সুলতানা বললেন, তোমার খাওয়া শেষ হয়েছে তারপরেও বসে আছ কেন? উঠে হাত মুখ ধোও, নিজের ঘরে যাও। কাল ছুটি আছে এক ঘণ্টা টিভি দেখতে পারবে।অনিকা উঠে গেল। সুলতানা অনিকার চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, তোমাকে কিছু প্রশ্ন করব আশা করি সত্যি উত্তর দেবে।জোয়ার্দার বললেন, আমি তো কখনো মিথ্যা বলি না। সুলতানা বললেন, শুরুইতো করলে মিথ্যা দিয়ে। এমন কেউ নেই যে মিথ্যা বলে না।জোয়ার্দার হতাশ গলায় বললেন, কি জিজ্ঞেস করবে জিজ্ঞেস কর।সুলতানা বললেন, মিথ্যা বলে পার পাবে না। আমার কাছে সব তথ্য প্রমাণ আছে। রঞ্জু লোক লাগিয়ে রেখেছিল। সে বের করেছে। ঐ মেয়েটার সঙ্গে যে তোমার বিয়ে হয়েছিল তা আমি জানি।কোন মেয়েটা?
ন্যাকা সাজবে না। খবরদার ন্যাকা সাজবে না। শায়লা মাগির কথা বলছি।এখন বুঝতে পারছি। গালাগালি করছ কেন? এটা ঠিক না।তুমি যদি তার সাথে লটরপটির করতে পার আমি গালাগালি করতে পারি।সুলতানা হাতে মোবাইল নিয়ে বসেছিলেন। মোবাইল বাজছে। তিনি মোবাইল হাতে উঠে গেলেন। যাবের আগে বলে গেলেন, হাত মুখ ধুয়ে বসার ঘরে বসে থাক। আমি আসছি।টেলিফোন করেছে রঞ্জ। তার গলার স্বরে রাজ্যের ভয়! কথাও ঠিক মত বলতে পারছে না।বুবু! একটু আসতে পারবে? আজকে মারাই যাচ্ছিলাম। চোখ গেলে ফেলতে চেয়েছিল। অনেক কষ্টে চোখ বাঁচিয়েছি।কে চোখ গেলে ফেলতে চেয়েছিল?
দুলাভাই এর বিড়াল টা।তোর দুলাভাই এর আবার কিসের বিড়াল।রঞ্জু বলল, যে বিড়ালটা আমাকে কামড়ায় সেটা দুলাভাই এর বিড়াল।তুই এখন কোথায়? স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। বুবু গাড়ি পাঠিয়েছি তুমি আসি। তোমার পায়ে পড়ি দুলাভাইকে সঙ্গে আনবে না।জোয়ার্দার অনেকক্ষণ হল বসার ঘরে বসে আছেন। সুলতানা আসছে। না। এগারোটা বেজে গেছে এখন ঘুমুতে যাওয়া উচিত। তবে কাল ছুটির দিন কাজেই আজ একটু দেরীতে ঘুমুতে গেলেও ক্ষতি হবে না।
টিভি দেখতে দেখতে জোয়ার্দার ঘুমিয়ে পড়লেন।রঞ্জু কেবিনে শুয়ে কাতড়াচ্ছে। বিড়াল তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কামড়েছে। সেলাই লেগেছে নয়টা। ডাক্তার তাকে সিডেটিভ ইনজেকশান দিয়েছেন।সুলতানা হাসপাতালে পৌছে দেখেন রঞ্জু ঘুমাচ্ছে। ঘুমের মধ্যেই কেঁপে কেঁপে উঠছে। হাত দিয়ে অদৃশ্য কিছু তাড়াবার চেষ্টা করছে।টেলিফোনে ক্রমাগত ক্লিং হচ্ছে। জোয়ার্দারের ঘুম ভাঙ্গল রিং এর শব্দে।হ্যালো কে?
আমি শায়ালা।ও আচ্ছা।জোয়ার্দার টিভির উপর রাখা ঘড়ির দিকে তাকালেন। রাত একটা দশ।এতবার টেলিফোন করলাম টেলিফোন ধরছে না। প্রথমে তোমার মোবাইলে করেছি না পেয়ে শেষে ল্যান্ডফোনে।জোয়ার্দার বললেন, আপনি কি প্রচুর এলকোহল খেয়েছেন।শায়লা বলল, হ্যাঁ খেয়েছি। আমি পুরোপুরি ড্রাঙ্ক। সোজা বাংলায় মাতাল। মাতাল বলেই তুমি তুমি করছি।শায়ালা কোনো সমস্যা?
হ্যাঁ সমস্যা। তোমার কারণে একজন আজ আমাকে চূড়ান্ত অপমান করেছে।কে অপমান করেছে? সুলতানা? না। মিসির আলি সাহেব। আপনার তোলা বরকতউল্লার ছবি নিয়ে গিয়েছিলাম। ছবিগুলি দেখতে বললাম। উনি দেখলেন না। বরং এমন কথা বললেন যেন আমি একজন মানসিক রুগী।মিসির আলি সাহেব কে? আছেন। একজন আপনি না চিনলেও চলবে।শায়লা কাঁদছ কেন? মাতাল হয়েছি। এই জন্যে কাঁদছি। আপনিতো মাতাল হননি। আপনি কেন আমাকে তুমি তুমি করছেন?
সরি।আপনি আর কখনো আমার অফিসে আসবেন না।আচ্ছা আর যাব না।শায়লা টেলিফোন রেখে দিল।রান্নাঘরে চায়ের কাপে চামচ নাড়ার শব্দ হচ্ছে। বসার ঘরে অস্বস্থি নিয়ে বসে আছে শায়লা। সে ছবিগুলি নিতে এসেছে। তার ধারণা মিসির আলি ছবি দেখেন নি। এক সপ্তাহ পার হয়েছে এখনো ছবি না দেখা হয়ে থাকলে আর দেখা হবে না।রান্নাঘর থেকে মিসির আলি বললেন, শায়লা তুমি চায়ে ক চামচ চিনি খাও।দু চামচ।মিসির আলি বললেন, ঘরে টেস্ট বিসকিট আছে। চায়ের সঙ্গে খাবে? না স্যার।
মিসির আলি ট্রেতে দুকাপ চা এবং পিরিচে। কয়েকটা টেস্ট বিসকিট নিয়ে ঢুকলেন। শায়লার সামনে ট্রে রাখতে রাখতে বললেন, একটা টেস্ট বিসকিট খেয়ে দেখো ভাল লাগবে। টেস্ট বিসকিটের গায়ে পনির দেয়া আছে। পনিরের উপর এক ফোঁটা রসুনের রস। গাৰ্লিক টোস্ট উইথ চিজ। রান্নার বই এ পেয়েছি।আপনি রান্নার বই পড়েন?
কেন পড়ব না? আমি রাঁধতে পারি না। কিন্তু রান্নার বই পড়তে ভালবাসি। তুমি কি জান সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া পার্ল এস বাকের চায়নীজ রান্নার উপর একটা বই আছে; আমি অনেক খোজ করছি কিন্তু বইটা পাচ্ছি না।আপনার গার্লিক টোস্ট উইথ চীজ খুব ভাল হয়েছে।মিসির আলি চায়ে চুমুক দিলেন। তিনি কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছেন।শায়লা বাড়তি কৌতূহলের কারণ ধরতে পারছে না।স্যার আপনি কি ছবিগুলি দেখার সময় পেয়েছিলেন?
মিসির আলি বললেন, তুমি যে দিন ছবিগুলি দিয়ে গেলে তার পর দিন ভোরবেলায় দেখেছি। এজি অফিসের সঙ্গে দুপুরবেলা যোগাযোগ করেছি। সেখান থেকে জানলাম বরকতউল্লাহ সাহেব জীবিত! প্রমোশন পেয়ে তিনি ডিএজি হয়েছেন।শায়লা চায়ে চুমুক দিয়েছিল, মিসির আলির কথায় বিষম খেল। নিজেকে সামলে নিয়ে বিড়বিড় করে বলল, Oh God.তোমার নিজের কি ধারণা জোয়ার্দার সাহেব কেন একজন জীবিত মানুষকে মৃত ঘোষণা করলেন?স্যার আমার ধারণা তিনি আমার সঙ্গে দেখা করার অজুহাত হিসেবে এইসব গল্প করেন। উনার সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। কথাবার্তা অনেকদূর এগোনোর পর বিয়ে ভেঙে যায়। আমার প্রতি উনার আলাদা দুর্বলতা একটা কারণ হতে পারে।তোমার কি ঐ ভদ্রলোকের প্রতি কোনো দুর্বলতা আছে?
না।বিয়ে করেছ? জ্বি-না।বাড়িতে একা থাক? জ্বি। আমি আর একটা কাজের মেয়ে।জোয়ার্দার কি জানে তুমি নিঃসঙ্গ জীবন যাপন কর? জানেন না। আমি তাকে বলেছি যে একটি মেয়েকে আমি পালক নিয়েছি। ওর সঙ্গে দুষ্টামী করে আমার সময় কাটে।মিথ্যা কথা কেন বলেছ? যাতে সে কোনো রং সিগনাল না পায়; ভেবে না বসে তার সঙ্গে বিয়ে না হওয়ায় আমি মেয়ে দেবদাস হয়ে গেছি।মিসির আলি বললেন, তাইতো হয়েছ। তুমি যখন হাইলি ইনটকসিকেটেড অবস্থায় থাক তখন কি জোয়ার্দারের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ কর? দুবার করেছি।
জোয়ার্দারের তোমার প্রতি কি মনোভাব তা আমি জানি না। তবে তুমি যে মহিলা দেবদাস তা আমি যেমন জানি তুমিও জান। রোগীর সমস্যা নিয়ে ছুটে এসেছ আমার কাছে।শায়লা উঠে দাঁড়াল। আহত গলায় বলল, স্যার আমি যাব। চেম্বারের সময় হয়ে গেছে। ছবিগুলি দিন।মিসির আলি বললেন, বসো। ছবি নিয়ে তোমার সঙ্গে জরুরী কথা আছে। ছবিগুলি অত্যন্ত বিস্ময়কার!বিস্ময়কর কোন অর্থে? মিসির আলি বললেন, সব অর্থেই। তুমি বস আমি বলছি।তিনি পড়ার টেবিলে ড্রয়ারে রাখা ছবিগুলি নিয়ে এলেন। অনিকার কোলের বিড়াল এবং আলাদা বিড়ালের ছবি শায়লার সামনে রাখতে রাখতে বললেন, বিড়াল দুটার মধ্যে তুমি কি কোনো পার্থক্য দেখছ?
শায়লা বলল, জ্বি না। দুটা একই বিড়াল।মিসির আলি বললেন, একই বিড়াল না। একটার ডান চোখের উপর সাদা স্পট, অন্যটার বাঁ চোখের উপর শাদা স্পট। বিড়াল দুটার একে অন্যের মিরর ইমেজ। বাচ্চা মেয়েটার কোলের বিড়াল আয়নার সামনে যে বিড়াল দেখা যাবে অন্যটা সেই বিড়াল।শায়লা বলল, ঠিক বলেছেন। আমার চোখে কেন পড়ল না? তুমি ভাল করে তাকাওনি এই জন্যে চোখে পড়ে নি। এখন বরকতউল্লাহ সাহেবের একটা ছবি দেখাচ্ছি। এই দেখ। ছবিটিতে অতি অদ্ভুত একটা বিষয় আছে। এটা বের কর।শায়লা বলল, স্যার আমি অদ্ভুত কিছু দেখতে পাচ্ছি না।
মিসির আলি বললেন, বরকতউল্লা সাহেবের তিনটি ছবি আমাকে দিয়ে গেছ। এই একটাতে বরকতউল্লা সাহেবের পেছনের দেয়াল খানিকটা ছবিতে এসেছে। দেয়ালে ক্যালেন্ডার ঝুলছে। ক্যালেন্ডারের একটা কোনা ছবিতে এসেছে। ক্যালেন্ডারের কোনার দুটা তারিখই এসেছে উল্টা। এর অর্থ বরকতউল্লাহ সাহেবের মিরর ইমেজ আছে। এই ছবিতে।শায়লা বিস্মিত গলায় বলল, এর মানে কি? মিসির আলি বললেন, আমিও তোমার মতই ভাবছি, এর মানে কি?
শায়লা বলল, আমাকে দুদিন সময় দিন আমি ঘটনা বের করে ফেলব।মিসির আলি বললেন, গুড লাক।তার গলার স্বরে তেমন ভরসা নেই।শায়লা এজি অফিসে। দুপুর একটা লাঞ্চ বিরতি। শায়লা খোজ নিয়ে জানল, জোয়ার্দার আজ অফিসে আসেন নি। সিক লিভ নিয়েছেন। বরকতউল্লাহ অফিসে আছেন।সরকারি অফিসে টিলাঢালা ভাব থাকে। হুট হাট করে যে কোনো ঘরে যে কেউ ঢুকে যেতে পারে।বরকতউল্লার ঘরের সামনে টুল পেতে বেয়ারা বসে আছে। তাকে পাশ কাটিয়ে শায়লা ঢুকে পড়ল। বেয়ারা কিছু বলল না, উদাস চোখে তাকিয়ে রইল।
বরকতউল্লার সামনে হটপটে দুপুরের খাবার। তিনি এখনো খাওয়া শুরু করেন নি। শায়লা বলল, আমি অসময়ে চলে এসেছি। তার জন্যে লজ্জিত। আমি আপনার এক মিনিট সময় নেব।বলুন কি ব্যাপার।শায়লা ব্যাগ থেকে তিনটা ছবি বের করে বরকতউল্লার সামনে রাখতে রাখতে বলল, এই ছবিগুলি নিশ্চয়ই আপনার।হ্যাঁ।ছবিগুলি কে তুলেছে? বরকতউল্লাহ একটা ছবি হাতে নিয়ে বলল, কে তুলেছে বলতে পারছি না।কোথায় তোলা হয়েছে তা বলতে পারবেন? না।আপনি কি আপনার অফিসের কলিগ জোয়ার্দার সাহেবের বাসায় কখনো গিয়েছিলেন?
না তো।আপনার কাছ থেকে এক মিনিট সময় নিয়েছিলাম। এক মিনিটের বেশি হয়ে গেছে। এখন আমি যাই?বরকতউল্লাহ বললেন, আপনি বসুন। আপনার পরিচয় দিন। হুট করে এসে কয়েকটা ছবি দেখিয়ে চলে যাবেন তাতো হবে না। ছবিগুলি কে তুলেছে? শায়লা বলল, আমি একজন ডাক্তার। ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রি হল আমার বিষয়। আমার একজন পেশেন্ট আমাকে এই ছবিগুলি দিয়েছেন। আমি বিষয়টা অনুসন্ধান করছি।আপনার কথাতো আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।আমি নিজেও এখন কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি যাই।শায়লা ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বের হল। তার পেছনে পেছনে বরকতউল্লাহ বের হলেন।
বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইলেন।এজি অফিস থেকে জোয়ার্দারের বাসার ঠিকানা শায়লা নিয়েছে। ভর দুপুরে জোয়ার্দারের বাসায় উপস্থিত হওয়া কোন কাজের কথা না। শায়লা তাই করল।অনেকক্ষণ বেল টেপার পর জোয়ার্দার নিজেই দরজা খুললেন, অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন শায়ালার দিকে।শায়লা বলল, আপনি কি আমাকে চিনেছেন? জোয়ার্দার বললেন, চিনব না কেন? তুমি আগের মতই আছ। শরীর সামান্য ভারি হয়েছে। আমার ঠিকানা কোথায় পেয়েছ।আপনার অফিস থেকে ঠিকানা নিয়েছি।আমি যে এজি অফিসে কাজ করি সেটা জান কি ভাবে?
শায়লা বলল, আমার শরীর খারাপ লাগছে, মাথা ঘুরছে। আমি কি আপনার বসার ঘরে কিছুক্ষণ বসতে পারি।অবশ্যই পার। এসো।আপনার স্ত্রী কিছু মনে করবেন নাতো? জোয়ার্দার বললেন, শায়লা আমিতো বিয়েই করি নি। স্ত্রী আসবে কেত্থেকে? শায়লা বিড়বিড় করে বলল, ও আচ্ছা আচ্ছা। আমি এক গ্রাস পানি খাব।তুমি বস। আমি পানি আনছি। তোমাকে এ রকম বিধ্বস্ত লাগছে কেন? দুপুরে খেয়েছ?
না।আমার সঙ্গে দুপুরে খেতে কোনো সমস্যা আছে? না।শায়লা বলল, আপনার মেয়ে অনিকা কোথায়? জোয়ার্দার অবাক হয়ে বললেন, তোমাকে একটু আগে বলেছি। আমি বিয়ে করি নি। এখন হঠাৎ মেয়ে প্রসঙ্গ তুললে কেন? আমি একা বাস করি। একাও ঠিক না। আমার একটা পোষা বিড়াল আছে।শায়লা বলল, বিড়ালের নাম কি পুফি? হ্যাঁ পুফি! বিড়ালের নাম জানলে কি ভাবে।শায়লা জবাব দিল না। চোখ মুখ শক্ত করে বসে রইল। জোয়ার্দার বললেন, কোনো সমস্যা? শায়লা বলল, হ্যাঁ সমস্যা বিরাট সমস্যা। আমার মাথা দপ দপ করছে। মাথায় পানি ঢালতে হবে। আপনার বাথরুমটা কি ব্যবহার করতে পারি।অবশ্যই পার। এসে বাথরুম দেখিয়ে দিচ্ছি।
ড. শায়লার ডায়েরি।ডায়েরি ইংরেজীতে লেখা। এখানে বাংলা ভাষ্য দেয়া হল। শুরুর দুটি fir, I am lost. I am totaly lost. আমি তলিয়ে গেছি। পুরোপুরি তলিয়ে গেছি। আমার ব্রেইনের নিউরো ট্রান্সমিটার সিগন্যাল পাঠানোয় ভুল করছে কিংবা তথ্য গুছাতে পারছে না। সব এলোমেলো করে দিচ্ছে।শারিরীক ভাবেও আমি ভেঙে পড়েছি। শরীরে প্রচুর এলকোহল নেবার পরও আমার ঘুম আসছে না। আমার ক্ষুধা কমে গেছে। তবে তৃষ্ণ বেড়েছে। কিছুক্ষণ পরপরই মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে। তখন পানি খাচ্ছি তাতেও শুকনা ভাব দূর হচ্ছে না। এই সঙ্গে শুরু হয়েছে ভার্টিগো সমস্যা। সারাক্ষণ মনে হয়। চারপাশের সব কিছু ঘুরছে। চোখ বন্ধ করে রাখলেও এই ঘুর্ণন বন্ধ হয় না।
আমার জীবনের ঘটনা প্রবাহ ভালমত লিখে যাওয়া অত্যন্ত জরুরী। কারণ আমার জীবনের ঘটনাবলি ব্যাখ্যার দাবি রাখে। আমি নিজে ব্যাখ্যা করতে পারলে ভাল হত, তা পারছি না। বিশেষ বিশেষ সময়ে হাতীর পা কাদামাটিতে আটকে পড়ে মিসির আলি স্যারের পা এখন কাদাবন্দি। তিনি অবশ্যি পা টেনে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমি হাল ছেড়ে দিয়েছি।হাল ছেড়ে দেয়া ছাড়া আমি কি আর করতে পারি।
আমি দুজন জোয়ার্দারকে দেখলাম। এদের চেহারা এক, নাম এক, এমন কি টেলিফোন নাম্বার এক কিন্তু এই দুজন সম্পূর্ণ আলাদা। একজন বিয়ে করেছেন তার একটি মেয়ে আছে। মেয়েটির একটি পোষা বিড়াল আছে। বিড়ালটার নাম পুফি।অন্যজন চিরকুমার। তবে তারও একটি বিড়াল আছে। বিড়ালটার নামও কুফি।বরকতউল্লাহ নামের একজনকে আমি দেখলাম তারও মনে হয় দুটি সত্তা। এক জায়গায় তিনি মৃত অন্য জায়গায় তিনি জীবিত।এই উদ্ভট হাস্যকর ব্যাপার কল্পকাহিনীর জন্যে ঠিক আছে। আমার জন্যে ঠিক নেই। আমি কল্পকাহিনীর কোনো চরিত্র না।মিসির আলি স্যারুকে জিজ্ঞেস করলাম, স্যার আমি কি পাগল হয়ে গেছি?
স্যার বললেন, এখনো হও নি। তবে সম্ভাবনা আছে।সম্ভাবনা যে আছে তা আমার মত কেউ জানে না। জোয়ার্দারের সঙ্গে আমার বিয়ের পাকা কথা হয়েছিল তারপর কুৎসিত অজুহাতে বিয়ে ভেঙ্গে যায়। তখন একবার আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। লোক লজ্জার ভয়ে দেশে আমার কোনো চিকিৎসা করা হয় নি। আমাকে ইন্ডিয়ার রাঁচিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।কাজেই পাগলামীর বীজ আমার মধ্যে আছে। এটা সুপ্ত অবস্থায় থাকে, কখনো কখনো জাগে।আমি আমার ব্রেইনের সিটি স্কেন করিয়েছি। মস্তিষ্কের কিছু জায়গায় অতিরিক্ত কর্ম ব্যস্ততা (super activity) দেখা গেছে। মৃগীরোগীদের মধ্যে এ রকম দেখা যায়। আমার কি বিশেষ কোনো ধরনের মৃগী রোগ হয়েছে? যখন রোগের আক্রমন হয় তখন আমি অন্য জোয়ার্দারকে দেখতে পাই?
আমি মাঝে মাঝেই এজি অফিসে যাই। কখনো সেখানে দেখি বরকতউল্লাহ সাহেব বেঁচে আছেন কখনো দেখি বরকতউল্লাহ সাহেব বেঁচে নাই। দুটি সম্পূৰ্ণ আলাদা এজি অফিস।মিসির আলি স্যার বললেন, তুমি যে এজি অফিসে বরকতউল্লাহ জীবিত সেখান থেকে একটা খবরে কাগজ আনবে এবং যেখানে বরকতউল্লাহ সাহেব মৃত সেখান থেকে একটা খবরের কাগজ আনবে।আমি তা করেছি। দেখা গেছে একটা খবরের কাগজ মিরর ইমেজ। পুরোটা উল্টা করে লেখা। আয়নার সামনে ধরলেই শুধু পড়া যায়।এর মানে কি? আমি মিসির আলি স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম, একজন মানুষের পক্ষে কি একই সময় দুটি ভিন্ন সত্তায় যাওয়া যায়?
স্যার বললেন যাওয়া যায়। মনে কর তুমি স্বপ্ন দেখছি। স্বপ্নে তুমি জেগে৷ তোমার মার সঙ্গে গল্প করছি। এখন তোমার দুটি সত্তা হয়ে গেল। একটিতে তুমি ঘুমোচ্ছ একটিতে তুমি জেগে আছ।আমি বললাম, একজন জোয়ার্দার সত্যি আছেন, আরেকজনকে আমি স্বপ্নে দেখছি এ রকম কি হতে পারে? স্যার বললেন, হতে পারে। চিরকুমার জোয়ার্দার হয়তো তোমার ব্রেনের সৃষ্টি। তার প্রতি তীব্র আবেগের কারণে ব্রেইন এই খেলাটা খেলাচ্ছে তবে কিন্তু আছে।কি কিন্তু?
মিরর ইমেজগুলি কিন্তু। তুমি খবরের কাগজের মিরর ইমেজ এনেছ এর অর্থ তুমি স্বপ্নের জগৎ থেকে একটা কাগজ নিয়ে এসেছি। এটা কোনো ক্রমেই সম্ভব না। প্রকৃতি এ ধরনের কিছু ঘটতে দেবে না।আমি বললাম, স্যার আমি কি এই বিষয়টা জোয়ার্দারের সঙ্গে আলাপ করব? স্যার বললেন, করতে পাের। দুই জোয়ার্দারের সঙ্গেই আলাপ করবে। কে কি ভাবে নিচ্ছে তা দেখবে। তোমার সমস্যা সমাধানের জন্যে এদেয়। দুজনেরই সাহায্য লাগবে।এর মধ্যে চিরকুমার জোয়ার্দার এক রাতে তার সঙ্গে খেতে বলল। সে নিজেই রাধবে। একা থাকার কারণে তার রান্নার হাত না-কি খুলেছে। সন্ধ্যা মিলাবার পর পর তার বাসায় গেলাম। বেল টিপতেই বাচা একটা মেয়ে দরজা খুলল। তার হাতে বিড়াল।আমি বললাম, তোমার নাম অনিক?
অনিকা বলল, হ্যাঁ। আর এর নাম পুফি।তোমার বাবা বাসায় নেই? না। মাকে নিয়ে নিউমার্কেট কাচা বাজারে গেছেন। আমাদের চাল শেষ হয়ে গেছে। এই জন্যে। আমরা মিনিকেট চাল খাই। আপনি মিনিকেট চাল চেনেন? না।মিনিকেট চাল কি ভাবে বানানো হয় তা জানেন? না।মোটা চালকে মেশিনে কেটে চিকন বানানো হয়। একে বলে মিনিকাট। মিনিকাট থেকে এসেছে মিনিকেট।বাহ্ তুমিতো অনেক কিছু জান।কুকুর এবং বিড়ালের মধ্যে তফাৎ জানেন?
কিছুটা জানি। তুমি কি জান বল শুনি।কুকুরকে যখন খাবার দেয়া হয় তখন কুকুর ভাবে মানুষ আমাদের দেবতা। এই জন্যে মানুষ আমাদের খাওয়াচ্ছে। আর বিড়ালকে যখন খাবার দেয়া হয় তখন বিড়াল ভাবে আমরা মানুষের দেবতা এই জন্যে মানুষ আমাদের যত্ন করছে! সুন্দরতো। কার কাছে শুনেছ? আমাদের মিসের কাছ থেকে। মিসের নাম শিরিন। আমরা তাকে ডাকি বি শিরিন।বি শিরিন কেন? উনি বাঁটকুতো এই জন্যে বি শিরিন। বাঁটকু শিরিন থেকে বি শিরিন।মেয়েটার সঙ্গে কথা বলে আমার হৃদয় হাহাকারে পূর্ণ হল। এই চমৎকার মেয়েটাতো আমারো হতে পারত।অনিকা বলল, আপনি কি বাবার জন্যে অপেক্ষা করবেন?
আমি বললাম, না। তোমার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করে চলে যাব।চা খাবেন? আমি চা বানাতে পারি। বসার ঘরে বসুন, আমি চা বানিয়ে আনছি।মেয়েটির বসার ঘরে বসলাম। এই ঘর আমি ছবিতে দেখেছি। দেয়ালে ক্যালেন্ডার ঝুলছে।মোবাইল ফোনের ক্যামেরা অপসান দিয়ে ক্যালেন্ডারের ছবি তুললাম। ক্যালেন্ডারের লেখা ছবিতে উল্টা এল। মিরর ইমেজ। কি হচ্ছে এসব? বাসায় ফিরে হুইস্কির বোতল খুলে বসলাম। পেগের পরে পেগ খাচ্ছি, নেশা হচ্ছে না।রাত একটার দিকে আমার কাছে টেলিফোন এল। জোয়ার্দার টেলিফোন করেছে। সে বলল, আমি তোমার জন্যে রান্না করেছি। তুমি আসিনি কেন? কোন সমস্যা?
সমস্যাতো বটেই। এই সমস্যা আমি নিতে পারছি না। আমি কি করব তাও বুঝতে পারছি না। Is there any one who can help. God of God! Help me please. মিসির আলি আতংকিত গলায় বললেন, তোমার একি অবস্থা! কি সর্বনাশ! শায়লাকে চেনা যাচ্ছে না। তার ওজন কমেছে আঠারো পাউণ্ড। গালের হাড় বের হয়ে গেছে। চোখ গর্তে ঢুকে গেছে। চোখের চারদিকে কালি। শায়লা কাদো কাদো গলায় বলল, স্যার আমি কিছু খেতে পারছি না। রাতে ঘুমাতে পারছি না। আমার ভার্টিগো হয়েছে। চারদিকে সব কিছু ঘুরছে।
Read more
