পুফি পর্ব – ৬ হুমায়ূন আহমেদ

পুফি পর্ব – ৬

বরকতউল্লাহ বললেন, দেরি করবেন না। প্রথম অবস্থায় রোগ ধরা পড়লে দ্রুত চিকিৎসা করে কন্ট্রোল করা যায়। আমার ছোট বোন নাইমা ব্রেস্টট ক্যানসারে মারা গেল। শুরুতে ধরা পড়লে ব্রেস্ট ক্যানসার কোনো ব্যাপারই না। তিনটা ছোট ছোট বাচা নিয়ে তার স্বামী কী বিপদেই না পড়েছে।বরকতউল্লাহ উঠে দাঁড়ালেন। হাই তুলতে তুলতে বললেন, আচ্ছা যাই। কাজ করছিলেন, কাজের মধ্যে ডিসটর্ব করলাম।বরকতউল্লাহ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দরজা দিয়ে বের হয়ে গেলেন। বিড়ালটাও পিছু পিছু গেল। কেউই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল না।

তিনি ওয়েটিং রুমে বসে আছেন। তার সিরিয়াল এসেছে নয়। শায়লার এসিসটেন্ট করিম গলা নামিয়ে বলল, আপনার সিরিয়ালে ব্রেক করতে পারি। অন্যরা রাগ করবে। এইটাই সমস্যা।জোয়ার্দার বললেন, আমি অপেক্ষা করব।করিম বলল, একটা কাজ করি স্যার? সব রুগী বিদায় হবার পর আপনি যান। কথা বলার সময় বেশি পাবেন।আমি যে সিরিয়াল পেয়েছি সেই সিরিয়ালেই যাব।আজও মিষ্টি এনেছেন?

হুঁ।ম্যাডাম কিন্তু মিষ্টি খান না।তার মেয়েটা খাবে।ম্যাডাম শাদী করেন নাই। মেয়ে কোথায় পাবেন।উনার একটা পালক মেয়ে আছে সুপ্তি নাম। সুপ্তি খাবে।কি যে কথা বলেন। উনার পালক মেয়ে টেয়ে কিছু নাই। একজন বুয়া আছে।ও আচ্ছা।নয়। নম্বার তার ডাক পড়ল না। অন্য রুগীরা যেতে থাকল। করিম গলা নামিয়ে বলল, আপনি এসেছেন ম্যাডামকে বলেছি। উনি বলেছেন। আপনাকে সবার শেষে পাঠাতে।আচ্ছা ঠিক আছে।আমার কথাই ঠিক হয়েছে। তাই না। স্যার? হুঁ।চা-কফি কিছু খাবেন? না।

জোয়ার্দার আগ্রহ নিয়ে ওয়েটিং রুমের লোকজন দেখছেন। রুণী হিসেবে তিনি শুধু একা এসেছেন, অন্য সবার সঙ্গে দুতিনজন করে এসিসটেন্ট। ষোল সতেরো বছরের একটি তরুণী মেয়ে এসেছে মনে হচ্ছে সেই রুগী। দুহাতে মুখ ঢেকে রেখেছে। সে তাঙ্কাচ্ছে আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে। মধ্য বয়স্ক যে ভদ্ৰলোক মেয়েটাকে নিয়ে এসেছেন। তিনি কিছুক্ষণ পর পর মেয়েটার হাত নামিয়ে দিচ্ছেন তাতে লাভ হচ্ছে না। মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে দুহাতে মুখ ঢাকছে।জোয়ার্দারের ডাক পড়েছে। তিনি ঘরে ঢুকতেই শায়লা বলল, রসমালাই আনেন নি?

জোয়ার্দার বললেন, এনেছি। আপনার এসিসটেন্টের কাছে দিয়েছি।ভেরি গুড।আপনার ক্যামেরাটাও নিয়ে এসেছি।ছবি তুলেছেন? জ্বি।ছবি উঠেছে? জ্বি উঠেছে।শায়লা বিস্মিত হয়ে বললেন, দেখি ছবি? জোয়ার্দার ছবি দেখাচ্ছেন। শায়লা তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। আশ্চর্যের ব্যাপার, সত্যি এক ভদ্রলোকের ছবি।জোয়ার্দার বললেন, এটা বরকতউল্লাহ সাহেবের ছবি। উনি টিভি দেখছেন। উনার তিনটা ছবি তুলেছি। সব ছবি ডান দিক থেকে তুলতে হয়েছে। উনার মাথার বাঁ দিকে চুল কম। এই জন্যে।শায়লা নিঃশ্বাস ফেললেন কিছু বললেন না। ছবি থেকে চোখ সরালেন না।

জোয়ার্দার বললেন, এটা কুফির ছবি; আমার কাছে যে বিড়ালটা আসে। আর এটা আমার মেয়ের কোলে পুফি। আমার মেয়ের নাম অনিকা। আপনাকে তার নাম বলে ছিলাম।আমার মনে আছে। আপনি কি এই সব ছবি আর কাউকে দেখিয়েছেন? না।এই ছবি যে বরকতউল্লাহ সাহেবের এটা আমি বুঝাব কি ভাবে? জোয়ার্দার বললেন, উনাকে চেনেন এমন যে কাউকে দেখালেই হবে। খালেক চিনবে।খালেক কে? আমাদের অফিসে কাজ করেন। আমার জুনিয়র কলিগ।বরকত সাহেব কত দিন হল মারা গেছেন?

দুই সপ্তাহের বেশি হয়েছে।শায়লা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, বিরাট সমস্যা হয়ে গেল।জোয়ার্দার বললেন, কি সমস্যা? শায়লা বললেন, ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবি তোলা হয়েছে। দিন তারিখ সব ছবিতে আছে। দুই সপ্তাহ আগে যিনি মারা গেছেন সেই লোক আপনার বসার ঘরে বসে টিভি দেখতে পারে না।জোয়ার্দার বললেন, সেটা বুঝতে পারছি। বুঝতে পারছি বলেই আপনার কাছে এসেছি।শায়লা বললেন, আপনি বুঝতে পারছেন না। আপনার বুঝতে পারার কথা না।শায়লার ভুরু কুঁচকে আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি গভীর সমুদ্রে ।

জোয়ার্দার বললেন, আপনার এসিসটেন্ট করিম বলছিল। আপনার সুপ্তি নামের কোনো মেয়ে নেই।শায়লা বলল, এই প্রসঙ্গ আপাতত থাকুক আমি ছবিগুলি নিয়ে চিন্তা করছি। আপনার মেয়ের কোলে যে বিড়াল আর সোফায় শুয়ে থাকা বিড়ালতো একই বিড়াল।দেখতে এক রকম মনে হলেও এক বিড়াল না। আমার মেয়ের বিড়ালটার নাম পুফি। পুফি খুবই শান্ত। আর এই বিড়ালটার নাম কুফি। এটা ভয়ংকর বিড়াল।ভয়ংকর কোন অর্থে? কুফি প্রায় আমার শ্যালকা রঞ্জকে আক্রমন করে। রঙুকে কুফির কারণে হাসপাতালে পর্যন্ত যেতে হয়েছে।আমি আপনার শ্যালকের সঙ্গে কথা বলব। তার টেলিফোন নম্বর দেয়া যাবে না? এই নিন। কাগজ তার টেলিফোন নাম্বার ঠিকানা লিখে দিন।জোয়ার্দার ঠিকানা লিখতে লিখতে বললেন, কুফি তুহিন তুষারকেও এটাক করেছিল।ওরা কারা।

ওরা দুজন যমজ বোন। আমার বাসায় কাজ করতো। এখন অবশ্যি কাজ করে না।শায়লা বললেন, আমি এই দুই বোনের সঙ্গেও কথা বলব।দুই বোন রঞ্জুর বাসায় আছে। রঞ্জুর ঠিকানা লিখে দিয়েছি। আমি কি এখন চলে যাব? শায়লা জবাব দিলেন না, তিনি একবার ছবি দেখছেন একবার জোয়ার্দারের দিকে তাকাচ্ছেন।বাড়ির ছাদে শামিয়ানা টাঙিয়ে খালেক সাহেবের মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠান। কেক এসেছে হোটেল সোনারগা থেকে। গিফট রাখার জন্য একটা টেবিল সাজানো। টেবিলের পেছনে শুকনো মতো এক লোক খাতা-কলম নিয়ে বসে আছে। যে গিফট দিচ্ছে তার নাম ঠিকানা লিখে রাখছে।

জোয়ার্দার অস্বস্তিতে পড়েছেন। কারণ তিনি খালি হাতে এসেছেন। মেয়েটাকে পরে কিছু একটা কিনে দিতে হবে। মেয়ে কত বড় তাও জানেন না।জোয়ার্দার খালেক বললেন, আপনার মেয়ে কোথায়? খালেক গলা নিচু করে বলল, বিরাট বেইজত হয়েছি স্যার। মেয়ের মা ঘুষের টাকার উৎসব করবে না বলে মেয়েকে নিয়ে দুপুর বেলায় কোথায় যেন গেছে। মোবাইল বন্ধ করে রেখেছে বলে বুঝতেই পারছি না তারা কোথায়।জোয়ার্দার বললেন, এখন গেস্টদের কী বলবেন?

খালেক বলল, সুন্দর গল্প বানায়ে রেখেছি। গোস্টরা সবাই খুশি মনে খাওয়াদাওয়া করে বিদায় হবে। আপনাকে একটা কথা বলি স্যার, সুন্দর মিথ্যা কিন্তু সত্যের চেয়েও ভালো।ছাদের এক কোনায় জোয়ার্দার বসে আছেন। গোস্টরা আসতে শুরু করেছে। তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসছে। একজন ম্যাজিশিয়ান এসেছেন। ম্যাজিশিয়ানের সহকারী মেয়েটির পোশাক যথেষ্ট উগ্ৰ। জোয়ার্দারের মনে হলো, ঢাকা শহর অতিদ্রুত বদলাচ্ছে। অল্প কিছুদিন আগেও কোনো বাঙালি মেয়েকে এই পোশাকে ভাবা যেত না। খালেক হন্তদন্ত হয়ে আসছে।স্যার, এক্ষুনি ম্যাজিক শুরু হবে। স্টেজের কাছে চলে যান।আমি এখান থেকেই দেখব। ভালো কথা, আপনি কি বরকতউল্লাহ সাহেবের বোনকে চিনতেন?

অবশ্যই। উনি স্কুলশিক্ষিকা।কত দিন আগে মারা গেছেন? মারা যাননি তো। উনার নাম নাইমা। ইংরেজি একটা স্কুলে শিক্ষকতা করেন।ও আচ্ছা।স্যার, হঠাৎ উনার প্রসঙ্গ কেন? জোয়ার্দার জবাব দিলেন না। নড়েচড়ে বসলেন। ম্যাজিক শো শুরু হয়েছে। ম্যাজিশিয়ানের সহকারী মিস পপি একটা কাঠের খালি বাক্স সবাইকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখালো। ম্যাজিশিয়ান সেই খালি বাক্সের ভেতর থেকে ধবধবে সাদা রঙের একটা কবুতর বের করলেন। জোয়ার্দার অস্পষ্ট স্বরে বললেন, অদ্ভুত! তাঁর দৃষ্টি বারবার মিস পপির দিকে চলে যাচ্ছে। এ রকম কেন হবে? জোয়ার্দার চোখ বন্ধ করে ফেললেন। ম্যাজিক দেখা যাচ্ছে না, ম্যাজিশিয়ানের কথা শুনে ম্যাজিক কল্পনা করে নেওয়া। ব্যাপারটা যথেষ্টই আনন্দদায়ক।

আমার হাতে আছে কিছু রিং। ভালো করে দেখুন। রিংগুলো স্টিলের তৈরি। কোনো ফাঁকফোকর নেই। এখন দেখুন। কিভাবে একটা রিংয়ের ভেতর অন্যটা ঢুকে যাচ্ছে।জোয়ার্দার কল্পনায় দেখছেন। রিংগুলো শূন্যে ভাসছে। একটার ভেতর আরেকটা আপনা। আপনি ঢুকছে আবার বের হচ্ছে। ম্যাজিশিয়ানের চোখে কোনো বিস্ময় নেই। কিন্তু মিস পপি চোখ বড় বড় করে এই দৃশ্য দেখছে।জন্মদিনের অনুষ্ঠান শেষ করে জোয়ার্দারের বাসায় ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল। দরজা সুলতানা খুললেন, কিছুই বললেন না। এটা ম্যাজিকের মতোই বিস্ময়কর ঘটনা। স্বামী এত রাত করে ফিরলে বাঙালি সব স্ত্রীর প্রথম প্রশ্ন হবে, এত রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলে?

সুলতানা বললেন, রঞ্জুর কোনো খবর জানো? না তো। ওর কী হয়েছে? পুলিশ অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেছে।জোয়ার্দার বললেন, ও আচ্ছা। বাথরুমে কি টাওয়েল দেওয়া আছে? গোসল করব।সুলতানা বললেন, এত বড় একটা ঘটনায় তোমার কোনো রি-অ্যাকশন নেই? একবারও জানতে চাইলে না কেন অ্যারেস্ট করেছে? তুমি কি এই জগতে বাস করো? তুষার মারা গেছে। তার বোন পুলিশের কাছে উল্টাপাল্টা কি সব বলেছে।মারা গেছে কিভাবে? ক্লিনিকে অ্যাবরশন করা হয়েছিল, সেখানে মারা গেছে।ও আচ্ছা।সুলতানা বললেন, আবার ও আচ্ছা? জোয়ার্দার বললেন, এক কাপ চা বানিয়ে দাও। চা খেয়ে গোসল করব।থানায় যাবে না? থাকায় যাব কেন?

আমার ভাইকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। টর্চার করছে কি না কে জানে। আর তুমি বলছি চা খেয়ে গোসলে যাবে।আমি থানায় গিয়ে কী করব? র্যাব-পুলিশ এসব আমি খুব ভয় পাই। রঞ্জুর অনেক টাকা। সে টাকা খরচ করবে, পুলিশ তাকে ছেড়ে দেবে। টাকাওয়ালা মানুষের এ দেশে কোনো সমস্যা হয় না।সুলতানা বললেন, তুমি একজন অমানুষ। আমার জীবনটা তুমি নষ্ট করেছ। আমি একা থাকব, কিন্তু তোমার সঙ্গে থাকব না। দিস ইজ ফাইন্যাল।জোয়ার্দার বললেন, আচ্ছা। তিনি বাথরুমে ঢুকলেন। সুলতানা টেলিফোন করলেন। থানায়। ওসি সাহেব বিনয়ী গলায় বললেন, রঞ্জু সাহেব তো কিছুক্ষণ আগে চলে গেছেন। আমরা দু-একটা প্রশ্ন করার জন্য ডেকেছিলাম। প্রশ্ন করেছি, উনি জবাব দিয়েছেন। তার কথাবার্তায় আমরা সন্তুষ্ট। তুহিন নামের একটা মেয়ের কথায় কিছু ভুল বুঝাবুঝি হয়েছিল। এখন সব ঠিক আছে।

সুলতানা রঞ্জকে টেলিফোন করতে যাবেন তার আগেই রঞ্জু টেলিফোন করল। রঞ্জুর কাছে জানা গেল পুলিশকে সন্তুষ্ট করতে তার দুই লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে। এখন সব কিছু আন্ডার কনট্রোল।জোয়ার্দার বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে আছেন। তার সামনে ভীত মুখে অনিক দাঁড়িয়ে আছে। অনিকার কোলে বিড়াল নেই। নতুন রাক্ষুসী চেহারার কাজের মেয়েটি এক কাপ চা দিয়ে গেছে। চা খেতে ভাল হয়েছে।অনিকা বলল, বাবা তুমি ভালো আছ? জোয়ার্দার হ্যা সূচক মাথা নাড়লেন।অনিক গলা নিচু করে বলল, বাবা তুমি এই ফ্ল্যাটে কি কোনো মেয়েকে নিয়ে এসেছিলো? মেয়ের নাম শায়লা।জোয়ার্দার বললেন, না।আমি জানি। তোমার খুব ঝামেলা হচ্ছে তাই না বাবা?

হুঁ।অনিক বলল, বাবা তোমার কি কোনো বিড়াল আছে? রঞ্জু মামা বলছিল তোমার নাকি একটা গুণ্ডা বিড়াল আছে।জোয়ার্দার বললেন, আছে।দেখতে পুফির মতো বাবা? হুঁ।বিড়ালটার কোনো নাম আছে? আমি নাম দিয়েছি কুফি।অনিকা বলল, নামটা বেশি ভালো হয় নি।জোয়ার্দার বললেন, তুমি একটা নাম দিয়ে দাও।অনিকা বলল, আমি নাম দিলাম পুফি টু। আমারটার নাম পুফি ওয়ান তোমারটা পুফি টু। নাম পছন্দ হয়েছে বাবা?হুঁ।সুলতানা বারান্দায় এসে দাড় কঠিন গলায় বললেন, মেয়ের কানে কি মন্ত্র দিচ্ছ?

জোয়ার্দার জবাব দিলেন না। চিন্তিত মুখে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। অনিকা বলল, মা! তুমি শুধু শুধু বাবাকে বকা দিবে না। বাবাকে বকা দিলে পুফি টু এসে তোমাকে কামড় দিবে।কি বললি? বাঁদর মেয়ে কি বললি তুই।অনিকা কঠিন গলায় বলল, আমার সঙ্গে তুই তুই করে কথা বলবে না। আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলেও পুফি টু তোমাকে কামড়াবে। পুফি টু ভয়ংকর রাণী।রাত আটটা বাজে। মিসির আলি তার শোবার ঘরের খাটে হেলান দিয়ে বসে আছেন। যথেষ্ট গরম পড়েছে কিন্তু মিসির আলির গায়ে হলুদ চাদর। তার ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে। মিসির আলির হাতে স্টিফান কিং এর ভৌতিক উপন্যাস নাম skeletion crew. তিনি অনেকখানি পড়ে ফেলেছেন। কিন্তু ভয়ের জায়গাগুলি ধরতে পারছেন না।স্যার আসব?

মিসির আলি বই থেকে মুখ তুললেন। শ্যামলা চেহারার মধ্য বয়স্ক এক মহিলা দাঁড়িয়ে। মিসির আলি কিছু বললেন না।আপনার বাইরের দরজা। হাট করে খোলা। কলিংবেল নেই বলে কড়া নেড়েছি। তারপর সাহস করে ঢুকে পড়লাম।সাধারণত চাদরে পা ঢাকা থাকলে কেউ চাদর সরিয়ে পা বের করে সালাম করে না। এই মহিলা তাই করল।মিসির আলি বললেন, আমি কি তোমাকে চিনি? না স্যার।তুমি যে ভাবে পা ছুঁয়ে সালাম করলে তা থেকে মনে হয়ে ছিল আমার ছাত্রী। ছাত্র ছাত্রীরাই এ ভাবে আমাকে সালাম করে। সালামের মধ্যে ভক্তির চেয়ে ভয় ভাব প্ৰবল থাকে।আমার ছিল?

হ্যাঁ ছিল।স্যার আমার নাম শায়লা। আমি ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রিতে Ph.D করেছি। ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড। এক সময় আপনি এই ইউনিভার্সিটিতেই পড়াশোনা করেছেন।মিসির আলি বললেন, শুনে খুশি হলাম। আমার পি এইচ ডি ডিগ্রি নেই।সবার এই ডিগ্ৰী লাগে না। স্যার। আপনার লাগে না।মিসির আলি বললেন, শায়লা তোমার সিগারেট খেতে ইচ্ছা করছে। সিগারেট ধরাও আমার দিক থেকে কোনো সমস্যা নেই।তুমি টেবিলে রাখা সিগারেটের প্যাকেটের দিকে তৃষ্ণার্তের মত তাকাচ্ছ। একটু দ্রুত নিঃশ্বাস নিচ্ছ ইংরেজীতে একে বলে short breath. নিকোটিনে যারা অভ্যস্ত তাদের সিগারেট দেখলেই নিঃশ্বাস ঘন ঘন পড়তে থাকে।শায়লা বলল, আমার বিষয়ে আর কি বলতে পারেন?

মিসির আলি বললেন, তুমি লেফট হ্যান্ডার।শায়লা বলল, আমিতো এমন কিছু করি নি। যা থেকে বুঝা যাবে আমি লেফট হ্যান্ডার। আপনাকে সালাম করার সময়ও ডান হাতে সালাম করেছি।মিসির আলি বললেন, তোমার বা হাতের আঙ্গুলো নিকোটিনের দাগ আছে। লেফট হ্যান্ডাররা বঁ হাতে সিগারেট খায়। তুমি শুধু যে নিকোটিনে আসক্ত তা-না, তুমি এলকোহলিক।শায়লা হ্যান্ডব্যাগ খুলে সিগারেট বের করতে করতে বলল, আমি এলকোহলিক এটা ঠিকই ধরেছেন। কি ভাবে ধরেছেন জানতে চাচ্ছি না। জানা জরুরী না। আমি আপনার কাছ থেকে একটা বিষয় জানতে এসেছি।

আমার নিজের না, আমার পেশেন্টের বিষয়। পেশেন্টের নাম আবুল কাশেম জোয়ার্দার। এজি অফিসের বড় কর্মকর্তা। পোষ্টের নাম ডেপুটি একাউন্টেন্ট জেনারেল। তিনি একজন মৃত মানুষকে তার ঘরে ঘুরা ফেরা করতে দেখে। এটা কি সম্ভব? মিসির আলি বললেন, ভিজুয়েল হেলুসিনেশান অবশ্যই সম্ভব। অনেকেই মৃত মানুষকে দেখেছে তার সঙ্গে কথা বলেছে এমন বলে।আমার পেশেন্ট মৃত মানুষের তিনটা ছবি তুলেছেন। মানুষটার নাম বরকতউল্লাহ। ছবিতে মৃত বরকতউল্লাকে দেখা যাচ্ছে আগ্রহ নিয়ে টিভি দেখছে। স্যার এটা কি সম্ভব?

মিসির আলি বললেন, সম্ভব না। মানুষের ভ্ৰান্তি হয়। যন্ত্রের হয় না। মৃত মানুষের ছবি তোলা হয়েছে এমন গল্প শোনা যায় না। ট্ৰিক ফটোগ্রাফিতে কিছু ছবি তোলা হয়েছে। সবই লোক ঠকানো ছবি তাও প্রমাণিত হয়েছে। তোমার ছবিগুলি রেখে যাও দেখব।এখান দেখবেন না।এখন ছবি দেখতে ইচ্ছা করছে না।শায়লা বলল, পাঁচটা ছবি খামে ভর্তি করে রেখে যাচ্ছি।মিসির আলি বললেন, তুমি না বললে তিনটা ছবি।শায়লা বলল, বরকতউল্লাহ সাহেবের তিনটা ছবি। দুটা আছে বিড়ালের ছবি।মৃত বিড়াল জীবিত হয়ে ঘুরছে তার ছবি।

শায়লা বলল, বিড়ালের কিছু রহস্য আছে। পরে বলব।ঠিক আছে। পরে বললেও হবে।শায়লা বলল, এই ভদ্রলোকের সমস্যা সমাধান আমার নিজের জন্যে খুব জরুরী। তিনি আমাকে বিরাট ধাঁধার মধ্যে ফেলেছেন। ঐ ভদ্রলোককে নিয়ে আমার খুবই ব্যক্তিগত একটা ঘটনা আছে; ঘটনাটা বলব? মিসির আলি বললেন, আরেক দিন শুনব।স্যার! আমি কি আজ চলে যাব? মিসির আলি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লেন।স্যার আমি কি আরো কিছু সময় থাকতে পারি। কোনো কথা বলব না। চুপচাপ বসে থাকব।বসে থাকতে চাচ্ছে কেন?

কোন কারণ নেই স্যার।কারণ অবশ্যই আছে। মানুষ কারণ ছাড়া কোনো কাজই করে না। তুমি কেন বসে থাকতে চাচ্ছ তা আমি জানি।শায়লা বলল, আপনি জানলে বলুন আমি শুনি। আমার নিজের জানা নেই।মিসির আলি বললেন, তুমি আরো কিছুক্ষণ বসে থাকতে চাচ্ছ কারণ তুমি আশা করছি তুমি বসে থাকতে থাকতেই আজ ছবি দেখব।শায়লা বলল, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আপনি ছবিগুলি এখন দেখছেন না, পরে দেখবেন। এর পেছনেও নিশ্চয়ই কারণ আছে। কারণটা বলুন আমি চলে যাচ্ছি।

মিসির আলি বললেন, আমি তোমার উপর বিরক্ত বলেই এখন ছবি দেখতে ইচ্ছা করছে না। ডক্টর অব ফিলসফি হয়ে বসে আছ আর বিশ্বাস করছ মৃত মানুষের ছবি তোলা হয়েছে। ছবিতে মৃত মানুষ টিভি দেখছে। হোয়াট এ ননসেন্স।শায়লা উঠে দাড়াল এবং লজ্জিত গলায় বলল, স্যার আমি সরি।জোয়ার্দার মেয়ের সঙ্গে রাতের খাবার খেতে বসেছেন। সুলতানা বসেন নি। কিছুদিন ধরে তিনি স্বামীর সঙ্গে খেতে বসছেন না। অনিক বলল, আমি একটা ধাধা জিজ্ঞেস করছি জবাব দিতে পারবে? জোয়ার্দার বললেন, না।চেষ্টা করে দেখা। চেষ্টা না করেই বলছি, পারব না।জোয়ার্দার বললেন, আমি চেষ্টা করলেও পারব না।

অনিক বলল, নাই তাই খাচ্ছে থাকলে কোথায় পেতে , কহেন কবি কালিদাস পথে যেতে যেতে।জোয়ার্দার বললেন, পারব না মা।কথাবার্তার এই পর্যায়ে খাবার টেবিলের পাশে সুলতানা এসে দাঁড়ালেন। অনিকা বলল, এই ধাঁধাঁটার উত্তর তুমি দিতে পারবে?

 

Read more

পুফি পর্ব – ৭ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *