হতভম্ব সম্রাট রুমী খাঁ-কে দুর্গ দখলের নির্দেশ দিলেন । রুমী খাঁ কামান দাগতে শুরু করলেন । এর উত্তরে কুতুব খাঁ’র দুর্গের ভেতর থেকে কামানের গোলা বৃষ্টির মতো পড়তে শুরু করল । কুতুব খাঁ’র কামানগুলি ছোট তবে তাদের নিশানা অব্যর্থ্ । রুমী খাঁ-কে পেছনে হটতে হলো ।
মোঘল সৈন্যরা দুর্গ অবরোধ করে পাঁচ মাস বসে রইল । দুর্গ দখল করতে পারল না । এর মধ্যে শুরু হলো বঙ্গের বিখ্যাত বৃষ্টি ।
সম্রাট হুমায়ূন দোতলা তাঁবুর (ডুরসানা মঞ্জেল) বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন । তাঁর দৃষ্টি পশ্চিমের দিগন্তরেখায়। ফজরের নামাজ শেষ হয়েছে । সূর্য এখনো পুরোপুরি ওঠে নি । পশ্চিম আকাশে মেঘের ঘনঘটা । সম্রাট প্রথম সূর্যকিরণ কপালে মাখতে চাচ্ছেন । এই মুহূর্তে হুমায়ূনের সৌভাগ্যের ঘাটতি যাচ্ছে । ছয় মাস পার হয়েছে, চুনার দুর্গ দখল হয় নি । গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান মীর আতশ পুরোপুরি ব্যর্থ । সে নৌকায় কামান বসিয়ে কামান দাগার হাস্যকর চেষ্টা করেছিল । কামান দাগামাত্র গোলার প্রবল বিপরীত ধাক্কায় দু’টি বড় নৌকা কামান এবং বারুদসহ পানিতে ডুবে গেছে । কামানের সঙ্গে তিনজন কামানচিও পানিতে । তারা সাঁতার না জানার কারণে পানির নিচ থেকে উঠে আসতে পারে নি ।
পশ্চিম আকাশের মেঘ পরিষ্কার হচ্ছে না, বরং গাঢ় হচ্ছে । ঘন কালো মেঘের যে বিচিত্র সৌন্দর্য আছে তা হুমায়ূন আগে লক্ষ করেন নি । আকাশের এই ছবি এঁকে ফেলতে পারলে ভালো হতো ।তাঁর ছবি আঁকার হাত এখনো সেই পর্যায়ে আসে নি । আফসোস!
আলামপনা !
হুমায়ূন পেছনে তাকালেন ।জওহর আবতাবচি* সম্রাটের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে । তার মুখ হাসি হাসি ।
*আবতার শব্দের অর্থ পানি । আবতাবচি-যে পানি সরবরাহ করে । সম্রাটকে পানি খাওয়ানোর দায়িত্ব জওহর আবতাবচি’র ।
জওহর!সুপ্রভাত ।
বাদশাহ নামদার পর্ব –১০
জওহর লজ্জায় মাথা নিচু করল । সে কিছু বলার আগেই সম্রাট তাকে সুপ্রভাত জানালেন। কী লজ্জা! কী লজ্জা!
জওহর আমতা আমতা করে বলল, সুপ্রভাত মহান সম্রাট । আমি আপনার জন্যে সুসংবাদ নিয়ে এসেছি । কিছুক্ষণ আগে রুমী খাঁ দলবল নিয়ে চুনার দুর্গে প্রবেশ করেছে । শের খাঁ’র ছেলে দুর্গ ছেড়ে পালিয়ে গেছে ।
শুকুর আলহামদুলিল্লাহ । আমার হৃদয় এই মুহূর্তে আনন্দে পূর্ণ ।
আমার কাছে তুমি কী উপহার প্রার্থনা কর ?
আপনার স্নেহ । আল্লাহপাক সাক্ষী, আপনার স্নেহ এবং করুণা ছাড়া আমার আর কিছুই চাইবার নেই ।আমি আমৃত্যু আপনাকে পানি খাইয়ে যেতে চাই ।
তা-ই হবে ।আমি দু’টি রাজকীয় ফরমান জারি করব । কলমচিকে আসতে বলো ।
রাজকীয় ফরমানের প্রথমটিতে লেখা হলো, জওহর আবতাবচি আজীবন সম্রাটকে পানি খাওয়ানোর দায়িত্ব থাকবে । তাকে এক হাজারি মসনদদারি দেওয়া হলো ।
দ্বিতীয় ফরমানে রুমী খাঁকে ‘মীর আতশ’ উপাধি দেওয়া হলো । তাকে চুনার দুর্গের আপাতত দায়িত্ব দেওয়া হলো । দুর্গের বন্দিদের যেন প্রাণহানি না হয় । সম্রাট দুর্গের প্রতিটি বন্দির প্রাণের জিম্মাদার ।
ফরমানজারির পর হুমায়ূন এক পেয়ালা বেদানার রস খেলেন । অজু করে আল্লাহপাকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্যে সূরা ফাতেহা পাঠ করলেন । জওহর সারাক্ষণই সম্রাটের পাশে বসে রইল ।
বাদশাহ নামদার পর্ব –১০
জওহর ।
জি আলামপনা ।
আমি ছদ্মবেশে কিছুক্ষণের জন্যে শহর ঘুরতে বের হব । হযরত ওমর রাজিআল্লাহুতালা আনহু এই কাজ করতেন ।
উনি রাতে বের হতেন । দিনে না । রাতের আলোয় কিছুই দেখা যাবে না । আমি দিনের আলোয় বের হব। তুমি আমাকে ঘোড়া ব্যবসায়ীর মতো সাজিয়ে দাও । চাদরে আমার ঠোঁট থাকবে ঢাকা । মানুষের পরিচয় লেখা থাকে ঠোঁটে । ঠোঁট ঢাকা মানুষ হলো পরিচয়হীন মানুষ ।
পাশাপাশি দু’টি ঘোড়া চলছে । একটিতে সম্রাট হুমায়ূন অন্যটিতে জওহর আবতাবচি । অনেক দূর থেকে তাদেরকে অনুসরণ করছে সম্রাটের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী বাহিনী । তেমন প্রয়োজনে নিমিষের মধ্যে ছুটে এসে তারা সম্রাটকে ঘুরে বেড়ালেও সম্রাটের নিরাপত্তাজনিত কোনো সমস্যা নেই ।
শহর শান্ত । দোকানপাট খুলেছে । ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে । চুনার দুর্গ পতনের কোনো প্রভাব শহরে পড়ে নি । শহরের কেন্দ্রে হরিসংকীর্তন শুনলেন ।
একজন নাগা সন্ন্যাসীকে দেখা গেল । গায়ে ভস্ম দেখে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় ঘুরছে । তাকে ঘিরে একদল ছেলেমেয়ে । নাগা সন্ন্যাসী তার সাধনদণ্ডে কাঁসার একটি ঘণ্টা ঝুলিয়ে দিয়েছে । যখন সে হাঁটছে ঘণ্টায় ঢং ঢং শব্দ হচ্ছে । সম্রাট নাগা সন্ন্যাসীর সঙ্গে জওহর আবতাবচির মাধ্যমে কিছুক্ষণ কথা বললেন । তিনি হিন্দুস্থানি ভাষা জানেন না ।
বাদশাহ নামদার পর্ব –১০
আপনি নগ্ন ঘুরছেন কেন ?
আমি নাগা সন্ন্যাসী, সবকিছু বিসর্জন দিয়েছি বলেই নগ্ন ।
আপনি তো লজ্জাও বিসর্জন দিয়েছেন । লজ্জা বিসর্জনের জিনিস না ।
তোর কাছে না, আমার কাছে লজ্জাও বিসর্জনের ।
আপনি গোপন অঙ্গে ঘণ্টা বেঁধেছেন কেন ?
সবাইকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্যে ঘণ্টা ।
আপনি তো সবই বিসর্জন দিয়েছেন । গোপন অঙ্গও বিসর্জন দিন ।
এর তো আপনার প্রয়োজন নেই ।
আমাকে নিয়ে তুই মাথা ঘামাচ্ছিস কী জন্যে ? তুই ঘোড়া বেচতে এসেছিস, ঘোড়া বিক্রি কর ।পুণ্য কামাতে চাইলে আমার সেবা কর ।সম্রাট তাকে দশটা তাম্রমুদ্রা দিয়ে শহরের বাইরে চলে গেলেন । নদীর পাড় ঘেঁসে ঘেঁসে যাচ্ছেন । তাঁর অদ্ভুত লাগছে । মধুর বাতাস । পশ্চিম আকাশের মেঘ এখন ভেলার মতো পুরো আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে । একটা তালগাছ বাঁকা হয়ে নদীর দিকে ঝুঁকে আছে । একদল শিশু তালগাছে উঠে সাবধানে মাথা পর্যন্ত যাচ্ছে, সেখান থেকে ঝাঁপ দিয়ে নদীতে পড়ছে । তাদের কী আনন্দ! সম্রাট বললেন, দেখো জওহর । ওদের কী আনন্দ!
জওহর কিছু বলল না । হুমায়ূন বললেন, সম্রাটের পুত্র-কন্যারা এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত ।
জওহর বলল, তাঁদের জন্য অন্য আনন্দ । মহান আল্লাহ ঠিক করে রেখেছেন কে কী আনন্দ পাবে । সম্রাট বললেন, চলো এগুই। আরও কোনো আনন্দদৃশ্য হয়তো সামনেই আছে ।
সম্রাট এগুলেন । প্রায় দু’ক্রোশ এগুবার পর তিনি থমকে দাঁড়ালেন। সামনে নখখাগড়ায় ঢাকা শ্মশানঘাট । বৃষ্টির সময় আশ্রয় নেওয়ার জন্যে চারদিকে খোলা শ্মশানবন্ধু ঘর । ঘরভর্তি নানান বয়সী নারী । তারা কলকল করে কথা বলছে ।
বাদশাহ নামদার পর্ব –১০
চারদিকে লোকে লোকারণ্য । ঢোল বাজছে, কাঁসার ঘণ্টা বাজছে । কিছুক্ষণ পরপর সবাই মিলে গগনবিদারী চিৎকার দিচ্ছে-সতী মাই কি জয় ।
চারজন পুরোহিত আসন করে বসে আছে । মন্ত্রপাঠ চলছে । পুরোহিতদের দক্ষিণ দিকে নদীর কাছাকাছি ডোমরা বসেছে কলসিভর্তি চোলাই মদ নিয়ে । তাদের চোখ রক্তবর্ণ ।
সম্রাট বিস্মিত হয়ে বললেন, কী হচ্ছে?
সতীদাহ হবে আলামপনা। মৃত স্বামীর সঙ্গে তার জীবিত স্ত্রীকে চিতায় পোড়ানো হবে ।
এই সেই সতীদাহ! আমি সতীদাহের কথা শুনেছি, আগে কখনো দেখি নি ।
দেখার জিনিস না । হিন্দুস্থানি বর্বরতা । চলুন ফিরে যাই । যে মেয়েটিকে পুড়িয়ে মারা হবে তার সঙ্গে কি কথা বলা যাবে ? আলামপনা । সে কথা বলার মতো অবস্থায় এখন থাকবে না ।
সবাই তাকে ঘিরে আছে । তাকে নিশ্চয়ই আরক খাওয়ানো হয়েছে । সে এখন নেশাগ্রস্ত ।
কদল মানুষ দেখছি লাঠিসোটা নিয়ে দাঁড়িয়ে । এরা কারা ?
সবসময় দেখা গেছে আগুন লাগানোমাত্র সতী দৌড় দিয়ে চিতা থেকে পালাতে চায় । তখন লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তাকে চিতায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং আগুনের উপর মেয়েটিকে চেপে ধরে রাখা হয় ।
নরকের বর্বরতা ।
অবশ্যই ।
আমি এই মুহূর্তে ফরমান জারি করে সতীদাহ বন্ধ করতে চাই ।
আলামপনা । গুস্তাকি মাফ হয় । আপনার সমস্ত প্রজা হিন্দু । আপনি ওদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে বাধা দিলে তারা বৈরী হয়ে উঠবে । আপনার জন্যে শাসনকার্য পরিচালনা দুঙ্কর হবে ।
আমি মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে চাই।
ঘোড়ার ব্যবসায়ী হিসেবে তারা আপনার সঙ্গে মেয়েটিকে কথা বলতে দেবে না
তাদেরকে তুমি বলো আমি মোঘল সম্রাট হুমায়ূন এবং আমার রক্ষীবাহিনীকে কাছে এগিয়ে আসতে বলো।
বাদশাহ নামদার পর্ব –১০
চিতায় ঘিয়ের আগুন জ্বলে উঠেছে । সেখানে প্রায় সত্তর বছর বয়সী এক চুলপাকা বৃদ্ধের শবদেহ । তার চুলে আগুন ধরতেই নিমিষে সব চুল জ্বলে গেল । আগুন ভালোমতো জ্বলে উঠলে সতী স্বেচ্ছায় হেঁটে হেঁটে চিতায় উঠবে । তাকে ভাং-এর শরবত খাওয়ানো হয়েছে । তার চিন্তাশক্তি কাজ করছে না ।ঢোলের বাদ্য আকাশ স্পর্শ করছে । শ্মশানঘরের তরুণীরা একে একে আসছে। সতী মেয়েটির কপালে সিঁদুর দিচ্ছে । সেই সিঁদুর নিজের কপালে ঘষছে এবং উপুড় হয়ে পড়ে মেয়ের পায়ে পড়ে তাকে প্রণাম করছে । বাজনাদাররা আধাপাগলের মতো নাচছে । হঠাৎ বাদ্যবাজনা থামল । সম্রাট হুমায়ূন এগিয়ে এলেন ।
তাঁর ঘোড়া এসে থামল সতীদাহের মেয়েটির সামনে । বারো-তের বছর বয়সী একটি মেয়ে । পরনে লালপেড়ে শাড়ি । গা- ভর্তি অলংকার । কী সুন্দর সরল মুখ, বড় বড় চোখ! ভয়ে আতঙ্কে সে থরথর করে কাঁপছে । মেয়েটির সঙ্গে কোথায় যেন সম্রাটের কন্যা আকিকা বেগমের মিল আছে ।
তোমার নাম কী ? বলো, নাম বলো ।
অম্বা ।
তোমার স্বামী মারা গেছে । সে চিতায় পুড়ে কয়লা হবে । তুমি তো বেঁচে আছ, তুমি কেন মরবে?
Read more
হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১১
