে যাই।কালিপদ চলে গেছে। হেড মাস্টার সাহেবের পা কাঁপছে। ঠকঠক করে কাঁপছে। অকারণে ভয়ে সমস্ত শরীর ঝিমঝিম করছে। এরকম কেন হচ্ছে তিনি বুঝতে পারছেন না। পিপাসায় বুক শুকিয়ে কাঠ। তিনি আস্তে আস্তে মাটিতে বসে পড়লেন। হড়হড় করে বমি হয়ে গেল। বমিতে লাল লাল কী দেখা যাচ্ছে। রক্ত না-কি? হেড মাস্টার সাহেব ক্ষীণ স্বরে বললেন–ইয়া মাবুদ। ইয়া মাবুদ।বাজারের একটা ঘরের সামনে কালিপদ দাঁড়িয়ে আছে। অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মিষ্টি চেহারার একটা মেয়ে এক সময় বাইরে এসে বলল, কারে চান গো? তোমারে চাই। তোমার নাম সাবিহা না?
হুঁ।তুমি মিথ্যা মামলা কেন করছ? কালিপদ তাকিয়ে আছে তীব্র দৃষ্টিতে। সাবিহা সেই দৃষ্টি থেকে চোখ ফিরিয়ে নিতে পারছে না। কালিপদ আবার বলল, কেন তুমি মিথ্যা মামলা করলা? ওসি সাহেব বলছেন।এখন ওসি সাহেবের কাছে আবার যাও। ওসি সাহেববে বলে–তুমি এইসবেব মধ্যে নাই।জি আচ্ছা।কখন যাইবা? এখনই যাব।যাও দিরং করবা না।জে-না। আমি দিরং করব না।সাবিহারও ঠিক হেড মাস্টার সাহেবের মতো হলো। গা হাত পা কাঁপছে। প্ৰচণ্ড বমি ভাব হচ্ছে। বুক ধড়ফড় করছে।
জালালুদ্দিন ওসি সাহেবের বাসায় উপস্থিত হয়েছেন। সমস্ত দিনের ভগাবহ ক্লান্তির পর ওসি সাহেব সবে ঘুমুতে গিয়েছেন। রাত বাজে নটা। এত সকাল সকাল তিনি ঘুমুতে যান না। আজ শরীরে কুলুচ্ছে না। এই সময় যন্ত্রণা। ওসি সাহেব বলে পাঠালেন, এখন দেখা হবে না।জালালুদ্দিন বললেন, এখনই দেখা হওয়া দরকার। ওসি সাহেবের নিজের স্বার্থেই দেখা হওয়া দরকার।ওসি সাহেব বের হয়ে এলেন। কঠিন গলায় বললেন, কী ব্যাপার? গম চুরি মামলাটা নিয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।আমার সঙ্গে কী কথা? হেড মাস্টার সাহেব স্বীকার করেছেন যে গম চুরির মামলাটা মিথ্যা মামলা।কী বললেন?
যা সত্য তাই বললাম। গম চুরি বিষয়ক সব দায়-দায়িত্ব উনি নিয়েছেন। কাজেই মবিনুর রহমান সাহেবকে ছেড়ে দিতে হয়।উনাকে অন্য কারণে গ্রেফতার করা হয়েছে। কারণটা আপনাকে বলেছি… । হ্যাঁ বলেছেন। সাবিহা নামের ঐ মেয়ে বলছে যে, আপনি তাকে দিয়ে মিথ্যা মামলা কবিয়েছেন।অনেকক্ষণ ওসি সাহেব কথা বলতে পারলেন না হচ্ছে কী এসব। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, সে বললে তো হবে না? হবে। সে বললেই হবে। নীলগঞ্জের সব মানুষ এসে ভেঙে পড়বে থানার সামনে। আপনার মহাবিপদ ওসি সাহেব।ভয় দেখাচ্ছেন না কি?
না, ভয় দেখাচ্ছি না। যা হতে যাচ্ছে সেটাই আপনাকে বলছি। মানুষ ক্ষেপে গেলে ভযঙ্কব হয়ে যায় ওসি সাহেব। ক্ষ্যাপা মানুষ বন্দুক মানে না।আপনি কি মবিনুব রহমান সাহেবকে ছাড়িয়ে নিতে এসেছেন? সেটা করা যায়… শুধু সেটা কবলে তো হবে না। আপনি যে অন্যায় করেছেন তার জন্যে সবার কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা কববেন। কানে ধরে দশবার উঠবোস করবেন।কী বললেন?
Read more
