মীর হামজা বললেন, অশ্বারোহী বিশাল বাহিনী নিয়ে একান্তে কথা ? আমরা দুজন দূরে সরে যাব । একান্ত কথা সেখানেই হবে । আপনি আপনার বাহিনী নিয়ে এসেছেন কেন ? বৈরাম খাঁ হাসতে হাসতে বললেন, গাধার বেপারি সঙ্গে গাধা নিয়ে চলাফেরা করে। গাধাগুলি হচ্ছে তার শোভা । একজন সেনাপতির শোভা তার সৈন্যবাহিনী ।
আমি আপনার সঙ্গে একান্তে কথা বলব না । যা বলতে চান এখানে বলুন ।
আমার সম্রাটের সঙ্গে আপনার কথা হয়েছে । সম্রাটকে আপনার কেমন মনে হয়েছে ?
তিনি ভীতুপ্রকৃতির মানুষ ।
ভীতু ?
হ্যাঁ ভীতু । ভীতু বলেই ভাইকে খুশি রাখার চেষ্টা করছেন ।
ভ্রাতৃস্নেহও তো হতে পারে ।
সম্রাটদের ভ্রাতৃস্নেহ থাকে না ।ভ্রাতৃভীতি থাকে ।
সম্রাট হুমায়ূন যুদ্ধযাত্রার পরপর কি কামরান মীর্জা নিজেকে দিল্লীর
সম্রাট ঘোষণা করবেন ?
সেটা উনিই ভালো বলতে পারবেন । আমি অন্তর্যামী না ।
আমি এই তথ্য বিশেষভাবে জানতে চাচ্ছি । সম্রাটের অমঙ্গল আশঙ্কায় আমি অস্থির ।
মীর হামজা বললেন, আপনাকে আগেই বলেছি আমি অন্তর্যামী না ।
কামরান মীর্জার পরিকল্পনা আমি জানি না ।
বৈরাম খাঁ বললেন, আমি কামরান মীর্জার পরিকল্পনা আঁচ করতে পারছি ।
আপনি এই খবর কামরান মীর্জাকে জানাবেন ।
অবশ্যই জানানো হবে ।
বৈরাম খাঁ বললে, আপনাকে মুখে কিছু জানাতে হবে না । আমি
এমন ব্যবস্থা করব যে আপনি লাহোরে উপস্থিত হওয়ামাত্র কামরান
মীর্জা যা বোঝার বুঝে নেবেন ।
কী ব্যবস্থা করবেন ?
আপনার জন্যে একটি গাধা সংগ্রহ করা হয়েছে । আপনি গাধার পিঠে চড়ে লাহোরে যাবেন । নগ্ন অবস্থায় যাবেন ।
আপনি উন্মাদের মতো কথা বলছেন ।
হতে পারে । আপনার সঙ্গের অশ্বারোহীর আমার সেনাবাহিনীতে যোগ দিবে । এরা ভাড়াটিয়া সৈন্য । দলত্যাগে তাদের কখনো সমস্যা হয় না ।
বাদশাহ নামদার পর্ব –৯
সম্রাট হুমায়ূনের কানে এই খবর পৌঁছানোর পরিণাম হবে ভয়াবহ ।
তাঁর কানে এই খবর আমিই পৌঁছাব । তাঁকে বলব, মীর হামজা লাহোরের পথে রওনা হওয়ার পর একদল ডাকাতের হাতে পড়েন। ডাকাতরা তাঁর সব লুটে নিয়ে তাঁকে নগ্ন করে গাধার পিঠে তুলে দেয় ।সম্রাট এই খবরে আমোদ পাবেন, তিনি আমোদ পছন্দ করেন ।
মীর হামজাকে সত্যি সত্যি নগ্ন করে গাধার পিঠে চড়িয়ে দেওয়া হলো ।
ফজরের নামাজের পরপরই সম্রাট হুমায়ূনের বিশাল বাহিনী বঙ্গদেশের দিকে যাত্রা শুরু করল । তারিখ : ২৭জুলাই ১৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দ।
সম্রাট আনন্দিত, কারণ তার দুই ভাই হিন্দাল মীর্জা এবং আসকারি মীর্জা তাঁর সঙ্গে আছেন ।
যাত্রার সময় আশ্চর্য এক ঘটনাও ঘটেছে । দু’টি কবুতর সম্রাটের মাথার উপর চক্রাকারে ঘুরেছে । এটি অতি শুভ লক্ষণের একটি।
অগ্রগামী দলে আছে অশ্বারোহী বাহিনী । তার পেছনের পদাতিক বাহিনী । তার পেছনের পদাতিক বাহিনী । পদাতিক বাহিনী চলছে হস্তীযূথের সঙ্গে । হাতির সংখ্যা আট শ’ । সেনাদল কোথাও না থেমে আসর পর্যন্ত একনাগাড়ে চলবে । আসরের সময় বিশ্রাম এবং আহারের জন্যে থামা হবে । পরদিন আবারও ফজরের নামাজের পর যাত্রা শুরু হবে । যুদ্ধযাত্রার সময় সম্রাট একবেলা আহার করেন ।
প্রথম যাত্রাবিরতিতে সম্রাটকে যে খাবার দেওয়া হয়েছিল, তার
বর্ণনা দেওয়া যেতে পারে ।
পোলাও : পাঁচ ধরনের ।
রুটি : সাত প্রকারের ।
পাখির মাংস : কিসমিসের রসে ভেজানো পাখি ঘিতে ভেজে দেওয়া ।
পাখিদের মধ্যে আছে হরিয়াল, বনমোরগ , বিশেষ শ্রেণীর ময়ূর ।
ভেড়ার মাংস : আস্ত ভেড়ার রোস্ট ।
বাছুরের মাংস : কাবাব ।
পাহাড়ি ছাগের মাংস : আস্ত রোস্ট (সম্রাটের বিশেষ পছন্দের খাবার)।
ফল,শরবত, মিষ্টান্ন ।
বাদশাহ নামদার পর্ব –৯
সম্রাট হুমায়ূন এবং তাঁর পরিবারের জন্যে যুদ্ধকালীন বাবুর্চির সংখ্যা ছিল এক হাজার । প্রধান বাবুর্চি নকি খান নতুন নতুন খাবার উদ্ভাবন করতেন ।তাঁর উদ্ভাবিত একটি খাবার পুরনো ঢাকার কিছু রেস্তোরাঁয় এখনো পাওয়া যায় । খাবারের নাম গ্লাসি ।
গ্লাসির রেসিপি (মোঘল আমলের) দেওয়া হলো । পাতলা স্লাইস করে কাটা খাসির মাংস সজারুর কাঁটা (বিকল্প, খেজুরের কাঁটা) দিয়ে কেঁচতে হবে । কেঁচানো মাংসে দিতে হবে কিসমিচের রস, পোস্তাদানা বাটা , পেস্তা বাটা, শাহী জিরা বাটা, আদার রস, পেঁয়াজের রস, রসুনের রস, দই, দুধ এবং গম বাটা । পরিমাণমতো লবণ । এতে যুক্ত হবে জয়ত্রি গুঁড়া, জায়ফল গুঁড়া, দারুচিনি গুঁড়া । সব ভালোমতো মেখে মাটির হাঁড়িতে রেখে ঢাকনা লাগিয়ে দিতে হবে । মাটির হাড়ি সারা দিন রোদে থাকবে । খাবার পরিবেশনের আগে আগে অল্প আঁচে মাংসের টুকরা মহিষের দুধের ঘিতে (ভৈসা ঘি) ভাজতে হবে ।
বঙ্গদেশের দিকে যাত্রার সময় তাঁর রসদখানায় মহিষের দুধের ঘি
ছিল দশ মণ এবং গরুর দুধের ঘি ছিল ত্রিশ মণ ।
সৈন্যদের খাবার ছিল : এক ঘটি দুধ, যবের রুটি, এক পোয়া ছাতু,
মাংস এবং পেঁয়াজ ।
যাত্রাবিরতির প্রথম রাত্রি ।
হুমায়ূন এশার নামাজ শেষ করে তাঁর জন্যে খাটানো চৌরনরৌতি তাঁবুতে গেছেন ।গানবাজনা শুনে আফিং খেয়ে ঘুমাবেন ।
তাঁর নিজস্ব ভৃত্য জওহর আবতাবচি তাঁকে জানাল শের খাঁ তাঁর জন্যে কিছু উপহার পাঠিয়েছেন । উপহারের মধ্যে আছে তিনজন অতি রুপবতী বাঙ্গালমুলুকের তরুণী এবং সাতজন হিজড়া । উপহারের সঙ্গে একটি পত্রও আছে ।
সম্রাট পত্র পাঠ করলেন । শের খাঁ লিখেছেন-
দিল্লীশ্বর সম্রাট হুমায়ূন,
আপনি অধম তুচ্ছাতিতুচ্ছ শের খাঁকে শায়েস্তা
করতে যাচ্ছেন । আমি আপনার দাসানুদাস । আমার
কারণে এই তীব্র গরমে আপনার কষ্ট হচ্ছে, এটা
আমি নিতেই পারছি না ।
আপনি দিল্লীতে ফিরে যান ।
আপনাকে চুনার দুর্গ আমি দিয়ে দিচ্ছি ।
কিছু উপহার পাঠালাম । আমি জানি উপহার
আপনার পছন্দ হবে ।
ইতি
অধম শের খাঁ (ফরিদ)
বাদশাহ নামদার পর্ব –৯
চিঠিতে কাজ হলো । সম্রাট নির্দেশ দিলেন, একদিন বিশ্রামের পর মূল সেনাবাহিনী দিল্লী ফেরত যাবে ।ডেকে পাঠানো হবে শের খাঁকে । চুনার দুর্গের দখল নেওয়ার জন্যে রুমী খাঁকে পাঠানো হবে । রুমী খাঁর নেতৃত্বে থাকবে বেশ কিছু কামান এবং দুই শ’ কামানচি । কামানের প্রয়োজন হবে না ।তারপরেও থাকল ।
ফজরের নামাজের পর দিল্লী যাত্রা শুরু হবে । নামাজের পরপর হুমায়ূন ঘোষণা করলেন চুনার দুর্গ হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় তিনি উপস্থিত থাকতে চান । কাজেই যুদ্ধযাত্রা অব্যাহত থাকবে । সম্রাটের খামখেয়ালির সঙ্গে তাঁর সেনাপতি এবং আমীররা পরিচিত । কেউ অবাক হলেন না ।
চুনার দুর্গের অধিনায়ক শের খাঁ’র পুত্র কুতুব খাঁ ।
চুনার দুর্গে পৌঁছতে হুমায়ূনের চার মাস সময় লাগল । তিনি নভেম্বরে পৌঁছলেন । আরামদায়ক আবহাওয়ায় হুমায়ূন প্রসন্ন । ভেষজবিদ্যার উপর কিছু দুর্লভ বই তাঁর কাছে এসেছে । বইয়ে বর্ণিত গাছের গুণাগুণ পরীক্ষার বাসনায় তিনি অস্থির । দুর্গ দখলের পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্ব শুরু করবেন ।
দুর্গের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার জন্য কুতুব খাঁর কাছে দূত গেল । কুতুব খাঁ বললেন, সম্রাট স্বয়ং উপস্থিত হলেই দুর্গ তার হাতে তুলে দেওয়া হবে ।
সম্রাটের দূত বললেন, সামান্য দুর্গ দখলের জন্যে হিন্দুস্থানের অধিপতির আসা শোভা পায় না ।
কুতুব খাঁ বললেন, হিন্দুস্থানের অধিপতিকে অনেক তুচ্ছ কাজ কিন্তু করতে হয় । শব্দ করে তিনি বায়ু ত্যাগ করেন । আপনি হয়তো শোনেন নি ।
বাদশাহ নামদার পর্ব –৯
আপনার ঔদ্ধত্যমূলক আচরণের সমুচিত জবাব দেওয়া হবে ।
শুনে খুশি হলাম । আফগানরা সমুচিত জবাব ভালোবাসে ।
আপনি যে নোংরা কথাগুলি বলেছেন আমি নিজে সম্রাটকে তা জানাব ।
সেই সুযোগ আপনি পাবেন না ।
এই কথার অর্থ কী ?
আপনাকে বাধ্য করা হবে সম্রাটকে একটা পত্র পাঠাতে । সেই পত্রে আপনি বিনয়ের সঙ্গে লিখবেন যে, আপনি স্বেচ্ছায় দলত্যাগ করে আমার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন ।
জীবন থাকতে এ ধরনের চিঠি আমি লিখব না ।
জীবন থাকা অবস্থাতেই আপনি লিখবেন ।আমার নির্দেশে আপনাকে খোজা করানো হবে । খোজা করার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ামাত্রই আপনি চিঠি লিখতে রাজি হবেন ।
সম্রাট হুমায়ূন তাঁর দূতের কাছ থেকে একটা চিঠি পেলেন । চিঠিতে জানলেন এই আমীর দলত্যাগ করেছে । তাঁর শক্তি ও সামর্থ্য সে ব্যয় করবে আফগানদের জন্যে ।
Read more
হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১০
